হিসাবে মিলছে না, তবুও ফেসবুকে ঢাকা দ্বিতীয়!

হিটলার এ. হালিম
১৬ এপ্রিল ২০১৭, ১৯:৫২আপডেট : ১৬ এপ্রিল ২০১৭, ২০:০৮

ফেসবুক

দুটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদন অনুযায়ী ঢাকা শহরে এখন সক্রিয় ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা ২ কোটি ২০ লাখের বেশি মানুষ। আর এতেই সারাবিশ্বের শহরগুলোর মধ্যে ফেসবুক ব্যবহারকারীদের তালিকায় ঢাকা উঠে এসেছে দ্বিতীয় অবস্থানে। এই উঠে আসাকে সংশ্লিষ্ট একটি পক্ষ দেখছেন ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণের পথে একধাপ অগ্রগতি হিসেবে। তবে ঢাকায় এত জনসংখ্যা আছে কিনা তা নিয়েই প্রশ্ন তুলে এই প্রতিষ্ঠানদুটোর বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েই সন্দেহ প্রকাশ করেছেন আইটি সংশ্লিষ্ট অনেকেই।

সম্প্রতি যুক্তরাজ্যভিত্তিক প্রতিষ্ঠান উই আর সোশ্যাল লিমিটেড ও কানাডাভিত্তিক প্রতিষ্ঠান হুটস্যুট ইনকরপোরেশন এক যৌথ প্রতিবেদনে শহরভিত্তিক ফেসবুক ব্যবহারকারীদের সংখ্যার বিচারে ঢাকাকে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম ফেসবুক ব্যবহারকারী শহর হিসেবে ঘোষণা করে। বর্তমান সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণের পথে এ ধরনের স্বীকৃতি অবশ্যই গুরুত্ববহ।

সম্প্রতি প্রকাশিত হুটসুটের র‌্যাংকিংয়ে যেভাবে ঢাকা দ্বিতীয়

এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়, দেশে ইন্টারনেটের প্রসার, মোবাইল ইন্টারনেট তথা থ্রিজির ব্যবহার সহজ হওয়া এবং মোবাইলফোন অপারেটরগুলোর ক্ষেত্রবিশেষে বিনামূল্যে ফেসবুক ব্যবহারের সুবিধা দেওয়া এবং ফেসবুকের ফ্রি বেসিক তথা সাবেক ফ্রি ইন্টারনেট সেবা ইন্টারনেট ডট ওআরজির কারণে ঢাকাসহ সারাদেশে ফেসবুক ব্যবহারকারীদের সংখ্যা বেড়েছে। দেশে মোট ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৫ কোটির বেশি বলে জানা গেছে যা মোট জনসংখ্যার প্রায় এক তৃতীয়াংশ। সম্প্রতি আইসিটি বিভাগের এক অনুষ্ঠানে আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক জানিয়েছেন এ তথ্য।

আবার সংশ্লিষ্ট অপরপক্ষ ‘হিসাবে গোলমাল’ থাকায় বিষয়টিকে মানতে পারছেন না। ফেসবুকের মোট ব্যবহারকারী আর ঢাকার জনসংখ্যার মধ্যে বিস্তর ফারাক থাকায় এই তালিকার কোথাও একটা খটকা রয়েছে বলে তারা মনে করেন। অনেকে প্রতিবেদন প্রকাশকারী প্রতিষ্ঠান দুটির কোনও ধরনের ক্রেডিবিলিটি রয়েছে কিনা এমন প্রশ্নও তুলেছেন।

নতুন এই স্বীকৃতির বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে আইসিটি বিভাগের প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক বাংলা ট্রিবিউনকে আবারও জানান, বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় সোশ্যাল মিডিয়া ফেসবুক শুধু মানুষে মানুষে সংযোগই তৈরি করছে না, বরং এই মাধ্যম এখন ডিজিটাল অর্থনীতির অন্যতম প্ল্যাটফর্মও বটে। প্রতিমন্ত্রী বলেন, আমরা দেশে একটি শক্তিশালী, সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী ইন্টারনেট নেটওয়ার্ক অবকাঠামো গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছি, মেসেঞ্জার বট ব্যবহারের মাধ্যমে ন্যাশনাল ইমার্জেন্সি সার্ভিস (৯৯৯)-সহ সরকারি সেবাগুলোকে ফেসবুক কেন্দ্রিক করা হচ্ছে বলেই ব্যবহারকারীর সংখ্যা বিবেচনায় ঢাকা বৈশ্বিকভাবে ফেসবুকে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। আমি মনে করি, ঢাকার এই অবস্থানের ফলে ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়ন আরও ইতিবাচক গতি পেল। তিনি সবাইকে এই মাধ্যমের ইতিবাচক ব্যবহার ও কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত হওয়ার আহ্বান জানান।

জানতে চাইলে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের সচিব শ্যাম সুন্দর সিকদার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, দেশের মানুষ প্রযুক্তি ব্যবহারে সচেতন হচ্ছেন- এই প্রতিবেদনই তার প্রমাণ। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘সক্রিয় ব্যবহারকারীর দিক দিয়ে ঢাকা দ্বিতীয়’ এই প্রতিবেদন যারা প্রকাশ করেছে তাদের কাছে এই প্রশ্ন করুন যে তারা কিভাবে এটা করেছেন। বরং তারাই ভালো বলতে পারবে এটা (প্রতিবেদনটা) সঠিক কিনা বলেও মন্তব্য করেন টেলিযোগাযোগ সচিব।

শুধু ফেসবুকের কল্যাণেই ঢাকা এই অবস্থান অর্জন এমন নয়, এর আগেও তথ্যপ্রযুক্তিরই আরেকটি শাখা ফ্রিল্যান্সিং আউটসোর্সিংয়ে ওডেস্কের নতুন গন্তব্য হিসেবে ঢাকা শহর তৃতীয় স্থান অর্জন করেছিল। এ টি কারর্নির সূচকেও ভালো অবস্থানে ছিল বাংলাদেশ। তবে যে কোনও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং ওটিটি (ওভার দ্য টপ) সার্ভিস ব্যবহারের ক্ষেত্রে ঢাকা শহরের এই অবস্থান অর্জন নুতন মাইলফলক হিসেবে বিশ্ববাসীর কাছে স্বীকৃতি পাবে বলেও অনেকের আশা।

ঢাকায় ফেসবুকের এ অবস্থানের বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করেন শ্রীলংকাভিত্তিক টেলিযোগাযোগ গবেষণা প্রতিষ্ঠান লার্ন এশিয়ার জ্যেষ্ঠ ফেলো আবু সায়ীদ খান। তিনি বলেন, ‘আগে জানতে হবে কারা এই তথ্য প্রকাশ করেছে, তারা এটা করতে পারে কিনা এবং তাদের কোনও ক্রেডিবিলিটি আছে কিনা।’ তিনি আরও বলেন, ‘ফেসবুক একটা দেশের ন্যাশনাল ইন্ডিকেটর হতে পারে না। অথচ অবস্থাদৃষ্টে তাই মনে হচ্ছে।’ তিনি জানান, আইটিইউ (ইন্টারন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন ইউনিয়ন) –এর কিছু সূচকে মিয়ানমার, কম্বোডিয়ার চেয়েও পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ। সেসব দিকে নজর দেওয়া এখন বেশি জরুরি। 

বাংলাদেশ সম্পর্কে ওই প্রতিবেদনে যা বলা হয়েছে

অভিযোগ রয়েছে, বাংলাদেশের মোট ফেসবুক ব্যবহারকারীর মধ্যে অর্ধেকই ভুয়া বা ফেক আইডি। দেশের ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা যখন ১ কোটি, সোয়া কোটি, দেড় কোটি, পৌনে দুই কোটি এবং আড়াই কোটি তখন বলা হতো এই সংখ্যার অর্ধেকই ভুয়া। মুক্ত সফটওয়্যার নিয়ে আন্দোলনকারী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ওপেন সোর্স নেটওয়ার্ক (বিডিওএসএনএ)-র সূত্রে এমন তথ্য জানা গিয়েছিল। সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক মুনির হাসানের কাছে বিষয়টি জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিষয়টির মধ্যে কোথাও একটা ঘাপলা আছে। কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের মোট ফেসবুক ব্যবহারকারী আড়াই কোটি। এর মধ্যে ৫০ লাখের বেশি আছে ভুয়া আইডি। এর অর্থ হলো কেউ এসব অ্যাকাউন্ট পরিচালনা করে। তাহলে তাদের সংখ্যা কত।

মুনির হাসানের ব্যাখ্যা হলো, ‘যেখানে ঢাকা শহরের মোট জনসংখ্যাই আড়াই কোটি নয় তাহলে এখানে সক্রিয় সোয়া ২ কোটি ব্যবহারকারী হয় কিভাবে?’

তার মতে, বিষয়টি এমন হতে পারে অনেকে আইডি খোলার সময় বিশেষ করে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, রাজশাহী ও খুলনা এলাকার লোক ছাড়া অনেকে নিজের জেলাও ঠিকমতো দিতে পারে না, জেলা বা শহর হিসেবে ঢাকা উল্লেখ করে। এই হিসাবে ঢাকার নাম এসে থাকতে পারে। 

মূলত, ২০১৪ সালের শেষ দিক থেকে দেশে ফেসবুক ব্যবহারকারী সংখ্যার দিক দিয়ে বিশাল এক উল্লম্ফন দেয়। এটা ২০১৫ ও ২০১৬ সালেও অব্যাহত ছিল। এই দুই বছরে কিছু সময় ফেসবুক বন্ধ থাকার কারণে এর প্রচার হয় আরও বেশি। সম্প্রতি সরকারের একটি অঙ্গ শিশুদের পড়াশোনার কথা চিন্তা করে ফেসবুক বন্ধ করা উচিত কিনা সে বিষয়ে অপর একটি অঙ্গের কাছে মতামত চাইলে ফেসবুক ব্যবহারকারীর ইস্যুটি আবারও সামনে চলে আসে। 

এদিকে, দেশের ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন আইএসপিএবির সভাপতি আমিনুল হাকিম মনে করেন, যে সংখ্যার কথা উল্লেখ করে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়েছে তা আসলে বাংলাদেশের সক্রিয় ব্যবহারকারী হয়ে থাকতে পারে। শহর বিবেচনায় ঢাকার নাম বলা হয়েছে। তিনি জানান, ঢাকা শহরে আইএসপিগুলোর ৫৮ লাখ ব্রডব্যান্ড (উচ্চগতি) ইন্টারনেট ব্যবহারকারী রয়েছে। অন্যদিকে দেশে স্মার্টফোন ব্যবহারকারীর সংখ্যা বেড়েছে। ২০১৬ সালে দেশে স্মার্টফোন আমদানি হয়েছে (বৈধ পথে দেশে প্রবেশ করেছে) ৮০ লাখের বেশি। চলতি বছর তা এক কোটি ২০ লাখ ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করছেন বাংলাদেশ মোবাইল ফোন ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএমপিআইএ) -এর সভাপতি রুহুল আলম আল মাহবুব মানিক। তিনি জানান, দেশের অন্য শহরগুলোর চেয়ে ঢাকায় স্মার্টফোন ব্যবহারকারীর সংখ্যা বেশি। ফলে স্বভাবতই ঢাকা শহরে ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যাও বেশি। স্মার্টফোন ব্যবহার বাড়লে ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা আরও বাড়বে বলে তিনি মনে করেন। তিনি বলেন, আড়াই থেকে সাড়ে তিন বা চার হাজার টাকার মোবাইল ফোনে দিব্যি ইন্টারনেট ব্যবহার করা যায়। ফলে ফেসবুক ব্যবহার ঠেকায় কে!

প্রসঙ্গত, টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসির সর্বশেষ হিসাব মতে দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ৭ কোটি।

/টিএন/

সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
ত্রিমুখী তদন্তের ‍মুখে বেবিচকের প্রকৌশলী শরিফুল
ত্রিমুখী তদন্তের ‍মুখে বেবিচকের প্রকৌশলী শরিফুল
শিশুর হাতে স্মার্টফোন: আশীর্বাদ না অভিশাপ? 
শিশুর হাতে স্মার্টফোন: আশীর্বাদ না অভিশাপ? 
পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে কিমের বড় ঘোষণা
পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে কিমের বড় ঘোষণা
শিশু রামিসাকে ধর্ষণের পর হত্যা, রায় রবিবার
শিশু রামিসাকে ধর্ষণের পর হত্যা, রায় রবিবার
সর্বাধিক পঠিত
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
তৃতীয় বিয়ের পিঁড়িতে বসতে যাচ্ছেন আমির খান
তৃতীয় বিয়ের পিঁড়িতে বসতে যাচ্ছেন আমির খান