জামায়াত-বিএনপি: নতুন আলোচনার নেপথ্যে (পর্ব ১)

Send
মাসুদা ভাট্টি
প্রকাশিত : ১৫:৪৩, ফেব্রুয়ারি ১৮, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:৪৪, ফেব্রুয়ারি ১৮, ২০১৯

মাসুদা ভাট্টিজামায়াত ইসলামী আবার আলোচনায়– এবারের আলোচনা অবশ্য একটু ভিন্নরকম। এর আগে মওদুদীবাদ নামের কট্টরপন্থী ইসলাম প্রতিষ্ঠা, স্বাধীনতা যুদ্ধে পাকিস্তানের সহযোগিতায় বাঙালি নিধন,স্বাধীন বাংলাদেশে সুকৌশলে রাজনীতিতে ফিরে এসে রগ কাটার রাজনীতির প্রচলন, ২০০১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকাকে কলঙ্কিত করা এবং তারপর নিজেদের জন্য একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক-অর্থনীতি (পড়ুন জামায়াত-অর্থনীতি) গঠন– ইত্যাদি বিষয় নিয়ে সারাক্ষণ আলোচনায় থাকলেও যুদ্ধাপরাধের বিচার শুরুর পর থেকে জামায়াতে ইসলামী ক্রমাগত কোণঠাসা হতে হতে এখন আলোচনা চলছে এর বিলুপ্তি কিংবা নতুন নামে ফিরে আসার বিষয়ে। এ বিষয়ে আলোচনার আরো সময় পাওয়া যাবে কারণ কোনোভাবেই জামায়াতে ইসলামী এদেশে বিলুপ্ত হচ্ছে না বা হওয়ার কোনও কারণ নেই (কেন কারণ নেই সে কথাই আলোচনা করতে চাইছি), ফলে আরও অনেকদিন এ নিয়ে আলোচনা চলবে কিন্তু সবার আগে আমাদের আলোচনা শুরু করা উচিত কী করে এদেশে জামায়াতে ইসলামী এখনও টিকে আছে এবং কেনই বা এতদিন পরে এসে বাঘা বাঘা জামায়াত নেতাদের স্বাধীনতা বা মুক্তিযুদ্ধ প্রশ্নে এতটা সত্যবোধ জেগে উঠলো আর রাতারাতি তারা দেশবাসীর কাছে ক্ষমা চাওয়ার প্রশ্নে উদার হয়ে উঠলেন?

জামায়াতের জন্মপ্রশ্নে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। তাদের রাজনীতি নিয়েও আজকে আলোচনা করতে চাই না। কেবলমাত্র ১৯৭১ প্রশ্নে জামায়াত ইসলামীকে স্বাধীন বাংলাদেশে জামায়াতের রাজনীতিকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল বঙ্গবন্ধুর আমলেই। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার ভেতর দিয়ে জামায়াতের আবার ফিরে আসা ও রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসীন হওয়ার ভেতরই নিহিত রয়েছে এদেশে জামায়াতের রাজনীতির মূল সমীকরণ। এই সমীকরণটি বুঝতে পারলেই জামায়াতকে নিয়ে বর্তমান আলোচনা এবং জামায়াতের ভবিষ্যৎ রাজনীতি সবই বুঝতে সহজতর হওয়ার কথা। কিন্তু অনেকেই দেখছি আশাবাদী হয়ে উঠছেন যে, একাত্তরের জন্য (একাত্তরের কীসের জন্য সে কথা জামায়াত-নেতারা কেউই কিন্তু একবারও বলেননি) ক্ষমা চেয়ে জামায়াত নতুন নামে রাজনীতি করলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। মজার ব্যাপার হলো, জামায়াত তো একাত্তরে কোনও অপরাধ করেছে বলে কখনও মনে করেনি, এখনও করে না। এমনকি পদত্যাগী জামায়াত-নেতা ব্যারিস্টার রাজ্জাক এই সেদিনও যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত জামায়াতের নেতাদের বাঁচানোর জন্য মামলা লড়েছেন; লর্ড কার্লাইল, টবি ক্যাডম্যান, ডেভিড বার্গম্যানসহ ক্যাথি ক্যাসিডি নামের প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে দেশে-বিদেশে লবিং চালিয়েছেন অভিযুক্তদের বাঁচানোর জন্য, শেখ হাসিনা সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টির জন্য। আজ হঠাৎ করে রাজ্জাক সাহেবের এরকম কয়েক হাজার ডিগ্রি ঘুরে যাওয়ার ব্যাপারটা এ কারণেই বিস্ময়কর যে,সময় ও পরিস্থিতি বিচারে তার এই ঘুরে যাওয়া আসলে নতুন কৌশলেরই ইঙ্গিত করে,এর বাইরে কিছু নয়।

কিন্তু একাত্তরের ওপর ভয়ঙ্কর স্বাধীনতা ও মানবতাবিরোধী ভূমিকার পরও জামায়াতকে কেন এদেশের রাজনীতিতে প্রয়োজন হয়েছিল, সে প্রশ্ন কি আমরা কেউ তুলেছি? আসুন তোলা যাক এই প্রশ্নটি। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর বাংলাদেশে চর দখল চলছে, যে যখন পারছে ‘দেশটা তার’ বলে ঘোষণা দিচ্ছে। বঙ্গভবন থেকে ক্যান্টনমেন্ট পর্যন্ত ট্যাঙ্কের আনাগোনা তখন নিত্যনৈমিত্যিক ব্যাপার। কিন্তু যে মুহূর্তে সামরিক আইন জারি করা হয় এবং জিয়াউর রহমান রাজনীতি করার জন্য দল গঠনের আয়োজন করেন তখন পাকিস্তান ও লন্ডনে নির্বাসিত থাকা নিষিদ্ধ জামায়াতে ইসলামীকে দেশে ফিরিয়ে আনার প্রয়োজন এই কারণেই পড়ে যে, জিয়াউর রহমানের রাজনীতি আসলে জামায়াতেরই রাজনীতি। তিনি সরাসরি মওদুদীবাদকে গ্রহণ করেছেন বলে ঘোষণা দেননি কিন্তু তিনি বহুদলীয় গণতন্ত্রের নামে যে রাজনীতিটি শুরু করলেন তার সঙ্গে জামায়াতের রাজনীতির মৌলিক পার্থক্য সামান্যই। বরং যেটুকু পার্থক্য দলীয় গঠনতন্ত্রে ছিল সেটুকুকে ঢাকার জন্য তিনি জামায়াতকে কেবল রাজনীতির সুযোগ নয়, রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা ও বিদেশি অর্থের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিতেও জিয়াউর রহমানের সরকার সহযোগিতা করেছে। নাহলে যে বিশাল অর্থনৈতিক সাম্রাজ্য জামায়াত এদেশে গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছিল তা সম্ভবপর হতো না। শেখ হাসিনা সরকারের মাত্র দুই আমলেই জামায়াতের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এই ধস নামতে পারলে রাষ্ট্রীয় ও সরকার দলীয় পৃষ্ঠপোষকতাতেই যে ‘৭৫ পরবর্তী বাংলাদেশে জামায়াতের শনৈ শনৈ উত্থান ঘটেছিল তাতে কেউ সন্দেহ প্রকাশ করলে তার ভূমিকা নিয়েই প্রশ্ন তুলতে হবে। এরশাদ-বিরোধী আন্দোলনে বিএনপি ও আওয়ামী লীগকে আমরা সক্রিয় থাকতে দেখি, আওয়ামী লীগ গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনা ও স্বাধীনতার চেতনা প্রতিষ্ঠার জন্য এই আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছে, অপরদিকে বিএনপি মূলত জিয়াউর রহমানের হাত থেকে জেনারেল এরশাদেও ক্ষমতা গ্রহণের দুঃখ এবং সেই ক্ষমতা ফেরানোর জন্যই এই আন্দোলনে ছিল। কিন্তু এরশাদ-বিরোধী আন্দোলনে জামায়াতের ভূমিকা কতটুকু কী ছিল সে-তো আমাদের জ্ঞাত ইতিহাস, অতএব মিথ্যাচারের কোনও সুযোগ নেই।

বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে যারা সামান্য জ্ঞান রাখেন তারা কি স্মরণ করতে পারেন যে, বিএনপি’র সঙ্গে কখনও জামায়াতের কোনও টানাপড়েন চলেছিল? অনেকেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রণয়নে আওয়ামী লীগের সঙ্গে জামায়াতের আন্দোলন-সহযোগী হওয়ার গল্প শোনাবেন। কিন্তু এ ব্যাপারে যদি কেউ এই প্রশ্ন তোলেন যে, জামায়াত তখন বিএনপি’র বিরোধিতা করেছিল যে উদ্দেশ্য নিয়ে তা আর কিছুই নয়, বিএনপি’র সঙ্গে দরকষাকষিতে ঠিক বনছিল না বলেই, এর সঙ্গে বিএনপি-বিরোধিতা আসলে ছিল না। বিরোধিতার কোনও কারণ থাকারও কারণ নেই, কারণ গোলাম আজমের নাগরিকত্ব হয়েছে বিএনপি’র আমলে এবং সেই আন্দোলন চরমভাবে ব্যর্থ করে দিয়েছে বিএনপি সরকার। আর সেই আন্দোলন ব্যর্থ হওয়ার ফলেই সংসদে জামায়াতের এতগুলো এমপি জয়লাভ করেছে, জামায়াতের রাজনীতির শেকড় আরও দূরে প্রোথিত হয়েছে। সে কারণে বিএনপি’র বিরুদ্ধে জামায়াতের সে আন্দোলন যে লোক দেখানো ছিল তাতে সন্দেহের অবকাশ কম। কিন্তু তারপর থেকে বিএনপি এবং জামায়াত ‘এক মায়ের পেটের দুই সন্তান’ বলে যে প্রচরাণা বিএনপি’র শীর্ষ নেতৃত্ব থেকে নবীন নেতা-নেত্রীদের প্রচারণা তা তো আর গোপন নেই। এর কারণ তাহলে কী? এর কারণ এটাই যে, বিএনপি ও জামায়াত আসলে একটিই রাজনৈতিক পক্ষ, দুই নামে দু’টি রাজনৈতিক দল মাত্র। এতে সুবিধে কী? এতে সুবিধে হলো, বিএনপি করবে রাজনীতি (মুখে মুক্তিযুদ্ধ বগলে পাকিস্তান) আর জামায়াত জোগান থেকে অর্থ, অস্ত্র এবং বিদেশি সমর্থন। ফলে দু’য়ে মিলে যে অক্ষশক্তি তৈরি হয় তাদেরকে টেক্কা দেওয়ার ক্ষমতা বাংলাদেশের আর কোনও রাজননৈতিক দলের কখনও হবে না, এমনটিই ভাবা গিয়েছিল ২০০৮ সাল পর্যন্ত। ১/১১-র ধাক্কা প্রতিটি রাজনৈতিক দলের গায়েই কম-বেশি লেগেছে কিন্তু জামায়াতের শরীরে ফুলের টোকাও পড়েনি। কিন্তু জনগণ অবাধে ভোট দিতে পারলে যে, তারা জামায়াতকে অস্বীকার শুধু নয়, জামায়াতের সঙ্গী বিএনপি’কেও লজ্জায় ফেলে দেয় তার প্রমাণ আমরা পেলাম ২০০৮ সালের নির্বাচনে। তারপর থেকেই জামায়াতের পতন ঠেকানো দুরূহ হয়ে পড়েছে। শীর্ষ জামায়াত নেতাদের ফাঁসি কার্যকর হওয়ার পর জামায়াতের অর্থনীতিতে ধস নামা শুধু জামায়াতের রাজনীতিকে দুর্বল করেছে তা নয়, আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, বিএনপি-রাজনীতিরও মরণদশা হয়েছে জামায়াতের দুর্বল হয়ে যাওয়ার ফলস্বরূপ। ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে কিন্তু এই নির্বাচন আরও প্রমাণ করে দিয়েছে যে, এদেশে একযোগে বিএনপি-জামায়াত নামক অক্ষশক্তিকে মানুষ অগ্রাহ্য করতে শিখেছে। আর সেই উপলব্ধি থেকেই একে একে খসে পড়তে শুরু করেছে জামায়াতের শীর্ষ পর্যায়ের নেতৃত্ব। একদিকে জামায়াতের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, পেশিশক্তির পড়তি, সঙ্গে বাই-ডিফল্ট বিএনপি-রাজনীতির করুণ পরিণতি বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি নতুন পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি করেছে। আর সেই সুযোগ জামায়াতের মতো সুযোগ-সন্ধানী রাজনৈতিক দল গ্রহণ করবে না, সেটা হতেই পারে না।

আর এই সুযোগ গ্রহণের সুযোগ নিতেই যে, ব্যারিস্টার রাজ্জাকসহ জামায়াত ইসলামীর শীর্ষ ও শিক্ষিত নেতৃত্ব হঠাৎ করে ১৯৭১ সালের জন্য ‘ক্ষমা’ চেয়ে নতুনভাবে জামায়াতকে সাজাতে (প্রয়োজনে নতুন নামে) চাইছে তাতে কোনও সন্দেহ নেই। কিন্তু আমরা কী করে ভুলবো যে, গোলাম আজমের নাগরিকত্ব আন্দোলনে গণ-আদালতে অংশগ্রহণকারীদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহী মামলা করেছিল বিএনপি, এবং শহীদ জননী জাহানারা ইমামকে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা মাথায় নিয়েই মারা যেতে হয়েছিল। সুতরাং, জামায়াতের বোধোদয় হয়েছে কী হয়নি সে প্রশ্ন নিরসনের আগে জামায়াতের দোসর বিএনপি কী ভাবছে তা জানাটাও জরুরি। এককে বাদ দিয়ে আরেককে নিয়ে ভাবার সময় এখনও আসেনি। কিন্তু হঠাৎ কেন জামায়াত প্রসঙ্গে দেশের শীর্ষ দৈনিকের প্রতিদিন ‘হেডলাইন’ হচ্ছে এবং জামায়াতের নতুন নামকরণ নিয়ে কথা উঠছে, কেনই বা বিএনপি এ ব্যাপারে একেবারে নিশ্চুপ, সে সম্পর্কিত বিশ্লেষণও আমাদের বোঝার দরকার আছে– এসব নিয়েই পরবর্তী কিস্তিতে লেখাটি শেষ করতে চাই।

লেখক: দৈনিক আমাদের নতুন সময়ের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক। 

 

/এসএএস/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ