পোলিশ আন্তর্জাতিক কবিতা উৎসব

কবিতায় হেমন্তের ঘ্রাণ ।। পর্ব—৩

হাসানআল আব্দুল্লাহ
২৮ মে ২০২৬, ০০:০০আপডেট : ২৮ মে ২০২৬, ০০:০০

একবছর পর। ১২ নভেম্বর, ২০২৫

চিহানোভে অনুষ্ঠিত ৩০তম আন্তর্জাতিক কবিতা উৎসবের পর্দা পড়েছে। বাসে করে আমরা হোটেলে এসে নামলাম সন্ধ্যা ছয়টা নাগাদ। প্রায় সকলেই বাস থেকে নেমে গেছেন। ডারিউস লেবিয়ডা আইলের বাম দিকে আর ডান দিকের দুই চেয়ারে বসে আছেন হাতিফ জানাবি ও হুসেন হাবেশ। তাদের গল্পই যেন ফুরোচ্ছে না। আমি নেমে আসার সময় পকেট থেকে ডারিউস কিছু একটা বের করে বললেন, “হাসানআল সুইডিশ একাডেমি এটা তোমার জন্যে পাঠিয়েছে।” আমি একটু অবাক হয়ে তাঁর হাতে ধরা সোনালি চাকতির দিকে তাকিয়ে দেখি আলফ্রেড নোবেলের ছবি। ভাবছি কী উত্তর দেবো। ওদিক থেকে হাতিফ ও হুসেন দু’জনেই হেসে কুটিকুটি। হাতিফ বলে উঠলেন, “হাসানআল এখনো বয়সে ছোটো। ওই পুরস্কার পাবার সময় তার এখনো হয়নি।” এবার আমি সুযোগ পেয়ে যাই, উত্তরের জন্যে আর ভাবতে হয় না । আমি বলি, “ওটা বরং আপাতত আমার বড়ো ভাই হাতিফকে দিয়ে দিন। আমি পরে কোনো একবছর নেবো।” সবাই একযোগে হেসে উঠলে আমিও তাদের সাথে যোগ দেই। পরদিন সকালে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টির ভেতর ভ্রসলোভ-এর দিকে গাড়ি চালাচ্ছিলেন কাতারজিনা। আমরা ইতোমধ্যে হোটেল ছেড়ে হাইওয়েতে উঠে পড়েছি। প্রথমেই তাঁর ছোটোবোনের বাসায় যাবো, যার মেয়ে নেয়োমির ১৫তম জন্মদিনে পারিবারিক লাঞ্চে যোগ দিতে হবে। গাড়ি চালাতে হবে সাড়ে চারশো’ কিলোমিটার। এক দফা রাস্তা ভুল করে বিরক্ত হয়ে যখন তিনি গাড়ি ঘোরাতে ব্যস্ত, আমি বাসের ওই ঘটনা রসিয়ে রসিয়ে বললে হাসির দমকে তাঁর বিরক্তি কেটে গেলো। তিনি বললেন, “পৃথিবীতে যতদিন রসিকতা আছে, ততদিন মানুষের ধ্বংস নেই।”

আমি বলি, “তোমার ভাগনির জন্ম আরেকদিন পরে হলে কি এমন ক্ষতি হতো! তিন দিনের কবিতা উৎসব সেরে বাসায় ফিরে আরামের ঘুম দিয়ে আমরা পরের দিন জন্মদিনের কেক কাটতে পারতাম।”

তিনি রসিকতা ধরতে পারলেন, বললেন, “আদতে ওর জন্মদিন দুই দিন আগে। কিন্তু শুক্র ও শনিবার পরিবারের সবাই একত্রিত হতে পারবেন না বলে আজ অনুষ্ঠান করা হচ্ছে। না গেলেই নয়।”

গাড়ি চেহানোভ থেকে দক্ষিণ দিকে ছুটে চললো গ্রামের ভেতর দিয়ে। এমন সাজানো গোছানো গ্রামকে আদতে গ্রাম বলা যায় কিনা তাই ভাবছিলাম। বললাম, “তোমাদের এখানে একটা জিনিস আমার ভালো লাগে। সব কিছু একেবারে হিসাব করে সাজিয়ে রাখা। গাছের পরে গাছ, ক্ষেতের পরে খেত, বাড়ির পরে বাড়ি—একটা সমীকরণের ভেতর ফেলে রাখা হয়েছে। পরিপাটি, সুন্দর, সুশৃঙ্খল।”

তিনি বললেন, “যারা এমনকি ক্ষেত করেন, গাছ লাগান তারাও আগে থেকে হিসাব করে নেন, কীভাবে এগুলোর পরিচর্যা করা যাবে, পরিপাটি রাখা যাবে। অনেকসময় দেখি যে শনিবারে গ্রামের সবাই একসাথে বের হয়ে রাস্তা-ঘাট পরিষ্কার করছেন। একটা খড়কুটোও রাস্তায় থাকতে দেন না।”

আমি মনে মনে বাংলাদেশের সাথে তুলনা করতে চাই। আমাদের গ্রামও যে কম পরিপাটি কম পরিষ্কার তা তো নয়। গত বিশ পঁচিশ বছরে সারা দেশকে ইলেকট্রিসিটির আওতায় আনা, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে এমনকি অজপাড়াগাঁয়েও নতুন রাস্তা ও সরকারি খরচে তাকে পাকা করে দেওয়ার ব্যবস্থা গ্রামের পরিবেশের যথেষ্ট উন্নতি ঘটিয়েছে। তবে জাতিগতভাবে আমরা যে কতটা অপরিষ্কার তাতো আর লিখে শেষ করার নয়! শহরে গেলে সেটা বোঝা যায়। ঢাকা শহরকে তো আমার আরো চল্লিশ বছর আগে থেকে বসবাসের অযোগ্য শহর বলে মনে হয়েছে। রাজনৈতিক মারামারি, দেশ দখলের পাঁয়তারা ইত্যাদি হয়, কিন্তু সবাই মিলে দেশ পরিষ্কারের শপথ কখনো নেয় না। যাহোক, গাড়ির ভেতরে আমার বেশ গরম লাগতে থাকে। সেকথা বললে ক্যাতারজিনা ফোঁড়ন কাটেন, “মিস্টার আব্দুল্লাহ, আপনি যে বিশাল শীতের জ্যাকেট পরে আছেন! গরম তো লাগবেই।”

“কেনো, গত বছরের কথা মনে নেই! গাড়িতে করে ওয়ারশ যাবার সময় জ্যাকেট গায় দিয়েও ঠান্ডা লাগছিল?”

“কিন্তু সেটা তো নভেম্বরে।”

তাইতো আমিও মনে করার চেষ্টা করি। আমরা সবে অটম বা হেমন্ত কবিতা উৎসব করে এলাম। অক্টোবরের মাঝামাঝি সময় এটি। “তাহলে তো জ্যাকেট খোলার ব্যবস্থা করতে হয়।”

তিনি বলেন, “রাস্তার পাশে কোথাও গাড়ি থামিয়ে—উই উইল আনড্রেস!” তাঁর নিজের জ্যাকেটের দিকেও ইশারা করেন।

আমি হো হো করে হেসে উঠি, “এত তাড়াতাড়ি নয়। অন্তত বাড়ি পর্যন্ত যাই।” ইংরেজিতে “আনড্রেস” বলতে যে অন্যকিছু বোঝায় আমি সেই রসিকতাটা করি।

“ইউ স্নিকি ফক্স। আমি যেটা বুঝিয়েছি তা হলো আমাদের জ্যাকেট খোলার ব্যবস্থা করবো।” তিনিও কম যান না।

আমি হেসে বলি, “মাঝে মাঝে আমার স্ত্রীও এমন কিছু বলে ফেলেন যার অন্য মিনিং দাঁড়ায়, এবং তা নিয়েও আমি রসিকতা করি। তখন অবশ্য আমার স্ত্রী আরেকটু রসিকতা করে বলেন যে ‘কিন্তু তুমি এই গল্পটা আর করোর সাথে শেয়ার করতে পারবে না। এখন বুঝে দেখো কে বেশি রসিক!’ তিনি অনেক বেশি উইটি।”

কথা বলতে বলতে রাস্তার পাশে একটি বাস স্টপে গাড়ি থামে। আমি দ্রুত নেমে জ্যাকেটটি খুলে পিছের সিটে রেখে আবার নিজের সিটে এসে বসি। তিনি নিজের জ্যাকেট রেখে গাড়ির পিছন থেকে আমার জন্যে বড়ো একটি পানির বোতল বের করে আনেন। গাড়ি আবারও চলতে থাকে। আমরা ওয়ারশ শহরের পশ্চিম দিক দিয়ে হাইওয়ে ধরি। তিনি বলেন, “ওয়ারশ আমাদের থেকে তিরিশ কিলোমিটার পুবে।”

আমি বলি, “আমির কাল ফেসবুকে লিখেছেন যে আমরা দু’জনেই এখন পোল্যান্ডে আছি, কিন্তু একে অপরকে দেখছি শুধুমাত্র ফেসবুকে।”

“তোমাকেও তো ওদের দাওয়াত করার কথা ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত যোগাযোগটিও করে নাই।” বেশ আবেগের সাথে বলেন ক্যাতারজিনা। “আমি মারলেনাকে দেখলে এরপর কি ব্যবহারটি করবো বুঝে উঠতে পারছি না! দাওয়াত করবি না সেটি ভালো কথা, তবে অন্তত যোগাযোগটা তো করবি।”

“না, তুমি তাঁর সাথে কোনো খারাপ ব্যবহার করবে না। এমন ব্যবহার করবে যে সে আমাদের সাথে কোনো অন্যায়ই করেনি।” আমি গাড়ির উইন্ডসিল্টে বৃষ্টির ধারা দেখতে দেখতে আরো বলি, “দেখো, একজন মানুষের চরিত্রের অনেকগুলো দিক থাকে। গতবছর তোমার ডাকে সাড়া দিয়ে তিনি তাঁর বাসায় আমাদের রাখলেন। আমরা দুই রাত থাকলাম। পুরো শহর ঘুরে দেখলাম। তিনিই নিজ থেকে এগিয়ে এসে প্রোমিস করেছিলেন যে আমার বইটি প্রকাশ করবেন, পত্রিকায় বড়ো আর্টিকেল লিখবেন কাভারে আমার ছবি দিয়ে। কিন্তু সেসব কথা তিনি রাখতে পারেননি। এক্ষেত্রে তিনি আমাদের একটি মেসেজ দিয়ে জানিয়ে দিতে পারতেন যে উৎসবে দাওয়াত করা, বই প্রকাশ করা, এবং পত্রিকায় আর্টিকেল লেখা ইত্যাদি সম্ভব হচ্ছে না। বরং তিনি সম্পূর্ণভাবে আমাকে ও তোমাকে ইগনোর করেছেন। এটি তাঁর চরিত্রের একটি খারাপ দিক বলে আমার মনে হচ্ছে। কিন্তু আমরা ভালোটিই দেখবো। খারাপটি বাদ দেবো।”

“তুমি অত্যন্ত ভালো মানুষ।” ক্যাতারজিনা গাড়ির চালাতে চালাতে এক ঝলক আমার দিকে তাকিয়ে আবার রাস্তায় চোখ রাখলেন।

আমি বললাম, “ও ও ও। স্টিয়ারিং হুইলে হাত রাখো।”

তিনি তেতে উঠলেন, “আমি খুব ভালো ড্রাইভার, কখনো অ্যাক্সিডেন্ট করিনি।”

আমি বললাম, “চৌত্রিশ বছর গাড়ি চালানোর অভিজ্ঞতা আমার আছে। অতএব স্টিয়ারিং হুইলে অন্তত একটি হাত রাখতে হবে। তুমি অরকেস্ট্রার নির্দেশনা দাও, কিন্তু সেটা দুই হাতে নয়। এক হাতে।” তিনি মাঝে মাঝে স্টিয়ারিং হুইল ছেড়ে দিয়ে দুইহাত নাচিয়ে কথা বলছিলেন।

“আমি ঠিক আছি।” তিনি ভোঁ ভোঁ করে গাড়ি টেনে গেলেন। তাঁর এই একটি অভ্যাস, গাড়ি তিনি আস্তে চালাতে পারেন না। গতবছর বলেছিলেন যে “আমার মাও আমার থেকে জোরে গাড়ি চালান।” যাহোক, তাঁর ছেলে একদিন আমাকে কথায় কথায় বলেন, “আমার মা মেনিয়াকের মতো গাড়ি চালায়।” আমি বলি, “আমার ছেলের গাড়ি চালানোর সাথে তোমার মায়ের মিল আছে। আমি তার সাথে গাড়িতে উঠলে রীতিমতো ভয়ে থাকি।”

ইতোমধ্যে বৃষ্টি থেমে গেছে। আকাশ বেশ পরিষ্কার। আমরা একশ’ কিলোমিটারের মতো পেরিয়ে এসেছি।

এমতাবস্থায় আমি ফেসবুক লাইভে ঢুকে পড়ি। বন্ধুদের সাথে ক্যাতারজিনার পরিচয় করিয়ে দিয়ে আমাদের অবস্থানের কথা জানিয়ে দেই। দেখতে দেখতে রোদ এসে পড়েছে। পাশের ভুট্টাক্ষেতগুলো আরো উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। আমাদের বামপাশে বিস্তীর্ণ খেতে রঙিন বাঁধাকপির চাষ দেখে আমরা উৎফুল্ল। আরেকটু এগোতেই ডানপাশে দেখা গেলো একই রকম খেত। কিন্তু বিধিবাম, আবার বৃষ্টি শুরু হলো। গতবছর প্রথম যেদিন ক্যাতারজিনার বাড়িতে যাই সেদিনও ঠিক একইভাবে বৃষ্টি পড়েছিল। পথে বৃষ্টি হলে নাকি যাত্রা শুভ হয়। আমি মন্তব্য করলাম, “অবশ্য আমার বাঁপাশে গুডলাক বসে আছে!”

ক্যাতারজিনা জানালেন, “আমরা পোজন্যানের ভেতর দিয়ে ভ্রসলোভের দিকে এগিয়ে যাবো। এখান থেকে আরো দুশো’ কিলোমিটার পোজন্যান।”

আমি বললাম, “তোমার মনে আছে, আমরা ২০২২ সালে পোজন্যান কবিতা উৎসবে যোগ দিয়েছিলাম?”

তিনি বললেন, “খুব মনে আছে।”

আমি বলি, “সেবছর তুমি আন্ডার দ্যা থিন লেয়ারস অব লাইট অনুবাদ করেছিলে।”

“অনেক অনেক কবির হাতে বইটি আমরা পৌঁছে দিতে সক্ষম হয়েছিলাম।” ফোঁড়ন কাটলেন তিনি।

এবছর তিনি পৌঁছে দিলেন তাঁর অনুবাদে আমার দ্বিতীয় বই, ‘দ্যা স্ক্যাটার ডিসপ্লে অব লিমস’, যার বাংলা হতে পারে ‘ছড়িয়ে যাওয়া হাড়গোড়’। সারা পৃথিবী জুড়ে যেমন মানুষ হত্যা হচ্ছে—ইউক্রেন, প্যালেস্টাইন, বাংলাদেশ—তাতে মনে হয় আমরা প্রতিদিন রক্ত ও হাড়গোড়ের উপর দিয়ে হাঁটছি।

ক্যাতারজিনা কাল বলেছিলেন যে আমার কবিতাগুলো অনুবাদের সময় তাঁর চোখ দিয়ে ঝরঝর করে জল পড়েছে। তিনি বললেন এখনও কোনো কোনো কবিতা পড়তে গেলে কাঁদি। আমি বলে উঠলাম, “আমি ভাগ্যবান যে তুমি আমার কবিতা আমার থেকেও বেশি ভালোবাসো!”

কোনো কোনো কবিতা লেখার সময় যে আমি নিজেও চোখের জল ঝরাইনি তাতো নয়!

তিনি বললেন, “তুমি হৃদয়ের মাঝখান থেকে কবিতা টেনে বের করে আনো। আজকাল অনেক কবিই তা করে না।”

“প্রকৃত কবির কাজতো তাই-ই।” আমি বলি।

ফেসবুক লাইভ শেষ হলে আমাদের কথাবার্তা কিছুক্ষণ পোজন্যানকে ঘিরে এগোলো। আমি জিজ্ঞেস করি, “তোমার মনে আছে দানুতা বারতোস সেখানে আমাকে কী বলেছিলেন?”

“খুব মনে আছে, তিনি তোমার পোলিশ মা।”

“ঠিক, সেই থেকে তাঁকে আমি পোলিশ মা বলে জানি।” উৎসব শেষে ফেরার দিন আমি আর ক্যাতারজিনা তাঁকে বিদায় জানাতে গেলে তিনি বললেন, “নিউইয়র্কে ফিরে তোমার মাকে বলবে এখানে তোমার আরো একজন মা আছে।” আমি তাকে জড়িয়ে ধরে বলেছিলাম, “অবশ্যই, আমার মা শুনে খুশি হবেন।”

দানুতা বরতোস ছিলেন তখন পোজন্যান শাখা রাইটার্স ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট। বয়সের কারণে তিনি সেই পদ ছেড়ে দিয়েছেন। এখন ক্রিস্টোফ গালাস প্রেসিডেন্ট হয়েছেন। গালাস অন্ধ হলেও এই কাজ তিনি সুচারু রূপে বেশ কয়েক বছর ধরে করে যাচ্ছেন, তাছাড়া তিনি ভালো গিটার বাজান এবং গিটারের সাথে স্বামী-স্ত্রীতে একত্রে গান করেন। গত বছর তাঁর গিটারের সাথে আমি “আমার পরাণ যাহা চায়” গানটি গিয়েছিলাম এতো চড়া গলায় যে রুমে ফিরে আমার স্ত্রী বলেছিলেন, “তুমি রবীন্দ্রসঙ্গীতকে অনেকখানি চড়িয়ে দিলে!”

আমি বললাম, “দেখো ও গিটার এতোটা উঁচুতে বাজাচ্ছিলো যে আমার এ ছাড়া করার কিছু ছিল না।” আমি অবশ্য স্ত্রীর সামনে কখনো সাহস করে গান ধরি না। তিনি বড়ো সমালোচক!

আমি ক্যাতারজিনাকে বললাম, “কিন্তু একটা বিষয় লক্ষ্য করেছো, ক্রিস্টোফ গালাস সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে আমাকে কিন্তু একবারও দাওয়াত করেনি।”

তিনি বললেন, “আমাকেও না। তবে আমি জানি যে ওদের বাজেট এখন সীমিত।”

“তাতে কি হবে, প্রতিবছরই তো নানান দেশ থেকে কবিরা আসছেন তাদের অনুষ্ঠানে।” আমি যোগ করি।

“তা আসছেন।” ক্যাতারজিনা স্বীকার করেন।

২০২৫ চেহানোভ আন্তর্জাতিক কবিতা উৎসবে বাঁ থেকে লেখক, জিভনিভ বিকোভিস্কি (পোল্যান্ড), ক্যাতারজিনা জর্জিও (পোল্যান্ড, কবির পোলিশ অনুবাদক), হুসেন হাবেশ (কুর্দিস্থান), বারবারা অরলেভস্কি (জার্মানি), ও হাতিফ জানাবি (ইরাক)

“আমি অবশ্য জানি কেন আমরা দাওয়াত পাই না, যদিও তাতে কিছু যায় আসে না। এই দেখো মারলেনা আমাদের দাওয়াত করতে চেয়েছিলেন বলেই আমরা দেড় মাসের একটি প্লান সাজিয়েছিলাম। তিনি দাওয়াত না করলেও কিন্তু প্লানটা আগের মতোই আছে। আমরা ওয়ারশতে না গেলেও একই সময়ে চেহানোভ-এ গেলাম। তাছাড়া আমার বইওতো প্রকাশ পেলো।” আমি হাসতে হাসতে যোগ করি, “কিছুই কারো জন্যে পড়ে থাকে না।”

তিনি আগ্রহ নিয়ে কারণটা জানতে অপেক্ষা করছিলেন। আমি তাকে বললাম, “তোমার কি মনে আছে প্যান্ডেমিকের সময় একজন কবি আমার কাছে একশ’ ডলার চেয়েছিলেন, বলেছিলেন যে তিনি বিপদে পড়েছেন, প্যান্ডেমিকের পর আমাকে টাকাটা ফিরিয়ে দেবেন। আমি টাকাটা দিতেও চেয়েছিলাম। কিন্তু তিনি চান আমি যেনো তার ব্যাংকে অয়ার করে দেই। আমি সাধারণত নিজের ব্যাংক থেকে কাউকে এইভাবে সরাসরি টাকা পাঠাই না। আমি ওয়েস্টার্ন ইউনিয়নে পাঠাতে চাইলে তিনি না করে দিলেন। সেটাই আসল কারণ।”

“কী জানি হলেও হতে পারে,” ক্যাতারজিনা মেনে নিলেন।

আমি বলি “দেখো, পৃথিবীতে কারো জন্যে কিছুই বসে থাকে না। এবছর আমি আট দেশে আটটি আন্তর্জাতিক কবিতা উৎসবে যোগ দিচ্ছি। লাইভ গোজ অন।”

“অবশ্যই,” তিনি সম্মতি দেন।

“তাছাড়া, এখন ষাটের কাছাকাছি পৌঁছে আমার একটি উপলব্ধি হয়েছে, যারা ভালোবাসে তাদের কাছে যাবো। যারা ভালোবাসে না তাদের থেকে দূরে থাকতে চাই। আর তুমি তো জানো এই পৃথিবীতে ভালোবাসার মানুষের সংখ্যাও কিন্তু কম নয়!”

ইতিমধ্যে আমরা একটি হাইওয়ে ওয়েটিং এরিয়ায় ঢুকে পড়ি। ক্যাতারজিনা বললেন যে তাঁর পা দুটো সচল করা দরকার। আমিও চা খাওয়ার জন্যে উদ্‌গ্রীব হয়েছিলাম। আমি মেশিন থেকে চা নিতে গেলে ক্যাতারজিনা বললেন, “আগে পে করে আসতে হবে!”

“তাই নাকি,” আমি অপরাধীর সুরে বলি, “যুক্তরাষ্ট্রে ওয়েটিং এরিয়াগুলোতে আমরা আগে মেশিন থেকে চা নেই, পরে পে করতে যাই।” কাউন্টারের দিকে হাঁটতে হাঁটতে আমি বলি।

“কিন্তু এখানে আগে টাকা দিতে হয়,” তিনি মুচকি হেসে বলেন, “তবে কানাডাতেও যুক্তরাষ্ট্রের মতোই নিয়ম, আমার মনে আছে।”

তবে মজার ব্যাপার হলো চা যে সাইজেরই নেয়া হোক, দাম একই। ক্যাতারজিনা আমাকে বোঝালেন, “শুধু একটু গরম পানিই বেশি নিচ্ছো। তাতে কিছু আসে যায় না।” আমি মনে মনে ভাবলাম, “এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি...!”

আমি একটি চা ও একটি কফির অর্ডার দিলে তিনি বললেন, “আমিও চা খাবো।”

অগত্যা দুটি চা নিয়ে আমরা রেস্টুরেন্ট এরিয়াতে বসে পড়লাম। কিন্তু শুধু চা ভালো লাগছিল না। অন্যকিছু সাথে না খেলে কেমন যেন বিষয়টি পানসে হয়ে যাচ্ছিলো। “দেখি আর কিছু পাওয়া যায় কিনা, তুমি একটু বসো।” বলেই আমি উঠে পড়লে ক্যাতারজিনা বললেন, “স্যান্ডউইচ খেতে পারো।” আমি বললাম, “তুমি?”

“না আমি আর কিছু খাবো না। এই চাতেই চলবে।”

আমি একটা চক্কর মেরে দেখলাম সেখানে কি কি খাবার আছে। স্যান্ডউইচ ও পিজ্জা জাতীয় কিছু খেতে ইচ্ছা হলো না। শেষে দুটো ওটমিল বার কিনে ফিরে এলে ক্যাতারজিনা দেখে বললেন, “ভালো জিনিস এনেছো।” আমি তাঁর হাতে একটি বার দিলে তিনি বললেন, “আমি রেখে দিচ্ছি, পরে খাবো।”

চা ও বিশ্রাম শেষে আমরা আবার হাইওয়ে নিলাম। কোথাও গতিসীমা ১২০ এবং প্রায় সর্বত্রই ১৪০ কিলোমিটার। তার মানে সর্বোচ্চ গতিসীমা ৮৬ মাইলের মতো যা আমেরিকায় সচরাচর দেখা যায় না। নিউইয়র্কে সর্বোচ্চ ৭০ বলেই আমার জানা। অতএব ক্যাতারজিনার গতির সাথে তাল মিলিয়ে আমাকে নড়ে চড়ে বসতে হয়। তিনি হাসতে হাসতে বলেন, “আমার কোনো দুর্ঘটনার রেকর্ড নেই।” আমি তাঁকে কি করে বুঝাই যে রেকর্ড তৈরি হয়, এটা ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। তবে তিনি জোরে গাড়ি চালালেও ভালো ড্রাইভার। আমি বলি, “আমি ভাবতাম কবিদের ভেতরে আমিই বেস্ট ড্রাইভার, কিন্তু আজ থেকে বেস্ট-এর জায়গাটি তোমাকে ছেড়ে দিলাম।”

তিনি বললেন, “না, তুমি আবার চিপা জায়গায় গাড়ি ভালো চালাতে পারো। পার্কিংয়েও আমার থেকে পারদর্শী।” তিনি আসলে গতবছর ওয়ারশ এয়ারপোর্টের কথা স্মরণ করে এ কথা বললেন। আমাকে নামিয়ে দেবার সময় কিছুতেই পার্কিংয়ে গাড়ি ঢোকাতে পারছিলেন না। আমি তখন ড্রাইভারস সিটে বসে অনায়াসে গাড়ি পার্ক করে দিয়েছিলাম। আমি হাসতে হাসতে বললাম, “ঠিক আছে তাহলে আমার প্রথম স্থান আমি ফিরিয়ে নিলাম!”

আরো কিছুক্ষণ গাড়ি চালানোর পর আমরা একটি বিশাল নদী পার হলাম। ক্যাতারজিনা বললেন, “এটি ভিশওয়াভা নদী, আমার দেশের সবচেয়ে’ বড়ো নদী। কিন্তু এখন নাব্যতা নাই বললেই চলে।” নদীটি পোল্যান্ডের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত উত্তর-দক্ষিণে অতিক্রম করেছে। হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ এই নদী পাহাড় থেকে এসে একেবারে বাল্টিক সাগরে মিশেছে। তবে পদ্মার মতোই এর এখন করুণ অবস্থা। তথাপি ব্রিজ পার হতে হতে অসংখ্য পাখির সমারোহ দেখে মনটা ভরে গেলো। ব্র্র্রিজের পরে হঠাৎ ডান দিকে ক্যাতারজিনা আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করে বললেন, “দেখো দেখো সারস!”

আমি বললাম, “ক’দিন পরেই শীত কাটাতে ওরা আমাদের দেশে পাড়ি জমাবে।”

ওদিকে একের পর এক ফোন করে যাচ্ছেন ক্যতারজিনার মা, আমরা কত দূরে এলাম তার খবর তিনি বারবার নিচ্ছেন। বেশ কয়দিন ক্যাতারজিনার বাড়ি তিনি ও তাঁর বন্ধু পাহারা দিয়েছেন। মূলত, কুকুর আর বিড়ালগুলোকে খাওয়ানোর জন্যে কাউকে না কাউকে থাকতে হয়। তবে, আজ যেহেতু আমরা আসছি তাই তিনি ছোটো মেয়ের বাসায় ইতোমধ্যে পৌঁছে গেছেন। নাতির জন্মদিন বলে কথা! ক্যাতারজিনা ফোনে বললেন, “তোমরা কেক কেটে ফেলো। আমরা লাঞ্চ-এ যোগ দেবো।”

আমি বললাম, “তোমার বোনের বাড়ি তো ভ্রসলোভ শহরের পুব দিকে। এখন কি আমাদের শহরের ট্রাফিক ঠেলে যেতে হবে?”

তিনি বললেন, “না না, আমি যে হাইওয়ে ধরে যাচ্ছি সেটি উত্তর দিক থেকে শহরকে পাশ কাটিয়ে ঠিক আমার বোনের বাসার কাছ দিয়ে যাবে।”

প্রায় শহরের কাছাকাছি এসে আরো একটি নদী পার হতে হলো। তিনি আমাকে তাড়াতাড়ি ছবি তুলতে বললেন। কী মনোরম ব্রিজ। একেবারে ইংরেজি এম অক্ষরের মতো। আর অসামান্য ঝলমলে। তিনি বললেন, “এই নদীর নাম অদ্রা। ভ্রসলোভ শহর এর তীরেই অবস্থিত।”

আমি জিজ্ঞেস করি, “আর পোজন্যান কোন নদীর তীরে?”

“ওটার নাম ভার্তা নদী,” সংক্ষেপে উত্তর দিয়ে তিনি হাইওয়ের দিকে চোখ রাখলেন।

সমস্যা হলো যে আমরা প্রায় কাছাকাছি এসে পড়লেও মেয়েটির জন্যে কোনো উপহার কিনিনি। ক্যাতারজিনা আমাকে আগেই বলেছিলেন, “১৫ বছর বয়সের ছেলেমেয়েদের জন্যে কিছু কেনা কঠিন। তাই আমি টাকা দিয়ে দেবো, ওর যা ইচ্ছা তাই কিনে নেবে।” আমি প্রস্তাবে সম্মত হলেও বললাম, “কিন্তু ফুল তো নিয়ে যেতে হবে!”

“তুমি সম্ভবত ভুলে গেছ যে আজ রোববার। রোববারে ফুল কোথায় পাবে শুনি! সব মার্কেট বন্ধ!”

“সব মার্কেট বন্ধ!” আমি আশ্চর্যবোধক চিহ্ন বসিয়ে তাঁর কথারই প্রতিধ্বনি তুললাম। “কোনো একটা মার্কেটও খোলা নেই!” আমি বেশ হতাশ হলাম। স্বগতোক্তি করলাম, “শুধু যাপকা খোলা!”

তিনি বললেন, “ভালো কথা মনে করেছ। যাপকায় ফুল পাওয়া যেতে পারে।”

কিন্তু বিধিবাম। আমরা এক্সিট নিয়ে শহরের রাস্তায় নেমে সামনে কোনো যাপকা পেলাম না।

তিনি বললেন, “আরেকটা বুদ্ধি মাথায় এসেছে।”

“কী?” আমি তাঁর দিকে তাকিয়ে আছি।

তিনি রেডলাইটে গাড়ি থামিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে দুষ্টু মেয়ের মতো হাসি দিয়ে বললেন, “সামনেই একটা কবরস্থান, পাশে ফুলের দোকান আছে। এই দোকান সাত দিনই খোলা থাকে।”

“এখন কবরস্থানের দোকান থেকে জন্মদিনের ফুল কিনবে?”

“তাতে কি! আমরা কিনছি জীবনের জন্যে। আমরা তো আর কবরস্থানে যাবার জন্যে কিনব না। ফুল হলেই হলো, তা কোথা থেকে কিনছি সেটা কিন্তু মুখ্য নয়।”

অতএব সেখানেই তিনি গাড়ি নিয়ে চলে গেলেন। এবং সাথে সাথেই পার্কিংও পাওয়া গেলো।

ক্যাতারজিনার ছোটোবোন ফুল নয়, ফুলের গাছ পছন্দ করেন। তাই, ভার্জিনিয়ার ও বার্থডে বেবির জন্যে দুটি ফুলের গাছ কিনে আমরা গাড়িতে উঠলাম। ঠিক সাথে সাথে ক্যাতারজিনার মা আবারও ফোন করলেন। এবার ক্যাতারজিনা একটু রেগে গেলেন, “এত বার ফোন দিচ্ছ কেনো?” আমি ইশারায় বললাম, “কুল ডাউন!” তিনি, “এইতো এসে গেছি” বলে ফোন রেখে দিলেন। আমি বললাম, “দেখো আমাদের মা-বাবারা আমাদের সাথে কথা বলার জন্যে কতটা উদ্‌গ্রীব থাকেন, আর আমরা তাঁদের সময় দিতে পারি না। ঠিক তুমি বা আমি যেমন আমাদের ছেলেমেয়েদের সাথে ফোনে কথা বলতে গেলে এক মিনিট বলেই ওরা রেখে দেয়। আমরাও কিন্তু সেটাই করি আমাদের মা-বাবার সাথে।”

আমার কথা শেষ হতে না হতেই ক্যাতারজিনা একটি বাগান বাড়ির সামনে গাড়ি থামালেন। মুখে বললেন, “আমরা এসে গেছি।”

/জেড-এস/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
যুক্তরাষ্ট্রের মসজিদে মুসল্লিদের জন্য খেজুর, বিস্কুট আর পানিও আছে
যুক্তরাষ্ট্রের মসজিদে মুসল্লিদের জন্য খেজুর, বিস্কুট আর পানিও আছে
কুনহার জোড়া গোলে এগিয়ে ব্রাজিল
কুনহার জোড়া গোলে এগিয়ে ব্রাজিল
আর্জেন্টিনার জন্য ৫০০ কেজি গরুর মাংস আনা হয়েছে
আর্জেন্টিনার জন্য ৫০০ কেজি গরুর মাংস আনা হয়েছে
‘ব্রাজিলের জয় দেখতে এসেছি’
‘ব্রাজিলের জয় দেখতে এসেছি’
সর্বাধিক পঠিত
আলোচিত প্রতিমন্ত্রীকে নিয়ে সংবাদ করায় কারাগারে ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক
আলোচিত প্রতিমন্ত্রীকে নিয়ে সংবাদ করায় কারাগারে ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক
ইউনিয়নের নাম পরিবর্তনে ডিসিকে ফোন করলেন প্রধানমন্ত্রী
ইউনিয়নের নাম পরিবর্তনে ডিসিকে ফোন করলেন প্রধানমন্ত্রী
সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় সাবেক প্রতিমন্ত্রী হারুনের জানাজা অনুষ্ঠিত
সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় সাবেক প্রতিমন্ত্রী হারুনের জানাজা অনুষ্ঠিত
চতুর্থ প্রজন্মের ব্যাংকগুলো কেমন চলছে? 
চতুর্থ প্রজন্মের ব্যাংকগুলো কেমন চলছে? 
ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথে দূরত্ব কমবে ৮০ কিলোমিটার
ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথে দূরত্ব কমবে ৮০ কিলোমিটার