কলম্বোর ঝকঝকে রোদে সকাল দশটায় চান্ডিকা হাথুরুসিংহে তার দল নিয়ে অনুশীলনে নেমে পড়েন শততম টেস্টের প্রস্তুতিতে। তখনও মাহমুদউল্লাহ জানতেন না তার দলে না থাকার খবরটি! তবে কিছুক্ষণের মধ্যেই জেনে গেলেন। পুরো দলের মধ্যেই খবরটি নিয়ে আলোচনা। তবে সবাই নীরব। কেউই কোনও মন্তব্য করলেন না।
মারিও ভিল্লাভারায়েন তার দল নিয়ে ওয়ার্মআপ শুরু করার মধ্যেই পুরো দল নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। সেখানে মাহমদুউল্লাহর উপস্থিতি থাকলেও কিছুক্ষণের মধ্যেই বিশ্বকাপে বাংলাদেশের এ প্রথম সেঞ্চুরিয়ান গায়েব হয়ে গেলেন! কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না তাকে। ব্যাটিং-বোলিং-ফিল্ডিং কোনও বিভাগেই অনুশীলন করেননি তিনি। হতাশায়-গ্লানিতে হয়তো কোথাও গিয়ে লুকিয়ে ছিলেন!
বুধবার পি সারা ওভালে লঙ্কানদের বিপক্ষে বাংলাদেশ তাদের শততম টেস্ট খেলতে মাঠে নামবে। এমন একটি ম্যাচে তার বাদ পড়াটা সতীর্থরা যেন মেনে নিতে পারেননি। হয়তো মাহমুদউল্লাহও পারছেন না। তাইতো দুঃখ-কষ্টে অনুশীলন শুরু হওয়ার এক ঘণ্টা পর স্টেডিয়াম থেকে মাইক্রোতে করে মাঠ ছেড়েছেন, কারও সঙ্গে কোনও কথা না বলেই।
বিভিন্ন সূত্রে দলের মধ্যে নানা ধরনের কোন্দলের খবর জানা গেছে। সেটা সতীর্থদের ছাড়িয়ে টিম ম্যানেজমেন্টের যোগ হওয়াটা নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে! যার ফলে সৃষ্টি হয়েছে নানা ধরনের জটিলতা, যার উৎকৃষ্ট উদহারণ মাহমুদউল্লাহর দেশে ফিরে যাওয়া।
শততম টেস্টে মাহমুদউল্লাহর না থাকাটা নিশ্চিত হলেও সীমিত ওভারের ক্রিকেটে তিনি থাকবেন কিনা বিষয়টি পরিষ্কার হয়নি এখনও। যদিও টিম ম্যানেজমেন্টের স্পষ্ট দাবি এই সিরিজের কোনও জায়গাতেই মাহমুদউল্লাহকে চায় না তারা। যদিও সিনিয়র খেলোয়াড়রা সবাই মাহমুদউল্লাহকে অন্তত ওয়ানডে সিরিজে দেখতে চান।
সব মিলিয়ে বিষয়টি নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। যদিও টিম ম্যানেজার খালেদ মাহমুদ সুজন এ ব্যাপারে বলেছেন, ‘সীমিত ওভারে ক্রিকেটে হয়তো সে ফিরতে পারে। আমি মনে করি রিয়াদ লড়াকু; শক্তভাবেই সে ফিরে আসবে।’
মুখে মাহমুদউল্লাহর ফেরার গল্পটা টিম ম্যানেজার করলেও সূত্র মতে জানা গেছে, খালেদ মাহমুদ ও হাথুরুসিংহের একক সিদ্ধান্তেরই বলি হয়েছেন এ অভিজ্ঞ ব্যাটসম্যান। অধিনায়ক মুশফিককেও এই ব্যাপারে জানানো হয়নি। সিদ্ধান্ত হওয়ার পরই জানতে পেরেছিলেন বাংলাদেশের টেস্ট অধিনায়ক।
খালেদ মাহমুদের শেষ কথাতেই অনেকটাই স্পষ্ট, সীমিত ওভারের ক্রিকেটে রাখা হবে না মাহমুদউল্লাহকে। কেন না তাকে ফিরতে হলে পারফরম্যান্স করেই ফিরতে হবে। ফেরার জন্য মাহমুদউল্লাহর সামনে একটাই পথ খোলা। ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ শুরু হবে আগামী মাসে। ওখানে ভালো পারফরম্যান্স করতে পারলেই কেবল সুযোগ মিলবে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি কিংবা আয়ারল্যান্ডে অনুষ্ঠিত ত্রিদেশীয় সিরিজে। তার আগে কোনও সুযোগ নেই মাহমুদউল্লাহর।
সবমিলিয়ে সোমবার সকালে টিম বাংলাদেশের মধ্যে অস্বস্তিই ছিল। কোনও খেলোয়াড়দের মধ্যেই ছিল না প্রাণোচ্ছ্বলতা। যার প্রভাব হয়তো শততম টেস্টে পড়লেও পড়তে পারে। খালেদ মাহমুদ অবশ্য তা মনে করছেন না, ‘বাংলাদেশ এখন আগের অবস্থানে নেই। মন খারাপতো সবারই থাকবে। এটা খুবই স্বাভাবিক। রিয়াদ অভিজ্ঞ খেলোয়াড়, এতো বছর দলের সঙ্গে ছিল। আমরা টেস্ট সিরিজে পিছিয়ে আছি, আমাদের হাতে তাকে বাদ দেওয়া ছাড়া কোনও উপায় ছিল না। এখানে আবেগ দিয়ে হবে না, পারফরম্যান্স সবচেয়ে বড় কথা। দলের প্রয়োজনে যেটা করা হয় সবাই সেটা মেনে নেয়।’
তবে মাহমুদউল্লার সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স অত্যন্ত হতাশাজনকই বটে। সব ফরম্যাটের ক্রিকেটেই তার ব্যাটে রান খরা। নিউজিল্যান্ড সফর দিয়েই মূলত শুরু হয় তার ব্যর্থতা। অথচ বিপিএলে খুলনা টাইটানসের হয়ে অসাধারণ পারফরম্যান্স করেছিলেন তিনি। ২-৩টি ম্যাচে বিধ্বংসী বোলিং করে রোমাঞ্চ ছড়ানো জয় উপহার দিয়েছিলেন মাহমুদউল্লাহ। তার অধিনায়কত্বে সাদামাটা দল নিয়েও সেরা চারে খেলেছিল খুলনা টাইটানস।
এরপর বিসিবির সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন নিজেও মাহমুদউল্লাহর অধিনায়কত্বের প্রশংসা করেছিলেন। মাশরাফি পরবর্তী যুগে মাহমুদউল্লাহকেই সীমিত ওভারের অধিনায়কত্ব ভাবা হচ্ছিল। কিন্তু হঠাৎ করেই মাহমুদউল্লাহর বাদ পড়াটা জনমনে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
সৌম্যকে অনেকদিন ধরেই সুযোগ দিচ্ছিল বিসিবি। ম্যাচ না খেলালেও দলের সঙ্গে তাকে রেখে দিয়েছিল বেশ কয়েকটা সিরিজে। কিন্তু মাহমুদউল্লাহ সেই তুলনায় কম সুযোগ পেলেন। খালেদ মাহমুদের কাছে এমন প্রশ্নে উত্তর পাওয়া গেল কূটনৈতিক, ‘অনেক সময় বিরতি মানুষকে সতেজ করে। এটার দরকার হয় মানুষের জীবনে। আমি মনে করি, এই বিরতিটা মাহমুদউল্লাহর জীবনে একটা টার্নিং পয়েন্ট হতে পারে। আমার বিশ্বাস এটা ওর জন্য ভালো কিছুই হবে।’
মাহমুদউল্লাহকে বাদ দেওয়ার পেছনে পারফরম্যান্স গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। টিম ম্যানেজমেন্ট স্পষ্ট করেই তা সংবাদ মাধ্যমকে বলেছেন। তবে ওয়ানডে সিরিজে রাখা হচ্ছে না, বিষয়টি তার ফিরে যাওয়াতেই প্রমাণ হয়। কেন না ওয়ানডে কিংবা টি-টোয়েন্টিতে তাকে রাখা হলে দেশে ফেরত পাঠানো হতো না। খালেদ মাহমুদ অবশ্য ভিন্ন সুরে কথা বললেন, ‘অবশ্যই পারফরম্যান্সের জন্য তাকে চলে যেতে হয়েছে। হয়তো ওয়ানডেতে ফিরে আসতেও পারে। মূলত ম্যানেজমেন্টের ইচ্ছাতেই চলে যাওয়া। সে সিনিয়র খেলোয়াড়, শততম টেস্টে মাঠের বাইরে তার খেলাটা দেখাটা অনেক কষ্টের হতে পারে।’
/আরএম/এফএইচএম/







