বিশ্ব ফুটবলে নতুন এক সংকটের সূচনা হয়েছিল ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফার প্রেসিডেন্ট জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর একটি প্রস্তাবকে ঘিরে। বিশ্বকাপ ও অন্যান্য বড় টুর্নামেন্টের বাণিজ্যিক স্বত্বের একটি অংশ বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রির পরিকল্পনা প্রকাশের পর বিশ্ব ফুটবলের শক্তিশালী সংগঠনগুলোর সঙ্গে ফিফার সরাসরি বিরোধ তৈরি হয়। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে ইউরোপের ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফা ভবিষ্যতে ফিফার সব টুর্নামেন্ট, এমনকি বিশ্বকাপও বয়কটের হুমকি দেয়।
তীব্র সমালোচনা, ইউরোপীয় ফুটবলের বয়কটের হুমকি এবং ফিফার অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহের মুখে শেষ পর্যন্ত সেই বিতর্কিত পরিকল্পনা বাতিল করেছে ফিফা। শুক্রবার এক জরুরি বিবৃতিতে ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো ঘোষণা দেন, এই ব্যবসায়িক প্রস্তাব ফুটবল অঙ্গনে তীব্র বিভাজন তৈরি করেছে, যা খেলাটির মূল স্বার্থের পরিপন্থি। তাই প্রস্তাবটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে।
ফুটবল ইতিহাসে এটি বিরল ঘটনা। কারণ ১৯০৪ সালে ফিফা প্রতিষ্ঠার পর থেকে বিশ্ব ফুটবলের প্রশাসনিক নেতৃত্ব নিয়ে এত বড় ধরনের প্রকাশ্য বিরোধ খুব কমই দেখা গেছে। প্রশ্ন উঠেছিল, কী এমন পরিকল্পনা করেছিলেন ইনফান্তিনো? কেন সেটিকে ‘বিশ্বকাপ বিক্রি’ বলে সমালোচনা করা হয়েছিল? কেন ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা ও এশিয়ার ফুটবল সংস্থাগুলো একে একে এর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল? আর শেষ পর্যন্ত কেন পরিকল্পনা প্রত্যাহার করতে হলো?
কী প্রস্তাব দিয়েছিলেন ইনফান্তিনো?
ফিফা ১৯৩০ সাল থেকে প্রতি চার বছর পরপর বিশ্বকাপ আয়োজন করে আসছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ছাড়া এই ধারাবাহিকতা কখনও ভাঙেনি। প্রথম বিশ্বকাপে অংশ নিয়েছিল ১৩টি দল। ২০২৬ সালের বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো অংশ নেবে রেকর্ড ৪৮টি দল। ২০৩০ সালে দলসংখ্যা আরও বাড়িয়ে ৬৪ করার প্রস্তাবও আলোচনায় রয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে ইনফান্তিনো প্রস্তাব দেন, বিশ্বকাপ, ক্লাব বিশ্বকাপসহ ফিফার গুরুত্বপূর্ণ টুর্নামেন্টগুলোর বাণিজ্যিক মালিকানার একটি সংখ্যালঘু অংশ (মাইনরিটি স্টেক) বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রি করা হবে। এ জন্য একটি বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান গঠন করা হবে, যা বিশ্বের বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক ও বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করবে।
ধারণা করা হচ্ছিল, যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান থ্রাইভ ক্যাপিটালের প্রতিষ্ঠাতা জশুয়া কুশনারের নেতৃত্বে ‘থ্রাইভ এটার্নাল’ নামে একটি তহবিল এই বিনিয়োগে আগ্রহী। ফিফা তাদের ২১১ সদস্য ফেডারেশনকে এ বিষয়ে মতামত জানাতে বলেছিল। এখানে বলে রাখা ভালো, জশুয়া কুশনার হলেন মার্কিন প্রেসিডেন্টে ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের ভাই।
‘বিশ্বকাপ বিক্রি’ বলতে কী বোঝানো হয়েছিল?
সমালোচকদের ভাষায়, এটি পুরো বিশ্বকাপ বিক্রি নয়; বরং বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক অধিকার ও ভবিষ্যৎ আয় থেকে যে লাভ হবে, তার একটি অংশ বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের হাতে তুলে দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল। অর্থাৎ বিশ্বকাপ আয়োজনের দায়িত্ব ফিফার কাছেই থাকত, কিন্তু টুর্নামেন্টের ভবিষ্যৎ রাজস্বের একটি অংশে বিনিয়োগকারীদের আর্থিক স্বার্থ তৈরি হতো।
এ কারণেই বিরোধীরা বলেছিলেন, এটি শুধু অর্থ সংগ্রহের উদ্যোগ নয়; বরং বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদকে বিনিয়োগ পণ্যে পরিণত করার চেষ্টা।
কেন এত বিতর্ক?
ফিফার এই পরিকল্পনা প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের ফুটবল প্রশাসকরা ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তাদের অভিযোগ ছিল, এত বড় একটি সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে কোনো স্বচ্ছ আলোচনা হয়নি। সদস্য দেশগুলোর সঙ্গে যথাযথ পরামর্শ করা হয়নি। এমনকি ফিফার নিজস্ব প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যেও প্রয়োজনীয় আলোচনা হয়নি।
সবচেয়ে বড় আপত্তি ছিল, বিশ্বকাপকে কখনও বাণিজ্যিক সম্পদ হিসেবে দেখার সুযোগ দেওয়া উচিত নয়। সমালোচকদের মতে, বিশ্বকাপ শুধু একটি টুর্নামেন্ট নয়; এটি এক শতাব্দীর বেশি সময় ধরে গড়ে ওঠা ফুটবলের ঐতিহ্য, যেখানে কোটি কোটি সমর্থকের আবেগ জড়িয়ে আছে।
সবচেয়ে কঠোর অবস্থানে উয়েফা
সবচেয়ে কঠোর অবস্থান নেয় ইউরোপিয়ান ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (উয়েফা)। ৫৫ সদস্যবিশিষ্ট এই সংস্থা জানিয়ে দেয়, ফিফা যদি বেসরকারি বিনিয়োগের পরিকল্পনা প্রত্যাহার না করে, তাহলে তারা ভবিষ্যতের ফিফা টুর্নামেন্ট— প্রয়োজনে বিশ্বকাপও— বয়কট করবে।
উয়েফার ভাষায়, বিশ্বকাপ কোনও বিনিয়োগ পণ্য হতে পারে না। এটি ফুটবলের সবচেয়ে বড় ঐতিহ্যগুলোর একটি এবং এর কোনও অংশই কখনও বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের হাতে তুলে দেওয়া উচিত নয়।
কনকাকাফ ও এএফসিও বিরোধিতায়
উয়েফার পর উত্তর, মধ্য আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের ফুটবল সংস্থা কনকাকাফও প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে। তারা অভিযোগ করে, এত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে যথাযথ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি এবং সদস্যদের মতামত দেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত সময়ও দেওয়া হয়নি।
এরপর এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনও (এএফসি) প্রকাশ্যে ফিফার পরিকল্পনার বিরোধিতা করে এবং উয়েফা ও কনকাকাফের উদ্বেগের প্রতি সমর্থন জানায়। এএফসির মতে, এই পরিকল্পনা ফিফার সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ার মৌলিক দুর্বলতাগুলো সামনে এনে দিয়েছে।
কীভাবে কোণঠাসা হলেন ইনফান্তিনো?
ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো সদস্য দেশগুলোকে এই প্রস্তাবের পক্ষে আনতে ৪০ মিলিয়ন ডলারের অনুদানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু উয়েফা, কনকাকাফ ও এএফসি একসঙ্গে প্রস্তাবের বিরোধিতা করায় পরিস্থিতি দ্রুত পাল্টে যায়।
ফিফার সংবিধান অনুযায়ী, প্রস্তাব পাসে প্রয়োজন ছিল ১০৬ ভোট। কিন্তু এই তিন কনফেডারেশনের সম্মিলিত অবস্থানের ফলে ১৩৬টি ভোট কার্যত ইনফান্তিনোর বিপক্ষে চলে যায়। এতে প্রস্তাবটি পাস হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় শেষ হয়ে যায়।
ফিফার ভেতর থেকেও বাড়ে চাপ
সংকট শুধু বাইরেই সীমাবদ্ধ ছিল না। ফিফার প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা (সিওও) কেভিন লামুর স্বীকার করেন, এই প্রকল্প নিয়ে ফিফার নিজস্ব প্রশাসনকেও বিভ্রান্ত ও অন্ধকারে রাখা হয়েছিল।
এরই মধ্যে পদত্যাগ করেন ফিফা সভাপতির বিশ্ব কৌশল ও শাসনবিষয়ক জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা কার্লোস কর্ডেইরো। পদত্যাগপত্রে তিনি লেখেন, এই প্রস্তাব ফুটবলের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর এবং এটি ফুটবলের ভবিষ্যৎকে বন্ধক রাখার সামিল।
শেষ পর্যন্ত কেন পরিকল্পনা বাতিল?
উয়েফার বয়কটের হুমকি, কনকাকাফ ও এএফসির প্রকাশ্য বিরোধিতা এবং ফিফার ভেতরের অসন্তোষ— সব মিলিয়ে ইনফান্তিনো ক্রমেই চাপে পড়ে যান। শেষ পর্যন্ত শুক্রবার জরুরি বিবৃতিতে তিনি ঘোষণা দেন, প্রস্তাবটি ফুটবল অঙ্গনে বিভাজন তৈরি করেছে এবং খেলাটির স্বার্থের পরিপন্থি হওয়ায় তা প্রত্যাহার করা হচ্ছে।
তিনি এখন বলছেন, ফুটবল সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে আবার এক টেবিলে বসিয়ে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান খোঁজা হবে।
ইনফান্তিনোর ভবিষ্যৎ কী?
আগামী ২০২৭ সালের মার্চে ফিফা কংগ্রেসে জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর চতুর্থ মেয়াদে সভাপতি পদে নির্বাচনে লড়ার কথা। তবে ইউরোপ, উত্তর ও মধ্য আমেরিকা এবং এশিয়ার নজিরবিহীন ঐক্যবদ্ধ অবস্থানের পর তার রাজনৈতিক অবস্থান বড় ধরনের চাপে পড়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনায় শুধু একটি ব্যবসায়িক পরিকল্পনারই পরিসমাপ্তি ঘটেনি; বরং বিশ্ব ফুটবলের প্রশাসনিক নেতৃত্বে ইনফান্তিনোর কর্তৃত্বও বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে।
কেন এই সংকট এত গুরুত্বপূর্ণ?
বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে শক্তিশালী তিন কনফেডারেশন— উয়েফা, কনকাকাফ ও এএফসি— একসঙ্গে ফিফার একটি প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছে। তাদের সম্মিলিত অবস্থান শুধু একটি বিতর্কিত পরিকল্পনাই থামিয়ে দেয়নি, বরং দেখিয়ে দিয়েছে যে বিশ্ব ফুটবলের বড় সিদ্ধান্তে সদস্য কনফেডারেশনগুলোর ঐকমত্য ছাড়া এগোনো কতটা কঠিন।

বিশ্বকাপ স্বত্ব বিক্রি প্রকল্প বাতিল করলো ফিফা 







