বিপদের নাম ‘ঝুলন্ত তার’

Send
হিটলার এ. হালিম
প্রকাশিত : ১১:০০, আগস্ট ২৮, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১১:০০, আগস্ট ২৮, ২০২০

ঝুলন্ত তার (ছবি সংগৃহীত)রাজধানীতে ঝুলন্ত তারের (ওভারহেড ক্যাবল) সমস্যা দীর্ঘদিনের। বিভিন্ন সময়ে এই তার নামানোর উদ্যোগ নেওয়া হলেও ঝুলন্ত জঞ্জাল এখনও দূর হয়নি। রাজধানীর সৌন্দর্যবর্ধনে বিদ্যুতের খুঁটিতে বিপজ্জনকভাবে ঝুলে থাকা এসব তার কখনও কখনও সরানো হলেও পরে তা আবার আগের জায়গায় ফিরে আসে। তবে রাজধানীর প্রধান প্রধান সড়কের বিভিন্ন জায়গা থেকে এই তারের জঞ্জাল কিছু সরানোও হয়েছে। এসব ক্যাবলের মধ্যে রয়েছে ল্যান্ডফোনের ক্যাবল, ইন্টারনেট ক্যাবল, ডিশ সংযোগের ক্যাবল ইত্যাদি।

জানা গেছে, ল্যান্ডফোনের ক্যাবলের বিকল্প হিসেবে এসেছে ট্রিপল প্লে সার্ভিস, ইন্টারনেট ক্যাবল নেমে যাচ্ছে ভূগর্ভস্থ ক্যাবল (এনটিটিএন সার্ভিস) লাইনে। ডিশ সংযোগের ক্যাবলও মাটির নিচ দিয়ে দেওয়া হবে এনটিটিএন লাইন ব্যবহার করে। বিটিসিএল সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা শহরের বিভিন্ন জায়গায় ট্রিপল প্লে (এক ক্যাবলে তিন সেবা) সার্ভিস চালু হয়েছে। এনটিটিএন অপারেটর দুটির দাবি ঢাকা শহরের প্রধান প্রধান সড়কে তাদের ভূগর্ভস্থ ক্যাবল লাইন নির্মাণ করেছে। অন্যদিকে ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন আইএসপিএবি বলছে, প্রধান প্রধান সড়কের যেখানে ভূগর্ভস্থ ক্যাবল লাইন আছে সেখানে মাটির নিচ দিয়েই ইন্টারনেট লাইন টানা হচ্ছে। সমস্যা হয়েছে, ছোট ছোট সড়ক ও অলি-গলিতে যেখানে ভূগর্ভস্থ ক্যাবল লাইন নেই, সেখানে ওভারহেড ক্যাবলের মাধ্যমেই সেবা দিতে হচ্ছে। ফলে অনেক জায়গায়ই ঝুলন্ত তার রয়ে গেছে।

সম্প্রতি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এসব অবৈধ ঝুলন্ত তার অপসারণে অভিযান চালালে বিষয়টি আবার সামনে চলে আসে। এর পরপরই ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন ঝুলন্ত তার অপসারণের জন্য ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময় বেঁধে দেয়। এই সময়ের মধ্যে ঝুলন্ত তার অপসারণ না করলে করপোরেশন অভিযান চালাবে বলে ঘোষণা দিয়েছে। অভিযানের পরে আইএসপিএবি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সঙ্গে বৈঠক করেছে। দক্ষিণের মেয়র আইএসপিএবিকে বিকল্প সমাধান নিয়ে সেখানে সেবা দিতে বলেছে। যদিও এরই মধ্যে দক্ষিণের ওইসব এলাকার কিছু কিছু জায়গায় ওভারহেড ক্যাবল রিস্টোর করে ইন্টারনেট সেবা পুনরায় চালু করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত ১৭ আগস্ট ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলীর সঙ্গে আইএসপিএবির বৈঠক হয়। বৈঠকে বিটিআরসির ইঅ্যান্ডও বিভাগের মহাপরিচালক, দুই এনটিটিএন (নেশন ওয়াইড টেলিকমিউশন ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক)-এর প্রতিনিধিসহ আরও অনেকেই ছিলেন। ওই বৈঠকে সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে আইএসপিএবির কাছে জানতে চাওয়া হয়, কেন তারা এখনও ওভারহেড ক্যাবলের মাধ্যমে সেবা দিচ্ছে? জবাবে জানানো হয়, সব জায়গায় এনটিটিএন সার্ভিস না থাকায় তারা ঝুলন্ত ক্যাবলের মাধ্যমে সেবা দেয়। এনটিটিএন প্রতিনিধিরা জানান, সব জায়গায় তাদের সেবা চালু রয়েছে। দুই দিক থেকে দুই রকম কথা আসায় বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, বৈঠক শেষে সবাই সরেজমিন দেখবেন কোথায় কোথায় এনটিটিএন সেবা চালু আছে।

বৈঠক শেষে প্রতিনিধি দল উত্তর সিটি করপোরেশনের উল্টো দিকের বড় ভবনে এলডিপির (লাস্টমাইল ডিস্ট্রিবিউশন পয়েন্ট) খোঁজ করলে জানানো হয়, ওই ভবনে এলডিপি নেই। এরপর গুলশান ২ নম্বরের ল্যান্ডমার্ক ভবনসহ আশেপাশের অন্তত ১০টি ভবনে এলডিপি আছে কিনা খোঁজ করতে গেলে একটি ভবন ছাড়া আরও কোনও ভবনে তা পাওয়া যায়নি। প্রতিনিধি দল সরেজমিন দেখতে গিয়ে প্রধান প্রধান প্রধান সড়কের দুই পাশে অন্তত ৮০-৯০ শতাংশ উঁচু ভবনে এলডিপির দেখা পায়নি বলে বৈঠকের একটি সূত্র এই প্রতিনিধিকে নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, এনটিটিএনগুলোকে ১৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে ভবনগুলোতে এলডিপি তৈরির সময় বেঁধে দিয়েছে উত্তর সিটি করপোরেশন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে এনটিটিএন প্রতিষ্ঠান ফাইবার অ্যাট হোম জানায়, রাজধানীর প্রধান প্রধান সড়কে ১ হাজার ৮০০ কিলোমিটার ভূগর্ভস্থ লাইন তৈরি করেছে প্রতিষ্ঠানটি। এছাড়া মতিঝিল, কাওরানবাজার, নিকেতন, মহাখালী ডিওএইচএস, গুলশান ও বনানী এলাকায় ৬টি এফটিটিএইচ (ফাইবার টু দ্য হোম) তৈরি করে এই সেবা দিচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটির হেড অব গভর্নমেন্ট অ্যাফেয়ার্স আব্বাস ফারুক বলেন, আমরা এনটিটিএন লাইসেন্সিং গাইডলাইন মেনেই রাজধানীর প্রধান প্রধান সড়কে এই লাইন তৈরি করেছি। এছাড়া আমরা সারাদেশের ৮টি বিভাগীয় শহর, ৬৪ জেলা, ৪৯১টি উপজেলা ও ৩ হাজার ৫০টি ইউনিয়নে ৪৮ হাজার ৩০৮ কিলোমিটার ফাইবার অপটিক ক্যাবল লাইন তৈরি করেছি। তিনি আরও বলেন, লাইসেন্সিং গাইড লাইনে উল্লেখিত সময়ের মধ্যেই তার প্রতিষ্ঠান সারাদেশে ক্যাবল লাইন নির্মাণের কাজ শেষ করেছে। আই্এসপিগুলো যদি আমাদের লাইন ব্যবহার না করে তো আমাদের কি করার আছে। এমন না যে তারা ব্যবহার করে না। অনেক জায়গায়ই তো করছে।

আরেকটি এনটিটিএন প্রতিষ্ঠান সামিট কমিউনিকেশন্স লিমিটেড সূত্রে জানা গেছে, প্রতিষ্ঠানটি এরই মধ্যে রাজধানীর ভিআইপি বা মেইন রোডে ১৬৫ কিলোমিটার ক্যাবল লাইন নির্মাণ করেছে। সাব-রোডে ক্যাবল লাইন তৈরি করেছে ২৫৩ কিলোমিটার। আর ১ হাজার ৯৬৫টি বাসাবাড়িতে কানেকশন (এলডিপি) দিয়েছে।

দুই এনটিটিএন অপারেটর এতোকিছু করার পরও ঢাকায় রাস্তার ওপরে ঝুলন্ত তারের জঞ্জাল। কেন সরছে না এসব- জানতে চাইলে আইএসপিএবির সভাপতি আমিনুল হাকিম বলেন, রাজধানীর ভিআইপি, প্রধান প্রধান সড়কের অনেক জায়গা থেকে এরইমধ্যে আমরা ক্যাবল নামিয়ে ফেলেছি, আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে গেছি। যেখানে নামাতে পারিনি সেখানে এনটিটিএন সার্ভিস নেই বা দূরে রয়েছে। সেই দূর থেকে ক্যাবল টেনে নিলে আমাদের ক্যাবল খরচ, লাইনের খরচ, লোকবলের খরচ লাগে এবং এনটিটিএন’র ভাড়া দিতে হয়। ফলে আমাদের খরচও বেশি হয়। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, ধরা যাক একজন গ্রাহক আমাদের কাছ থেকে ইন্টারনেট সেবা নিতে চান কিন্তু এনটিটিএনগুলোর এলডিপি যেখানে সেখান থেকে গ্রাহকের বাসার দূরত্ব দুই বা তিন কিলোমিটার। দেখা গেল আমাদের সংযোগ রয়েছে আর এক কিলোমিটার দূরে। তখন আমরা এনটিটিএন এর কাছ থেকে সেবা না নিয়ে পুরো পথটুকুই ক্যাবল টেনে দিই।

কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, যদি এক কিলোমিটার এনটিটিএন’র সেবা নিই তাহলে ওদের ভাড়া দিতে হবে আবার আমাদের লোকবল ব্যবহার করে ক্যাবলও টানতে হবে। এজন্য আমরা একই লোকবল দিয়ে ক্যাবল টেনে সেবা দিই। এজন্য ঝুলন্ত ক্যাবল ছোট ছোট সড়কে বা গলিতে থেকে যাচ্ছে, সরানো যাচ্ছে না। এছাড়া সব জায়গায় এনটিটিএন সেবা ব্যবহার না করার পেছনে উচ্চ সার্ভিস চার্জও (ব্যান্ডউইথ ট্রান্সমিশন চার্জ) -এর জন্য দায়ী বলে আমিনুল হাকিম মনে করেন। এই চার্জ কম হলে বা নিয়ন্ত্রক সংস্থা (বিটিআরসি) চার্জ বেঁধে দিলে আমাদের পক্ষে সেবা দেওয়া আরও সহজ হতো।

কবে ঢাকা শহর ঝুলন্ত তারের জঞ্জালমুক্ত হবে জানতে চাইলে আইএসপিএবি সভাপতি বলেন, আমাদের এই টার্গেট বা স্বপ্নটা এনটিটিএনগুলোর ওপর নির্ভরশীল। তারা যত তাড়াতাড়ি সব জায়গায় মাটির নিচে লাইন টানতে পারবে আমরাও তত দ্রুত তার নামিয়ে নিতে পারবো।

জানা গেছে, দুটি প্রতিষ্ঠান বাণিজ্যিকভাবে এনটিটিএন সেবা দেয়। বাহন নামে নতুন একটি প্রতিষ্ঠান এনটিটিএন লাইসেন্স পেয়েছে সম্প্রতি। নতুন প্রতিষ্ঠানটির কাজ এখনও দৃশ্যমান নয়। ফলে আইএসপিগুলোকে পুরনো দুই এনটিটিএনর ওপরেই নির্ভর করতে হয়। এই অপারেটর দুটি নিজেরাই দাম ঠিক করে (ব্যান্ডউইথ ট্রান্সমিশন চার্জ) সেবা দিয়ে যাচ্ছে। এনটিটিএন দুটি এবং আইএসপিগুলো দীর্ঘদিন ধরে বিটিআরসির কাছে দাম বেঁধে দেওয়ার আবেদন জানিয়ে এলেও বিষয়টি গত ১০-১১ বছরে আলোর মুখ দেখেনি। বিটিআরসিও গত ৫-৬ বছর ধরে দাম বেঁধে দেওয়া হবে বললেও তা আজও হয়নি।

কয়েক বছর আগে জানা যায়, বিটিআরসি আইটিইউ (ইন্টারন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশ ইউনিয়ন) থেকে একজন পরামর্শক এনে ইন্টারনেটের ‘কস্ট মডেলিং’ -এর উদ্যোগ নিয়েছিল। কিন্তু উদ্যোগের বাস্তবায়ন আজও দেখা যায়নি।

সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, আইটিইউ পরামর্শক এনটিটিএনগুলোর সার্ভিস চার্জ ঠিক করে আইএসপিগুলোকে চার্জ বাড়িয়ে দিতে বলে। এতে করে ইন্টারনেটের দাম বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকায় এনটিটিএন চার্জের দাম বেঁধে দেওয়ার বিষয়টি আর এগোয়নি।

ট্রিপল সার্ভিস চালু করে ক্যাবল সরাচ্ছে বিটিসিএল

রাজধানীতে যেসব ঝুলন্ত তার দেখা যায় এর মধ্যে ল্যান্ডফোনের ক্যাবলও রয়েছে। সরকারের ল্যান্ডফোন (ফিক্সড পিএসটিএন) সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান বিটিসিএল রাজধানীর মিরপুর ডিওএইচএস এলাকায় পাইলট প্রকল্প হিসেবে ট্রিপল প্লে সেবা চালু করে। এক ক্যাবলের মাধ্যমে তিন ধরণের সেবা (ভয়েস, ডাটা তথা ইন্টারনেট ও ভিডিও) চালু করে ঝুলন্ত ক্যাবলের জঞ্জাল কমিয়ে আনারও উদ্যোগ নেয়। বিটিসিএল মিরপুর ডিওএইচএস এলাকার পরে গুলশানসহ যেসব এলাকায় এই সেবা দিচ্ছে সেখানে ভয়েস ও ডাটা চালু করা হয়েছে। ভিডিও তথা আইপি টিভি এখনও চালু হয়নি। এটি চালুর জন্য এরইমধ্যে বিটিসিএল টেন্ডার প্রক্রিয়া শুরু করেছে বলে জানা গেছে।

জানা গেছে রাজধানীর ২১টি এলাকা, ময়মনসিংহ, সিলেট, মৌলভীবাজার ও কক্সবাজারের সদর উপজেলায় এবং চট্টগ্রাম শহরের ১০টি এলাকায় ট্রিপল প্লে সার্ভিস শুরু করেছে বিটিসিএল।

/আরআইজে/

লাইভ

টপ