X
মঙ্গলবার, ২০ এপ্রিল ২০২১, ৭ বৈশাখ ১৪২৮

সেকশনস

তিস্তা জার্নাল । পর্ব ৮

আপডেট : ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ১২:৫২

পূর্বপ্রকাশের পর

এগোতে এগোতেই দেখা মিলল তিস্তায় মাছ ধরে ফেরা কয়েকজন জেলের। ট্রলার বা নৌকা নিয়ে পদ্মা-মেঘনায় ইলিশ ধরতে যাওয়া জেলে নয় এরা। পরনের লুঙ্গি হাঁটুর উপরে পর্যন্ত ভাঁজ করে তুলে গিঁট দিয়ে বাঁধা, গায়ে শার্টের ওপরে সোয়েটার, কিংবা শুধুই একটা গেঞ্জি, ভারি শক্তপোক্ত ফ্রেমে বাঁধা খেওয়া জাল মাথার উপরে তুলে ধরা, বাড়তি শুকনো কাপড় মাথায় পাগড়ির মতো করে বাঁধা, কাঁধে ঝুলছে মাছ রাখার মাটির হাঁড়ি কিংবা লাউয়ের খোল। “কী মাছ মারলেন দাদা?”—এমন প্রশ্নে মুখে কোনও ভাবান্তর দেখি না। কাছে গিয়ে “দেখি কী মাছ” বলে হাঁড়ির দিকে ঝুঁকলে অবশ্য তিনজনই থেমে দাঁড়ান। একজন বলেন, “বৈরালি। নেমেন?” হাঁড়ির তলায় তিস্তার একান্ত নিজস্ব বৈরালি মাছের কেজি দুই-আড়াই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পোনা। “কত কেজি?” “চাইরশ।” বলেই হয়তো বোঝেন কেনার ইচ্ছে আমার নেই, তাই চলে যাবার জন্য পা বাড়ান। বেলা শেষ হয়ে আসছে। টাটকা থাকতে থাকতে গোডাউনের হাট কিংবা পীরেরহাটে বিক্রি করতে হবে মাছ। তারপর রাতের বাজার করা আছে, বাড়ি ফিরে কিছু মুখে দিয়ে বিশ্রাম করা আছে—কাঁধের ‘ভারা’য় মাছ নিয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে খোশগল্প করার সময় তাঁদের নেই। তবু ছবি তোলার অনুরোধ উপেক্ষা করেন না তাঁরা।

নদী থেকে বৈরালি মাছের পোনা ধরে ফিরছেন জেলেরা। ছবি : লেখক গন্তব্য এখনও দূরে, তবে বেলা আছে অনেকটা। আমি হাঁটছিলাম চরের পশ্চিম ধার ঘেঁষে—গ্রামের লাগোয়া উঁচু আবাদি জমি আর নিচু চরের মাঝখানের সীমানার ওপর দিয়ে। সীমারেখাটা স্পষ্ট, আর সেটা শুধু জমির উচ্চতার পার্থক্যের মধ্যেই দৃশ্যমান নয়—সেই জমির রূপের পার্থক্যও মুহূর্তে চোখে পড়ে। বামদিকে গ্রাম-সংলগ্ন জমিগুলোর জীবন্ত আর্দ্র বুকে আলুর ক্ষেতের ঘন সবুজ, তামাকের সবুজের হলদেটে আভা, কিংবা সর্ষের তীব্র উজ্জ্বল হলুদের সমান্তরালে চলতে থাকা ছন্নছাড়া চরের বালির সাদা-ধূসর শূন্যতা, আর সেই শূন্যতার মাঝে মাঝে এখানে-ওখানে মানুষের সযত্ন চেষ্টায় বাঁচিয়ে রাখা সবজি কিংবা তামাকের ক্ষেতের শ্রীহীন টুকরোগুলো তিস্তার দ্বৈত রূপের কথা মনে করিয়ে দেয়। এই দ্বৈততা তিস্তার চরিত্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তার দুই পাড়ের মানুষের জীবনের সচ্ছলতা-দারিদ্র্যে মেশানো ইতিহাস, তার অবিরাম ভাঙা-গড়া, তার ঊষরতা আর উর্বরতা, তার ভূপ্রকৃতির বর্ণহীনতা আর বর্ণময়তা—সবকিছুতে এই দ্বৈততার খোঁজ মিলবে। এখানে অসংখ্য মানুষের দেখা পাওয়া যাবে যারা আজ হতদরিদ্র, অথচ এক-দুই পুরুষ আগে, কিংবা নিজের জীবৎকালেই একটা সচ্ছল জীবন কাটিয়ে দেওয়ার মতো যথেষ্ট জমি ছিল তাদের। তেমনই একজনের দেখা পেলাম কিছুক্ষণের মধ্যেই। বাম দিকে অনতিদূরে প্রথম গ্রোইনটা রেখে একটা ঘন সবুজ আলুর ক্ষেতের আল ধরে এগোচ্ছিলাম, আচমকা পঞ্চাশোর্ধ্ব এক নারীর মুখোমুখি হলাম—একটা কাস্তে দিয়ে আলের ঘাস কেটে পাশের সাদা প্লাস্টিকের বস্তাটায় ভরছিলেন। ময়লা হলুদ-বেগুনি-সবুজ-লাল ডোরাকাটা শাড়িতে যেনতেনভাবে জড়ানো তাঁর ছোট্ট শীর্ণ কাঠামোটা আগে থেকে দেখতেই পাইনি—যেন সেটা  আলুক্ষেতের গাঢ় সবুজ, আলের ঘাস আর মাটির ধূসরতার মধ্যে লুকিয়ে মিশে ছিল। চরের চেনা পারিপার্শ্বিকের সঙ্গে বেমানান মানুষ দেখে তিনি কিছুটা আড়ষ্ট হয়ে শরীরটা ঘুরিয়ে একদিকে সরে যেতে চাইলেন। “কী করেন চাচি” বলে আলাপ করতে চাইলে তাঁর অস্বস্তি কিছুটা কমলো বলে মনে হলো। চরের দিকে মুখ করেই বললেন, “আর বাবা, কী আর...এই ঘাস কাটি...গরিব মানুষ...।” ধীরে ধীরে আলাপ জমে উঠলে জানালেন, ঐ চরেই দিগন্তবিস্তৃত বালুর মধ্যে তাঁর ভিটেবাড়ি, জমিজমা পড়ে আছে। এই বছর ত্রিশেক আগেই ছিল সেসব—নিজের চোখে দেখেছেন। তারপর একদিন যেন কোন দুষ্ট জাদুকরের জাদুতে উর্বর কালো পলিমাটি ধারালো কাচের মতো বালিতে রূপ নিয়েছে। বাড়ি আর তার চারপাশ ঘিরে থাকা গ্রামের পাড়া-প্রতিবেশি, মাঠ-পুকুর, বাঁশবন, ফসলের ক্ষেত মুহূর্তে শূন্যে মিলিয়ে গেছে। প্রথম যৌবনের সুখ-সম্ভাবনা-স্বপ্ন আজ এই মধ্যবয়সের চরম দারিদ্র্যে পর্যবসিত। নিজের ভাগ্যকে নিজেই মাঝে মাঝে বিশ্বাস করতে পারেন না। 
“আর বাবা, কী আর...এই ঘাস কাটি...গরিব মানুষ...”—তিস্তায় ভিটেমাটি হারানো নারী। ছবি : লেখক কিন্তু তিস্তাতীরের মানুষের ভাগ্য কি কেবল নদীর মর্জিতেই লেখা হয়? এই যে নদী আর মানুষের নিরন্তর লুকোচুরি খেলা, তাতে শেষ পর্যন্ত কে জেতে—মানুষ না নদী? এ প্রশ্নের শেষ উত্তর হয়তো অজানা। বর্ষার তিস্তা যেভাবে এক লহমায় তার দুপাশের জনপদের মানচিত্র বদলে দেয়, যেভাবে রাতারাতি মানুষ হারিয়ে ফেলে বাড়িঘর আর ঠিকানা, তাতে নদীর প্রবল গতির সামনে মানুষের অসহায়তাই কেবল ধরা দেয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মানুষ তো হারে না, অন্তত হার স্বীকার করতে চায় না—বারবার ভিটা হারিয়েও নদী পিছু হটলেই ফিরে ফিরে আসে, চরের অনিশ্চয়তা আর শূন্যতার মধ্যে হারানো ভিটা খুঁজে নিয়ে আবার ঘর বাঁধে। এমনকি স্থান হারিয়ে গেলেও হারিয়ে যেতে দেয় না তার নাম—সাথে করে বয়ে নিয়ে যায় তার নতুন পৃথিবীতে, তাকে পুরনো চেনা নাম দিয়ে সাজায়। ঘর বাঁচিয়ে রাখার এই অদম্য ইচ্ছা শুধু নদীমাতৃক বাংলাদেশের এক অপ্রধান নদীর দুপাশের জনপদেই দেখা যায় তা নয়—এই ইচ্ছা বিশ্বজনীন। ‘নিউ ওয়ার্ল্ড’-এ অভিবাসী মানুষ একদিন সাথে করে নিয়ে গিয়েছিল তার আদি আবাসের নাম। তাই ইয়র্ক, ইংল্যান্ড, অক্সফোর্ড, ক্যামব্রিজ, লন্ডন, নিউহ্যাম্পশায়ার, ব্রিস্টল, বার্মিংহ্যাম, ওয়েস্টমিনস্টার—মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এরকম অসংখ্য স্থাননাম তাদের আদি উৎস ইংল্যান্ড এবং সেই ভূখণ্ড থেকে নতুন মহাদেশে পাড়ি জমানো মানুষের আদি ভূমির প্রতিধ্বনি হয়ে আছে।
আদি ভূমির নাম—যে ভূমির অন্য নাম ‘বাড়ি’ কিংবা ‘পুরান বাড়ি’—স্থানান্তরিত মানুষের মনে জেগে থাকে পুরনো কিন্তু জীবন্ত স্মৃতির মতো, ক্ষতের মতো। স্মরণের সামান্য আঘাতেই তাতে ব্যথা জাগে, আনন্দও। 

তিস্তার দুই রূপ—ঊষর বালির আগ্রাসনের পাশেই পলির সম্ভাবনা। ছবি : লেখক  দ্বিতীয় গ্রোইনটার কাঠামো স্পষ্টভাবে দৃষ্টিসীমায় আসতেই চলতি পথে চরের মানুষজনকে জিজ্ঞেস করে নিশ্চিত হতে চাচ্ছিলাম আমার পুরান বাড়ির অবস্থান। জিজ্ঞেস করতে করতে ক্রমশ এগোচ্ছিলাম কার্যত নদীর দিকেই। পৌষের প্রথম সপ্তাহ; এ মৌসুমে তিস্তা এখনও তার বাৎসরিক রিক্ততার শেষ সীমায় এসে পৌঁছেনি। তাই এখনও হেঁটে নদী পার হবার মতো ক্ষীণ হয়নি জলধারা। আমার পুরান বাড়ির দিশা জানতে চাওয়ায় আধঘণ্টা আগে প্রায় উত্তর দিগন্তের কাছে ময়ালের সাথে মিশে থাকা একটা ভুট্টাক্ষেত দেখিয়ে দিয়েছিলেন একজন। সেই পথনির্দেশ মেনে নদীর কাছে পৌঁছে আবিষ্কার করলাম, সেই ভুট্টাক্ষেত নদীর ওপাড়ে। এপাড়ে গত বর্ষায় চরের ওপর তিস্তার স্রোতের ফেলে যাওয়া পুরু বালির একটা খণ্ডের ধার ঘেঁষেই নদীর ভেজা খাত একটা বিরাট বাঁকের রূপ নিয়েছে। সেখানে দুই প্রবীণ-প্রবীণাকে দেখলাম তামাকের চারা পুঁতছেন। নারীটির কষ্টিপাথরের মতো কালো গায়ের রং, ছোট নাক আর গোলাটে মুখমণ্ডলে উত্তর জনপদের আদি নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর স্বাক্ষর। পুরুষটির শারীরিক গঠন সম্পূর্ণ অন্যরকম—চরের খোলা রোদে পোড়া গায়ের তামাটে রং একদা-ফর্সা গাত্রবর্ণের আভাস দিচ্ছে। বয়স আর সারাজীবনের পরিশ্রমের ঝাপটা শরীরের ঋজুতাকে খর্ব করেছে। তবু এককালের লম্বা একহারা শরীরের আদলটুকু এখনও অটুট। লম্বাটে মুখে খাড়া নাক। পরিচয়পর্বে জানা গেল তাঁরা স্বামী-স্ত্রী। পীরের বাড়িটা এখানে কোথায় ছিল এমন প্রশ্নে পুরুষটি প্রবলভাবে মাথা নেড়ে বললেন, না না, এখানে তো কোনও পীরের বাড়ি ছিল না। এক পীরের বাড়ি ছিল পাকিস্তান আমলে, কিন্তু সেটা তো ঐদিকে, কয়েক মাইল উজানে। নারীটি কিন্তু পরিষ্কার মনে করতে পারলেন এখানে বছর দশেক আগে বটগাছটা জেগেছিল নদীর তলা থেকে। অনেক মানুষ আসত দূর-দূরান্ত থেকে গাছের ছাল নিতে। সে তো এখানেই—এই যেখানে তাঁরা তামাকের চারা লাগাচ্ছেন তারই আশেপাশে। পুরুষটির অস্বীকৃতি কিন্তু তার স্ত্রীর বর্ণনার প্রতিক্রিয়ায় আরও প্রবল হচ্ছিল। তিস্তার চরের অধিবাসীদের কথায় আন্তরিকতার সাথে যে কপাল-মেনে-নেওয়া মৃদু হতাশার সুর মিশে থাকে, তা তাঁর কণ্ঠস্বরে নেই। চরের অচেনা পরিবেশে এক আগন্তুকের কৌতূহলকে বন্ধুত্বের সাথে স্বাগত জানানোর বদলে তাঁর কণ্ঠে যেন কঠোরতা। “আরে না না, এখানে পীরের বাড়ি কই?” তাঁর গলায় যেন ধমকের সুর—স্ত্রীকে কথাই বলতে দিতে চাইছিলেন না। নারীটি কিন্তু নাছোড়—আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “আরে ওমার মনে নাই। অ্যাটে তো পীরের বটগাছটা জাগসিল। হ্যাঁ, আট-দশ বছর তো হইসেই।” স্বামীকে তিনি মনে করিয়ে দেন, সেই যে বিনবিনার চরের অমুক গাছের বাকলের বড় একটা টুকরো বাড়িতে নিয়ে গিয়ে খড়ি করে ভাত জ্বাল দেওয়ার জন্য চুলায় ঢোকাতেই রক্তবমি করা শুরু করল। তারপর তাড়াতাড়ি বাকলের টুকরাটা বের করে আগুনটা নিভিয়ে গাছের কাছে রেখে যাওয়ার সাথে সাথে তার বমি বন্ধ হয়ে গেল। স্ত্রীর মুখে পীরের এই লোককথা হয়ে-ওঠা সাংঘাতিক মাজেজার বয়ানের পুনরাবৃত্তিতেই কি না জানি না, বৃদ্ধ হাল ছেড়ে দিলেন—হ্যাঁ, পীরের বাড়ি ছিল তো একটা। হাত বাড়িয়ে সামনের পানি জমে থাকা বাঁকের অংশটা দেখিয়ে বললেন—ঐ যে ঐখানে মনে হয়।
এসবই নিশ্চয়ই তাঁর জানা ছিল। তাহলে কেন তিনি ওভাবে অস্বীকার করছিলেন? প্রশ্নটা মনে ঘুরছিল। উত্তর পেলাম একটু পরেই। “আপনি কোথাত থাইকা আসছেন?”—এমন আচমকা পাল্টা প্রশ্নে কিছুটা পাল্টা আক্রমণের সুর যেন শুনতে পেলাম। কিন্তু প্রশ্নের ভাষাটা কানে লাগল আরও অর্থপূর্ণভাবে। ‘থাইকা’ এ অঞ্চলের শব্দরূপ নয়। আমি ঢাকায় থাকি—আমার এমন উত্তরে বৃদ্ধের মুখে ঢাকা এবং সংলগ্ন অঞ্চলগুলোর বিভিন্ন স্থাননামের বন্যা ছোটে। ঢাকা তো বুঝলাম, কিন্তু জায়গার নাম নাই? ঢাকার কোথায়? ধানমণ্ডি? মোহাম্মদপুর? হাজারিবাগ? যাত্রাবাড়ি? নারায়ণগঞ্জ? এই সব জায়গায় তিনি ঘুরেছেন এক সময়। কাজ করেছেন। তাঁর এই আত্মজীবনীর খণ্ডচিত্র আর ভাষার রূপ বলে দিচ্ছিল তিনি তিস্তাতীরের আদি বাসিন্দা নন। বস্তুত জামালপুর এবং বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চল থেকে যমুনার ভাঙনে ঘর হারানো বহু মানুষ বহুকাল ধরে তিস্তার চরে আবাস গড়েছেন, উত্তরাঞ্চলের মানুষের সাথে বিবাহসূত্রে আবদ্ধ হয়ে তিস্তার চরের স্থায়ী অধিবাসী হয়ে উঠেছেন। বুঝলাম, ইনি তাঁদেরই একজন। বৃদ্ধ বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছিলেন যে, আশেপাশে তাঁদের কয়েক একর জমি আছে—কিছুটা এখনও নদীতে আর কিছুটা বালি হয়ে পড়ে আছে। আর কিছু চলে গেছে শরিকদের দখলে। ঘরহারানো মানুষের মনের অতলে নির্ঘুম জেগে থাকা উন্মূলতার স্মৃতি এবং আতঙ্ক, আর তার থেকে জন্ম নেওয়া  আগ্রাসী মনোভাব বৃদ্ধের আচরণে স্পষ্ট। তাছাড়া যে জমিটাতে এই মুহূর্তে স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে বৃদ্ধ বয়সে তিনি এখন তামাকের চারা বুনছেন, আর নদীর ধারার আরও কাছে ঐ কিছুটা দূরে তাঁদের ছেলে আর ছেলেবউ আরও জলময় পলিভরা যে জমির টুকরোটাতে কাজ করছেন—সেগুলোর কোনওটাই তাঁদের নয়। হয়তো তাঁর মনে সন্দেহ জেগেছে, এই শহুরে আগন্তুক জমির অধিকারের ধান্দায় ঘুরছে। হয়তো সে ব্যাপারে নিশ্চিন্ত হলে, পরিচয় আরও ঘনিষ্ঠ হওয়ার পর বৃদ্ধ তাঁর পিতৃপুরুষের, কিংবা হয়তো তাঁরও, আদিভূমির স্মৃতিচারণ করতেন আমারই সঙ্গে, কোনওদিন সেখানে ফেরার অসম্ভব বাসনা জানাতেন। কিন্তু এখন তাঁকে এই জমির দখল রক্ষা করতে হবে, সত্য অস্বীকার করে হলেও, যুদ্ধ করে হলেও—কেননা, আদিভূমি এখনও শূন্যতায় মিশে আছে। কেননা, এই জমিই এখন তাঁর ‘বাড়ি’।
চরের ক্যানভাসে মানুষের আঁকা জীবনের রং। ছবি : লেখক মনে আছে সিঙ্গাপুরের চীনা মার্কেটের এক চীনা বংশোদ্ভূত দোকানির কথা; আমি চীনে গিয়েছিলাম শুনে মহিলার ঝানু ব্যবসায়ীসুলভ নির্বিকার মুখখানা মুহূর্তে কীরকম আলোয় ঝলমল করে উঠেছিল। “তুমি চীনে যাও না?”—আমি জানতে চেয়েছিলাম। “কোনওদিন যাওয়া হয়নি”, মহিলা উত্তর দিয়েছিলেন। অথচ কখনও-না-দেখা পিতৃভূমির নামটা অচেনা এক বিদেশির মুখে উচ্চারিত হয়েই যেন দোকানে সাজানো অপূর্ব কারুকাজে ভরা শত শত শো-পিসের গায়ে গায়ে প্রতিফলিত হয়ে শতগুণ উজ্জ্বল আর মধুর হয়ে মহিলাটির মুখে উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছিল। ‘বাড়ি’ এমনই এক জাদুময় শব্দ যে তার উচ্চারণে বর্তমান-অতীতের বোধ হারিয়ে যায়, বাস্তব-কল্পনার সীমানা লোপ পায়। পৃথিবীর সব মানুষের মনে তার অস্তিত্ব অমর, তবে উন্মূল মানুষের মনেই তার আবেদন সবচেয়ে বেশি প্রবল, তাৎপর্যপূর্ণ এবং প্রতিধ্বনিময়।
বৃদ্ধ দম্পতির কাছ থেকে বিদায় নিয়ে নদীর পাড় ঘেঁষে পশ্চিম দিকে হাঁটছিলাম। অদূরেই ঘাটের কাছে বালির ওপর বসানো ন্যাংটা টিনের ঘরটা। তার ছায়ায় বালির ওপর একটা বৃত্ত তৈরি করে জনাদশেক শিশু আর বৃদ্ধা বসে আছেন ওপাড় থেকে নৌকা আসার অপেক্ষায়। বেলা পড়ন্ত, নদী পার হয়ে ওপাড়ে বাড়ি ফেরার মৃদু উৎকণ্ঠা নিয়ে বৃদ্ধাদের কেউ চুপচাপ ঘাটের দিকে তাকিয়ে আছেন, উল্টোদিকে বসা কারও চোখ বিস্তীর্ণ চরের উপর দিয়ে দূরে বোল্লার পাড়ের সবুজ দিগন্তরেখা, কিংবা পুবে মহীপুর ব্রিজের দিকে প্রসারিত। মনে সন্দেহ উঁকি দিচ্ছিল, আমার ‘পুরান বাড়ি’র সুনির্দিষ্ট অবস্থানটা সেদিন লালু দাসের দেখানো ছোট্ট চরটার নিচে না-ও হতে পারে, সেটা হয়তো এখন ঐ বৃদ্ধ দম্পতির তামাকের ক্ষেতের নিচে সমাধিস্থ। নাকি নদীর পাড়ের ঘন সবুজ ভুট্টাক্ষেতটাই সেই জায়গা। ঘাটের কাছে যে জায়গাটায় দাঁড়িয়ে আছি তার এক কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে যে-কোনও বিন্দুতে বাড়িটা নিশ্চুপ হয়ে বালি আর পলির গভীরে শুয়ে আছে। কিংবদন্তীর সেই বটগাছটা আবার জেগে উঠলেই কেবল সেই বিন্দুটার অবস্থান নিশ্চিতভাবে জানা যাবে। আর যদি প্রামাণ্য প্রতীকের মতো গাছটা কোনওদিন আর না জাগে, তাহলে ঐ রাগী বৃদ্ধের মতো বহু প্রার্থীর আগ্রাসী দাবির মুখে আমার বাড়ি একদিন ছিন্নভিন্ন হয়ে হারিয়ে যাবে। এভাবেই বোধহয় নদীর অস্থির ভূগোলের মধ্যে একজনের বাড়ি একদিন অন্য কারও হয়ে যায়। চলবে  

/জেডএস/

সম্পর্কিত

অন্যমনস্কতার ভেতর বয়ে যাওয়া নিঃশব্দ মর্মর

অন্যমনস্কতার ভেতর বয়ে যাওয়া নিঃশব্দ মর্মর

মজিদ মাহমুদের সাক্ষাৎকার

মজিদ মাহমুদের সাক্ষাৎকার

শামসুজ্জামান খান : বাঙালি সংস্কৃতির অতন্দ্র প্রহরী

শামসুজ্জামান খান : বাঙালি সংস্কৃতির অতন্দ্র প্রহরী

স্মৃতিতে বোশেখী মেলা

স্মৃতিতে বোশেখী মেলা

আমাদের মঙ্গল শোভাযাত্রা

আমাদের মঙ্গল শোভাযাত্রা

বসন্তের লঘু হাওয়া

বসন্তের লঘু হাওয়া

বইমেলায় নভেরা হোসেনের ‘অন্তর্গত করবী’

বইমেলায় নভেরা হোসেনের ‘অন্তর্গত করবী’

অমিয় চক্রবর্তীর কবিতা : বিষয়বিন্যাস

অমিয় চক্রবর্তীর কবিতা : বিষয়বিন্যাস

সর্বশেষ

অন্যমনস্কতার ভেতর বয়ে যাওয়া নিঃশব্দ মর্মর

অন্যমনস্কতার ভেতর বয়ে যাওয়া নিঃশব্দ মর্মর

মজিদ মাহমুদের সাক্ষাৎকার

মজিদ মাহমুদের সাক্ষাৎকার

শামসুজ্জামান খান : বাঙালি সংস্কৃতির অতন্দ্র প্রহরী

শামসুজ্জামান খান : বাঙালি সংস্কৃতির অতন্দ্র প্রহরী

স্মৃতিতে বোশেখী মেলা

স্মৃতিতে বোশেখী মেলা

আমাদের মঙ্গল শোভাযাত্রা

আমাদের মঙ্গল শোভাযাত্রা

বসন্তের লঘু হাওয়া

বসন্তের লঘু হাওয়া

বইমেলায় নভেরা হোসেনের ‘অন্তর্গত করবী’

বইমেলায় নভেরা হোসেনের ‘অন্তর্গত করবী’

অমিয় চক্রবর্তীর কবিতা : বিষয়বিন্যাস

অমিয় চক্রবর্তীর কবিতা : বিষয়বিন্যাস

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ

Bangla Tribune is one of the most revered online newspapers in Bangladesh, due to its reputation of neutral coverage and incisive analysis.
© 2021 Bangla Tribune