তার একটাই শর্ত, চাওয়াও বলা যেতে পারে। মনের গহিনে বয়ে চলা শঙ্কা ও অস্থিরতার স্রোতের প্রকাশ ঘটাবেন ঠিকই, কিন্তু পরিচয় গোপন রাখতে হবে। আফগানিস্তানের বর্তমান পরিস্থিতি মোটামুটি সবারই জানা। দেশটি দখলে নিয়েছে তালেবানরা। যে যেভাবে পেরেছেন, দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন বা করছেন। সেই দেশে থেকে তালেবানদের বিরুদ্ধে কিছু বলতে গেলে অবস্থা কী হতে পারে, বলার অপেক্ষা রাখে না। তাই আফগান ফুটবলারের পরিচয় গোপন রাখার ‘শর্ত’ মেনে নিতে দ্বিতীয়বার ভাবতে হয়নি।
তারপরও পাঠকের সুবিধার্থে ছদ্মনাম হিসেবে ওই ফুটবলারকে আব্দুল আজিজ নামে উপস্থাপন করা হলো। তো এই আব্দুল আজিজ কিছু দিন আগেও ফুরফুরে মেজাজে ফুটবল নিয়ে মেতে থাকতেন। রাজধানী কাবুলের বাইরে অন্য প্রদেশে বসবাস তার। সেখানে ফুটবল নিয়ে ভালোই সময় কাটছিল আফগান জাতীয় দলের সেই ফুটবলারের। কিন্তু তালেবানরা দেশের ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পর সবকিছু পাল্টে গেলো। ফুটবল খেলা তো দূরের কথা, এখন জীবন টিকিয়ে রাখাই দায় হয়ে পড়েছে। ঘরবন্দি থেকে সময় কাটছে। আর জীবন-ধারণ করতে তালেবানদের কাছ থেকে আসছে একের পর এক বিধিনিষেধ! আফগানিস্তানের সাম্প্রতিক হালচাল ফুটে উঠেছে বাংলা ট্রিবিউনের কাছে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সেই ফুটবলারের কথাবার্তায়।
এই তো কিছু দিন আগে কাতারে বিশ্বকাপ বাছাই পর্ব খেলেছে আফগানিস্তান। সেই দলে ছিলেন তরুণ সেই খেলোয়াড়ও। তালেবানের ক্ষমতা দখলের আগে ফুটবল নিয়েই সময় কাটছিল আব্দুল আজিজের। স্থানীয় একটি দলের হয়ে মাঠও মাতিয়ে যাচ্ছিলেন। কিন্তু হঠাৎ করে তালেবানের মতো কট্টরপন্থি দলের ক্ষমতা দখলের সঙ্গে জীবন-জীবিকা সবকিছু অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে!
সেই ফুটবলারটি নিজের আসল নাম পাঠকদের কাছে না জানাতে অনুরোধ করে বলেছেন, ‘দয়া করে আমার আসল নাম লিখবেন না। লিখলে আমার ও পরিবারের ওপর বিপদ নেমে আসতে পারে।’
স্থানীয় মাঠে ফুটবল খেলে সময় কাটালেও এখন বাসায় অনেকটা বন্দি অবস্থায় দিন কাটছে তার, ‘আমি একজন ফুটবলার। জাতীয় দলে প্রতিনিধিত্ব করছি। তালেবানরা ক্ষমতা নেওয়ার পর থেকে প্রতিটি মুহূর্ত আতঙ্কে কাটছে। কখন কী হয়ে যায়। মাঠে যাওয়া এখন বন্ধ আছে। তার ওপর ওরা নানান রকম বিধিনিষেধ আরোপ করে যাচ্ছে।’
একটি উদাহরণ দিয়ে ওই তরুণ ফুটবলার বলেছেন, “তালেবানরা বলেছে, বড় চুল রাখা যাবে না। ফুলপ্যান্ট পরে ফুটবল খেলা উচিত। আমার চুলের স্টাইল ও আর ড্রেস দেখে ওরা (তালেবান) বলে, ‘তুমি তো মুসলিম নও’। আসলে আমরা সবাই ভয়ে আছি। বাসায় বাবা-মা আছেন। ভাইবোনরাও কম আতঙ্কে নেই।”
সতীর্থ অনেক খেলোয়াড় দেশ ছেড়েছেন। তাদের মতো আফগানিস্তান ছাড়তে চেয়েছিলেন আব্দুল আজিজ। কিন্তু পারেননি, ‘আমিও চেয়েছিলাম দেশ ছাড়তে। কিন্তু পারিনি। এখন কী করার। ভাগ্যের হাতে নিজেকে ছেড়ে দিয়েছি। এরমধ্যে ভালো দিক হলো, নারী ফুটবলার সবাই দেশ ছাড়তে পেরেছে।’
রাজধানী কাবুলে বোমা বিস্ফোরণ। মেয়েদের ঘর থেকে বের হওয়া কিংবা গান-বাজনা অনেকটা নিষিদ্ধ বলা চলে। অন্ধকার যুগের দিকে দেশকে নিয়ে যাওয়ার পাঁয়তারা। আব্দুল আজিজ এমন দিন কখনোই চাননি, ‘মনে করেছিলাম দেশ একটু একটু উন্নতির দিকে যাচ্ছে। কিন্তু ঠিক এই সময়ে আবারও তালেবানরা ক্ষমতায় চলে এলো। এখন আমাদের সামনের কীভাবে দিন কাটবে, কিছুই জানি না। এদিকে ফুটবল ফেডারেশনও চুপ। কোনও কার্যক্রম নেই। আমাদের ভবিষ্যৎ তো অন্ধকার দেখতে পাচ্ছি। শুধু যারা দেশের বাইরে আছে বা চলে গেছে, তারা আমাদের চেয়ে ভালো আছে।’
এমন ঘোরতর অন্ধকার সময়ে কোনও কূলকিনারা খুঁজে পাচ্ছেন না এই ফুটবলার। অন্ধকার সময়ের পরিক্রমায় আর জড়াতে চান না। বেঁচে থাকতে, ফুটবল মাঠে ফিরতে অধীর অপেক্ষায় আছেন। কিন্তু আদৌ সেই দিন ফিরবে কিনা, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এই আফগানের মতো সন্দিহান অনেকেই!









