প্রশান্ত মহাসাগরে শক্তিশালী হচ্ছে এল নিনো। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার (ডব্লিউএমও) পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালের শেষ দিকে এটি শক্তিশালী অবস্থায় পৌঁছাতে পারে এবং ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সক্রিয় থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। এল নিনোর প্রভাবে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের স্বাভাবিক ধরনে পরিবর্তন আসতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে এবার শীতের তীব্রতা কেমন হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। এল নিনোর কারণে শীতের অনুভূতি কম হতে পারে কিনা, সে বিষয়ে অবশ্য নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
এল নিনো একটি প্রাকৃতিক জলবায়ু প্রক্রিয়া। এতে প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্য ও পূর্ব অংশের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় বেড়ে যায়। এর প্রভাবে বায়ুমণ্ডলীয় প্রবাহ ও আবহাওয়ার স্বাভাবিক ধরনে পরিবর্তন আসতে পারে। কোথাও তাপমাত্রা বাড়তে পারে, কোথাও বৃষ্টিপাতের ধরন বদলে যেতে পারে। তবে এর প্রভাব সব দেশ ও অঞ্চলে এক রকম হয় না।
জলবায়ু বিশেষজ্ঞ আইনুন নিশাত মনে করেন, বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির বিষয়টি বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত হলেও এল নিনোর কারণে বাংলাদেশে ঠিক কতটা গরম পড়বে, তা নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব নয়। অন্যদিকে আবহাওয়াবিদ আবুল কালাম মল্লিকের মতে, এল নিনোর প্রভাবে তাপমাত্রার তীব্রতা ও গরমের অনুভূতি বাড়তে পারে। তবে এর প্রভাব অঞ্চলভেদে আলাদা হবে।
শীতের ধরন কি বদলাবে?
এল নিনোর প্রভাবে তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের স্বাভাবিক ধরনে পরিবর্তন আসতে পারে। এর ফলে কোনও কোনও অঞ্চলে স্বাভাবিকের তুলনায় উষ্ণ আবহাওয়া দেখা দিতে পারে। তবে এ পরিস্থিতি বাংলাদেশের শীতকালকে কতটা প্রভাবিত করবে, তা শুধু এল নিনোর উপস্থিতি দিয়ে নিশ্চিত করা যায় না।
আবহাওয়াবিদ আবুল কালাম মল্লিক বলেন, আগামী বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এল নিনো সক্রিয় থাকার পূর্বাভাস রয়েছে। এর প্রভাবে তাপমাত্রার তীব্রতা ও গরমের অনুভূতি বেশি থাকতে পারে। তবে এল নিনোর প্রভাব সব শহর বা দেশে একই রকম হবে না।
তিনি বলেন, এল নিনোর প্রভাবে গ্রীষ্ম ও বর্ষাকালের বাইরেও বছরের বিভিন্ন সময়ে তাপমাত্রা বেশি থাকতে পারে। শীতকালের মেয়াদ কমে আসার পাশাপাশি স্বল্প সময়ে বেশি বৃষ্টিপাতের প্রবণতাও দেখা দিতে পারে। তবে এসব প্রভাবের কোনটি কোন দেশে দেখা দেবে, কিংবা কোনও দেশে একাধিক প্রভাব একসঙ্গে পড়বে কিনা, তা নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।
বৈশ্বিক উষ্ণতার প্রভাবও বিবেচ্য
জলবায়ু বিশেষজ্ঞ আইনুন নিশাত বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বৈশ্বিক উষ্ণতা বাড়ছে। কার্বন নিঃসরণের কারণে দীর্ঘ সময় ধরে তাপমাত্রা বাড়ার প্রবণতা তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে তাপমাত্রা বৃদ্ধির হার সীমিত রাখাই বড় চ্যালেঞ্জ।
এল নিনো ও লা নিনা সম্পর্কে মানুষের ধারণা তৈরি হলেও এই দুই পরিস্থিতি কেন সৃষ্টি হয়, তা নিয়ে আরও বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করেন তিনি। তার ভাষায়, ‘এল নিনো এলে গরম বাড়ে, লা নিনা এলে গরম কমে—এটা সবাই এখন জানে।’
আইনুন নিশাত বলেন, এল নিনো সক্রিয় থাকায় তাপমাত্রা বেশি হতে পারে। তবে এর কারণে বাংলাদেশে ঠিক কতটা গরম পড়বে, তা নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব নয়। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে ভবিষ্যতে তাপমাত্রা আরও বাড়তে পারে বলেও আশঙ্কা রয়েছে।
এদিকে ডব্লিউএমও’র পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, এল নিনো ২০২৬ সালের শেষ দিকে শক্তিশালী অবস্থায় পৌঁছাতে পারে এবং ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সক্রিয় থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। এর প্রভাবে বিভিন্ন অঞ্চলের তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের ধরনে পরিবর্তন আসতে পারে।
এল নিনোর প্রভাব সম্পর্কে আবহাওয়াবিদ মো. বজলুর রশীদ বলেন, জুনের পর থেকেই এল নিনোর শক্তিশালী অবস্থা তৈরি হয়েছে, যার প্রভাব পুরো ভারতীয় অঞ্চলে পড়তে পারে। এর প্রভাবে গ্রীষ্মে অনিয়মিত বৃষ্টি ও স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি তাপমাত্রা দেখা দিতে পারে। শীতেও তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি থাকতে পারে। অক্টোবর এবং অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর সময়ের পূর্বাভাসেও তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকার ইঙ্গিত রয়েছে। একই সময়ে বৃষ্টিপাত কম হতে পারে।
শীতে কেমন থাকতে পারে তাপমাত্রা?
এবার শীত কেমন হবে জানতে চাইলে আবহাওয়াবিদ মো. তরিফুল নেওয়াজ কবির বলেন, নভেম্বরের প্রথম দিকে উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি জেলায় তাপমাত্রা ১৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমে আসতে পারে। নভেম্বরের শেষ দিকে উত্তরাঞ্চলের কোথাও কোথাও শৈত্যপ্রবাহের পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ঢাকায় শীতের অনুভূতি বাড়তে পারে ডিসেম্বর থেকে। এ সময় রাজধানীর তাপমাত্রা ১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নামতে পারে।
তিনি বলেন, আগামী কয়েক মাসে উত্তর ও উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে বাতাস প্রবাহিত হতে পারে। এই বাতাসের প্রবাহ বাড়লে শীতের অনুভূতিও বাড়তে পারে। তবে এসবই সম্ভাব্য পূর্বাভাস, নিশ্চিত তাপমাত্রা নয়। প্রকৃত তাপমাত্রা বাতাসের দিক ও গতি, আকাশের অবস্থা এবং অন্যান্য আবহাওয়াগত পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করবে।
এদিকে হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থিত পঞ্চগড়ে তাপমাত্রা কমতে শুরু করেছে। সোমবার (২৬ অক্টোবর) সকাল ৯টায় তেঁতুলিয়ায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ১৬ দশমিক ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আগের দিন একই সময়ে তা ছিল ১৭ ডিগ্রি।
তেঁতুলিয়া আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জিতেন্দ্রনাথ রায় জানান, রাত ও ভোরে কুয়াশার প্রবণতা বাড়ছে। দিনের তাপমাত্রা তুলনামূলক বেশি থাকায় দিনে গরম এবং রাতে ও ভোরে ঠান্ডা অনুভূত হচ্ছে। আগামী দিনগুলোতে তাপমাত্রা আরও কমলে শীতের অনুভূতি বাড়তে পারে।
শুধু পঞ্চগড় নয়, উত্তরাঞ্চলের অনেক এলাকায় তাপমাত্রা কমছে। এ ছাড়া গ্রামের দিকে ভোরে ও সন্ধ্যায় কুয়াশার দেখা পাওয়া যাচ্ছে। শহরেও সন্ধ্যার পর হিমহিম ভাব এসেছে। তবে দিনের গরম এখনও ভ্যাপসা। ফলে অক্টোবর শেষ হতে চললেও তাপমাত্রা শীতে কতটা কমবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।