বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তি হিসেবে দীর্ঘদিন প্রায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন জিয়ান্নি ইনফান্তিনো। কিন্তু বিশ্বকাপ ঘিরে বেসরকারি বিনিয়োগ আনার উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনাই এবার তার জন্য বুমেরাং হয়ে দাঁড়িয়েছে। উয়েফার নেতৃত্বে তীব্র বিরোধিতা, ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের পদত্যাগ এবং স্বচ্ছতার প্রশ্নে সমালোচনার মুখে ফিফা সভাপতির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এখন বড় অনিশ্চয়তার মুখে।
বিশ্বকাপ ও অন্যান্য টুর্নামেন্ট পরিচালনার জন্য নতুন একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠান গঠন এবং তার ২০ শতাংশ শেয়ার বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রির প্রস্তাব শেষ পর্যন্ত প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়েছেন সভাপতি ইনফান্তিনো।
শুক্রবার ফিফার এক বিবৃতিতে, যা ইনফান্তিনোর নামে প্রকাশ করা হয়, স্বীকার করা হয় যে প্রস্তাবটি ব্যাপক বিভাজন সৃষ্টি করেছে এবং তা আর এগিয়ে নেওয়া হবে না।
এর মধ্য দিয়ে বিশ্ব ফুটবলে টানা তিন দিনের তীব্র বিরোধের অবসান ঘটেছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে ইউরোপীয় ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফাও ঘোষণা দেয়, প্রস্তাব প্রত্যাহার না করা হলে তারা ফিফার সব কার্যক্রম বয়কট করবে।
এই পরিকল্পনাটি ছিল ইনফান্তিনোর ব্যক্তিগত উদ্যোগ। ইতিহাসের সবচেয়ে লাভজনক বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার দুই সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে সেই পরিকল্পনার ব্যর্থতা ফিফার শীর্ষে তার অবস্থানকে নড়বড়ে করে দিয়েছে। ৫৬ বছর বয়সী এই সুইস প্রশাসক আরও সাড়ে চার বছর ফিফার নেতৃত্বে থাকার পরিকল্পনা করেছিলেন।
কিন্তু ম্যাসাচুসেটসের কলেজ অব দ্য হলি ক্রস-এর অর্থনীতির অধ্যাপক ভিক্টর ম্যাথেসন রয়টার্সকে বলেছেন, ‘এক সপ্তাহ আগেও ইনফান্তিনোর পুনর্নির্বাচন প্রায় নিশ্চিত মনে হচ্ছিল। এত আর্থিকভাবে সফল একটি বিশ্বকাপ আয়োজনের পর তিনি সহজেই জিতবেন বলে ধারণা ছিল। কিন্তু এখন সেই অবস্থানই ঝুঁকির মুখে।’
বিশ্বকাপের আগে আগামী মার্চে মরক্কোয় অনুষ্ঠিতব্য ফিফা কংগ্রেসে চতুর্থ মেয়াদের জন্য ইনফান্তিনোর পুনর্নির্বাচন প্রায় নিশ্চিত বলেই ধরা হচ্ছিল। তার বিপক্ষে তখন কোনো উল্লেখযোগ্য প্রার্থীও ছিল না।
কিন্তু মাত্র তিন দিনের ঘটনাপ্রবাহ পুরো চিত্র পাল্টে দিয়েছে। ফিফার বিভিন্ন আঞ্চলিক কনফেডারেশন অভিযোগ তোলে, এত বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তাদের সঙ্গে কোনো আলোচনা করা হয়নি। অনেকেই ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে ফুটবলের মূল ভিতটাই বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগ তোলেন।
শুক্রবার ফিফা অতিরিক্ত অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে পরিকল্পনাটির পক্ষে অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করলেও ইনফান্তিনোর ঘনিষ্ঠ কয়েকজন কর্মকর্তা প্রকাশ্যেই এর বিরোধিতা করেন।
ফিফার জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা কার্লোস কর্দেইরো পদত্যাগ করে পরিকল্পনাটিকে ফুটবলের জন্য খারাপ চুক্তি বলে মন্তব্য করেন। অন্যদিকে ফিফার প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা কেভিন লামুর অভিযোগ করেন, কর্মীদের বিভ্রান্ত করা হয়েছে এবং পুরো উদ্যোগটি ছিল একজন ব্যক্তির প্রকল্প।
নেতৃত্বের ধরন নিয়ে প্রশ্ন
২০১৬ সালে দুর্নীতিকাণ্ডের পর সেপ ব্ল্যাটারের স্থলাভিষিক্ত হন ইনফান্তিনো। রয়টার্সকে বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে, স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রবণতার কারণে তিনি দীর্ঘদিন ধরেই সহকর্মীদের বিরক্তির কারণ ছিলেন।
এর আগেও ২০১৮ সালে ক্লাব বিশ্বকাপে ২৫ বিলিয়ন ডলারের বেসরকারি বিনিয়োগ আনার পরিকল্পনা উয়েফার তীব্র বিরোধিতার মুখে প্রত্যাহার করতে হয়েছিল তাকে।
২০২২ কাতার বিশ্বকাপের আগে বিতর্কিত বক্তব্য দিয়েও সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন ইনফান্তিনো। তবে সেসব সংকট তিনি সামাল দিতে সক্ষম হয়েছিলেন। এবার পরিস্থিতি ভিন্ন।
সমালোচকদের অভিযোগ, পরিকল্পনাটি নিয়ে কোনো ঐকমত্য গড়ে তোলার চেষ্টা করেননি ইনফান্তিনো। এমনকি মঙ্গলবার সংবাদমাধ্যমে তথ্য ফাঁস হওয়ার আগ পর্যন্ত অনেক গুরুত্বপূর্ণ অংশীজনও এ বিষয়ে কিছুই জানতেন না।
এ সময় তিনি সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে বৈঠক করেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরিবারের সঙ্গে সম্পর্কিত থ্রাইভ ক্যাপিটাল-কে সম্ভাব্য বিনিয়োগকারী গোষ্ঠীর নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য বেছে নেন।
এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন (এএফসি) এই প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য বলে আখ্যা দিয়ে ফিফায় প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের দাবি জানিয়েছে।
ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্কও আলোচনায়
ইনফান্তিনোর সঙ্গে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। গত ডিসেম্বরে ফিফার শান্তি পুরস্কার ট্রাম্পকে দেওয়া নিয়েও প্রশ্ন উঠেছিল।
ফিফার সাবেক সহসভাপতি জিম বয়েস বিবিসিকে বলেছেন, ‘খ্যাতি সম্ভবত ইনফান্তিনোর মাথায় চড়ে বসেছে। বিশ্বকাপ চলাকালে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল বিস্ময়কর।’
বিশ্বকাপ চলাকালে ট্রাম্প নিজেই দাবি করেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের খেলোয়াড় ফোলারিন বালোগুনের লাল কার্ডের নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার অনুরোধ তিনি ইনফান্তিনোকে করেছিলেন। পরে ফিফার স্বাধীন শৃঙ্খলা কমিটি বালোগুনকে খেলার অনুমতি দিলে ফুটবলে ট্রাম্পের প্রভাব নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়।
ক্রীড়া বিষয়ক মার্কেটিং বিশ্লেষক বব ডরফম্যান বলেছেন, ‘এর সঙ্গে কুশনার পরিবারের সম্পৃক্ততা পুরো বিষয়টিকে আরও বিতর্কিত করে তুলেছে।’
তবে শুক্রবার ট্রাম্প দাবি করেছেন, বিশ্বকাপের শেয়ার বিক্রির প্রস্তাব নিয়ে তার সঙ্গে ইনফান্তিনোর কোনো আলোচনা হয়নি।
তবুও শেষ হয়ে যায়নি ইনফান্তিনোর সম্ভাবনা
বিশ্লেষকদের মতে, এই বিতর্কের পর ফিফা সভাপতি নির্বাচনে ইনফান্তিনোর বিপক্ষে শক্তিশালী প্রার্থী আসার সম্ভাবনা অনেক বেড়েছে। তবে এখনই তাকে পুরোপুরি বাতিল করে দেওয়ার সময় আসেনি।
কারণ, ফিফার ২১১টি সদস্য ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনই ভোট দেবে, আর তাদের অনেকেই ফিফার আর্থিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। ইনফান্তিনোর নেতৃত্বে এসব সদস্য সংস্থা উল্লেখযোগ্য অর্থায়ন পেয়েছে।
পুনর্নির্বাচিত হতে হলে প্রথম দফায় দুই-তৃতীয়াংশ ভোট অথবা পরবর্তী দফায় সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রয়োজন হবে।
ডরফম্যানের মতে, ইনফান্তিনো যদি নিজের ভুল স্বীকার করে ক্ষমাপ্রার্থনার পথ বেছে নেন। তাহলে পরিস্থিতি বদলাতেও পারে!









