স্বাধীনতার পর নতুন বাংলাদেশের সামনে শুধু রাষ্ট্র গঠনের চ্যালেঞ্জ ছিল না। ছিল নিজেদের ক্রীড়া সাংস্কৃতিক পরিচয় নতুন করে তুলে ধরার প্রয়োজনীয়তাও। তাই এমন একটি খেলাকে সামনে আনার প্রয়োজনীয়তা তৈরি হয় যার শিকড় এই দেশের মাটিতে। সেই জায়গায় হা-ডু-ডু ছিল একেবারেই মানানসই। যার পোশাকি নাম কাবাডি।
বাংলাদেশের সবচেয়ে সফল কাবাডি খেলোয়াড় আব্দুল জলিল, যিনি এশিয়ান গেমস ও সাউথ এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশ দলের অধিনায়ক ও কোচ ছিলেন এবং দেশের প্রথম কাবাডি খেলোয়াড় হিসেবে জাতীয় পুরস্কারও পেয়েছেন। তিনি জানান, কেন কাবাডি বাংলাদেশের জাতীয় খেলা। তার মতে, কাবাডিকে বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্তটা ছিল খুবই স্বাভাবিক।
বাংলা ট্রিবিউনকে বলছিলেন, ‘এটা খুব সহজ একটি খেলা। ঈদ, দুর্গাপূজা কিংবা অন্যান্য উৎসবের সময় গ্রামের কৃষকেরা এই খেলা খেলতেন। পুরস্কার হিসেবে গরু, রেডিও, চাল- এ ধরনের জিনিস দেওয়া হতো। খেলাটি আমাদের সংস্কৃতির অংশ। হা-ডু-ডুতে মানুষের ব্যাপক অংশগ্রহণ ছিল।’
এই কারণেই নাম বদলে আনুষ্ঠানিকভাবে কাবাডি খেলা বাংলাদেশের সমাজে টিকে গেছে। যার সঙ্গে মিশে আছে বৃষ্টি, কাদামাটি আর গ্রামের মাঠ।
গ্রামে কাবাডির ঐতিহ্য এখনও পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। মূলত এটি গ্রামীণ খেলা। তবে গ্রামে ব্যাপক জনপ্রিয় হলেও কাবাডি কখনোই সেভাবে শহুরে খেলা হয়ে উঠতে পারেনি। বিশেষ করে ঢাকায় ফুটবল ও ক্রিকেটই ছিল সাধারণ মানুষের প্রধান আকর্ষণ।
লিগ ক্রিকেট ও ফুটবলের মতো কাবাডির ম্যাচেও একসময় দর্শক আসতো। কিন্তু ক্রিকেট ও ফুটবলের ক্লাব সংস্কৃতি, জনপ্রিয়তা এবং বাণিজ্যিক বিস্তারের সঙ্গে কাবাডি কখনও পাল্লা দিতে পারেনি।
আবাহনী ও মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের মতো ক্লাবের ম্যাচে গ্যালারি ভরে যাওয়ার দৃশ্য দেখা গেছে ফুটবল ও অন্যান্য খেলায়। নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত হকিও ছিল বেশ জনপ্রিয়। সেই সময় কাবাডি থেকে গেছে অনেকটাই আড়ালে। অথচ সেই সময় সেসব খেলা জনপ্রিয় হলেও শুরুর দিকে এশিয়ান গেমসে পদক আসে এই খেলা থেকেই। যে কারণে পদক প্রাপ্তির গুরুত্ব বিবেচনায় এই খেলাটিকে এখনও বিভিন্ন গেমসে প্রাধান্য দেওয়া হয়ে থাকে। এছাড়া সরকারিভাবেও একে আলাদা গুরুত্ব দেওয়া হয়ে থাকে। যে কারণে কাবাডি খেলে পরিচিতি পেলে বিভিন্ন সংস্থা ও বাহিনীতে চাকরির সুযোগ মেলে।
এখানে উল্লেখ্য, এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশ ১৯৯০, ১৯৯৪ ও ২০০২ সালে কাবাডি থেকেই রৌপ্যপদক জিতেছে। ১৯৯৮, ২০০৬, ২০১০ ও ২০১৪ সালে এসেছে ব্রোঞ্জপদক।
সাউথ এশিয়ান গেমসে ১৯৮৫, ১৯৮৭ ও ১৯৯৫ সালেও রৌপ্য জিতেছে বাংলাদেশ। এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপেও ১৯৮০ ও ১৯৮৯ সালে দ্বিতীয় হয়েছিল দলটি।
বিশ্বকাপেও বাংলাদেশের সাফল্য আছে। ২০০৪ ও ২০০৭ সালে পুরুষদের বিশ্বকাপে তৃতীয় হয়েছিল বাংলাদেশ। মেয়েদের দলও ২০১২ সালের বিশ্বকাপে তৃতীয় স্থান অর্জন করে। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক কাবাডিতে বাংলাদেশের অবস্থান দীর্ঘদিন ধরেই ছিল শক্তিশালী।
তবে ভবিষ্যৎ নিয়েও আশার কথা শুনিয়েছেন আব্দুল জলিল। যিনি এবার নতুন কুঁড়ি স্পোর্টসে নির্বাচকের দায়িত্বও পালন করেছেন। তিনি জানিয়েছেন কাবাডিতে প্রতিভা অন্বেষণ সফলভাবেই হয়েছে, ‘কাবাডিতে এ ধরনের প্রতিভা অন্বেষণ আগে হয়নি। তাই শুরুতে সম্ভাবনাময় খেলোয়াড় খুঁজে পাওয়া সহজ ছিল না। তবে সারা দেশ থেকে যারা এসেছে, তাদের মধ্যে কয়েকজনের দারুণ সম্ভাবনা দেখেছি। সঠিক পরিচর্যা করতে পারলে কয়েক বছরের মধ্যেই তারা জাতীয় দলকে সার্ভিস দিতে পারবে।’









