ঘরের রান্না, সম্পর্কের উনুন ও বদলে যাওয়া নগরজীবন 

প্রশান্ত কুমার শীল
০৮ জুন ২০২৬, ১০:০০আপডেট : ০৮ জুন ২০২৬, ১১:০৪

বাংলা সিনেমার এক অমর চরিত্র ধনঞ্জয়। তপন সিনহা নির্মিত ‘গল্প হলেও সত্যি’ ছবির সেই ধনঞ্জয় কেবল একজন গৃহকর্মী নয়, সে যেন এক হারিয়ে যেতে বসা পারিবারিক সংস্কৃতির প্রতিনিধি।

তার হাতে রান্না ছিল শিল্প, সংসার ছিল দায়িত্ব, আর মানুষকে খাওয়ানো ছিল এক ধরনের মানবিক সাধনা। আজকের শহুরে জীবনে দাঁড়িয়ে ধনঞ্জয়কে মনে পড়া অকারণ নয়। কারণ, আমাদের চারপাশে এখন রমরমা ফুড ডেলিভারি অ্যাপ, ক্লাউড কিচেন, ইনস্ট্যান্ট ফুড সার্ভিস। অথচ ঘরের রান্না, পারিবারিক খাবার ও একসঙ্গে বসে খাওয়ার সংস্কৃতি যেন ক্রমেই সরে যাচ্ছে জীবনের প্রান্তে।

শহুরে জীবনের ব্যস্ততা এখন নতুন এক খাদ্যসংস্কৃতি তৈরি করেছে। অফিসের সময় বদলেছে, কাজের ধরন বদলেছে, পরিবারের কাঠামো বদলেছে। একসময় মধ্যবিত্ত পরিবারের রান্নাঘর ছিল সংসারের কেন্দ্রবিন্দু। সকালে বাজার, দুপুরে রান্না, বিকালে নাস্তা, রাতে সবাই মিলে খাওয়ার মধ্যে একটি পারিবারিক ছন্দ ছিল। এখন সেই জায়গা দখল করেছে মোবাইল স্ক্রিন। ক্ষুধা লাগলে কেউ আর রান্নাঘরের দিকে তাকায় না, বরং ফোনের অ্যাপে আঙুল চালিয়ে অর্ডার দেয়। কয়েক মিনিটের মধ্যে খাবার হাজির।

এই পরিবর্তনকে একেবারে নেতিবাচক বলা যাবে না। কারণ প্রযুক্তি মানুষের জীবনকে সহজ করেছে। নগরের যানজট, কর্মব্যস্ততা, একক পরিবার, নারী-পুরুষ উভয়ের চাকরি—সব মিলিয়ে অনেক পরিবারেই প্রতিদিন রান্না করা কঠিন হয়ে উঠেছে। ফুড ডেলিভারি অ্যাপ তাই প্রয়োজনের জায়গা থেকে জনপ্রিয় হয়েছে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের কাছে এটি সুবিধাজনক, দ্রুত ও বৈচিত্র্যময় এক ব্যবস্থা। এখন কেউ চাইলেই একই দিনে বিরিয়ানি, সুশি, পাস্তা, কাচ্চি, থাই স্যুপ কিংবা ডেজার্ট

 অর্ডার করতে পারে। খাবার এখন কেবল পুষ্টি নয়, বিনোদনও বটে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই সুবিধার ভিড়ে আমরা কি যেন হারাচ্ছি?

ভারতের অত্যন্ত জনপ্রিয় সেলিব্রিটি শেফ, রন্ধনশিল্পী এবং টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব সঞ্জীব কাপুর। তিনি তাঁর সুস্বাদু রান্নার কৌশল এবং জনপ্রিয় টিভি শো 'খানা খাজানা'র মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে বিশেষ পরিচিতি লাভ করেছেন। তিনি বলেছেন “ফুড ডেলিভারি অ্যাপ জীবনযাত্রার পরিবর্তনের প্রতিফলন, কিন্তু শিশুদের ঘরের রান্নার মূল্য বোঝা উচিত।” কথাটি নিছক আবেগের নয়; বরং এর মধ্যে লুকিয়ে আছে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতা। কারণ, ঘরের রান্না শুধু খাবার নয়, এটি স্মৃতি, সম্পর্ক ও পরিচয়ের অংশ। মায়ের হাতের ডাল, দাদির পাটিসাপটা, ঈদের সেমাই, পূজার সন্দেশ কিংবা বৃষ্টির দিনের খিচুড়ি-ইলিশ—এসবের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে আবেগ, পারিবারিক ইতিহাস ও সামাজিক বন্ধন।

ধনঞ্জয় চরিত্রটির সাফল্য এখানেই। সে রান্নাকে কেবল দায়িত্ব মনে করেনি; বরং সৃজনশীলতা ও যত্নের জায়গা থেকে দেখেছে। তার রান্নায় ছিল কল্পনা, আন্তরিকতা ও শিল্পবোধ। কাঁচকলার কোপ্তাকে মাংসের স্বাদে নিয়ে যাওয়া কিংবা চালতা দিয়ে ডাল রান্না। এসব কেবল রন্ধন দক্ষতা নয়, এটি জীবনকে উপভোগ করার এক নান্দনিকতা। আজকের দ্রুতগতির শহুরে সমাজে সেই নান্দনিকতা ক্রমেই বিরল হয়ে যাচ্ছে।

এখনকার শিশুরা হয়তো জানেই না, রান্নাঘরের গন্ধ কীভাবে পরিবারের আবহ তৈরি করে। অনেক শিশুর কাছে খাবার মানেই ব্র্যান্ডেড প্যাকেট, রেস্টুরেন্ট বা অ্যাপভিত্তিক ডেলিভারি। ফলে খাবারের সঙ্গে তাদের আবেগগত সম্পর্ক তৈরি হচ্ছে না। তারা জানছে না একটি রান্না তৈরি হতে কত সময়, শ্রম ও মমতা লাগে। খাবার তাই তাদের কাছে ভোগের বস্তু, জীবনের অংশ নয়।

ফুড ডেলিভারি অ্যাপের আরেকটি সামাজিক দিকও রয়েছে। এই অ্যাপভিত্তিক অর্থনীতি নগরে নতুন ধরনের শ্রমবাজার তৈরি করেছে। হাজার হাজার তরুণ এখন ডেলিভারি রাইডার হিসেবে কাজ করছেন। কিন্তু এই শ্রমের পেছনে রয়েছে অনিশ্চয়তা, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, নিরাপত্তাহীনতা ও মানসিক চাপ।

একদিকে মানুষ দ্রুত খাবার পাচ্ছে, অপরদিকে সেই দ্রুততার জন্য কেউ রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে ছুটে চলেছে। প্রযুক্তির এই সুবিধাবাদী কাঠামোর মধ্যে মানবিক শ্রমের মূল্য কতটা নিশ্চিত হচ্ছে, সেটিও ভাবার বিষয়।

অন্যদিকে, ঘরের রান্না কমে যাওয়ার ফলে পারিবারিক যোগাযোগও কমছে। আগে খাওয়ার টেবিল ছিল আলাপের জায়গা। সেখানে পরিবারের সদস্যরা দিনের গল্প বলতো, মতবিনিময় করতো, সম্পর্ক দৃঢ় হতো।

এখন অনেকেই একা একা মোবাইল হাতে খাবার খায়। কেউ সিরিজ দেখে, কেউ স্ক্রল করে, কেউ অফিসের মেইল দেখে। ফলে খাওয়ার সামাজিকতা হারিয়ে যাচ্ছে।

এই পরিবর্তনের পেছনে অর্থনৈতিক বাস্তবতাও আছে। শহরের জীবন ব্যয়বহুল, সময় সংকুচিত, মানুষের ধৈর্য কমে গেছে। তাই অনেকের কাছে রান্না একটি ঝামেলার কাজ। কিন্তু রান্নাকে যদি শুধুই শ্রম হিসেবে দেখা হয়, তাহলে তার মানবিক ও সাংস্কৃতিক দিকটি হারিয়ে যায়। ধনঞ্জয় আমাদের সেই হারিয়ে যাওয়া দিকটির কথাই মনে করিয়ে দেয়।

বাঙালি সংস্কৃতিতে খাবার সবসময়ই বিশেষ গুরুত্ব বহন করেছে। সাহিত্য, সিনেমা, লোকজ সংস্কৃতি—সর্বত্র খাবারের উপস্থিতি লক্ষণীয়। বিভূতিভূষণের উপন্যাসে, সত্যজিৎ রায়ের চলচ্চিত্রে কিংবা রবীন্দ্রনাথের চিঠিপত্রে খাবারের প্রসঙ্গ বারবার এসেছে। কারণ, খাবার মানুষের জীবনযাত্রা, শ্রেণি, সংস্কৃতি ও আবেগের প্রতিফলন। আজকের নগরসভ্যতায় সেই সাংস্কৃতিক গভীরতা ক্রমশ পণ্যে রূপ নিচ্ছে।

তবে বাস্তবতাকে অস্বীকার করাও সমাধান নয়। আধুনিক জীবনে ফুড ডেলিভারি অ্যাপ থাকবে, প্রযুক্তিও থাকবে। কিন্তু তার মধ্যেও ঘরের রান্না ও পারিবারিক খাবারের সংস্কৃতি টিকিয়ে রাখা জরুরি। সপ্তাহে অন্তত কয়েক দিন পরিবার একসঙ্গে বসে খেতে পারে। শিশুকে রান্নাঘরের সঙ্গে

পরিচিত করা যেতে পারে। রান্নাকে নারীর একক দায়িত্ব না ভেবে পারিবারিক অংশগ্রহণে রূপ দেওয়া প্রয়োজন। বাবা-মা একসঙ্গে রান্না করলে শিশুরাও খাবারের মূল্য বুঝবে।

একটি সমাজের পরিবর্তন বোঝার জন্য তার খাবারের সংস্কৃতি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। আজ আমরা দ্রুততার সমাজে বাস করছি। সব কিছু এখন ‘ইনস্ট্যান্ট’। কিন্তু জীবনের সব অনুভূতি কি ইনস্ট্যান্ট হয়? মায়ের হাতের রান্না, পরিবারের সঙ্গে বসে খাওয়া, কারও জন্য যত্ন করে রান্না করা—এসবের কোনও অ্যাপভিত্তিক বিকল্প নেই।

ধনঞ্জয় তাই কেবল সিনেমার চরিত্র নয়; সে এক সাংস্কৃতিক স্মৃতি। সে আমাদের মনে করিয়ে দেয়, রান্নাঘর শুধু চুলা-পাতিলের জায়গা নয়, এটি সম্পর্কের উনুন। সেখানে যত্ন, সৃজনশীলতা ও ভালোবাসা একসঙ্গে সেদ্ধ হয়। আধুনিক শহর হয়তো আমাদের দ্রুত করেছে, কিন্তু মানবিক করেছে কী?

সম্ভবত এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই আজও ধনঞ্জয় ফিরে আসে। কখনও সিনেমার পর্দায়, কখনও স্মৃতির ভেতর, কখনও সঞ্জীব কাপুরের মন্তব্যে। আর তখন মনে হয়, প্রযুক্তির যুগেও ঘরের রান্নার ধোঁয়া আসলে এক ধরনের সভ্যতার গন্ধ।

লেখক: শিক্ষক ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক

/এপিএইচ/এমওএফ/
সম্পর্কিত
ছয় দফা থেকে বাঙালির স্বাধীনতার অভিযাত্রা
নির্ভুল হওয়ার গুরুত্ব
আত্মকেন্দ্রিক মানুষ ও  অবহেলিত মায়ের লাশ
সর্বশেষ খবর
এআইয়ের রূপ ধরে আসছে নতুন উপনিবেশবাদ
এআইয়ের রূপ ধরে আসছে নতুন উপনিবেশবাদ
স্কুলছাত্রীকে ছুরিকাঘাত, অভিযুক্ত যুবক গ্রেফতার
স্কুলছাত্রীকে ছুরিকাঘাত, অভিযুক্ত যুবক গ্রেফতার
বাংলাদেশের বিপক্ষে ওয়ানডে থেকে ছিটকে গেলেন মার্শ-হেড
বাংলাদেশের বিপক্ষে ওয়ানডে থেকে ছিটকে গেলেন মার্শ-হেড
লক্ষ্মীপুরে হত্যা: আসামি দিনাজপুরে গ্রেফতার
লক্ষ্মীপুরে হত্যা: আসামি দিনাজপুরে গ্রেফতার
সর্বাধিক পঠিত
ভুটানের ভূমিকম্পে কাঁপলো ঢাকাসহ সারা দেশ
ভুটানের ভূমিকম্পে কাঁপলো ঢাকাসহ সারা দেশ
আগেই তাকে ত্যাজ্য করেছি, ফাঁসির রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করবো না
আগেই তাকে ত্যাজ্য করেছি, ফাঁসির রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করবো না
স্পা সেন্টারে ‘ব্ল্যাকমেইল’ ফাঁদ
স্পা সেন্টারে ‘ব্ল্যাকমেইল’ ফাঁদ
পেনাল্টি, লাল কার্ড ও মারামারির ম্যাচে মালদ্বীপকে হারাতে পারেনি বাংলাদেশ 
পেনাল্টি, লাল কার্ড ও মারামারির ম্যাচে মালদ্বীপকে হারাতে পারেনি বাংলাদেশ 
আবাসিক হোটেলে ইউপি সদস্যের লাশ, সিসিটিভি ফুটেজে নাটকীয় মোড়
আবাসিক হোটেলে ইউপি সদস্যের লাশ, সিসিটিভি ফুটেজে নাটকীয় মোড়