যে প্রযুক্তিকে যুদ্ধক্ষেত্রে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার হাতিয়ার হিসেবে এগিয়ে নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, সেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাই এবার দেশটির সামরিক বাহিনীকে চীনের সঙ্গে সম্ভাব্য সংঘাতের অত্যন্ত কাছাকাছি নিয়ে গিয়েছিল। ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের সময় এআইয়ের সহায়তায় তৈরি একটি ভুল গোয়েন্দা প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, মধ্যপ্রাচ্যে চলাচলকারী একটি চীনা জাহাজে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কাজে ব্যবহারের উপযোগী সরঞ্জাম বহন করা হচ্ছে। মার্কিন বাহিনী তথ্যটির ভিত্তিতে জাহাজটি আটকানোর জোর প্রস্তুতি নিলেও, অভিযান শুরুর ঠিক আগে তথ্যটির সত্যতা যাচাই করতে গিয়ে এআইয়ের ভুল শনাক্তকরণ ধরা পড়ে।
ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসে গত ১৮ সেপ্টেম্বর। মার্কিন স্পেশাল অপারেশনস কমান্ডের এক বিশ্লেষক জাহাজটির ম্যানিফেস্টসংক্রান্ত গোয়েন্দা তথ্য একটি এআই চ্যাটবটে দেন। এতে সরকারি গোপন ‘সিগন্যালস ইন্টেলিজেন্স’-এর পাশাপাশি উন্মুক্ত উৎসের তথ্যও ছিল। চ্যাটবটটি জাহাজটির বহন করা পণ্য ভুলভাবে শনাক্ত করে এবং সেটিকে পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট উপাদান হিসেবে চিহ্নিত করে। পরে ওই বিশ্লেষক এআই ব্যবহার করেই ভুল তথ্যকে প্রচলিত গোয়েন্দা প্রতিবেদনের কাঠামোয় সাজিয়ে বিভিন্ন কমান্ড পর্যায়ে পাঠান। ব্যবহৃত চ্যাটবটটি বাণিজ্যিক নাকি মার্কিন সরকারের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থা ছিল, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
পরিস্থিতির গুরুতরতা বোঝার পর অভিযান শুরুর ঠিক আগে মূল তথ্যসূত্র আরও গভীরভাবে যাচাই করা হয়। তখন এআইয়ের ভুল শনাক্তকরণের বিষয়টি ধরা পড়ে এবং অভিযান বাতিল করা হয়। ঘটনাটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একজনের মতে, এআইয়ের এই গুরুতর ভুল প্রায় দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি করে ফেলেছিল। চীনা জাহাজটিতে মার্কিন সামরিক অভিযান চালানো হলে তা দুই দেশের মধ্যে সরাসরি সশস্ত্র সংঘাতের ঝুঁকি তৈরি করতে পারতো।
ঘটনাটি এমন সময়ে ঘটল, যখন মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর সামরিক কাজে এআই ব্যবহারের পরিধি ক্রমাগত বাড়িয়েই চলছে। জানুয়ারিতে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ ‘আর্টিফিশিয়াল অ্যাক্সেলারেশন স্ট্র্যাটিজি’ প্রকাশ করে এআই পরীক্ষার গতি বাড়ানো এবং সামরিক বাহিনীর বিভিন্ন শাখায় এর ব্যবহার সম্প্রসারণের কথা জানান। তিনি বলেন, ‘আমরা পরীক্ষামূলক প্রয়োগের সুযোগ বাড়াব, আমলাতান্ত্রিক বাধা দূর করবো এবং সামরিক এআইয়ের ক্ষেত্রে নেতৃত্ব নিশ্চিত করবো।’ সামরিক কার্যক্রমের প্রতিটি ক্ষেত্রে এআইকে অগ্রাধিকার দিয়ে সক্ষমতা গড়ে তোলাই ছিল মূল লক্ষ্য।
ঘটনাটি শেষ পর্যন্ত কোনো সংঘাতে গড়ায়নি। তবে সামরিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রযুক্তির দ্রুততা এবং মানুষের যাচাইয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তা নতুন করে সামনে এসেছে। মার্কিন বাহিনী যুদ্ধক্ষেত্রে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার উপকরণ হিসেবে এআইয়ের ব্যবহার বাড়ালেও, এর তৈরি তথ্যের যথার্থতা যাচাই এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব এখনো মানুষের ওপরই থাকছে।









