২১ বছর ধরে আর্জেন্টিনার ১০ নম্বর জার্সি ছিল তার। কাঁধে ছিল কোটি মানুষের প্রত্যাশা, আর পায়ে ছিল দেশের স্বপ্ন। লিওনেল মেসি সেই অধ্যায় শেষ করেছেন। এবার তার শূন্যতা পূরণের কঠিন পরীক্ষার সামনে তিনবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা।
মেসির আন্তর্জাতিক অবসরের পর শুধু একজন কিংবদন্তিকে হারানোর ধাক্কাই নয়, আরও কিছু প্রশ্ন সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। কোচ লিওনেল স্ক্যালোনি থাকবেন তো? বয়স্ক তারকাদের আর কতজন চালিয়ে যাবেন? ২০৩০ বিশ্বকাপের আগে নতুন প্রজন্মকে কতটা প্রস্তুত করতে পারবে আর্জেন্টিনা?
গত সোমবার বিখ্যাত ১০ নম্বর জার্সি ছেড়ে দিয়েছেন ৩৯ বছর বয়সী মেসি। ২১ বছর ধরে যে জার্সি গায়ে আর্জেন্টিনার প্রত্যাশার ভার বহন করেছেন, সেটি এখন নতুন কারও অপেক্ষায়।
শুরুর সময়টা মেসির জন্য সহজ ছিল না। বারবার ব্যর্থতা, ফাইনালে হার আর সমালোচনার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে তাকে। তবে ক্যারিয়ারের শেষ দিকে এসে সেই হতাশার গল্প বদলে দেন তিনি। ২০২১ কোপা আমেরিকা, ২০২২ বিশ্বকাপসহ তিনটি বড় শিরোপা জিতিয়ে আর্জেন্টিনাকে এনে দেন সোনালি যুগের স্বাদ। কিন্তু সেই দলের অনেকেই এখন বয়সের ভারে ন্যুব্জ।
জুলাইয়ে স্পেনের কাছে বিশ্বকাপ ফাইনালে ১-০ গোলে পরাজয়ের ম্যাচে স্ক্যালোনির দলের হয়ে মাঠে নামা ১৭ জনের মধ্যে ২০৩০ বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার সময় ৩০ বছরের নিচে থাকবেন মাত্র দুজন।
অভিজ্ঞ সেন্টারব্যাক নিকোলাস ওতামেন্দি ইতোমধ্যেই আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানিয়েছেন। ৩৮ বছর বয়সী এই ডিফেন্ডার স্পেনের কাছে ফাইনালে হারের পরই অবসরের সিদ্ধান্ত নেন। ওই ম্যাচে তরুণ ও প্রাণবন্ত স্পেনের কাছে কার্যত অসহায় হয়ে পড়েছিল আর্জেন্টিনা।
গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্তিনেজও অবসরের ইঙ্গিত দিয়েছেন। ৩২ বছর বয়সী মিডফিল্ডার লিয়ান্দ্রো পেরেদেসের ভবিষ্যৎ নিয়েও তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। ফাইনালের পর স্পেনের খেলোয়াড়দের আক্রমণ করায় ফিফা তাকে ১০ ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে।
মেসির অনুপস্থিতির প্রভাব কতটা বড় হবে, সেটিও বুঝতে পারছেন পেরেদেস। আর্জেন্টাইন টেলিভিশন চ্যানেল টিএনকে তিনি বলেছেন, ‘সে (মেসি) না থাকলে আগের মতো সবকিছু চালিয়ে যাওয়া কঠিন হবে।’
রদ্রিগো ডি পলের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারও মেসির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। ফলে তার ভবিষ্যৎ নিয়েও তৈরি হয়েছে প্রশ্ন। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন স্ক্যালোনিকে নিয়ে। ২০১৮ সালে দায়িত্ব নেওয়ার পর স্ক্যালোনির অধীনে আর্জেন্টিনা পেয়েছে তাদের অন্যতম সফল সময়। ২০২১ কোপা আমেরিকা জয়ের মাধ্যমে ২৮ বছরের বড় শিরোপা খরা কাটিয়েছিল দলটি। এরপর আসে বিশ্বকাপ জয়ও। কিন্তু স্ক্যালোনির বর্তমান চুক্তির মেয়াদ শেষ হচ্ছে ডিসেম্বরে। বিশ্বকাপের আগে ২০৩০ সাল পর্যন্ত চুক্তি বাড়ানোর বিষয়ে সম্মতি হয়েছিল বলে খবর থাকলেও ফাইনালের হতাশাজনক পারফরম্যান্সের পর নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন তিনি।
একবার বলেছিলেন, ‘আমি কী করতে চাই, সে বিষয়ে আমার একটা ধারণা আছে। আমি চুক্তির প্রতি সম্মান দেখাবো, এরপর দেখা যাবে। আমাকে ভাবতে হবে। কারণ জানি না, এত বড় কিছু আবার অর্জন করা সম্ভব কি না।’
তবু আশার জায়গা আছে
মেসি নেই, ওতামেন্দিও নেই—তারপরও আর্জেন্টিনার স্কোয়াডে শিরোপার দাবিদার হওয়ার মতো যথেষ্ট প্রতিভা রয়েছে।
রক্ষণে লিসান্দ্রো মার্তিনেজ ও ক্রিস্তিয়ান রোমেরো নিজেদের প্রথম পছন্দের সেন্টারব্যাক জুটি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। মাঝমাঠে এনজো ফার্নান্দেজ ও অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারও নিজেদের জায়গা পাকা করে ফেলেছেন। মেসির বিদায় আক্রমণভাগে নতুন তারকাদের আরও বড় ভূমিকা নেওয়ার সুযোগ তৈরি করতে পারে। ইন্টার মিলানের লাওতারো মার্তিনেজ ও অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদের হুলিয়ান আলভারেজ এখন সামনে থেকে নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ পাবেন।
বিশেষ করে আলভারেজের কাছ থেকে আরও বেশি প্রত্যাশা থাকবে। জাতীয় দলের হয়ে ৫৯ ম্যাচে ১৫ গোল—তার প্রতিভার তুলনায় সংখ্যাটি এখনও খুব বেশি নয়।
তরুণদের মধ্যে ইতোমধ্যে নজর কেড়েছেন কোমোর প্রতিভাবান ফুটবলার নিকো পাজ। বিশ্বকাপে দুই ম্যাচ খেলা এই তরুণ সামনে নিয়মিত একাদশের দাবিদার হতে পারেন।
২৩ বছর বয়সী জুলিয়ানো সিমিওনেও আলো ছড়িয়েছেন। আর্জেন্টিনার সাবেক তারকা ডিয়েগো সিমিওনের ছেলে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেমিফাইনাল জয়ে বদলি হিসেবে নেমে নজর কাড়েন।
রিয়াল মাদ্রিদের উইঙ্গার ফ্রাঙ্কো মাস্তানতুওনো বিশ্বকাপের দলে ছিলেন না। তবে ১৯ বছর বয়সেই জাতীয় দলের হয়ে চার ম্যাচ খেলে ফেলেছেন তিনি।
এছাড়া গত বছর চিলিতে অনুষ্ঠিত অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার নতুন প্রজন্মও নিজেদের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছে। ফলে এখন সেই শূন্যতা পূরণের দায়িত্ব নতুন প্রজন্মের। বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের সামনে তাই শুরু হচ্ছে নতুন অধ্যায় মেসি পরবর্তী আর্জেন্টিনা!









