১১ বছর আগে যশোর জেলার ঝিকরগাছা উপজেলার বাঁকুড়া ইউনিয়নের বালিয়াডাঙ্গি গ্রামের শহিদুল ইসলামের ছেলে আরিফুল ইসলাম জীবিকার তাগিদে মালয়েশিয়ায় পাড়ি জামান। দীর্ঘদিন পর সোমবার রাতে দেশে আসেন তিনি। রাতে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান তিনি। আরিফুলকে আনতে তার ভাই রাকিব হোসেন, মা নুরজাহান বেগম, বোন আয়েশা বেগম ও ভাগ্নে আশরাফুল ও ভাগ্নি তাসফিয়া একটি প্রাইভেটকারে বিমানবন্দরে যান।
বাড়িতে ফেরার পথে ভোররাত পৌনে ৪টার দিকে ঢাকা-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ের মালিগ্রাম এলাকায় দাঁড়িয়ে থাকা একটি বিকল ট্রাকের পেছনে সজোরে ধাক্কা দেয় প্রাইভেটকারটি। এতে কারটি দুমড়ে-মুচড়ে যায়। ঘটনাস্থলেই নিহত হন চার জন। হাসপাতালে নেওয়ার পর আহত আরও একজনের মৃত্যু হয়।
নিহতরা হলেন ঝিকরগাছা উপজেলার বালিয়াডাঙ্গা গ্রামের শহিদুল ইসলামের স্ত্রী নুরজাহান বেগম (৫৫), তাদের বড় ছেলে মালয়েশিয়া প্রবাসী আরিফ হোসেন (৩০), ছোট ছেলে রাকিব হোসেন (২০), মেয়ে আয়শা খাতুন (৩৫) এবং প্রাইভেটকারের চালক যশোরের মণিরামপুর উপজেলার চালুহাটি গ্রামের জাহিদ হোসেন (৩৫)।
দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়েছেন আয়শা খাতুনের ছেলে হুসাইন (৮) ও মেয়ে তাসফিয়া খাতুন (৩)। তারা ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা ও হাইওয়ে থানা পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে আহতদের উদ্ধার করে ভাঙ্গা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখানে রাকিব, নুরজাহান বেগম ও আয়েশা বেগম এবং প্রাইভেটকারের চালক জাহিদকে মৃত ঘোষণা করেন কর্তব্যরত চিকিৎসক।
গুরুতর আহত অবস্থায় প্রবাসী আরিফুল ইসলাম এবং তার ভাগ্নে আশরাফুল ও ভাগ্নি তাসফিয়াকে ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। পথে প্রবাসী আরিফুল ইসলাম মারা যান। শিশু আশরাফুল ও তাসফিয়া বর্তমানে ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে। তাদের অবস্থাও আশঙ্কাজনক।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, প্রাইভেটকারটির গতি অনেক বেশি ছিল। এ ছাড়া চালকের চোখে হয়তো ঘুম ছিল, এ কারণেই দুর্ঘটনা ঘটেছে।
স্থানীয়রা জানান, ভূমিহীন পরিবারের সন্তান আরিফ ১১ বছর আগে সংসারের হাল ধরতে পাড়ি জমিয়েছিলেন প্রবাসে। মালয়েশিয়ায় ঘাম ঝরানো উপার্জনে পাঁচ শতক জমি কিনে মাথাগোঁজার ঠাঁই করেছিলেন। এক দশক পর সোমবার রাতে ছুটিতে দেশে ফেরেন আরিফ। বাড়ি ফিরেই বুধবার বিয়ের জন্য পাত্রী দেখতে যাওয়ারও কথা ছিল। এক বুক আশা ও আনন্দ নিয়ে প্রিয় সন্তানকে রিসিভ করতে ঢাকার বিমানবন্দরে ছুটে গিয়েছিলেন মা নুরজাহানসহ পুরো পরিবার। কিন্তু দুর্ঘটনার কারণে বাড়ি ফেরা আর হলো না। এখন সেই বাড়িতে চলছে শোকের মাতম।
ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, পরিবারের পাঁচ সদস্যের মধ্যে শুধু বাড়িতে থাকায় বেঁচে গেছেন আরিফের বাবা শহিদুল ইসলাম। স্বজনদের হারিয়ে এখন পাগলপ্রায় তিনি।
নিহত প্রবাসী আরিফুলের দুলাভাই ইলিয়াস হোসেন বলেন, ‘দীর্ঘদিন পর গতকাল রাতে মালয়েশিয়া থেকে দেশে ফেরেন আমার বড় শ্যালক। তাকে আনতে আমার স্ত্রী, ছোট শ্যালক ও শাশুড়িসহ ছেলেমেয়েরা বিমানবন্দরে গিয়েছিলেন। বাড়িতে আসার পথে এ দুর্ঘটনা ঘটে। এই মর্মান্তিক মৃত্যু কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছি না আমরা। আজকে যে বাড়ি আনন্দময় থাকার কথা, সেখানে এখন শোকের মাতম চলছে।’
আরিফের মামা নজরুল ইসলাম বলেন, ‘আরিফ ১১ বছর বিদেশে ছিল। সোমবার দিবাগত রাতে বিমানবন্দরে পৌঁছে। সন্তানকে আনতে গিয়েছিল মা নূরজাহান বেগম ও তার দুই সন্তান, নাতি-নাতনি। ফেরার পথে চার জন মারা গেছে। বাবা ছাড়া পরিবারে কেউ নেই। বাড়িতে কান্না করারও লোক নেই।
শিবচর হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান জানান, চার জনের মরদেহ উদ্ধার করে থানায় রাখা হয়েছে। প্রবাসীর মরদেহ ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে রয়েছে। প্রাইভেটকার ও ট্রাকটিকে জব্দ করা হয়েছে। নিহতের স্বজনরা এসেছেন, তাদের কাছে মরদেহ হস্তান্তরের প্রক্রিয়া চলছে। মামলার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।









