X
শুক্রবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২১, ৯ আশ্বিন ১৪২৮

সেকশনস

প্রসঙ্গ : মারুফ ইসলামের ‘জীবন এখানে এমন’

আপডেট : ১৯ অক্টোবর ২০২০, ০৭:০০

‘আমাকে খোঁজো না তুমি বহুদিন-কতদিন আমিও তোমাকে

খুঁজি নাকো; এক নক্ষত্রের নিচে তবু—একই আলোপৃথিবীর পারে

আমরা দুজনে আছি; পৃথিবীর পুরনো পথের রেখা হয়ে যায় ক্ষয়,

প্রেম ধীরে মুছে যায়, নক্ষত্রেরও একদিন মরে যেতে হয়’

—জীবনানন্দ দাশ

জীবনের উপলব্ধি কবির কাছে এমনই। অন্যের কাছে অন্যরকম। ভিন্ন ভিন্ন উপলব্ধিজাত বিষয়ের এক অনির্দিষ্ট, অনির্ধারিত অভিজ্ঞানের সমষ্টি। অতএব জীবন কোথায় কেমন তার উপলব্ধি লেখক মারুফ ইসলামের গল্প সংকলন ‘জীবন এখানে এমন’ এর সাথে মিল ও অমিলের উপলব্ধি তৈরি করবে বৈকি! প্রয়োজন ও অপ্রয়োজনও মনে হতে পারে; আবার আরোপিতও মনে হতে পারে কোনো কোনো বিষয়। তারপরও কোনো গল্পই জীবনের বাইরের নয় বৈকি। তার গল্পের চরিত্ররা যেসব ঘটনার জন্ম দেয় সে সবের বাস্তবতা—বাস্তব ও পরাবাস্তবতা দ্বারা কতোটা নিয়ন্ত্রিত তার চুলচেড়া বিশ্লেষণ হয়তো করা যাবে কিন্তু তরুণ লেখক মারুফ যে অভিজ্ঞানে আঁকতে চেয়েছেন ‘জীবন এখানে এমন’ তার প্রেক্ষিতে বলা যায় এ আয়োজন আরও আয়ত ও গভীরতর করে নেওয়ার দাবি রাখে। কারণ এটি তার দ্বিতীয় গল্প সংকলন।

‘বাস্তবতা নিছক একটি বিভ্রম, যদিও এটি খুব স্থায়ী’—অ্যালবার্ট আইনস্টাইন

একজন বিজ্ঞানীর উপলব্ধি বাস্তবতা সম্পর্কে এমন। যে বাস্তবতায় জীবনগুলো যাপন করে সে বাস্তবতার ভবিষ্যৎ মূল্য থাক বা না থাক ইতিহাসের ক্রম থেকে তারা কিছুতেই বাদ যায় না। তাই জীবনের ছবি আঁকতে গেলে কেমন জীবনের ছবি আঁকা দরকার তা লেখককে গুরুত্বের সঙ্গে ভাবতে হয়! কেননা কেউ যদি বাণিজ্যিক শিল্পী হতে চান তার একটা গতিপথ আছে; আবার যিনি সৃজনশীল শিল্পী বা লেখক হতে চান তার একটি আলাদা পথ আছে। আমরা ধরে নিই যে, মারুফ দ্বিতীয়টাই হতে চান—অতএব নিজেকে কেনা-বেচার বিষয়টি এ মাধ্যমে মুখ্য নয়; শিল্পটাই মুখ্য।

বর্তমানে আমরা যে সমাজ বাস্তবতায় বাস করছি তার মডেলটা কী? এখানের মূল সংকটটা কী? যে সংকট পুরো নাগরিক জীবনের সব অনুষঙ্গকে ধরে টানা-হেচড়া করে? কারা বা কাদের জন্য চরিত্রগুলো সংকটে পড়ে? যারা নিয়ন্ত্রক তারাও কেন নেতিবাচক ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়? এসব কিছুরই রাজনৈতিক, আর্থিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংকট আছে; ফলে সে বাস্তবতাকে যিনি ভালো বোঝেন তার পক্ষেই কেবল যৌক্তিক চরিত্র ও ঘটনা নির্মাণ সম্ভব।

‘জীবনে যদি অগ্রগতি না থাকে সে জীবন অবাঞ্ছিত’—রোম্য রোলা

অতএব শিল্পে সমাজের এমন চরিত্রই উঠে আসা উচিত যার জীবনের গুরুত্ব অন্য জীবনকেও বাঞ্ছিত করে তোলে। কোন চরিত্র যদি অবাঞ্ছিতও হয় তার বাস্তবতাকে যদি লেখক যৌক্তিকভাবে তুলে আনতে পারেন তবে সে চরিত্রকে পাঠক গ্রহণ করে নেয়। আমরা মারুফের প্রথম গল্প ‘ছাতা’র মূল চরিত্র মঞ্জুর কথায় যদি বলি, সে প্রচলিত সমাজে নেতিবাচক চরিত্রই। একজন চোর, আবার চারিত্রিক সমস্যাও তার আছে। ঘরে অসুস্থ স্ত্রীকে রেখে নিষিদ্ধ পল্লীতে যায়। যে সাথীকে তার পছন্দ, প্রেমিক দ্বারা প্রতারিত হয়ে যে মেয়ে পল্লীতে আসে এবং যে এই নরক থেকে মুক্তির স্বপ্ন দেখে মঞ্জুর মাধ্যমে; সে কিনা তাকে এখান থেকে নিয়ে গিয়ে সান্তাহারে হোটেলে বিক্রি করার মতলব করে! আবার গল্পের প্রথম দিকে খালেক ব্যাপারির ছাগল চুরি করতে গিয়ে রাখাল বালককে খুন করে ফেলে। কারণ যাই হোক সে একজন খুনিও। কিন্তু তারপরও শেষ দৃশ্যে আমরা দেখি সাথীকে সে ট্রেনে উঠিয়ে দিয়ে মুক্ত করে দেয়।

এ বাস্তবতা থাকা অস্বাভাবিক নয়; কিন্তু বাস্তবতাটিকে পাঠকের কাছে যৌক্তিক করায় মারুফ কতটা সফল?

আমরা মঞ্জুর মনের ভাবনা থেকে জানতে পেরেছি যে, তার জন্মের সময় মা মারা যায়। তার বড় বোন আঞ্জুর আদর যত্নেই বেড়ে উঠে। কিন্তু একদিন সে নিরুদ্দেশ হয়ে যায়; পরে জানা যায় সে পতিতা পল্লীতে বিক্রি হয়ে যায়। তার প্রতীক্ষায় থাকে সে।

যদি তার জীবনে এমন ঘটনা থাকে তাহলে স্বাভাবিকভাবেই পতিতাপল্লীর প্রতি তার ঘৃণাবোধ এবং সহানুভূতি দুটোই থাকার কথা। কারণ এখানে যে নারীরা আসে তাদের আসার পেছনের গল্পগুলো কোনো না কোনোভাবে তার বোনের গল্পের মতো কিংবা কাছাকাছিই তো হয়। তাদের প্রতি একধরণের সহানুভূতিই তো থাকার কথা।—এ প্রশ্নগুলো আসার অবকাশ না থাকাটা লেখকের দক্ষতাকে প্রশ্নহীন করতে পারতো। কিন্তু সেটা হয়নি।

এদিক থেকে দেখলে মারুফকে ভাবতে হবে চরিত্র ও বাস্তবতা নির্মাণে আরও যত্নবান হওয়ার প্রয়োজন আছে কিনা। 

জীবন সহজ নয়, জটিলও নয়-জীবন জীবনের মতো। আমরাই একে সহজ করি জটিল করি—হুমায়ূন আহমেদ

লেখক যদি এভাবে দেখে তার পক্ষে পক্ষপাতিত্বহীন জীবনের গল্প তুলে আনা সম্ভব। কারণ লেখক যে চরিত্র আঁকে তাকে পাঠকের কাছে বিশ্বাসযোগ্য করাতে হলে চরিত্রকে দিয়ে তার বৈশিষ্ট্যানুযায়ী ঘটনা ও সংলাপ বলানো অনেক বেশি যুক্তিগ্রাহ্য হয়ে ওঠে। আরোপিত করার বা হওয়া থেকে দোষমুক্ত থাকেন লেখক।

পরের গল্প ‘করুণ মুহূর্তগুলো’তে দাদা নাতির দারিদ্র জীবনে ভালো খাবার তীব্র বাসনা এবং ভিক্ষুক মোতালেব পেট ভরে খাওয়ার পর অসুস্থ হয়ে মারা যাওয়ার ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। খুব সরলভাবে গল্প এগিয়েছে সরল পরিণতিও মারুফ এঁকেছেন। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায় এরকম দারিদ্রতা কতোটা যুক্তি সম্মত? এখনকার সময়ে একজন ভিক্ষুকের আয় কম নয়। এক দু’শো টাকা কামানো তেমন বিষয় নয়, নাতি যে সবজি কুড়িয়ে বিক্রি করে তার থেকেও যা আসে তাতে দাদা নাতি কখনো মফস্বলের মতো জায়গায় এক প্যাকেট বিরিয়ানি কিনে খেতে পারে না—এমন কী? আর মাহফিল বা মসজিদে গরীবদের যে খাওয়া দেয় তা তো বছরে বহুবার খাওয়া যায়।

অন্যদিক থেকে দেখলে অপ্রাপ্তিই মানুষের জীবনকে কর্মময় বর্ণাঢ্য করে তোলে এবং ততদিন মানুষ ইতিবাচক থাকে যতদিন তার জীবনে সংগ্রাম থাকে। জীবনে যখনই সাফল্য আসে, আসে তৃপ্তি; তখন শুরু হয় মানুষের অধঃপতন কিংবা পতন। তখন সে বেঁচে থাকা হয়ে ওঠে অর্থহীন। এ গল্পের দার্শনিক দিক বিচার করলে ভিক্ষুক মোতালেবের জীবনের যে পরমতৃপ্তি কয়েক প্যাকেট খাবারের মাধ্যমে সে পেয়েছে। এবং যে সুখানুভব সে উপলব্ধি করে। কর্মহীন বিশ্রামের যে সুযোগ লাভ করেছে তারপর তার আর কী চাওয়া থাকতে পারে। এর পরেরটা তো পুনরাবৃত্তি। পুনরাবৃত্তির মধ্যে ক্লান্তি ছাড়া কিছুই থাকে না। কিন্তু মোতালেবের মতো মানুষের জীবন এমনই যে যারা শুধুমাত্র জীবনটাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্যে যতটুকু গ্রহণের দরকার তার বেশি তারা পায় না। বেশিটা তাদের চাওয়াও নয়। ফলে মৃত্যুর মতো স্বাভাবিক পরিণতি তাদের জীবনে নানা ছুতোয় সময়ে অসময়ে চলে আসে। মোতালেবের চলে যাওয়াটা পাঠকের মধ্যে একধরণের সহানুভূতির উদ্রেক করে। কিন্তু মিন্টু যার জীবন পড় আছে অনাগত দিনের তার কী হবে আমরা কেইই জানি না। লেখক নিজেও তার কোনো আভাস দেননি।

গল্পের ঘটনার মধ্য দিয়ে লেখক সমাজবাস্তবতার অসঙ্গতির প্রতি যে ঈঙ্গিত করেন এবং সেটা যদি খুব যৌক্তিকভাবে করতে পারেন সেক্ষেত্রে লেখককে সফল বলতে হবে। মারুফ এ গল্পে সরদার বাড়ির বড় ছেলে আকবর সরদারের বক্তব্যের মাধ্যমে আমাদের রাজনৈতিক আস্ফালনের প্রতি ঈঙ্গিত করেছেন।যেমন—

‘হামরা ক্ষমতায় আসার পর কাউয়াতলার কত উন্নয়ন হছে, দিখিছিন তোমরা? কাউয়াতলা এখন মধ্যম আয়ের গাঁও। আর বিশ বছরের মধ্যে এডা উন্নত আয়ের গাঁওতে পরিণত হবে। তখন কাঙালি ভোজ খিলানোর মতো একডাও মানুষ পাওয়া যাবে না, হামি হলপ র্কযা কচ্ছি আজ। হামার কতা যদি সত্যি না হয়, তোমরা হামার কান কাট্যা কুত্তাক খিলাইও সেদিন।’

সমাজ ও রাজনৈতিক অসংঙ্গতিকে ব্যাঙ্গ করার মাধ্যমে লেখক ইতিবাচক দিকটি তুলে ধরেন যাতে অসঙ্গতি কাটিয়ে উঠতে সমাজ ও রাজনৈতিক শক্তি সচেতন হয়। আশা করি এ কাজটি মারুফ এ গল্পের একটি ঘটনার মাধ্যমে বর্তমান সময়ের রাজনৈতিক বাস্তবতাকে চমৎকারভাবে তুলে ধরতে সমর্থ হয়েছেন।

‘নামহীন শোক’ গল্পে লাল্টু নামক চরিত্রটিকে লেখক মারুফ যেভাবে পাঠকের সামনে তুলে ধরেছেন তাতে আমাদের নিম্ন আয়ের বা সমাজের নিচুতলার মানুষের স্বপ্নভঙ্গের আখ্যান বলা যায়। লাল্টুর মতো সন্তানদের বাঁচার জন্যে ধ্বংসাত্মক কিংবা বিকৃত যে কোন কিছুতেই আটকে যেতে পারে সেটা ইচ্ছা হোক বা অনিচ্ছায়। লাল্টুর শরীর বিক্রির চিন্তাকে বিকৃত বা অযৌক্তিক যাই মনে হোক; তাতে লাল্টুর কিছু আসে যায় না। এর পিছনে তার যুক্তিটা উড়িয়ে দেয়া যায় না। আবার পিয়ারা বানুকে নিয়ে কাউয়াতলী থেকে ঢাকায় এসে মা ও দুলাভাইয়ের কাছে জায়গা না পেয়ে চন্দ্রিমায় পুলিশ বা চৌকিদারের কাছে নিজে ও পিয়ারার ইজ্জত হানি, তার জেল; রাষ্ট্র এখানে প্রত্যক্ষ নিপীড়ক এবং আপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এটা নিচুতলার মানুষের জীবনের প্রাত্যাহিক ঘটনা। এ বাস্তবতা তো মধ্যবিত্তের চোখেও পড়ে কোর্ট কিংবা থানার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় দেখা যায় একদল সাধারণ মানুষ উদ্বিগ্নতা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। অসহায় মানুষের জীবনে গোদের উপর বিষফোঁড়া এই রাষ্ট্র। লেখক মারুফ এই ছোট গল্পটির মধ্যে চমৎকারভাবে এই শ্রমজীবী মানুষের জীবনের ছবি এঁকেছেন।

‘সাধিত রাধিকা’ গল্পটি গল্পই। প্রেম নামক তরল বিষয়ের রূপের সাধিত অভিব্যক্তি ফুটে উঠেছে।

লীলাক্ষেত্র নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানদের ব্যর্থতার বা হারানোর গল্প। বাস্তব ও স্বপ্নের টানাপোড়েন। মিঠুন মণ্ডলের ছোট্ট স্বাভাবিক চাওয়াটাও অনিশ্চয়তার দোলাচালে খুন হয়ে যায়। হয়তো বা আবারো তাকে বাঁচার চেষ্টা করে যেতে হবে। সেখানে সফল হবে কি হবে না তার কোনো কিছুই পাঠক জানে না, কারণ সমাজে গ্যারান্টির কিছুই নেই, দীর্ঘশ্বাস ছাড়া।

‘দ্বিধা’ গল্পটি খুব সাদামাটা ঢঙ্গে এগিয়েছে। এখানে নায়কের নামটা আমরা জানতে পারিনি। যে ছেলে মিতাকে বিয়ে করতে চেয়েছে। তার অন্যকে পছন্দ থাকায় সম্পর্কটা এগোয়নি। মা-বাবার পছন্দে ঠিক করা পাত্রীর সাথে যখন কথা এগিয়ে যাচ্ছে সেই মুহুর্তে মিতার মার অনুরোধ; দু’টো সুযোগই তার সামনে হাতছানি দিয়ে ডাকছে। এখন কোন পথে যাবে সে? দুটো অপশনের যে কোনটিই হতে পারে।

‘আমরা এমনই এসে ভেসে যাই’। তরুণদের অনিশ্চিত ও স্বপ্নহীন জীবনের বিভিন্ন ঘটনা ও স্মৃতির মধ্য দিয়ে আঁকা এ গল্পটিতে রবি চরিত্রটির একটা অস্পষ্ট চেহারা পাওয়া যায়। অনেকদিন পর দেখা হলেও গল্পটা যার মুখ দিয়ে শুনছি তার আগ্রহ থাকলেও কেমন নিস্পৃহ থাকে রবি। সিগেরেট আনতে গিয়ে ফিরে এসে বন্ধু আর তাকে পায় না। রবির ভগ্ন পারিবারিক গল্পের আভাস আমরা পেয়েছি। মা অন্য একজন পুরুষের হাত ধরে চলে যায়। পরদিন ভোরে পেপারে একটি মেয়ের খুনের ঘটনার সাথে রবির ছবি ছাপা সহ ধাধা লাগার মতো কথক বন্ধু সুমনকেও বলতে পারে না রবির বিষয়টি। সুমনও কী যেন বলতে এসে না বলে পালিয়ে যায়। কোন চরিত্রেরই কোন ডাইমেনশন পাওয়া যায় না। একটা অস্পষ্টতা, অস্থিরতার আভাস আছে তাতে। গল্পের উদ্দেশ্যটা ধরা যায় না। একটা পেইন্টিংএর মতো কিছু অবয়বের আভাস শুধু ফুটে উঠেছে কেবল।

‘একটা সস্তা প্রেমের গল্প’ সেঁজুতি নামের মেয়েটি কিভাবে পুরুষের চাওয়া-পাওয়ার কাছে বলি হয় তার ছবি। কবির সাথে সম্পর্ক কিন্তু তাকে পছন্দ না হওয়ার সামাজিক গ্যাপ আবার শাকিলকে পছন্দ করার মাঝে সামাজিক ফাঁক না থাকলেও শাকিলের মা-বাবার সম্পর্কেও জটিলতা। বাবার অনৈতিক জীবন যাপন, তার বৈধ বাপ না থাকা, বাইরে চলে যাওয়ার উদ্দেশ্যে টাকা ম্যানেজ করা এসবের জন্য কবির হয়ে সেঁজুতিকে বলি দিয়ে পঞ্চাশ হাজার টাকা সংগ্রহ করা শাকিলকে একটা নেতিবাচক মানুষ হিসেবে তুলে এনেছেন লেখক। কবিও তার বাইরে নয়। চাওয়া-পাওয়ার এসব বেমিল কিভাবে জীবন জীবনের প্রতি নির্মোহভাবে নির্মম হতে পারে তার ছবি হয়ে উঠেছে গল্পটি।

‘এসি’ গল্পটি একটি নিম্ন আয়ের লোকের পরিবারে স্ত্রী সন্তানদের কষ্টের প্রতি সমবেদনা ও সহানুভূতির গল্প। সামির সাহেব টিনসেডের বাসায় থাকলেও অফিসে এসির মধ্যে থাকেন। তিনি অপরাধবোধে ভুগতেন বলে প্রায় সময় এসি বন্ধ করে দিতেন কেন এটা করেন কেউ তা জানতেন না। কিন্তু কলিগ ফারুক সাহেব সরাসরি সামির সাহেবের বাসায় এসে দেখেন সামির সাহেব টিনসেডের বাসায় এসি লাগাচ্ছেন। কেন এটা করছেন তার ব্যাখ্যায় তিনি স্বীকার করেন যে, আমি অফিসে এসিতে থাকি অথচ আমার বউ-বাচ্চারা কষ্টে থাকেন। এটা ভালো লাগতো না বলে তিনি বারবার এসি বন্ধ করতেন। ফারুক সাহেব তার কথায় সাহানুভূতি প্রকাশ করেন, তার চোখ ভিজে আসে। ছোট ছোট চাওয়া-পাওয়ার সংঘাত মানুষকে সুন্দর করে তুলে সন্দেহ নেই। কিন্তু যেটা সামর্থের বাইরে সেটা পূরণ করতে গেলে সামর্থ বাড়িয়ে নিতে হয় নতুবা দুর্নীতির পথে পা বাড়াতে হয়। আমাদের বর্তমান সমাজে সামর্থ বাড়িয়ে নেয়ার গল্পগুলো দুর্নীতির সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত; তাতে কোনো সন্দেহ নেই। যাকে আমরা এখন কিছুই মনে করি না, মনে করি স্বাভাবিক। লেখকের গল্পটি আমাদের কোনো দিক নির্দেশ করে না যদিও। শুধু বউ-বাচ্চার প্রতি তার অপরিসীম সিমপ্যাথেটিক ব্যাপারটি প্রকাশ করেছে। কিন্তু আমরা জানি, এখানে এই একান্ত ব্যক্তিগত জায়গায় এসে মানুষ এসব ছোটখাট বৈষয়িক চাহিদাগুলোর মধ্যে হারিয়ে যায়, হারিয়ে যায় অন্যের সাথে নিজের সংহতির যোগ। প্রশ্ন রেখেই আপাত আমরা সামির সাহেবের অনুভূতিকে সমর্থন জানিয়ে যায়।

‘একদিন বৃষ্টিতে সন্ধ্যায়’ গল্পটিতে সঞ্জুর প্রেমিকা পুস্পকে খুঁজে না পাওয়া তেরো মেয়ের পাচার হওয়ার সংবাদ; যার মাঝে পুস্প নামের একটি মেয়ের নাম পাওয়া গেছে। গল্পের কথক তার বন্ধু সঞ্জুর প্রেমিকা পুস্পকে পাচার করেছে পেশাগত কারণে। এ বস্তবতা সমাজে ঘটে চলেছে অহরহ। না হোক সেটা পরিচিত, যে কাজটা করছে সে তো অন্যের বোন প্রেমিকা কাউকে না কাউকে তো অন্ধকার জগতে পাঠাচ্ছে নিজে ভালো থাকার জন্যে। এ বাস্তবতাকে পাঠক কীভাবে নেবেন বা দেখবেন তা তারাই ঠিক করবেন। লেখক হিসেবে মারুফ কোন গল্পেই সিদ্ধান্তের দিকে যাননি, যেতে চাননি।

‘ক্রান্তিকাল’ গল্পে শিশিরের বাড়ি ফেরা, খুন হয়ে যাওয়া মা-বোন-বাবার ঘটনা, যার কোনো ব্যাখ্যা সে বলতে পারে না। তাকে আর তার মা-বাবার কাছে স্বপ্নের কথা বলা হয়ে ওঠে না। বেকার যুবকের চাকুরি পাওয়ার আনন্দে বাড়ি এসে সুসংবাদটা সরাসরি দেয়ার প্রত্যাশায় তার গ্রামে ছুটে আসা। বাস্তব জীবনের নির্মমতা তাকে টুকরো টুকরো করে নিঃস্ব করে দেয়। স্বপ্নভঙ্গের এ গল্পটি আমাদের সমাজের নিষ্ঠুরতাকে তুলে ধরে।

‘জীবন এখানে এমন’ সংকলনের শেষ গল্প এটি। এখানে নশরতপুর স্টেশনের আত্মকথনের মাধ্যমে আমরা জানতে পায় আনার পাগলা রইচ মিন্থির পালক সন্তান যাকে স্টেশনে এক নারী রেখে গিয়েছিল তার কোলে। নিঃসন্তান রইস ও তার স্ত্রী নিজ সন্তান মনে করে পেলে বড় করেছে। সে ট্রেনে কাটা পড়ে নির্মম মৃতুবরণ করেছে। তার স্ত্রী শরীফ নামের একটি ছেলের সাথে ট্রেনে চড়ে পালিয়ে গেছে। সর্বশেষ আনারের কোন ওয়ারিশ থাকে না। এটিও ব্রাত্য জনগণের নির্মম জীবনের গল্প। যেখানে মানুষের সম্পর্কগুলো মানবিক ও অমানবিকতা পাশাপাশি জড়াজড়ি করে বেঁচে থাকে। তার নিপুন ছবি মারুফ পক্ষপাতহীনভাবে তুলে এনেছে।

এখন বলা যায় যে, লেখক মারুফের গল্প বলার ধরণে একটা সাবলীলতা আছে। ঝরঝরে মেদহীন ভাষায় তিনি পাঠককে গল্পের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত টেনে নিয়ে যেতে পারেন। দৃশ্য রচনায় সুপটিয়সী মারুফ প্রতিটি গল্পে এই দক্ষতার স্বাক্ষর রেখেছেন সন্দেহাতীতভাবে যা একজন কথাশিল্পীর জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। 

//জেডএস//

সম্পর্কিত

সাহিত্যতত্ত্ব : একটি সংক্ষিপ্ত পরিক্রমা

সাহিত্যতত্ত্ব : একটি সংক্ষিপ্ত পরিক্রমা

লিডসে এলিয়টের 'ওয়েস্টল্যান্ড' ও নজরুলের 'বিদ্রোহী' কবিতার শতবর্ষ

লিডসে এলিয়টের 'ওয়েস্টল্যান্ড' ও নজরুলের 'বিদ্রোহী' কবিতার শতবর্ষ

বঙ্গবন্ধুর স্বাস্থ্য ভাবনা

বঙ্গবন্ধুর স্বাস্থ্য ভাবনা

অন্নজল ও অন্যান্য কবিতা  

অন্নজল ও অন্যান্য কবিতা  

পর্ব—চার

সাহিত্যতত্ত্ব : একটি সংক্ষিপ্ত পরিক্রমা

আপডেট : ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১২:১৬

পূর্বপ্রকাশের পর
লঞ্জাইনাসের সাবলাইম তত্ত্ব

গ্রিক পণ্ডিতদের কাছ থেকে আমরা সাহিত্য বিষয়ে পেয়েছি ‘মাইমেসিস’ তত্ত্ব আর রোমান যুগ থেকে পেয়েছি ‘সাবলাইম’ তত্ত্ব। সাবলাইম তত্ত্বও সাহিত্যের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা। মাইমেসিস তত্ত্বের বিষয়বস্তু হলো সাহিত্যের কার্যধারা আর সাবলাইম তত্ত্বের বিষয়বস্তু হলো সাহিত্যের শৈলী। সাবলাইম তত্ত্বটি যে গ্রন্থ থেকে আমরা গ্রহণ করেছি সে গ্রন্থটিও গ্রিক ভাষায় লিখিত এবং লেখার সময়কাল খ্রিষ্টীয় প্রথম শতক। বইটির গ্রিক নাম ‘পেরি হিপসুস’ (Peri Hypsous) ইংরেজিতে ‘On Sublime’। বইটির নাম আমরা জানলেও এটির লেখক কে তা আমরা নিশ্চিতভাবে জানি না। ১৫৫৪ সালে এটি প্রথম মুদ্রিত হয় এবং সে মুদ্রণে লেখকের নাম উল্লেখ করা হয়েছিল ডায়োনিসিয়াস লঞ্জাইনাস (Dionysius Longinus)। কিন্তু পরে দেখা যায় যে, পাণ্ডুলিপিতে লেখকের নাম লেখা ছিল Dionysius Or Longinus; Dionysius Longinus নয়। এই আবিষ্কারের পর থেকে অনেক ইতিহাস খোঁড়াখুঁড়ি হয় আসল লেখকের নাম উদ্ধারের জন্য। অনেক নাম আসে। অনেক বিতণ্ডা হয়। শেষে রেগে গিয়ে স্থির করা হয় এর লেখক হলেন Pseudo-Longinus, অর্থাৎ জনৈক ‘ভুয়া’ লঞ্জাইনাস। 
সাবলাইম সম্পর্কে প্রথম কথায়ই লঞ্জাইনাস বলছেন যে এটি হলো ভাষার উচ্চতা আর চমৎকারিত্ব (loftiness and excellence of language)। মহান লেখকরা তাঁদের লেখার এই গুণের ভিত্তিতে অত্যুচ্চ খ্যাতি আর অমরত্ব অর্জন করে থাকেন। ভাষার এই উচ্চতা আর চমৎকারিত্ব অর্জিত হলো কিনা তা নির্ভর করে ভাষাটি পাঠকের উপর কী প্রভাব ফেলল তার ওপর। দেখতে হবে ভাষাটি পাঠককে তার ভিতর থেকে বের আনল কিনা। ভাষাটি যদি যুক্তিপ্রধান হয় তাহলে তার কাজ হবে পাঠককে কোনো সিদ্ধান্তের দিকে প্ররোচিত করা। এক্ষেত্রে পাঠকের নিজস্ব যুক্তিবুদ্ধি সেই প্ররোচনার বিরুদ্ধে তাকে দাঁড়াতে শক্তি জোগাবে। পাঠক নিজের যুক্তিবুদ্ধির জোর দ্বারা সেই ভাষার শক্তিকে দমিত করতে সমর্থও হতে পারে। এই প্রকার ভাষা সাবলাইম নয়; এই ভাষা পাঠককে তার অবস্থান থেকে, তার কোটর থেকে নাড়িয়ে দিতে সমর্থ হয় না। ফলে যুক্তিতর্কের প্ররোচনাময় ভাষা সাহিত্যের ‘সাবলাইম’ ভাষার মর্যাদা অর্জন করতে পারে না। সাহিত্যের ভাষা হবে সেই ভাষা যার বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর মতো পাঠকের কোনো শক্তি থাকবে না। আরব্য একটি ধ্রুপদী কথা আছে কবিতার ব্যাপারে যা লঞ্জাইনাসের এই সাবলাইম ধারণাকে প্রতিধ্বনিত করে। আরব্য সেই ধ্রুপদী সংজ্ঞায় বলা হয়েছে কবিতা হলো সেই ভাষা যা শ্রোতার কানের অনুমতি ছাড়া হৃদয়ে প্রবেশ করে। লঞ্জাইনাসও সাহিত্যের সেই ভাষাকে সাবলাইম বলেছেন যা অপ্রতিরোধ্য শক্তিতে পাঠককে নাড়িয়ে দেয়, পাঠককে তার ভিতর থেকে এমন শক্তিতে বের করে আনে যে পাঠক ইচ্ছে করলেও সে শক্তির বিরুদ্ধে কোনো প্রতিরোধ গড়তে পারে না। এই ভাষা যখন পাঠককে আন্দোলিত করে পাঠক তখন বিমূঢ় হয়ে যায়। লঞ্জাইনাসের এই বক্তব্য থেকে বোঝা যায় যে, সাহিত্যগত ভাবনা বিষয়ে লঞ্জাইনাস অনেকটাই প্লেটোপন্থি, এরিস্টটলপন্থি নন। প্লেটো বলেছেন সাহিত্য যুক্তিবুদ্ধিকে নষ্ট করে এবং আবেগের উপদ্রবকে বাড়িয়ে তোলে। লঞ্জাইনাস সেই সুরেই বলেছেন যে, মহৎ সাহিত্যের ভাষা মানুষের যুক্তিবুদ্ধিকে বজ্রাঘাতে আহতের মতো থ’ বানিয়ে দেয় এবং পাঠককে তার আবেগের ও অনুভবের স্রোতে ভাসিয়ে নেয়। 
অবশ্য প্লেটোর অনুসরণে লঞ্জাইনাস সাহিত্যের ভাষার এই শক্তিকে অভিযুক্ত করেননি এবং সাহিত্যকে নিষিদ্ধ করার কথাও বলেননি। উপরন্তু, বইয়ের ৭ম অধ্যায়ে এসে, মনে হচ্ছে, তিনি বুঝতে পারলেন যে তিনি যা বলছেন তার মধ্যদিয়ে সাহিত্যের ভাষার একটি ক্ষতিকর দিকের কথা তিনি বলে ফেলেছেন। তাই এবারে সেই ক্ষতি পোষাতে গিয়ে তিনি একটু স্ববিরোধী হয়েই বললেন—‘সাহিত্যের সাবলাইম ভাষা পাঠকের আত্মার জন্য উচ্চভাবনার খোরাক জোগায়’ (dispose[s] the soul to high thoughts . . . leave[s] in the mind more food for reflection than the words seem to convey)। লঞ্জাইনাসের টেক্সটের বিশ্লেষণে স্টিফেন হ্যালিওয়েল এর নাম দিয়েছেন ‘অর্থের অতিরিক্ত’ বা ‘অর্থের উদ্বৃত্ত’ (surplus of meaning)। তিনি মনে করেন সাহিত্যের সাবলাইম ভাষা এভাবে অর্থের অতিরিক্ততা সৃষ্টির মাধ্যমে পাঠককে এক গভীরতর বাস্তবতার দিকে নিয়ে যায়। যুক্তিবুদ্ধির সাধারণ চর্চার মাধ্যমে উপলব্ধির সে গভীরতায় কখনো পৌঁছা সম্ভব নয়।
সাহিত্যের এই মহীয়ান অর্থাৎ সাবলাইম ভাষা কীভাবে তৈরি হবে, এর উপাদান কী কী—এ বিষয়েও লঞ্জাইনাস তাঁর বইয়ে আলোচনা করেছেন। লঞ্জাইনাসের মতে সাহিত্যের সাবলাইম ভাষার উপাদান বা উপকরণ হলো পাঁচটি : ১. মহৎ ভাব ধারণের ক্ষমতা, ২. প্রচণ্ড আবেগ জাগানোর ক্ষমতা, ৩. ভাষার অলংকার (figures of speech), ৪. উচ্চমার্গীয় শব্দ, ও ৫. শব্দের মহৎ বিন্যাস। প্রথম দুটি উপাদান বিষয়ে লেখকের কিছু করণীয় নেই। মহৎ ভাব ও উচ্চ আবেগের বিষয় হলো লেখার বিষয়বস্তু সংশ্লিষ্ট। লেখার বিষয়বস্তুর এই মহিমা না থাকলে শুধু লেখকের কারিগরি যোগ্যতার জোরে সাহিত্যকে সাবলাইম পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই বলেই লঞ্জাইনাসের ধারণা। সাবলিমিটি অর্জনের বাকি তিনটি উপাদান সম্পূর্ণই লেখকের কারিগরি যোগ্যতার অংশ। লেখককে জানতে হবে কীভাবে ভাষায় চমৎকার ও মনোহর অলংকার সৃষ্টি করতে হয়, কীভাবে উচ্চমার্গীয় শব্দ খুঁজে পেতে হয় এবং কীভাবে সে শব্দমালা মহৎ শৈল্পিক বিন্যাসে বাঁধতে হয়। 
লঞ্জাইনাসের মতে মহৎ ভাব ও উচ্চ ভাব তিনভাবে অর্জিত হতে পারে। প্রথমত, এটি ঈশ্বরের দান হিসেবে লেখকের মনে আপনা-আপনি জন্ম নিতে পারে। দ্বিতীয়ত, মহৎ লেখকরে লেখা অনুকরণ করার মাধ্যমে এটি অর্জিত হতে পারে। তৃতীয়ত, কল্পনার জোরেও এটি অর্জিত হতে পারে বলে লঞ্জাইনাসের বিশ্বাস। লক্ষণীয় যে, সাহিত্যতাত্ত্বিকদের মধ্যে লঞ্জাইনাসই প্রথম কল্পনার ব্যাপারটি সাহিত্যে গুরুত্বের সাথে দেখেছেন। লঞ্জাইনাসের এই কথা একটু ভিন্নভাবে রোম্যান্টিক যুগে প্রবলভাবে আবার ফিরে এসেছে। তবে তার পূর্বে ইংরেজি তথা ইউরোপীয় সাহিত্যে পুরো গ্রিক ও রোমান ভাবনাকে পাথেয় ধরে রেনেসাঁস যুগে নির্মিত হয়েছিল সাহিত্যের তাবৎ নমুনা ও আদর্শ। গ্রিক ও রোমান ভাবনায় উজ্জীবিত হয়ে; প্লেটো, এরিস্টটল ও লঞ্জাইনাসের চিন্তার অনুসারী হয়ে সাহিত্যের সেই নমুনা ও আদর্শকে ঘিরে যে তত্ত্বের উদ্ভব ঘটেছিল তার সুপরিচিত নাম হলো নিওক্লাসিসিজম বা নব্যধ্রুপদীবাদ। আমাদের পরের আলোচনা এই নিওক্লাসিসিজম নিয়ে।   


নিওক্লাসিসিজম

সাহিত্যতত্ত্বে নিওক্লাসিসিজম বিষয়টি এক এক দেশের জন্য এক এক রকমের। দেশভেদে ও সাহিত্যভেদে এর সময়কাল এবং বিষয়বস্তুতে স্পষ্ট ভিন্নতা রয়েছে। আমরা এখানে যে শুধু ব্রিটেনভিত্তিক ইংরেজি সাহিত্যের নিরিখে নিওক্লাসিসিজম বিষয়ে আলোচনা করতে যাচ্ছি। নিওক্লাসিসিজম শব্দটি ইংরেজিতে ব্যবহৃত হলেও এর খাঁটি ইংরেজি হলো নিউক্লাসিসিজম। বাংলা করলে দাঁড়ায় নব্য ক্লাসিসিজম। ক্লাসিসিজম মানে হলে ক্লাসিকসের ভিত্তিতে দাঁড় করানো সাহিত্য ভাবনা। ইংরেজ তথা ইউরোপীয় ভাবনায় ক্লাসিক হলো গ্রিক ও রোমান সাহিত্য। সোজা করলে নিওক্লাসিসিজমের অর্থ দাঁড়ায় গ্রিক ও রোমান সাহিত্যের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা সাহিত্যভাবনা বা সাহিত্যতত্ত্ব।  
শব্দের ব্যুৎপত্তি থেকে আহরিত এই অর্থের সাথে নিওক্লাসিসিজমের ব্যবহারিক অর্থ খুব একটা আলাদা নয়। সারা ইউরোপ জুড়ে রেনেসাঁস পরবর্তী শিক্ষিত মহল তাদের সাহিত্যের দিকনির্দেশনা সংগ্রহ করতে শুরু করলো গ্রিক ও রোমান ক্লাসিকস থেকে তারই ফসল হিসেবে তৈরি হলো নিওক্লাসিক সাহিত্য মতবাদ। ইংরেজ দেশে এই সময়টা হলো মোটামুটি ১৬৬০ থেকে ১৭৯০ পর্যন্ত, অর্থাৎ ইংরেজ পিউরিটান আন্দোলনের নেতা অলিভার ক্রমওয়েলকে হত্যার পর থেকে ফরাসি সম্রাট ষোড়শ লুইয়ের হত্যার আগ পর্যন্ত সময়কাল। রেনেসাঁসের পর থেকে রোম্যান্টিকের শুরু পর্যন্ত সময়কাল।
নিওক্লাসিসিজমের সময়কালটাকে সাহিত্যবিষয়ক ফতোয়ার কালও বলা যেতে পারে। এসময় কোনটা সাহিত্য হলো আর কোনটা সাহিত্য হলো না তা গ্রিক ও রোমান ক্লাসিকসে যাঁরা পণ্ডিত ও জ্ঞানী ছিলেন তাঁদের ফতোয়ার ওপর নির্ভর করত। কবিতাটির ফর্ম কী হবে, তার ছন্দ কী হবে, তার অলঙ্কার কী হবে সব ক্ষেত্রেই তখন ক্লাসিকস থেকে নির্দেশনা আহরণ করতে হতো। আর সে নির্দেশনা শুধু কবিতার জন্য নয়, সাহিত্যের সব শাখার জন্যই এসময় ক্লাসিক সাহিত্য থেকে ফতোয়া আর কানুন আহরণ করতে হতো। সেসব ফতোয়া দিয়ে আলক্সান্ডার পোপ দুখানা গ্রন্থও লিখে ফেলেছিলেন : একখানা ‘An Essay on Criticism’, অপরখানা ‘Essay on Man’। দুখানাই কবিতায় লেখা প্রবন্ধ। শেষোক্ত প্রবন্ধখানায় গ্রিক-রোমানদের সাহিত্যের এইসব ফতোয়া বা কানুনের মাহাত্ম্য বর্ণনা করতে গিয়ে পোপ সোজা বলে দিয়েছিলেন যে, এসব নিয়মকানুন কোনো মানুষের তৈরি জিনিস নয়, এগুলো খোদ ভগবানের তৈরি। ভগবান যেমন প্রকৃতি বানিয়ে আমাদেরকে দিয়েছেন, তেমনি এগুলোও আমাদের জন্য বানিয়ে দিয়েছেন। মানুষ খালি এগুলোকে প্রকৃতি থেকে খুঁজে নিয়ে একটু সাজিয়েছে মাত্র। পোপের ভাষায়— Those rules of old discover’d, not devis’d/ Are Nature still, but Nature methodis’d। 
ক্লাসিক সাহিত্যের নিয়মকানুন দিয়ে সাহিত্যকে শাসনের যুগ হিসেবে নিওক্লাসিকাল যুগ মৌলিকভাবে পরিচিত হলেও সাহিত্যবিষয়ক ভাবনা ও চর্চায় এর আরো কিছু ভিন্নতর অনুষঙ্গও রয়েছে। রেনেসাঁস যুগে ঈশ্বরকে সরিয়ে দিয়ে মানবের জয়গানের যে সূচনা হয়েছিল নিওক্লাসিকাল যুগে এসে সে জয়গানের একটু লাগাম টেনে ধরা হলো। নিওক্লাসিকাল যুগের সাহিত্য তার বিষয়বস্তুতে মানবের জয়গান না গেয়ে বরং মানবের ত্রুটি ও স্খলনের জায়গাগুলো ব্যাপকভাবে তুলে আনতে শুরু করল। ক্লাসিক গ্রিক সাহিত্যে ভালো মানুষ নিয়ে ছিল মহাকাব্য আর ট্র্যাজেডি, এবং খারাপ মানুষ নিয়ে ছিল স্যাটায়ার আর কমেডি। নিওক্লাসিকাল যুগ ক্লাসিকাল যুগের সেই ভালো মানুষের সাহিত্য রচনায় নামল না, বরং উঠে পড়ে নামল খারাপ মানুষের সাহিত্য রচনায়। ফলে এই যুগে ক্লাসিকাল ধারায় মহাকাব্য আর ট্র্যাজেডি তেমন আসলো না, আসলো হরেক জাতের কমেডি, আর আসলো হরেক জাতের স্যাটায়ার। এমনকি মহাকাব্যের রূপকেও তারা মক-এপিক নামের নতুন ধারায় স্যাটায়ার রচনার কাজে ব্যবহার শুরু করল। 
আরো একটা বিষয়ে নিওক্লাসিকাল যুগ ইংরেজি তথা ইউরোপীয় সাহিত্যকে পিছিয়ে দিলো। ক্লাসিকসের অন্ধ অনুকরণের মাধ্যমে নিওক্লাসিকাল যুগ কল্পনার জায়গা সাহিত্যে ব্যাপকভাবে সংকুচিত করে ফেলল। সে সংকোচন এমনভাবে চলতে থাকল যে শেষ পর্যন্ত কল্পনার বিপুল শক্তিধারী মানুষদেরকে এই চর্চার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে নামতে হলো। সেই বিদ্রোহ থেকেই জন্ম নিলো রোম্যান্টিসিজম নামের নতুন সাহিত্যভাবনা বা সাহিত্যতত্ত্ব। আমাদের পরের আলোচনা এই রোম্যান্টিসিজম নিয়ে। চলবে

/জেডএস/

সম্পর্কিত

লিডসে এলিয়টের 'ওয়েস্টল্যান্ড' ও নজরুলের 'বিদ্রোহী' কবিতার শতবর্ষ

লিডসে এলিয়টের 'ওয়েস্টল্যান্ড' ও নজরুলের 'বিদ্রোহী' কবিতার শতবর্ষ

বঙ্গবন্ধুর স্বাস্থ্য ভাবনা

বঙ্গবন্ধুর স্বাস্থ্য ভাবনা

অন্নজল ও অন্যান্য কবিতা  

অন্নজল ও অন্যান্য কবিতা  

একদিন দিনে চাঁদ ফুটবে

একদিন দিনে চাঁদ ফুটবে

লিডসে এলিয়টের 'ওয়েস্টল্যান্ড' ও নজরুলের 'বিদ্রোহী' কবিতার শতবর্ষ

আপডেট : ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১৪:৫১

যুক্তরাজ্যের লিডস শহরের সেভেন আর্টস থিয়েটারে উদযাপিত হতে যাচ্ছে কবি কাজী নজরুল ইসলামের 'বিদ্রোহী' এবং টি এস এলিয়ট রচিত কবিতা 'ওয়েস্টল্যান্ড'র গৌরবময় শতবর্ষ। আগামী ২ অক্টোবর শনিবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে এ অনুষ্ঠান হবে।
ভারতীয় মার্গসঙ্গীত ও দক্ষিণ এশীয় শিল্প, সাহিত্য, সঙ্গীতের শীর্ষ সংস্থা সৌধ সোসাইটি অব পোয়েট্রি অ্যান্ড ইন্ডিয়ান মিউজিকের ব্যবস্থাপনায় এই বিশেষ উদযাপনে মঞ্চায়িত হবে কবি টি এম আহমেদ কায়সার পরিচালিত বিশেষ কাব্য-আলেখ্য দ্য রেবেল অ্যান্ড দ্য ওয়েস্টল্যান্ড। এতে এলিয়টের চরিত্র রূপায়ন করছেন কবি ও নাট্যকার জন ফার্নডন এবং নজরুলের চরিত্রে থাকছেন আবৃত্তিকার মানস চৌধুরী। এলিয়টের সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী অধ্যাপক শিব কে কুমারের চরিত্রে অভিনয় করবেন শান্তনু গোস্বামী। মূল কবিতা দুটির নাটকীয় পাঠ ও অভিনয়ে থাকছেন কবি বেকি চেরিম্যান, কবি এরিক শিলান্ডার, কবি মাইলস সল্টার, শ্রী গাঙ্গুলি, কানিজ ফাতেমা চৌধুরী, এহসান আহমাদ রাজ, মোহাম্মদ সাদিফ, মিলি বসু, অভ্র ভৌমিক প্রমুখ। সঙ্গীত ব্যবস্থাপনায় থাকছেন প্রীতম সাহা। আলোক প্রক্ষেপণ ও ব্যবস্থাপনায় পাবলো খালেদ।
এই কবিতা দুটির ঐতিহাসিক প্রেক্ষিত এবং বিশ্ব-কবিতায় এর প্রভাব নিয়ে বক্তব্য রাখবেন লিডস ট্রিনিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক কবি ওজ হার্ডউইক।
বাংলা ও ইংরেজি দুই সমৃদ্ধ কাব্য-ঐতিহ্যের প্রখ্যাত দুই কবিতার শতবর্ষ উদযাপনে দ্য রেবেল এবং দ্য ওয়েস্টল্যান্ড মঞ্চায়িত হবে ১৪ মার্চ লন্ডনের রিচমিপ থিয়েটারে এবং পরবর্তীতে ম্যানচেস্টার মিউজিয়াম, হাউজ অব কমন্স, ব্রিটিশ লাইব্রেরিসহ ব্রিটেনের বিভিন্ন শিল্পমঞ্চে, কয়েকটি শহরে।

/জেডএস/

সম্পর্কিত

সাহিত্যতত্ত্ব : একটি সংক্ষিপ্ত পরিক্রমা

সাহিত্যতত্ত্ব : একটি সংক্ষিপ্ত পরিক্রমা

বঙ্গবন্ধুর স্বাস্থ্য ভাবনা

বঙ্গবন্ধুর স্বাস্থ্য ভাবনা

অন্নজল ও অন্যান্য কবিতা  

অন্নজল ও অন্যান্য কবিতা  

একদিন দিনে চাঁদ ফুটবে

একদিন দিনে চাঁদ ফুটবে

বঙ্গবন্ধুর স্বাস্থ্য ভাবনা

আপডেট : ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১২:২১

কিশোর বয়স থেকে রাজনীতি করেছেন বঙ্গবন্ধু। ১৯৪৭-এর পর পশ্চিম পাকিস্তানি শাসক-শোষকগোষ্ঠী পূর্ব বাংলা তথা পূর্ব পাকিস্তানের মানুষকে সকল ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত রেখেছে, তা তিনি নিজের জীবনেই অনুভব করেছেন। ক্ষমতায় যাবেন কি না তা নিয়ে কোনো নিশ্চয়তা না থাকলেও দেশের মানুষের জন্য কোন কোন কাজ করা দরকার সেই ভাবনা সব দক্ষ রাজনীতিবিদেরই থাকে। বঙ্গবন্ধুর আরো বেশি ছিল। কারণ তিনি নিজে ছিলেন স্বাপ্নিক এবং স্বপ্নদ্রষ্টা। বিরোধী রাজনীতি করার সময় দেশের অর্থনীতি কীভাবে পরিচালিত হওয়া উচিত তা যেমন ভাবতেন, তেমনই ভাবতেন জনগণের স্বাস্থ্য উন্নয়নের জন্য কোন পরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসর হওয়া উচিত। অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থান, কর্মসংস্থান—সবকিছু নিয়েই গভীরভাবে ভাবতেন। জানতেন ঔপনিবেশিক আমলের নীতি এবং অবকাঠামো দিয়ে জনগণের জীবনের মূল চাহিদাগুলো পূরণ করা সম্ভব নয়। তাই ক্ষমতায় গেলে কী করবেন, সে বিষয়ে প্রায় পূর্ণাঙ্গ ধারণা ছিল তাঁর। ছিল হয়তো লিখিত পরিকল্পনার ছকও। তাই তো দেখা যায়, মুক্তিযুদ্ধের শেষে ১০ জানুয়ারি ১৯৭২ দেশের মাটিতে পা দিয়েই তিনি কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। এবং প্রথমেই হাত দিয়েছেন দেশের মানুষের মৌলিক প্রয়োজন পূরণ করার ক্ষেত্রেগুলিতে। স্বাস্থ্য তেমনই একটি মৌলিক প্রয়োজন এবং অধিকার। সীমিত সংখ্যক সুবিধাভোগী মানুষের মধ্যে স্বাস্থ্যসেবাকে বন্দি না রেখে দেশের সাত কোটি জনগণের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার পরিকল্পনা নির্মিত হয়েছে তাঁর হাত ধরে। 
          এই বইয়ের লেখক অধ্যাপক ডা. হারিসুল হক পাঠকদের মনে করিয়ে দিচ্ছেন, দেশে ফেরার ২১ দিনের মাথায় বঙ্গবন্ধু গঠন করলেন পরিকল্পনা কমিশন। হাত দিলেন স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা প্রণয়নের কাজে।
          কেমন ছিল সদ্যস্বাধীন বাংলাদেশের স্বাস্থ্য-অবকাঠামো? লেখক হারিসুল হকের বই থেকে জানা যাচ্ছে, সারা দেশে সাত কোটি মানুষের জন্য হাসপাতালে শয্যা ছিল মাত্র ১২৩১১টি। দেশে ডাক্তারের সংখ্যা মাত্র ৭০০ জন। তাদের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধে শহিদ হয়েছেন ৭০ জন। বিভিন্ন বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ডাক্তার ২৫৯ জন। তাদের সবার অবস্থান ছিল রাজধানী ঢাকাতে এবং মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালগুলিতে। তার মানে, ঢাকার বাইরে কোনো রোগীর বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের সেবা পাওয়ার কোনো সুযোগই ছিল না।
          চিকিৎসাব্যবস্থা মানে কেবল ডাক্তার নয়। নার্স, ল্যাব টেকনিশিয়ান, ওয়ার্ড বয়, প্যারামেডিক, অ্যাম্বুলেন্সচালক, হেলথ ভিজিটর, সেনিটারি ইন্সপেক্টর, ফার্মাসিস্টসহ নানা ধরনের স্বাস্থ্যসেবাদানকারীদের নিয়ে গড়ে ওঠে একটি দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা। সেইসব টেকনিক্যাল মানুষের সংখ্যাও ছিল নিতান্তই অপ্রতুল। সারা দেশে নার্স ছিলেন ৭০০ জন, মিডওয়াইভস ছিলেন ২৫০ জন, স্বাস্থ্য পরিদর্শিকা ২৫০ জন। কমপাউন্ডার ছিলেন ১০০০ জনেরও কম। সারাদেশে নামমাত্র রুরাল হেলথ সেন্টার ছিল ১৫০টি। নামমাত্র বলা হচ্ছে এইজন্য যে সেগুলোতে কোনো ডাক্তার তো দূরের কথা, প্যারামেডিকেরও পদায়ন ছিল না।  এই সংখ্যাগুলোই বলে দেয় এই দেশের মানুষের জন্য কার্যত কোনো স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলার ইচ্ছাই ছিল না পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর। তাদের জীবন পুরোটাই ছিল নিয়তির ওপর নির্ভরশীল। স্থানীয় হাতুড়ে, কবিরাজ, হেকিমদের ওপর নির্ভর করতে হতো সর্বাংশে।
          এই অবস্থা পরিবর্তনের জন্য ব্যাপক পরিকল্পনা করলেন বঙ্গবন্ধু। রাতারাতি তো একটা দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা উন্নত করা সম্ভব নয়। তাই কিছু ছিল আশু লক্ষ্য, কিছু মধ্যম মেয়াদী, এবং কিছু সুদূরপ্রসারী। প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় স্বাস্থ্যব্যবস্থায় কিউরেটিভ এবং প্রিভেনটিভ চিকিৎসাকে সমন্বিত করা হয়েছিল। বিশুদ্ধ পানি, পয়ঃনিষ্কাশন, এনভায়রনমেন্টাল হেলথ, গর্ভবতী মা ও প্রসূতি পরিচর্যা, জনগণকে স্বাস্থ্যশিক্ষা দেওয়া, বিভিন্ন রোগের টিকা ছিল প্রিভেনটিভ চিকিৎসার অন্তর্গত। এছাড়া যেহেতু স্বাস্থ্যখাত অনেককিছুর সাথে সমন্বিত একটি বিষয়, তাই স্বাস্থ্যের সাথে পরিবার পরিকল্পনা এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়কে একীভূত করা হয়েছিল।
          স্বাস্থ্যখাতে জরুরি ভিত্তিতে কিছু ক্রাশ প্রোগ্রাম নিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। ১৯৭২ সালে ৪৫০ জন ছাত্রীকে রির্বাচন করে দ্রুত নার্সিং ট্রেনিং সেন্টারে পাঠানো হলো। একটিমাত্র নার্সিং ট্রেনিং ইনস্টিউট ছিল ঢাকাতে। জরুরি ভিত্তিতে রাজশাহীতে খোলা হলো আরেকটি ট্রেনিং সেন্টার। ডাক্তার-সংখ্যা তো রাতারাতি বাড়ানো সম্ভব নয়। একজন ছাত্রের এমবিবিএস কোর্স সম্পন্ন করার জন্য ছয় বৎসর সময় লাগে। তাই অন্তত জনগণের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার জন্য কিউবার দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে একবছর মেয়াদি কোর্সের মাধ্যমে প্যারামেডিক তৈরির ব্যবস্থা নেওয়া হলো।
          বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে পরিকল্পনা কমিশন এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এমনভাবে পরিকল্পনা প্রস্তুত করেছিল, যাতে করে দেশের যেকোনো অঞ্চলের প্রতিটি মানুষ স্বাস্থ্যসেবা নেটওয়ার্কের আওতায় আসতে পারে। বেসিক হেলথ ওয়ার্কার বা মৌলিক স্বাস্থ্যকর্মী নামে একটি পদ সৃষ্টি করা হয়। এরাই জনগণের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত স্বাস্থ্যসেবক। লেখক তার বইতে তুলে ধরেছেন মৌলিক স্বাস্থ্যকর্মীদের কাজের বিবরণ—‘৪০০ মানুষের স্বাস্থ্যের দেখভালের দায়িত্বে থাকবেন একজন মৌলিক স্বাস্থ্যকর্মী। তাঁরা সিডিউল অনুযায়ী মাসে অন্তত একবার প্রতিটি বাড়ি পরিদর্শন করবেন। পরিদর্শনকালে তাঁরা টিকাদান কর্মসূচি (গুটি বসন্ত, কলেরা, টাইফয়েড এবং যক্ষ্মা)-তে প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ করবেন, প্রাথমিক স্বাস্থ্যশিক্ষা (সঠিক পয়ঃনিষ্কাশন, পানীয় জল বিশুদ্ধকরণ, পরিবার পরিকল্পনা) সম্বন্ধে জনগণকে অবহিত করবেন, তাঁরা ম্যালেরিয়া শনাক্ত করার জন্য রোগীদের রক্ত ও সম্ভাব্য যক্ষ্মা আক্রান্তদের কফের নমুনা সংগ্রহ করে রুরাল হেলথ সেন্টারের ল্যাবরেটরিতে জমা দেবেন। তাঁরা ম্যালেরিয়া, যক্ষ্মা ও কুষ্ঠরোগীদের ঔষধ রোগীদের বাড়ি বাড়ি পৌঁছে দিয়ে আসবেন। তাঁরা ম্যালেরিয়া নির্মূল অভিযানে সম্পৃক্ত থাকবেন এবং মহামারিকালে সরকার গৃহীত বিবিধ কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত হবেন। তাঁরা পারিবারিক স্বাস্থ্যকার্ড ও পরিবার পরিকল্পনা গ্রহীতাদের কার্ড যথাযথভাবে পূরণ এবং সংরক্ষণ করবেন—পরবর্তীকালে সেখান থেকে পরিসংখ্যানের জন্য তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা যাবে।’ [পৃষ্ঠা ৩৬]
          এই ধরনের পরিকল্পনাকে বলা যায় গণমুখী স্বাস্থ্য পরিকল্পনা। শিক্ষার মতো স্বাস্থ্যও কারো সুযোগ নয়, বরং অধিকার। এই ধারণাতেই বিশ্বাসী এবং প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিলেন বঙ্গবন্ধু। সেজন্য স্বাস্থ্যখাতে যেসব পরিকল্পনা তিনি গ্রহণ করেছিলেন সেগুলির বর্ণনা পাওয়া যাবে ডা. হারিসুল হকের লেখা এই গ্রন্থে।
          বঙ্গবন্ধু সমাজতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়তে চেয়েছিলেন। কারণ, তাঁর বিশ্বাস ছিল একমাত্র সমাজতন্ত্রেই সকল মানুষের মুক্তি সম্ভব। দারিদ্র্য থেকে মুক্তি, অশিক্ষা থেকে মুক্তি, স্বাস্থ্যহীনতা থেকে মুক্তি। সেই লক্ষ্যেই এই ধরনের স্বাস্থ্য পরিকল্পনা। সমাজতন্ত্র গড়ে না উঠলেও বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে অন্তত একটি কল্যাণরাষ্ট্র পেতে যাচ্ছিল বাংলাদেশের মানুষ। 
          এখন পৃথিবীতে স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং স্বাস্থ্য ভাবনায় অনেক পরিবর্তন এসেছে। ঔষধ, রোগনির্ণয়, জরুরি স্বাস্থ্যসেবা, জটিল স্বাস্থ্যসেবায় যুক্ত হয়েছে অনেক নতুন নতুন আবিষ্কার। সেগুলি বয়ে এনেছে মানুষের রোগমুক্তি এবং দীর্ঘ জীবনের আশ্বাস। কিন্তু মুক্তবাজার পুঁজিবাদ এখন কেবল ধনীদের জন্যই নিশ্চিত করেছে উপযুক্ত স্বাস্থ্যসেবা। দেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠী এখন আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত। বিশাল বিশাল সরকারি স্বাস্থ্য অবকাঠামো গড়ে উঠেছে। তবু সেখানে চিকিৎসা পায় দেশের মাত্র শতকরা ৩০ ভাগ মানুষ। বাকি ৭০ ভাগ মানুষকে স্বাস্থ্যসেবা কিনতে হয় বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক, নার্সিং হোম থেকে। মুক্তবাজার পুঁজিবাদের নিয়ম অনুসারে স্বাস্থ্যখাতে গড়ে উঠেছে প্রতিযোগিতা। তবে সেই প্রতিযোগিতা রোগীদের জন্য সহায়ক হয়নি। হয়েছে উদ্যোক্তা এবং দালাল শ্রেণির জন্য। টাকার অঙ্কে স্বাস্থ্যখাতে সরকারি বরাদ্দ বেড়েছে। তবে অন্যখাতের তুলনায় বেদনাদায়করূপে কম। বঙ্গবন্ধুর সময়ে যেখানে বাজেটের প্রায় ৫% বরাদ্দ ছিল স্বাস্থ্যখাতে, এখন সেখানে বরাদ্দ ২%-এরও কম। বিশ্বব্যাংকের নির্দেশনায় সরকারকে জনগণের স্বাস্থ্য প্রতিদিন বেশি বেশি করে ছেড়ে দিতে হচ্ছে বেসরকারি খাতে। এই প্রবণতা বঙ্গবন্ধুর চিন্তা এবং আদর্শের সাথে সাংঘর্ষিক।
          আমরা কৃতজ্ঞ ডা. হারিসুল হকের কাছে এমন একটি গ্রন্থ প্রণয়নের জন্য। তার এই গ্রন্থের মাধ্যমে আমরা অন্তত এটুকু বুঝতে পারছি যে স্বাস্থ্যখাতে আমাদের কোনদিকে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু, আর এখন আমরা হাঁটছি তাঁর নির্দেশিত পথের বিপরীত দিকে। বঙ্গবন্ধুর প্রতি সত্যিকারের শ্রদ্ধাজ্ঞাপনের একমাত্র উপায় হচ্ছে বর্তমানের ভুলযাত্রা থেকে বিরত হয়ে তাঁর আদর্শের পথকে অনুসরণ করা।

বঙ্গবন্ধুর স্বাস্থ্য ভাবনা। অধ্যাপক ডা. হারিসুল হক। প্রকাশক : কবিতাসংক্রান্তি, ঢাকা। প্রচ্ছদ : ধ্রুব এষ। পৃষ্ঠা : ৮৮। মূল্য :  ৩০০ টাকা।

 

/জেডএস/

সম্পর্কিত

সাহিত্যতত্ত্ব : একটি সংক্ষিপ্ত পরিক্রমা

সাহিত্যতত্ত্ব : একটি সংক্ষিপ্ত পরিক্রমা

লিডসে এলিয়টের 'ওয়েস্টল্যান্ড' ও নজরুলের 'বিদ্রোহী' কবিতার শতবর্ষ

লিডসে এলিয়টের 'ওয়েস্টল্যান্ড' ও নজরুলের 'বিদ্রোহী' কবিতার শতবর্ষ

অন্নজল ও অন্যান্য কবিতা  

অন্নজল ও অন্যান্য কবিতা  

একদিন দিনে চাঁদ ফুটবে

একদিন দিনে চাঁদ ফুটবে

অন্নজল ও অন্যান্য কবিতা  

আপডেট : ২২ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১২:৩৯

অন্নজল

গনগনে রোদ ঠেলে এসে ফকির দাস বটের নিচে বসে।
ঘষা চশমার সামনে হলুদ প্রজাপতি নাচে দাঁতরাঙা ফুলে। 
মাঠে পাকা ধান। পাখি ওড়ে হরেক কিসিম।
ফকির দেখে আর ভাবে, আহা কী রঙ কী রঙ! 
এ বছর ভালো ভিখ মিলবে গো!
বলেই জিভ কাটে, কিরে দেয়, চোখ বুঁজে আকাশে তাকায় জোড় হাতে, মোনাজাতে।
কী যে ভেবে ফেলল সে; এসব ভাবতে নেই!
ভাবলেই মেঘ জমে, ধানের দাম পড়ে যায়, দেনদারি হয় চাষি, দেশে ওঠে রোগের বালাই।

সেও তো চাষিই ছিল একদিন।
এইসব ভেবেটেবে চুপচাপ ঝোলা থেকে ছেঁড়া পুঁটলিটা বের করে আনে।
খুলে ফেলে বিচিকলা দুটো সরিয়ে রাখে, থাক।
কাল খাওয়া যাবে। আজ সে নুন ঘষে নেবে রুটির কানায়।
হরি হে, দিন দিয়ো, দেখো তুমি খোদা। এই বলে সে মুখে অন্ন দেয়। 
অন্নই তো হরি। অন্নই তো মালিক গো! সে দিন না দিলে কেমনে চলবে তার?
খাওয়া দেখে বটের তলায় সাঁৎ সাঁৎ করে শালিক নামে দুটো।
ওটা শালিক না রোদ? ফকির ঘষা কাচে ঠাওর পায় না। 
রুটি চিবোয় আর ভাবে, ভেবে যায়।
আজ ধুনিপাড়ায় কার বাড়ি যেন ভোজ আছে না? 
বিকেলে যেতে হবে। সেও তো দেশেরই লোক, দুটো এঁটোকাঁটা পাবে না কি আর?
ধুলোর ঘূর্ণি কুটো নিয়ে ঘোরে। ঘুরতে ঘুরতে উপরে উঠে যায়।
ফকির গামছা পাতে। একটু জিরোতে তো হবে। কত যে রাস্তা বাকি!


ফড়িং

একটা ফড়িং জলের ওপর মুখ দেখবে বলে থমকে দাঁড়ালো।
কী দেখতে চাইল সে? কতটা ব্যথার ভারে স্থির হয়ে থাকে জীবনের মুখ? 
অথবা ফেলে আসা উড়ানের পথ
স্মৃতির পরম জলে দাগ রেখে গেছে কিনা এইসব?
ঘরে এখন অন্ধকার, বিদ্যুৎ নেই
ঝড়ের সময়ে ভাঙা জানালাটা খোলা যাবে না।
অথচ এই অন্ধকারেই তো দেখা যায় সব–
পুকুরের জল, থমকে দাঁড়ানো ফড়িং, 
স্মৃতির শালুকপাতায় টলমল ব্যথার মিনার।

/জেডএস/

সম্পর্কিত

একদিন দিনে চাঁদ ফুটবে

একদিন দিনে চাঁদ ফুটবে

সুমোহিনী ভেনাস

সুমোহিনী ভেনাস

আমি মুখ খুলতে চাই না : নাদিয়া আঞ্জুমান

আমি মুখ খুলতে চাই না : নাদিয়া আঞ্জুমান

পৃথিবী

পৃথিবী

একদিন দিনে চাঁদ ফুটবে

আপডেট : ২১ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১৪:৫৭

একদিন দিনে চাঁদ ফুটবে

ছোটরা বড়দের কাজ করলে
আর বড়রাও ছোটদের ভূমিকায় থাকলে
বিষয়টা মজার।

বেটিদের পোশাক বেটা পরলে
আর পুরুষদের ড্রেস নারী পরলে হাস্যকর।

একদিন দিনে চাঁদ ফুটবে এবং রাতে সূর্য উঠবে।


তিনটি মেয়ের জামা-কাপড়

তিনটি মেয়ে ঝর্নাজলে
মনের পাখা মেলছে,
নগ্নস্নানে কী আনন্দে
জলের সাথে খেলছে।

বনপরিদের ভাগ্নি যেন
জলপরিদের কন্যা,
ঝর্না জলে জল সাঁতারে
ছড়ায় সুখের বন্যা।

হঠাৎ একটি হেলিকপ্টার
ভটভট করে এলো,
মেয়ে তিনটির স্বাধীনতা
করল এলোমেলো।

হেলিকপ্টার গুলি ছোড়ে
হারায় তারা দিশে,
একটি মেয়ে গুলিবিদ্ধ
রক্তজলে মিশে।

বাকি দুজন বন্দি হলো
সেই শিকারির খাঁচায়,
তিনটি মেয়ের জামা-কাপড়
পড়ে থাকে মাচায়।


পরাজয়

আজ কানাডায় নির্বাচন।
কোথাও ‘আমার ভাই/ তোমার ভাই, আমার নেতা/ তোমার নেতা…’নেই
কোথাও স্লোগান, মিটিং, মিছিল, পোস্টার নেই,
মাইকিং নেই।
কিন্তু শরৎ-হেমন্তের সন্ধিক্ষণে
কোথায় যেন কি হচ্ছে!

আজ কানাডার নির্বাচন।
আজ আমি খুব নীরবে হেরে গেলাম তোমার কাছে!


দেশ বিভাগের গান

আমি তুমি যুক্তাক্ষর
একই সাথে মুক্তাক্ষর।

আমরা থাকি ভালোবাসার বন্ধনে।

আমি তুমি পানি-জল
মা-জননী নির্মল—

মায়ের মুগ্ধ আঁচল থেকে গন্ধ নে!

আমি তুমি এক-দুই
দুই দেশের এক ভূঁই,

নিজ দেশটা পরবাসী, ক্রন্দনে।

/জেডএস/

সম্পর্কিত

অন্নজল ও অন্যান্য কবিতা  

অন্নজল ও অন্যান্য কবিতা  

সুমোহিনী ভেনাস

সুমোহিনী ভেনাস

আমি মুখ খুলতে চাই না : নাদিয়া আঞ্জুমান

আমি মুখ খুলতে চাই না : নাদিয়া আঞ্জুমান

পৃথিবী

পৃথিবী

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

সাহিত্যতত্ত্ব : একটি সংক্ষিপ্ত পরিক্রমা

পর্ব—চারসাহিত্যতত্ত্ব : একটি সংক্ষিপ্ত পরিক্রমা

লিডসে এলিয়টের 'ওয়েস্টল্যান্ড' ও নজরুলের 'বিদ্রোহী' কবিতার শতবর্ষ

লিডসে এলিয়টের 'ওয়েস্টল্যান্ড' ও নজরুলের 'বিদ্রোহী' কবিতার শতবর্ষ

বঙ্গবন্ধুর স্বাস্থ্য ভাবনা

বঙ্গবন্ধুর স্বাস্থ্য ভাবনা

অন্নজল ও অন্যান্য কবিতা  

অন্নজল ও অন্যান্য কবিতা  

একদিন দিনে চাঁদ ফুটবে

একদিন দিনে চাঁদ ফুটবে

রাজু আলাউদ্দিনের আকাঙ্ক্ষার মানচিত্র…

রাজু আলাউদ্দিনের আকাঙ্ক্ষার মানচিত্র…

বাঁশপাতার ভেতরে ভেসে যাবার প্রাক্কালে

বাঁশপাতার ভেতরে ভেসে যাবার প্রাক্কালে

সুমোহিনী ভেনাস

সুমোহিনী ভেনাস

আমার B ও ৯
সাহিত্যতত্ত্ব : একটি সংক্ষিপ্ত পরিক্রমা

পর্ব—তিনসাহিত্যতত্ত্ব : একটি সংক্ষিপ্ত পরিক্রমা

সর্বশেষ

সাইক্লিং নিরাপদে ১০ সুপারিশ

সাইক্লিং নিরাপদে ১০ সুপারিশ

বিশ্ব পর্যটন দিবস উপলক্ষে সাইকেল র‌্যালি

বিশ্ব পর্যটন দিবস উপলক্ষে সাইকেল র‌্যালি

‘বিদ্যালয়ে এসে করোনা আক্রান্তের প্রমাণ পাওয়া যায়নি’

‘বিদ্যালয়ে এসে করোনা আক্রান্তের প্রমাণ পাওয়া যায়নি’

ঢাকায় ‘জলবায়ু অবরোধ আন্দোলন’ কর্মসূচি

ঢাকায় ‘জলবায়ু অবরোধ আন্দোলন’ কর্মসূচি

জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি

জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি

© 2021 Bangla Tribune