X
বৃহস্পতিবার, ২৯ জুলাই ২০২১, ১৪ শ্রাবণ ১৪২৮

সেকশনস

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

প্রগতির পথিক

আপডেট : ২৩ জুন ২০২১, ১১:৪৭

[অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর ৮৫তম জন্মদিন আজ। তিনি ১৯৩৬ সালের ২৩ জুন ঢাকার বিক্রমপুর উপজেলার বাড়ৈখালীতে জন্মগ্রহণ করেন। বাকস্বাধীনতা, মানবাধিকার, পরিবেশ সুরক্ষা, দুর্নীতি প্রতিরোধসহ সামাজিক ন্যায়বিচারবিষয়ক আন্দোলনের পুরোধা। দীর্ঘকাল তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগে অধ্যাপনা করেছেন। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলা প্রবন্ধসাহিত্য যাদের নিরলস অবদানে সমৃদ্ধ তিনি তাদের অন্যতম। তিনি মার্কসবাদী চিন্তা-চেতনায় উদ্বুদ্ধ, প্রগতিশীল ও মুক্তমনা। ‘নতুন দিগন্ত’ পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক।]

শিক্ষার যেমন শেষ নেই, একজন প্রকৃত শিক্ষকও কখনো অবসরে যান না। জীবনকে অতিক্রম করে তিনি হয়ে ওঠেন অনুসরণীয় ও দৃষ্টান্ত। তেমনি একজন আমাদের সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী স্যার।

এ ধরনের প্রাগ্রসর মানুষের কোনো নাম হয় না। এক সময় তাঁর নাম তাঁর চেয়ে দুর্বল হয়ে পড়ে। চেতনাশৈলীর মধ্যদিয়ে সামাজিক দায়বদ্ধ এসব আলোকিত মানুষেরা নামের চেয়ে অনেক উপরে বাস করেন। তিনি হন স্যার, পিতা—এমন অবলম্বন, আশ্রয়ের একটি প্রতিষ্ঠান। ছাত্র নয় যে, তিনি তারও স্যার। এমন অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত যারা হন সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী স্যার তাদের একজন। একইসঙ্গে তিনি অনেক, ভিন্নধারার মানুষের প্রতিকৃতি। ছাত্র-অছাত্র, পরিচিত-অপরিচিতজন সবার তিনি স্যার। সবার স্যার হওয়ার যোগ্যতা তিনি অর্জন করেছেন নিজ গুণে। একদা প্রমথ চৌধুরী বলেছিলেন, 'শুধু মুখের কথাই জীবন্ত। যত দূর পারা যায়, যে ভাষায় কথা কই সে ভাষায় লিখতে পারলেই লেখা প্রাণ পায়। আমাদের প্রধান চেষ্টার বিষয় হওয়া উচিত কথায় ও লেখায় ঐক্য রক্ষা করা, ঐক্য নষ্ট করা নয়। ভাষা মানুষের মুখ হতে কলমের মুখে আসে, কলমের মুখ হতে মানুষের মুখে নয়। উল্টোটা চেষ্টা করতে গেলে মুখে শুধু কালি পড়ে।' (কথার কথা : প্রবন্ধ সংগ্রহ)। একথা স্যারের নিজের জন্যই পুরোপুরি প্রযোজ্য। এই বাঙালি মনীষী একাধারে শিক্ষাবিদ, লেখক, প্রাবন্ধিক, পরিবেশ সুরক্ষা এবং সামাজিক ন্যায়বিচারবিষয়ক আন্দোলনের পুরোধা ব্যক্তিত্ব।

দীর্ঘকাল তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যে অধ্যাপনা করেছেন। কিন্তু তাঁর জানা-শোনার বৃত্ত শুধু ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি তারও অধিক বিস্তৃত। তাঁর সমাজ বিশ্লেষণ সবার চেয়ে আলাদা। সবাইকে আপন করে নেয়ার শক্তি তাঁর এতটাই প্রবল যে, তাঁর স্নেহ-ভালোবাসার সান্নিধ্য পেতে অসংখ্যজন ব্যাকুল। সবচেয়ে অবাক করা দিক—একবার স্যারকে একটা সমস্যার কথা বললে তিনি সহজে তা ভোলেন না। পরিচয়ের পর স্যার কারো নাম ভুলে যান এমন ঘটনা আমার জানা নেই। দেশের কোনো আন্দোলন-গণসংগ্রাম থেকে স্যার নিজেকে কখনো দূরে রাখেননি। সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে তিনি কখনো সামান্য দূরেও সরে যাননি বা জেগে থেকে ঘুমাননি। এভাবেই তিনি নিজের মধ্যে একটি বিপ্লব করে একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছেন। স্যারের লেখা বই ‘আপনজনের মুখ’ কখনো একবারে পড়তে পারিনি। একটা লেখা কত শক্তিশালী হতে পারে তা তাঁর লেখা পড়ে সহজেই বোঝা যায়। ‘বাঙালির জাতীয়তাবাদ’, শরৎচন্দ্র ও সামন্তবাদ (১৯৭৫), আমার পিতার মুখ (১৯৭৬), বঙ্কিমচন্দ্রের জমিদার ও কৃষক (১৯৭৬), বেকনের মৌমাছিরা (১৯৭৮), ‘বাঙালিকে কে বাঁচাবে?’, ‘কুমুর বন্ধন’ (১৯৭৭), শ্রেণী সময় ও সাহিত্য (১৯৯০) এসব বইয়ের মধ্যে তথ্য, উপাত্ত আর সঞ্চয় করে রাখার মতো সম্পদ রয়েছে অজস্র।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর লেখায় মূল যে বক্তব্য তা হলো সমাজে শ্রেণিবৈষম্য থাকলে কায়েমি স্বার্থ থাকবেই। তাতে বাঙালি জাতীয়তাবাদ দিয়ে কোনো লাভ হবে না। দুই বাঙালির লাহোর যাত্রা সম্পর্কেও তাঁর যে বিশ্লেষণ তা যুক্তির আদলে গড়া। রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, রামমোহন, বিদ্যাসাগর, শিবরাম চক্রবর্তী ও আরজ আলী মাতুব্বর সম্পর্কে তাঁর বিশ্লেষণ খুবই উঁচু ও সাহিত্যরসে পরিপূর্ণ। প্রবন্ধ-সাহিত্যকে জনপ্রিয় করার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। সহজ ভাষায় ছোট ছোট পদবিন্যাসে তাঁর লেখা খুবই ছন্দময়। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী সম্বন্ধে বিশিষ্ট বাম রাজনীতিক ও তাত্ত্বিক হায়দার আকবর খান রনো একটি বিশ্লেষণাত্মক লেখা লিখেছিলেন ‘আমাদের বুধবার’ নামের একটা অনলাইন পত্রিকায় (২৪ জুন, ১৯১৪) অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : একজন বিপ্লবী বুদ্ধিজীবীর নাম—শিরোনামের এই লেখায় সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর জীবনের মননশীলতার যে বহুমাত্রিকতা এবং মার্কসবাদী লেখক ও বিপ্লবী বুদ্ধিজীবী হিসেবে সমাজ পরিবর্তনের লড়াইয়ে তাঁর মননশীল সংগ্রামকে তুলে ধরা হয়েছে। তিনি লিখেছেন—১৯৭৪ সালে বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত ‘দ্বিতীয় ভুবন’ সাহিত্যবিষয়ক কয়েকটি অসাধারণ প্রবন্ধের সংকলন। অসাধারণ পাণ্ডিত্যপূর্ণ আলোচনা। এরিস্টটল, শেক্সপিয়র, টলস্টয়, ইয়েটস, বার্ট্রান্ড রাসেল, এলিয়ট, ফ্রানৎজ ফানন প্রভৃতি বিশ্ব ইতিহাস ও সাহিত্যের দিকপালের পাশাপাশি আছেন বাংলা ভাষার কবি সাহিত্যিকদের অনেকেই—রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, মীর মশাররফ হোসেন, কাজী আবদুল ওদুদ, জীবনানন্দ, সুকান্ত প্রমুখ। এই সংকলনের নামটি কেনো ‘দ্বিতীয় ভুবন’? এই নামকরণের মধ্যদিয়ে লেখকের দৃষ্টিভঙ্গি ফুটে ওঠে। তিনি মনে করেন, সাহিত্য জীবন বিচ্ছিন্ন নয়। জীবনকে কেন্দ্র করে প্রথম যে ভুবন, তারই ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে সাহিত্যের উপরিকাঠামো, যাকে অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলছেন দ্বিতীয় ভুবন।

এ কথা ঠিক যে সাহিত্য সংস্কৃতির ভিত্তিকে প্রভাবিত করে। সেটাকে অস্বীকার করা হবে একপেশে ও ভ্রান্ত দৃষ্টিভঙ্গি। এমনকি স্বয়ং ফ্রেডারিখ এঙ্গেলস ঐতিহাসিক বস্তুবাদ প্রসঙ্গে এমন একপেশে ভ্রান্ত দৃষ্টিভঙ্গির সমালোচনা করেছিলেন। যাই হোক, সেই প্রসঙ্গ এখনকার আলোচ্য বিষয় নয়। আমি যেটা দেখাতে চাই তা হলো, অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী আধিবিদ্যকের মতো সাহিত্য-সংস্কৃতিকে সমাজ এবং সমাজের শ্রেণিদ্বন্দ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন করে কখনই বিচার করেননি। Art for art’s sake যারা বলেন, তাদেরও তিনি বিপরীত শিবিরে অবস্থান করেন। সেই জন্য তিনি সাহিত্যের সামাজিক উৎসভূমি সন্ধান করেন। শ্রেণি বিশ্লেষণের মাইক্রোসকোপের তলায় ফেলে সাহিত্য সংস্কৃতিকে বিচার করেন। তাঁর একটি বইয়ের নাম ‘উনিশ শতকের বাংলা গদ্যের সামাজিক ব্যাকরণ’। নামটির মধ্যেই ভিন্নতার সুর আছে, লেখকের দৃষ্টিভঙ্গির বিশিষ্টতাও তাতে ধরা পড়ে। এটা হলো মার্কসবাদী দৃষ্টিভঙ্গি।

লক্ষণীয় বিষয় হলো এই যে, কিছু কিছু তাত্ত্বিকের মতো তিনি এইভাবে শুরু করেন না—‘মার্কস ইহা বলিয়াছেন, অতএব ইহা সত্য’। সেটা হলো মুখস্থ বিদ্যা, মার্কসবাদের যথাযথ প্রয়োগ নয়। অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী মার্কসবাদের মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গিকে ভিত্তি করে বিশেষ সময় ও যুগের সাহিত্য ও সাহিত্যিকের সঙ্গে সমাজের ও শ্রেণির সম্পর্ক নির্ণয় করেছেন। উনবিংশ শতাব্দীতে বাংলা গদ্য সাহিত্যের সূচনা, বিদ্যাসাগর থেকে যার যাত্রারম্ভ (রাজা রামমোহন রায় গদ্য লিখলেও ওটাকে ঠিক গদ্য সাহিত্য বলা যায় না) এবং উনিশ শতকের শেষভাগে রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত যার বিস্তার, সেই গদ্য সাহিত্য যে সমাজ বিকাশের সঙ্গে সম্পর্কিত তা চোখে আঙুল দিয়ে প্রথম দেখিয়েছেন একজনই। তিনি হচ্ছেন সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। এটি একটি মহান আবিষ্কারও বলা যেতে পারে।

উনিশ শতকের সাহিত্য এবং সমাজ-সংস্কৃতি নিয়ে অনেক গবেষণামূলক রচনা ছিল। কিন্তু এইভাবে গদ্যের সামাজিক ব্যাকরণ আর কেউ তুলে ধরেছেন বলে আমার মনে হয় না। এর জন্য যে বৈজ্ঞানিক, দ্বান্দ্বিক দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং একইসঙ্গে অসাধারণ মেধা লাগে তা অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর ছিল এবং আছে। মেধার জন্য আমরা অবাক হয়ে তাঁর প্রশংসা করি। আর দৃষ্টিভঙ্গির জন্য আমরা অন্তর থেকে শ্রদ্ধা জানাই। ওই যে আরও ‘বড় কিছু’র কথা বলেছিলাম সেটা হলো এই দৃষ্টিভঙ্গি। সমাজ ও সাহিত্য বিশ্লেষণে শ্রেণি দৃষ্টিভঙ্গি।

তিনি যে সাহিত্য সমালোচনা করেছেন সেখানে তিনি শ্রেণিগতভাবে নিরপেক্ষ থাকেননি। বস্তুত কেউই শ্রেণিগতভাবে নিরপেক্ষ থাকতে পারেন না। তবে অনেকে নিরপেক্ষতার ভান করেন, অথবা নিজের শ্রেণি অবস্থান সম্পর্কেও অজ্ঞ থাকেন। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী সজ্ঞানে এবং সোচ্চারে শ্রেণি অবস্থান নিয়েছেন। সেটা শ্রমিক শ্রেণির পক্ষে, পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে। আরও স্পষ্ট করে বললে, সরাসরি সমাজতন্ত্রের পক্ষে। তাঁর তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে মহান সাহিত্যিকদের শ্রেণি অবস্থান ধরা পড়েছে। মহান ব্যক্তি ও সাহিত্যিকদের ইতিবাচক ও মহান অবদানকে তিনি তুচ্ছ করেননি। কিন্তু বুর্জোয়া ও পেটি-বুর্জোয়া দুর্বলতাকে নির্মমভাবে প্রকাশ করতেও দ্বিধান্বিত হননি। কারণ, প্রকৃত শিক্ষকের মতোই তিনি আগামী প্রজন্মকে শ্রেণি শিক্ষায় শিক্ষিত করতে চেয়েছেন। ইংরেজির জ্ঞানী শিক্ষকের চেয়ে এই শিক্ষক কিন্তু অনেক বড়, অনেক মহান এবং ব্যতিক্রমী।

 

দুই.

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর পাণ্ডিত্যের বিশেষ অর্জন হলো, তিনি ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যেও শিক্ষক হয়েও একমুখীনতায় আবিষ্ট নয়। শেকসপিয়ারের নারীরা যেমন তাঁর লেখার উপজীব্য, যেমন তিনি লিখেন, দুই বাঙালির লাহোরযাত্রা তেমনি লিখেছেন রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য নিয়ে। বিশেষত ‘যোগাযোগ’ উপন্যাসকে নতুন দৃষ্টিতে দেখেছেন সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। বইটির নাম ‘কুমুর বন্ধন’। এই কুমু হলো ‘যোগাযোগ’  উপন্যাসের নায়িকা কুমুদিনী। এই উপন্যাসে রবীন্দ্রনাথ সামন্ত চিন্তার বিরোধী প্রগতিশীল দৃষ্টিভঙ্গি এনেছেন।

মেয়েদের দাসীর হাটে বিক্রি হওয়া যে ‘হাটে মাছ-মাংসের দরে মেয়ে বিক্রি হয়’—এমন কথা বলার মধ্যদিয়ে রবীন্দ্রনাথ সামন্ত সমাজব্যবস্থার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছেন। তাঁর কুমুই অনেক সীমাবদ্ধতা নিয়েও বিদ্রোহ করেছে, যে মনে করে, বৈবাহিক সম্পর্ক থাকলেও মনের মিল না থাকলে দৈহিক সম্পর্ক অসুচিতার পর্যায়ে পড়ে। রবীন্দ্রনাথের কুমু মনে করে ‘জীবনে অনেক আসে যায়, তবু কিছু বাকি থাকে’। সেটা হলো আত্মমর্যাদাবোধ ও ব্যক্তিত্ব। নারীত্বের ও সতীত্বের নতুন ব্যাখ্যা এনেছেন রবীন্দ্রনাথ। এই সকল ইতিবাচক দিককে (যা আমার বিবেচনায় বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ) ছোট করে না দেখেও সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী শ্রেণির জায়গাটা তীক্ষ্ণভাবে তুলে ধরেছেন। তিনি উপন্যাসটি সম্পর্কে সঠিকভাবেই বলেছেন, ‘রবীন্দ্রনাথ মুৎসুদ্দি পুঁজির বর্বরতা দেখাচ্ছেন, কিন্তু সামন্ত শক্তির বর্বরতা দেখাচ্ছেন না। কারণ তিনি অসাধারণ হয়েও এক জায়গায় সাধারণ—সে তার শ্রেণী চরিত্র।’ মধুসূদন মুৎসুদ্দি এবং বিপ্রদাস ক্ষয়িষ্ণু সামন্ত প্রতিনিধি। গোটা উপন্যাসজুড়ে দুজনের মধ্যে দ্বন্দ্ব। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলছেন : ‘দ্বন্দ্ব বুঝি ষড়যন্ত্র—এই বিশেষ ক্ষেত্রে। প্রজারা ও শ্রমজীবীরা কিন্তু নীরব, তারা যে আদৌ আসে না এই সমস্ত উপন্যাসে তাতে বোঝা যায় এ সমস্তের মধ্যে মহাকাব্যিকতা নেই, এদের সামাজিকতাটা খর্বিত, শ্রেণি বিভাজন দ্বারা পরিবেষ্টিত। দ্বন্দ্ব যে ষড়যন্ত্র সেটা আরো স্পষ্ট হতো যদি ওই দুই শক্তিকে স্থাপন করা যেত সাধারণ মানুষের সঙ্গে তাদের যে সম্পর্ক তারই পটভূমিতে। দেখা যেত অভিন্ন তারা শ্রমশোষণে।’

আরও অনেক বই ও প্রবন্ধ থেকে অনেক উদাহরণ দেওয়া যায়, যেখানে পরিষ্কার হয়ে উঠেছে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী শ্রেণি দৃষ্টিভঙ্গি।

শ্রেণি দৃষ্টিভঙ্গি মানে ‘শ্রেণি শ্রেণি’ বলে চিৎকার করাও নয়, অথবা তত্ত্বকথা আওড়ানোও নয়। যে কোন রচনা, যা যতোই বিপ্লবী অথবা শ্রমিকশ্রেণির পক্ষের হোক না কেন, তাকে হৃদয়গ্রাহী রূপে পরিবেশন করতে হবে। আমরা দেখেছি শ্রমিক শ্রেণির বিপ্লবী মতবাদের প্রতিষ্ঠাতা ও দার্শনিক কার্ল মার্কসের ভাষাও ছিল অসাধারণ সাহিত্যগুণে সমৃদ্ধ। মাও সে-তুঙ এক বক্তৃতায় (ইউনানে শিল্প-সংস্কৃতি সম্পর্কিত বক্তৃতা, ১৯৪২ সাল) বলেছেন, সাহিত্যকে স্লোগান ও পোস্টারের স্তরে নামিয়ে আনলে চলবে না।’

অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর প্রতিটি রচনা অসাধারণ সাহিত্যগুণে সমৃদ্ধ। তাঁর ভাষায় কী যেন একটা মাধুর্য আছে যা পাঠককে আকর্ষণ করে। খুব সরল শব্দ প্রয়োগের মধ্যদিয়ে কাব্যরসে সমৃদ্ধ গদ্য রচনায় তাঁর বিশেষ দক্ষতা আছে। তাঁর মধ্যে জটিল তত্ত্বও আছে। তত্ত্বের নির্দিষ্ট উদাহরণ আছে। কখনো কখনো তীর্যক মন্তব্য বা ব্যাঙাত্মক ভাষা আছে। বেশকিছু রচনায় তিনি Dialectical approach রাখতে পেরেছেন শব্দচয়ন ও বাক্য রচনার অসামান্য পারদর্শিতার সাথে। একটা ছোট উদাহরণ দেই। আমাদের পরিচিত ‘কুমুর বন্ধন’ থেকেই দেওয়া যাক :

‘কুমুর বন্ধন একটি সামাজিক দলিল। এবং সেই সঙ্গে একটি নীরব চিৎকার। আর্তচিৎকার। সেই সমাজব্যবস্থার বিরুদ্ধে যা দুর্বলকে কেবলি পীড়ন করে। কুমু পীড়িত হয় নারী বলে নয়, দুর্বল বলেই। নিপীড়নভিত্তিক সমাজব্যবস্থা দুর্বলকে পেলেই সবল হয়, কেননা প্রবলের কাছে সে দুর্বল।’

মনে হয় যেন সাহিত্য সমালোচনা করতে গিয়ে লেখক নিজেই সাহিত্য রচনা করেছেন। তাঁর রচনায় অজস্র ব্যাঙ্গাত্মক ভাষার সন্ধান পাব, যার মধ্যদিয়ে কঠিন সত্য স্বচ্ছ হয়ে পরিস্ফুট হয়। সেই রকম ব্যাঙ্গাত্মক রচনায় একটি দুটি দৃষ্টান্ত তুলে ধরা যাক। এবার উদাহরণ টানব আমাদের পরিচিত বই ‘উনিশ শতকের বাংলা গদ্যের সামাজিক ব্যাকরণ’ থেকে। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের কুফল জেনেও বঙ্কিম তার পক্ষে মতামত প্রকাশ করেছেন। বঙ্কিমের কয়েকটি বাক্য উদ্ধৃত করে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলছেন, ‘স্বদেশী কৃষকের প্রাণ রক্ষার চেয়ে বেশি জরুরি বিদেশি ইংরেজের মান রক্ষা করা’। কী তীক্ষ্ণ তীর্যক, ব্যাঙ্গাত্মক মন্তব্য।

একই বইয়ে আরেক জায়গায় তিনি প্যারীচাদ মিত্র আর মাইকেল মধুসূদনের দুইটি গদ্য রচনার মধ্যে তুলনামূলক আলোচনা করতে গিয়ে সমালোচক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী লিখেছেন, ‘কিন্তু দুটি রচনার ভেতর প্রাথমিক ব্যবধানটুকুও উপেক্ষণীয় নয়। প্যারীচাদ চিন্তিত ‘জাত’ নিয়ে, ওদিকে মাইকেলের যেহেতু ‘জাত’ নেই, বিজাতীয় তিনি, তাই তার উদ্বেগ ‘জাত’ নয়, সভ্যতা নিয়ে। একজনের মুখ যদি হয় সামন্তবাদের দিকে, তবে অন্যজনের মুখ পুঁজিবাদমুখো।’

কী চমৎকার অভিব্যক্তি। শব্দের কী চমৎকার খেলা। আবার তত্ত্বের গভীরতাও কম নয়। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী সাহিত্য সমালোচনামূলক বই ও প্রবন্ধ অনেক লিখেছেন। সেগুলো কেবল সমালোচনা নয়, নিজেই হয়ে উঠেছে উচ্চস্তরের সাহিত্য। তেমনই সমাজ ও রাজনীতিসংক্রান্ত অসংখ্য রচনা প্রায় প্রত্যেকটিই উৎকৃষ্ট সাহিত্যের মর্যাদা পেতে পারে।

তিনি সবসময় দেশের সামাজিক, রাজনৈতিক আন্দোলনের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন। ওসমানী উদ্যানে গাছ কেটে ফেলার সর্বনাশী উদ্যোগ যখন নিয়েছিল সরকার, তখন তিনি তাঁর ছাত্র ও বাম সংগঠনসমূহকে সঙ্গে নিয়ে এর বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলেন। এটিকে কেবল পেটি-বুর্জোয়া আন্দোলন বলে তুচ্ছ করা যায় না। কারণ, যে রিকশাচালক, মুটে-মজুর, ফেরিওয়ালা, ঠেলাগাড়িওয়ালা প্রমুখ কড়ারৌদ্রে পরিশ্রম করেন, তাদের ঢাকা শহরে সামান্য জায়গাও নেই বিশ্রাম নেবার। অথচ বিশ্রামটা তার জন্য জরুরি। গাছ দেয় সেই বিশ্রামের জায়গা। ধনীর সরকার গাছ কেটে ফেলার সিদ্ধান্ত নিলে অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী যে আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তার গুরুত্ব যথেষ্ট ছিল।

একইভাবে তিনি আড়িয়াল বিলের কৃষকের জমি কেড়ে নিয়ে অপ্রয়োজনীয়ভাবে বিমানবন্দর করার সরকার যে অপচেষ্টা চালিয়েছিল, তার বিরুদ্ধেও তিনি আন্দোলন গড়ে তোলেন। সরকার তাঁর বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানিও করতে চেয়েছিল।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী কখনো সরাসরি কোনো রাজনৈতিক দল করেননি। কিন্তু সমাজতন্ত্র অভিমুখী বামধারার সঙ্গে তিনি ঘনিষ্ঠভাবে থেকেছেন। তরুণ প্রজন্মকে উদ্দীপ্ত করেছেন, তাঁর বক্তব্য ও উপস্থিতি দ্বারা। তিনি হচ্ছেন সচেতন মাকর্সবাদী বিজ্ঞানে আস্থাশীল সত্যিকার অর্থে বিপ্লবী বুদ্ধিজীবী। যে ধরনের মানুষের আমাদের দেশে বড় অভাব। অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী সেই শূন্যতার মাঝে উজ্জ্বল জ্যোতিষ্কের মতো জ্বলজ্বল করে জ্বলছেন।

নিজেই শুধু লিখছেন না, প্রগতির ধারায় মতাদর্শিক সংগ্রামকে জোরদার করার জন্য পত্রিকা প্রকাশ করে চলেছেন। ‘নতুন দিগন্ত’ পত্রিকাটির তিনিই প্রাণপুরুষ। পত্রিকার সাংগঠনিক কাজটিও তাঁর নেতৃত্বেই পরিচালিত হয়।

আশির দশকে তাঁর লেখা কলাম ‘গাছপাথর’ ও সন্তোষ গুপ্তের ছদ্মনামে অনিরুদ্ধের কলাম আমাদের দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে। তাঁর সম্পাদিত পত্রিকা পরিক্রমা, সাহিত্যপত্র, সচিত্র সময়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পত্রিকা, ঢাকা ইউনিভার্সিটি স্টাডিস উল্লেখযোগ্য। তাঁর কাছে আমরা তাঁর জন্যই চিরঋণী। ৮৫তম জন্মদিনে স্যারকে জানাই গভীর শ্রদ্ধা। পুনর্মুদ্রণ

/জেডএস/

সম্পর্কিত

মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’

মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা

কথা হয় জানি না 

কথা হয় জানি না 

আলোকিত মানুষের স্বপ্নদ্রষ্টা

আলোকিত মানুষের স্বপ্নদ্রষ্টা

মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’

আপডেট : ২৮ জুলাই ২০২১, ১২:৫১

মহাশ্বেতা দেবী (১৯২৬-২০১৬) লেখক পরিবার থেকেই এসেছিলেন। পিতৃমাতৃ—দুকূলই লেখক ছিলেন। এমনকি শ্বশুরকূলও। পুরুষানুক্রমেই এঁরা লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। মহাশ্বেতা দেবীর জীবনটা সাহিত্যের কাছেই সঁপে দিয়েছিলেন। লিখেছিলেন দুহাত খুলে। ‘হাজার চুরাশির মা’ (১৯৭৪) তার অন্যতম আলোচিত উপন্যাস। গ্রন্থখানির পাঠপরিক্রমায় কিছুটা সাবধানী মনে এগুতে হয়। মাঝেমধ্যেই নিত্যনতুন চরিত্রের দেখাসাক্ষাৎ ঘটে। সিংহভাগ চরিত্রই দিব্যনাথ-সুজাতা পরিবারের। উপন্যাসখানি বুঝে নিতে চাইলে এদের মধ্যকার পারষ্পারিক সম্পর্ক স্মরণে রাখা খুবই জরুরি। পরিবারটি অনেকটা উনিশ শতকের ক্লাব-কালচারের ন্যায় সামন্তধারায় গড়ে ওঠে। ভোগবাদী প্রবৃত্তি এদের মধ্যে তীব্রতর। দিব্যনাথের নিজস্ব ‘চার্টার্ড অ্যাকাউনটেনসির আফিস।’ প্রতিনিয়ত মোটা টাকা আসে। জ্যোতি, নীপা অথবা তুলির স্বামীরাও কর্পোরেট কর্পোরেশনে হাই সেলারির জব করে। সবাই ভোগবিলাসে মত্ত। এদের চারিত্রিক স্খলনও কম নয়। অফিসের টাইপিস্ট মেয়েকে নিয়ে দিব্যনাথের ঢলাঢলি, মাঝেমধ্যেই রক্ষিতা নিয়ে বাইরে সান্ধ্য কাটানো। ঢেকেঢুকে নয়, প্রকাশ্য দিবালোকে সর্বসম্মুখে সহাস্যে এসব ফষ্টিনষ্টি করে বেড়ায়। এসব সে পৌরুষ-অধিকার বলেই জানত। কেবল বর্তমান নয়, চিরকালই দিব্যনাথ নারী নিয়ে নোংরামি করে আসছে। শাশুড়িও কম প্রশ্রয় দেয়নি। ছেলে তার ‘পুরুষ বাচ্চা’, স্ত্রৈণ নয় বলে অহংকারও করত। দিব্যনাথের পিতাও নাকি যৌবনকালে এমনই ছিল। প্রায়শই সন্ধ্যাবেলা নারী নিয়ে বাইরে কাটাত। পরপর দুই পুরুষের নৈতিক অধঃপতন তৃতীয় পুরুষ জ্যোতি অথবা নিপাদের কাছেও সমভাবেই সমর্থন পায়। সামন্ত প্রভুর ন্যায় দিব্যনাথ নিজেকে পরিবারের ‘বস’ বলে বিবেচনা করত। সন্তানেরা অনেকেই ইনিয়েবিনিয়ে প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষভাবে বাবাকে ‘বস’ বলেই সম্বোধন করত। এমনকি কনিষ্ঠ সন্তান ব্রতীও। তবে এই সন্তানের মেজাজটা ছিল খানিকটা ভিন্ন ধার ও ধারার।

২.
অর্থবিত্তে স্বচ্ছল হলেও পরনারীতে অভ্যস্থ হওয়ায় দিব্যনাথ-সুজাতার দাম্পত্য-সম্পর্ক সুখের ছিল না। দিব্যনাথ সুজাতাকে স্ত্রীর মর্যাদা দিতো না। বরং যৌন পার্টনার হিসেবেই বিবেচনা করত। অসুখবিসুখ হলে খোঁজখবর নিত না। নবজাতকের কান্না থেকে বাঁচার জন্য তেতলায় ঘুমাত। প্রসূতি স্ত্রী থেকে দূরে অবস্থান করত। শাশুড়িমাও ছিল নারীবিদ্বেষী মহিলা। সুজাতার সন্তান জন্মদান সইতে পারত না। প্রসবকাল দেখলেই বাড়ি ছেড়ে চলে যেত। তীব্র প্রসবযন্ত্রণা নিয়ে সুজাতাকে একা একাই নার্সিং হোমে যেতে হতো। দিব্যনাথের নজর কেবল একদিকে—‘আবার মা হবার যোগ্য শরীর হচ্ছে কি না সুজাতার।’ দুবছর পরপর সুজাতার চার সন্তান জন্মে। জ্যোতি, নীপা, তুলি। সর্বশেষ ব্রতী। প্রথম ও শেষে পুত্রসন্তান, মাঝখানে দুটি কন্যাসন্তান। ব্রতীর দুবছর বয়সকালে সুজাতা লম্পট দিব্যনাথের বিরুদ্ধে প্রথম বিদ্রোহ করেছিল। লেখকের ভাষায়—দিব্যনাথ কিছুতেই ওঁকে পঞ্চমবার ‘মা’ হতে বাধ্য করতে পারেনি। দিব্যনাথ সুজাতাকে ফার্মের কাজ ছেড়ে দিতে বলেছিল। সুজাতা মানেনি। ‘কাজ না-ছাড়া সুজাতার দ্বিতীয় বিদ্রোহ।’ 
বাবামায়ের মধ্যকার এই টানাপড়েন ব্রতী খানিকটা বুঝতে পারত। বুঝতে পারত মাতৃবক্ষের সুগভীরে লুকানো তীব্র গোপন ব্যথা। ব্রতীর মনটা কম্পাসের কাটার ন্যায় মমতাময়ী মাতা জগজ্জননী সুজাতার দিকে হেলে থাকত। ব্রতী সর্বদা মায়ের ওপর চোখদুটো সুস্থির রাখত। দশ বছর বয়সেও খেলাধুলা ফেলে বাড়ি চলে আসত। শিয়রে বসে মায়ের মাথায় বাতাস করত। এজন্য দিব্যনাথ ব্রতীকে সইতে পারত না। কনিষ্ঠ সন্তান হলেও শত্রু বিবেচনা করত। ব্রতীকে টিপ্পনি কেটে দিব্যনাথ কখনো বলত ‘মাদার্স চাইল্ড’ কখনো বলত ‘মেয়েমার্কা ছেলে। নো ম্যানলিনেস।’                 
মতাদর্শিক দ্বন্দ্বে এই পুঁজিবাদী পরিবারের চরিত্রগুলো দুভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। একদিকে পারিবারিক ‘বস’ দিব্যনাথ ও জ্যেষ্ঠ তিন সন্তান জ্যোতি, নীপা, তুলি। সেইসঙ্গে এদের পূর্বপ্রজন্ম ঠাকুরমাও। অপরদিকে সুজাতা ও তার কনিষ্ঠ সন্তান ব্রতী। এই দ্বন্দ্ব কেবল একটি পরিবারের নয়, এটি সমসাময়িক সমাজ অথবা রাষ্ট্রের দ্বন্দ্ব। এমনকি বৈশ্বিকও। বিশ্বজগৎ সংসার তখন ধনতান্ত্রিক ও সমাজতান্ত্রিক দুধারায় দ্বিধাবিভক্ত। দ্বন্দ্বটা এতই জটিল ছিল যে, ভাই-বোন, পিতা-পুত্র, স্বামী-স্ত্রীর সমুদয় সামাজিক ও আত্মিক বন্ধন শিথিল হয়ে যায়। এমনকি রক্তের বন্ধনও।
 
৩.
দিব্যনাথপুত্র ব্রতী পিতার পুঁজিবাদী আদর্শে আস্থা হারিয়েছিল। আস্থা হারিয়েছিল সমসাময়িক সমাজ ব্যবস্থাপনায়। আস্থা হারিয়েছিল মুনাফাখোর ব্যবসায়ী ও স্বার্থান্ধ নেতাদের ওপর। পুঁজিবাদী জীবনব্যবস্থার পরিবর্তে সমাজতান্ত্রিক জীবনব্যবস্থার স্বপ্ন লালন করত। সমতাভিত্তিক একটি সুন্দর সুষম সমাজ বিনির্মাণের লক্ষে হৃদয় তার জেগে উঠেছিল। লেখকের ভাষায়, তখন সত্তর দশক। মুক্তির কাল। মুক্তির দশকে জনমুক্তির আন্দোলনে অনেকটা সংগোপনেই সংযুক্ত হয়েছিল ব্রতীরা। তখন সাম্রাজ্যবাদী শোষক সরকার ক্ষমতায়। জেলের পাঁচিল উঁচু করে। নতুন নতুন ওয়াচ টাওয়ার বসায়। বন্দিদের জন্য ফটকঅবন্দি খোলে না। সুগভীর রাতে ভ্যানভর্তি বন্দি এলে লেখকের ভাষায়—‘ওপর থেকে ক্রেন নামে। জন্তুর মত বন্দীকে যন্ত্রের নখে আঁকড়ে ক্রেন উঠে যায়, জেলের ভেতর নামিয়ে দেয়।’ জন্তুর মতো হলেও যারা জেলে যায়, তারা অন্তত প্রাণে বেঁচে যায়। কিন্তু বাইরের ব্রতীরা নিদারুণভাবে প্রাণটা হারায়। রাষ্ট্রযন্ত্র নানা উপায়ে নির্মম নির্যাতন অব্যাহত রাখে। নির্জন সলিটারি সেলে নির্যাতন চালায়। লেখকের ভাষায়—‘সাউন্ডপ্রুফ। দরজা-জানালায় ফেলটমোড়ানো ফাঁপা রবারের নল বসিয়ে সাউন্ডপ্রুফ করা। ঘরের আর্তনাদ, গোঙানি, মারের আওয়াজ, জেরাকারীর গর্জন, সব শব্দ ঐ নলের জন্য ঘরের ভেতরেই বন্দী থাকে।’

৪.
বিজিত, প্রার্থ, লালটু, সমু ব্রতীর বিপ্লবী বন্ধু। এরাও চেয়েছিল স্বসমাজটিকে বদলে দিতে। সহযোদ্ধা বন্ধুদের বাঁচাতেই সেদিন ব্রতী গিয়েছিল সমুদের বাড়িতে। কিন্তু বাঁচাতে পারেননি। নিজেও বাঁচতে পারেনি। গভীর রাতে সমুদের বাড়ি ঘেরাও করে গুন্ডারা। হিংস্র গলায় বলে—‘বের করে দিন, লয়তো ঘরে আগুন দিমু!’ ব্রতীর কণ্ঠ শুনে কেউ একজন বলে ওঠে—‘হালায় আরেক মালটারে জুটাইছে। বাইর হ ঘটির পোলা।’ হাতে হাত রেখে স্লোগান দিতে দিতে ব্রতীরা বেরিয়ে আসে। বাইরে অন্ধকার। ঘুটঘুটে আধার মুখ হাসি-উল্লাসে ফেটে পড়ে। ভয়ংকর গন্ডগোল। ‘বাড়ী বাড়ী আলো নিভে যাচ্ছে, দরজা জানালা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, চমকে সরে যাচ্ছে ভয়চকিম মুখ।’ সহসা স্লোগান থেমে যায়। সমবেত ঘাতকেরা খটখট গুলির শব্দ করতে করতে চলে যায়। সমুর দরিদ্র বাবা থানায় গেলে আততীয়দের নাম শুনে ধমকে ওঠে পুলিশ। পুলিশভ্যান আসতে আসতে সরে যায় ঘাতকেরা। নিতু ওরফে দীপুর মতো ভদ্রছেলেকে তো থানার সামনেই পিটিয়ে হত্যা করে। ‘প্রকৃত খুনি কখনো বন্দুক ধরে না।’ ব্রতী-সমুদের হত্যা-পরিকল্পনাকারীরাও ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। এমনকি প্রত্যক্ষ ঘাতকদেরও বিচার হয় না। বুক ফুলিয়ে এরা নির্বিবাদে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ায়। সমুর দিদিকে দেখে নির্মম ব্যঙ্গ করে, হাহা করে হাসে আর বলে—‘তর ভাইয়ের ছাদ্দ করলি না ক্যান? ভাল কইরা খাইতাম!’ সুজাতার মনে কত প্রশ্ন—যে শহরে এমন সব জঘন্য অপরাধ সংঘটিত হয়, সেখানে পরপর কী করে সংস্কৃতিমেলা, রবীন্দ্রমেলা অনুষ্ঠিত হয়?

৫.
সুজাতা টেলিফোনেই ব্রতী হত্যার খবর পায়। অপর প্রান্ত থেকে ভেসে আসে—‘কাটাপুকুরে আসুন।’ পিতা দিব্যনাথ কাটাপুকুরে না গিয়ে দৌড়ায় পত্রিকা-অফিসে। পুত্রহত্যার খবর ধামাচাপা দিতে দিব্যনাথ ‘দড়ি টানাটানি করে বেড়াচ্ছিলেন।’ সফলও হয়েছিলেন। লেখক বলছেন—‘দিব্যনাথের ছোটাছুটি দড়ি টানাটানি সফল হয়েছিল। পরদিন খবরের কাগজে চারটি ছেলের হত্যার খবর বেরোয়। নাম বেরোয়। ব্রতীর নাম কোন কাগজে ছিল না।’ পত্রিকাপাতা থেকে ব্রতীকে মুছে দিয়েছিল দিব্যনাথ। মুছতে পারেনি মর্গ থেকে। সেখানে  ব্রতীর অবস্থান ‘হাজার চুরাশি’ নম্বরে। সেদিন ব্রতীর মৃত্যু পিতার কাছে কলঙ্কজনক মৃত্যুরূপে বিবেচিত হয়েছিল। মমতাময়ী মা সুজাতা সুস্থির থাকতে পারেননি। ছুটে গিয়েছিলেন কাটাপুকুরের লাশ ঘরে। প্রাণধন পুত্র ব্রতীর মৃত্যু নিয়ে কোথাও একটু সংশয় ছিল। তাই মুখটুকু দেখতে চেয়েছিলেন। অসীম করুণায় ডোম জানিয়েছিল—‘কি আর দেখবেন মাইজী? মুখ কি আর আছে কিছু?’ সীমাহীন মমতায় সুজাতা সবলে ব্রতীর মুখের আবরণ সরিয়ে দেয়। ‘শানিত ও ভারী অস্ত্রের উলটো পিট দিয়ে ঘা মেরে থেঁতলানো, পিষ্ট, ব্রতীর মুখ।’ আঙুল বোলানোর মতো ইঞ্চি পরিমাণ জায়গাও মসৃণ ছিল না। সবই দলিত, মোথিত, থেঁতলানো। তবু সুজাতা ব্রতী! ব্রতী! বলে আঙুল বোলায়। 
ব্রতীদের অপরাধ, ওরা দেয়ালে দেয়ালে বয়ান লিখত। ওরা লাল অক্ষরে লাল শব্দে দেয়াল রঙিন করে তুলত। কেবল মুক্তকণ্ঠে সমবেত স্লোগানই ধারণ করত না, প্রাণভরে বিশ্বাসও করত। দেবীর ভাষায়—‘ব্রতীরা এই এক নতুন জাতের ছেলে। স্লোগান লিখলে বুলেট ছুটে আসে জেনেও ব্রতীরা স্লোগান লেখে। কাটাপুকুর যাবার জন্যে হুড়োহুড়ি লাগিয়ে দেয়।’ ব্রতীরা এতটাই সমাজবিরোধী যে, দিব্যনাথের ন্যায় পিতারা মুখাগ্নিও করতে আসে না। ব্রতীদের লাশ কাটাপুকুরের মর্গে পড়ে থাকে। রাতে পুলিশ গাদাগাদি করে শ্মশানে বয়ে আনে। এরপর আগুন জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দেয়। শ্রাদ্ধে বিশ্বাসীজনও যথানিয়মে শ্রাদ্ধ করার সুযোগটুকুও পায় না। স্ফীত লাল চোখে বসে থাকতে হয় সারাটা দিন।

৬.
নকশাল আন্দোলনকে (১৯৭০) কেন্দ্র করে মহাশ্বেতা দেবী উপন্যাসটির আখ্যানভাগ সাজিয়েছেন। কল্পনার সঙ্গে সমসাময়িক সমাজ বাস্তবতার দরকারি সমন্বয় ঘটয়েছেন। সেই সঙ্গে কলকাতার বুদ্ধিজীবীদের অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। বাংলাদেশের মহান মুক্তির সংগ্রামে (১৯৭১) কলকাতার বুদ্ধিজীবীরা ‘বাংলাদেশের সহায় ও সমর্থনকল্পে পশ্চিমবঙ্গ তোলপাড় করে ফেলেছিল।’ কিন্তু নকশাল আন্দোলনের হত্যাকাণ্ড তাদের কাছে অস্বাভাবিক মনে হয়নি অথবা এরমধ্যে পৈশাচিকতা খুঁজে পাননি। যদি পেতেন, ‘তাহলে ত কলকাতার কবি ও লেখক ওপারের পৈশাচিকতার সঙ্গে এপারের পৈশাচিকতার কথাও বলতেন।’ কিন্তু বলেননি। মূলত প্রান্তজনের বেঁচে থাকার লড়াই, লড়াই শেষে নিদারুণ পরিণতিই তুলে আনতে চেয়েছেন মহাশ্বেতা দেবী। দেবীর গদ্যশেলীতে কিছুটা দুর্বলতা থাকলেও অসীম মমতায় সেটি কাটিয়ে উঠতে পেরেছেন। উপন্যাস হয়ে উঠছে উপভোগ্য সেইসঙ্গে সাব-অলটার্ন হিস্ট্রির দরকারি দালিলিক শিল্পকর্ম। ২৮ জুলাই প্রয়াণদিবসে লেখকের প্রতি অশেষ প্রণতি।  

/জেডএস/

সম্পর্কিত

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা

কথা হয় জানি না 

কথা হয় জানি না 

আলোকিত মানুষের স্বপ্নদ্রষ্টা

আলোকিত মানুষের স্বপ্নদ্রষ্টা

তারাশঙ্কর : স্মরণে বরণে

তারাশঙ্কর : স্মরণে বরণে

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা

আপডেট : ২৮ জুলাই ২০২১, ১৮:৩৬

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা। কাঁটাবনে অবস্থিত প্রকাশনা সংস্থা ‘উজান’ এমন ঘোষণা দিয়েছে তাদের প্রকাশিত ‘কোরিয়ার কবিতা’ ও ‘কোরিয়ার গল্প’ নিয়ে আলোচনার জন্য।
এই বই দুটিতে রয়েছে কোরিয়ার বিশ ও একুশ শতকের উল্লেখযোগ্য কবিদের কবিতা এবং একই সময়ের গুরুত্বপূর্ণ কথাসাহিত্যিকদের ছোটগল্প। 
উজানের এই আয়োজনে সহযোগিতা করছে লিটারেচার ট্রান্সলেশন ইনস্টিটিউট অব কোরিয়া। 
বই আলোচনার সর্বোচ্চ পুরস্কার ২০ হাজার টাকা। এছাড়া দ্বিতীয় পুরস্কার ১৫ হাজার এবং তৃতীয় পুরস্কার ১০ হাজার টাকা। এই প্রতিযোগিতায় নির্বাচিত সর্বোচ্চ ১০ আলোচকের প্রত্যেককে দেওয়া হবে ৫ হাজার টাকা মূল্যমানের বই। 
আলোচনাগুলো বাছাই করবেন দেশের বিশিষ্ট কবি, সাহিত্যিক ও অনুবাদকদের সমন্বয়ে গঠিত বিচারক কমিটি। একজন একটি বই নিয়ে আলোচনা করতে পারবেন। আলোচনা বাংলাভাষায় লিখিত বা ভিডিও মাধ্যমে হতে হবে। 
অংশগ্রহণে ইচ্ছুক অনলাইনে ফরম পূরণ করতে করতে পারবেন এসব লিংকে www.ujaninfo.com, www.porospor.info। ২০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে আলোচনা জমা দিতে হবে [email protected] এ।
বিস্তারিত জানতে এবং বই সংগ্রহ করতে পারবেন www.ujaninfo.com, www.facebook.com/UjanPrakashan, https://www.facebook.com/UjanBooks থেকে।  

/জেডএস/

সম্পর্কিত

মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’

মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’

কথা হয় জানি না 

কথা হয় জানি না 

আলোকিত মানুষের স্বপ্নদ্রষ্টা

আলোকিত মানুষের স্বপ্নদ্রষ্টা

তারাশঙ্কর : স্মরণে বরণে

তারাশঙ্কর : স্মরণে বরণে

কথা হয় জানি না 

আপডেট : ২৭ জুলাই ২০২১, ১৯:৪৪

কিছু ছবি এখনও আছে বলে কথা বলার দু-একটা মানুষ পাওয়া যায়>প্রতিবার মেঘ হলে মেঘমল্লার শুনে বৃষ্টি ভোলা যায় না>নিহত পশুররক্ত আর মাংস বাতাসে>দুঃখ আছে বলে কয়েকটা কবিতা এরপরও লেখা হবে>সকালগুলো ঘুমিয়ে কাটে বলে আর অপরাধবোধ জাগে না>রাত পেয়ে যাই>বাতাস কিন্তু ঘুরে যাচ্ছে>সময়ে সব বদলায় এ তত্ত্ব এখনও প্রমাণের চেষ্টা চলে>ঘরের মধ্যেও এক নেশা আসে বাইরেও এক নেশা যায়>নেশা>হেই হ্যালো, আমি হাস্নাহেনার গন্ধও পাচ্ছি>মাংসের গন্ধের সাথে>ছবি কিন্তু সব কথার উত্তর দেয়>হুহু করে উত্তর>থেকে বাতাস আসবে দুমাস পরেই>যদি বলি ছবিকে, কী, সে পাল্টা প্রশ্ন করে না>যদি বলি, কেন ও ইত্যাদি, পাল্টা প্রশ্ন করে না>যার যা উত্তর তা বুঝিয়ে দেয় আজকাল প্রতি রাতেই প্রায়>উত্তর পেতে পেতে ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে…>চরাচরে পাখি থাকলে বলে দিয়ো তাদের পাখায় আর কোনো শব্দ নেই>তাদের ওড়ায় আর কোনো নীরবতা নেই<

/জেডএস/

সম্পর্কিত

বোকা দুপুরের নাম

বোকা দুপুরের নাম

চন্দ্র গুরুং-এর কবিতা

চন্দ্র গুরুং-এর কবিতা

বব কফম্যানের কবিতা

বব কফম্যানের কবিতা

করেছি নোঙর... ও অন্যান্য ।। ফিলিপ দনিস

করেছি নোঙর... ও অন্যান্য ।। ফিলিপ দনিস

আলোকিত মানুষের স্বপ্নদ্রষ্টা

আপডেট : ২৫ জুলাই ২০২১, ১২:১৮

বিকালের মেঘ ভেদ করে ঠোঁটজুড়ে আসে স্নিগ্ধ জলধারা। বহমান শান্ত জীবনের স্তুতি। তিনি হেসে চলেন, মন মাতানো মুগ্ধতা ছড়ায় চারপাশে। কংক্রিট শহরের মিহি আলোর অডিটোরিয়ামে মানুষ মানুষের বিশ্বস্ত চোখ খোঁজে। স্বপ্ন দেখে সরল বৈভবহীন জীবনের। যে স্বপ্নের স্পন্দন এখন ছড়িয়ে গেছে সমস্ত বাংলাদেশে। মঞ্চে যিনি অনর্গল কথা বলছেন সেই ‘আলোকিত মানুষ’ এর স্বপ্নদ্রষ্টা অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। বাগ্মী এ মানুষটির জীবন বহু কাজে বহু সৃষ্টিতে উদ্ভাসিত।

তাঁকে বুঝতে হলে তাকাতে হবে তাঁর অজস্র সৃষ্টিশীল বইয়ের দিকে, পাঠ নিতে হবে তাঁর আত্মজৈবনিক বইয়ের সরস বয়ান। জানতে হবে তাঁর ব্যাপক কর্মজীবন সম্পর্কে। চোখ খোলা রেখে আমাদের নিবিষ্ট হতে হবে সবুজ নিসর্গ, মানুষের কাছাকাছি বাংলার শ্যামল প্রান্তরে, বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্যে। সেই প্রকৃত সত্য খুঁজতে গিয়ে যন্ত্র বা নাগরিকতার ছোবলে যেখানে তাঁর হৃদয়ও আশাহত হয়েছে।

তিনি কবিতায় উচ্চারণ করেছেন―

একা একা টের পাই চারপাশে―আকাশে ও নিচে―
অবিশ্রান্ত আর্তনাদে ভেঙে যায় বহুদিনকার
ধানভানানীর গান এদেশের, পাটক্ষেত, বেহুলার ঘর―
ঢেঁকির পুরনো গল্প, সাপ, ঝোপ, দোয়েলের দেশ―
বাংলাদেশের আবহমানের।
(শাব্দিত কলঘর, কাব্যগ্রন্থ―মৃত্যুময় ও চিরহরিৎ, পৃ. ২০)

অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, জন্ম ২৫ জুলাই ১৯৩৯ সালে। অবিভক্ত ভারতে কলকাতার পার্ক সার্কাস এলাকায়। পিতা সেময়কার স্বনামধন্য অধ্যাপক, শিক্ষাবিদ ও নাট্যকার আযীম উদ্দীন আহমেদ, মাতা করিমউন্নেসা বেগম। তাঁর পৈতৃক বাড়ি বাগেরহাট জেলার কচুয়া উপজেলায়। দেশভাগের পর আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ পরিবারের সাথে চলে আসেন তৎকালীন পূর্বপাকিস্তানে। পিতার চাকরি সূত্রেই তার শৈশবের কিছু সময় কাটে টাঙ্গাইলের করটিয়ায়। সেখানকার বংশী নদী তাঁর শৈশবের মনোহর চিন্তায় দারুণভাবে গেঁথে আছে। তাঁর আত্মজৈবনিক বই বহে জলবতী ধারা প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ড, নিষ্ফলা মাঠের কৃষক ইত্যাদি তাঁর বহমান জীবনের নানান অভিজ্ঞতা, জীবন গল্পের সুনিপুণ বৃত্তান্ত। পিতার নাট্যচর্চা ও কবিতার খেয়াল তাকে প্রবলভাবে আকর্ষণ করত। কলেজে পড়া অবস্থায় বুঁদ হয়েছেন কবিতায় ও সরল জীবনের দর্শনে। মূলত তার ব্যাপ্তিময় জীবনের ভিতটা সেসময়ই রচিত হয়েছিল। কলেজজীবনে তার কিছু শিক্ষকের অবদানও এক্ষেত্রে স্বীকার্য। কলেজজীবনেই তিনি ভ্রমণ করেন ইংরেজি কবিতা ও বাংলা কবিতার অপার সৌন্দর্যের ভূমিতে। যা বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে বাংলা সাহিত্য নিয়ে পড়তে উদ্বুদ্ধ করেছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হতে পড়াশোনা শেষ করে ১৯৬১ সালে মাত্র বাইশ বছর বয়সে মুন্সিগঞ্জের হরগঙ্গা কলেজে যোগদানের মধ্যদিয়ে তাঁর শিক্ষকতা জীবন শুরু হয়। যা অব্যাহত ছিলো ১৯৯২ সাল পর্যন্ত। হরগঙ্গা কলেজ ছাড়াও শিক্ষকতা করেছে সিলেট মহিলা কলেজ, রাজশাহী কলেজ, ঢাকায় ইন্টারমিডিয়েট টেকনিক্যাল কলেজ (বর্তমানে সরকারি বিজ্ঞান কলেজ) এবং সর্বশেষ ঢাকা কলেজে দীর্ঘসময় অধ্যাপনার পর অবসর গ্রহণ করেন। এছাড়াও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগে খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে বাংলা পড়াতেন। অধ্যাপক হিসেবে তার সফলতা ও জনপ্রিয়তা ছিল গগনচুম্বী। মূলত তাঁর সকল কাজের মাধ্যমেই তিনি মানুষকে স্বপ্ন দেখিয়েছেন। উজাড় করে দিয়েছেন সবটুকু। শিক্ষক হিসেবে তাঁর নিজের কথায়―

আমি সাহিত্যের অধ্যাপক ছিলাম। সাহিত্যের স্বপ্ন ও সৌন্দর্য আজীবন আমার চেতনা-জগতে যে-হীরের দীপ্তি ছড়িয়েছে আমি সেই উজ্জ্বলতাকে ছাত্রদের ভেতরে ছড়িয়ে দিতে চেষ্টা করেছি। তাদের সেই আনন্দে উজ্জীবিত করতে চেয়েছি। পরীক্ষায় ছাত্রদের বেশি নম্বর পাওয়াবার জন্যে পরিশ্রম করে জীবন নিঃশেষ করাকে আমার কাছে ‘দুর্লভ মানবজন্মে’র অপচয় বলেই মনে হয়েছে। জীবন কত দীপান্বিত ও জ্যোতির্ময় তা একজন ছাত্র সবচেয়ে ভালো করে জানতে পারে তার জীবনে দীপান্বিত শিক্ষকদের কাছ থেকে। (নিষ্ফলা মাঠের কৃষক, পৃ. ১১)

বর্তমান সময়ের শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ নিয়ে স্পষ্ট কথা বলতেও এ সফল অধ্যাপক দ্বিধা করেননি। প্রসঙ্গক্রমেই তিনি লিখেছেন―

আজ দেশের স্কুল-কলেজগুলোয় কার্যত লেখাপড়া হচ্ছেই না। দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর লক্ষ লক্ষ শিক্ষকের অধিকাংশই শিক্ষক হওয়ার যোগ্য নন, যাঁরা যোগ্য তাঁরা ছাত্রদের দেন অতি সামান্য। ফলে অভিভাবকরা কেউই বিদ্যালয়কে আজ তাঁদের সন্তানদের বিকাশের অঙ্গন হিসেবে মনে করেন না। ফলে বাণিজ্যিক উদ্যমসম্পন্ন গৃহশিক্ষকরা আজ হয়ে উঠেছেন ছাত্রসমাজের মূল আশ্রয়। (নিষ্ফলা মাঠের কৃষক, পৃ. ১৭৬)

বাংলাদেশের ষাটের দশকে নতুনধারার সাহিত্য সৃষ্টির আন্দোলনের পুরোধা অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। প্রায় একযুগ ‘কণ্ঠস্বর’ পত্রিকা সম্পাদনা করার মাধ্যমে নেতৃত্ব দিয়েছেন বাংলা সাহিত্য বাঁকবদলের ধারায়, প্রগতিশীল সাহিত্য সৃষ্টির প্রয়াসে। নিশ্চিত আশ্রয় হয়ে উঠেছিলেন সেসময়কার তরুণ কবি-সাহিত্যিকদের। বাংলাদেশ টেলিভিশনের সূচনালগ্ন হতে যুক্ত হন উপস্থাপনায়। রুচিশীল ও শিক্ষামূলক অনুষ্ঠান, উপস্থাপনায় তার নিজস্ব ধরন ইত্যাদি কারণে তিনি হয়ে উঠেছিলেন জনপ্রিয় উপস্থাপক খ্যাতিতে ও ব্যক্তিত্বে। তাঁর হাত ধরেই অনেক মেধাবী তরুণ উঠে আসে। তাঁর ‘আমার উপস্থাপক জীবন’ বইটিতে তিনি তুলে ধরছেন তাঁর উপস্থাপক জীবনের নানান দ্বন্দ্ব ও প্রতিকূলতা। বর্ণনা করছেন বাংলাদেশ টেলিভিশনে যাত্রা আর সমৃদ্ধির বিভিন্ন দিক। আমাদের মহান মুত্তিযুদ্ধে পাকসেনাদের হাতে আটক হয়েছিলেন তিনি। উপস্থাপক হিসেবে তাঁর জনপ্রিয়তা তাঁকে সে যাত্রায় প্রাণে বাঁচিয়ে ছিল বলে তিনি বইটিতে বলেছেন নির্দ্বিধায়। তাঁর ‘সংগঠন ও বাঙালি’ বই পাঠকের কাছে খুবই জনপ্রিয়। জাতীয় জীবনে সংগঠনের প্রয়োজনীয়তা, বাঙালির সংগঠনের দুর্বলতা এবং তা কীভাবে আমাদের জাতীয় জীবনে উন্নতির মূলবাধা হয়ে দাঁড়ায় তার স্পষ্ট বয়ান রয়েছে বইটিতে। সংগঠনের অভাবে রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রায় ভঙ্গুর হয়ে পড়ে, ব্যক্তি ডুবে থাকে তা আত্মকেন্দ্রিকতায় এসবের সত্য উপলব্ধি উঠে এসেছে তাঁর লেখায়।

১৯৭৮ সালে অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ প্রতিষ্ঠা করেন তাঁর স্বপ্নের প্রতিষ্ঠান ‘বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র’। তিনি কবিতায় লিখেছেন―

রাত্রিকে বাসে না ভালো কেউ সম্প্রতি। কেননা এ
রাত্রি সব এক করে দেয়। রাত্রির নির্বাক কাফন
জামার পৃথক রঙ, স্বতন্ত্র চুলছাঁটা, আস্তিনে মাপ
মুছে দিয়ে সবাইকে আদ্যোপান্ত এক পাতলুনের ভেতর
নিয়ে আসে।
(মৃত্যুময়ের জন্য, কাব্যগ্রন্থ―মৃত্যুময় ও চিরহরিৎ, পৃ. ৫৬)

হ্যাঁ, তিনি এমন রাত্রিকেই দূর করতে চেয়েছেন। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন সংস্কৃতিমান, মুক্ত চেতনার সৃজনশীল মানুষ না হলে আগামী বাংলাদেশ হবে অনুর্বর, অন্ধকার। তিনি বইয়ের সোনালি অক্ষরে, জ্ঞানের অমৃতবাণীতে বদলাতে চেয়েছেন সমাজকে, তরুণদের। বই পড়া আন্দোলন ও নানা ধরনের কর্মকাণ্ডের মধ্যদিয়ে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের লক্ষ হচ্ছে―আগামী দিনের অর্থাৎ তরুণদের বড় করে তোলা ও তাদের সংঘবদ্ধ জাতীয় শক্তিতে পরিণত করা। প্রায় বিয়াল্লিশ বছর ধরে তাঁর নেতৃত্বে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র বিভিন্নভাবে কাজ করে চলেছে অবিরাম। এগুলো মধ্যে রয়েছে―দেশভিত্তিক উৎকর্ষ কার্যক্রম, পাঠাভ্যাস উন্নয়ন কর্মসূচি, ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি, আলোর ইশকুল, কেন্দ্রের লাইব্রেরি, আলোকচিত্র চক্র, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ইত্যাদি। সারা দেশে প্রায় ২৪ লাখ ছাত্র/ছাত্রী বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের বই পড়া কার্যক্রমের সাথে যুক্ত। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ও অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ সম্পর্কে লিখতে গিয়ে শিক্ষাবিদ ও লেখক অধ্যাপক আনিসুজ্জামান লিখেছেন―

বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠা আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের জীবনের সর্বাধিক কীর্তি হিসেবে দেখা দেয়। যেখানে আমরা অনেকে মিলে একটি প্রতিষ্ঠান দাঁড় করাতে পারি না, সেখানে একক প্রচেষ্টায় এত বড় একটা প্রতিষ্ঠান গড়া যে তাঁর বিশেষ যোগ্যতার প্রকাশ, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এর ব্যাপ্তি সারা দেশ, কোনো কোনো ক্ষেত্রে দেশের সীমানা ছাড়িয়েও।…সায়ীদ লিখেছেন প্রচুর। কবিতা ও ছোটগল্প, প্রবন্ধ ও ভাষণ, স্মৃতিকথা ও জার্নাল, নাটক ও অনুবাদ।…তাঁর মধ্যে মিলিত হয়েছে শিল্পী ও কর্মী, ভাবুক ও উদযোগী। তাঁর চিন্তা ও সাধনায় দেশ ক্রমাগত উপকৃত হোক। (আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ বহুমুখিতায় ও স্বপ্নচারিতায়, পৃ. ৩৫, ৩৬)

সত্যিকারভাবেই বহুমুখী কাজের মাধ্যমে তিনি উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব বাংলাদেশে। তাঁর প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ৩২টি। গল্প, প্রবন্ধ ও কবিতায় সাহিত্যে বিভিন্ন শাখায় তিনি অবদান রেখেছেন ও রেখে চলেছেন। সামাজিক নানা কাজেই তিনি সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন। যেমন ডেঙ্গু প্রতিরোধ আন্দোলন, পরিবেশ দূষণবিরোধী আন্দোলন ইত্যাদি। তিনি তাঁর কাজের স্বীকৃতি হিসেবে পেয়েছেন সম্মাননা ও পুরস্কার। এগুলোর মধ্যে আছে―জাতীয় টেলিভিশন পুরস্কার (১৯৭৭), র‌্যামন ম্যাগসাইসাই পুরস্কার (২০০৪), একুশে পদক (২০০৫), পরিবেশ পদক (২০০৮), বাংলা একাডেমি পদক (২০১২) ইত্যাদি।

‘আলোকিত মানুষ চাই’ এর স্বপ্নদ্রষ্টা অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যারের দেখানো পথেই আগামী দিনের তরুণদের মধ্যে ‘মানুষ তার স্বপ্নের সমান বড়’ বই পড়ার মাধ্যমে এমন অনুভূতির প্রবহমানতায়, চর্চায় হয়তো আমরা পাব সংঘবদ্ধ, প্রগতিশীল, আত্মকেন্দ্রিক জীবনকে পেছনে ফেলে আসা দেশপ্রেমিক বুদ্ধিদীপ্ত এক প্রজন্ম। যা বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দেবে।

এ মহীরুহের জন্মদিনে বিনম্র শ্রদ্ধা।

সহায়ক গ্রন্থ

১. বহে জলবতী ধারা (প্রথম খণ্ড), আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, ঢাকা, ২০০৩।
২. বহে জলবতী ধারা (দ্বিতীয় খণ্ড), আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, ঢাকা, ২০১১।
৩. মৃত্যুময় ও চিরহরিৎ, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, ঢাকা, ১৯৮৮।
৪. নিষ্ফলা মাঠের কৃষক, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, ঢাকা, ১৯৯৯।
৫. বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ও আমি, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, ঢাকা, ১৯৯৯।
৬. আমার উপস্থাপক জীবন, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, ঢাকা, ২০০৫।
৭, সংগঠন ও বাঙালি, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, ঢাকা, ২০০৩।
৮. আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ বহুমুখিতায় ও স্বপ্নচারিতায়, সম্পাদনা―আতাউর রহমান, ঢাকা, ২০১৫।
৯. ইন্টারনেট।

/জেডএস/

সম্পর্কিত

মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’

মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা

কথা হয় জানি না 

কথা হয় জানি না 

তারাশঙ্কর : স্মরণে বরণে

তারাশঙ্কর : স্মরণে বরণে

তারাশঙ্কর : স্মরণে বরণে

আপডেট : ২৩ জুলাই ২০২১, ০৯:০০

তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় (২৩ জুলাই, ১৮৯৮-সেপ্টেম্বর ১৪, ১৯৭১) বিংশ শতাব্দীর বিশিষ্ট বাঙালি কথাসাহিত্যিক। তার সামগ্রিক সাহিত্যকর্মের মধ্যে রয়েছে ৬৫টি উপন্যাস, ৫৩টি গল্পগ্রন্থ, ১২টি নাটক, ৪টি প্রবন্ধের বই, ৪টি আত্মজীবনী, ২টি ভ্রমণ কাহিনী, ১টি কাব্যগ্রন্থ এবং ১টি প্রহসন। তিনি রবীন্দ্র পুরস্কার, সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার, জ্ঞানপীঠ পুরস্কার, পদ্মশ্রী এবং পদ্মভূষণ পুরস্কারে পুরস্কৃত হয়েছেন।

 

যা খুব ছোট, তাকে খুব কাছ থেকে না দেখলে ভালো করে চেনা যায় না। দূর থেকে তা অস্পষ্ট দেখায়। কিন্তু যা খুব বড়, একটা নির্দিষ্ট দূরত্বে তাকে না দেখলে, তার ব্যাপ্তিটা অধরা থেকে যায়। প্রথম হিমালয় দর্শনে ঠিক এই রকমই একটা সম্ভ্রম জাগানো অনুভূতি হয় যেকোনো মানুষের। কিন্তু আস্বাদন পরিপূর্ণ হয়, শুধু দূর থেকে নয়, যখন কাছে গিয়েও তাকে দেখি।
কিন্তু আমার তারাশঙ্করের দর্শন ঘটেছিল এর ঠিক বিপরীত ক্রমে। তাঁকে প্রথমে দেখেছিলাম খুব কাছ থেকে, পরম স্নেহের নৈকট্যে। সে প্রথম যে ঠিক কবে তা আজ আর বলতে পারি না—তবে স্মৃতির ভেতরে প্রথম যে ছবিটি দেখি তা সম্ভবত ১৯৪৮ এর, এবং স্থান কলকাতারই বাগবাজারের ১/১ আনন্দ চ্যাটার্জি লেনের একটি বাড়ির দোতলার ঘরে। একটি সাবেকী আমলের খাটের ওপর চড়ে আমরা তিনটি শিশু খেলছি, লাফাচ্ছি, কখনো বা নাচছি—আর অদূরেই কৃষ্ণবর্ণ ধ্যানমগ্ন এক প্রৌঢ় ছোট্ট একটি কাঠের ডেস্কের ওপর গভীর নিবিষ্ট হয়ে লিখে চলেছেন পাতার পর পাতা। মুক্তোর মতো অক্ষরে একে একে ফুটে উঠছে বাংলা কথাসাহিত্যের উজ্জ্বলতম রত্নখনি। তবু সে সান্নিধ্য এত সহজ ছিল বলেই হয়তো আজও সমানভাবে স্পষ্ট। তিনি লিখছেন আর আমরা—তাঁর নাতিনাতনিরা খেলছি। খেলা যখন ছিল তোমার সনে/তখন কে তুমি তা কে জানতো? জানতে পারিনি ঐ নৈকট্যের জন্যই হয়তো-বা। ফলে আমাদের খেলাটা ছিল অবাধ। কখনো ঘরে কখনো ঘর ছাড়িয়ে বারান্দায়—সরু লম্বা বারান্দার ওপাশে আরেকটা বারান্দায় কখনো কখনো দেখা দিতেন লং ক্লথের পাঞ্জাবি পরা, সাদা চুল এক বৃদ্ধ। দাদুর যামিনী দা—শিল্পী যামিনী রায়। মাঝে মাঝে দুই জ্যোতিষ্কের বার্তাবিনিময় হতো এপার ওপার।
ইতিমধ্যে দাদুর সাহিত্যিক খ্যাতি বাড়ছিল। বাড়ি তৈরির কাজও চলছিল। ১৯৪৯ এ বাগবাজার ছেড়ে তিনি উঠে গেলেন টানাপার্কে তাঁর নিজস্ব বাড়িতে। তার কিছুকাল পরেই আমরাও চলে এলাম পাইকপাড়ায় গোয়েল্কা গার্ডেন্স-এর একটি আশ্চর্য সুন্দর ফুটফুটে ফ্ল্যাটে। চারদিকে শুধু সবুজ আর সবুজ। খুব কাছেই দাদুর বাড়ি। রোজ বিকেলে খেলতে যেতাম ওবাড়ির পাশের মাঠে। বাড়ির সামনেই বোগেনভেলিয়ার ছায়অর নিচে দুপাশে রোয়াক, মাঝে বেতের চেয়ার পাতা। দাদু বসে আছেন। তাঁকে ঘিরে আরো কতজন। কথা হতো কত বিষয়ে। মাঝে মাঝেই শৈল দাদু এসে উপস্থিত হতেন। সাহিত্যিক শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়। দাদুর বাড়ির ঠিক বিপরীতে আর্মড পুলিশের ক্যাম্প। তার ওপাশে ইন্দ্রবিশ্বাস রোডের ওপর বাড়ি করেছিলেন শৈল দাদু। প্রতিদিন সকালে বন্ধু সন্দর্শনে তাঁর আসাটা ছিল নৈমিত্তিক ঘটনা। দাদুও যেতেন।
কিন্তু সে অনেক পরের ঘটনা। ১৯৬০-৬১ নাগাদ তখনো সজনীকান্ত দাস বেঁচে। শনিবারের চিঠি প্রকাশিত হচ্ছে নিয়মিত রমরমিয়ে। শৈলজানন্দের বাড়ি থেকে পূবদিকে আরেকটু এগোলেই সজনীকান্তের বাড়ি। নিচে বিশাল অফিস, প্রেস আর সেখানেই বাংলার তাবড় তাবড় সাহিত্যিকদের আড্ডা। সে আড্ডায় তারাশঙ্করকে, শুনেছি বড়বাবু বলেই চিহ্নিত করা হতো।
দেখতে দেখতে আমাদের টালা-পাইকপাড়া অঞ্চলটা একসময় সাহিত্যিকদের তীর্থস্থান হয়ে উঠল। মন্মথ দত্ত রোডের একটি ফ্ল্যাটে কাজী নজরুল ইসলাম; কিন্তু তাঁর চৈতন্য তখন মহামগ্ন। আরেকটু এগিয়ে সাহিত্যিক নরেন্দ্রনাথ মিত্র। নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীও এলেন কিছুকাল পরে, শৈলজানন্দের বাড়ির একতলায়। পাইকপাড়ায় আমাদের বাড়িরই কাছে হাউসিং স্টেটে থাকতেন গৌরকিশোর ঘোষ।
চাঁদের শোভা থাকে, সূর্যের রামধনু। বিদ্রোহী কবি তখন ফুলের জলসায় নীরব। তাঁকে বাদ দিলে, বাকিরা ছিলেন তারাশঙ্করের...। তাঁর সভার নিত্য অতিথি।
কিন্তু আরো দুজন ছিলেন, তাঁরা শুধু তাঁর... ছিলেন না, তাঁর ভাবের অংশীদারও ছিলেন। একজন তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র, আমার বড়মামা সনৎকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় এবং আরেকজন আমার বাবা, তারাশঙ্করের জ্যেষ্ঠ জামাতা শান্তিশঙ্কর মুখোপাধ্যায়। শুধু আত্মীয় নয়, এঁরাও ছিলেন তাঁর সভার...।
আরো কতজন, কত গুণীজন, কত কবি সাহিত্যিক শিল্পী যে তাঁর বাড়িতে পদচিহ্ন রেখে গেছেন তার হিসাব দেওয়া অসম্ভব। এসেছেন বনফুল, অচিন্ত্যসেনগুপ্ত, প্রেমেন্দ্র মিত্র, সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, প্রবোধ সান্যাল, আশাপূর্ণা দেবী, গজেন্দ্রকুমার মিত্র, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়, শিবরাম চক্রবর্তী—এমনি আরো কত যে গুণীজন। আর এঁদের... আর ফুলের গন্ধে—টালাপার্কের বাড়ি ভরে উঠত প্রতিবছর ৮ই শ্রাবণ—তারাশঙ্করের জন্মদিন। বাড়িতে মানুষ ধরত না। তাই ম্যারান বেঁধে—সে এক বিপুল আয়োজন। ফুলের গন্ধের সঙ্গে যোগ দিত খাবারের মন মাতানো গন্ধ।
বছরে দুটি দিনের জন্য আমাদের ছিল একমাত্র প্রতীক্ষা দুর্গা পুজো আর আটই শ্রাবণ। আমাদের মধ্যে আবার আমার দিদি, শকুন্তলার প্রতীক্ষা ছিল সবচাইতে ব্যাকুল। কারণ, কি সৌভাগ্য ওরও জন্মদিন ঠিক ওই ৮ই শ্রাবণ। একে বড় নাতনি, তার জন্মদিনের ঐ একসূত্রতা। দাদুর কাছে ওর ছিল একটু বিশেষ সমাদর। ওকে নিয়ে কবিতাও লিখেছিলেন তিনি—
তুমি যখন হবে পঞ্চদশী
আমি হব ষাট বছরের বুড়ো
তুমি খাবে কড়মড়িয়ে মেঠাই
আমি খাব চেটে চেটে ঝুরো।

দাদুর বয়স যখন পঁয়তাল্লিশ, তখন দিদির জন্ম। অতএব দাদুর যখন ষাট, দিদি তখন পঞ্চদশী। টীকা আরো একটু হয়তো অপ্রায়োগিক হবে না। বীরভূমে মিঠাইকে বলে মেঠাই, মেটাই, কিংবা আরো সঠিকভাবে বললে ‘মিটিই’। মনে হতে পারে মিঠাই কি তবে কড়মড়িয়ে খাওয়া যাবে? আসল কথা হলো, মেঠাই মানে বীরভূমে সন্দেশ নয়—গুড় আর বেসনের লম্বা লম্বা কাঠিভাজা, ওখানে বলে সিড়িভাজা—তার নাড়ু—বেশ শক্ত, কড়া পাকেঢ়। কড়মড়িয়েই খেতে হয়। প্রতিবছর পুজোর সময় ঘরে ঘরে এইসব মেঠাই, নারকেল খণ্ড, খই বিনু—এমনি আরো কত কি তৈরি হতো। আর ঝুরো হলো শুকনো বালিগুড়। এও বীরভূমেরই শব্দ।
সে তো আসবেই। তারাশঙ্করের কবিতায় বীরভূম আসবে না, লাভপুর আসবে না—তাই হয়! কোনো না কোনোভাবে আসবেই আসবে। তাঁর শেকড় যে ঐ মাটিতেই। আর জীবনের শেষ মুহূর্তেই তাঁর ভ্রুযোগ ছিন্ন হয়নি। প্রায়ই যেতেন গ্রামের বাড়িতে। তাঁদের যে সাবেক বৈঠকখানা বাড়ি—খড়ের চাল, এপাশ ওপাশ বারান্দা, সামনে বাগান—আর এই বাগানেই তিনি রোয়াক বাঁধিয়ে দিয়েছিলেন, ভারী সুন্দর একটা গোলঘর বানিয়ে ছিলেন। সামনে নানান ফুলের গাছ। রোয়াকের পাশে চেয়ার পাতা—এখানেই বসতেন বন্ধুবান্ধব পরিচিতজনের সঙ্গে। গল্প হতো। কখনো অন্ত্যজ শ্রেণির বহু মানুষ আসতেন। তাঁর কাছে তাঁরাও ছিল আপনজন। পুজোর সময় সবাইকে কাপড় দিতেন। অর্থ সাহায্য দিতেন সাধ্যমতো।
লাভপুরকে তিনি ভোলেননি। আর লাভপুরও আজও ভোলেনি তাঁকে।

/জেডএস/

সম্পর্কিত

মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’

মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা

কথা হয় জানি না 

কথা হয় জানি না 

আলোকিত মানুষের স্বপ্নদ্রষ্টা

আলোকিত মানুষের স্বপ্নদ্রষ্টা

সর্বশেষ

তালেবান নিয়ন্ত্রিত প্রদেশে প্রবল বন্যায় ১৫০ জনের মৃত্যু

তালেবান নিয়ন্ত্রিত প্রদেশে প্রবল বন্যায় ১৫০ জনের মৃত্যু

সৌদি আরব থেকে ফেরত পাঠালে হজ-ওমরাহ ছাড়া প্রবেশ করা যাবে না

সৌদি আরব থেকে ফেরত পাঠালে হজ-ওমরাহ ছাড়া প্রবেশ করা যাবে না

বিনা দোষে মিনুর কারাভোগ, কুলসুম ও তার সহযোগী রিমান্ডে 

বিনা দোষে মিনুর কারাভোগ, কুলসুম ও তার সহযোগী রিমান্ডে 

জেলের বড়শিতে বিশাল বোয়াল

জেলের বড়শিতে বিশাল বোয়াল

অনির্দিষ্টকাল ইরানের সঙ্গে আলোচনা চলতে পারে না: মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী

অনির্দিষ্টকাল ইরানের সঙ্গে আলোচনা চলতে পারে না: মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী

বিয়ের চার দিনের মাথায় কিশোরীর ‘আত্মহত্যা’

বিয়ের চার দিনের মাথায় কিশোরীর ‘আত্মহত্যা’

হেলেনা জাহাঙ্গীরের বাসায় র‌্যাবের অভিযান

হেলেনা জাহাঙ্গীরের বাসায় র‌্যাবের অভিযান

করোনার 'সুপার স্প্রেডার' রাষ্ট্র হওয়ার পথে মিয়ানমার

করোনার 'সুপার স্প্রেডার' রাষ্ট্র হওয়ার পথে মিয়ানমার

লকডাউনে মায়ের চেহলাম আয়োজন করায় ছেলেকে জরিমানা

লকডাউনে মায়ের চেহলাম আয়োজন করায় ছেলেকে জরিমানা

ফেরি ‘শাহজালাল’ দুর্ঘটনার অনুসন্ধানে চার সদস্যের কমিটি

ফেরি ‘শাহজালাল’ দুর্ঘটনার অনুসন্ধানে চার সদস্যের কমিটি

অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধে নীতিমালা প্রণয়নের আহ্বান

অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধে নীতিমালা প্রণয়নের আহ্বান

অধস্তন আদালতের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কালো ব্যাজ পরিধানের নির্দেশ

অধস্তন আদালতের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কালো ব্যাজ পরিধানের নির্দেশ

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’

মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা

কথা হয় জানি না 

কথা হয় জানি না 

আলোকিত মানুষের স্বপ্নদ্রষ্টা

আলোকিত মানুষের স্বপ্নদ্রষ্টা

তারাশঙ্কর : স্মরণে বরণে

তারাশঙ্কর : স্মরণে বরণে

উৎসবে গল্প

উৎসবে গল্প

থিয়েটার

থিয়েটার

গহন
শীতের অপেক্ষা করছি না

শীতের অপেক্ষা করছি না

মন্তাজের নিজের জমি

মন্তাজের নিজের জমি

© 2021 Bangla Tribune