আবারও এরশাদ!

Send
আহসান কবির
প্রকাশিত : ১৭:০৭, ডিসেম্বর ১০, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:৩৫, ডিসেম্বর ১০, ২০১৮

আহসান কবিরজাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এরশাদ অভিমান করে আবারও আলোচনায় এসেছেন। তার দলের এক নেতা বলেছেন—‘তিনি সুস্থ আছেন। সিএমএইচে (সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল) চিকিৎসা নিয়েছেন’। এই দলের অন্য আরেক নেতা বলেছেন, ‘তিনি সুস্থ নন। তাকে বিদেশে চিকিৎসা নিতে পাঠানো উচিত!’ মাঝখান থেকে কয়েকটি দৈনিক ও অনলাইনের খবর অনুযায়ী, এরশাদ পার্টি অফিসে গিয়েছিলেন। গাড়ি থেকে নামেননি। ক্ষোভ-অভিমানের কথা উপস্থিত কর্মী-সমর্থকদের সামনে বলে এসেছেন। তার ক্ষোভ অভিমান ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সঙ্গেই। সম্ভবত এখন তার বেশি করে মনে পড়ছে, তিনি বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর ‘বিশেষ দূত’ এবং তার ‘প্রথম’ স্ত্রী রওশন এরশাদ দশম সংসদের বিরোধীদলীয় নেত্রী। অবশ্য জাতীয় পার্টির একজন নেতা এই ঘটনার ইঙ্গিত দিয়ে এরশাদ প্রসঙ্গে  বলেছেন, ‘তার বয়স হয়েছে!’
এরশাদের এই ‘অভিমানের’ দিনকয়েক আগে জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় অফিসে মৃদু ভাঙচুর হয়। (ভাঙচুর ও পুলিশের লাঠিচার্জ সবসময়ে ‘মৃদু’ হয়) একাধিক সূত্রে জানা যায়, প্রায় ২৭-২৮ জন  নেতা মনোনয়ন পাওয়ার জন্য টাকা দিয়েছিলেন এরশাদ  ও জাতীয় পার্টির সাবেক মহাসচিব রুহুল আমিন হাওলাদারকে (২০১৪ সালে জিয়াউদ্দীন বাবলুকে সরিয়ে রুহুল আমিন হাওলাদারকে মহাসচিব বানানো হয়েছিল। বর্তমানে তার স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন মশিউর রহমান রাঙ্গা)। মনোনয়ন না পেয়ে এসব নেতা ও তাদের সমর্থকরা জাতীয় পার্টির অফিস ভাঙচুর করেন। এরপর হঠাৎ করে জানা যায়, এই ‘মনোনয়ন বাণিজ্য’ এবং বিবিধ কারণে রুহুল আমিন হাওলাদারকে মহাসচিব পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, এমনকি পটুয়াখালী-১ আসন থেকে এখন পর্যন্ত তার মনোনয়নপত্র বৈধতা পায়নি!

গত ৪০ বছরে এরশাদ অসংখ্য কারণে আলোচনায় এসেছেন। ২০১৪ সালের জানুয়ারি মাসের নির্বাচনে এরশাদ তার ‘স্বভাবসুলভ পাল্টি’ দিয়ে ভর্তি হয়েছিলেন সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে। সেটা ছিল তার রাজনৈতিক অসুখ।  

দেশে সম্ভবত ‘সবচেয়ে বেশি নিন্দাবাক্য’ রচিত হয়েছে দুজনকে ঘিরে। প্রথমজন মানবতাবিরোধী অপরাধী গোলাম আযম আর দ্বিতীয়জন এরশাদ হোসেন। দ্বিতীয়জন ক্ষমতা দখল করার পর নিজের নাম পরিবর্তন করেছিলেন। এরশাদ হোসেন থেকে ‘হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ’ (হু.মু. এরশাদ) হয়েছিলেন।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে এরশাদ ছিলেন ‘পাকিস্তান প্রত্যাগত অফিসার’। ১৯৭১ সালের শুরুতে এরশাদ ছুটিতে বাংলাদেশে এসেছিলেন। পরে রংপুর হয়ে তিনি পাকিস্তানে ফিরে যান।

বাংলাদেশে ফেরার পর এরশাদের সেনাবাহিনীতে প্রত্যাবর্তনের ঘটনায় অনেকেই নাজিউর রহমান মঞ্জুরের কথা বলে থাকেন। তার জন্যই নাকি বঙ্গবন্ধুর আমলে এরশাদ চাকরি ফিরে পেয়েছিলেন। পরে তিনি একটি কোর্সে ভারত যান। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের সময় তিনি হঠাৎ করে দেশে এসেছিলেন, পরে আবারও ভারতে কোর্সে ফিরে যান। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডকে ঘিরে অনেক কথা প্রচলিত আছে। জেনারেল মঞ্জুর হত্যা মামলার কোনও সুরাহা এখনও হয়নি, যার আসামি এরশাদ নিজেই।

এরশাদের আরও কিছু রেকর্ড আছে। ১৯৮২ সালে সামরিক শাসক হিসেবে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের শুরুতে রাষ্ট্রীয় সব মিডিয়াও দখল করে নিয়েছিলেন। দখলের কয়েক মাস আগে সাপ্তাহিক ‘বিচিত্রা’য় এক সাক্ষাৎকার দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনায় সামরিক বাহিনীর অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছিলেন। সেনাবাহিনী প্রধান হিসেবে সরাসরি এমন সাক্ষাৎকার দেওয়ার নিয়ম না থাকলেও এরশাদ থোড়াই কেয়ার করেছিলেন এবং ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ ক্ষমতা দখলের পর তৎকালীন নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি এম এ সাত্তারের নামে একটি সংবাদ বিভিন্ন পত্রিকা ও বাংলাদেশ টেলিভিশনে পাঠানো হয়, যার শিরোনাম ছিল ‘মার্শাল ল’ ছাড়া গত্যন্তর ছিল না। এম এ সাত্তার এমন কথা বলতে পারেন? অনেকেরই সন্দেহ ছিল। পরে একাধিকবার এম এ সাত্তার বলেছেন, জোর করে এই সংবাদ মিডিয়ায় প্রচার করিয়েছিলেন এরশাদ নিজে! জেনারেল মঞ্জুর হত্যার পর ‘কতিপয় উত্তেজিত জনতা ও সৈনিকের হাতে মঞ্জুরের মৃত্যু’ এই শিরোনামের খবর প্রচারের পেছনেও এরশাদ সাহেবের হাত ছিল।

তবে ‘হারানোর’ রেকর্ডও আছে এরশাদের। ক্ষমতায় আসার পর মিডিয়া দখল করে এরশাদ আত্মপ্রচারে নামেন এবং ক্রমশ কবি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। ১৯৯০-এর ছয় ডিসেম্বর ক্ষমতা হারানোর পরে এরশাদ দীর্ঘদিন জেল খাটেন। কবিতার জন্য জেল অনেক ভালো জায়গা। নাজিম হিকমতের ‘জেলখানার চিঠি’ কবিতা সারা পৃথিবীতে তুমুল জনপ্রিয়। তবে এরশাদই একমাত্র কবি, যিনি ক্ষমতা হারানোর সঙ্গে সঙ্গে কবিতা লেখার ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলেন। অনেকেই বলতেন, এরশাদের হয়ে কবিতাগুলো অনেকেই লিখে দিতেন। এই কবিতা নিয়েই এরশাদকে ঘিরে সবচেয়ে মজাদার কৌতুক ছিল। জাতিসংঘে সভা চলছে। উপস্থিত আছেন বুশ সিনিয়র, রাশিয়ার গর্বাচেভ ও বাংলাদেশের পক্ষে ‘মহান’ এরশাদ। সভার মাঝখানে এক পাগল ঢুকে পড়লো। বুশ উঠে পাগলকে সরে যেতে বললেন। পাগল উল্টো তেড়ে এলো। বুশ সরে গেলে গর্বাচেভ পাগলকে তাড়ানোর চেষ্টা করলেন। পাগল গেলো না। এরপর এরশাদ উঠে পাগলের কানে কানে কী যেন বললেন। পাগল দিলো ভো দৌড়! কীভাবে সম্ভব হলো? জানতে চাইলেন বুশ ও গর্বাচেভ। এরশাদ বললেন, পাগলকে কানে কানে বলেছিলাম আমার একটা কবিতা শুনবে? তারপর কী ঘটলো দেখলেনই তো।

তারপরও ‘স্বৈরাচার ও বিশ্ববেহায়া’ খ্যাত  (বিশ্ববেহায়া নামটি দিয়েছিলেন পটুয়া কামরুল হাসান) এরশাদের দল জাতীয় পার্টি ১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩৫টি আসন পায় এবং এরশাদ ৫টি আসনে জয়লাভ করেন। শুধু  রংপুর বিভাগে ৩৩টি আসন পাওয়ার কারণে এটাকে রংপুরের দল হিসেবেই অনেকে অভিহিত করতেন। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে জাতীয় পার্টি ৩২ আসন লাভ করে এবং আওয়ামী লীগকে সমর্থন দিলে ২১ বছর পর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফিরতে সক্ষম হয়। ২০০১ সালে নাজিউর রহমান মঞ্জু দল ভেঙে বিএনপির সঙ্গে চারদলীয় জোটে যোগ দেন এবং এরশাদ তার জাতীয় পার্টি নিয়ে আলাদাভাবে নির্বাচন করলে এরশাদের জাতীয় পার্টি মাত্র ১৪টি আসন পায়। এরপর এরশাদ নিজেই ঘোষণা দেন ‘একা একা নির্বাচন করাটা ভুল’ ছিল। তবে তার এই ভুলের জন্য লাভবান হয়েছিল বিএনপি এবং জেলখানা থেকে তিনি নিজেকে দূরে রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন। এরপর বাতাস বদলাতে থাকলে এরশাদ আবারও ডিগবাজি খান এবং ২০০৯-এর ডিসেম্বর মাসের সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মহাজোটের শরিক হিসেবে জাতীয় পার্টি ২৯টি (পরে এরশাদের ছেড়ে দেওয়া দুটো আসনের উপনির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী জয়লাভ করে) আসন পায়। এবারের  নির্বাচনে মহাজোট থেকে তার দলকে ২৭টি আসন ছাড় দিয়েছে।

তারপরও তিনি এরশাদ। জাতীয় পার্টির কোনও কোনও নেতার মতে, ‘তার বয়স’ হলেও বিদিশার লেখা বই ‘শত্রুর সাথে বসবাস’- এর ভাষ্য অনুযায়ী ‘এরশাদ বৃদ্ধ কিন্তু সক্ষম!’ এই সক্ষমতার কারণে স্বৈরাচারের সব বৈশিষ্ট্য ধারণ করেও তিনি রাজনীতিতে টিকে আছেন। কারও কারও মতে তিনি ‘ফ্যাক্টর’, কারও কারও মতে ‘এরশাদ সিনড্রোম’।

দুর্ভাগ্য এই যে, প্রধান দুই রাজনৈতিক দল ও শক্তির কারণে স্বাধীনতার প্রায় অর্ধশতাব্দী পরেও রাজনীতি থেকে স্বৈরাচার ও রাজাকারদের (প্রধানত দলগতভাবে জামায়াতে ইসলামী) বিতাড়িত করা যায়নি।

লেখক: রম্যলেখক

/এসএএস/এমএনএইচ/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ