একজন সাধারণ ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর নিত্যদিনের অনলাইন কার্যক্রম মূলত সারফেস ওয়েবের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। তবে ইন্টারনেটের বিশাল জগতের অন্তরালে আনুমানিক ০.০১ থেকে ০.০৫ শতাংশ জুড়ে থাকা অবৈধ পরিসর ডার্ক ওয়েবে কোনও ব্যবহারকারী নিজে কখনও প্রবেশ না করলেও তাঁর সম্পূর্ণ বায়োডেটা পৌঁছে যেতে পারে সেখানে। ডার্ক ওয়েবকেন্দ্রিক তথ্য ফাঁস ও বিক্রির ঘটনা আন্তর্জাতিকভাবে দীর্ঘদিনের উদ্বেগের বিষয় হলেও, বাংলাদেশেও সাম্প্রতিক কয়েকটি ডেটা ফাঁসের ঘটনায় চুরি হওয়া তথ্য ডার্ক ওয়েবে বিক্রির দাবি সামনে এসেছে। এসব ঘটনায় ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে—তথ্য চুরি বা পরিচয় চুরির শিকার হওয়ার বিষয়টি কীভাবে শনাক্ত করা সম্ভব এবং সম্ভাব্য ক্ষতি এড়াতে আগেভাগে কী ধরনের সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন?
গত ২৩ আগস্ট ‘ম্যাডারক্স’ নামে একটি হ্যাকার গোষ্ঠী ডার্ক ওয়েব ফোরামে ৬০ লাখ বাংলাদেশি চাকরিপ্রার্থীর সিভি বিক্রির বিজ্ঞাপন দেয়। তাদের বিজ্ঞাপনে নাম, ফোন নম্বর, ঠিকানা, ই-মেইল, শিক্ষাগত যোগ্যতা, চাকরির ইতিহাস ও প্রশিক্ষণের তথ্য থাকার কথা বলা হয়। ১৪৮টি সিভির নমুনাও প্রকাশ করা হয়েছিল, যার বেশির ভাগই ২০১১–২০১৭ সালের পুরোনো তথ্য। এক কপির দাম চাওয়া হয় ১,০০০ ডলার। তবে বিডিজবস দাবি অস্বীকার করে বলেছে, তাদের নিরাপত্তাব্যবস্থা ও অ্যাক্সেস কন্ট্রোল রয়েছে এবং নিবন্ধিত নিয়োগকারীরা তথ্য শুধু নিয়োগের উদ্দেশ্যেই ব্যবহার করতে পারে।
এর আগে রোড ট্রান্সপোর্ট কর্তৃপক্ষের ১০ লাখের বেশি রেকর্ড, নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে এক মাসে ৩ লাখ ৬৫ হাজার নাগরিকের এনআইডি তথ্য বিক্রির ঘটনা, প্রায় ১৪ হাজার সাংবাদিকের তথ্য উন্মুক্ত হয়ে যাওয়া, এবং প্রবাসীকল্যাণ ও জনশক্তি ব্যুরোর ১০ লাখের বেশি অভিবাসী কর্মীর তথ্য ডার্ক ওয়েবে বিজ্ঞাপনের বিষয়ও সামনে এসেছে। চলতি বছর মার্চে স্বপ্ন সুপারমার্কেটের সিস্টেমে হ্যাকারদের দীর্ঘস্থায়ী অনুপ্রবেশের পর ৪০ লাখের বেশি গ্রাহকের তথ্য ঝুঁকিতে পড়ার ঘটনাও প্রকাশ্যে আসে। চুরি হওয়া তথ্য ব্যবহার করে অপরাধীরা ভুক্তভোগীর পরিচয়ে অ্যাকাউন্ট খোলা, কেনাকাটা, আর্থিক প্রতারণা বা লক্ষ্যভিত্তিক ফিশিং চালাতে পারে। একটি সিভিতে থাকা একাধিক তথ্য একত্র করলে অপরাধীরা ব্যক্তির একটি বিস্তারিত ডিজিটাল প্রোফাইল তৈরি করতে পারে—যা ভুয়া চাকরির প্রস্তাব বা ব্যক্তিগত তথ্যভিত্তিক প্রতারণাকে আরও বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে।
এ ক্ষেত্রে, ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষায় ডার্ক ওয়েব মনিটরিং কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। এ ধরনের সেবা ব্যবহার করে সরাসরি ডার্ক ওয়েবে প্রবেশ না করেই বিভিন্ন গোপন উৎসে ই-মেইল, ফোন নম্বর, অ্যাকাউন্টের তথ্য বা অন্যান্য পরিচয়-সংক্রান্ত ডেটা ফাঁস হয়েছে কি না, তা শনাক্ত কড়া যায়। কোনো তথ্যের মিল পাওয়া গেলে সাধারণত সতর্কবার্তা দেওয়া হয়, ফলে সেই তথ্য প্রতারণা বা পরিচয় চুরিতে ব্যবহারের আগেই প্রয়োজনীয় নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। তবে তথ্য ডার্ক ওয়েবে যাওয়ার পর নয়, আগেই ঝুঁকি কমানোই সবচেয়ে কার্যকর কৌশল। প্রতিটি অ্যাকাউন্টে আলাদা শক্তিশালী পাসওয়ার্ড, দুই-স্তরের বা মাল্টি-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন, নিয়মিত ব্যাংক ও ডিজিটাল অ্যাকাউন্ট পর্যবেক্ষণ এবং সন্দেহজনক লিংকে ক্লিক না করা জরুরি। প্রয়োজনের অতিরিক্ত ব্যক্তিগত তথ্য অনলাইনে না দেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ।
তবে তথ্য ডার্ক ওয়েবে পৌঁছানোর পর ব্যবস্থা নেওয়ার চেয়ে আগেই ঝুঁকি কমানোই সবচেয়ে কার্যকর কৌশল। প্রতিটি অ্যাকাউন্টে আলাদা ও শক্তিশালী পাসওয়ার্ড ব্যবহার, দুই-স্তরের বা মাল্টি-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন (এমএফএ) চালু রাখা, নিয়মিত ব্যাংক ও ডিজিটাল অ্যাকাউন্টের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ এবং সন্দেহজনক লিংক বা বার্তা এড়িয়ে চলা জরুরি। একই সঙ্গে অনলাইনে প্রয়োজনের অতিরিক্ত ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ না করাও তথ্য চুরি ও পরিচয় জালিয়াতির ঝুঁকি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে, কারণ অনেক প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব সিস্টেমে নিরাপত্তা দুর্বলতা শনাক্ত ও তাৎক্ষণিকভাবে সংশোধনের চর্চা এখনও সীমিত। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোতে তথ্য ফাঁসের পর ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের দ্রুত অবহিত করা, ফরেনসিক তদন্ত পরিচালনা এবং দায় নির্ধারণের ক্ষেত্রেও ঘাটতি সামনে এসেছে। ফলে ব্যক্তিগত সতর্কতার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানগুলোকেও কঠোর অ্যাক্সেস কন্ট্রোল, নির্ভরযোগ্য অডিট লগ, দ্রুত ডেটা ব্রিচ নোটিফিকেশন এবং নিয়মিত সাইবার নিরাপত্তা পরীক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।









