মেসির পর রোনালদো, শেষ হলো ফুটবলের এক মহাকাব্যিক অধ্যায়

স্পোর্টস ডেস্ক
০৫ নভেম্বর ২০২৬, ১৯:০৩ আপডেট : ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ১৯:০৩

ফুটবল থেকে দুজনের বিদায় একসঙ্গে হলো না। তবে কাছাকাছি সময়ে একই গল্পের শেষ পাতায় এসে দাঁড়ালেন লিওনেল মেসি ও ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। একজন আর্জেন্টিনার আকাশে বিশ্বকাপের আলো ছড়িয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানিয়েছেন। অন্যজন পর্তুগালের লাল-সবুজ জার্সিতে দীর্ঘ ২৩ বছরের পথচলার ইতি টানার ঘোষণা দিয়েছেন। সময়ের ব্যবধানে শেষ হতে চলেছে ফুটবলের এক মহাকাব্যিক অধ্যায়ের।

বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছেন রোনালদো। ৪১ বছর বয়সী এই মহাতারকা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া আবেগঘন বার্তায় জানিয়েছেন, পর্তুগালের সাত নম্বর জার্সি অন্য কারও হাতে তুলে দেওয়ার সময় এসেছে। ২০০৩ সালের আগস্টে যে যাত্রার শুরু, ২৩ বছর পর তার সমাপ্তির ঘোষণা দিলেন তিনি।

একটি জার্সি, একটি দেশ, কোটি মানুষের আবেগ মিলে রোনালদোর কাছে পর্তুগাল শুধু একটি জাতীয় দল ছিল না; ছিল নিজের পরিচয়, গর্ব আর ভালোবাসার জায়গা। এই দীর্ঘ সময়ে কত জয়, কত গোল, কত রেকর্ড, কত আনন্দ-বেদনার মুহূর্ত। এসবকিছুর সাক্ষী হয়ে থেকেছে পর্তুগালের সাত নম্বর জার্সি।

রোনালদোর বিদায় মানে শুধু একজন ফুটবলারের বিদায় নয়, একটি প্রজন্মের স্মৃতিরও বিদায়। যে প্রজন্ম তাকে দেখেছে গোল করতে, অসম্ভবকে সম্ভব করতে, শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যেতে। কখনও তার গতি, কখনও দুর্দান্ত হেড, কখনও অবিশ্বাস্য ফ্রি-কিক। সব মিলিয়ে তিনি হয়ে উঠেছিলেন ফুটবলের এক অনন্য চরিত্র।

পর্তুগালের হয়ে রোনালদোর অর্জনের তালিকাও অসাধারণ। ২৩৪টি আন্তর্জাতিক ম্যাচে করেছেন ১৪৬ গোল। পুরুষদের আন্তর্জাতিক ফুটবলে সর্বোচ্চ ম্যাচ খেলা এবং সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড- দুটিই তার দখলে। ২০১৬ সালে পর্তুগালকে প্রথমবারের মতো ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ জেতানোর পেছনে ছিল তার নেতৃত্ব ও অনুপ্রেরণা। পরে জিতেছেন উয়েফা নেশনস লিগের শিরোপাও।

অথচ রোনালদোর পথচলা মোটেও সহজ ছিল না। ক্যারিয়ারের বিভিন্ন সময়ে সমালোচনা শুনতে হয়েছে তাকে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উঠেছে ফিটনেস নিয়ে প্রশ্ন, জায়গা হারানোর আলোচনা। তবু প্রতিবারই নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছেন। গোল করেছেন, রেকর্ড গড়েছেন, দলকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তার কাছে হার মানে শেষ নয়, বরং নতুন করে ফিরে আসার প্রেরণা।

রোনালদোর বিদায়ের খবরটি এসেছে মেসির আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানানোর পর। গত ৩১ আগস্ট আর্জেন্টিনার অধিনায়ক মেসি জাতীয় দল থেকে অবসরের ঘোষণা দেন। ফলে ফুটবল বিশ্বের দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী মহাতারকার আন্তর্জাতিক অধ্যায় একই বছরে এসে শেষ হওয়ার পথে।

একসময় তাদের তুলনা ছাড়া ফুটবল আলোচনা যেন পূর্ণতা পেত না। কে সেরা, কার গোল বেশি, কার ট্রফি বেশি- এমন অসংখ্য বিতর্কে বিভক্ত ছিল ফুটবলবিশ্ব। কিন্তু সময়ের সঙ্গে স্পষ্ট হয়েছে, একজনকে অন্যজনের সঙ্গে তুলনা করে ছোট করার সুযোগ নেই। দুজনই নিজেদের মতো করে ফুটবলকে সমৃদ্ধ করেছেন। একজন আর্জেন্টিনার হয়ে বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন পূরণ করেছেন, অন্যজন পর্তুগালকে এনে দিয়েছেন ইউরোপিয়ান শ্রেষ্ঠত্বের স্বাদ।

মেসি-রোনালদোর প্রতিদ্বন্দ্বিতা ফুটবলকে দিয়েছে অন্য রকম এক সৌন্দর্য। তাদের লড়াই দেখতে দেখতে বড় হয়েছে একটি প্রজন্ম। কখনও বার্সেলোনার জার্সিতে মেসি, কখনও রিয়াল মাদ্রিদের সাদা জার্সিতে রোনালদো-এল ক্লাসিকোর সেই দিনগুলো এখন শুধুই স্মৃতি। ব্যক্তিগত শ্রেষ্ঠত্বের লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি লাভবান হয়েছে ফুটবল।

রোনালদো তার বিদায়ী বার্তায় শুধু গোল, রেকর্ড কিংবা ট্রফির কথা বলেননি। গুরুত্ব দিয়েছেন মানুষ ও সমর্থকদের। বিশেষ করে বিদেশে থাকা পর্তুগিজ সমর্থকদের কথা বলেছেন, যারা তার খেলা দেখতে গিয়ে নিজেদের দেশের কাছাকাছি থাকার অনুভূতি পেতেন। তার ভাষায়, পর্তুগালের হয়ে এই যাত্রা তার জীবন বদলে দিয়েছে।

তবে মেসি ও রোনালদোর বিদায়ের গল্প এক রকম নয়। মেসির আন্তর্জাতিক অধ্যায় পূর্ণতা পেয়েছে বিশ্বকাপ জয়ের মধ্য দিয়ে। আর্জেন্টিনার হয়ে দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে বিশ্বসেরার মুকুট মাথায় নিয়েই বিদায়ের পথে তিনি। অন্যদিকে রোনালদোর বিদায়টা ততটা মসৃণ হলো না। পর্তুগালের কোচের সঙ্গে দ্বন্দ্ব, দলে নিজের ভূমিকা নিয়ে অসন্তোষ এবং নেশনস লিগের ম্যাচ ঘিরে তৈরি হওয়া পরিস্থিতির ছায়া পড়েছে তার শেষ অধ্যায়ে। ফলে দীর্ঘদিনের সতীর্থদের সঙ্গে মাঠে দাঁড়িয়ে বিদায় জানানোর চেয়ে তার বিদায়ী ঘোষণায় আবেগের পাশাপাশি তিক্ততার সুরও রয়েছে।

এখন থেকে আন্তর্জাতিক ফুটবলে আর দেখা যাবে না রোনালদোর সেই চেনা উদযাপন। গোলের পর দুই হাত ছড়িয়ে দেওয়া, বাতাসে লাফিয়ে ঘুরে দাঁড়ানো কিংবা গ্যালারির দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে ওঠা- এসব দৃশ্য হয়তো আর পর্তুগালের জার্সিতে দেখা যাবে না।

তবে বিদায় বললেই কি সব শেষ হয়ে যায়? কিছু মানুষ সময়ের সীমানা পেরিয়ে স্মৃতিতে বেঁচে থাকেন। রোনালদোও তেমনই একজন। তার গোল, অর্জন, পরিশ্রম আর জেতার অদম্য মানসিকতা ফুটবল ইতিহাসে থেকে যাবে।

মেসি ও রোনালদোর আন্তর্জাতিক বিদায়ের মধ্য দিয়ে ফুটবল হারাল এক অবিস্মরণীয় যুগের দুই মহানায়ককে। নতুন প্রজন্ম আসবে, নতুন তারকারা আলো ছড়াবেন। কিন্তু তাদের দুজনের জন্য ফুটবলপ্রেমীদের হৃদয়ে যে জায়গা তৈরি হয়েছে, তা পূরণ করা সহজ হবে না।

 

/টিএ/এফআইআর/
সম্পর্কিত
রোনালদোকে যথাযথ স্বীকৃতি দিতে চায় পর্তুগাল
৫ মিনিটের ভিডিওতে রোনালদো যা বললেন 
অবসরের ঘোষণা দিলেন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো
সর্বশেষ খবর
তাহসিফের মৃত্যু: তৃতীয় দফায় রিমান্ডে দীপ
তাহসিফের মৃত্যু: তৃতীয় দফায় রিমান্ডে দীপ
‘পরবর্তী ওবামা’ কে এই জন অসফ?
‘পরবর্তী ওবামা’ কে এই জন অসফ?
‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ পালনের আহ্বান জামায়াত আমিরের
‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ পালনের আহ্বান জামায়াত আমিরের
প্রত্যেকটা প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে চাই: প্রধানমন্ত্রী
প্রত্যেকটা প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে চাই: প্রধানমন্ত্রী
সর্বাধিক পঠিত
‘বড় দায়িত্ব থেকে মুক্ত হলাম’, রাকসু ছেড়ে কোথায় যাচ্ছেন আম্মার
‘বড় দায়িত্ব থেকে মুক্ত হলাম’, রাকসু ছেড়ে কোথায় যাচ্ছেন আম্মার
বাংলাদেশের এমপির বড় ভাই জিতলেন যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে, এলাকায় আনন্দ
বাংলাদেশের এমপির বড় ভাই জিতলেন যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে, এলাকায় আনন্দ
‘ভিআইপি’ সেবায় সন্ত্রাসীর আস্তানায় গিয়ে ৭৪ জমির দলিল রেজিস্ট্রি করলেন সাব-রেজিস্ট্রার
‘ভিআইপি’ সেবায় সন্ত্রাসীর আস্তানায় গিয়ে ৭৪ জমির দলিল রেজিস্ট্রি করলেন সাব-রেজিস্ট্রার
ভারতীয় ভিসা আবেদনে নতুন নির্দেশনা
ভারতীয় ভিসা আবেদনে নতুন নির্দেশনা
ইরানকে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সরবরাহের অভিযোগে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা
ইরানকে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সরবরাহের অভিযোগে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা