X
মঙ্গলবার, ২০ এপ্রিল ২০২১, ৭ বৈশাখ ১৪২৮

সেকশনস

তিস্তা জার্নাল । পর্ব ৯

আপডেট : ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ০০:০০

পূর্বপ্রকাশের পর

ঘাটের টিনের শেডটার কাছ থেকে নদী পেরিয়ে আমার দৃষ্টি ওপাড়ে যায়। সেই একই পরিচিত দৃশ্য। শীতের শান্ত শীর্ণ ক্ষীণতোয়া তিস্তার অলস স্রোত, আর পানির ওপর মৃদু ঢেউয়ের বয়ে-চলা প্যাটার্ন। বাড়ির পাশের পুকুরের স্থির পানিতে হঠাৎ একটা শিমুল ফুল খসে পড়লে যতটুকু ঢেউ ওঠে, যেন ততটুকুই আলোড়ন এই পৌষের তিস্তায়। শুধু কিনারায়—যেখানে গত বর্ষায় জমানো বালির শুকনো লম্বা খণ্ডটাকে এখন এই নীরব নিরলস স্রোত একটু একটু করে কেটে নিয়ে যাচ্ছে আবার কোনও নতুন ঠিকানায় তাকে গড়ে তুলবে বলে, সেখানে কান পাতলে মৃদু কলকল শব্দ শোনা যায়। কাচের মতো স্বচ্ছ জলের ভিতর দিয়ে নদীতলে দৃষ্টি নিবদ্ধ করলে চোখে পড়ে বালির ছোট ছোট উঁচু-নিচু কাঠামো, আর সেখানে পানির ওপর ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ঘূর্ণি ওঠে। কিছুক্ষণ আগে চরের মধ্যে দাঁড়িয়ে দু-এক কিলোমিটার দূর থেকে নদীর দিকে তাকিয়ে যে দৃশ্য দেখেছি, তার সাথে হুবহু মিল এই দৃশ্যের। মাথার ওপরে একই নীল আকাশ দিগন্তের উপরে এসে একটা লাল আভা পেয়েছে, পুব-পশ্চিমে প্রসারিত একই সবুজ ময়ালের রেখাটা যেন আকাশ আর পৃথিবীর অভিন্ন গোলকটাকে কেটে দুভাগ করে দিয়েছে। শুধু বালির বদলে এখানে পানি। এমনকি নদীর পানির এই ঢেউয়ের প্যাটার্ন বালির উপরে এখনও প্রায় সম্পূর্ণ অটুট—যেন শুকনো তৃষ্ণার্ত বালু প্রস্তুত হয়ে আরেকটা বর্ষার অপেক্ষা করছে স্থির উৎকণ্ঠা নিয়ে, তার জাদুর কাঠির ছোঁয়ায় মুহূর্তে পানিতে রূপ নিয়ে আবার নদীর সাথে মিশে যাবে বলে।          

তিস্তার জাদুর ভূগোল : পটভূমি একই থাকবে, কিন্তু এই বালি যে-কোনও বর্ষার পর হয়ে যেতে পারে পানি। ছবি : লেখক

কিন্তু শুষ্কতা আর আর্দ্রতা, পলি আর বালি, চরের জেগে ওঠা আর বিলীন হয়ে যাওয়া, ভিটেবাড়ি হারানো আর ফিরে পাওয়ার এই নিরুপায় অনিঃশেষ অনিশ্চয়তার মধ্যে সবচেয়ে স্থির বিস্ময় হলো তিস্তাতীরের মানুষের জীবন। কতভাবে যে মানুষ নিজেকে বাঁচিয়ে রাখে এখানে! খাপ খাইয়ে নেয় নদীতীরের নিজস্ব বাস্তবতার সঙ্গে। ভিটেবাড়ি, চাষজমি সব হারালেও সে থাকে নদীর আশেপাশেই। সব ফিরে পাবার অপেক্ষা করে। অপেক্ষার শক্তি তার টিকে থাকার মন্ত্র। তিস্তার ভাঙনে সর্বস্ব হারানো যে নারী আলের ওপর ঘাস কাটছিলেন, তাঁর আজকের এই সামান্য উঞ্ছবৃত্তি তো তাঁর সম্ভাবনার মৃত্যু নয়—তাঁর জীবনসংগ্রাম। তাই চরের মৃত বালির দিকে চোখ মেলে বলে-যাওয়া হতাশ্বাসে ভরা তাঁর কথাগুলোর মধ্যে আশা লুকিয়ে আছে নিশ্চয়। কারণ তিনি জানেন যে তিস্তার অববাহিকা এক জাদুর দেশ। নদীর হাতসাফাই যদি একদিন তাঁর ভিটেমাটি, সচ্ছলতার রুমালটাকে তাঁরই চোখের সামনে হাপিশ করে দিয়ে থাকে, তাহলে সেই হাতই আবার সেটাকে ফিরিয়ে আনবে চোখের পলকে—শুধু একটা সৌভাগ্যের বর্ষাকালের অপেক্ষা। কিংবা চরের উদার বুকে কুড়িয়ে পাওয়া বেওয়ারিশ পলির টুকরোয় তামাকের ‘পুলি’ বুনতে বুনতে আমার প্রশ্নের উত্তরে হঠাৎ দাঁড়িয়ে লম্বাটে মুখের যে একহারা দীর্ঘাঙ্গ পুরুষটি বলেছিলেন “আমার তো কোনও জমি নাই”, পুরনো মলিন শার্টের গোটানো হাতার নিচে তাঁর সুগঠিত দুই হাতের সঞ্চালনে জীবনের গতি দেখতে পেয়েছি, যা শূন্য থেকে শক্তি সংগ্রহ করে তাই দিয়ে নিজের আর প্রিয়জনের জন্য বেঁচে থাকার রসদ জোগাতে পারে। আশ্চর্য এই যে, এইসব মানুষের দুর্ভাগ্য কিংবা দারিদ্র্যের বর্ণনার ভাষায় কিংবা মুখের অভিব্যক্তিতে কখনও কোনও অভিযোগ লেখা থাকে না—হয়তো ভাগ্যের বিরুদ্ধে কোনও অভিযোগ চলে না, বহু প্রজন্মের অভিজ্ঞতায় এঁরা সেটা বুঝেছেন, মেনেও নিয়েছেন। তাই তিস্তাতীরের মানুষের মুখের রেখায় সেই সরলতা, শান্তি এবং হৃদ্যতা, যা বোকামি, হিংস্রতা আর শত্রুতার মনোভাব থেকে এঁদের মনকে রক্ষা করে।              

“আমার তো কোনও জমি নাই”—তিস্তার চরের বেওয়ারিশ জমির চাষী । ছবি : লেখক
তাই বলে হিংস্রতা বা নিষ্ঠুরতার উপাদান তিস্তাতীরের মানুষের মনে একেবারেই নেই তা নয়। ভূমিহীন চাষীটির তামাকের ক্ষেতের ছবি যখন তুলছিলাম, তখন কালোমতো শক্তপোক্ত চেহারার আরেকজন চাষী দুষ্টুমির হাসি মুখে নিয়ে বলছিলেন, “ভাই, ইয়্যার (এর) একটা ছবি তোলেন। কাগজত লিখমেন, এ বেচারার জমি নাই। আরেকজনের জমিত আবাদ করে।” তার দুষ্টুমিকে প্রতিবেশির দুর্ভাগ্য নিয়ে নিষ্ঠুরতা ছাড়া আর কীই বা বলা যায়! মিথ্যা, উগ্রতা কিংবা গোঁয়ার্তুমিও নিশ্চয়ই আছে। নদীখাতের আর্দ্র পলিজমিতে তামাকের ক্ষেতে কাজ করা সেই বৃদ্ধের কথা আগেই বলেছি। কোনও বর্ষার পর পানি সরে গেলে যখন বিস্তীর্ণ পলিজমি জাগে, তখন যার যার জমি বুঝে নেবার প্রক্রিয়ার মধ্যে শত্রুতা উঁকি দেয়—দাবি আর বিতণ্ডা কখনও কখনও মারামারিতে গিয়ে ঠেকে। নিজেরই দুর্বলতর আত্মীয়দের ভালো জমির অধিকার থেকে বঞ্চিত করার ঘটনাও কম নয়। আবার চরের বিরাট বিস্তারের মধ্যে সীমানাহীনতার যে চর্চা চলে, তা যতই ভঙ্গুর আর ক্ষণস্থায়ী হোক, তথাকথিত আধুনিক নাগরিক জীবনে তা অকল্পনীয়। এই চর্চাই তিস্তার বহু ভাগ্যহত ঘর-বাড়ি হারানো মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে। চরের বুকে পড়ে-থাকা কোনও পলির টুকরোয়—তা যত ছোটই হোক—তাই যে-কোনও ভূমিহীনই বুনে দিতে পারেন পেঁয়াজ, রসুন, মিষ্টি আলু, কুমড়া কিংবা তামাকের চারা। বর্ষা এসে নদীর মূল ধারা ছাপিয়ে সেই বাঁধের গোড়া পর্যন্ত সমস্ত চর দখল করে নেবার আগে ঘরে তুলতে পারেন অন্তত মাস দুই-তিন টিকে থাকার খানিকটা রসদ। হয়তো তিস্তার বিধ্বংসী আর অননুমেয় খেয়ালি স্বভাবই এর অববাহিকার মানুষের মনকে নম্রতা, কোমলতা আর স্থৈর্যের উপাদানে তৈরি করেছে। আবার একই বাস্তবতা তিস্তাতীরের মানুষের মনের আরেক বৈশিষ্ট্যের জন্ম দিয়েছে: ঘরহীনতার বোধ। এ এক অদ্ভুত বৈপরীত্য; বারবার ভাঙনেও যে-মানুষ নদীতীরের আবাস ছাড়তে চায় না, তাকে বারবার সরে যেতে হয় সেই আবাস থেকে।            

তিস্তার চরের বিচিত্র ভূগোল : চারদিক ঘেরা ধু ধু বালির সমুদ্রের মধ্যে মরূদ্যানের মতো এক টুকরো উঁচু পলিদ্বীপ। ছবি : লেখক
তিস্তাতীরের মানুষের মনে তাই ‘বাড়ি’র প্রতি মায়া আর উদাসীনতা পাশাপাশি বাস করে। শেষ পর্যন্ত যে ভূমিতে টিকে থাকার সংগ্রাম অনিবার্যভাবে ব্যর্থ হয়, কিংবা যে ভূমিতে শান্তি আর বিকাশ অসম্ভব হয়ে পড়ে—তা যদি ‘পুরান বাড়ি’ বা জন্মভূমিও হয়—সে ভূমি মানুষ চিরকাল ছেড়ে গেছে নতুন ভূমিতে নতুন ‘বাড়ি’ বানাবে বলে। এই অনিচ্ছুক স্থানান্তর তিস্তাতীরের প্রায় প্রতিটি মানুষের অভিজ্ঞতা। তার মনস্তত্ত্ব তাই অদ্ভুত টানাপোড়েনে ভরা। তার প্রতিটা নতুন বাড়ি একদিন ‘পুরান বাড়ি’ হয়ে যায়, আর প্রতিটা পুরান বাড়িতে—পৃথিবীর যে প্রান্তেই হোক সে বাড়ি—সে তার অস্তিত্বের, গৃহকাতরতার, মায়ার একেকটা খণ্ড রেখে আসে। প্রতিটা বাড়িই তার ‘বাড়ি’, মানসিকভাবে প্রতিটা বাড়িতে সে বাস করে দিনের বা জীবনের একেকটা সময়ে। প্রতিটা বাড়ির পথে পথে সে হাঁটে, তার ঘরের আরাম আর উষ্ণতা নেয়, তার বনানীর মর্মর শোনে, তার চারপাশের মানুষগুলোর স্পর্শ অনুভব করে। তবু হয়তো সেই আদি ‘পুরান বাড়ি’র জন্য, জন্মভূমির জন্য—যে ভূমিতে তার শৈশব কেটেছে—তার মর্মের টান সবচেয়ে বেশি। কারণ টুকরো-টাকরা ছেঁড়াখোঁড়া সামান্য শান্তি, আর ক্রমাগত, দীর্ঘস্থায়ী যন্ত্রণার মানবজীবনে শৈশবই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে সুন্দর, স্মরণীয় আর মায়াময়।

তিস্তাতীরের অসংখ্য মানুষের সেই যুক্তিহীন, রূঢ়তাহীন, মায়াময় শৈশব আমার দৃষ্টির সামনে চরের বিচিত্র ভূগোলের মধ্যে শুয়ে আছে। বালি সেই ভূগোলের প্রধানতম উপাদান, আর সেই বালির চেহারাও অনেক রকম। গ্রামের প্রান্তে, বাঁধের নিচ থেকেই জমিতে বালির অস্তিত্ব চোখে পড়ে। তবে সেখানে মাটির পরিমাণই বেশি, কেননা বর্ষায় তিস্তার শরীর গ্রামের প্রান্ত পর্যন্ত প্রসারিত হলেও মূল ধারা থেকে অত দূরে সে বালির দ্বীপগুলো ফেলে যায় না। নদীর ভাঙন যে তীরে যখন চলতে থাকে, সে তীরে বালির আগ্রাসনও বেশি। আর যেদিকে নদী অনেকদিন ভাঙে না, সেই ‘কাইম’-এ ক্রমগত আবাদ, সেচ আর গৃহস্থালি কাজকর্মের কারণে মাটির স্তর জমতে থাকে পুরু হয়ে। অবশ্য বাঁধ থেকে নেমে চরের ভেতরে সামান্য এগিয়েই আমি বালির দেখা পেয়েছি। তবে সে বালি সূক্ষ্মতর, ধূলার সাথে মেশানো। বোল্লার পাড়ের বাঁধ থেকে নেমে কয়েক পা এগোলেই ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের রাস্তাটা ধূলার নদী হয়ে ওঠে, তাতে প্রচুর বালি মেশানো। রাস্তার দুদিকে চাষের জমিতেও বালি, তবে তা চাষ আর সেচের কল্যাণে প্রায়শই আর্দ্র। চাষের উপযোগী জমির মাঝে মাঝেই কাশ আর ঘাসে ছাওয়া ঊষর, বালিময় অনেক ভূমিখণ্ড চরময় ছড়ানো। অনেক বালিজমিকে ধীরে ধীরে চাষযোগ্য করে তোলার প্রক্রিয়া চলে জমির অধিকারী গৃহস্থের উদ্যোগেই। সম্পূর্ণ বালিময় জমিতে তামাকের আবাদ তিস্তার চরের সাধারণ দৃশ্য। অন্য ফসল ফলানোর জন্য দূর থেকে পলিমাটি এনে বালির ওপর বসানো হয়, যদিও এভাবে চরের সামান্য টুকরো-টাকরা অংশেই কেবল আবাদ করা চলে। প্রাকৃতিকভাবেও, বর্ষার পর তিস্তা চরের এখানে-ওখানে পলি ফেলে যায় বিভিন্ন আয়তন ও পরিমাণে—তখন সেখানে চাষের তোড়জোড় শুরু হয়। চরের মাঝখানে, ধামুর আর কোলকোন্দের সীমানায় এক জায়গায় চোখে পড়ল দ্বীপ কিংবা মরূদ্যানের মতো অনেকখানি জায়গা। জায়গাটা চারদিক ঘিরে থাকা বালিময় ভূমির থেকে হাত দুয়েক উঁচু। চারপাশের ভূদৃশ্য থেকে তার রূপ সম্পূর্ণ আলাদা—পলিময়, সবুজ ফসলে জীবন্ত, আর্দ্র। গৃহস্থেরা কাজ করছেন সবজি ক্ষেতে—বিশ্বাসই হয় না অমন একখণ্ড জমি চরের বিশাল ঊষরতার মাঝখানে ওভাবে শুয়ে আছে বুকে জীবনের পশরা মেলে। 

প্রাণহীন বালির বিস্তার পেরোলেই সবুজের আশ্রয়, কিন্তু কোনওটাই দীর্ঘস্থায়ী নয়। ছবি : লেখক
চরের পশ্চিম দিকের যে রাস্তাটা ধরে আমি গোডাউনের হাটের দিকে এগোচ্ছিলাম, সে পথেই এক-দেড় কিলোমিটারের মধ্যেই এমন বালিময় একটা জায়গা পেলাম যে মনে হচ্ছিল যেন মরুভূমির ওপর দিয়ে হাঁটছি। গত বর্ষায় প্রসারিত তিস্তার রেখে যাওয়া ঢেউ আর মানুষের পায়ের ছাপে বালুজমিটা অসমান। আর, পৌষের শুরু হলেও মাঝ আকাশের সূর্যের কল্যাণে জমিটা তপ্ত, যদিও তাপ অসহনীয় নয়, বরং খোলা চরের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া অদৃশ্য শীতল বাতাসের মধ্যে সেই তাপ আরামই দিচ্ছিল। আকাশ মেঘহীন নীল। বামদিকে অনতিদূরেই গ্রাম—গাছপালা ঘরবাড়ি স্পষ্ট দেখা যায়। ছোট্ট মরুভূমিটা যেন এক সবুজ বেষ্টনী দিয়ে ঘেরা। মিনিট বিশেক হাঁটলেই এই ক্ষুদ্র বন্ধ্যা মরুভূমি থেকে গ্রামের সবুজে পৌঁছানো যাবে। কিন্তু হায়, তিস্তার ভূগোলে এই বৈপরীত্ব শুধু নয়, এই গোটা দৃশ্যই কত ক্ষণস্থায়ী, অনিশ্চিত! গ্রোইনদুটোর কল্যাণে নদীর দক্ষিণ তীরের অনেকখানি জুড়ে আপাতত ভাঙন নেই, কিন্তু তিস্তার গতিপ্রকৃতিতে বিশ্বাস কী! যে-কোনও বর্ষায় ভাঙনের দিক বদলে যেতে পারে, তখন এই গ্রাম আর এই ক্ষুদ্র মরুভূমি মুহূর্তে বিলীন হয়ে যাবে—ভূদৃশ্য বদলে যাবে তিস্তার ভয়াল জাদুতে।

দক্ষিণ পাড়ের মানুষকে তিস্তার বর্তমান ভাঙনের রকমসকম নিয়ে যখনই প্রশ্ন করেছি, সবার উত্তরেই সতর্ক স্বস্তির সুর লক্ষ করেছি—নদী আপাতত এপাড়ে ভাঙছে না। অবশ্য বোল্লার পাড়ে এই শীতকালেও মন্থর, প্রায়-নীরব ভাঙন আমি নিজে দেখেছি। তবে তিস্তার ভাঙন বলতে যা বোঝায়—পুরো গ্রাম গিলে খাওয়া, ভূদৃশ্য ওলট-পালট করে দেওয়া ভাঙন—অন্তত দক্ষিণ পাড়ের বরাইবাড়ি থেকে কোলকোন্দ পর্যন্ত এলাকাজুড়ে আপাতত নেই। কিন্তু এই সুসংবাদে সম্পূর্ণ স্বস্তি নেই, কেননা তিস্তা এখন স্থানে স্থানে গভীরতা হারিয়ে প্রায়-সমতলে পরিণত হয়েছে; শীত আসতে না আসতেই হেঁটে পার হয়ে যাওয়া যায় নদী। বন্যা আর ভাঙন তাই হয়ে দাঁড়িয়েছে আরও ব্যাপক। সে কারণেই জেলে লালু দাস থেকে শুরু করে ভ্যানচালক যুবকটি, গোডাউনের হাটে তিস্তার তীরের ঠিক ওপরেই কোলকোন্দ ইউনিয়ন পরিষদ ভবনের পাশের দোকানি থেকে শুরু করে সেখানে পরিচিত হওয়া সচ্ছল ব্যবসায়ীটি পর্যন্ত সবাই তাকিয়ে আছেন তিস্তা খননের দিকে। ভ্যানচালক যুবকটির কথায় বুঝলাম তিনি নিয়মিত খোঁজ রাখছেন কে শেষ পর্যন্ত তিস্তা খননের কাজটা পাবে—চীন না ভারত। শহর থেকে দূরে নদীতীরের প্রত্যন্ত এক গ্রামের বাসিন্দা স্বল্পশিক্ষিত খেটে-খাওয়া অখ্যাত সেই যুবক এই বিশাল পৃথিবীর সমস্ত যুদ্ধ-ক্ষমতা-ধ্বংস-শান্তির খবর হয়তো রাখেন না, কিন্তু নিজের ছোট্ট ভিটেবাড়িটুকুর অস্তিত্ব কোন ভূ-রাজনীতির পেন্ডুলামের দোলায় অনিশ্চিতভাবে দুলছে, তার সুলুকসন্ধানের চেষ্টাটুকু ঠিকই বজায় রাখেন। তাঁর সহজ, স্বল্পে-তুষ্ট মন জানে, নদীর বুক গভীর হলে ভাঙন বন্ধ হবে শুধু তাই নয়—দুপাশের অনেক দূর পর্যন্ত এলাকায় স্থায়ী পলি পড়বে। সেখানে আবাদ হবে দুর্দান্ত। তাঁর বাড়ি টিকে থাকবে নির্ভয়ে নিশ্চিন্তে।

হোক অনিশ্চিত, তবু এই বালিতে আমারও পা পড়েছে। ছবি : লেখক
চর পেরিয়ে নদীর কিনারায় চলে এসেছি অনেকক্ষণ। ঘাটের টিনের শেডটাও পিছনে ফেলে এসেছি। অদূরে ডানদিকে দ্বিতীয় গ্রোইনটার কাঠামো স্পষ্ট। সামনে দেখতে পাচ্ছি সেদিন লালু দাসের নৌকায় ওঠার জায়গাটা। যে চরটার নিচে আমার পুরান বাড়ি থাকবার সম্ভাবনা, আমার চোখের সামনে নদীর মাঝখানে সেটাও জেগে আছে। নদীর ধার ধরে সোজা ইউনিয়ন পরিষদের কাছের ঘাটটার দিকে না এগিয়ে বামে ঘুরে গেলাম বালুজমিটা পেরিয়ে গ্রামের প্রান্তে গিয়ে উঠবো বলে। হাতের বামে বাঁশের মাচায় লাউ-ঝিঙে ফলে আছে। বেলা আছে এখনও খানিকটা। গ্রামের প্রান্তে প্রথম বাড়িটার সামনে পৌঁছে কী মনে করে পিছন ফিরে তাকালাম—হয়তো মনে হয়েছিল অনেকদিন, কিংবা কোনওদিনই আর এখানে এমন করে আসা হবে না। ঘাটের টিনের ঘরটা চরের সাদা বালির সাথে এমন করে মিশে আছে যে ওটাকে আমার চোখ খুঁজেই পাচ্ছিল না। ঘরটার সামনে বালির ওপর মানুষগুলো একইভাবে বসে আছে, তাদের কাপড়ের রং বালির পটভূমিতে দূর থেকেও স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। তিস্তা অববাহিকার এই বালি কারও পায়ের ছাপ নিজের বুকে ধরে রাখে না জানি, তবু এই বালিতে অসংখ্য মানুষের সাথে আমিও হেঁটে গেলাম, একথা মনে করে মন জুড়ে এক ঝলক পরিতৃপ্তির হাওয়া খেলে গেল।

আগামী পর্বে সমাপ্ত   

/জেডএস/

সম্পর্কিত

অন্যমনস্কতার ভেতর বয়ে যাওয়া নিঃশব্দ মর্মর

অন্যমনস্কতার ভেতর বয়ে যাওয়া নিঃশব্দ মর্মর

মজিদ মাহমুদের সাক্ষাৎকার

মজিদ মাহমুদের সাক্ষাৎকার

শামসুজ্জামান খান : বাঙালি সংস্কৃতির অতন্দ্র প্রহরী

শামসুজ্জামান খান : বাঙালি সংস্কৃতির অতন্দ্র প্রহরী

স্মৃতিতে বোশেখী মেলা

স্মৃতিতে বোশেখী মেলা

আমাদের মঙ্গল শোভাযাত্রা

আমাদের মঙ্গল শোভাযাত্রা

বসন্তের লঘু হাওয়া

বসন্তের লঘু হাওয়া

বইমেলায় নভেরা হোসেনের ‘অন্তর্গত করবী’

বইমেলায় নভেরা হোসেনের ‘অন্তর্গত করবী’

অমিয় চক্রবর্তীর কবিতা : বিষয়বিন্যাস

অমিয় চক্রবর্তীর কবিতা : বিষয়বিন্যাস

সর্বশেষ

অন্যমনস্কতার ভেতর বয়ে যাওয়া নিঃশব্দ মর্মর

অন্যমনস্কতার ভেতর বয়ে যাওয়া নিঃশব্দ মর্মর

মজিদ মাহমুদের সাক্ষাৎকার

মজিদ মাহমুদের সাক্ষাৎকার

শামসুজ্জামান খান : বাঙালি সংস্কৃতির অতন্দ্র প্রহরী

শামসুজ্জামান খান : বাঙালি সংস্কৃতির অতন্দ্র প্রহরী

স্মৃতিতে বোশেখী মেলা

স্মৃতিতে বোশেখী মেলা

আমাদের মঙ্গল শোভাযাত্রা

আমাদের মঙ্গল শোভাযাত্রা

বসন্তের লঘু হাওয়া

বসন্তের লঘু হাওয়া

বইমেলায় নভেরা হোসেনের ‘অন্তর্গত করবী’

বইমেলায় নভেরা হোসেনের ‘অন্তর্গত করবী’

অমিয় চক্রবর্তীর কবিতা : বিষয়বিন্যাস

অমিয় চক্রবর্তীর কবিতা : বিষয়বিন্যাস

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ

Bangla Tribune is one of the most revered online newspapers in Bangladesh, due to its reputation of neutral coverage and incisive analysis.
© 2021 Bangla Tribune