শিশু-কিশোরদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে ক্ষতিকর প্রভাবের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রের ২৯টি অঙ্গরাজ্যের করা মামলার নিষ্পত্তিতে সর্বোচ্চ ১৮ বিলিয়ন ডলার দিতে ইতোমধ্যেই রাজি হয়েছে মেটা। তবে এই আর্থিক সমঝোতার পাশাপাশি ফেসবুক-ইনস্টাগ্রামে অপ্রাপ্তবয়স্কদের ব্যবহার সীমিত করতে সময়সীমা, রাতের প্রবেশাধিকার বন্ধ, স্কুলের সময়ে নোটিফিকেশন নিয়ন্ত্রণ, অ্যালগরিদমনির্ভর ফিড এড়ানোর সুযোগ এবং বয়স যাচাই প্রযুক্তি উন্নয়নের মতো বড় পরিবর্তন আনতে সম্মত হয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। তবে সমঝোতাটি এখনও আদালতের অনুমোদন পায়নি। অনুমোদন মিললে এর অধিকাংশ শর্ত আগামী ১০ বছর কার্যকর থাকবে।
মামলায় অভিযোগ করা হয়েছিল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আসক্তির সম্ভাব্য ক্ষতি সম্পর্কে অবগত থাকা সত্ত্বেও মেটা তাদের প্ল্যাটফর্মগুলো এমনভাবে নকশা করেছে, যাতে শিশু-কিশোররা দীর্ঘসময় এতে সক্রিয় থাকে। অঙ্গরাজ্যগুলোর অভিযোগের মধ্যে শিশুদের অভিভাবকের অজ্ঞাতে তথ্য সংগ্রহ এবং চিলড্রেন্স অনলাইন প্রাইভেসি প্রোটেকশন অ্যাক্ট (সিওপিপিএ) লঙ্ঘনের বিষয়ও তুলে ধরা হয়। তবে সমঝোতায় মেটা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
সমঝোতার আওতায় ১৮ বছরের কম বয়সী ব্যবহারকারীদের জন্য ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামে ডিফল্টভাবে দুই ঘণ্টার দৈনিক ব্যবহারসীমা থাকবে। ৬০ ও ৯০ মিনিট ব্যবহারে সতর্কবার্তা এবং এরপর প্রতি ১৫ মিনিটে বিরতির জন্য প্রম্পট দেখানো হবে। দুই প্ল্যাটফর্মে ব্যয় করা সময় মিলিয়েই সময়সীমা গণনা হবে এবং অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া এই সীমা কোনোমতেই অতিক্রম করা যাবে না। রাত ১২টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত নাইট মোডে অ্যাপ ব্যবহারের সুযোগ বন্ধ থাকবে। সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৩টা পর্যন্ত ‘স্কুল মোড’ সক্রিয় থাকা অবস্থায় নিরাপত্তা ও সরাসরি বার্তা ছাড়া অধিকাংশ নোটিফিকেশনই ব্লক করা হবে।
এছাড়া কিশোরদের জন্য লাইক ও রিঅ্যাকশনের সংখ্যা ডিফল্টভাবে গোপন রাখা, চরম মেকআপ ফিল্টার ব্যবহারে বাধা এবং অটোপ্লে ফিচার বন্ধ করার সুযোগ থাকবে। অভিভাবকেরা প্রচলিত সাধারণ অ্যালগরিদমের পরিবর্তে ‘নন-পার্সোনালাইজড ফিড’ ডিফল্ট হিসেবে নির্ধারণ করতে পারবেন তাদের সন্তানের জন্য। কিশোরদের ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট ব্যবহারের পাশাপাশি সন্দেহজনক প্রাপ্তবয়স্কদের যোগাযোগ ঠেকাতেও আরও বেশ কিছু ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে সমঝোতার সবচেয়ে বড় প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ হতে পারে বয়স যাচাই প্রক্রিয়া। ১৩ বছরের কম বয়সী কিংবা প্রাপ্তবয়স্কের জন্ম তারিখ ব্যবহার করে অ্যাকাউন্ট খোলা কিশোরদের শনাক্ত করতে মেটাকে আরও কার্যকর ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে। বর্তমানে বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে বয়স যাচাইয়ে মুখের ছবি বা বায়োমেট্রিক তথ্য, সরকারি পরিচয়পত্র এবং ব্যবহারকারীর আচরণ বিশ্লেষণ করা হয়ে থাকে। তবে এসব পদ্ধতিতে ভুল বয়স শনাক্ত হওয়ার পাশাপাশি ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা লঙ্ঘনের ঝুঁকিও রয়েছে। বিশেষ করে শিশুদের পরিচয়পত্র বা মুখের বায়োমেট্রিক তথ্য ফাঁস হলে তা পাসওয়ার্ডের মতো সহজে পরিবর্তন করা সম্ভব নয়।
এ কারণে ব্যক্তিগত তথ্য সংরক্ষণ না করেই বয়স যাচাইয়ের বিকল্প পদ্ধতি নিয়েও আলোচনা হচ্ছে। যেমন, যাচাই শেষে ব্যবহারকারীর প্রকৃত পরিচয় সংরক্ষণ না করে শুধু তিনি নির্দিষ্ট বয়সসীমার মধ্যে রয়েছেন কি না, সেই তথ্য নির্দেশকারী একটি ডিজিটাল টোকেন রাখা যেতে পারে। ফলে সমঝোতার সাফল্য শুধু শিশুদের সামাজিকমাধ্যম ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের ওপর নয়, বয়স যাচাইয়ের নির্ভুলতা ও ব্যবহারকারীর গোপনীয়তা— দুটিই নিশ্চিত করার ওপরও নির্ভর করবে।








