X
সোমবার, ১৯ এপ্রিল ২০২১, ৬ বৈশাখ ১৪২৮

সেকশনস

অনুবাদ সাহিত্যের কলাকৌশল

আপডেট : ২৫ অক্টোবর ২০২০, ১২:৩৩

অনুবাদের ক্ষেত্রে ভালো হয় উৎস ভাষা (Sourch Language) এবং লক্ষ্য বা উদ্দিষ্ট ভাষাতে (Target Language) প্রায় কাছাকাছি দক্ষতা থাকলে। যেমন আমরা জানি স্যামুয়েল বেকেট তাঁর বিখ্যাত অ্যাবসার্ড নাটক ওয়েটিং ফর গডো প্রথমে ফরাসি ভাষায় লিখে নিজেই আবার ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন। কবি টিএস এলিয়টও তাঁর ‘ওয়েস্টল্যান্ড’ কবিতাটির পঞ্চম অংশ ‘Death by Water’ প্রথমে ফরাসি ভাষায় লিখে পরে তা ইংরেজিতে অনুবাদ করেন। ভ্লাদিমির নবোকভও বহুভাষিক পণ্ডিত ছিলেন। তিনি প্রথম উপন্যাস রুশ ভাষায় লেখেন, পরে ইংরেজিতে লিখে বিশ্বজুড়ে খ্যাতি পান। বাংলা ভাষায় আবু সয়ীদ আইয়ুবের কথা বলা যেতে পারে, যিনি গালিবের গজলের অনুবাদ করেছিলেন। তাঁর মাতৃভাষা বাংলা না হলেও তিনি বাংলা ভাষায় পণ্ডিততুল্য ছিলেন। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ও ইংরেজি এবং বাংলা দুই ভাষাতেই লেখালেখি করেছেন। বর্তমানে ফরাসিবিদ, এলিয়ট-বিশেষজ্ঞ এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজির অধ্যাপক চিন্ময় গুহ মূল ফরাসি থেকে অনুবাদ করেন। তবে ভালো অনুবাদের জন্য দুটি ভাষায় সমান দক্ষতা থাকা অপরিহার্য না হলেও লক্ষ্য-ভাষায় পূর্ণ দখল থাকা দরকার।

অনুবাদের ক্ষেত্রে উৎস ভাষার অভিধানিক অর্থ জানাই যথেষ্ট নয়। অঞ্চলভেদে এমনকি সময়ভেদেও শব্দের প্রায়োগিক বা ব্যবহারিক অর্থও জানতে হবে। সংস্কৃতিকে আমরা সংজ্ঞায়িত করতে পারি মানুষের কতগুলো বিশ্বাস ও আচরণের সমষ্টি হিসেবে। বিশ্বাসের মধ্যে ধর্ম, অর্থনীতি, রাজনীতি ও আচরণের মধ্যে রয়েছে সাহিত্য ও সংস্কৃতি। আর এসবেরই প্রকাশ ঘটে ভাষার মাধ্যমে। অনুবাদ এক্ষেত্রে ভাষা বদলের মধ্য দিয়ে দুটি ভিন্ন সংস্কৃতিকে সম্পৃক্ত করে। নিডা ও টাবের অনুবাদের সংজ্ঞা থেকেও আমরা তেমনটি পাই। তাঁরা বলেন : ‘অনুবাদ হচ্ছে উৎস ভাষার বিষয়বস্তুকে লক্ষ্য ভাষায় মোটামুটি কাছাকাছিভাবে প্রকাশ করা। কাছাকাছি বলতে প্রথমত, অর্থের দিক থেকে এবং দ্বিতীয়ত, রচনাশৈলীর দিক থেকে। কিন্তু অন্যান্য বিষয়াবলি বিবেচনা করে বলা যায়, অনুবাদ বলতে সমার্থকবোধকে প্রকাশ করা বোঝায়, একই অর্থ প্রকাশ করা নয়।’ [দ্য থিওরি অ্যা-প্র্যাকটিস অব ট্রান্সলেশন]।

তাত্ত্বিকরা অনুবাদকে থিওরি হিসেবে দাঁড় করানোর পর নানা দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করে আসছেন। ফলে অনুবাদের সংজ্ঞা, প্রকারভেদ নিয়ে একক কোনো মত প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তাই অনুবাদের প্রকারভেদ নিয়ে কথা বলতে হলে কয়েক প্রকারের অনুবাদ নিয়ে আলোচনা করতে হবে। ক্যাটফোর্ড অনুবাদের শ্রেণিবিভাগ করেন এর পর্যায়, বিন্যাস ও ব্যাপ্তি অনুসারে। নিডা ও টাব যে দুই ধরনের অনুবাদের কথা বলেছেন, তা হলো : অর্থ ও কাঠামো সমার্থক এবং ভাব-সমার্থক। তবে অনুবাদের একটি আধুনিক পদ্ধতি প্রস্তাব করেন নিউমার্ক। তিনি অর্থগত অনুবাদ, ভাব-বিনিময়গত অনুবাদ, অনুবাদ এবং সংস্কৃতি এই তিনটি পদ্ধতির কথা উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, অর্থগত অনুবাদের ক্ষেত্রে মনোযোগ দেওয়া হয় লিখিত বক্তব্যের ওপর। অন্তর্নিহিত শক্তি এখানে বিবেচ্য নয়। এক্ষেত্রে অনুবাদকের কাজ হয়ে থাকে উৎস-ভাষার বাক্যগঠন ও অর্থদ্যোতনা অপরিবর্তিত রেখে উদ্দিষ্ট ভাষায় প্রকাশ করা। অর্থগত অনুবাদের চেয়ে ভাব-বিনিময়গত অনুবাদ অনেক বেশি স্পষ্ট ও স্বচ্ছ। তাই নিউমার্ক এ ধরনের অনুবাদকেই প্রাধান্য দেন।

অনুবাদ ও সংস্কৃতি বিষয়ে নিউমার্ক বলছেন যে, সংস্কৃতির স্বাতন্ত্র্যের কারণে সাংস্কৃতিক-পূর্বানুমান ও মূল্যবোধগুলো প্রতিটি সংস্কৃতির নির্দিষ্ট মানসিক বৈশিষ্ট্য তৈরি করে দেয়। এবং ধরে নেওয়া যায়, এ বৈশিষ্ট্যগুলো কোন কোন সংস্কৃতিতে খুব কাছাকাছি। তাই বলে দুটো ভিন্ন সংস্কৃতির মানসিক বৈশিষ্ট্য পুরোপুরি একরকম হয় এমন ঘটনা নিতান্ত বিরল। এই মানসিক বৈশিষ্ট্যগুলো নির্দিষ্ট সংস্কৃতির ভাষায় প্রতিফলিত হয়; আর ভাষা হচ্ছে এক ধরনের অদৃশ্য দেয়াল যা বিভিন্ন সংস্কৃতির কাছে পৃথিবীকে বিভিন্নভাবে দেখায়। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, পশ্চিমা বিশ্বে ড্রাগন ভীষণ বিপজ্জনক প্রাণী অথচ প্রাচ্যদেশে সেটি সৌভাগ্যের প্রতীক। বাংলাদেশে কাউকে তুচ্ছার্থে ‘গরু’ বলা হলেও উত্তর আফ্রিকায় গরু সৌভাগ্যের প্রতীক।

ইংরেজ কবি জন ড্রাইডেন (১৬৩১-১৭০০) তাঁর Preface to Ovid’s Epistles-এ অনুবাদকে তিন শ্রেণিতে ভাগ করেছেন: মেটাফ্রেজ (Metaphrase), প্যারাফ্রেজ (Paraphrase) এবং ইমিটেশন (Imitation)। Metaphrase হলো ‘word for word and line by line’ অনুবাদ; যাকে বলা যায় আক্ষরিক অনুবাদ। Paraphrase বিশ্বস্ত স্বাধীন অনুবাদ। অনুবাদক মূলের শব্দগুলো হুবহু অনুসরণ না করে তার অর্থকে অনুসরণ করেন। কখনো কখনো পুরো বাক্যাংশ কিংবা বাক্যও পাল্টে যেতে পারে। একে ‘sense for sense’ অনুবাদও বলা যায়। Imitation হলো এটা এক ধরনের অনুকৃতি। রবীন্দ্রনাথ যাকে বলছেন প্রতিরূপ। এ অনুবাদে শাব্দিক ও ভাবগত সাযুজ্য উভয়কে বিসর্জন দেওয়া হয়। এটি স্বাধীন অনুবাদ না অনুসরণ, তা নিয়ে মতভেদ আছে।

Metaphrasing বা আক্ষরিক অনুবাদ সাধারণত বিজ্ঞান বা টেকনিক্যাল বিষয়ে করা হয়। সাহিত্যের আক্ষরিক অনুবাদকে অনেকে আদর্শিক অনুবাদ হিসেবে মনে করেন না। তবে যাঁরা আক্ষরিক অনুবাদকে মহিমান্বিত করেছেন তাঁদের মধ্যে উচ্চস্বরে উচ্চারিত হয় হোর্হে লুই বোর্হেসের কথা। লাতিন বিশ্বের এই মহান লেখক অনুবাদশিল্প নিয়ে বিস্তারিত কথা বলেছেন ১৯৬৭ সালে আমেরিকার হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘নরটন লেকচার’ নামে খ্যাত এক বক্তৃতায়। বোর্হেস সেখানে দৃষ্টান্তসহ আক্ষরিক অনুবাদের সৌন্দর্যের কথা তুলে ধরে মূলের চেয়ে অনূদিত কাজের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেন। আসলেই কি অনুবাদ মূলকে ছাপিয়ে যেতে পারে। বোর্হেস বলছেন : ‘আক্ষরিক অনুবাদ শুধু, যেমনটা ম্যাথু আর্নল্ড বলেছেন, অভ্যবতা ও অস্বাভাবিকতাই নিয়ে আসে না, সঙ্গে আরও আনে অচেনা অনুভূতি ও সৌন্দর্য।’ [মাসরুর আরেফিন: ‘বোরহেস ও আক্ষরিক অনুবাদের সৌন্দর্য’, কালের খেয়া, দৈনিক সমকাল]। তবে বোর্হেস এই আক্ষরিক অনুবাদ বলতে শব্দ ধরে ধরে অনুবাদ নয়, বোধের বিশ্বস্ত অনুবাদের কথা বলছেন। কারণ আমরা জানি, অনেক ক্ষেত্রে আক্ষরিক অনুবাদ সম্ভবও নয়। আক্ষরিক অনুবাদে মূলকে অক্ষুণ্ণ রাখতে গিয়ে বিক্রীত হওয়ার সম্ভাবনাও থাকে। উদাহরণ হিসেবে খন্দকার আশরাফ রচিত ‘তরজমার জমাখরচ’ প্রবন্ধ থেকে একটা অংশ উদ্ধৃত করছি: ‘কবিতা বা কাব্যমণ্ডিত রচনার আক্ষরিক অর্থাৎ আভিধান দেয়া অনুবাদে কী হয় তার একটি নমুনা আমাকে দেখিয়েছিলেন শ্রদ্ধেয় জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী। তাঁরই এক বন্ধু, তিনিও বিখ্যাত, কিন্তু নাম বলছি না, শেক্সপীয়রের হ্যামলেট নাটকের বিখ্যাত স্বগতোক্তি ‘To be or not to be’-এর অনুবাদ করতে গিয়ে একটি মজার কাণ্ড করেছিলেন। ঐ স্বগতোক্তির এক জায়গায় আছে, Aye, there is the rub-‘সেখানেইতো সমস্যা’, বা ‘ও জায়গাটাইতো বিঁধছে’; অনুবাদক লিখলেন, ‘হ্যাঁ, সেখানেই তো ঘষাঘষি।’ রবীন্দ্রকাব্যের অনুবাদক টমসন সাহেবও এরকমভাবেই ‘অরূপরতন’ শব্দটির অর্থ করেছিলেন ‘ugly gem’! শুধু শব্দের অর্থবিভ্রাট নয়, বিভ্রাট ঘটে অন্যত্রও। একটি সাহিত্যকর্ম একটি সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলকেও বিম্বিত করে। সেই পরিমণ্ডল সম্পর্কে জ্ঞান না থাকলে অনুবাদক বিপদগ্রস্ত হন সহজেই। কয়েক বছর আগে জীবনানন্দ দাশের কবিতার ইংরেজি অনুবাদ করতে গিয়ে এক অনুবাদক ‘সিন্ধুসারস’ শব্দটির অনুবাদ করেছিলেন ‘The Indus Stork’: সিন্ধু বলতে তিনি সমুদ্র না বুঝে পাকিস্তানের সিন্ধু নদী বুঝেছিলেন।’ [তর্জমার জমাখরচ। শাশ্বতিকী অনুবাদ সংখ্যা, সম্পাদক বর্তমান আলোচক]

ইংরেজি ভাষায় ছন্দ মাপা হয় মিটার বা স্ট্রেস মেপে, বাংলায় মাত্রা দিয়ে। কাজেই গদ্যের আক্ষরিক অনুবাদ কিছুটা সম্ভব হলেও কবিতার আক্ষরিত অনুবাদ সম্ভবই নয়। তাছাড়া খালিকুজ্জামান ইলিয়াস ‘অনুবাদের সৃজনশীলতা’ প্রবন্ধে যেমনটি বলছেন, ‘সেতারে যেমন বেহালার স্বর নেই, সানাইয়ে নেই পিয়ানোর স্বর, তেমনি এক ভাষায় নেই অন্য ভাষার স্বর।’ তাই সাহিত্যের অনুবাদের ক্ষেত্রে আমরা আদর্শ অনুবাদ বলতে paraphrasing বা মূলানুগ অনুবাদকে বুঝি। imitation বা অনুকৃতি স্বাধীন অনুবাদ নয়, কারণ এখানে মূলটা অনেক সময় হারিয়ে গিয়ে নতুন একটি টেক্সটের জন্ম হয়। বড়মাপের কবিরা সাধারণ এই ধরনের অনুবাদ করে থাকেন। এজন্যে বলা হয়ে থাকে কবিরা আদর্শ অনুবাদক হতে পারেন না। ওক্তাবিও পাস তাই বলছেন, ‘তাত্ত্বিকভাবে কবিদেরই উচিত কবিতার অনুবাদ করা। কিন্তু প্রায়োগিকভাবে লক্ষ্য করা যায়, খুব কমসংখ্যক কবিই ভালো অনুবাদক।’ [অনুবাদ : সাহিত্য ও আক্ষরিকতা, অনুবাদ : আবদুস সেলিম] অধিকাংশ সময় দেখা যায়, কবিরা অনুবাদের মাধ্যমে মূলকে নিজের করে ফেলেন। উদাহরণ হিসেবে আমরা দেখব বাংলা সাহিত্যে ত্রিশের কবিতা বিদেশি কবিতা থেকে প্রত্যক্ষভাবে অনেক কিছু গ্রহণ করেছে। সেটা এক ধরনের অনুবাদই। কিন্তু এমন করে আত্মস্থ করে স্বভাষায় প্রকাশ করেছেন যে সেটি আর মূলানুগ থাকেনি। স্বাধীন সৃষ্টি হিসেবে আমরা সেগুলো গ্রহণ করতে পারি। একটা উদাহরণ দেওয়া যায়। জীবনানন্দ দাশের ‘হায় চিল’ কবিতা প্রখ্যাত আইরিশ কবি ডব্লিউ বি ইয়েটসের ‘He Reproves the Curlew’ কবিতাটির অনুকরণে লেখেন। অনুরূপভাবে প্রায় হুবহু অনুকৃতি না হলেও এডগার এলেন পোর ‘টু হেলেন’ কবিতাটির সঙ্গে বিষয়গত সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যায় জীবনানন্দের ‘বনলতা সেন’ কবিতার সঙ্গে। ফ্রস্টের বিখ্যাত ও বহুল পঠিত কবিতা ‘Stopping by Woods on a Snowy Evening’-এর বাংলা অনুবাদ করেছেন শামসুর রাহমান। গীতিধর্মী কবিতাটির তিনি অনুবাদ করেন ছড়াধর্মী ছন্দে। কিছু চিত্রকল্পের অনুবাদ করেছেন মূল থেকে সরে গিয়ে। The woods are lovely, dark and deep-এর বাংলা করেছেন ‘কাজল গভীর এ-বন মধুর লাগে’। আবার My little horse must think it queer -এর অনুবাদ করেছেন ‘ঘোড়াটা ভাবছে ব্যাপার চমৎকার’। ফ্রস্টের কথাটা এখানে বদলে গেছে। একইভাবে Tree at My Window KweZvi Vague dream-head lifted out of the ground, And thing next most diffuse to cloud -এর অনুবাদ করেছেন ‘মাটি থেকে উঠে এলো আবছা স্বপ্ন-চূড়ো আর তারপর কুয়াশার মেঘ এলো ছেয়ে’। এটিও বেশ স্বাধীন অনুবাদ। এই কারণে বাংলাদেশের এই প্রখ্যাত কবি বিশস্ত অনুবাদক হয়ে উঠতে পারেননি। রবীন্দ্রনাথের গীতাঞ্জলি অনুবাদ, ঈশ্বরচন্দ্রের ভ্রান্তিবিলাস বা গিরীশ ঘোষের ম্যাকবেথ, মুনীর চৌধুরী ও প্রফেসর কবীর চৌধুরীর ওথেলো, সৈয়দ শামসুল হকের ‘ম্যাকবেথ’—এগুলোও অনুবাদ করা হয়েছে মূল থেকে খানিকটা সরে এসে। এক ধরনের পুনর্লিখনের প্রয়াস সেখানে আছে।

অনুকৃতির আরো চমৎকার উদাহরণ হতে পারে শেকসপিয়ারের নাটকগুলো। শেকসপিয়ারের প্রায় সব নাটকই কোনো না কোনো প্রচলিত কাহিনি বা লোককথার পুনর্নির্মাণ। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরসহ বিশ্বের বড় বড় লেখক এই কাজটি করেছেন। যেমন রবার্ট ব্রাউনিং যখন ‘The Pied Piper of Hamelin’ লেখেন তখন সেটিও নতুন সৃষ্টি হিসেবে বিবেচিত হয়। ড্রাইডেনের ভাষায় এগুলোকে ইমিটেশন বলা যায় : ‘মূলের সংকেত দ্বারা অনুপ্রাণিত স্বাধীন ও নতুন সৃষ্টি। ড্রাইডেন যদিও ইমিটেশনকে অনুবাদেরই একটা শ্রেণি হিসেবে গণ্য করেছেন, তবে তাকে গুরুত্ব দেননি।’ [ধ্রুপদী সাহিত্যের অনুবাদ/জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী]। একইভাবে বোর্হেসও ইমিটেশনকে অনুবাদের আওতায় ফেলে বিচার করতে চাননি। তিনি বলছেন, ‘মূলকে ছাপিয়ে অনুবাদ যদি বেশি ভালো হয়ে যায় তাহলে তা আর ‘অনুবাদ’ই থাকে না, হয়ে যায় সৃজনশীল নতুন সাহিত্য। তো, বিচারের বিষয় যখন অনুবাদ, তখন এমন অনুবাদ নিয়ে বলার আর কীই-বা থাকে, যা কিনা মূলের চেয়েও সুন্দর, অর্থাৎ অন্য অর্থে, যা কিনা আর অনুবাদই থাকছে না? [মাসরুর আরেফিন/বোরহেস ও আক্ষরিক অনুবাদের সৌন্দর্য]।

মধ্যযুগের কবি আলাওল, অনুবাদক হিসেবে যার পরিচিত আমরা আগেই পেয়েছি, অনুবাদের তিনটি স্তরকে চিহ্নিত করেছেন :

১. ভিন্ন ভাষায় মূলপাঠের অর্থ বোঝা

২. রসনির্ণয় করার উদ্দেশ্যে মূলকাব্যের রূপ বিশ্লেষণ ও ব্যাখ্যা করা

৩. নির্ণীত রস পুনরায় বহন করার জন্য বাংলা ভাষায় নতুন সাহিত্য ভাজন, অর্থাৎ পাঁচালি কাব্য রচনা করা—যাতে সভাসদরা পূর্ণভাবে রস উপভোগ করতে পারে।

পাশাপাশি আলাওল অনুবাদের তিনটি ক্রিয়া উল্লেখ করেন :

১. বুঝুন—অর্থাৎ মূল পাঠের ভাষার বাচ্যার্থ বোঝা

২. ভাঙন—অর্থাৎ বাচ্যার্থ থেকে কাব্যের আন্তরিক ভাব ব্যাখ্যা করা

৩. কহন—এই সাহিত্যিক ভাব অনুভব করে পাঠক বা দেশি শ্রোতাদের সন্তোষের উদ্দেশ্যে বাংলা ভাষায় পাঁচালি রচনা করা। [কবি আলাওলের অনুবাদ-পদ্ধতি, থিবো দুবের, ভাবনগর, ১ম বর্ষ, ১ম সংখ্যা]।

এক ভাষা থেকে অন্য ভাষায় রূপান্তর করতে গেলে কাছাকাছি সমার্থক শব্দ বা near-equivalent নিয়ে ভাবতে হয়। মার্কিন ভাষাতাত্ত্বিক ইউজেনে নিদা এই সমার্থক শব্দ নির্বাচনের প্রয়াসকে দুভাবে চিহ্নিত করেছেন। একটি হচ্ছে Formal equivalence-এর অনুসন্ধান, অন্যটি Dynamic equivalence-এর অনুসন্ধান। প্রথমটি অনেকটা কাছাকাছি বা আক্ষরিক অনুবাদের প্রয়াস। দ্বিতীয়টি লক্ষ্য ভাষায় যুতসই সমার্থক শব্দ বের করা। একটি কথা মনে রাখা প্রয়োজন, একটি ভাষার অধিকাংশ শব্দের হুবহু প্রতিশব্দ অন্য ভাষায় হয় না। এমনকি আন্তঃভাষাতেও সেটি সম্ভব নয়। অনেক সময় অর্থ হুবহু এক হলেও ধ্বনিগত ব্যঞ্জনা আলাদা হওয়ার কারণে গ্রহণ করা যায় না। যেমন, বাংলা ভাষায় ‘বিফল’ শব্দের সমার্থক শব্দ হিসেবে অভিধানে আমরা পাই : ফলহীন, অচল, নিষ্ফল, অসমর্থ, ব্যর্থ। এর কোনোটিই বিফলের সম্পূর্ণ চরিত্র ধারণ করে না। ইংরেজিতে বহুল ব্যবহৃত ‘সিরিয়াস’ শব্দটির যে ব্যবহারিক ব্যাপ্তি, তা ধারণ করে এমন কোনো যুতসই প্রতিশব্দ বাংলাতে নেই। যে কারণে serious person, serious subject, serious issue, serious art—প্রভৃতি ক্ষেত্রে বাংলা অনুবাদের সময় সিরিয়াসের ভিন্ন ভিন্ন সমার্থক শব্দের প্রয়োজন হয়। অর্থাৎ অনুবাদ করার সময় অনেকগুলো অপশনের ভেতর বোঝাপড়া বা নেগোসিয়েশন করতে হয়। ইতালির কথাসাহিত্যিক উমবার্তো ইকো যে কারণে বলছেন, অনুবাদ মানেই হলো নেগোসিয়েশন। তাঁর একটা বই আছে অনুবাদবিষয়ক : মাউস অর র‌্যাট? ইঁদুরের ইংরেজি প্রতিশব্দ মাউস হবে না র‌্যাট হবে। সিদ্ধান্তটা অনুবাদক নেবেন। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত তাঁর হাতে। আমি নিজের অনুবাদ থেকে একটা উদাহরণ দিতে পারি। মার্কিন গল্পকার এডগার এলান পোর A Tell Tale Heart গল্পটি আমি অনুবাদ করে বিপদে পড়ে যাই শিরোনাম নিয়ে। আমি শিরোনামের অনুবাদ করার পক্ষপাতী। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে যেমন শেকসপিয়ারের As You Like It বা স্টিভেনসনের Treasure Island-এর মতো বিখ্যাত বইগুলোর নাম বিশ্বের সকল ভাষার সাহিত্যপ্রেমীদের মুখে মুখে থাকার কারণে এ ধরনের জনপ্রিয় বইগুলোর শিরোনাম ইংরেজিতেও রাখা যায়। এসব ক্ষেত্রে অনেক সময় অনুবাদ করলেই বরং বুঝতে সমস্যা হয়। এ ক্ষেত্রে As You Like It শিরোনামটি বাংলা বর্ণে ‘অ্যাজ ইউ লাইক ইট’ রাখা যেতে পারে। A Tell Tale Heart-এর ক্ষেত্রে সেটি করা যাচ্ছে না কারণ ‘এ টেল টেল হার্ট’ লিখলে Tell এবং Tale-এর বানানগত এবং অর্থগত পার্থক্য ধরা পড়ে না। ফলে একে বাংলা করা যুক্তিসংগত। A Tell Tale Heart-এর অনেকগুলো সম্ভাব্য বাংলা আমি দাঁড় করাতে চেষ্টা করি। ‘কথা বলা হৃদয়’, ‘বাচাল হৃদয়’, ‘কথক মন’ প্রভৃতি। আমি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক অসীম কুমার দাসের সঙ্গে আলোচনা করে বাংলা করেছি ‘বেফাঁস হৃদয়’। আরো অনেক অপশন নিশ্চয় আছে। অনুবাদক যৌক্তিক একটা বেছে নেবেন। এভাবেই একটি পূর্ণাঙ্গ টেক্সটের অনুবাদ করার সময় অনুবাদককে অসংখ্যবার নেগোসিয়েশনের ভেতর দিয়ে যেতে হয়। এটা করতে গিয়ে মূল টেক্সটের একটা সমালোচকীয় পাঠ দাঁড় করান তিনি। কবি-সমালোচক এজরা পাউন্ডও বলছেন সে কথা। তাঁর মতে, অনুবাদ হলো ‘এ ফর্ম অব ক্রিটিসিজম’। অর্থাৎ অনুবাদ হচ্ছে মূল টেক্সটের সমালোচকীয় পাঠ। যে কারণে একই টেক্স ভিন্ন ভিন্ন অনুবাদে ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণিক পাঠ হয়।

এসব বিবেচনায় অনুবাদ সবসময় কঠিনসাধ্য একটি কাজ। অনুবাদে আরও কিছু সমস্যা আছে যা কখনোই দূর হওয়ার নয়। গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক যেমনটি বলছেন, ‘Yet language is not everything. It is only a vital clue to where the self loses its boundaries. The ways in which rhetoric or figuration disrupt logic themselves point at the possibility of random contingency, beside language, around language.’ [The Politics of Translation] দুটি ভাষা দুটি সংস্কৃতির বোধকে ধারণ করে, অনুবাদের ভেতর দিয়ে এ দুটোর মধ্যে সংযোগ স্থাপন করার কাজটি করা হয়। এ কারণে উৎস ভাষাগোষ্ঠীর ইতিহাস-সংস্কৃতি-মিথ-সামাজিক আচার ইত্যাদি গভীরভাবে জানা দরকার। সবচেয়ে ভালো হয়, অনুবাদক যে দেশের সাহিত্যকর্ম অনুবাদ করছেন সে দেশে কিছুকাল যাপন করতে পারলে। অর্থাৎ ভাষা শেখাটাই এখানে সব না। গ্লোবাল ইংরেজি আর স্থানিক ইংরেজি সবসময় এক হয় না। যে কারণে অভিধানের অর্থ সর্বত্র চলে না। নিশ্চয় ভাষা সবসময় কনটেক্সচুয়াল। অনুবাদককে সেটা ধরতে হবে; না হলে জীবনানন্দ দাশের ‘হয়তোবা হাঁস হবো—কিশোরীর—ঘুঙুর রহিবে লাল পায়’-এর অনুবাদ করতে গিয়ে হাঁসের লাল পায়ের ঘুঙুর উঠে যাবে কিশোরী পায়ে, যেমনটি কিছু কিছু অনুবাদে হয়েছেও।

//জেডএস//

সম্পর্কিত

অন্যমনস্কতার ভেতর বয়ে যাওয়া নিঃশব্দ মর্মর

অন্যমনস্কতার ভেতর বয়ে যাওয়া নিঃশব্দ মর্মর

মজিদ মাহমুদের সাক্ষাৎকার

মজিদ মাহমুদের সাক্ষাৎকার

শামসুজ্জামান খান : বাঙালি সংস্কৃতির অতন্দ্র প্রহরী

শামসুজ্জামান খান : বাঙালি সংস্কৃতির অতন্দ্র প্রহরী

স্মৃতিতে বোশেখী মেলা

স্মৃতিতে বোশেখী মেলা

আমাদের মঙ্গল শোভাযাত্রা

আমাদের মঙ্গল শোভাযাত্রা

বসন্তের লঘু হাওয়া

বসন্তের লঘু হাওয়া

বইমেলায় নভেরা হোসেনের ‘অন্তর্গত করবী’

বইমেলায় নভেরা হোসেনের ‘অন্তর্গত করবী’

অমিয় চক্রবর্তীর কবিতা : বিষয়বিন্যাস

অমিয় চক্রবর্তীর কবিতা : বিষয়বিন্যাস

সর্বশেষ

অন্যমনস্কতার ভেতর বয়ে যাওয়া নিঃশব্দ মর্মর

অন্যমনস্কতার ভেতর বয়ে যাওয়া নিঃশব্দ মর্মর

মজিদ মাহমুদের সাক্ষাৎকার

মজিদ মাহমুদের সাক্ষাৎকার

শামসুজ্জামান খান : বাঙালি সংস্কৃতির অতন্দ্র প্রহরী

শামসুজ্জামান খান : বাঙালি সংস্কৃতির অতন্দ্র প্রহরী

স্মৃতিতে বোশেখী মেলা

স্মৃতিতে বোশেখী মেলা

আমাদের মঙ্গল শোভাযাত্রা

আমাদের মঙ্গল শোভাযাত্রা

বসন্তের লঘু হাওয়া

বসন্তের লঘু হাওয়া

বইমেলায় নভেরা হোসেনের ‘অন্তর্গত করবী’

বইমেলায় নভেরা হোসেনের ‘অন্তর্গত করবী’

অমিয় চক্রবর্তীর কবিতা : বিষয়বিন্যাস

অমিয় চক্রবর্তীর কবিতা : বিষয়বিন্যাস

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ

Bangla Tribune is one of the most revered online newspapers in Bangladesh, due to its reputation of neutral coverage and incisive analysis.
© 2021 Bangla Tribune