হতাশা কাটিয়ে মন ভালো করে দিলো বুন্দেসলিগা

Send
পবিত্র কুন্ডু
প্রকাশিত : ০৩:০২, মে ১৭, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ০৩:৪১, মে ১৭, ২০২০

বুন্দেসলিগায় ডর্টমুন্ড-শালকে লড়াইমারণ ভাইরাসের আগ্রাসনে পৃথিবীর মন খারাপ। ঘরের মধ্যে মন কেমন। মাঠের মধ্যে মন কেমন। খোলা আকাশের মন কেমন। কিন্তু এর মধ্যেই ফুটবলের একটু মন ভালো হলো আজ। মন ভালো হলো ক্রীড়াঙ্গনের। মৃত্যু আর মৃত্যুভয়ের সঙ্গেই তো নিত্য বসবাস। আর কখনও খেলাধুলা প্রাণ ফিরে পাবে কি না এমন প্রশ্নচিহ্ন বড় যখন সামনে, ফুটবল নামলো জার্মানির মাঠে। দুই মাস পর। আর তাতে বরুসিয়া ডর্টমুন্ড ৪-০ গোলে শালকেকে উড়িয়ে দিয়ে আবারও শুরু করলো বুন্দেসলিগা জয়ের অভিযান।  

পর্তুগিজ উইঙ্গার রাফায়েল গেরেইরোর জোড়া গোলের সঙ্গে আরলিং হালান্ড ও থ্রোগান হ্যাজার্ডের একটি  করে গোলে ৬৩ মিনিটেই ডর্টমুন্ড ৪-০ করে ফেলে স্কোরলাইন। কেন যেন ডর্টমুন্ড আর বেশি গোল করতে চায়নি। অন্তর থেকে চাইলে সেটি হতেই পারতো। প্রিয় সিগন্যাল ইদুনাপার্কের নি:শব্দ কান্না তাদের বুকে বাজছিল? হবে হয়তো। তারা নিজেদের প্রিয় মাঠে জনারণ্যেই জয়ের উৎসব করতে অভ্যস্ত। করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে স্বাস্থ্যবিধির বেড়ি পরে দর্শকশূন্য মাঠে খেলা। এই জয়ের আনন্দ যে দর্শকের সঙ্গে ভাগাভাগি করার উপায় নেই!

ইউরোপের সেরা পাঁচ লিগের একটি। গড় দর্শক উপস্থিতির বিচারে বুন্দেসলিগা সবার ওপরে। এর মধ্যে আবার ডর্টমুন্ডের সিগন্যাল ইদুনা পার্কের বিশেষ খ্যাতি। এই স্টেডিয়াম যেকোনও ম্যাচেই ৮১ হাজারের বেশি দর্শক ধারণক্ষমতার ছুঁয়ে ফেলে প্রায় পুরোটাই। মাঝগ্যালারিতে চেয়ারছাড়া যে ফাঁকা জায়গা, ডর্টমুন্ডের হলুদ জার্সির রংয়ের সঙ্গে মিলিয়ে সেই জায়গাটার নাম হলুদ দেয়াল। ওখানে ২৫ হাজার সমর্থক পুরো ম্যাচ দেখে দাঁড়িয়ে। সারাক্ষণ কণ্ঠে থাকে গান। আজ সেই হলুদ দেয়াল শূন্য পড়ে। ক্লাবের ১১০ বছরের ইতিহাসে এই প্রথম। সাঞ্চো, রয়েস, গেরেইরো,হাকিমি বা হালের সেনসেশন হালান্ডরা কাদের দেখাবেন পায়ের কারুকাজ?

তবু তারা খেললেন মুগ্ধ করার মতোই। দীর্ঘ অবসরে শরীর আগের মতো চনমনে নয়। তারপরও ইউরোপীয় মান ক্ষুন্ন হয়নি। ২৯ মিনিটেই গোল করে নরওয়েজিয়ান তরুণ ফরোয়ার্ড হালান্ড বুঝিয়ে দিলেন কেন তাকে নিয়ে ইউরোপজুড়ে মাতামাতি। এই জানুয়ারিতেই আরবি সালজবুর্গ থেকে ডর্টুমন্ড এসে ভিড়েছেন, করোনাভাইরাসের কারণে ১৩ মার্চ ফুটবল বন্ধ হওয়ার আগে করেছিলেন ১২ গোল, খেলা ফের শুরু হওয়ার দিনেই খুলে ফেললেন গোলের খাতা। ৪৫ মিনিটে ব্যবধান দ্বিগুণ গেরেইরোর গোলে। বিরতির পরে তৃতীয় মিনিটেই ডর্টমুন্ড ৩-০ এগিয়ে, এবার হালান্ডের পাসে তৃতীয় গোল এডেন হ্যাজার্ডের ভাই থ্রোগান হ্যাজার্ডের পায়ে। ৬৩ মিনিটে গেরেইরোর দ্বিতীয় গোল ওই হালান্ডের ক্রস থেকেই।

জার্মানির উয়া অঞ্চলের সবচেয়ে উত্তাপ ছড়ানো লড়াই ‘রিভিয়েরা ডার্বি’। আশঙ্কা ছিল দর্শকের নি:শ্বাসবিহীন ডার্বিটা শেষ পর্যন্ত কি ‘ঘোস্ট ডার্বি’ হয়ে উঠবে? মানে ভুতুড়ে লড়াই! হলুদ-নীলের লড়াইটিকে ভুতুড়েই লেগেছে, তবে দর্শকের চেয়েও বেশি দায়ী এখানে শালকে। দলটি এমনই ম্যাড়মেড়ে খেলেছে যে ডার্বি নামটাই ছিল বেমানান।

৪-০ গোলের জয়ে ডর্টমুন্ড যেখানে লিগ শীর্ষে থাকা বায়ার্ন মিউনিখের  ১ পয়েন্টের  নাগালে চলে এসেছে, সেখানে শালকে ষষ্ঠস্থান থেকে ছিটকে পড়লো আটে। তাদের ইউরোপা লিগের টিকিট পাওয়াটাই  প্রশ্নের মুখে। ২৬ ম্যাচ শেষে ডর্টমুন্ডের পয়েন্ট ৫৪, এক ম্যাচ কম খেলা বায়ার্নের ৫৫। আর সমান সংখ্যক ম্যাচ থেকে শালকের পয়েন্ট ৩৭। একইদিনে ম্যাচ হয়েছে আরও পাঁচটি, তাতে হফেনহেইমকে ৩-০ গোলে হারিয়েছে  হার্থা বার্লিন, অগসবুর্গকে ২-১ গোলে ভলফসবুর্গ, ফ্রাঙ্কফুর্টকে ৩-১ গোলে মনশেনগ্লাডবাখ, লাইপজিগ-ফ্রেইবুর্গ ম্যাচ ড্র হয়েছে ১-১ এবং ডুসেলডর্ফ-পেডারবর্ন গোলশূন্য।

কঠিন স্বাস্থ্যবিধি মেনে খেলা, কখনও কখনও মনে হয়েছে ফুটবল তো নয় যেন কোনও ল্যাবরেটরির গবেষণা। মাঠে নামার আগে খেলোয়াড়দের মুখে মাস্ক। মাঠ থেকে উঠে যেতেই আবার মাস্ক। ডাগআউটে খেলোয়াড়-কোচিং স্টাফ সবার মুখেই তাই। খেলোয়াড়েরা বসে আছেন এক মিটার দূরে দূরে। গোল উদযাপন হাত উঁচিয়ে। কিংবা একজনের সঙ্গে আরেকজনের কনুই ঠেকিয়ে। মাঠের খেলাতেও আগের মতো গা ছোঁয়াছুঁয়ির প্রবণতা কম। রেফারির হুইসেল, বলের শব্দ, খেলোয়াড়দের কথা ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে অডিওতে। ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারির (ভিএআর) ব্যবহার আছে যথারীতি।

বেলারুশের কথা বাদ দিন, ফ্যারো আইল্যান্ডের ফুটবলও দূরে রাখুন। করোনার মধ্যেও এ দুটি ইউরোপীয় দেশে ফুটবল চলছে, তবে সে নিয়ে কেউ তেমন ভাবেনি। করোনাভীতি জয় করে ফুটবলের আসল পরীক্ষা শুরু হলো আজই। টেলিভিশনে বিশাল বিস্তার বলে গোটা ফুটবল পৃথিবীরই চোখ এই লিগের দিকে।

করোনার সঙ্গে মানবজাতির বসবাস যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়েই যায়, কে জানে বুন্দেসলিগাই হয়তো শিখিয়ে দিলো আগামী দিনের ফুটবল-ভাষা।

    

 

 

 

/পিকে/

লাইভ

টপ