বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা এখন উচ্চশিক্ষা পরিকল্পনার চেয়ে যেন রাজনৈতিক মর্যাদা, আঞ্চলিক দাবি এবং বেসরকারি বিনিয়োগের নতুন ক্ষেত্র হয়ে উঠছে। চলতি বছরের শুরুতে আরও ১১টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব নিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনে আলোচনা শুরু হয়। এর মধ্যে ঠাকুরগাঁওয়ের ইকো ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি শর্তসাপেক্ষে সাময়িক অনুমোদন পেয়েছে। বাকি প্রস্তাবগুলোর বেশ কয়েকটি এখনও ইউজিসি ও মন্ত্রণালয়ের যাচাই-বাছাই পর্যায়ে রয়েছে। এদিকে জাতীয় সংসদেও এক অধিবেশনে সাতক্ষীরাসহ অন্তত ১০টি এলাকায় নতুন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি উঠেছে। অর্থাৎ সরকারি ও বেসরকারি—দুদিক থেকেই নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার এক ধরনের প্রতিযোগিতা চলছে।
এই প্রতিযোগিতার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি প্রায় অনুপস্থিত— বাংলাদেশে আসলে কতটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রয়োজন এবং কী ধরনের বিশ্ববিদ্যালয় প্রয়োজন? সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, দেশে অনুমোদিত বিশ্ববিদ্যালয় ১৭৪টি, যার মধ্যে ৫৭টি পাবলিক এবং ১১৭টি বেসরকারি। অনুমোদিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকটি এখনও কার্যক্রমই শুরু করতে পারেনি। অপরদিকে, ২০২৫ সালে সরকারকে ১৮টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা ভাবতে হয়েছিল। কারণ দীর্ঘ সময়েও তারা স্থায়ী ক্যাম্পাসে যেতে পারেনি। এমন পরিস্থিতিতে পুরোনো প্রতিষ্ঠানের আইনগত ও অ্যাকাডেমিক দুর্বলতা নিরসন না করে নতুন প্রতিষ্ঠান অনুমোদনের যৌক্তিকতা স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্নের মুখে পড়ে।
স্বাভাবিকভাবে গুণগত মান ঠিক থাকলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বৃদ্ধি কোনও সমস্যা নয়। জনসংখ্যার অনুপাতে উচ্চশিক্ষার সুযোগ বাড়ানো, পিছিয়ে পড়া অঞ্চলকে শিক্ষার আওতায় আনা, নারী ও নিম্ন-আয়ের শিক্ষার্থীদের প্রবেশাধিকার বৃদ্ধি এবং নতুন জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তোলার জন্য নতুন প্রতিষ্ঠান প্রয়োজন হতে পারে। বাংলাদেশের শিক্ষা সম্প্রসারণের উল্লেখযোগ্য সাফল্যও রয়েছে। ইউনেস্কোর ২০২৬ সালের বাংলাদেশ কেস স্টাডি অনুসারে, প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্তির হার ১৯৯০ সালের ৩৪ শতাংশ থেকে ২০২৪ সালে ৯০ শতাংশে এবং নিম্নমাধ্যমিক সমাপ্তির হার ২৩ শতাংশ থেকে ৭৪ শতাংশে পৌঁছেছে। উচ্চমাধ্যমিক স্তরেও অংশগ্রহণ কিছুটা বেড়েছে, যদিও ২০২৪ সালে সমাপ্তির আনুমানিক হার ছিল মাত্র ৩৮ শতাংশ। কিন্তু এটাও মনে রাখা প্রয়োজন—শিক্ষায় প্রবেশাধিকার বাড়া এবং মানসম্মত বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে ওঠা এক বিষয় নয়।
একটি প্রতিষ্ঠানের নামের শেষে ‘বিশ্ববিদ্যালয়’ যুক্ত হলেই সেটি জ্ঞান উৎপাদনের কেন্দ্রে পরিণত হয় না। বিশ্ববিদ্যালয় হতে হলে সেখানে যোগ্য ও পূর্ণকালীন শিক্ষক, গবেষণাগার, সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার, গবেষণা তহবিল, স্বাধীন অ্যাকাডেমিক পরিবেশ, গবেষণাভিত্তিক স্নাতকোত্তর শিক্ষা এবং কার্যকর প্রশাসনিক কাঠামো থাকতে হয়। অধিকারভিত্তিক দৃষ্টিকোণ থেকেও উচ্চশিক্ষার সুযোগ বাড়ানো জরুরি, কিন্তু সুযোগ বাড়ানোর নামে নিম্নমানের ডিগ্রি বিতরণ করলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীরা। তারা সঞ্চয় বা ঋণের অর্থ ব্যয় করে এমন একটি সনদ পায়—যার শ্রমবাজার বা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে প্রত্যাশিত মূল্য থাকে না।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০১০-এর ঘোষিত উদ্দেশ্যই ছিল মানসম্মত শিক্ষা সম্প্রসারণ এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা। এই আইনের অধীনে সরকারি সাময়িক অনুমতি বা সনদ ছাড়া কোনও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা করা যায় না। এতে বোর্ড অব ট্রাস্টিজ, সিন্ডিকেট, অ্যাকাডেমিক কাউন্সিল, শিক্ষক নিয়োগ কমিটি, মান নিশ্চিতকরণ, হিসাব নিরীক্ষা, পরিদর্শন, অনুমোদিত ক্যাম্পাস এবং সনদ বাতিলের ব্যবস্থাও রয়েছে। অর্থাৎ কাগজে-কলমে নিয়ন্ত্রণের কাঠামো দুর্বল নয়।
আইন অনুযায়ী সাময়িক অনুমোদনপ্রাপ্ত বিশ্ববিদ্যালয়কে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে স্থায়ী ক্যাম্পাস, অবকাঠামো, শিক্ষক এবং অন্যান্য শর্ত পূরণ করতে হয়। কিন্তু এমন বিশ্ববিদ্যালয়ও রয়েছে, যারা ১২, ১৫ কিংবা ২০ বছরেও স্থায়ী ক্যাম্পাসে যেতে পারেনি। ২০২৫ সালে ১৮টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য আইনি ব্যবস্থার আলোচনাই প্রমাণ করে—বাংলাদেশের মূল সংকট নতুন আইনের অভাব নয়, বরং বিদ্যমান আইন ধারাবাহিক ও নিরপেক্ষভাবে প্রয়োগ না করার সমস্যা। যারা বছরের পর বছর শর্ত ভঙ্গ করেও কার্যক্রম চালাতে পারে, তাদের উপস্থিতিতে নতুন উদ্যোক্তাদের প্রতি কঠোর শর্ত আরোপও বিশ্বাসযোগ্য থাকে না।
এখানে আপনি প্রশ্ন করতেই পারেন, উদ্যোক্তাদের উদ্দেশ্য কি শিক্ষার প্রসার না বাণিজ্যি? আমাদের প্রচলিত আইন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতাকে জনকল্যাণকামী বা শিক্ষানুরাগী ব্যক্তি, গোষ্ঠী, দাতব্য ট্রাস্ট কিংবা প্রতিষ্ঠান হিসেবে কল্পনা করেছে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন, এখানে কোনও কোনও প্রতিষ্ঠানে ভর্তি, টিউশন ফি এবং দ্রুত সম্প্রসারণই প্রধান সাফল্যসূচক হয়ে ওঠে। গবেষণা, শিক্ষক উন্নয়ন, অ্যাকাডেমিক স্বাধীনতা এবং শিক্ষার্থীর দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণ চলে যায় দ্বিতীয় সারিতে। তবে একই সাথে সব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে এক কাতারে ফেলা অন্যায্য হবে। দেশের কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা, মানসম্মত শিক্ষা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং চাকরি যোগ্যতার ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি করেছে। সমস্যাটি মালিকানায় নয়, সমস্যাটি হলো মান, জবাবদিহি এবং মুনাফা বা আর্থিক উদ্বৃত্ত ব্যবহারের স্বচ্ছতায়।
QS World University Rankings 2027, যা ১৮ জুন ২০২৬ প্রকাশিত হয়েছে, তাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের মধ্যে সর্বোচ্চ অবস্থানে থেকেও বিশ্বে যৌথভাবে ৬০০তম। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় ৭১১-৭২০, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় ৯০১-৯৫০ এবং ব্র্যাক ও ড্যাফোডিল ১০০১-১২০০ স্তরে রয়েছে। অর্থাৎ কিছু প্রতিষ্ঠানের অগ্রগতি থাকলেও বাংলাদেশের কোনও বিশ্ববিদ্যালয় এখনও বিশ্বের শীর্ষ ৫০০-এর মধ্যে নেই। তবে বিষয়ভিত্তিক র্যাংকিংয়ে কিছু উজ্জ্বলতা রয়েছে, যেমন- পেট্রোলিয়াম ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে বুয়েট ১০১-১৫০ এবং কৃষি ও বনবিদ্যায় বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ২৫১-৩০০ স্তরে ছিল।
যদিও আমার মনে হয়, র্যাংকিংকে বিশ্ববিদ্যালয়ের মানের একমাত্র মাপকাঠি ভাবা উচিত নয়। স্থানীয় অন্তর্ভুক্তি, মাতৃভাষায় জ্ঞানচর্চা, সামাজিক প্রভাব বা সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীদের উন্নয়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সব র্যাংকিং যথেষ্টভাবে ধারণ করে না। তারপরও র্যাংকিংয়ের সূচকগুলো আমাদের কাঠামোগত দুর্বলতা চিহ্নিত করতে সহায়তা করে। কিউএস পদ্ধতিতে গবেষণা ও জ্ঞান আবিষ্কার মোট স্কোরের ৫০ শতাংশ, যার মধ্যে অ্যাকাডেমিক সুনাম ৩০ এবং শিক্ষকপ্রতি গবেষণা উদ্ধৃতি ২০ শতাংশ। চাকরি যোগ্যতা ও ফলাফল ২০, শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত ১০, আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততা ১৫ এবং টেকসই উন্নয়ন ৫ শতাংশ।
বাংলাদেশি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পিছিয়ে থাকার কারণ তাই রহস্যজনক নয়। অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে পূর্ণকালীন গবেষকের সংখ্যা কম, গবেষণা অনুদান অপ্রতুল, পিএইচডি ও পোস্ট-ডক্টরাল সংস্কৃতি দুর্বল, আন্তর্জাতিক শিক্ষক ও শিক্ষার্থী সীমিত এবং গবেষণা ব্যবস্থাপনা পেশাদার নয়। প্রচুর শিক্ষককে অতিরিক্ত ক্লাস ও প্রশাসনিক কাজে সময় দিতে হয়। অনেক প্রতিষ্ঠানে স্বাধীন গবেষণার বদলে পদোন্নতির জন্য প্রকাশনা প্রধান প্রেরণা হয়ে ওঠে। ফলস্বরূপ গবেষণার সংখ্যা বাড়লেও মৌলিকতা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, পুনরুৎপাদন যোগ্যতা এবং উদ্ধৃতির প্রভাব প্রত্যাশিত মাত্রায় বাড়ে না। শিক্ষায় সামগ্রিক সরকারি ব্যয়ও বড় সীমাবদ্ধতা। বিশ্বব্যাংকের ইউনেসকো-উৎসভিত্তিক হিসাবে ২০২৪ সালে বাংলাদেশ শিক্ষায় জিডিপির প্রায় ২ শতাংশ ব্যয় করেছে, যেখানে অস্ট্রেলিয়ার সর্বশেষ প্রাপ্য হার ৫.১, জার্মানির ৫.২ এবং ভারতের ৪.১ শতাংশ।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়ালে বিদ্যমান সীমিত শিক্ষক, গবেষণা অর্থ ও প্রশাসনিক সক্ষমতা আরও ছড়িয়ে পড়বে। একটি নতুন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য উপাচার্য, রেজিস্ট্রার, শিক্ষক, কর্মকর্তা, জমি, ভবন, গবেষণাগার ও বার্ষিক বাজেট প্রয়োজন। কিন্তু নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য প্রায়ই পুরোনো প্রতিষ্ঠান থেকেই শিক্ষক ধার করতে হয়। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রেও একই সীমাবদ্ধ সংখ্যক যোগ্য শিক্ষক একাধিক প্রতিষ্ঠানে খণ্ডকালীন পাঠদান করেন। ফলে নতুন সাইনবোর্ড তৈরি হলেও নতুন অ্যাকাডেমিক সক্ষমতা তৈরি হয় না।
প্রতিটি জেলায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় চাই শুনে ভালো লাগে, আবার এই দাবি রাজনৈতিকভাবে আকর্ষণীয় বটে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় কোনও জেলা প্রশাসনিক কার্যালয় নয় যে প্রত্যেক জেলায় একটি করে থাকতেই হবে। একটি অঞ্চলের উচ্চশিক্ষার চাহিদা পূরণের জন্য সব ক্ষেত্রে পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা জরুরি নয়। বিদ্যমান বিশ্ববিদ্যালয়ের স্যাটেলাইট অ্যাকাডেমিক কেন্দ্র, প্রযুক্তি ইনস্টিটিউট, কমিউনিটি কলেজ, পলিটেকনিক, নার্সিং ও শিক্ষক প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান কিংবা ডিজিটাল ও মিশ্র শিক্ষা কার্যক্রম অনেক ক্ষেত্রে বেশি সাশ্রয়ী ও কার্যকর হতে পারে। তবে একই সাথে আঞ্চলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারণা পুরোপুরি বাতিল করা উচিত নয়। সাতক্ষীরার লবণাক্ততা,
উপকূলীয় কৃষি ও জলবায়ু অভিযোজন, মেহেরপুরের কৃষি, হাওর অঞ্চলের পানি ব্যবস্থাপনা কিংবা উত্তরাঞ্চলের খাদ্য ও দারিদ্র্য নিয়ে বিশেষায়িত গবেষণা প্রতিষ্ঠান জাতীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কিন্তু সেই প্রতিষ্ঠানকে ঢাকার একটি সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুকরণে অসংখ্য গতানুগতিক বিভাগ খোলার প্রয়োজন নেই। স্থানীয় সমস্যা, জাতীয় গবেষণা অগ্রাধিকার এবং সম্ভাব্য কর্মসংস্থানের সঙ্গে সংযুক্ত বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানই অধিক যুক্তিযুক্ত। সংসদে উত্থাপিত দাবিগুলোর অনেক ক্ষেত্রেই স্থানীয় গবেষণার যুক্তি দেওয়া হয়েছে, কিন্তু সেই যুক্তির পক্ষে স্বাধীন চাহিদা সমীক্ষা, অর্থায়ন পরিকল্পনা বা শিক্ষক সরবরাহের বিশ্লেষণ প্রকাশ করা হয়নি।
আমার মনে হয়, নতুন সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদনে অন্তত দুই বছরের একটি নীতিগত বিরতি দিয়ে জাতীয় উচ্চশিক্ষা সক্ষমতা নিরীক্ষা করা উচিত। তবে বিশেষায়িত ও প্রমাণিত জাতীয় প্রয়োজনের প্রকল্পকে ব্যতিক্রম রাখার সুযোগ থাকতে পারে। নিরীক্ষায় অঞ্চলভিত্তিক শিক্ষার্থী চাহিদা, বর্তমান আসনের ব্যবহার, শিক্ষক সরবরাহ, স্নাতকদের কর্মসংস্থান, গবেষণার বিশেষায়ন এবং ভবিষ্যৎ জনমিতি বিবেচনায় নিতে হবে। একই সাথে ইউজিসির প্রতিটি সম্ভাব্যতা প্রতিবেদন, পরিদর্শন ফলাফল এবং অনুমোদনের যুক্তি জনসমক্ষে প্রকাশ করা উচিত। কে আবেদন করেছেন, অর্থের উৎস কী, বোর্ড অব ট্রাস্টিজে কারা আছেন, জমি ও অবকাঠামোর অবস্থা কী, প্রথম দশ বছরের আর্থিক পরিকল্পনা কী এবং প্রতিষ্ঠান বন্ধ হলে শিক্ষার্থীদের কীভাবে সুরক্ষা দেওয়া হবে, এসব তথ্য নাগরিকের জানার অধিকার। প্রাথমিক অনুমোদনকে বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার পূর্ণ লাইসেন্স না বানিয়ে ধাপে ধাপে ক্ষমতা দেওয়া দরকার।
প্রথম পর্যায়ে সীমিত কয়েকটি বিষয়ে স্নাতক শিক্ষা, পরবর্তী পর্যায়ে ফলাফল যাচাই করে স্নাতকোত্তর এবং গবেষণার সক্ষমতা প্রমাণের পর পিএইচডি চালুর অনুমতি দেওয়া যেতে পারে। ইংল্যান্ডের বিষয় ও স্তরভিত্তিক ডিগ্রি প্রদানের ক্ষমতা এবং অস্ট্রেলিয়ার ঝুঁকিভিত্তিক মূল্যায়ন থেকে বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে শিক্ষা নিতে পারে। প্রত্যেক বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য পূর্ণকালীন শিক্ষক অনুপাত, শিক্ষকপ্রতি শিক্ষার্থী, গবেষণা ব্যয়, স্নাতক সম্পন্নের হার, চাকরি বা উচ্চশিক্ষায় প্রবেশের হার, অভিযোগ নিষ্পত্তি, নিরীক্ষিত আর্থিক হিসাব এবং অ্যাক্রেডিটেশন অবস্থা নিয়ে বার্ষিক প্রকাশ্য স্কোরকার্ড চালু করা দরকার। এসব সূচকে টানা ব্যর্থ হলে নতুন ভর্তি স্থগিত, প্রোগ্রাম বন্ধ, অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে একীভূতকরণ কিংবা সনদ বাতিল করতে হবে।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইনেও মান নিশ্চিতকরণ, পরিদর্শন, হিসাব নিরীক্ষা এবং সনদ বাতিলের বিধান রয়েছে, প্রয়োজন হলো তার দৃশ্যমান ও সমান প্রয়োগ। আমার মতে, সংখ্যা বৃদ্ধির বাজেটকে গবেষণা ও বিদ্যমান বিশ্ববিদ্যালয়ের মানোন্নয়নে স্থানান্তর করতে হবে। প্রতিযোগিতামূলক গবেষণা অনুদান, গবেষণাগার, ডিজিটাল জার্নাল, পিএইচডি বৃত্তি, পোস্টডক্টরাল পদ, আন্তর্জাতিক যৌথ গবেষণা এবং গবেষণা প্রশাসনে বিনিয়োগ ছাড়া র্যাংকিংয়ে উল্লেখযোগ্য উন্নতি হবে না। গবেষণা ও জ্ঞান আবিষ্কার যখন কিউএস র্যাংকিংয়ের অর্ধেক ওজন বহন করে, তখন নতুন ভবন নির্মাণের চেয়ে গবেষণার পরিবেশ তৈরিই বেশি কার্যকর বিনিয়োগ।
আমাদের মনে রাখার দরকার বাংলাদেশে প্রশ্নটি ‘নতুন বিশ্ববিদ্যালয় চাই কী চাই না’ এত সরল নয়। প্রকৃত প্রশ্ন হলো, আমরা বিশ্ববিদ্যালয় চাই, নাকি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাইনবোর্ড চাই? কোনও অঞ্চল বা জনগোষ্ঠী উচ্চশিক্ষা থেকে বঞ্চিত থাকলে—সেখানে সুযোগ সৃষ্টি করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কিন্তু সেই দায়িত্ব নিম্নমানের ডিগ্রির দোকান খুলে পালন করা যায় না। একইভাবে উদ্যোক্তার অর্থ থাকলেই তাকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার অধিকার দেওয়া যায় না, কারণ বিশ্ববিদ্যালয় সাধারণ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নয়— এটি জনস্বার্থে পরিচালিত জ্ঞান, দক্ষতা ও নাগরিকতা তৈরির প্রতিষ্ঠান।
নতুন ১০টি প্রস্তাবিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদনের আগে সরকারকে তাই একটি প্রশ্নের উত্তর প্রকাশ্যে দিতে হবে—এই প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশের কোন অপূর্ণ অ্যাকাডেমিক, গবেষণা বা আঞ্চলিক প্রয়োজন পূরণ করবে, যা বিদ্যমান ১৭৪টি বিশ্ববিদ্যালয় পূরণ করতে পারছে না? সেই প্রশ্নের তথ্যভিত্তিক উত্তর না থাকলে নতুন অনুমোদন উচ্চশিক্ষার সম্প্রসারণ হিসেবে নয়, বরং একটি নতুন বাণিজ্যিক বাজার বা প্রভাবশালী গোষ্ঠীর প্রকল্প হিসেবে সন্দেহের জন্ম দেবে। সরকারকে ভাবতে হবে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা জাতীয় মর্যাদার মাপকাঠি নয়। একটি দেশের উচ্চশিক্ষার শক্তি নির্ধারিত হয় সে কতটি নতুন নামফলক বসিয়েছে তা দিয়ে নয়, বরং তার বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কতটা স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে পারে, কতটা নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করে, শিক্ষার্থীদের কতটা দক্ষ করে তোলে এবং সমাজের বাস্তব সমস্যার কতটা কার্যকর সমাধান দিতে পারে তা দিয়ে।
লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, আইন বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়




