জরুরি অবস্থায় গাড়ির দরজা খুলতে সমস্যা হওয়ার আশঙ্কায় চীনে টেসলা ও শাওমিসহ ১১টি গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বাজার থেকে বড় সংখ্যক গাড়ি তুলে নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এটি চীনের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় গাড়ি প্রত্যাহারের ঘটনা। একই সঙ্গে বৈদ্যুতিক গাড়ির নিরাপত্তা নিয়ে দেশটির নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর নজরদারি আরও কঠোর হওয়ার বিষয়টিও সামনে এসেছে।
কেন গাড়ি বাজার থেকে তুলে নেওয়া হচ্ছে
বেশিরভাগ গাড়ি তুলে নেওয়ার কারণ গাড়ির জরুরি দরজা খোলার হাতল। দুর্ঘটনার মতো জরুরি পরিস্থিতিতে এসব হাতল কোথায় রয়েছে, তা খুঁজে বের করা বা সঠিকভাবে ব্যবহার করা কঠিন হতে পারে বলে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বিশেষ করে গুরুতর সংঘর্ষের পর গাড়ির বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা কাজ না করলে যাত্রীদের গাড়ি থেকে বের হওয়া কিংবা উদ্ধারকারীদের ভেতরে প্রবেশের ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি হতে পারে।
এই সমস্যা সমাধানে ১১টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৯টি বিনা খরচে জরুরি দরজার হাতলের অবস্থান বোঝাতে সতর্কতামূলক লেবেল লাগাবে। বেশিরভাগ নির্মাতা গাড়ির সফটওয়্যারও দূর থেকে হালনাগাদ করবে।
প্রায় ৩০ লাখ টেসলা গাড়ি তুলে নেওয়া হচ্ছে
এই কর্মসূচিতে টেসলার অংশগ্রহণই সবচেয়ে বড়। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, চীনের বাজার থেকে প্রায় ২৯ লাখ ৮০ হাজার আমদানি করা ও চীনে তৈরি টেসলা গাড়ি তুলে নেওয়া হবে।
এর মধ্যে রয়েছে মডেল ৩, মডেল ওয়াই, মডেল এস এবং মডেল এক্স। গাড়িগুলো আগামী ২৫ সেপ্টেম্বর থেকে এই কর্মসূচির আওতায় আসবে।
টেসলার ক্ষেত্রে জরুরি দরজার হাতল চিহ্নিত করার জন্য সতর্কতামূলক লেবেল লাগানোর পাশাপাশি সফটওয়্যার হালনাগাদ করা হবে। দুর্ঘটনার পর স্বয়ংক্রিয়ভাবে গাড়ির জানালা কিছুটা নামিয়ে দেওয়ার সুবিধাও এই হালনাগাদের অংশ থাকবে। এতে দুর্ঘটনার পর যাত্রীদের বের হওয়া কিংবা উদ্ধারকারীদের প্রবেশ সহজ হতে পারে।
শাওমিসহ আরও যেসব প্রতিষ্ঠান রয়েছে
টেসলার পাশাপাশি শাওমি, লিপমোটর, এক্সপেং, জিকর এবং লিংক অ্যান্ড কো-এর মতো গাড়ি নির্মাতারাও এই কর্মসূচিতে রয়েছে।
রয়টার্স জানিয়েছে, অন্তত ছয়টি গাড়ি ব্র্যান্ড শুক্রবার তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় গাড়ি প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছে।
চীনের সবচেয়ে বড় গাড়ির বাজারে বৈদ্যুতিক গাড়ি নিয়ে প্রতিযোগিতা দ্রুত বাড়ছে। এর পাশাপাশি গাড়িতে নতুন নতুন প্রযুক্তি যুক্ত হওয়ায় নিরাপত্তা নিয়েও দেশটির কর্তৃপক্ষের নজরদারি বাড়ছে।
২০২৭ সাল থেকে লুকানো দরজার হাতল নিষিদ্ধ
এই ঘটনার সঙ্গে চীনের গাড়ির নকশায় আরেকটি বড় পরিবর্তনের বিষয়ও সামনে এসেছে। দেশটি ২০২৭ সাল থেকে লুকানো বা গোপন দরজার হাতল নিষিদ্ধ করার পরিকল্পনা করেছে।
এই ধরনের হাতল গাড়ির দরজার সঙ্গে সমতলভাবে থাকে এবং প্রয়োজন হলে বাইরে বেরিয়ে আসে। চাবির রিমোট, স্মার্টফোন কিংবা চাপ দেওয়ার মাধ্যমে এগুলো ব্যবহার করা যায়। টেসলার মাধ্যমে এই নকশা ব্যাপক জনপ্রিয় হওয়ার পর অনেক চীনা বৈদ্যুতিক গাড়িতেও এমন হাতল ব্যবহার করা হয়েছে।
তবে দুর্ঘটনা বা বিদ্যুৎ ব্যবস্থা বিকল হওয়ার মতো পরিস্থিতিতে এসব হাতল দ্রুত খুঁজে পাওয়া এবং ব্যবহার করা যাবে কি না, তা নিয়ে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ন্ত্রক পর্যায়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বৈদ্যুতিক গাড়িতে বাড়ছে নিরাপত্তার নজরদারি
চীনের এই বড় গাড়ি প্রত্যাহারের ঘটনা এমন এক সময়ে ঘটল, যখন দেশটি বৈদ্যুতিক গাড়ি খাতের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরও জোরদার করছে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় গাড়ির বাজারটিতে নির্মাতাদের মধ্যে তীব্র মূল্য প্রতিযোগিতার পাশাপাশি গাড়িতে নতুন প্রযুক্তি যুক্ত করার প্রতিযোগিতাও চলছে।
নতুন প্রযুক্তি গাড়িকে আরও স্মার্ট ও ব্যবহারবান্ধব করলেও জরুরি পরিস্থিতিতে সেগুলো কতটা নিরাপদ, সেই প্রশ্নও এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
চীনের এবারের গাড়ি প্রত্যাহারের ঘটনা সেই বিষয়টিই সামনে নিয়ে এসেছে। বিশেষ করে দুর্ঘটনার পর গাড়ির বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে গেলে যাত্রীরা যাতে দ্রুত গাড়ি থেকে বের হতে পারেন, সে বিষয়টিকে এখন আরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, চীনের এই রেকর্ড গাড়ি প্রত্যাহার শুধু কয়েকটি গাড়ির নিরাপত্তা ত্রুটি সংশোধনের ঘটনা নয়। এটি দেখাচ্ছে, বৈদ্যুতিক ও প্রযুক্তিনির্ভর গাড়িতে নতুন সুবিধা যোগ করার পাশাপাশি জরুরি নিরাপত্তাব্যবস্থাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হচ্ছে নির্মাতাদের।









