বিশ্বকাপের মাঠে আর্জেন্টিনা সেমিফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করেছে ঠিকই, কিন্তু তাদের শেষচার ছাপিয়ে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে ভিএআর ও রেফারিং বিতর্ক। একের পর এক সিদ্ধান্তে প্রতিপক্ষের আপত্তি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ এবং নতুন রেফারিং প্রটোকল- সব মিলিয়ে বিশ্ব ফুটবলে শুরু হয়েছে নতুন বিতর্ক।
বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার সেমিফাইনালে ওঠার পথজুড়ে রেফারিং নিয়ে বিতর্ক যেন পিছু ছাড়ছেই না। প্রতিপক্ষ দলগুলোর ধারাবাহিক অভিযোগের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়েছে টুর্নামেন্টে লিওনেল মেসিদের প্রতি বিশেষ সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ। সেই অভিযোগ থেকেই অনেক সমর্থক আর্জেন্টিনাকে ব্যঙ্গ করে ভার্জেন্টিনা বলে আখ্যা দিচ্ছেন।
বিতর্কের সর্বশেষ ঘটনা ঘটে শনিবার সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে। ম্যাচে সুইস ফরোয়ার্ড ব্রিল এমবোলোকে অভিনয়ের অভিযোগে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখিয়ে মাঠ থেকে বের করে দেন রেফারি। ভিএআরের সহায়তায় নেওয়া এই সিদ্ধান্তকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে মন্তব্য করেন সুইজারল্যান্ডের কোচ মুরাত ইয়াকিন।
এ নিয়ে সোমবার রয়টার্সের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলে ফিফা সরাসরি কোনো প্রতিক্রিয়া না দিয়ে ৮ জুলাই প্রকাশিত রেফারিং প্রধান পিয়েরলুইজি কলিনার একটি সাক্ষাৎকারের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে। সেখানে তিনি শেষ ষোলোতে মিসরের বিপক্ষে আর্জেন্টিনাকে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ নাকচ করেছেন।
২০২৬-২৭ মৌসুম থেকে কার্যকর হওয়া নতুন রেফারিং প্রটোকলের আওতায় ভুল খেলোয়াড়কে শাস্তি দেওয়ার মতো কিছু ক্ষেত্রে ভিএআরের হস্তক্ষেপের সুযোগ বাড়ানো হয়েছে। তবে এই নিয়ম বিশ্বকাপেই বড় পরিসরে আলোচনায় এসেছে।
বিশ্বকাপে ব্রিটিশ টেলিভিশন আইটিভির নিয়মনীতি সংক্রান্ত বিশ্লেষক এবং সাবেক ফিফা রেফারি ক্রিস্টিনা আনকেল বলেছেন, নতুন এই প্রটোকল প্রয়োগ করা ঠিক হয়নি। তার ভাষায়, ‘আমার মনে হয় না, শুরুতেই এটি প্রয়োগ করা উচিত ছিল। নিয়মটি খুব বিস্তৃত।’
তিনি বলেছেন, ‘এখানে শুধু কার্ড পাওয়া খেলোয়াড় বদলানো হচ্ছে না; বরং মূল সিদ্ধান্তই বদলে যাচ্ছে। যে সিদ্ধান্তে একদিকে ফ্রি-কিক দেওয়া হয়েছিল, সেটিকে উল্টো দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ সিদ্ধান্তের ভিত্তিটাই পরিবর্তন করা হচ্ছে।’
আনকেলের মতে, ‘এভাবে আমরা এমন এক পর্যায়ে চলে যাচ্ছি, যেখানে ভিএআর কার্যত আবার নতুন করে রেফারিং করছে। অথচ শুরু থেকেই ভিএআরকে এমন অবস্থান থেকে দূরে রাখার চেষ্টা ছিল।’
তার মতে, নতুন এই প্রটোকলের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো এটি পর্যাপ্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই বিশ্বকাপে প্রয়োগ করা হয়েছে। আর সেটিই জনমনে বিতর্ক আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
রয়টার্সকে তিনি বলেছেন, ‘পর্যাপ্ত পরীক্ষা ছাড়াই এই প্রটোকল সম্প্রসারণ করা হয়েছে। এটি যেন বারুদের স্তুপের মতো। আমি শুধু অপেক্ষা করছি, কখন শেষ বিস্ফোরণটি ঘটে।’
আর্জেন্টিনাকে ঘিরে বিতর্কের শুরু গ্রুপ পর্বেই। আলজেরিয়া দাবি করেছিল, তাদের অধিনায়ক আইসা মান্দির পায়ের পেছনে পা দেওয়ার ঘটনায় লিওনেল মেসিকে লাল কার্ড দেখানো উচিত ছিল। কিন্তু রেফারি তাকে বহিষ্কার করেননি। পরে সেই ম্যাচেই হ্যাটট্রিক করেন মেসি।
এর কয়েক দিন পর ম্যাচ পরিচালনায় অসন্তোষ জানিয়ে আনুষ্ঠানিক অভিযোগও করে আলজেরিয়া, রয়টার্সকে এমন তথ্য জানিয়েছে একটি সূত্র।
শেষ ষোলোতে মিসরের বিপক্ষেও বিতর্ক থামেনি। ৬২ মিনিটে মিসর গোল করলেও আক্রমণ গড়ার সময় ফাউলের অভিযোগে ভিএআর পর্যালোচনার পর সেটি বাতিল করা হয়।
পরে ম্যাচে পেনাল্টির আবেদনও নাকচ হয় মিসরের। এরপর ৯২ মিনিটে জয়সূচক গোল করে আর্জেন্টিনা। ম্যাচ শেষে মিসর ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন জানায়, রেফারির একাধিক সিদ্ধান্ত ম্যাচের ফলাফলে প্রভাব ফেলেছে।
তবে আনকেলের মতে, আলজেরিয়া ও মিসরের ম্যাচ দুটিতে রেফারিংয়ে বড় ধরনের ভুল তার চোখে পড়েনি। তিনি বলেন, প্রত্যাশিত ফল না এলে সমর্থকেরা সাধারণত সবচেয়ে সহজ লক্ষ্য হিসেবে রেফারিদেরই দোষারোপ করেন। তবে মাঠের বাইরের কিছু ঘটনাও সমর্থকদের আস্থা কমিয়ে দিয়েছে বলে মনে করেন তিনি।
সম্প্রতি দুটি লাল কার্ডের শাস্তি নিয়ে ফিফার সিদ্ধান্তও সমালোচনার জন্ম দেয়। যুক্তরাষ্ট্রের ফরোয়ার্ড ফোলারিন বালোগুন শেষ মুহূর্তে এক ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা থেকে অব্যাহতি পেলেও ইংল্যান্ডের ডিফেন্ডার জ্যারেল কোয়ানসাহকে দুই ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। আনকেলের ভাষায়, ‘এ মুহূর্তে সমর্থকদের আস্থা প্রায় পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে। রেফারি এবং বিশ্লেষক হিসেবে আমি অনেক বড় টুর্নামেন্ট কভার করেছি, কিন্তু এবার যেভাবে আলোচনা ও প্রশ্ন উঠছে, শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেই নয়, সর্বত্র। সেটা আগে কখনও দেখিনি।’







