বাংলাদেশের ঘরোয়া ফুটবলে অনেকদিন ধরেই বিদেশি খেলোয়াড়ের দাপট। মৌসুম শুরুর আগে বিদেশি খেলোয়াড় কোটা কমানো-বাড়ানো নিয়ে দেনদরবার চলে। এবারও ব্যতিক্রম হয়নি, কথা উঠেছে যথারীতি। তবে করোনাকালীন এই কঠিন সময়ে অনেক ক্লাবই বিদেশি খেলোয়াড়মুক্ত ফুটবল মৌসুম চাইছে। এ নিয়ে ক্লাবগুলো কিছুটা দ্বিধাবিভক্ত। মাঠের খেলায় বিদেশি খেলোয়াড় থাকা না-থাকা নিয়ে অনেকেই নানান যুক্তি দিচ্ছেন। বাংলা ট্রিবিউনের ধারাবাহিক এই আয়োজনে আজ থাকছে জাতীয় দলের সাবেক কোচ সাইফুল বারী টিটুর মূল্যায়ন-
বিদেশি ফুটবলার থাকলে তাকে একাদশে রাখতেই হবে- এমন প্রবণতা থাকে ক্লাবগুলোর মধ্যে। আবার কোচ যারা আছেন তারাও চান মাঠে সেরা খেলাটা দেখাতে। সেক্ষেত্রে অনেকের ভরসার জায়গা জুড়ে আছেন বিদেশিরাই। তাদের নৈপুণ্যেই অনেক সময় স্থানীয়রা ম্লান হয়ে পড়েন।
বিদেশি ফুটবলার নিষিদ্ধ নিয়ে যখন তর্ক-বিতর্ক চলছে, তখন দেশের অন্যতম সেরা কোচ সাইফুল বারী টিটু বিষয়টির সঙ্গে পুরোপুরি একমত হতে পারেননি। নিজের কাজের জায়গা থেকে বলেছেন, ‘মিশ্র অভিজ্ঞতা আমার বলতে পারেন। স্থানীয় খেলোয়াড় বেশি খেলতে পারলে ভালো। জাতীয় দলেও এর প্রভাব পড়ে। আবার বিদেশি না থাকলে খেলার মানও কমে যায়। এর ইতিবাচক ও নেতিবাচক দুটো দিকই আছে। তবে সব পজিশনে স্থানীয় ফুটবলাররা ভালো করলে অবশ্য অন্যরকম ভালো লাগা কাজ করে।’
বিদেশি খেলোয়াড়ের কল্যাণে সম্প্রতি বিশ্বকাপে খেলা দানিয়েল কলিনদ্রেসকে খেলতে দেখা গেছে। এছাড়া আর্জেন্টাইন হার্নান বার্কোসের মতো তারকা দ্যুতি ছড়িয়েছেন ঢাকার মাঠে। টিটুর ব্যাখ্যা, ‘বিদেশি খেলোয়াড়দের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয় সবার। যা কাজে দেয় খেলাতে। এখন ওদের মতো খেলোয়াড় যদি ভবিষ্যতে খেলতে না পারে তাহলে তাদের মিস করবে সবাই। দেখা যাবে, খেলার মাঠ ছাড়াও ড্রেসিং রুমসহ সব জায়গাতে শেখার সুযোগ কমে যাবে। বিদেশি ফুটবলারদের সঙ্গে খেলে অনেক কিছু শেখার আছে।’
স্থানীয়দের প্রতি দুর্বলতা প্রকাশও করেছেন এই কোচ। নিজের খেলোয়াড়ি জীবনের অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি করেছেন এভাবে, ‘১৯৮৯ সালে মোহামেডানের মতো বড় দলে গিয়েছি। সেই বছর ঢাকার মাঠে বিদেশি ফুটবলার নিষিদ্ধ ছিল। এমেকা ইউজিগোর তারকা খেলোয়াড় আমাদের সঙ্গে কলকাতায় খেলেছে। কিন্তু ঢাকায় তার খেলা হয়নি। সেই বছর বিদেশি নিষিদ্ধ থাকায় আমি ছাড়াও ইমতিয়াজ আহমেদ নকীব ও জাকির হোসেনসহ অনেক তরুণ খেলোয়াড় সুযোগ পেয়ে আলোচনায় উঠে এসেছিলাম। আবার সাব্বির ভাইরা (সৈয়দ রুম্মন বিন ওয়ালি সাব্বির) কিন্তু বোরহানজাদেহ, নালজেগার ও বিজেন তাহেরিদের সঙ্গে খেলে নিজেদের প্রমাণ করেছেন।’
বিদেশিদের সঙ্গে লড়াই করে জায়গা করে নেওয়ার পক্ষে টিটু। এছাড়া স্থানীয়দের মানসিকতায় বদল আনার প্রতিও জোর দিয়েছেন সাবেক এই ফুটবলার, ‘একজন খেলোয়াড়কে পুরোপুরি পেশাদার হতে হবে। তাকে ক্লাব লেবেলে ভালো করতে হবে। নিজেকে নিংড়ে দিয়ে জাতীয় দলে জায়গা করে নিতে হবে- এমন মানসিকতার প্রয়োজন। তাহলে অনেক সময় ভালো খেলোয়াড় উঠে আসবে।’
বিদেশি নিষিদ্ধ না করে কমিয়ে আনার পক্ষে তার মত, ‘বিদেশি না থাকলে সুযোগ পায় স্থানীয়রা। অন্য দিকে অবশ্য খেলার মান কমে যায়। তবে কমিয়ে আনাটাই বুদ্ধিমানের কাজ। তিন কিংবা দুই জনে রাখতে পারলে ভালো। আবার এএফসি কাপের কথাও মাথায় রাখতে হবে।’
প্রতিটি ক্লাবের একাডেমি হলেই বরং খুশি হতেন এই কোচ, ‘প্রতিটা ক্লাবে একাডেমি থাকতে হবে। সেখানেই তারা আস্তে আস্তে গড়ে উঠবে। একসময় পরিণত হবে। পুরোপুরি পেশাদারভাবে তৈরি হবে তখন। এছাড়া ক্লাব কিংবা জাতীয় দলে খেলার জন্য তারা সেভাবে প্রস্তুত থাকবে। বড়দের দেখে অনেক কিছু শেখার সুযোগ হবে।’
২০১২-২০১৩ মৌসুমে স্থানীয়দের নিয়ে সুপার কাপ জিতেছিলেন টিটু। সেই স্মৃতি রোমন্থন করে বলেছেন, ‘আমার অধীনে মোহামেডান লিগে পঞ্চম হয়েছিল। তারপর স্থানীয়দের নিয়ে করা সুপার কাপে আমরা শেখ রাসেলকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলাম। স্থানীয়রা সেবার বেশ ভালো খেলেছিল। সুযোগ পেলে তারাও যে ভালো খেলতে পারে সেটাও প্রমাণিত হয়েছে।’
অতিমাত্রায় বিদেশি নির্ভরতা অনেক সময় ক্ষতির কারণও হয়ে দাঁড়ায়। টিটু উদাহরণ হিসেবে ভারতের আইএসএলকে সামনে এনেছেন, ‘আইএসএলের দিকে তাকিয়ে দেখুন। বেশি বিদেশি খেলোয়াড়ের কারণে তাদের সেখানে ভালো স্ট্রাইকার উঠে আসছে না। এখনও সুনীল ছেত্রীর দিকে তাকিয়ে থাকতে হচ্ছে। তারপরও ওখানে ফুটবল জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। আলোড়ন তুলতে পেরেছে।’








