বাংলাদেশের ইতিহাসে ৭ জুন এমন একটি দিন, যাকে শুধু একটি স্মরণদিবস বললে কম বলা হয়। এই দিনটি আসলে বাঙালির রাজনৈতিক জাগরণের দিন, নিজের অধিকারকে নিজেদের ভাষায় ঘোষণা করার দিন। ১৯৬৬ সালের ৭ জুন পূর্ব বাংলার মানুষ হরতাল, মিছিল আর প্রতিবাদের মধ্য দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছিল, তাদের দাবি আর চেপে রাখা যাবে না। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যে ছয় দফা উত্থাপন করেছিলেন, তা সেদিন কাগজের কর্মসূচি থেকে রক্তমাখা গণআন্দোলনে রূপ নেয়। তাই ঐতিহাসিকভাবেই ৭ জুন বাঙালির অধিকারচেতনা, আত্মমর্যাদা এবং মুক্ত ভবিষ্যতের পথে এগিয়ে যাওয়ার এক বড় অর্জনের দিন ।
পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠনের পরই পূর্ব বাংলার মানুষের মনে ধীরে ধীরে প্রশ্ন জমতে শুরু করে। জনসংখ্যায় সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়েও তারা রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রে ছিল না— প্রশাসন, সামরিক বাহিনী, অর্থনীতি এবং উন্নয়ন ব্যয়ের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করত পশ্চিম পাকিস্তান। পূর্ব পাকিস্তানের পাট ও অন্যান্য রফতানি পাকিস্তানের অর্থনীতিকে শক্তি জুগিয়েছিল, কিন্তু সেই আয়ের ন্যায্য প্রতিফলন পূর্ব বাংলার মানুষের জীবনে পড়েনি। এই বৈষম্য শুধু অর্থনীতিতে ছিল না, ছিল রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বেও। ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের পরে পূর্ব পাকিস্তানের নিরাপত্তাহীনতা এবং কেন্দ্রীয় সরকারের উদাসীনতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তখন অনেকেই বুঝতে শুরু করেন, এই কাঠামোর মধ্যে থেকে শুধু অনুনয়-বিনয় করে ন্যায্য অধিকার আদায় করা সম্ভব নয়।
এই পটভূমিতেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৬৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে লাহোরে ঐতিহাসিক ছয় দফা উত্থাপন করেন। বিরোধী রাজনৈতিক মহলের সম্মেলনে তিনি পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের দাবি তুলে ধরতে চেয়েছিলেন, কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানের নেতারা তা আলোচনা করতেও রাজি হননি। বরং শুরু থেকেই এটিকে ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’ বলে প্রচারণার চেষ্টা করা হয়। বঙ্গবন্ধু তখন বুঝেছিলেন, আপসের ভাষায় আর কাজ হবে না; জনগণের সামনে সরাসরি বলতে হবে কী চাই, কেন চাই, এবং কেন এ দাবি ন্যায্য। পরে ২১ ফেব্রুয়ারি আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী কমিটি ছয় দফাকে অনুমোদন দেয় এবং মার্চ মাসে তা আরও সংগঠিতভাবে জনতার সামনে পৌঁছে দেওয়া হয়। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই এটি দলের কর্মসূচি থেকে মানুষের কর্মসূচি হয়ে ওঠে।
ছয় দফার প্রতিটি দাবির ভেতরেই ছিল দীর্ঘদিনের বঞ্চনার জবাব। প্রথম দফায় ছিল প্রকৃত ফেডারেল কাঠামো ও জনগণের ভোটে নির্বাচিত সংসদীয় সরকার— দ্বিতীয় দফায় বলা হয়, কেন্দ্র শুধু প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র দেখবে, বাকিটা থাকবে প্রদেশের হাতে। তৃতীয় দফায় মুদ্রা ও আর্থিক নিরাপত্তার প্রশ্ন ওঠে, যাতে পূর্ব পাকিস্তান থেকে সম্পদ পাচার বন্ধ হয়। চতুর্থ দফায় কর আরোপ ও রাজস্ব আদায়ের ক্ষমতা প্রদেশের হাতে দেওয়ার দাবি জানানো হয়। পঞ্চম দফায় বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের পৃথক হিসাব ও বাণিজ্যিক ক্ষমতার কথা বলা হয়। আর ষষ্ঠ দফায় পূর্ব পাকিস্তানের নিজস্ব মিলিশিয়া বা আধাসামরিক বাহিনীর দাবি ওঠে। কাগজে এ ছিল ছয়টি দফা, কিন্তু এর ভেতরের কথা ছিল একটাই, পূর্ব বাংলার মানুষের ভাগ্য নির্ধারণ করবে পূর্ব বাংলার মানুষ নিজেরাই।
এ কারণেই ছয় দফা এত দ্রুত মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেয়। ভাষা আন্দোলন বাঙালিকে সাংস্কৃতিকভাবে এক করেছিল, কিন্তু ছয় দফা তাকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অধিকারের প্রশ্নে এক প্ল্যাটফর্মে দাঁড় করায়। গ্রামের মানুষ হয়তো “ফেডারেশন” বা “রাজস্ব কাঠামো” শব্দের গভীর অর্থ জানতো না, কিন্তু তারা খুব ভালো করেই বুঝতো, তাদের ঘামের ফসল অন্যের ঘরে যাচ্ছে, অথচ নিজের ঘর খালি। বঙ্গবন্ধুর বড় শক্তি ছিল, তিনি এই জটিল বিষয়গুলোকে সাধারণ মানুষের ভাষায় রূপ দিতে পেরেছিলেন। তাই ছয় দফা হয়ে উঠেছিল কেবল রাজনৈতিক নেতাদের আলোচ্য বিষয় নয়, বরং শ্রমিক, ছাত্র, কৃষক, নিম্ন-মধ্যবিত্ত, সবাইয়ের বাঁচার দাবি। ইতিহাসবিদদের অনেকে তাই একে “বাঙালির মুক্তির সনদ” বলেছেন। আবার কেউ কেউ বলেছেন, ছয় দফার ভেতরে মূলত একটি কথাই ছিল, স্বাধীনতার প্রস্তুতি।
ছয় দফাকে জনতার দ্বারে পৌঁছে দিতে বঙ্গবন্ধু সারা পূর্ববাংলা ঘুরে বেড়ান। সভা-সমাবেশ করেন, মানুষের সঙ্গে কথা বলেন, বোঝান কেন এই দাবিগুলো কেবল একটি দলের নয়, সবার। এই জনসমর্থনই শাসকগোষ্ঠীকে অস্বস্তিতে ফেলে। সরকার রাজনৈতিক বিতর্কের জবাব রাজনৈতিকভাবে না দিয়ে শুরু করে দমন-পীড়ন। বঙ্গবন্ধুকে ৮ মে ১৯৬৬ গ্রেফতার করা হয়; আরও বহু নেতা-কর্মীকেও আটক করা হয়। তখন স্পষ্ট হয়ে যায়, কেন্দ্রীয় সরকার ছয় দফাকে শুধু বিরোধী মত হিসেবে দেখছে না, বরং নিজেদের ক্ষমতার ভিত্তির জন্য হুমকি হিসেবে দেখছে। কিন্তু দমননীতি আন্দোলন থামাতে পারেনি; বরং সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ আরও বাড়িয়ে দেয়।
এই পরিস্থিতিতে ৭ জুন ডাকা হয় সর্বাত্মক হরতাল। সেদিন ঢাকাসহ নারায়ণগঞ্জ, টঙ্গী এবং আরও নানা জায়গায় মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাস্তায় নামে। হরতাল সফল করতে শ্রমিকদের ভূমিকা ছিল বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। পুলিশ ও তৎকালীন ইপিআর গুলি চালায়— অন্তত ১১ জন নিহত হন, যাঁদের মধ্যে মনু মিয়া, শফিক ও শামসুল হকের নাম বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়। বহু মানুষ আহত ও গ্রেফতার হন। কিন্তু রক্তপাতেও আন্দোলনের গতি থামেনি। বরং ৭ জুনের পর ছয় দফা আরও দৃঢ়ভাবে জনআন্দোলনের রূপ নেয়। আসলে ৬ দফা একপ্রকার প্রমান করে দেয় যে, বাঙালি তার দাবির পক্ষে কেবল স্লোগান দিতে নয়, আত্মত্যাগ করতেও প্রস্তুত।।
৭ জুনের এই আত্মত্যাগের মধ্য দিয়েই ছয় দফা নতুন ঐতিহাসিক শক্তি পায়। আগে এটি ছিল একটি সুসংগঠিত রাজনৈতিক প্রস্তাব— ৭ জুনের পরে এটি হয়ে ওঠে জনতার নৈতিক অধিকার। এরপর পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী আরও কঠোর হয়। বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে পরে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দেওয়া হয়, আন্দোলন দমনে নানা রকম ভয়ভীতি ও দমননীতি চালানো হয়। কিন্তু বাস্তবে এতে লাভ হয়নি। ছাত্রসমাজ ছয় দফাকে বিস্তৃত করে ১১ দফা কর্মসূচি সামনে আনে, এবং শেষ পর্যন্ত ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান পাকিস্তানি শাসনকে বড় ধাক্কা দেয়। বঙ্গবন্ধুর মুক্তি, জনআন্দোলনের বিস্তার, এবং জাতীয় রাজনীতিতে বাঙালির একক অবস্থান— এসবের শেকড় গিয়ে মেশে ছয় দফা আন্দোলনের মধ্যেই।
এরপরের ঘটনাপ্রবাহ যেন ইতিহাসের স্বাভাবিক ধারাতেই এগিয়েছে। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে পূর্ব বাংলার মানুষ ছয় দফার পক্ষে রায় দেয়। আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সমর্থন পায়, অর্থাৎ জনগণ ভোটের মাধ্যমে জানিয়ে দেয় তারা কোন ভবিষ্যৎ চায়। কিন্তু পাকিস্তানি শাসকচক্র সেই গণরায় মেনে নেয়নি। জাতীয় পরিষদের অধিবেশন বিলম্বিত করা হয়, রাজনৈতিক সমাধানের বদলে ষড়যন্ত্র ও শক্তিপ্রয়োগের পথ বেছে নেওয়া হয়। ২৫ মার্চের গণহত্যা শেষ পর্যন্ত পরিষ্কার করে দেয়, যে রাষ্ট্র নিজের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর ন্যায্য অধিকার মেনে নিতে পারে না, তার সঙ্গে আর সহাবস্থান সম্ভব নয়। সেই অর্থে ছয় দফা শুধুই একটি আন্দোলনের নাম নয়— এটি স্বাধীন বাংলাদেশের দিকে এগিয়ে যাওয়া রাজনৈতিক প্রস্তুতির সবচেয়ে স্পষ্ট দলিল।
৭ জুনের গুরুত্ব তাই এখানেই যে, এই দিনটি বাঙালিকে নিজেদের শক্তি চিনতে শিখিয়েছিল। এর আগে বঞ্চনা ছিল, ক্ষোভ ছিল, প্রতিবাদও ছিল; কিন্তু ছয় দফা সেই ক্ষোভকে দিকনির্দেশনা দিয়েছিল, আর ৭ জুন সেই দিকনির্দেশনাকে মানুষের রক্তাক্ত অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে ঐতিহাসিক উচ্চতায় নিয়ে যায়। আমাদের মনে রাখা উচিত স্বাধীনতা হঠাৎ করে আসে না— তার আগে লাগে দীর্ঘ প্রস্তুতি, রাজনৈতিক স্পষ্টতা, সাংগঠনিক শক্তি এবং মানুষের ঐক্যবদ্ধ অবস্থান। বঙ্গবন্ধু সেই প্রস্তুতিটিই তৈরি করেছিলেন। তিনি বুঝেছিলেন, একটি জাতিকে মুক্ত করতে হলে আগে তাকে নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করতে হয়, নিজের পায়ে দাঁড়ানোর সাহস দিতে হয়। ছয় দফা সেই সাহসের নাম। বাংলাদেশ যতদিন থাকবে, ৭ জুন ততদিন আমাদের মনে করিয়ে দেবে— অধিকার আদায় করতে হলে স্পষ্ট কথা বলতে হয়, সংগঠিত হতে হয়, আর প্রয়োজনে ত্যাগ স্বীকার করতে হয়। ছয় দফা বাঙালিকে তা শিখিয়েছিল। সেই শিক্ষার পথ ধরেই এসেছে ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, সত্তরের গণরায়, আর একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ। ইতিহাসের সেই ধারাবাহিকতায় ৭ জুন আলাদা করে দীপ্যমান হয়ে থাকে। কারণ এই দিনেই বাঙালি প্রথম এত স্পষ্টভাবে বুঝিয়েছিল, তারা আর প্রজার মতো বাঁচবে না, নিজেদের অধিকার নিয়ে, নিজেদের মর্যাদা নিয়ে, নিজেদের দেশ নিয়েই বাঁচবে।
লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, আইন বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। পিএইচডি গবেষক, ইউনিভার্সিটি অব লেস্টার, যুক্তরাজ্য
ইমেইল: [email protected]









