আরেক প্রস্থ মাশরাফি-বীরত্ব

Send
বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট
প্রকাশিত : ২০:১৭, জানুয়ারি ১৩, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ০৯:৩১, জানুয়ারি ১৪, ২০২০

মাশরাফির সাহসের সামনে নতজানু গেইলসেই ২০০১ সালে তার টেস্ট অভিষেকের লগ্ন থেকেই ধারাটি চলছে। মাশরাফি মুর্তজা নামের এক বীর ক্রিকেটারের বীররসে জারিত হচ্ছে এ দেশের ক্রিকেট। দীর্ঘ ১৯ বছরের অভিযাত্রায় চোট বারবার থাবা বসিয়েছে শরীরে। হুমকির মুখে পড়েছে তার ক্রিকেট ক্যারিয়ার। খাদের কিনারায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু ফিরে এসেছেন, ঘুরে দাঁড়িয়েছেন বীরের মতো। ক্রিকেটে প্রতিপক্ষের সঙ্গে লড়েছেন। কিন্তু নীরবে, অদৃশ্য আততায়ীর মতো মূর্তিমান প্রতিপক্ষ তো ছিল ওই চোটও।

তবে চোট মাশরাফির চোখে চোখ রাঙিয়ে তাকাতে পারে, তাকে দমিয়ে রাখতে পারে না। এই যেমন আজ সোমবার মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে বঙ্গবন্ধু বিপিএলের ‘এলিমিনেটর’ ম্যাচে দেখা গেল। মাত্রই ৪৮ ঘণ্টা আগে ফিল্ডিং করতে গিয়ে হাতে চোট পেয়েছিলেন। সেটি এমনই গুরুতর যে হাসপাতালে গিয়ে ১৪টি সেলাই দিতে হয়েছে। এ অবস্থায় কে ভাবতে পেরেছিল মাশরাফিকে পরের ম্যাচেই দেখা যাবে? সেই রাতেই যদিও বলেছিলেন, খেলবেন ; তারপরও মাঠে না নামা পর্যন্ত মন থেকে কেউ বিশ্বাস করতে চায়নি। না, চোখের বিভ্রম সরিয়ে সবাইকে বিশ্বাস করতে হলো। ঢাকা প্লাটুনের অধিনায়কই প্রতিপক্ষকে নিয়ে টস করতে নামলেন। চোটটা ‘বোলিং হ্যান্ডে’ নয়, বাঁ হাতে। কিন্তু একটা হাতে ওরকম ক্ষত নিয়েও বোলিং করা কি কম ঝুঁকির ছিল? বোলিং করেছেন, ৪ ওভারে ৩৩ রান, যথেষ্টই খরুচে। কিন্তু ওটা তো আসলে একটি চোখের বিচার, অন্যচোখ দেখেছে সাহস আর লড়াই। আর পাকিস্তানি লেগ স্পিনার শাদাব খানের বোলিংয়ে ক্রিস গেইলের যে ক্যাচটি নিলেন ডান হাতে, সেটিকে কী বলবেন? মুখে কিছু বলা লাগে না। যা বলার গ্যালারির সশ্রদ্ধ অভিবাদন আর বিমুগ্ধ করতালিই সব বলে দেয়। এর আগে বিপর্যয় থেকে দলকে টেনে তুলতে ব্যাটিংয়ে শাদাব খানকে ক্রিজে সঙ্গ দেওয়াটাও কম ছিল না।

এই সাহস ও লড়াইয়ের প্রশংসা আপনি মাশরাফির কাছে করতে যাবেন না। এতে তার আগ্রহ দেখবেন না। সংবাদ সম্মেলনেই তিনি প্রকাশিত আদি-অকৃত্রিম মাশরাফিরূপে, ‘ক্যাচটা আমার হাতের কাছেই এসে গিয়েছিল। আর ওটা এক হাত দিয়েই নিতে হতো। সেটা আমি পেরেছি এই আরকি! তবে বলটা খুব জোরে এলে কী হতো জানি না।’

মাশরাফি যা খুব সহজ দেখেন মাহমুদউল্লাহ তা দেখেন না। তার দীর্ঘ সময়ের অধিনায়কের এই কাণ্ড, এই যে অকুতোভয়ে মাঠে নেমে পড়া, চট্টগ্রাম চ্যালেঞ্জার্স অধিনায়ক বিস্মিত, ‘সত্যিই এক হাতে ১৪টি সেলাই নিয়ে মাশরাফি ভাইয়ের মাঠে নেমে পড়া দেখে আমি অবাক। আমি হলে এটা পারতাম না। শুধু তো মাঠে নেমে পড়াই নয়, তিনি ব্যাট করেছেন, বোলিং করেছেন এবং দুর্দান্ত একটি ক্যাচ নিয়েছেন।’

মাশরাফি যখন মাঠে খেলছেন, ক্যামেরা বারকয়েক প্যান করে গেল গ্যালারিতে। যেখানে মাশরাফির স্ত্রী-সন্তান ও ভাই উৎসাহ এবং কৌতূহলে তাকিয়ে তার দিকে। ঢাকার হারের পর নত দেখালো সেই মুখগুলো। এটাই স্বাভাবিক, একজন চ্যাম্পিয়ন ঘরের মধ্যেও যে বিজয়ের আবহ ছড়িয়ে দেন। যেখানে ক্রিকেট নামের খেলাটি জীবন-যুদ্ধেও জয়ের প্রতিশব্দ হয়ে ওঠে।

ম্যাচ শেষে আরেকটি দৃশ্যে চোখ আটকে যায় সবার। ক্রিস গেইল খুব আগ্রহ নিয়ে দেখছেন মাশরাফির ব্যান্ডেজ-বাধা হাত। পরে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের স্বঘোষিত এবং সত্যিকার অর্থেই ‘ইউনিভার্স বস’ বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে লড়াকু ক্রিকেটারকে বুকে জড়িয়ে ধরে হাসছেন। সেই হাসি সংক্রমিত হচ্ছে গ্যালারির মানব-অরণ্যে।

/পিকে/

লাইভ

টপ