নানা কৌশলে একাধিকবার আঙুলের ছাপ নিয়ে সিম রি-রেজিস্ট্রেশন করেছে জালিয়াতরা। যারা অবৈধ ভিওআইপির সঙ্গেও জড়িত বলে জানিয়েছে পুলিশ। ঢাকা, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ ও নাটোরে গ্রেফতার হওয়া প্রতারকরা পুলিশকে জালিয়াতির চাঞ্চল্যকর এ সব তথ্য জানায়। অথচ বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে সিম রি-রেজিস্ট্রেশন করা হলে জালিয়াতি একেবারেই অসম্ভব বলে জানিয়েছিলেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলেছিলেন, এ পদ্ধতিকে শতভাগ সাইবার সুরক্ষার মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে বায়োমেট্রিক পদ্ধতি জালিয়াতি করে সিম রি-রেজিস্ট্রেশনের অভিযোগে পুলিশ প্রতারক চক্রকে গ্রেফতার করছে।
সম্প্রতি চট্টগ্রামে ঘটে যাওয়া সিম জালিয়াতি করে মোবাইল অর্থিক সেবা বিকাশের টাকা ও সিম উত্তোলনের ঘটনা, রাজধানীতে বুধবারের অভিযানে সিম জালিয়াতি চক্রকে আটক এবং বৃহস্পতিবার ময়মনসিংহ ও নাটোরে বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে নিবন্ধিত সিম উদ্ধার ও জালিয়াত চক্রকে আটকের ঘটনা দিনভর আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দেয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যা বায়োমেট্রিক কেলেঙ্কারি হিসেবে ঘুরছে।
সিম জালিয়াতি সম্পর্কে তার অবস্থান পরিষ্কার। বিষয়টি সম্পর্কে জানাতে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম বৃহস্পতিবার বিকেলে সচিবালয়ে তার দফতরে সাংবাদিকদের বলেন, অবৈধ সিম নিবন্ধনকারীদের বিরুদ্ধে অভিযান চলবে। আর অপারেটরদেরই এই দায় নিতে হবে। এর আগে তিনি দেশের সব মোবাইলফোন অপারেটরের শীর্ষ নির্বাহীদের তার দফতরে ডেকে নিয়ে উদ্ভূত বিষয়গুলো সম্পর্কে জানতে চান।
এদিকে, বৃহস্পতিবারের ঘটনায় ঢাকায় বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে জালিয়াতির মাধ্যমে নিবন্ধন করে সিম বিক্রির অভিযোগে যে ২১ জনকে আটক করেছে পুলিশ, তাদের মধ্যে মোবাইলফোন অপারেটর এয়ারটেলের কর্মকর্তাও রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। যেসব সিম আটক করা হয় তা-ও এয়ারটেলের। এ বিষয়ে জানতে চাইলে এয়ারটেল থেকে পাঠানো এক বিবৃতিতে বলা হয়, এয়ারটেল ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনায় নিয়ন্ত্রণমূলক বিধিমালা মেনে চলতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করে। এয়ারটেল আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল একটি প্রতিষ্ঠান। এয়ারটেল এ বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্ত কার্যক্রমে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করছে।
প্রসঙ্গত, সরকারের পক্ষ থেকে বারবারই বলা হয়েছে যে ডিভাইস দিয়ে আঙুলের ছাপ নেওয়া হচ্ছে, তাতে সংরক্ষণের কোনও মেমোরি নেই। ফলে কোনও আঙুলের ছাপ সংরক্ষণ করা হচ্ছে না। জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) ডাটাবেজে সংরক্ষিত আঙুলের ছাপের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হচ্ছে। আঙুলের ছাপ সংরক্ষণের কোনও সুযোগই রাখা হয়নি ডিভাইসে। এসব বলারও পরও ঘটে যায় গত মে মাসে চট্টগ্রামে সিম জালিয়াতির ঘটনা।
এরই পরিপ্রেক্ষিতে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, ওই সিমগুলো বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে নিবন্ধন করা ছিল বলেই জালিয়াতির ঘটনা ধরা পড়েছে। ওই সময় সরকারের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সতর্ক করে দেওয়া হয়, বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে সিম নিবন্ধনে কোনও মোবাইলফোন অপারেটর জালিয়াতি করলে ৩০০ কোটি টাকা জরিমানা করা হবে।
সিম জালিয়াতির বিষয়ে জানতে চাইলে শ্রীলঙ্কাভিত্তিক টেলিকম গবেষণা প্রতিষ্ঠান লার্ন এশিয়ার সিনিয়র ফেলো আবু সাঈদ খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, টেলিযোগাযোগ আইনে বর্ণিত অর্থদণ্ডের ধারার অধীনে বিধি প্রণয়নের মাধ্যমে এই অপরাধের শাস্তি বিধান করতে হবে। তিনি বলেন, শুধু মুখে বললেই (নির্বাহী আদেশ) হবে না।
ময়মনসিংহ প্রতিনিধি জানান, অবৈধ ভিওআইপি সরঞ্জাম ও দুই হাজার ২০০ সিমসহ তিনজনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। তারা একটি সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্রের সদস্য বলে জানিয়েছে পুলিশ। একটি আঙুলের ছাপ দিয়ে ২০টি করে সিম নিবন্ধন করেছিল আটক ব্যক্তিরা। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতারকৃতরা এমন তথ্য দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন ময়মনসিংহ কোতোয়ালী মডেল থানার ওসি কামরুল ইসলাম। তদন্তের স্বার্থে এর বেশি কিছু জানাতে অস্বীকৃতি জানান তিনি।
টেলিযোগাযোগ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত ৪ জুন পর্যন্ত মোট ১১ কোটি ৬০ লাখের মতো সিম বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে নিবন্ধিত হয়েছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসি’র হিসাবে গত এপ্রিল শেষ নাগাদ গ্রাহকের হাতে থাকা মোবাইল সিমের সংখ্যা ছিল ১৩ কোটি ২০ লাখের মতো। এ হিসাবে এখনও দেড় কোটির বেশি সিম নিবন্ধিত না হওয়ায় ঘোষণা অনুযায়ী সেগুলো বন্ধ রয়েছে। তবে গ্রাহকরা ইচ্ছা করলেই বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে নিবন্ধন করে সেই সিম তুলতে পারছেন। সম্প্রতি বিভিন্ন স্থানে কয়েকটি দোকানে জাতীয় পরিচয়পত্র ও আঙুলের ছাপ ছাড়াই সিম বিক্রির তথ্য পাওয়ার পর অভিযান শুরুর কথা জানিয়েছিল নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসি ও পুলিশ।
আঙুলের ছাপ জালিয়াতি করে সিম নিবন্ধনের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে পুলিশ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে ২২ জনকে গ্রেফতার করে। পরে এ ব্যাপারে তেজগাঁও জোনের উপ-কমিশনার বিপ্লব কুমার সরকার এক সংবাদ সম্মেলনে এ বিষয়ে তথ্য প্রকাশ করেন।
গ্রেফতারকৃতরা জিজ্ঞাসাবাদে কী জানিয়েছেন—জানতে চাইলে তেজগাঁও জোনের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার ওয়াহিদুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, পুলিশ গ্রেফতারকৃতদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালতে রিমান্ডের আবেদন করেছিল। কিন্তু আদালত রিমান্ডে না দিয়ে তাদের জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদের নির্দেশ দেন। তাই আগামী দুই-একদিনের মধ্যে তাদের জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে বলে জানান তিনি। তবে গ্রেফতারের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা জানিয়েছেন, নানা কৌশলে একাধিকবার আঙুলের ছাপ নিয়ে তারা রি-রেজিস্ট্রেশন করিয়েছিলেন। এর সঙ্গে আর কারা জড়িত, সেটা খুঁজে বের করতে তারা কাজ করছেন।
আরও পড়তে পারেন: অবৈধ সিম নিবন্ধনকারীদের বিরুদ্ধে অভিযান চলবে: তারানা হালিম
/এমএনএইচ/








