X
সোমবার, ১৯ এপ্রিল ২০২১, ৬ বৈশাখ ১৪২৮

সেকশনস

দুটো চড়ুই পাখির গল্প

আপডেট : ১৮ জানুয়ারি ২০২১, ১৪:৩৭

একদিন স্বর্গের বারান্দায় দেখা হয়ে গেল দুজনের; টাঙ্গাইলের বাসাইলের নুরনাহারের সাথে ঢাকার সোবহানবাগের আনুশকার। বয়সটা তাদের কাছাকাছি হলেও পৃথিবীতে তাদের বসবাস ছিল দুই ভিন্ন দুনিয়ায়। তাই বলে তাদের বন্ধুত্ব হতে দেরি হলো না। আনুশকা নুরনাহারকে দেখে অবাক হয়ে বলল—৩৬ দিন! ৩৬ দিন তুমি কীভাবে সহ্য করলে, নুরনাহার? কীভাবে টিকেছিলে ওখানে? কী ভয়ংকর ব্যাপার! ভালোবাসাহীন এই অত্যাচার। কেন পালিয়ে যাওনি বলো তো?

টাঙ্গাইলের নুরনাহার তার কথা শুনে হাসে—আরে আমার ব্যাপার অন্য। ১৪ বছর বয়সে আমার বিয়ে হয়েছে যার সাথে তাকে দেখে ভালোবাসাবাসির কথা মনেও আসেনি। যা এসেছে তা হলো ভয়। আর সেই ভয় প্রতিরাতের আগমনে, প্রতিটি দরজা বন্ধের শব্দে , প্রতিটি স্পর্শে দ্বিগুণ চতুর্গুণ হয়েছে। কাঁদতেও ভয় করেছে আমার। আমি ভেবেছি এটাই নিয়ম। এমনটাই হয়ে থাকে।

আশ্চর্য যে স্বর্গের আকাশেও পেঁজাতুলোর মতো মেঘ ওড়ে। সেই মেঘের রং গোলাপি। রক্ত যখন তার ঘনত্ব হারিয়ে ফ্যাকাশে রং ধারণ করে তেমন। কোনটা যে নিয়ম, কেমনটাই-বা হয়ে থাকে—আনুশকাই বুঝি তা জানত? নুরনাহারের বাবা-মা তার পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেনি, মহামারি এসে তছনছ করে দিয়েছিল তাদের সবকিছু। চোদ্দ বছরের মেয়েটার জন্য প্রবাসী পাত্র পেয়ে তারা তাই খুশিতে বর্তে গিয়েছিল। অভাবে অনটনে আমরা মরলে মরব, মেয়েটা তো খেয়ে পরে বাঁচবে! আনুশকা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। মেয়েটা আর বাঁচল কই? কিন্তু তার তো ভীষণভাবে বাঁচার কথা ছিল। নামকরা ইংরেজি স্কুলে পড়েছে, ভালো ভালো ঘরের ছেলেমেয়েদের সাথে মিশেছে। এটিকেট একসেন্ট এন্তার শিখেছে। তার আশপাশের কেউ তো এ বয়সে নুরনাহারের মতো বিয়ে হয়ে যাবার কথা স্বপ্নেও ভাবেনি। তবে ভালোবাসাবাসির কথা ভেবেছে বই কি। যেমন করে পাখিরা পাখিদের ভালোবাসে। যেমন করে প্রজাপতিরা ঘুমের মধ্যে ফুলের স্বপ্ন দেখে। যেমন করে রূপকথার রাজকন্যারা উঁচু কোনো দুর্গের খোলা জানালা দিয়ে কারও ঘোড়ার খুরের শব্দের জন্য উন্মুখ চেয়ে থাকে। আনুশকাও তেমন এক রূপকথার মেয়েটি ছিল বটে। বাস করতো এক রূপকথার জগতে। যেখানে কোনো একদিন রাজপুত্রের সাথে তার দেখা হলেও হতে পারত। কিন্তু নুরনাহারের জীবনে কোনো রূপকথা ছিল না।

তবু তাদের জীবনে এসেছিল কেবল রাক্ষস। রাজপুত্তুরের বদলে বিরাট দৈত্য। যার মুলোর মতো দাঁত, আর কুলোর মতো কান। নুরনাহার নিজেও অবাক হয়ে এবার আনুশকাকে প্রশ্ন করে—তা তুমি ছেলেটাকে ভালোবাসতে কি বাসতে না তা নিয়ে দেখছি সবাই ভারি চিন্তিত হয়ে পড়ল। আচ্ছা বলো তো, ভালোবাসা কি নিকাহর সার্টিফিকেট থাকলেই বুঝি অত্যাচার জায়েজ হয়ে যায়? খুন? হত্যা? সব? যা ইচ্ছে করা যায়? চাইলে ঝিনুকের ভেতর লুকিয়ে থাকা প্রাণভোমরাটাকে হাতের তেলোয় পিষে মেরে ফেলা যায়? প্রজাপতির ডানা ছিঁড়ে ফেলা যায়?

স্বর্গের আকাশে তখন ছোট ছোট তারারা জ্বলজ্বল করে নুরনাহারের নাকফুলের মতো। অনেক বছর আগে তার মায়ের সদ্যোজাত শিশু মরে গেলে মা তাকে বলেছিল শিশুটি নাকি দূর আকাশের তারা হয়ে গেছে। নুরনাহারের ইচ্ছে করে তারা হয়ে যাওয়া তার ছোট্ট ভাইটিকে খুঁজে বের করে। তারপর মাকেও নিয়ে এসে এখানে একটা পাখির ঘর বানাবে সে। ওই রাক্ষসের দেশ থেকে নিয়ে আসবে প্রিয়জনদের।

তার কথা শুনে আনুশকাও হাসল এবার। বলল—ওসব কথা থাক। যখন ধীরে ধীরে সমস্ত শরীরটা রক্তহীন ফ্যাকাসে সাদা হয়ে যাচ্ছিলো, তখন আমার কি মনে হচ্ছিল জানো? আমি যেন একটা হালকা ছোট্ট চড়ুই পাখি হয়ে যাচ্ছি। আমার কোনো ওজন নেই। কেউ আর আমায় আটকে রাখতে পারবে না। একটা লাফ দিলেই উড়াল দিয়ে চলে যাব অনেক দূরে। আচ্ছা, তোমার কেমন লাগছিল বলো তো?

নুরনাহার দূর আকাশের দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে বলে—আমার মনে হচ্ছিল এবার আমি বেঁচে গেছি। এই কালো ভয়ংকর অন্ধকার রাত আর কখনও আসবে না আমার জীবনে। ওই দরজার পাল্লা বন্ধ করার রক্তহিম করা আওয়াজ আর আমাকে কাঁপিয়ে তুলবে না। আমি ভাবছিলাম একটা বিচ্ছিরি রাত কেটে গিয়ে আমার চারপাশটাতে সেদিন ভোর হয়ে গেছে! পৃথিবীতে এত সুন্দর ভোর আর কখনো দেখিনি আমি। তুমি কি দেখেছ?

স্বর্গের আকাশে তখন তারারা ডুবে যায়, নতুন ভোর হয়, আকাশে ভেসে বেড়ায় গোলাপি মেঘ। তারপর স্বর্গের বারান্দা থেকে হাত ধরাধরি করে দুটি ছোট্ট সাদা চড়ুই পাখি ভোরের নরম আলোয় পাখনা মেলে উড়ে চলে যায় সেই খোলা আকাশে। তাদের ফ্যাকাশে মোলায়েম ডানায় আদর করে দেয় স্বর্গের ঝিরঝির বাতাস। তাদের রক্তহীন ঠোঁটে চুমু খায় গোলাপি মেঘ। নাকফুলের মতো তারারা তাদের দেখে মিষ্টি হাসি হেসে বিদায় নেয়।

/জেডএস/

সম্পর্কিত

অন্যমনস্কতার ভেতর বয়ে যাওয়া নিঃশব্দ মর্মর

অন্যমনস্কতার ভেতর বয়ে যাওয়া নিঃশব্দ মর্মর

মজিদ মাহমুদের সাক্ষাৎকার

মজিদ মাহমুদের সাক্ষাৎকার

শামসুজ্জামান খান : বাঙালি সংস্কৃতির অতন্দ্র প্রহরী

শামসুজ্জামান খান : বাঙালি সংস্কৃতির অতন্দ্র প্রহরী

স্মৃতিতে বোশেখী মেলা

স্মৃতিতে বোশেখী মেলা

আমাদের মঙ্গল শোভাযাত্রা

আমাদের মঙ্গল শোভাযাত্রা

বসন্তের লঘু হাওয়া

বসন্তের লঘু হাওয়া

বইমেলায় নভেরা হোসেনের ‘অন্তর্গত করবী’

বইমেলায় নভেরা হোসেনের ‘অন্তর্গত করবী’

অমিয় চক্রবর্তীর কবিতা : বিষয়বিন্যাস

অমিয় চক্রবর্তীর কবিতা : বিষয়বিন্যাস

সর্বশেষ

অন্যমনস্কতার ভেতর বয়ে যাওয়া নিঃশব্দ মর্মর

অন্যমনস্কতার ভেতর বয়ে যাওয়া নিঃশব্দ মর্মর

মজিদ মাহমুদের সাক্ষাৎকার

মজিদ মাহমুদের সাক্ষাৎকার

শামসুজ্জামান খান : বাঙালি সংস্কৃতির অতন্দ্র প্রহরী

শামসুজ্জামান খান : বাঙালি সংস্কৃতির অতন্দ্র প্রহরী

স্মৃতিতে বোশেখী মেলা

স্মৃতিতে বোশেখী মেলা

আমাদের মঙ্গল শোভাযাত্রা

আমাদের মঙ্গল শোভাযাত্রা

বসন্তের লঘু হাওয়া

বসন্তের লঘু হাওয়া

বইমেলায় নভেরা হোসেনের ‘অন্তর্গত করবী’

বইমেলায় নভেরা হোসেনের ‘অন্তর্গত করবী’

অমিয় চক্রবর্তীর কবিতা : বিষয়বিন্যাস

অমিয় চক্রবর্তীর কবিতা : বিষয়বিন্যাস

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ

Bangla Tribune is one of the most revered online newspapers in Bangladesh, due to its reputation of neutral coverage and incisive analysis.
© 2021 Bangla Tribune