বাংলা ট্রিবিউনকে একান্ত সাক্ষাৎকার ইসলামি গণবিপ্লব ঘটাতে চাই: মুফতি ফয়জুল্লাহ

Send
চৌধুরী আকবর হোসেন
প্রকাশিত : ১৯:২৮, জানুয়ারি ১২, ২০১৬ | সর্বশেষ আপডেট : ২১:৫৩, জানুয়ারি ১২, ২০১৬

মুফতি ফয়জুল্লাহমুফতি ফয়জুল্লাহ—সমকালীন ধর্মভিত্তিক রাজনীতিতে আলোচিত ব্যক্তিদের একজন। নিজের প্রভাব ও রাজনৈতিক দর্শন দিয়ে ইতোমধ্যে নিজকে দলে নির্ভরযোগ্য-প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সক্রিয় থেকে সমকালীন চিন্তার সঙ্গে নিজেকে প্রতিনিয়ত যুক্ত রেখেছেন। সম্প্রতি ইসলামী ঐক্যজোট দীর্ঘদিনের জোটবন্ধু বিএনপির সঙ্গ ত্যাগ করার পেছনে তার ইচ্ছারও প্রাধান্য ছিল চোখে পড়ার মতো। তবে,  তিনি মনে করেন, দলের সবার আগ্রহ আর স্বতন্ত্র ইসলামিক রাজনৈতিক ধারা সৃষ্টির জন্যেই বিএনপি-জামায়াতের সঙ্গ ছেড়েছে ইসলামী ঐক্যজোট।

ইসলামী ঐক্যজোটের  সাবেক চেয়ারম্যান প্রয়াত ‍মুফতি ফজলুল হক আমিনীর মৃত্যুর পর মুফতি ফয়জুল্লাহ ২০১৩ সালের ৯ জানুয়ারি মহাসচিব পদে নির্বাচিত হন। ৭ জানুয়ারি বিএনপি ত্যাগের দিনটিতে অনুষ্ঠিত ত্রিবার্ষিক কনভেনশনে ফের ইসলামী ঐক্যজোটের মহাসচিব নির্বাচিত হয়েছেন তিনি। পাশপাশি হেফাজতের  যুগ্ম-মহাসচিবের দায়িত্বও পালন করছেন। ৯ জানুয়ারি শনিবার দুপুরে রাজধানীর লালবাগে জামিয়া কোরআনিয়া মাদ্রাসায় বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে একান্ত আলাপকালে নিজ দলের মুখ্য উদ্দেশ্য সম্পর্কে নিজের মত জানান  ইসলামী ঐক্যজোটের মহাসচিব মুফতি ফয়জুল্লাহ।

বাংলা ট্রিবিউন: আপনার বিএনপি জোট ছাড়লেন কেন? 

মুফতি ফয়জুল্লাহ: আমাদের কনভেনশনে বলা হয়েছে, ‘ইসলামী ঐক্যজোট ঘোষণা করছে যে, ২০ দলের সঙ্গে আমাদের কোনও সম্পর্ক নেই।’ আমরা এ কথার মধ্যেই আছি। কী বলেছি,সেটা বুঝে নিতে হবে। জোট ছাড়া, অমুক-তমুক—এসব বলিনি। আল্লাহর জমিনে আল্লাহর দ্বিন কায়েম করার যে মিশন ইসলামী ঐক্য জোটের, তা এগিয়ে নেওয়ার জন্য স্বতন্ত্রভাবে এবং বৃহত্তর ঐক্যের জন্য বিভ্ন্নি ইসলামি ব্যক্তিত্ব,সংগঠনকে সমন্বিত করে একটি প্লাটফর্ম গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে কনভেনশনে।

বাংলা ট্রিবিউন: এই ঐক্যের রূপরেখা কেমন হবে?

মুফতি ফয়জুল্লাহ: আমরা ইসলামি গণবিপ্লব ঘটাতে চাই। এ জন্য রাজনৈতিক ঐক্য প্রয়োজন। যারা ইসলামি গণবিপ্লবে আমাদের সঙ্গী হতে চান, আমরা তাদের সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে যেতে চাই। যেসব দল, সংস্থা ও ব্যক্তিত্ব দেশে ইসলাম কায়েমে সংকল্পবদ্ধ, আমরা তাদের নিয়ে বৃহৎ একটি ঐক্য গড়ে তুলতে চাই। এ নিয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলেছি। নতুন নামে এ জোটের আত্মপ্রকাশ হবে। এটা সময়ের সীমা রেখায় বেঁধে হবে না।

বাংলা ট্রিবিউন: ভবিষৎতে অন্য কোনও জোটে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে?

মুফতি ফয়জুল্লাহ: এ ক্ষেত্রে পরিষ্কার করে বলব, ইসলামী ঐক্য জোট আওয়ামী লীগের সঙ্গেও নেই, বিএনপির সঙ্গেও নেই। আর আওয়ামী লীগের সঙ্গে ইসলামী ঐক্যজোটের কোনওভাবেই ঐক্য হতে পারে না। বরং আওয়ামী লীগকে বলব, তারা যেন ইসলামবিদ্বেষী উগ্র-নাস্তিক্যবাদী মুরতাদদের সঙ্গে বন্ধুত্ব ত্যাগ করে। একইসঙ্গে সব রাজনৈতিক দলের প্রতি আহ্বান জানাব, তারা যেন ইসলামের পক্ষে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করে।

বাংলা ট্রিবিউন: দীর্ঘদিনের জোটের রাজনীতি ছেড়ে ঐক্যজোটের ভবিষৎ রাজনৈতিক পরিকল্পনা কী?

মুফতি ফয়জুল্লাহ: আমাদের নির্দিষ্ট লক্ষ্য হচ্ছে এ দেশে ইসলামি হুকুমাত কায়েম করা। ইসলামি হুকুমাত কায়েমের মাধ্যমে দেশের স্বাধীনতা, অখণ্ডতা রক্ষা করা। এছাড়া, দেশের সুনাম বৃদ্ধি, মানবধিকার, মানবিক মর্যাদা, সাম্য, ইনসাফ কায়েম করা। দেশেরে উন্নতি, সমৃদ্ধি ও মানবতার কল্যাণ সাধন করা। মজলুমের অধিকার প্রতিষ্ঠা, জুলুম বন্ধ করা, মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা, নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধ, দারিদ্র্য বিমোচনসহ সর্বস্তরেরে মানুষের কল্যাণ সাধন। এই কাজগুলোর জন্য শক্তি ও সাংগঠনিক ভিত্তি প্রয়োজন।এ জন্য তৃণমূল থেকে সর্বোচ্চ পর্যায়পর্যন্ত ইসলামী ঐক্যজোটকে নুতন আঙ্গিকে সাজিয়ে বাস্তবতার নিরিখে পরিকল্পনা করে সামনে আগাতে হবে।  ইসলামী ঐক্যজোট পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে স্বাধীন, পরনির্ভরশীল নয়। বৃহৎ একটি ঐক্য গড়ে তুলতে চাই।

বাংলা ট্রিবিউন: এই পরিকল্পনা কিভাবে বাস্তবায়ন করবেন ?

মুফতি ফয়জুল্লাহ: আমাদের শীর্ষ আলেমদের দোয়া ও পরামর্শ নিয়ে ধীরে-ধীরে নতুন প্রজন্মকে নেতৃত্বে নিয়ে আসা হবে। নতুন নেতৃত্ব শৃঙ্খলা ও শান্তিপূর্ণ উপায়ে মানুষকে ইসলামের পথে আহ্বান করবে। আলোকিত মানুষ গড়ে তুলবে। সমাজ ও রাষ্ট্র গড়তে শান্তিপূর্ণ ইসলামি গণবিপ্লব সংগঠিত করবে।

বাংলা ট্রিবিউন: দেশের কথা বলছেন, কিন্তু বরাবরই ধর্মীয় ইস্যু ছাড়া জাতীয় ইস্যুতে ধর্মভিত্তিক দলগুলোর কর্মসূচি কম, সেটা কেন?

মুফতি ফয়জুল্লাহ: প্রথমত, আমাদের রাজনীতি ধর্মীয় রাজনীতি, ধর্ম আমাদের বলে, এ জন্য রাজনীতি করি। কিন্তু আমাদের কর্মসূচি কম নয়। আমাদের সব বিষয়ে কর্মকাণ্ড থাকে। কিন্তু দেখা যায়, ধর্মীয় ইস্যুর কর্মসূচি বেশি আলোচিত হয়। অন্য ইস্যু কম আলোচনায় আসে বলে অনেকে মনে করেন আমরা দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে কথা বলি না। দ্বিতীয়ত, আমরা যে কারণে ইসলামের পক্ষে সোচ্চার, তাহলো আমাদের দেশের স্বাধীনতা, স্বাভৌমত্ব, অখণ্ডতা নির্ভর করে এ দেশের ইসলাম ও মুসলমান টিকে থাকার ওপর। এদেশে যতদিন ইসলাম, ইসলামি সভ্যতা-সংস্কৃতি বজায় থাকবে, ততদিন এ দেশে স্বাধীনতা, স্বাভৌমত্ব টিকে থাকবে। এ জন্য আমরা সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেই ইসলাম ও মুসলমানিত্বের ওপর। 

বাংলা ট্রিবিউন: দীর্ঘ দিনের জোট থেকে সরে আসায় দলের ভেতরে বিরূপ প্রভাব পড়বে বলে মনে করেন?

মুফতি ফয়জুল্লাহ: এ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগেসারাদেশের নেতা-কর্মীদের মতামত নিয়েছি। আলেমদের সঙ্গে কথা বলেছি। মুরব্বিদের সঙ্গে কথা বলেছি। সবার মতামত নিয়ে মজলিসে শূরায় আলাপ-আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এখন আমরা দলের জন্য অনেক বেশি সময় দিতে পারব। বেশি সময় দেওয়ার ফলে বেশি  মেধা ও শ্রম দলে দেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। দলের গতি তরান্বিত হবে, দল এগিয়ে যাবে। ইসলামী ঐক্যজোটের কর্মসূচি আরও বেশি গণমানুষের কাছে পৌঁছানো যাবে। ফলে দলের ভেতরে বিরূপ প্রভাব পড়ার পরিবর্তে দলের গতি বৃদ্ধি পাবে।

বাংলা ট্রিবিউন: আপনারা আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিটি আসনেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার কথা ঘোষণা দিয়েছেন, সেটা কি সম্ভব হবে?

মুফতি ফয়জুল্লাহ: আমাদের ৬৪টি জেলায় কমিটি আছে।আমরা এতদিন জোটে ছিলাম বলে জোটের সিদ্ধান্তের বাইরে প্রার্থী দিতে পারিনি। এখন আমাদের চেষ্টা থাকবে প্রতিটি আসনে প্রার্থী দেওয়ার। প্রত্যেক জেলায় সফর করেছি। সব জেলার মধ্যে কর্মক্ষম ও দক্ষ লোকদের নিয়ে অগ্রসর হব।

বাংলা ট্রিবিউন: আপনারা কনভেনশনে জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতির বিরোধিতা করেছেন, কিন্তু কেন?

মুফতি ফয়জুল্লাহ: আমরা নারীর উন্নয়নের বিরোধী নই। আমরা আগেও বলেছি, এখনও বলতে চাই, জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতির মধ্যে ইসলামবিরোধী ধারাগুলো  বাতিল করতে হবে। কোন-কোন ধারা ইসলামের সঙ্গে সাংঘর্ষিক, তাও সরকারকে ২০১১ সালে লিখিত আকারে দিয়েছি। আমরা মনে করি, কোরআন, সুন্নাহর সঙ্গে বিরোধী ধারাগুলো বাতিল করে প্রকৃত অর্থে নারীর মর্যাদা বৃদ্ধি, সহিংসতা থেকে মুক্তি দিতে ইসলামের ধারা সংযোজন করতে হবে।

বাংলা ট্রিবিউন: ধর্ম অবমাননার জন্য শাস্তির কথা বলছেন, আপনার ব্লাসফেমি আইন চান?

মুফতি ফয়জুল্লাহ: আমরা ব্লাসফেমি আইন চাই না।ধর্ম অবমাননা বলতে শুধু ইসলাম ধর্ম নয়। যেকোনও ধর্মের অবমাননা। ইসলামে সকল ধর্মের অবমাননা নিষিদ্ধ। আমাদের দেশের সংবিধান ও জাতিসংঘের মানবধিকার সনদ অনুসারেও ধর্ম অবমাননা নিষিদ্ধ। দেশের আইনশৃঙ্খলা অবনতির জন্যও ধর্ম অবমাননা দায়ী। এ কারণে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত না করতে পারে, সংসদে ধর্ম অবমাননার জন্য শাস্তির বিধান রেখে আইন চাই। আইনে ইসলমি শরিয়ত অনুযায়ী ধর্ম অবমাননার জন্য সর্বোচ্চ শান্তি মৃত্যুদণ্ড রাখতে হবে। তবে আমরা ব্লাসফেমি আইন চাই না। একইসঙ্গে কেউ আইন নিজের হাতে তুলে নেবে, সেটিও গ্রহণযোগ্য নয়।

বাংলা ট্রিবিউন: দেশে জঙ্গিবাদের যে উত্থান ঘটছে, এটা ধর্মভিত্তিক রাজনীতির জন্য হুমকি কি না?

মুফতি ফয়জুল্লাহ: ধর্মের নামে জঙ্গিবাদের উত্থান  হচ্ছে মূলত  মুসলমানদের শক্তিকে পৃথিবীর সামনে সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত করতে। এটা ষড়যন্ত্রের অংশ। আমরা এদের বিরুদ্ধে আগেও কথা বলেছি, আগামী দিনেও বলব। প্রয়োজন হলে আগামী দিনে মাঠে কর্মসূচি দেব। বোমাবাজি, খুন, জুলুম, নির্যাতন বন্ধের জন্য সামনে আমাদের কর্মসুচি থাকবে।

বাংলা ট্রিবিউন: দেশে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবি উঠেছে দীর্ঘদিন ধরে।এটা মোকাবিলা করবেন কিভাবে?

মুফতি ফয়জুল্লাহ: নিষিদ্ধের দাবি সাধারণ নাগরিকদের নয়। তারা ধর্মপ্রাণ। অবশ্যই এসব দাবি বামপন্থীদের। ইসলামি রাজনীতি নয়,  বরং বামপন্থী রাজনীতি নিষিদ্ধ করা উচিত। তাদের কারণে দেশে কোনও উন্নতি হয় না। সমৃদ্ধিও হয় না। তাদের কারণে সমাজে অশান্তি সৃষ্টি হয়। এ দেশের ওপরে আল্লাহর যে রহমত, তাদের কারণে তাও বন্ধ থাকে। তারা  সমাজ ও দেশের জন্য অকল্যাণের, দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি। তাদের রাজনীতি নিষিদ্ধ হওয়া উচিত।

/সিএ/এমএনএইচ/

/আপ: আরএ/

লাইভ

টপ