কাঠমান্ডুর দশরথে নতুন ইতিহাস গড়েছে বাংলাদেশ নারী ফুটবল দল। সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে প্রথমবারের মতো শিরোপা জিতে চারদিকে হইচই ফেলে দিয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট জেতার পিছনে কোচ গোলাম রব্বানী ছোটনের অবদান কম নয়। দীর্ঘদিনের নিরলস প্রচেষ্টায় এসেছে এমন সাফল্য। রাতে ট্রফি নিয়ে উল্লাসের ফাঁকে কাঠমান্ডুর হোটেল থেকে ফোনে বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে কথা বলেন তিনি। সাক্ষাৎকারে ক্যারিয়ারের শুরুর দিকের কথা ছাড়াও জয়ের অভিব্যক্তি নিয়ে অনেক কথাই উঠে এসেছে।
প্রশ্ন: এমন উদ্ভাসিত জয়ের পর চারদিক থেকে অভিনন্দনের বৃষ্টি আসছে। নিশ্চয়ই এই অনুভূতি আগের সবকিছুকে ছাড়িয়ে গেছে?
গোলাম রব্বানী ছোটন: তা তো অবশ্যই। আগে তো কোনও সময় সিনিয়রদের আসরে শিরোপা জেতা হয়নি। এবার অপরাজিত থেকে চ্যাম্পিয়ন হলাম। দক্ষিণ এশিয়ার শ্রেষ্ঠত্ব এখন আমাদের দখলে। এই ভালো লাগাটা ভাষায় প্রকাশ করতে পারবো না।
প্রশ্ন: কাঠমান্ডুর টুর্নামেন্ট শুরুর আগে কী ভেবেছিলেন। শিরোপা জয়ের স্বপ্ন তখন উঁকি দিয়েছিল?
গোলাম রব্বানী ছোটন: আমি ধাপে ধাপে এগিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিলাম। জানতাম নিজেদের খেলাটা খেলতে পারলে বহু দূর এগিয়ে যেতে পারবো। খেলোয়াড়দের ওপর বিশ্বাস ছিল। কেননা, ওরা আমারই হাতে গড়া। সাবিনা-কৃষ্ণারা কথার প্রতিদান মাঠে দিয়েছে। আজ সে কারণেই আমরা সাফে চ্যাম্পিয়ন।
প্রশ্ন: এবারই প্রথম দুই শক্তিধর ভারত ও নেপালকে হারালেন। কীভাবে সম্ভব হলো?
গোলাম রব্বানী ছোটন: আমাদের দল আগের চেয়ে পরিপক্ব। আগে ওরা বয়সভিত্তিক পর্যায়ে খেলে নিজেদের এখানে নিয়ে এসেছে। সাবিনা ছাড়া সবারই বয়স ২০-এর আশপাশে। ওদের যে অভিজ্ঞতা তাতে যেকোনও দলকে হারানোর ক্ষমতা রাখে। আমরা কিন্তু মালয়েশিয়াকে নিজেদের মাঠে হারিয়েছি। তখন থেকেই আমাদের আত্মবিশ্বাসের লেভেল বাড়তে থাকে।
প্রশ্ন: এখন তো আপনি সবচেয়ে সুখী ব্যক্তি। নারীদের টুর্নামেন্টে বাংলাদেশ এই প্রথম ট্রফি জিতেছে আপনার কোচিংয়ে…
গোলাম রব্বানী ছোটন: তা বলতে পারেন। আমার ঈদের চেয়ে বেশি আনন্দ লাগছে। কাঠমান্ডুর ১৬ হাজার দর্শকদের সামনে বাংলাদেশ যেভাবে খেলেছে তা প্রশংসনীয়। অনেকে বলেছে দল চাপের মুখে পড়বে, ভেঙে পড়বে; কিন্তু হয়েছে উল্টো। আমাদের মেয়েরা প্রমাণ করেছে তা কঠিন অবস্থায় ম্যাচ জয় করতে পারে। পারে দেশবাসীর মুখে হাসি ফোটাতেও।
প্রশ্ন: এখন মহা সুখী হলেও আপনার শুরুর পথচলা মোটেও স্বস্তিদায়ক ছিল না। সেই গল্প শুনতে চাই..
গোলাম রব্বানী ছোটন: ২০০৯ সালে যখন মেয়েদের কোচ হয়েছি তখন বন্ধু-বান্ধবসহ অনেকেই টিটকারি-টিপ্পনী কেটেছে। তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করেছে। সেটা কানে তুলিনি। ধৈর্য ধরেছি, পরিশ্রম করে গেছি। এতদিন যারা টিটকারি মারতো আজ তারাই প্রশংসায় পঞ্চমুখ। এছাড়া আমি কোচিংয়ে আসার আগে ঢাকায় পশ্চিমবঙ্গ থেকে একটি দল এসেছিল। আমি গ্যালারিতে বসে তখন দেখেছিলাম আমাদের দল তাদের সঙ্গে পেরে উঠেনি। তখন থেকে মনে জেদ চেপে যায়। যদি কোনও সময় সুযোগ পাই তাহলে মেয়েদের কোচ হবো। সেই কথা এখনও মনে পড়ে। সেই জেদ আমাকে এতদূর এনেছে।
প্রশ্ন: আপনি যখন মেয়েদের কোচ হন তখন তো কেবল মেয়েদের ফুটবলটা বিকশিত হচ্ছিলো..
গোলাম রব্বানী ছোটন: তখন মেয়েরা ফুটবল ছাড়াও ভলিবল, হ্যান্ডবল খেলতো। আমি তাদের বলেছিলাম সাফল্য পেতে হলে একটি খেলাতে মনোযোগ দিতে। মাঠে ছেলে না মেয়ে খেলছে তা দেখবো না। শুধু পারফরম্যান্স দেখবো। ওরা আমার কথা শুনেছে। বর্তমান ফুটবল ফেডারেশনও মেয়েদের খেলায় জোর দিয়েছে। অনেকদিন ধরেই দীর্ঘমেয়াদে আবাসিক ক্যাম্প করছে। টেকনিক্যাল ডিরেক্টর পল স্মলিও সাহায্য করছে। সবার চেষ্টায় আজ আমাদের এই সাফল্য।
প্রশ্ন: আগে বাংলাদেশ দল ভারত কিংবা নেপাল দলের সামনে ভয় পেতো। এখন তো সাহসী এক বাংলাদেশকে দেখা গেছে।
গোলাম রব্বানী ছোটন: এটা ধারাবাহিক খেলার ফসল। আমাদের মেয়েরা বয়সভিত্তিক পর্যায় থেকে শিখে আসছে। এখন ওরা পরিপক্ব কিংবা অভিজ্ঞ হয়ে ভারত কিংবা নেপালের বিপক্ষে সাবলীল খেলেছে। এবার যেমন ভারত ম্যাচে জয়ের পর মনে হয়েছে ট্রফি আমরা জিততে পারবো। শারীরিক-মানসিক দিক দিয়ে আমরা এগিয়ে ছিলাম । আগে ওদের সামনে পেলে ভয় পেতো। এখন ভারত ও নেপাল দলকে মনে হয়েছে উল্টো আমাদের দেখে ভয় পেয়েছে!
প্রশ্ন: আপনার দলে ডিফেন্ডার থেকে ফরোয়ার্ড অনেকেই গোল পেয়েছে। এর রহস্য কী? তারওপর সাবিনাকে জায়গা বদল করেও খেলতে দেখা গেলো। ৮ গোল করে সবাইকে ছাড়িয়ে গেলো!
গোলাম রব্বানী ছোটন: বয়সভিত্তিক দল থেকে ওরা গোল করে আসছে। আমাদের পরিকল্পনা তেমন ছিল। আমরা সেটপিস কিংবা সব পজিশন থেকে গোল করার জন্য অনুশীলন করি। সেভাবেই ওরা বেড়ে উঠেছে। সাবিনার পজিশন বদলে খেলাটা পরিকল্পনার অংশ। মনিকা-মারিয়ার সঙ্গে সাবিনা যেন বল বানিয়ে দিতে পারে। সেই জন্য ওকে নম্বর ১০ পজিশনে খেলানো হয়েছে। ওর জায়গায় ও সফল হয়েছে।
প্রশ্ন: দক্ষিণ এশিয়ার শ্রেষ্ঠত্ব তো পেলেন। এখন নিশ্চয় স্বপ্ন আরও প্রসারিত করেছেন?
গোলাম রব্বানী ছোটন: এখন মেয়েরা পরিপক্ক হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার ফুটবলে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। অবশ্যই আরও ওপরের দিকে দেখতে চাই ওদের। বেশ কিছুদিন আগে ইরান-জর্ডানের কাছে হেরেছিলাম। এবার আর হতে দেবো না। সামনের দিকে এশিয়ান পর্যায়ে সম্মানজনক অবস্থায় থাকলে পারলে নিজের কাছে ভালো লাগবে।
প্রশ্ন: ম্যাচ জয়ের পর বাসা থেকে স্ত্রী কী বললো?
গোলাম রব্বানী ছোটন: আজ (সোমবার) ছিল আমার বিবাহবার্ষিকী। উত্তেজনায় তা ভুলেই যেতে বসেছিলাম। এই দিনে আবার সাফের শিরোপা জিতেছি, আমার ডাবল আনন্দ এখন। মেয়েরা এসে তো বললো এই ট্রফি আন্টির জন্যও উপহার।








