সেকশনস

তিস্তা জার্নাল | পর্ব দুই

আপডেট : ০৮ ডিসেম্বর ২০২০, ১১:৫৭

পূর্ব প্রকাশের পর

কিন্তু এখন শান্ত কৃশ তিস্তার তীরে বোল্ডারের স্তূপের ওপর বসে বড়শি ফেলে ধ্যানস্থ হয়ে আছে লোকজন—বালকেরাও বাদ যায়নি।  নদীতীরের খোলা আকাশের ঈষৎ-তপ্ত রোদ আড়াল করতে কারও মাথায় ছাতা। আবালবৃদ্ধবনিতা গোসল সেরে নিচ্ছে পরিষ্কার ঠান্ডা পানিতে। এখানে-ওখানে দু-একটা ‘চটকা’ জাল খুঁটিতে বাঁধা, কোনওটার কেবল কাঠামোটা বাঁধা আছে, জালটা খুলে রাখা হয়েছে—অবসরমতো গৃহস্থ কৃষক ওটা টেনে দু-এক বেলার মতো মাছ ধরবে বলে। পানির কিনার আর নদীশাসনের সিমেন্টের বাঁধনের মাঝখানে যে এক চিলতে ভেজা বেলে মাটি, তীরবাসিনী বৌ-ঝিরা সেখানে ধনেপাতা, পিঁয়াজ কিংবা রসুনের বীজ বুনেছেন। সেগুলোর কচি পাতা শিরশিরে বাতাসে দোল খাচ্ছে।

তিস্তার এই অংশে মাছ ধরার আয়োজন খুব বেশি নেই। ‘চটকা’ জাল ছাড়া ছোট ডিঙি নৌকায় করে পাতা-জাল দিয়ে মাছ ধরতে দেখা গেল এক বৃদ্ধ আর তার সহকারীকে। বড়শির প্রচলন এখানে বেশি। বাজারের দোকানের সামনেই পরিচয় হয়েছিল বছর ত্রিশের এক যুবকের সাথে। হলুদ-কালো ডোরাকাটা টি-শার্ট আর অনেকগুলো পকেটঅলা প্যান্ট পরনে; মাছ ধরার উপযুক্ত পোশাক! হাতে হুইলঅলা বড়শি আর সাদা প্লাস্টিকের বাজারের ব্যাগ—মাছ ধরার সরঞ্জাম আর ধরা-মাছ রাখার জন্য। তেমন কিছু স্থির পেশা নেই, আছে মাছ ধরার নেশা। মুখে লম্বা কালো চাপদাড়ি আর খুলি কামড়ানো চুল। রোদে পুড়ে গায়ের শ্যামলা রং কালো হয়ে উঠেছে— ‘বোনা ফাইড’ মাছ-ধরিয়ে দেখেই বলে দেওয়া যায়। অনুরোধ করতেই নিজেই নদীটাকে পেছনের ব্যাকগ্রাউন্ডে রেখে পাড়ের বাঁধানো জায়গায় এক হাতে ব্যাগ-বড়শি ধরে আরেক হাত সোজা ঝুলিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন ছবি তোলার জন্য।

নদীর একেবারে তীর ধরে সরু মাটির ধুলোভরা পথ বুড়িরহাট-মহীপুর পাকা রাস্তার সমান্তরালে গঙ্গাচড়া সদর পর্যন্ত চলে গেছে। পায়ে-হাঁটা লোকজন, মোটরসাইকেল, ভ্যানগাড়ি, এমনকি দুয়েকটা ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা সেই পথ দিয়ে চলাচল করছে। এই দুই রাস্তার মাঝখানে বাড়িঘর, যৎসামান্য সওদা সাজিয়ে রাখা দু-একটা দোকান, পুকুর, কিছু চাষজমি। এই বাড়িগুলো অন্যরকম—কোনওরকমে মাথার গোঁজার ব্যবস্থা যেন; কিন্তু তবু আলগা ভঙ্গুর নদীকবলিত মাটিতে জীবনের শিকড় পুঁতে দেওয়ার কোনও আয়োজন বাকি নেই। বাঁশ-খড় বা টিনের বেড়া, টিনের আচ্ছাদন, কিন্তু অগোছালো—নদীতীরের আলগা বেলেমাটির ওপর আলতো করে বসিয়ে রাখা হয়েছে যেন। কাছ ঘেঁষে মাটির ভাঙাচোরা পথটা চলে গেছে, বাড়ির উঠোন আর সেই পথটা একাকার। সেখানে গরু-ছাগল বাঁধা, কয়েকটা বাচ্চা নিয়ে মুরগি চরছে, দুটো কুকুরের ভালোবাসার পূর্বরাগ চলছে, পাটকাঠিতে গোবর চেপে তৈরি করা ‘শলা’ রোদে শুকাচ্ছে—সুলভ আর উৎকৃষ্ট জ্বালানি। পথটার একধারে কিছু গাছপালা, ইলেকট্রিকের খাম্বা, বাঁশের খুঁটি দিয়ে একটা মাচা বেঁধে দেওয়া হয়েছে, তাতে মেটে আলু, লাউ-কুমড়া বা শিমের লতা উঠে গেছে। পথটার প্রায় উপরেই কিছুটা দূরত্বে দুটো বাঁশের খুঁটি পুঁতে আর একটা বাঁশ তার ওপর আড়াআড়ি বসিয়ে গোলপোস্টের মতো একটা কাঠামো দাঁড় করানো হয়েছে—সেই গোলপোস্টের ক্রসবারে কাপড় শুকাতে দেওয়া হয়েছে। মূল বসতঘরের একপাশের বেড়াটার তিনদিকে টিনের বেড়া দিয়ে গোয়ালঘর করা হয়েছে, তার খোলা দরজার বাইরে খড় ছড়ানো, উপরের চালাটায় ছোটো একটা জাল বাঁশের ফ্রেমসুদ্ধ উল্টো হয়ে রোদে শুকোচ্ছে।

তিস্তাপাড়ের মানুষের মুখ: বাঁধানো পাড়ের বোল্ডারের উপর বসে মাছ ধরছে বালক, ছবি: লেখক  পথটা ধরে গঙ্গাচড়ার দিকে এগোই। একটা বাড়ির বাইরের উঠোনে, কয়েকটা বছর চার-পাঁচের বাচ্চা খেলছিল। ক্যামেরা তাক করতেই বনের ভীত হরিণছানার মতো যে যেদিকে পারে ছুট লাগায়। অভয় দিয়ে যখন বললাম ছবি তোলা হচ্ছে, তখন মিষ্টি হেসে ক্যামেরার সামনে মুখ বাড়িয়ে দাঁড়ায়।

সামনেই গান্নার পাড়—এ অঞ্চলে তিস্তার সবচেয়ে ভাঙনপ্রবণ বাঁক ওটা। গত এক দশকে বর্ষা মৌসুমে এখানে যতবার এসেছি, নদীর করাল গ্রাস দেখেছি। এখন শীতের শুরুতে নদী অনেক ভেতরে চলে গেছে। গান্নার পাড় থেকে নদীর ধারা পর্যন্ত অনেকখানি চর—সেখানে মিষ্টি আলু, শাকসবজির ক্ষেত। নদীর ধারার ধার ঘেঁষে সেইসব ফসলসমেত বিরাট বিরাট বেলেমাটির চাঙড় ভেঙে ভেঙে নদীতে পড়ছে।

সেখানে পথের ধারের আরেকটা বাড়ির উঠোনে সামান্য কিছু ধানের আঁটি একটা কাঠের গুঁড়িতে আছাড় মেরে মেরে ধান ঝাড়ছিলেন বছর পঁয়ত্রিশের একজন নারী। তাঁকে সাহায্য করছে তের-চৌদ্দ বছরের এক কিশোরী। নদীর অবস্থা কেমন জিজ্ঞেস করতেই নিতান্ত চেনা মানুষের মতো হাসিমুখে কাজ বন্ধ করে ভাঙতে থাকা সবজি ক্ষেতের দিকে আঙুল তাক করে বললেন, “ঐ যে দ্যাখেন, সোউগ চলি যায়চোল (সব চলে যাচ্ছে)।” নিজে থেকেই পরিস্থিতির বিস্তারিত বলতে লাগলেন, কিন্তু বর্ণনার ভাষায়, দেহভঙ্গিতে কোনও অভিযোগ নেই—যেন খুব স্বাভাবিক এসব, নিত্যদিনের ব্যাপার। বাস্তবিকই তাই; নদীর ভাঙাগড়ায় এই মানুষেরা অভ্যস্ত। হয়তো গোটা জীবনটাই এই নদীর তীরে, ভাঙনে ঘরবাড়ি ভিটেমাটি হারিয়ে, আবার গড়ে কাটিয়ে দিয়েছেন এই নারী। বাকিটা জীবনটাও কাটিয়ে দেবেন। সরল, বন্ধুত্বপূর্ণ—কিন্তু আদিম, সভ্যতাবিচ্ছিন্ন, অসচেতন নন এঁরা। ছবি তুলতে চাইলেই একইরকম মিষ্টি হেসে প্রত্যাখ্যান করে বললেন, “ছবি তুলবেন কেন? ছবি তুলব না।” সোজা সংক্ষিপ্ত প্রত্যাখ্যান, কিন্তু অমলিন হাসি আর বিনীত দেহভঙ্গির মিশেলে সে প্রত্যাখ্যানকে খুব ভব্য মনে হয়।

শীতের তিস্তার চরে আবাদ করা শাক-সবজির ক্ষেত নদীতে ভেঙে পড়ছে, ছবি: লেখক তিস্তার পাড়ের মানুষের এই রূপটা সব সময় আমাকে অবাক করেছে। হাঁটতে হাঁটতে আরেক জায়গায় দেখলাম তিন নারী নদীর বাঁধানো পাড়ের ঢালের উপরটায় বসে মিষ্টি আলুর ডাল কেটে কেটে গুছিয়ে রাখছেন। তাঁদের একজন প্রৌঢ়া, একজনের বয়স ত্রিশের কোঠায় হবে, অন্যজন সদ্য কৈশোরোত্তীর্ণ। ‘কী করেন চাচি’ জিজ্ঞেস করতেই অসংকোচে, পাশের বাড়ির চেনা মানুষের মতোই হেসে উত্তর দিলেন—ডালগুলো চরের বালুমাটিতে পোঁতা হবে, ভাল ‘শ্যাকালু’ হবে। এখানে কেমন আছেন জানতে চাইলে সেই একই অভিযোগহীন ভঙ্গিতে উত্তর দেন, “আর বাবা, হামার থাকা। নদীর ওপরোত বাড়ি। থাকা না থাকা সমান। কাওঁ হামার খোঁজ নেয় না।” আশ্চর্য না হয়ে পারলাম না ছবি তুলতে চাইলে প্রৌঢ়া যে উত্তর দিলেন তা শুনে, “ছবি তুলি তোমরা তো ইন্টারনেটত দেমেন। হামরা তাত কি পামো?” মুখে সেই দ্বিধায় ফেলে দেওয়া সবিনয় প্রত্যাখ্যানের হাসি। ইন্টারনেটে তাঁদের ছবি দেওয়ার আমার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে নেই বলাতে পাশের কিশোরী একটু রাগি ভঙ্গিতেই প্রতিবাদ করে, “দেবেনই তো, আমরা জানি।” ভাষায় স্কুলের শিক্ষা আর ইন্টারনেটের প্রভাব স্পষ্ট।

কথা বলতে বলতে উল্টোপাশের বাড়িটা থেকে বেরিয়ে এলেন শাড়ি-পরা এক নারী; বয়স ত্রিশের কোঠাতেই হবে। চুল ভেজা, ভাঁজ করা হাতে ভেজা কাপড়। বোঝাই যাচ্ছে, কেবলই গোসল করেছেন, কাপড় শুকোতে দেবেন। সুদর্শনা, সুযৌবনা নারীর কথায়-ভঙ্গিতে সম্পূর্ণ অপরিচিত পুরুষের সামনে কোনও সংকোচ নেই, আবার সামান্যতম অশালীনতা বা অসৌজন্যের আভাস নেই। অত্যন্ত পরিচিতের মতো স্বাভাবিক কণ্ঠস্বরে কথায় যোগ দিলেন কাপড় শুকোতে দিতে দিতে। শাড়ির পাড় একদিকে কিছুটা সরে গেছে, তথাকথিত আব্রু রক্ষার কোনও বাড়াবাড়ি নেই। আমার মনে হলো, আমার সামনে এই নারী অকারণে নিজের শাড়ির পাড় আর আঁচল টানাটানি শুরু করলেই বরং সেটা অশালীন আর অপমানজনক হতো। যামিনী রায়ের এলিগ্যান্ট নারীদের কথা অবধারিতভাবেই মনে এলো। স্বভাবতই এই নারীকে ছবির জন্য অনুরোধ করার সাহস পাইনি। অপ্রয়োজনীয়ও মনে হলো।

তিস্তাপাড়ের মানুষের মুখ: ক্যামেরা তাক করতেই প্রথমে ভয় পেলেও পরে হাসিমুখে তাকাল শিশু, ছবি: লেখক যে নদী মুহূর্তে সর্বস্বান্ত করে দেয় তার পাড়ে বাস করা মানুষেরা স্বাভাবিকভাবেই কষ্টসহিষ্ণু। তবু তিস্তাপাড়ের মানুষের সুখী মুখশ্রী, সরল বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ আর সৌজন্যের রহস্য কী তা বলা মুশকিল। নদীর ভাঙনে ক্রমাগত কৃষিজমি, বসতভিটা হারালেও সামান্য জমি পেলেই তাতে ফসল ফলানোর প্রবণতা চোখে পড়ার মতো। ক্ষুদ্র বা মাঝারি ব্যবসায় আগ্রহ আর উদ্যোগ চারদিকে ছড়ানো। আবার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় উৎসাহ তরুণতর প্রজন্মগুলোতে প্রচুর। যে-তরুণী প্রতিবেশীর সাথে নদীতীরে বসে মিষ্টি আলুর লতা কাটছে, কিংবা যে-কিশোরী মায়ের সাথে পথের পাশের উঠোনে ধুলোভরা গায়ে ধানের আঁটি মাড়াই করছে—সবারই যে স্কুলের সাথে যোগাযোগ আছে তা তাদের কথাতেই বোঝা যায়। কিছুটা ক্রোধও কি এদের মনে জমেছে? —শহরের সুবিধাভোগী মানুষের প্রতি? স্কুলের শিক্ষা আর ইন্টারনেট হয়ে বাইরের দুনিয়া আর তার অন্যায় সম্পদ বিভাজনের অস্পষ্ট বোধ এদের মুখের সরলতায় কি কিছু ভ্রূকুঞ্চন আনছে? সেটাই স্বাভাবিক।

কিছুটা এগোতে একটা চওড়া বাঁকের কোনায় একটা দোকান। টিন-বাঁশ-কাঠের কাঠামোর ভেতরটায় উঁচু মাচার মতো মেঝে। সেখানে দোকানি বসে। এই দোকানটা মালপত্রে ঠাসা। সামনের বেঞ্চিতে দুই বৃদ্ধ বসে। একজনের কাঁচাপাকা চুল, কপালের উপরটায় অনেকখানি ফাঁকা। সাদা দাড়ি। নদীপাড়ের মৃদু ঠান্ডায় গায়ে গোলাপি গলাবন্ধ হালকা সোয়েটার। অন্যজন আরও বয়সী। চুল দাড়ি সব সাদা। পরনেও সাদা গেঞ্জির ওপরে আধময়লা হাফহাতা সাদা টি-শার্ট। হাতদুটো কোলের কাছে গোটানো। জিজ্ঞেস করতেই সাগ্রহে জানালেন তাঁর বয়স ‘সই সই’ একশ হয়েছে। পাশে বসতেই অচেনা মানুষের সাথে নিঃসঙ্কোচে আলাপ জুড়লেন। এককালে ব্রিটিশ টোব্যাকো কম্প্যানিতে চাকরি করেছেন। এক ছেলে আর তার বউ-ছেলে—এদের নিয়ে তাঁর সংসার। নাতি আর্মিতে চাকরি করে। বুড়ো দাদার ভীষণ যত্ন নেয়। শরীরে এই বয়সেও তেমন কোনও রোগ নেই তাঁর। শুধু চোখ আর কানের শক্তি কিছুটা কমেছে—ঐ যে মহিলাটা সামনের পথ দিয়ে যাচ্ছে তার কাঠামোটা বুঝলেও চিনতে পারছেন না। তবু চশমা পরেন না—কী দরকার! তাঁর কোনও অসুবিধা তো হয় না। আমাকে টানছিলো বয়সের আড়ালে ঢাকা-না-পড়া বৃদ্ধের কিশোর মুখখানা, আর সাগ্রহ সরল দৃষ্টি। সুখী পুরো একটি শতাব্দী বেঁচে থাকা তার সার্থক হয়েছে।

তিস্তাপাড়ের মানুষের মুখ: শতবর্ষী বৃদ্ধের চোখেমুখে শিশুর সরলতা আর বন্ধুত্ব, ছবি: লেখক গান্নার পাড়ের কিছুটা আগের বাঁকটাতে পাড়ের ওপর পথের পাশে বাঁশঝাড়ের ছায়ায় দাঁড়ানো একটা অটোরিকশায় বসা এক কিশোর। পাকা রাস্তা সামনে আর কতদূর জিজ্ঞেস করতেই ময়লা ছিটের গেঞ্জি আর বার্মিজ লুঙ্গি পরা কিশোরের প্রশ্ন, “আপনি কি দার্শনিক?” প্রশ্নটা কিছুটা চমকে দিল। আমার মাথায় বারান্দাঅলা বাদামি জিন্সের টুপি, কাঁধে ঝোলানো ব্যাকপ্যাক আর গলায় ক্যামেরা। তাই “আপনি কি সাংবাদিক?” —এমন প্রশ্নে অবাক হবার কিছু ছিল না। কিন্তু দার্শনিক! ‘দার্শনিক’ কথাটা কি সে ‘সাংবাদিক’ বোঝাতে ভুলে বলল, নাকি দার্শনিক অর্থেই? গোঁফের রেখা ওঠার খুব বেশি দিন হয়নি তার, চোখেমুখে বাল্যের সরলতা এখনও লেপ্টে আছে। বড় বড় ঝকঝকে দাঁত, মোটা ঠোঁট আর কিছুটা লালচে চোখের দৃষ্টিতে কৌতূহল, বন্ধুতা। জিজ্ঞেস করলাম, গাড়িটা তোমার? “না, আরেকজনের”, তার উত্তর। তুমি কী করো? “পড়ি, ক্লাস এইটে।” ক্লাস তো বন্ধ। “হুঁ, অ্যাসাইনমেন্ট জমা নিসে।” বাহ্! তাহলে তোমার কোনও কাজ নাই এখন। উত্তরে মুখে সহাস্য স্বীকৃতি। আমি দার্শনিক নই, সাংবাদিকও নই—এই উত্তরে তার কৌতূহল দূর হলো বলে মনে হলো না। যাই হোক, সাগ্রহে সে পাকা রাস্তার দূরত্ব আর দিক জানিয়ে দিল। রওনা দিতেই আবার প্রশ্ন, “আপনি কি গঙ্গাচড়া যাবেন?” না, আমি বুড়িরহাট যাব। কিছুক্ষণ হাঁটার পর পিছনে অটোরিকশার শব্দ শুনে ঘুরে তাকাই। রিকশাটা পাশে আসতেই ভেতর থেকে কিশোরের স্বাভাবিক আহ্বান, “ওঠেন”। এখন সে ড্রাইভারের পাশের সিটে বসেছে, ড্রাইভার তার উপরের ক্লাসে পড়ে। স্কুল বন্ধ, তাই এখন গাড়িটা চালাচ্ছে।
তিস্তাপাড়ের মানুষের মুখ: “আপনি কি দার্শনিক?”—টুপি মাথায়, ক্যামেরা কাঁধে লেখককে দেখে তিস্তাপাড়ের স্কুলপড়ুয়া কিশোরের প্রশ্ন। ছবি: লেখক অপরিচিত অথবা সদ্য-পরিচিত কাউকে এভাবে গাড়িতে উঠতে বললে সে যে সন্দেহ করতে পারে, এমন বোধই কিশোরের নেই মনে হলো, তার অপাপবিদ্ধতা এতই অটুট। তার আহ্বানের মধ্যে যে সরলতা ছিল তা সূক্ষ্ম হলেও নির্ভুল। আমার সাথে দামি ক্যামেরা, মোবাইল, ঘড়ি, টাকা-পয়সা। অচেনা পরিবেশে, শীতের আসন্ন সন্ধ্যার ছায়াচ্ছন্নতার মধ্যে সম্পূর্ণ অচেনা দুজন তরুণের ডাকে তাদের গাড়িতে উঠলে যে বিপদ হতে পারে তা মনেই হয়নি আমার। নির্দ্বিধায় উঠে পড়লাম।

অস্বীকার করার উপায় নেই, গাড়িতে ওঠার এক-দুই মিনিট পর একটু অস্বস্তিই লাগছিল। ভাবছিলাম পাকা রাস্তাটা আর কতটা দূর হতে পারে। হঠাৎ গাড়িটা ব্রেক কষে দাঁড়াতেই ছেলেটা বলে উঠল, “এইখানে বুড়িরহাটের গাড়ি পাবেন।” তাকিয়ে দেখি পাকা রাস্তায় এসে গেছি। ভাড়া দেব বলে পকেটের দিকে হাত বাড়াতেই কিশোরের সলজ্জ সবেগ “না না না” তার অটোরিকশার শোঁ শোঁ শব্দের সাথে মিশে একটা ব্যঙ্গাত্মক ধ্বনি তৈরি করে চারদিকের ঘনায়মান অন্ধকারকে নাড়িয়ে দিয়ে গঙ্গাচড়ার দিকে ছুটে চলল। আমি বুড়িরহাটের একটা অটোরিকশা ভাড়া করে তাতে উঠে বসলাম। নিজের মনের সংকীর্ণতায় অনুশোচনা হচ্ছিল।

টাকা দেওয়ার জন্য পকেটের দিকে হাত বাড়ানোটা আমার ঠিক হয়নি। চলবে

আরও পড়ুন : তিস্তা জার্নাল | পর্ব এক

//জেডএস//

সম্পর্কিত

তিস্তা জার্নাল । শেষ পর্ব

তিস্তা জার্নাল । শেষ পর্ব

তিস্তা জার্নাল । পর্ব ৯

তিস্তা জার্নাল । পর্ব ৯

তিস্তা জার্নাল । পর্ব ৮

তিস্তা জার্নাল । পর্ব ৮

তিস্তা জার্নাল । পর্ব ৭

তিস্তা জার্নাল । পর্ব ৭

তিস্তা জার্নাল । পর্ব ৬

তিস্তা জার্নাল । পর্ব ৬

তিস্তা জার্নাল । পর্ব ৫

তিস্তা জার্নাল । পর্ব ৫

তিস্তা জার্নাল | পর্ব চার

তিস্তা জার্নাল | পর্ব চার

তিস্তা জার্নাল | পর্ব তিন

তিস্তা জার্নাল | পর্ব তিন

সর্বশেষ

মাল্লাম ইলিয়ার (এ কেমন) বিচার

মাল্লাম ইলিয়ার (এ কেমন) বিচার

ঝুম শব্দে কাঁপে নদী

ঝুম শব্দে কাঁপে নদী

তরুণ লিখিয়ের খোঁজে জলধি

তরুণ লিখিয়ের খোঁজে জলধি

রাষ্ট্রভাষা-আন্দোলনে বঙ্গবন্ধু : বিদ্বেষ-বন্দনা বনাম ঐতিহাসিক সত্য

রাষ্ট্রভাষা-আন্দোলনে বঙ্গবন্ধু : বিদ্বেষ-বন্দনা বনাম ঐতিহাসিক সত্য

চাকরি ও সংসার হারানো বায়ান্নর মমতাজ বেগম

চাকরি ও সংসার হারানো বায়ান্নর মমতাজ বেগম

কারামা ফাদেলের ‘অপেক্ষার যন্ত্রণা’

ফিলিস্তিনি গল্পকারামা ফাদেলের ‘অপেক্ষার যন্ত্রণা’

আনিসুজ্জামানের ‘স্বরূপের সন্ধানে’ : পাঠ-অনুভব

আনিসুজ্জামানের ‘স্বরূপের সন্ধানে’ : পাঠ-অনুভব

বৃষ্টির মতো এখানে হীরার টুকরা ঝরছে

প্রসঙ্গ মাল্যবানবৃষ্টির মতো এখানে হীরার টুকরা ঝরছে

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ


[email protected]
© 2021 Bangla Tribune
Bangla Tribune is one of the most revered online newspapers in Bangladesh, due to its reputation of neutral coverage and incisive analysis.