সেকশনস

তিস্তা জার্নাল । পর্ব ৫

আপডেট : ০৫ জানুয়ারি ২০২১, ০৩:৪২

পূর্বপ্রকাশের পর

ভ্যানগাড়িটা দাঁড়িয়ে আছে বাঁধের ঠিক মাঝামাঝি, কিন্তু চালককে কোথাও দেখতে পেলাম না। দোকানের সিমেন্টের বেঞ্চিটা ফাঁকা, তবে বাম দিকে অন্য দোকানটার ঝাপ খোলা—ভেতরে আধা-অন্ধকারে বোধহয় দোকানি বসে আছে। ডানদিকে কিছুটা দূরে বাঁধের ওপর নানান বয়সের কয়েকটা ছেলে দাঁড়ানো, আর কুয়াশা পড়া শুরু হবার আগেই কৃষাণী শুকাতে দেওয়া খড়গুলো একপাশে জড়ো করে রেখে কখন বাড়ি চলে গেছে। “এ গাড়ি কার?” হাঁক শুনে দোকানের ভেতর থেকে একটা মুখ উঁকি দেয়, কিন্তু কোনও উত্তর মেলে না। কিছুটা ব্যস্ত হয়ে এদিক-ওদিক তাকাতে দেখি ডানদিকের দোকানটার পিছন থেকে একজন লুঙ্গিপরা কালোমতো বছর চল্লিশের লোক বেরিয়ে আসছে। লোকটার হাতে কিছু-একটা ধরা; কাছে আসতে দেখি একটা পলিথিনের ব্যাগে পান, সুপারি, আরও কিছু সওদাপাতি। “আপনার গাড়ি?” —জিজ্ঞেস করতে হ্যাঁ-সূচক মাথা নেড়ে লোকটা বলে, “আপনি ওঠেন, এই বাজারগুলা...।” গঙ্গাচড়া বাজার থেকে কোনও একজন চেনা যাত্রী জিনিসগুলো কিনে তার হাতে দিয়ে বাড়ির কারও কাছে পৌঁছে দিতে বলেছে—তেমন কাউকেই খুঁজছে সে। ডানের দোকানটায় ওগুলো দিয়ে যেতে পারত, কিন্তু সেটা এখন বন্ধ। উপযুক্ত লোকের জন্য আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে তার আপত্তি ছিল না, কিন্তু এখন যাত্রী পেয়ে কিছুটা ব্যস্ত হয় সে। গলা উঁচিয়ে বাঁধের ওপর দাঁড়ানো ছেলেগুলোর মধ্যে একজনকে ডাকে, ছেলেটা অনিচ্ছায় এগিয়ে আসতে তার হাতে একরকম জোর করে বাজারভর্তি ব্যাগটা ধরিয়ে দিয়ে গাড়ির হ্যান্ডেল ধরে। ততক্ষণে গাড়িতে আরও এক যাত্রী উঠে বসেছে। “বাজার ঠিক লোকের হাতে দিসেন তো?” —চালককে এ প্রশ্ন করতেই বেশ আলাপি চটপটে তরুণ নিজে থেকে প্রশ্নটা কেড়ে নিয়ে উত্তর দেয়, “কোনও অসুবিধা নাই, এখানে সবাই সবাক চেনে।” তার মান-আঞ্চলিক মিশ্র বুলিতে মনে হয়, কিছু লেখাপড়া আছে তার, অথবা শহরের অচেনা মানুষের সাথে ‘ভদ্র ভাষা’য় কথা বলার প্রয়োজন বোধ করছে। 

অঘ্রানের তিস্তার শান্ত রূপ। গোডাউনের হাটের কাছে মাঝনদী থেকে দেখা বিভিন্ন দূরত্বে ওপাড়ের ‘ময়াল’। ছবি: লেখক বাঁধ থেকে নেমে পাকা রাস্তায় উঠে ভ্যান চলতে থাকে। কৌতূহলটা এখানে আসার সময়েই জেগেছিল, এখন প্রশ্নটা ছুড়ে দিলাম, চালকের উদ্দেশেই—“এ রাস্তায় কি শুধু ভ্যানই চলে? রিকশা নাই?” তরুণই আবার আগ বাড়িয়ে ব্যাপারটা বুঝিয়ে দেয়—এখানে গঙ্গাচড়া পর্যন্ত গেলে দশ টাকার বেশি ভাড়া কেউ দেবে না। পথে নেমে গেলে তো আরও কম। রিকশায় দুজনের বেশি মানুষ উঠতে পারে না; অনাত্মীয় মহিলা-পুরুষ হলে তাও সম্ভব নয়। রিকশাঅলার তাই পোষায় না। ভ্যানে মেয়ে-পুরুষ নির্বিশেষে জনাদশেক যাত্রী উঠতে পারে গ্রহণযোগ্য দূরত্ব বজায় রেখেই। তাই এখানে ভ্যানেরই চল। একেবারে অভিজ্ঞজনের বাস্তব ব্যাখ্যা। আর, কিছুক্ষণের মধ্যেই সেই বাস্তবতার চাক্ষুষ প্রমাণও পেয়ে গেলাম। 

মোট আড়াই কিলোমিটার পথের প্রায় সবটা জুড়েই থেমে থেমে যাত্রী ওঠায় ভ্যান। যাত্রীরা যে যার বাড়ির সামনে বা সুবিধাজনক জায়গায় দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করে। বাঁধ থেকে একটু এগিয়ে রাস্তার পাশে দুটো বাচ্চা আর ব্যাগপত্র নিয়ে এক মহিলা অপেক্ষা করছিলেন। আমাকে খানিকটা ধমকের সুরেই সরিয়ে দিয়ে জায়গা করে নিয়ে মহা শোরগোল করে ভ্যানে উঠে বসলেন। তারপর তরুণের হাতে ছেলেটাকে দিয়ে বললেন, “যাও, মামার কোলত যাও।” চল্লিশোর্ধ্ব মহিলার হাতে লাল কাচের চুড়ির সাথে শাঁখা, কপালে সিঁদুর আর মুখে পান। তাঁদের কথোপকথনেই তরুণের নাম জানলাম—হামিদ। বুঝলাম, আত্মীয়তার সম্পর্কটা রক্তের নয়—পাশাপাশি বসবাসের সূত্রে, যদিও কথোপকথনের ভঙ্গিতে, সুরে এমনই স্বাভাবিক নৈকট্য যে তরুণের নাম না জানলে তাকে মহিলার তুতো ভাই-ই মনে করতাম। মহিলার কথায় অবশ্য একটা প্রচ্ছন্ন কর্তৃত্বের ভাব লক্ষ করছিলাম, আর “দিদি মনে হয় অনেক দূরে চললেন?” প্রশ্নটা করেই সেটার কারণ পরিষ্কার বুঝতে পারলাম। “লালমণিরহাট যাবোহ্”— কথার শেষে একটা ঝোঁকের মতো ভঙ্গি কিছুটা রূঢ়তা আনছে, এবং সেটা ইচ্ছাকৃত অভ্যেস বলেই মনে হলো যখন তাঁর পরের কথাটা একেবারে অপ্রত্যাশিতভাবে জানালো যে তিনি হেলথে ‘জব’ করেন, আর তাঁর “জামাই এসআই”। এরপর সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগে ‘জব’ করা পুলিশের এসআইয়ের স্ত্রী যেন প্রসঙ্গক্রমে আরও জানালেন যে, গাড়িটা আজ বের করেননি কারণ ওটার মবিল পাল্টাতে হবে, নইলে নিজের গাড়ি রেখে বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে তিনি কি আর এই ভ্যানে-ট্যানে উঠতেন! মিনিট দশেকের মধ্যে গঙ্গাচড়া বাজারে পৌঁছে “তাহলে আসি দিদি” বলে বিদায় জানাতে কিছুটা কৌতূহল আর কিছুটা যেন অবজ্ঞায় আমার আপাদমস্তক দেখে নিয়ে শেষে সংক্ষেপে বললেন, “আসহেন্”। 

***

গঙ্গাচড়া বাজার থেকেই আমার পরের যাত্রা শুরু। সেদিন ধামুরের চরের উপর দিয়ে তিস্তার বর্তমান ধারা পর্যন্ত যাওয়া হয়ে ওঠেনি বেলা ফুরিয়ে যাওয়ায়। ফেরার পথে চরের কৃষাণরাই পরামর্শ দিয়েছিল, নদী দেখতে চাইলে এত কষ্ট করার দরকার কী? গঙ্গাচড়া-বরাইবাড়ি পাকা সড়ক ধরে মন্থনার হাটের আগে সোজা মরিয়ম ‘সিল্লানি’র (‘সিল্লানি’ অর্থ পাগলি) মাজার। ওখান থেকে ভ্যানে গোডাউনের হাট পর্যন্ত গেলেই নদী। বুদ্ধিটা মন্দ নয়। কিন্তু সেটা তো তিস্তার অন্য ‘পয়েন্ট’, অন্য বাঁক—সেখানে নদী আর নদীতীরের জীবনের রূপ আলাদা, হোক তা নদীর মাত্র ৬-৭ কিলোমিটার উজানে। তাছাড়া, বোল্লার পাড়ের বৃদ্ধের মুখে আব্দুল আলী পণ্ডিতের নাম উল্লেখে এবং চরের বুক চিরে দিগন্তের দিকে চলে যাওয়া ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের বড় রাস্তা দেখে আমার তিস্তাদর্শনের প্রেরণায় নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। আমার বাবার মুখে বহুবার শুনেছি, এই ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের রাস্তাই ছিল পুরান বাড়ি এবং রংপুর শহর আর বাইরের পৃথিবীর মধ্যে তাঁদের প্রধান যোগসূত্র। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ভাঙতে-থাকা তিস্তার অনিশ্চিত তীরে একটি পরিবারের আবাসভূমি বাঁচিয়ে রাখবার প্রবল আকাঙ্ক্ষা, একই সঙ্গে তাতে বৃহত্তর পৃথিবীর নিরন্তর রক্ত সঞ্চালন অবাধ রাখবার স্বপ্ন—এই দুই অসম্ভবের সম্ভাবনা অনেককাল জিইয়ে রেখেছিল এই রাস্তা। দশ-বারো কিলোমিটার ভাটিতে মহীপুরের পিতৃভূমি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আব্দুল আলী পণ্ডিতের বাবা পীর সাহেব গউস উদ্দিন মাওলানা যখন তিস্তার তীরে কোলকোন্দ আর আবুলিয়ার সীমানায় পৌনে দু’শ বছর আগে আবাস গড়েন, তখন থেকে এই স্বপ্নের শুরু। তারপর ধীরে ধীরে গড়ে ওঠা একটা বিরাট পরিবার নদীর নির্মম নির্বিকার তরবারির আঘাতে টুকরো টুকরো হয়ে পৃথিবীময় ছড়িয়ে পড়েছে। নদীর ভয়াল গ্রাস থেকে রাস্তাটাও রেহাই পায়নি। ভাঙনের সাথে সাথে একটু একটু করে পিছু হটতে হটতে আজকের বোল্লার পাড়ের বাঁধে এসে ঠেকেছে। সেদিন বাঁধের ওপর দোকানের বেঞ্চিতে বসে বৃদ্ধ তাই বলছিলেন, “বাঁধটা তখন থাকলে তোমার-আমার কারও বাড়ি ভাঙতো না বাবা।” ‘তোমার বাড়ি’ কথাটা মনে খুব ধাক্কা দিয়েছিল। যে বাড়ি চোখেই দেখিনি কোনওদিন, যে বাড়ি নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে আমার জন্মেরও অর্ধশতাব্দী আগে, সে বাড়ি আমার বাড়ি হয় কী করে! কিন্তু টের পাই, সেটা যে আমারও বাড়ি—এই অনুভব মনের কোন গভীর পর্যন্ত শিকড়ের মতো গেঁথে আছে; কোনও সময়ের হিসাব কিংবা যুক্তি দিয়ে সে অনুভব দূর করতে পারি না। কল্পনায় দেখতে পাই, কাকিনা থেকে গঙ্গাচড়া পর্যন্ত প্রসারিত দীর্ঘ প্রশস্ত ধূলিময় পথটায় অসংখ্য পায়ের ছাপের সাথে আমার পিতৃপুরুষের পায়ের ছাপও মিলেমিশে আছে। আজ এই দুদিকের বসতবাড়ি, দোকানপাট, চাষজমির চাপে কুঁকড়ে সরু হয়ে যাওয়া পথটার পিচের আস্তরণের নিচে চাপা পড়া প্রাচীন ধুলার উপর, কিংবা চরের ধু-ধু প্রান্তরের দিশাহীনতার মধ্যে সেই পায়ের ছাপগুলোকে আলাদা করে চিনে নিতে পারি না, কিন্তু তাদের বাস্তব জীবন্ত অস্তিত্ব নির্ভুল নিশ্চয়তায় অনুভব করি। 

ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের বড় রাস্তাটা দিয়েই তাই আমি নদী দেখতে যেতে চাই, সেটা চরের কয়েক কিলোমিটার ধুলা, বালি বা রুক্ষ প্রান্তর ঠেলে হলেও। এই বাঁধের নিচ থেকে মৌজার প্রান্তের লাল নিশান ছাড়িয়ে দিগন্তে ঐ যে বালির ওপর টিনের ন্যাংটা ঘরটা দেখা যায়, তার কিছুটা উত্তর-পশ্চিমে নদীর মাঝখানে তোমাদের বাড়ি—বৃদ্ধ বলেছিলেন। চরের মাঝখানে দু’ভাগ হওয়া বড় রাস্তাটার উত্তর-পশ্চিমের শাখাটা ধরেই সেখানে যাওয়া যাবে এই শীতের শুকনো মৌসুমে। তেমনই পরিকল্পনা ছিল পরের যাত্রায়। কিন্তু মুশকিল হলো, পীরের বাড়িটা নদীর মাঝখানে ঠিক কোন জায়গাটায় পড়েছে সেটা কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারলেন না। তাই পরিকল্পনা পাল্টাতে হলো। সহজ রাস্তায় গিয়ে আগে নিশ্চিতভাবে দেখে আসি জায়গাটা, খুঁজে আসি কখনও-না-দেখা চিহ্নহীন ‘বাড়ি’র দিশা, তারপর চরের উপর দিয়ে বড় রাস্তা ধরে সেখানে যাব—সে যাত্রায় পথটাই হবে গন্তব্য, কেননা প্রকৃত গন্তব্য এখন নদী কিংবা সময়ের অস্থির গতির রহস্যে প্রোথিত। 

“ছবি তুললে টাকা লাগবে”—গঙ্গাচড়া বাজারে দেখা হলো বুদ্ধিমান নাহিদের। ছবি : লেখক বুড়িরহাট থেকে অটোরিকশায় বুড়িরহাট-গঙ্গাচড়া সড়ক ধরে তামাক গবেষণা কেন্দ্র, হর্টিকালচার সেন্টার, মৌলভিবাজার, নবনীদাস পেরিয়ে গঙ্গাচড়া বাজারে পৌঁছাই। বহু বছর ধরে রংপুর শহর থেকে তিস্তাতীরের সেই দূর প্রান্ত—এপাড়ে মন্থনা, গোডাউনের হাট, বরাইবাড়ি, আর ওপাড়ে মটুকপুর, চিলাখাল, আলমবিদিতর, বিনবিনার চর, আবুলিয়া—পর্যন্ত যাতায়াতের এটাই প্রধান সড়ক। অবশ্য হর্টিকালচার সেন্টার থেকে আরেকটা রাস্তা চ্যাংমারি, নীলকণ্ঠ হয়ে গঙ্গাচড়া বাজারে গিয়ে মিশেছে। দুই পাশে ঘনিষ্ঠ বাড়িঘর, বাঁশঝাড়, বুনো ঝোপ, পুকুর নিয়ে এই পথটা আমার বালকবয়সের স্মৃতিতে ঠাসা। ছয়-সাত বছর বয়সে পীরেরহাট থেকে বুড়িরহাটে নানার বাড়ি কতবার হেঁটে চলে এসেছি এই পথ ধরে! যদিও এখন পিচবাঁধানো, দুপাশের বাড়িঘরের চেহারা আর ভূদৃশ্য পাল্টে গেছে, তবু পথের প্রতিটা বাঁক আজও চিনতে পারি। অনেক বাঁশঝাড় আর বুনোঝোপ বিয়াল্লিশ বছর পরও অক্ষত রয়ে গেছে। শৈশবের সেইসব একাকি যাত্রার অনেক বছর পরে প্রথম যৌবনে বিশ্ববিদ্যালয়ের দিনগুলোতে বিভূতিভূষণ মনে করিয়ে দিয়েছিলেন, শৈশবে আমিও অপু ছিলাম।   

গঙ্গাচড়া বাজারে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা থেকে নেমেই দেখা হলো রাস্তার পাশে একটা পুরনো ভাঙাচোরা হুইলচেয়ারে আসীন নাহিদের। লিকলিকে, অকেজো দুই পা ভাঁজ করে চেয়ারের পুরনো ছেঁড়া গদির ওপর বিছানো একটা চটের বস্তার ওপর বসেছে। সামনে দু-একটা কয়েন। ঢলঢলে সোয়েটারের ভেতরে ঠুঁটো হাত আর কুজো, ক্ষীণ শরীরের অস্তিত্ব বোঝা যায়। মাথায় একটা বড়সড় গোল টুপি। শরীরের আকার-আকৃতি আর বালক-সুলভ মুখাবয়ব দেখে বয়স আন্দাজ করা মুশকিল। তবে জিজ্ঞেস করায় চিকন কিন্তু খ্যানখেনে নাকি কণ্ঠস্বরে যখন সে জানালো যে সে সাতাশ বছরের যুবক, তখন কিছুটা অবাক হলেও বিশ্বাস করতে হলো। তারপর ছবি তোলার জন্য আমাকে ক্যামেরার লেন্সের খাপ খুলতে দেখে একটু উঁচু গলায় দাবি জানিয়ে বসল, “ছবি তুলবেন? তাইলে কিন্তু টাকা নাগবে।” চমকে মুখের দিকে তাকাতেই স্মিত হাসিটা ধরে রেখে মুখের ওপর পড়া রোদের কারণে কুচকানো চোখে আমার দিকে তাকিয়ে রইল। কৌতূহলী দু’চারজন লোক পাশে দাঁড়িয়ে পড়েছিল। একজন বলল, “আরে, তোক টিভিত দ্যাখাইবে।” কিন্তু টেলিভিশনের পর্দায় নিজের মুখ দেখতে পাবার অমন আকর্ষণীয় সম্ভাবনায়ও তাৎক্ষণিক প্রাপ্তির দাবি ভোলার পাত্র সে নয়। মুখের হাসি আর চাহনি তেমনই স্থির। দারুণ বাস্তববাদী আর বুদ্ধিমান! কত টাকা দিতে হবে জানতে চাইলে সোজা উত্তর—একশ’ টাকা। বলো কি! পুরো একশ’ টাকা! হ্যাঁ, এর কমে হবে না। যদি টাকা না দিয়ে এমনি ছবি তুলে নিই? উত্তরে নাহিদ একইরকম স্মিতমুখে তাকিয়ে রইল। কোনও ভাবান্তর নেই—যেন সে জানে তেমন কিছু হবে না। শেষে টাকাটা দিয়েই তার ছবি তুলতে হলো। 

অটোরিকশা ধরে এবার যাত্রা চাঁদ সদাগরের অচিনগাছের পাশ দিয়ে বিলাইফালা, পীরেরহাট পেরিয়ে মরিয়ম সিল্লানির মাজার পর্যন্ত। সেখান থেকে গোডাউনের হাট হয়ে তিস্তা; প্রায় হাতের কাছেই। কিন্তু মাজারের কাছে রাস্তাটা যেখানে মন্থনার হাটের দিকে বাঁক নিয়েছে, সেখানে পৌঁছে মনে হলো, সামনেই নব-র ‘কুরা’ (‘কুরা’ হলো বিলের মাঝখানে গভীর পুকুর) —ওটা দেখে তারপর নদীতে যাব।

মন্থনার হাট থেকে গোডাউনের হাটের পথে—সামনে শৈশবের স্মৃতিজড়ানো নব-র কুরার ব্রিজ। ছবি : লেখক শৈশবের রহস্য আর ভয় মেশানো নব-র কুরা আজ আর নেই। উপরের ব্রিজটাকে চল্লিশ বছরের ব্যবধানে নিতান্তই নিচু আর ছোট একটা কালভার্ট বলে মনে হলো। ব্রিজের ওপর পরিষ্কার রাস্তার একপাশে পা দিয়ে শুকাতে দেওয়া ধান মেলে দিচ্ছেন এক কৃষাণী। ডানে-বামে উত্তর-দক্ষিণ বরাবর বড়বিল নামের জলাটা চলে গেছে দুদিকের দিগন্ত অবধি। এখন মাঝদুপুরে অঘ্রানের নাতিতপ্ত রোদ ঝলমল করছে। বাতাস স্বচ্ছ। ব্রিজটার ওপর থেকে বামে দূরে বিলের ওপর দিয়ে তাকালে পীরেরহাটের পীরের বাড়ির পুকুর আর আর কিছুটা দূরে ঢাঙা-র কুরার ব্রিজটা দেখা যায়। পাঁচ-ছয় বছর বয়সে পীরের ঐ পুকুর কিংবা ব্রিজের ওপর থেকে তাকালে কখনও না-দেখা নব-র কুরার ব্রিজটাকে বিরাট আর সুউচ্চ মনে হতো। গ্রামের প্রতিবেশি বয়সে-বড় ছেলেদের যারা মন্থনা বা বরাইবাড়ি যাতায়াতের সুবিধা আর স্বাধীনতা ভোগ করত হাটবারে ছাগল-মুরগি বিক্রি করা কিংবা মাছ ধরতে যাবার অধিকারে, তাদের কাছে শুনতাম নব-র কুরার গভীর কালো পানি, আর মরিচা মেশানো গাঢ় সবুজ রঙের প্রাচীন ঘন জমাট কচুরিপানার আস্তরণের নিচে হঠাৎ ঘাই মারা বুড়ো গজার মাছের কথা। আবাল্য রহস্য আর ভয়ের রাজ্য ছিল সেটা। চলবে…

/জেড-এস/

সম্পর্কিত

তিস্তা জার্নাল । শেষ পর্ব

তিস্তা জার্নাল । শেষ পর্ব

তিস্তা জার্নাল । পর্ব ৯

তিস্তা জার্নাল । পর্ব ৯

তিস্তা জার্নাল । পর্ব ৮

তিস্তা জার্নাল । পর্ব ৮

তিস্তা জার্নাল । পর্ব ৭

তিস্তা জার্নাল । পর্ব ৭

তিস্তা জার্নাল । পর্ব ৬

তিস্তা জার্নাল । পর্ব ৬

তিস্তা জার্নাল | পর্ব চার

তিস্তা জার্নাল | পর্ব চার

তিস্তা জার্নাল | পর্ব তিন

তিস্তা জার্নাল | পর্ব তিন

তিস্তা জার্নাল | পর্ব দুই

তিস্তা জার্নাল | পর্ব দুই

সর্বশেষ

শামীম রেজার ‘পাথরচিত্রে নদীকথা’

শামীম রেজার ‘পাথরচিত্রে নদীকথা’

নন্দনের নতুন সংহিতা

শামীম রেজার কবিতানন্দনের নতুন সংহিতা

অনন্যা সাহিত্য পুরস্কার পাচ্ছেন ঝর্না রহমান

অনন্যা সাহিত্য পুরস্কার পাচ্ছেন ঝর্না রহমান

বাংলাদেশের সাহিত্য : স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর | শেষ পর্ব

বাংলাদেশের সাহিত্য : স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর | শেষ পর্ব

বাংলাদেশের সাহিত্য : স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর | প্রথম পর্ব

বাংলাদেশের সাহিত্য : স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর | প্রথম পর্ব

ক্রায়িং রুম

ক্রায়িং রুম

মাল্লাম ইলিয়ার (এ কেমন) বিচার

মাল্লাম ইলিয়ার (এ কেমন) বিচার

ঝুম শব্দে কাঁপে নদী

ঝুম শব্দে কাঁপে নদী

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ


[email protected]
© 2021 Bangla Tribune
Bangla Tribune is one of the most revered online newspapers in Bangladesh, due to its reputation of neutral coverage and incisive analysis.