স্বাস্থ্যমন্ত্রীর ‌গর্জনের পরও ‘যেই লাউ সেই কদু’

এ.এস.এম.নাসিম, নোয়াখালী
১৮ জুন ২০২৬, ২০:০৬আপডেট : ১৮ জুন ২০২৬, ২০:৫২

নোয়াখালী সফরে এসে গত মঙ্গলবার স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন হঠাৎ ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতাল পরিদর্শন করেন। এ সময় চিকিৎসাসেবায় নানা অব্যবস্থাপনা ও নোংরা পরিবেশ এবং চিকিৎসকদের দেরিতে উপস্থিতির প্রমাণ পেয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। সঙ্গে সঙ্গে দায়িত্বে অবহেলার দায়ে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. ফরিদ উদ্দিন চৌধুরীকে তাৎক্ষণিক প্রত্যাহারের নির্দেশ দেন তিনি। তবে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর এমন ক্ষোভের পরও হাসপাতালে কোনও পরিবর্তন আসেনি। চলছে আগের মতোই।

মঙ্গলবার দুপুর দেড়টার দিকে হাসপাতাল পরিদর্শনকালে মোবাইল ফোনে তিনি তত্ত্বাবধায়ককে প্রত্যাহারের নির্দেশ দেন। এ নির্দেশনার পরপরই স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে ঘিরে বিক্ষোভ করেন হাসপাতালের বাইরে থাকা কিছু লোকজন। তাদের বিক্ষোভের মুখে বিরক্তি প্রকাশ করে সেখান থেকে চলে যান স্বাস্থ্যমন্ত্রী।

তত্ত্বাবধায়ককে প্রত্যাহারের নির্দেশনার পরপরই স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে ঘিরে বিক্ষোভ করেন হাসপাতালের বাইরে থাকা কিছু লোকজন

হাসপাতালের দায়িত্বশীল একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সেদিন মন্ত্রীর সামনে বিক্ষোভ করেছেন দালাল ও বহিরাগতরা। মন্ত্রী হাসপাতাল পরিদর্শন শেষে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছেন। সেইসঙ্গে জেলা সিভিল সার্জন ডা. আনোয়ার হোসেনকে হাসপাতালে তত্ত্বাবধায়কের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে এখনও তদন্ত প্রতিবেদন আসেনি। এমনকি যেসব বিষয়ে মন্ত্রী ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন, সেগুলোর কোনোটিতে পরিবর্তন আসেনি। আগের মতো অবস্থায় চলছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, আগের মতোই চলছে সবগুলো ওয়ার্ডে চিকিৎসাসেবা। চিকিৎসাসেবায় নানা অব্যবস্থাপনা ও নোংরা পরিবেশ এবং চিকিৎসকদের দেরিতে উপস্থিতি বৃহস্পতিবার পর্যন্ত আগের মতোই ছিল। দুপুরের পর থেকে কোনও চিকিৎসকের দেখা মেলেনি চেম্বারে। নোংরা পরিবেশও কাটেনি। যেই লাউ সেই কদু।

সরজমিনে হাসপাতাল ও বিভিন্ন ওয়ার্ড ঘুরে দেখা যায়, ওয়ার্ডের বিভিন্ন স্থানে এখনও ময়লা পানি ও বর্জ্য পড়ে আছে। সেগুলো পরিষ্কার করার দিকে কারও কোনও নজর নেই। রোগীদের অভিযোগ, আজও বাড়তি টাকা না দিলে মিলছে না চিকিৎসাসেবা। প্রত্যেকটি বেড নিতেই দিতে হচ্ছে বাড়টি টাকা (ঘুষ)।

একাধিক সরকারি চাকরিপ্রার্থী যারা বিভিন্ন সরকারি দফতরে যোগদানের জন্য মেডিক্যাল রিপোর্ট করাতে হাসপাতালে এসেছেন, তাদের মধ্যে অন্তত পাঁচ জন বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন, সরকারি ফি ছাড়াও তাদের কাছ থেকে বাড়তি টাকা নেওয়া হয়েছে। এক্স-রে করাতে সরকারি ফি ২০০ টাকার স্থলে তাদের থেকে ৩০০ টাকা করে নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া অন্যান্য পরীক্ষা করাতেও হয়রানির শিকার হচ্ছেন।

এ বিষয়ে দুজন ভুক্তভোগী সরাসরি সিভিল সার্জনের কাছে গিয়ে অভিযোগ করেছেন। সিভিল সার্জন তাৎক্ষণিক বিষয়টি খোঁজ নিলে অতিরিক্ত টাকাগুলো তাদের ফেরত দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।

হামের আইসোলেশন ওয়ার্ডে চার জন রোগীর স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সেখানেই গত তিন দিন কোনও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক পরিদর্শনে আসেননি। মেডিক্যাল অফিসাররাই দিনে একবার রোগীদের দেখতে আসেন। সারাদিনে রোগীরা আর কোনও চিকিৎসকের দেখা পান না। তাদের কাছে গেলেও চিকিৎসা দেন না।

 স্বাস্থ্যমন্ত্রী নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতাল পরিদর্শন করেছেন গত মঙ্গলবার

জসিম হোসেন নামে এক রোগীর স্বজন অভিযোগ করে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‌‘আমরা এখানে এসেছি চিকিৎসাসেবা নিতে। গরমের ভেতর অনেক কষ্টে আমাদের এখানে থাকতে হয়। কিন্তু এখানে চিকিৎসকদের দেখা পাওয়া যায় না। দিনে একবার মেডিক্যাল অফিসাররা আসেন। অন্য সময় আমাদের রোগীদের অবস্থা খারাপ হলেও তাদের আর পাওয়া যায় না। সব চিকিৎসক বাইরে গিয়ে চেম্বার করা নিয়েই ব্যস্ত থাকেন। আমরা রোগীদের চিকিৎসার কথা ভেবে ভয়ে কিছু বলতেও পারি না। মন্ত্রী বলার পরও কোনও পরিবর্তন হয়নি।’

চার বছরের ছেলে জোবায়ের হোসেনকে তিন দিন আগে হামের চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে ভর্তি করেছেন কোম্পানীগঞ্জের চর বালুয়ার বাসিন্দা আবু জাকের। চিকিৎসা পেতে ভোগান্তির কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘গতকাল বেলা ১১টায় একবার ডাক্তার এসেছিলেন। আজ দুপুর পর্যন্ত কোনও ডাক্তারের দেখা পাইনি।’

সরেজমিনে দেখা গেছে, আগের মতোই চলছে সবগুলো ওয়ার্ডে চিকিৎসাসেবা

এদিকে, মৌখিকভাবে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়কের অতিরিক্ত দায়িত্ব পাওয়ার পর বুধবার সকাল সাড়ে ৯টায় হাসপাতাল পরিদর্শন করেন সিভিল সার্জন ডা. আনোয়ার হোসেন। এ বিষয়ে তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে, ‘আমি মৌখিকভাবে হাসপাতালের দায়িত্ব পেয়েছি। এখনও লিখিত কোনও অর্ডার পাইনি। তবু সকাল ৯টায় হাসপাতালে এসে চিকিৎসক ও রোগীদের সঙ্গে কথা বলেছি। বিভিন্ন বিভাগে গিয়েছি এবং পুরো হাসপাতাল পরিদর্শন করেছি।’ 

হাসপাতালে জনবল সংককট যেমন রয়েছে পাশাপাশি অনেক ধরনের অনিয়মও রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমরা অনিয়মগুলো চিহ্নিত করার চেষ্টা করছি। অনিয়মগুলো চিহ্নিত করে এ ধরনের অনিয়মের সঙ্গে যারা জড়িত প্রত্যেকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এসব অনিয়ম দূর করতে একটু সময়ও লাগবে।’

/এএম/ 
সম্পর্কিত
বাড়ি কোথায় বলতে পারছে না শিশুটি, পরিবার হারিয়ে হাসপাতালে কাঁদছে
আয়ু বৃদ্ধির ওষুধের ‘বাঁচা-মরার’ লড়াই
এবার শাস্তির মুখে পড়তে যাচ্ছে আদ-দ্বীন কর্তৃপক্ষ
সর্বশেষ খবর
গোলকিপারের বীরত্বে ইকুয়েডরকে রুখে দিয়েছে কুরাসাও
গোলকিপারের বীরত্বে ইকুয়েডরকে রুখে দিয়েছে কুরাসাও
বাবা হারানোর বেদনা থেকে দোলার গান ‘বাবার ছায়া’
বাবা হারানোর বেদনা থেকে দোলার গান ‘বাবার ছায়া’
সাজা শেষ হলেও মুক্তি মিলছে না কত বিদেশির
সাজা শেষ হলেও মুক্তি মিলছে না কত বিদেশির
‘অ্যাডলফ হিটলার’ নামে পিৎজা অর্ডার করায় কলেজছাত্রের কারাদণ্ড
‘অ্যাডলফ হিটলার’ নামে পিৎজা অর্ডার করায় কলেজছাত্রের কারাদণ্ড
সর্বাধিক পঠিত
হঠাৎ ইসলামী ব্যাংকের সতর্কবার্তা জারি
হঠাৎ ইসলামী ব্যাংকের সতর্কবার্তা জারি
৫০১ নম্বর কক্ষকে ‘বিজয়ের প্রতীক’ ঘোষণা মামুনুল হকের
৫০১ নম্বর কক্ষকে ‘বিজয়ের প্রতীক’ ঘোষণা মামুনুল হকের
হাই স্পিড ট্রেনে বেইজিং যাবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান
হাই স্পিড ট্রেনে বেইজিং যাবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান
প্রধানমন্ত্রী কবে ভারত সফরে যাবেন, জানালেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা
প্রধানমন্ত্রী কবে ভারত সফরে যাবেন, জানালেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা
বিদেশ সফরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফরসঙ্গী কতজন
বিদেশ সফরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফরসঙ্গী কতজন