আয়ু বৃদ্ধির ওষুধের ‘বাঁচা-মরার’ লড়াই

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
১৯ জুন ২০২৬, ১০:০৫ আপডেট : ১৯ জুন ২০২৬, ১০:০৫

মানুষের কোষকে কি আসলেই তরুণ করে তোলা সম্ভব? এই তত্ত্বের সত্যতা যাচাইয়ে বিশ্বে প্রথমবারের মতো মানুষের ওপর শুরু হয়েছে একটি ওষুধের ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল। দীর্ঘায়ু সংক্রান্ত চিকিৎসা বিজ্ঞানের অন্যতম প্রতিশ্রুতিশীল এই তত্ত্বের জন্য এটিকে একটি বড় ‘বাঁচা-মরার’ মুহূর্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে।

প্রাথমিক পর্যায়ের এই ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল মূলত এটিই নির্ধারণ করবে যে, মানুষের শরীরে কোষের পুনর্গঠন প্রক্রিয়া নিরাপদে করা সম্ভব কি না। ভবিষ্যতে যেকোনও চিকিৎসার মাধ্যমে মানুষের জৈবিক বার্ধক্য ধীর করা কিংবা বয়স উল্টো পিঠে ঘুরিয়ে দেওয়ার দাবি প্রতিষ্ঠিত করার জন্য এটিই প্রথম ও প্রধান শর্ত।

মানুষের আয়ু বাড়ানোর এই প্রচেষ্টায় একদিকে যেমন সুষম খাদ্য ও ব্যায়ামের মতো সাধারণ বিষয় রয়েছে, তেমনি রয়েছে তরুণ দাতাদের শরীর থেকে প্লাজমা নেওয়ার মতো ব্যয়বহুল পদ্ধতিও। প্রথম পদ্ধতিটি কয়েক দশকের বিজ্ঞান দ্বারা প্রমাণিত। তবে দ্বিতীয় পদ্ধতিটির বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন (এফডিএ) ইতোমধ্যে দুবার সতর্কবার্তা জারি করে বলেছে, এর মাধ্যমে কোনও ক্লিনিক্যাল উপকার পাওয়ার বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। সহজ কথায়, দীর্ঘায়ু পাওয়ার এই লড়াইয়ে যেমন বিজ্ঞানসম্মত জীবনযাত্রার ভূমিকা আছে, তেমনি এর আড়ালে রয়েছে চটকদার ভণ্ডামিও।

তবে এর মাঝামাঝি একটি অত্যন্ত আকর্ষণীয় বৈজ্ঞানিক ভিত্তি রয়েছে। সেটি হলো, বার্ধক্য আসলে একটি জৈবিক প্রক্রিয়া, যা অন্যান্য হাজারো শারীরিক প্রক্রিয়ার মতো চিকিৎসার মাধ্যমে পরিবর্তন করা সম্ভব।

যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অন এজিং-এর সাবেক পরিচালক ফেলিপ সিয়েরা বলেন, এই খাতের দুটি বড় দিক রয়েছে। একদিকে খুব গুরুতর এবং প্রতিশ্রুতিশীল কিছু বৈজ্ঞানিক গবেষণা চলছে, যা নানা কারণে মানুষের ওপর সঠিকভাবে পরীক্ষা করা হচ্ছে না। অন্যদিকে, কিছু প্রতারক চক্র রয়েছে যারা যুক্তিহীন ও অসম্ভব সব প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে।

ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের অংশ হিসেবে গত সপ্তাহে প্রথম একজন রোগীর শরীরে গ্লুকোমার মতো চোখের জটিল রোগের চিকিৎসায় একটি পরীক্ষামূলক জিন থেরাপি প্রয়োগ করা হয়েছে। গ্লুকোমা এমন একটি রোগ যা মানুষকে অন্ধত্বের দিকে ঠেলে দেয়। এই থেরাপিটি মূলত তিনটি জিনকে লক্ষ্য করে কাজ করে, যা বুড়িয়ে যাওয়া কোষগুলোকে আংশিকভাবে পুনর্গঠন করতে পারে। এই পরীক্ষার মূল লক্ষ্য হলো চোখ থেকে মস্তিষ্কে সংযোগকারী নিউরনগুলোর কার্যক্ষমতা ফিরিয়ে আনা।

এই ট্রায়ালের অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠান লাইফ বায়োসায়েন্সেস। এর অন্যতম সহ-প্রতিষ্ঠাতা হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডেভিড সিনক্লেয়ার, তিনি এই দীর্ঘায়ু বিজ্ঞান খাতের অন্যতম সুপরিচিত এবং একই সাথে বিতর্কিত একজন বিশেষজ্ঞ। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, তাদের লক্ষ্য হলো কোষের পুনর্যৌবন থেরাপির মাধ্যমে বার্ধক্যজনিত রোগগুলোকে নিরাময় করা।

তবে মনে রাখতে হবে, এখন যে কাজটির ট্রায়াল চলছে তা কেবল এই থেরাপির নিরাপত্তা মূল্যায়ন করছে। এটি সফল হলেও ওষুধটি আসলেই কাজ করে কি না, তা প্রমাণ করতে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে। পরবর্তী কার্যকারিতা পরীক্ষায় এটি বার্ধক্য কমায় কি না, তা দেখা হবে না, বরং দেখা হবে এটি গ্লুকোমা নিরাময় করতে পারছে কি না। তবে এটি সফল হলে তা হবে সেলুলার রিপ্রোগ্রামিংয়ের জন্য একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক।

ইউনিভার্সিটি অব ওয়াশিংটনের হেলদি এজিং অ্যান্ড লনজিভিটি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক ম্যাট কেবারলেইন বলেন, আমার মনে হয় এই এপিজেনেটিক রিপ্রোগ্রামিং যদি সফল হয়, তবে তা এই চিকিৎসা খাতের জন্য একটি যুগান্তকারী মুহূর্ত হবে।

বিজ্ঞানটি একদম নতুন হলেও এই খাতে শত শত মিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ থেমে নেই। সেলুলার রিপ্রোগ্রামিং নিয়ে কাজ করা বেশ কিছু বায়োটেক কোম্পানির বাজারমূল্য ইতোমধ্যে বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সম্প্রতি তহবিল সংগ্রহের পর নিউলিমিট নামক একটি স্টার্টআপের মূল্যায়ন দাঁড়িয়েছে ৩.১ বিলিয়ন ডলারে, অথচ তাদের তৈরি প্রথম ওষুধটির মানুষের ওপর পরীক্ষামূলক প্রয়োগ আগামী বছরের আগে শুরুই হবে না। এই কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা ক্রিপ্টোকারেন্সি এক্সচেঞ্জ কয়েনবেস-এর সিইও ব্রায়ান আর্মস্ট্রং।

প্রযুক্তি বিশ্বের অন্য বিলিয়নিয়ারদেরও এই খাতে বড় বিনিয়োগ রয়েছে। চ্যাটজিপিটি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ওপেনএআই-এর সিইও স্যাম অল্টম্যান রেট্রো বায়োসায়েন্সেস-এ ১৮০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছেন, যার বর্তমান বাজারমূল্য ১.৮ বিলিয়ন ডলার। এ ছাড়া অ্যামাজনের প্রতিষ্ঠাতা জেফ বেজোসের অর্থায়নে ২০২২ সালে ৩ বিলিয়ন ডলার মূলধন নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল অ্যাল্টোস ল্যাবস। সবার নজর এখন প্রথম ট্রায়ালের ফলাফলের দিকে।

সূত্র; অ্যাক্সিওস

/এএ/
সম্পর্কিত
অস্ত্র সমর্পণে ইরানি গোষ্ঠীগুলোকে নতুন সময় দিলো ইরাক
ব্রাজিলের নির্বাচনে প্রার্থী ‘ট্রাম্প’, ‘ওবামা’, কেন জানেন?
যুক্তরাষ্ট্র হামলা করলে আরও কঠোর জবাবে প্রস্তুত ইরান, অনিশ্চিত কূটনীতি
সর্বশেষ খবর
‘মার্চ ফর ইনসাফ’ কর্মসূচি ঘোষণা ইনকিলাব মঞ্চের
‘মার্চ ফর ইনসাফ’ কর্মসূচি ঘোষণা ইনকিলাব মঞ্চের
বাংলামোটরে ওষুধ ব্যবসায়ীর ওপর হামলা, বহিষ্কৃত যুবদল নেতা আটক
বাংলামোটরে ওষুধ ব্যবসায়ীর ওপর হামলা, বহিষ্কৃত যুবদল নেতা আটক
বিয়ের পর স্বামীর পদবি নেওয়ার রীতি এলো যেভাবে
বিয়ের পর স্বামীর পদবি নেওয়ার রীতি এলো যেভাবে
দুই মন্দিরে চুরির ঘটনায় চার জন গ্রেফতার 
দুই মন্দিরে চুরির ঘটনায় চার জন গ্রেফতার 
সর্বাধিক পঠিত
ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে ‘বের করে দিলেন’ রুবিও
ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে ‘বের করে দিলেন’ রুবিও
এলপিজি: বেশি দামে বিক্রি হলে কঠোর ব্যবস্থা
এলপিজি: বেশি দামে বিক্রি হলে কঠোর ব্যবস্থা
‘আম্মার উড়ে আসা নেতা’, কার ওপর গজব পড়ার কথা বললেন উমামা
‘আম্মার উড়ে আসা নেতা’, কার ওপর গজব পড়ার কথা বললেন উমামা
স্পিকারের সঙ্গে দেখা করে বের হয়ে যা বললেন ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি
স্পিকারের সঙ্গে দেখা করে বের হয়ে যা বললেন ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি
বিএনপির রাজনীতিতে যেভাবে উত্থান ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির
বিএনপির রাজনীতিতে যেভাবে উত্থান ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির