X
শুক্রবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২১, ২ আশ্বিন ১৪২৮

সেকশনস

ধারাবাহিক—এক

ক্লিশিতে শান্ত দিন ।। হেনরি মিলার

আপডেট : ০২ আগস্ট ২০২১, ১৩:৩৭

[১৯৩০-৩৯ সময়পর্বে প্যারিসে বসবাসকালের অভিজ্ঞতা নিয়ে মিলার এই উপন্যাসিকাটি লেখেন। ওঁর ‘ট্রপিক অফ ক্যান্সার’, ‘ব্ল্যাক স্প্রিং’, ‘ট্রপিক অফ ক্যাপ্রিকর্ন’, ‘দ্য রোজি ক্রুসিফিকশন’—ট্রিলজি, এগুলোর মতোই ‘কোয়ায়েট্‌ ডেইজ ইন ক্লিশি’ও একটি আত্মজৈবনিক আখ্যান। ’৩০-এর দশকের শুরুর দিকের অভিজ্ঞতাই এতে রয়েছে, যে সময়টায় মিলার ‘ব্ল্যাক স্প্রিং’ উপন্যাসটি লিখছিলেন। থাকতেন শহরতলি ক্লিশির একটা ছোট্ট অ্যাপার্টমেন্টে বন্ধু আলফ্রেড পার্লেসের সাথে ভাগ করে। লেখক জীবনের এক প্রতিকূল অবস্থার সাথে তখন লড়ছেন মিলার। প্যারিস থেকে নিউ ইয়র্কে ফেরার অল্প কিছুদিন বাদে ১৯৪০-এ লেখেন এই উপন্যাসিকাটি। পরে, ১৯৫৬ সালে বিগ সারে থাকার সময়, যখন তিনি ‘নেক্সাস’-এর ওপর কাজ করছেন, এতে কিছু সংযোজন, পরিমার্জন করেন।
‘কোয়ায়েট্‌ ডেইজ ইন ক্লিশি’ গ্রন্থাকারে প্রথম প্রকাশিত হয় ফ্রান্সে, অলিম্পিয়া প্রেস থেকে, ১৯৫৬ সালেই। আমেরিকায় মিলারের ‘ট্রপিক অফ ক্যান্সার’-এর ওপর দীর্ঘ প্রায় তিন দশক ধরে চলা অশ্লীলতার অভিযোগ তথা আইনি নিষেধাজ্ঞা ১৯৬৪-৬৫ নাগাদ উঠে যাবার পর ওঁর অন্যান্য বইয়ের সাথে এই উপন্যাসিকাটিও আমেরিকায় প্রকাশিত হয় ১৯৬৫ সালে। প্রকাশক, গ্রোভ প্রেস।
মিলারের ফোটোগ্রাফার-বন্ধু জর্জ ব্রাসেই ওঁর ‘হেনরি মিলার: দ্য প্যারিস ইয়ার্স’ বইতে জানিয়েছেন যে, মিলারের মতে (‘কোয়ায়েট্‌ ডেইজ ইন ক্লিশি’র) ‘টাইটল ইজ কমপ্লিটলি মিসলিডিং’।       
উল্লেখ থাকে যে, উপন্যাসিকাটির দুটি অংশ। প্রথমাংশ, ‘কোয়ায়েট্‌ ডেইজ ইন ক্লিশি’, দ্বিতীয়াংশ ‘মারা ম্যারিগনান’। যদিও, দুটি অংশই মূল গ্রন্থে দু মলাটের ভেতর রয়েছে এবং তাদের মধ্যে স্থান, কাল ও পাত্রের বহুলাংশে সাদৃশ্য থাকলেও, আখ্যানের ক্রমিক পরিণতির দিক থেকে বা কাহিনির ধারাবাহিক বিন্যাসে অংশ দুটিতে প্রত্যক্ষ বা অনিবার্য কোনও যোগ নেই। আমি এখানে শুধু প্রথমাংশটিরই অনুবাদ করেছি।
অনুসন্ধিৎসু পাঠকের জন্য বলা, মিলারের ‘কোয়ায়েট্‌ ডেইজ ইন ক্লিশি’ অবলম্বনে সিনেমা তৈরি হয়েছে দু’বার। প্রথমটি একটি ড্যানিশ প্রোডাকশন, ১৯৭০ সালে। দ্বিতীয়টি ছিল ফরাসি নির্মাণ, ১৯৯০ সালে পরিচালক ক্লদ শাব্রল এটা নিয়ে সিনেমা করেন। ১৯৯১ সালে, আমেরিকার সাহিত্যের ওপর ভিত্তি করে এইচবিও চ্যানেল একটি অ্যান্থলজি সিরিজ করেছিল, তাতে এই উপন্যাসের দ্বিতীয় ভাগ অর্থাৎ ‘মারা ম্যারিগনান’ অবলম্বনে একটি ৩০ মিনিটের শর্ট ফিল্ম তৈরি হয়, যার নাম ছিল ‘মারা’।  
উপন্যাসিকাটিতে ফ্রান্সের একাধিক রাস্তাঘাট, জায়গা, স্থাপত্য নিদর্শন এবং শিল্প ও সাহিত্য-ব্যক্তিত্বের নাম রয়েছে। বাঙালির জিভে তাদের যথাযথ উচ্চারণ কী হবে বা কী হওয়া উচিত তা নিয়ে পণ্ডিতমহলে বিতর্ক চিরকাল থাকবে। আমি একটা স্বাভাবিক ভারসাম্য রাখার চেষ্টা করেছি। যা হয়তো বিশুদ্ধ ফরাসি উচ্চারণ নয় তবে তার কাছাকাছি, আবার বাঙালির জিভেও বেমানান নয়।
আরেকটি কথা, যে সমস্ত ফরাসি নাম বা শব্দ এই উপন্যাসে তথা এই অনুবাদে রয়েছে, তাদের সম্পর্কে পরিশিষ্টে সামান্য কিছু পরিচিতি উল্লেখের চেষ্টা করেছি। যাতে আগ্রহী পাঠকের কাছে উপন্যাসে জড়িয়ে থাকা পরিমণ্ডলটির আবহ সাবলীল হয়। সেপ্টেম্বর—অক্টোবর, ২০১৬। —অনুবাদক।] 

এ লেখা যখন লিখছি, রাত নেমে এসেছে। লোকজন সব ডিনারে চলল। সারাটাদিন ছিল ধূসর। প্যারিসে যেমন হামেশাই দেখা যায়। চিন্তায় হাওয়া লাগাতে ব্লকগুলোর আশপাশ দিয়ে হাঁটছি। করতে কিছুই পারছি না, শুধু ভাবছি নিউ ইয়র্ক আর প্যারিস এই শহর দুটোর মধ্যে কী ভীষণ তফাত। সেই একই সময়, একইরকম দিন, এমনকী এই ধূসর শব্দটাও, যা এইসব সঙ্গ থেকেই আসে, সেই গ্রিসাইলের সাথে অল্পই সাযুজ্য তার, একজন ফরাসির কানে যা চিন্তা ও অনুভূতির একটা জগৎ জাগিয়ে তুলতে সক্ষম। অনেক আগে, প্যারিসের রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে, দোকানের জানলায় রাখা জলরঙের কাজগুলো মন দিয়ে দেখতে দেখতে, আমি সেই জিনিসটার একক অনুপস্থিতি সম্পর্কে অবহিত হয়েছিলাম যাকে পেইন’জ গ্রে[১] বলে। এটা আমি উল্লেখ করলাম কারণ, সবাই-ই জানে প্যারিস সবিশেষভাবে এমন এক শহর যার নির্দিষ্ট কোনও সংজ্ঞা নেই। উল্লেখ করলাম কারণ, আমেরিকান শিল্পীরা তৈরি করা ফরমায়েসি ধূসরকেই ব্যবহার করে অতিরিক্ত এবং বদ্ধমূলভাবে। ফ্রান্সে এই ধূসরমালা অসীম; এখানে ধূসর তার পরিণাম-লুপ্ত।

ধূসরতার এই বিপুল পৃথিবী নিয়ে ভাবছিলাম যাকে আমি এই প্যারিসেই চিনেছি। কারণ এরকম সময়ে, এমনিই যখন বুলেভার ধরে হেঁটে যাচ্ছিলাম, অধীর আগ্রহে মনে হল ঘরে ফিরে যাই, লিখি, আমার স্বাভাবিক অভ্যেসের সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী একটা লেখা। ওখানে আমার সময় ফুরোলে আমি আবার প্রবৃত্তিগতভাবে ঠিক ভিড়ে মিশে যাব। এখানে এই ভিড়, সবরঙের শূন্যতা, সবকিছুর সূক্ষ্ম তারতম্য, সব ভেদ ও স্বাতন্ত্র্য, আমাকে নিয়ে যাবে আমার ভেতরে, ফিরিয়ে নিয়ে যাবে আমার ঘরে, আমার কল্পনার মধ্যে এক নিরুদ্দিষ্ট জীবনের সেই জটিল ও মিশ্র উপাদানগুলোকে খুঁজতে, যখন সেগুলো সংমিশ্রিত ও আত্তীকৃত হয়ে প্রতিপালিত আর সুসংগত অস্তিত্বের সৃষ্টির দিকে হয়তো কী অনিবার্যভাবে পুনরুৎপাদন করছে কোমল ও স্বাভাবিক ধূসরকে। এরকম একটা দিনে, এরকম সময়ে র‌্যু লাফিত্তের[২] যে কোনও জায়গা থেকে সাক্রে কয়্যেরের[৩] দিকে তাকিয়ে দেখাটাই আমাকে স্বপ্নাবেশে নিয়ে যেতে সক্ষম। এমনকী যখন আমি ক্ষুধার্ত কিংবা ঘুমনোরও কোনও জায়গা নেই তখনও আমার ওপরে এই দৃশ্যটার এরকমই প্রভাব চলত। পকেটে আমার হাজার ডলার থাকলেও আমি জানি এমন কোনও দ্রষ্টব্য নেই যা আমার মধ্যে এরকম স্বপ্নাবেশ জাগাতে পারে।

প্যারিসের ধূসর দিনগুলোয় আমি সাধারণত মঁমার্তের[৪] ক্লিশির দিকে হাঁটি।

ক্লিশি থেকে অবারভিলারের[৫] দিকে একের পর এক কাফে, রেস্তোরাঁ, থিয়েটার, সিনেমাহল, কাপড়ের দোকান আর হোটেল। এটা প্যারিসের ব্রডওয়ে যা ৪২নং আর ৫৩নং রাস্তার মাঝখানের অল্প বিস্তৃতিটার দিকে সংযুক্ত হয়েছে।

ব্রডওয়ে সর্বদাই ছুটছে। মাথা ঘুরিয়ে দেয় আর ঝলমলে। বসার কোনও জায়গা নেই। মঁমার্ত আলস্যপরায়ণ, মন্থরগতি, উদাসীন আর গতানুগতিক, খানিকটা বাজেই আর নোংরা, সম্মোহন করার মতো রূপসী সে নয়, ঝকমকে নয় কিন্তু ধুঁইয়ে ধুঁইয়ে ওঠা আগুনে দেদীপ্যমান।

ব্রডওয়ে রোমাঞ্চকর, এমনকী কখনও জাদুকরী, কিন্তু সেখানে আগুন নেই, তাপ নেই কোনও— সে এক ঝকঝকে আলোকিত অ্যাজবেস্টস্‌, বিজ্ঞাপনের প্রতিভূদের স্বর্গ। মঁমার্ত অতি ব্যবহারে জীর্ণ, নিষ্প্রভ, বেওয়ারিশ, ন্যাংটো লম্পট, ভাড়াটে সেনার মতো শুধু টাকার জন্য কাজ করে, অশ্লীল। যদি এমন কিছু থাকে, যা বিরক্তিকর অথচ আকর্ষণীয়, কিন্তু কপট কুটিলতার সাথে বিরক্তিকর, সেরকম আবাধ্য লম্পট সে। খানকতক বার এখানে রয়েছে যা একচেটিয়াভাবে বেশ্যা, দালাল, ঠগ আর জুয়াড়িতে ভর্তি, ওদের হাজারবার নিরস্ত করলেও শেষ অব্দি তোমায় চুষে নেবে আর দাবি করবে ঠকেছে বলে।    

এই বুলেভারের প্রধান বস্তু হল রাস্তার ধারের হোটেলগুলো, যাদের কদর্যতা এতোটাই বদ আর কুটিল যে সেখানে ঢোকার চিন্তামাত্র তুমি কেঁপে উঠবে, তবু এটা অনিবার্য যে এদের মধ্যে কোনও একটায় কোনও-না-কোনও দিন তুমি একটা রাত অন্তত কাটাবে, হয়তো একটা সপ্তাহ বা একটা মাস। এমনকী হয়তো এই জায়গাটার প্রতি আসক্তই হয়ে পড়বে এটা দেখে যে, একদিন তোমার গোটা জীবনের আদলটাই পালটে গেছে এবং একসময় যাকে তুমি হীন, জঘন্য ভেবেছ এখন তাকেই মোহময়, চমৎকার মনে হচ্ছে। বৃহৎ প্রেক্ষিতে, আমার সন্দেহ, মঁমার্তের এই কপট মোহের কারণ প্রকাশ্য ও বেআইনি যৌনব্যবসা।

সেক্স জিনিসটা রোম্যান্টিক নয় বিশেষত যখন তা বিকিকিনির হাটে এসেছে। কিন্তু ছেয়ে থাকা একটা সুগন্ধ সে তৈরি করতে পারে, একটা ঝাঁজালো অতীত-আর্তি। যা দুর্ধর্ষ আলোকিত গে হোয়াইট ওয়ের[৬] চেয়েও অনেক অনেক বেশি রহস্যময় আর সম্মোহনকারী। প্রকৃতপ্রস্তাবে আবছা, অন্ধকারময় আলোতেই যৌনজীবনের শ্রীবৃদ্ধি; আলো-আঁধারির ছায়াতেই এর ঘর, নিওন আলোর ঝলসানি এখানে নয়।

ক্লিশির এক কোণে কাফে ওয়েপলার, যা দীর্ঘদিন ধরে বহুবার যাওয়া আমার অত্যন্ত প্রিয় এক জায়গা। দিনের পুরোটা সময় সমস্তরকম আবহাওয়ায় তার ভেতরে, বাইরে আমি বসেছি। একটা আস্ত বইয়ের মতো আমি একে জানি। ওয়েটার, ম্যানেজার, ক্যাশিয়ার, বেশ্যা, খদ্দের এমনকী বাথরুমে থাকা অ্যাটেন্ডেন্টদের মুখগুলো আমার স্মৃতিতে এমনভাবে খোদাই করা আছে যেন তারা একটা বইয়ের অলঙ্করণ, যে বই আমি রোজ পড়েছি। মনে পড়ে, সেই প্রথম যখন এসেছিলাম কাফে ওয়েপলারে, আমার স্ত্রীর সাথে, ১৯২৮ সেটা; রোয়াকের ওপরে একটা ছোট্ট টেবিলে মাতাল বেহেড হয়ে এক বেশ্যাকে যখন মরে পড়ে যেতে দেখলাম, আর দেখলাম কেউ তাকে ধরার জন্য ছুটেও গেল না, কীরকম প্রবল ধাক্কা খেয়েছিলাম আমি এটা দেখে, মনে পড়ে। ফরাসিদের এই নির্বিকার ঔদাসীন্য হতবাক আর আতঙ্কিত করে দিয়েছিল আমাকে; এখনও করে, ওদের মধ্যে যেসব ভালো গুণ রয়েছে পরবর্তীকালে সেসব জানার পরেও। ‘এ কিছু না, সামান্য একটা বেশ্যা... একটু মাতাল হয়ে পড়েছিল আর কি’। এখনও আমি এই শব্দগুলো শুনতে পাই। আজও তারা আমার গায়ে কাঁটা দিয়ে যায়। কিন্তু এটাই প্রকৃত ফরাসিয়ানা, এই মনোভাবটা, আর তুমি যদি এটা মেনে নিতে না শেখো, ফ্রান্সে তোমার অবস্থানটা খুব সুখপ্রদ হবে না।  

ধূসর দিনগুলোয়, যখন বড় কাফেগুলো ছাড়া সর্বত্র ঠান্ডায় জমে গেছে, রাতে ডিনারে যাবার আগে কাফে ওয়েপলারে এক-দু ঘণ্টা কাটাবার জন্য আমি উন্মুখ হয়ে থাকতাম। কামোদ্দীপনার এমন সুসময় ভাসিয়ে নিয়ে যেত এই জায়গাটাকে, যা উঠে এসেছে এক ঝাঁক বেশ্যার হাত ধরে, যারা জমায়েত করে থাকত ঢোকার মুখটার কাছে। ধীরে ধীরে তারা খদ্দেরদের কাছে নিজেদের বিলি-বণ্টন করে দিলে, জায়গাটা তখন শুধু কামনায় উষ্ণই হয়ে উঠত না, মিষ্টি একটা সুগন্ধের মাধুর্যে ভরে যেত।

আবছা আলোয় সুগন্ধী জোনাকির মতো তারা ডানা ঝাপটাত। যারা খদ্দের খুঁজে নেবার মতো ভাগ্যবান হত না, রাস্তায় পায়চারি করত অলসভাবে, তারপর সাধারণত আবার ফিরে আসত একটু বাদেই, তাদের পুরনো জায়গায়। গর্বে অন্যদের মুখ তখন ঝকঝক করছে, সন্ধের পালা শুরু করতে তারা প্রস্তুত। যে কোণটায় সাধারণত ওরা জড়ো হত সেটা যেন একটা এক্সচেঞ্জ মার্কেট, এই সেক্স মার্কেটেরও ওঠা-নামা আছে অন্য এক্সচেঞ্জ মার্কেটের মতোই। বর্ষার দিনগুলো সাধারণত এখানে ভালো ব্যবসা-পাতির দিন, আমার চোখে তা-ই মনে হয়েছে। প্রবাদ আছে, একটা বর্ষার দিনে তুমি দুটো কাজই করতে পারো যখন বেশ্যারা কখনও তাস পিটিয়ে সময় নষ্ট করে না।

সেই দিনটাও ছিল বর্ষারই দিন, শেষবিকেলের দিক। কাফে ওয়েপলারে এক নবাগতাকে লক্ষ করলাম। আমি বেরিয়েছিলাম কেনাকাটা করতে, আমার হাত ভর্তি হয়ে আছে বই আর কিছু ফোনোগ্রাফ রেকর্ডে। সেদিন নিশ্চয়ই আমেরিকা থেকে একটা অপ্রত্যাশিত অর্থপ্রাপ্তি ঘটেছিল যার ফলে কেনাকাটা যা করেছি তারপরেও কয়েকশো ফ্রাঙ্ক তখনও আমার পকেটে। আমি বসে আছি ওই এক্সচেঞ্জের জায়গাটায়, ক্ষুধাময় এক মহিলামহল পরিবেষ্টিত হয়ে; ক্রমাগত খুঁচিয়ে যাওয়া বেশ্যার দল আর যা কিছু আমার সামনে দিয়ে যাচ্ছে সেসবে আমার কোনও প্রতিবন্ধকতাই হচ্ছিল না, কারণ আমার চোখ তখন একনজরে তাক করে আছে মোহসঞ্চারী ওই নবাগতা সুন্দরীর দিকে, যে অনেকটা তফাতে কাফের দূরবর্তী কোণে বসে আছে। তাকে অত্যন্ত আকর্ষণীয় সুন্দরী এক যুবতি বলেই মনে হল যে তার প্রেমিকের সাথে দেখা করবে বলে এসেছে এবং নির্ধারিত সময়ের অনেকটা আগেই চলে এসেছে। যে মদটা মেয়েটা অর্ডার করেছিল নামমাত্রই ছুঁয়েছে সেটা। তার টেবিলের পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া পুরুষদের দিকে সে পূর্ণ এবং স্থির দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে, কিন্তু তা থেকে কিছুই বোঝা যায় না— ব্রিটিশ বা আমেরিকান মহিলাদের মতো একজন ফরাসি মহিলা কখনওই তার দৃষ্টি সরিয়ে নেয় না। নিরুদ্বিগ্ন স্থির চোখে তাকিয়ে সে চারপাশ মাপছে, কিন্তু দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য কোনও স্পষ্ট প্রয়াস তাতে নেই। সে ছিল নিঃশব্দ পদসঞ্চারী এবং সম্ভ্রম উদ্রেককারী, আগাগোড়া স্থিতিসাম্যে টান টান আর নিজেকে ধরে রাখা একজন।

সে অপেক্ষা করছিল। আমিও অপেক্ষা করছিলাম। আমি উৎসুক ছিলাম দেখতে যে সে কার অপেক্ষায় বসে আছে।

আধঘণ্টা পর, যে সময়টায় আমি বেশ ক’বার তার চোখাচোখি হলাম এবং ধরে ফেললাম, এ মেয়ে অপেক্ষা করছে যেকোনও কারুর জন্যেই, যে সঙ্গত আনুষ্ঠানিক প্রস্তাবটা করবে। এসব ক্ষেত্রে সাধারণত মাথা বা হাত নেড়ে ইশারাটুকুই করতে হয় যাতে মেয়েটি তার টেবিল ছেড়ে উঠে আসবে এবং তোমার সাথে যোগ দেবে— যদি সে ঠিক সেই ধরনের মেয়ে হয়। কিন্তু তখনও আমি একেবারে নিশ্চিত হতে পারিনি। আমার চোখে তো সে দেখতে খুবই সুন্দর, সুপুষ্ট, উথলে ওঠা যাকে বলে— মানে বলতে চাইছি যত্নে লালিত আরকি।  

যখন ওয়েটার আরেকবার রাউন্ডে এল আমি মেয়েটিকে দেখিয়ে ওকে জিগ্যেস করলাম যে চেনে কিনা। ওয়েটার যখন বলল ‘না’, আমি বললাম ওকে এখানে আসতে বলো, আমার সাথে জয়েন করুক। আমি মন দিয়ে ওর মুখ লক্ষ করছিলাম যখন ওয়েটার ওকে মেসেজটা দিচ্ছিল। ওর মুখে হাসি এবং আমার দিকে তাকিয়ে অল্প মাথা নাড়ানোটা দেখে আমার যেন একটা রোমাঞ্চ দিয়ে গেল। আমি আশা করেছিলাম যে ও জলদি উঠে পড়বে এবং এদিকে চলে আসবে, কিন্তু তার বদলে বসেই রইল এবং আবার হাসল, এবারে আরও মৃদু, আর সঙ্গে সঙ্গে মাথাটা ঘুরিয়ে জানলা দিয়ে একদৃষ্টে স্বপ্নমাখা চোখে তাকিয়ে রইল। মাঝখানে ঢুকে পড়তে আমি একটু সময় দিলাম এবং দেখলাম নড়াচড়ার কোনও লক্ষণই তার নেই, এবারে আমি উঠে দাঁড়ালাম, সোজা হেঁটে গেলাম ওর টেবিলের দিকে। যথেষ্ট আন্তরিকভাবেই সে আমায় স্বাগত জানাল, যেন বাস্তবিকই আমি তার বন্ধু, কিন্তু আমি লক্ষ করলাম ও যেন একটু আচ্ছন্ন হয়ে আছে নেশায়, প্রায় অপ্রস্তুত। আমাকে বসতে দিতে চায় কি চায় না ঠিক নিশ্চিত ছিলাম না আমি, কিন্তু তা সত্ত্বেও আমি বসে পড়লাম এবং ড্রিঙ্ক অর্ডার করে চট করে ওর সাথে কথা বলতে শুরু করে দিলাম। (চলবে)

পরিশিষ্ট
১. পেইন’জ গ্রে (Payne’s grey) : নীল, লাল, কালো এবং শাদা রঞ্জকে তৈরি একটি কম্পোজিট পিগমেন্ট। বিশেষত জলরঙের ছবিতে ব্যবহার করা হয়। ঊনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে ব্রিটিশ শিল্পী উইলিয়াম পেইনের নামানুসারে এই নাম।
২. র‌্যু লাফিত্তে (Rue Laffitte) : প্যারিসের একটি রাস্তা। বর্তমানে এর বিস্তৃতি বুলেভার্দ দে ইতালিয়েনস থেকে র‌্যু নত্‌রদাম দে লরেত্তে অবধি। এই রাস্তাটার একেবারে শুরুর মুখে, অর্থাৎ বুলেভার্দ দে ইতালিয়েনসের জংশন থেকে সাক্রে কয়্যেরকে দেখে মনে হয় নত্‌রদাম গির্জার শৃঙ্গভাগে দাঁড়িয়ে আছে।   
৩. সাক্রে কয়্যের (Sacré Coeur) : ১৯১৪ সালে নির্মিত প্যারিসের রোমান ক্যাথলিক চার্চ। ইংরিজিতে পুরো নাম, ব্যাসিলিকা অফ দ্য সেক্রেড হার্ট অফ প্যারিস। ১৮৭১ সালের ফ্রাঙ্কো-প্রুশিয়ান যুদ্ধে ফরাসিদের পরাজয় এবং ওই বছরই সমাজতান্ত্রিক পারি কম্যিউনের জাতীয় স্মৃতিতে শহরের সবচেয়ে উচ্চবিন্দুতে মঁমার্তের শৃঙ্গভাগে রোমান-বাইজেন্টাইন স্থাপত্যরীতির এই চার্চ। ফরাসি রক্ষণশীলতার নৈতিক ভাষ্যের মূর্ত প্রকাশ বলে একে ধরা হয়। এর গম্বুজের চূড়া থেকে প্রায় গোটা প্যারিস শহরটাকে দেখা যায়। 
৪. মঁমার্ত : ফরাসি উচ্চারণে মঁমার্ত্র (Montmartre)। এটা প্যারিসের অষ্টাদশ প্রশাসনিক শাখার অন্তর্গত এক পাহাড়ি টিলা। এর চূড়াভাগে থাকা শ্বেত-গম্বুজওয়ালা সাক্রে কয়্যের গির্জা আর গোটা এলাকা জুড়ে ছড়ানো নৈশ কাফেগুলির জন্যে অধিক পরিচিত মঁমার্ত। দালি, পিকাসো, ভ্যান গঘ প্রমুখ বহু শিল্পী বিশ শতকের শুরু থেকে এখানে এসেছেন, থেকেছেন দীর্ঘকাল, তাঁদের কাজ করেছেন।
৫. অবারভিলে (Aubervillers) : প্যারিসের উত্তর-পূর্বের শহরতলিতে অবস্থিত একটি ফরাসি কম্যিউন।    
৬. গে হোয়াইট ওয়ে : ১৯০২ সাল থেকে নিউইয়র্কের ব্রডওয়েকে ‘গ্রেট হোয়াইট ওয়ে’ বলা হয়। মিউজিকাল গে হোয়াইট ওয়ে ১৯০৭-এর অক্টোবরে ফিলাডেলফিয়ায় অনুষ্ঠিত হওয়ার পর ক্যাসিনো থিয়েটারে চালু হলে, ‘গ্রেট হোয়াইট ওয়ে’র বদলে নাট্যশহর ব্রডওয়েকে সাধারণত ‘গে হোয়াইট ওয়ে’ নামেই ডাকা হত এর ডাকনাম হিসেবে। বিশ শতকের পঞ্চাশ এবং ষাটের দশক থেকে ‘গে’ শব্দটি ‘সমকামী’ অর্থে ব্যবহৃত হয়। আবার ওই সময় থেকেই টেলিভিশনের দর্শক বাড়ার সাথে সাথে আমেরিকার সংস্কৃতির ওপর ব্রডওয়ে মিউজিকালের বিপুল প্রভাব ও জনপ্রিয়তাও কমতে শুরু করে। এখন ‘গে হোয়াইট ওয়ে’ কথাটি কদাচিৎ ব্যবহৃত হতে দেখা যায়, যদি বা হয়, তাহলে ‘গে’ শব্দের সমকামী ব্যবহারকেই এতে উল্লেখ করা হয়।  

/জেডএস/

সম্পর্কিত

সাহিত্যতত্ত্ব : একটি সংক্ষিপ্ত পরিক্রমা

সাহিত্যতত্ত্ব : একটি সংক্ষিপ্ত পরিক্রমা

তুমি নামের অচেনা কেউ

তুমি নামের অচেনা কেউ

জীবনানন্দের ‘পৃথিবীলোক’ : নগর পতনেরও শব্দ শুনি

জীবনানন্দের ‘পৃথিবীলোক’ : নগর পতনেরও শব্দ শুনি

করিমের সহজ-স্বভাবী গান

করিমের সহজ-স্বভাবী গান

পর্ব—তিন

সাহিত্যতত্ত্ব : একটি সংক্ষিপ্ত পরিক্রমা

আপডেট : ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১২:০৫

পূর্বপ্রকাশের পর

এরিস্টটলের সাহিত্যতত্ত্ব

এরিস্টটল (৩৮৪ খ্রি. পূ.-৩২২ খ্রি. পূ.) ছিলেন প্লেটোর সবচেয়ে বিখ্যাত ছাত্র। তাঁর জন্ম মেসিদোনিয়ায়। ১৭ বছর বয়সে তিনি এথেন্সে এসে প্লেটোর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। ৩৪৭ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে প্লেটোর মৃত্যুর পরে তিনি এথেন্স ত্যাগ করেন। ৩৩৫ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে তিনি পুনরায় এথেন্সে ফিরে আসেন এবং তাঁর স্কুল লাইসিয়াম শুরু করেন। ৩২২ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে তিনি লাইসিয়াম থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেন এবং ঐবছরই ক্যালচিস নামক শহরে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। বলতে গেলে জ্ঞানবিজ্ঞানের এমন কোনো শাখা যার ওপর এই ৬২ বছরের জীবনে এরিস্টটল কাজ করেননি। জ্ঞানবিজ্ঞানের এই সকল শাখায় তিনি যে বইগুলো রচনা করেছিলেন সেগুলো হারিয়ে গেছে। যা আছে তা সম্ভবত তার লেখা বই নয়, বরং খুব সম্ভবত তাঁর কাছ থেকে নেওয়া বিভিন্ন লেকচার নোটের সংকলন। ফলে এগুলো প্লেটোর ‘দি রিপাবলিক’-এর মতো সুলিখিত নয় এবং সাহিত্যগন্ধীও নয়। সাহিত্য বিষয়ে ‘পোয়েটিকস’ তাঁর যে বইটি আমাদের কাছে আছে সেটিও সেরকম একটি লেকচার নোটের সংকলন। নোটগুলো তিনি হয়তো তাঁর লাইসিয়ামে লেকচারের জন্য তৈরি করেছিলেন। ফলে গ্রন্থভুক্ত বিষয়গুলোর আলোচনায় সুসংগঠিত পরম্পরা নেই, এবং ক্ষেত্রবিশেষে অনেক অস্পষ্টতা ও দুর্বোধ্যতা রয়েছে। তারপরও এটিই সাহিত্যতত্ত্ব বিষয়ে দুনিয়ার সকল দেশে সবচেয়ে বেশি রেফারেন্স দেওয়ার একটি বই। এরিস্টটলের সাহিত্যতত্ত্ব নিয়ে আলোচনা মানে হলো এই বইটি নিয়েই আলোচনা।

‘পোয়েটিকস’ গ্রন্থের পরিচ্ছেদগুলোকে তিনটি পর্বে ভাগ করা যায়। পরিচ্ছেদ-১ থেকে পরিচ্ছেদ-৫ পর্যন্ত বিস্তৃত প্রথম পর্বটিকে বলা যেতে পারে গ্রন্থটির সূচনা পর্ব যেখানে মাইমেসিস বা শিল্পের অপরিহার্য বৈশিষ্ট্য অনুকরণের অর্থ ও প্রকরণের আলোচনা রয়েছে। দ্বিতীয় পর্বের বিস্তৃতি পরিচ্ছেদ-৬ থেকে পরিচ্ছেদ-২২ পর্যন্ত। এ পর্বে মাইমেটিক আর্ট বা অনুকরণ শিল্পের একটি রূপ হিসেবে ট্র্যাজেডির গঠন ও বৈশিষ্ট্য নিয়ে আলোচনা রয়েছে। পরিচ্ছেদ ২৩ থেকে ২৬ পর্যন্ত তৃতীয় পর্বে রয়েছে ট্র্যাজেডির সাথে মহাকাব্যের তুলনা। আমরা এখানে বইটির পরিচ্ছেদ ধরে আলোচনা করব না। আমরা এখানে বরং ‘মাইমেসিস’ বিষয়ে এরিস্টটল ও প্লেটোর ভাবনার পার্থক্য এবং সেই পার্থক্যের সূত্র ধরে এরিস্টটল কর্তৃক সূচিত সাহিত্যবিষয়ক নতুন ভাবনার গতিপথ দেখব।

একথা বহু পণ্ডিত বলেছেন যে, এরিস্টটলের পোয়েটিকস ভিতরে ভিতরে প্লেটোর মাইমেসিস থিয়োরির একটি সমালোচনা এবং মাইমেসিসের বিরুদ্ধে প্লেটোর উচ্চারিত অপবাদগুলোর একটি জবাব। তবে সে জবাব সরাসরি নয়, হয়তো তাতে গুরুনিন্দা হয় বলেই এরিস্টটল সরাসরি প্লেটোর নামও উচ্চারণ করেননি এবং প্লেটোর অপবাদের ধরে ধরে একটি একটি করে জবাবও দেননি।

প্লেটোর আলোচনার মতোই এরিস্টটলও তাঁর আলোচনার কেন্দ্রে রেখেছেন মাইমেসিসকে, তবে মাইমেসিসের কোনো সংজ্ঞা দেওয়ার তিনি প্রয়োজন করেননি। সংজ্ঞা দিলে সে সংজ্ঞা গুরুর ভাবনার প্রতি সরাসরি দ্রোহ রূপে উচ্চারিত হবে সে ভাবনায়ও তিনি মাইমেসিসের সংজ্ঞা না দিয়ে থাকতে পারেন। তবে সংজ্ঞায় না বললেও আলোচনায় এরিস্টটল ধীরে ধীরে স্পষ্ট করেছেন তিনি কীভাবে মাইমেসিস বিষয়ে প্লেটো থেকে আলাদাভাবে ভাবছেন। প্লেটো বারবার বলেছেন যে, মাইমেসিস হলো প্রকৃতিকে এবং প্রকৃত বস্তুকে সত্য ও সঠিক রূপ থেকে ধাপে ধাপে বিকৃত করার একটি প্রয়াস। অথচ এরিস্টটল তাঁর পোয়েটিকসের ৪ নং পরিচ্ছেদে লিখেছেন ‘Poetry in general seems to have sprung from two causes, each of them lying deep in our nature. First, the instinct of imitation is implanted in man from childhood, one difference between him and other animals being that he is the most imitative of living creatures, and through imitation he learns his earliest lessons; and no less universal is the pleasure felt in things imitated.’

আশ্চর্যের সাথে লক্ষণীয় যে এই বাক্যদুটোতে এরিস্টটল যতগুলো অবধারণকে প্রকাশ করেছেন তার সবকটাই প্রায় সরাসরি মাইমেসিস বিষয়ে প্লেটোর অবধারণগুলোকে অস্বীকার করে। প্লেটো বলেছেন মাইমেসিস প্রকৃতিকে তথা প্রকৃত সত্যকে একধাপ বিকৃত করে। তার মানে প্লেটোর মতানুযায়ী মাইমেসিস একটি প্রকৃতিবিরুদ্ধ প্রক্রিয়া। কিন্তু এরিস্টটলের মতে মাইমেসিস প্রকৃতির গভীরে প্রোথিত এবং প্রকৃতির গভীর থেকে উৎসারিত (lying deep in our nature)। এরিস্টটলের মতে অনুকরণের প্রবৃত্তি মানবের জন্ম থেকে অর্জিত। তাই এ প্রবৃত্তি পরিহার্য তো নয়ই বরং এই প্রবৃত্তিই মানুষকে পশুজগতের থেকে আলাদা করেছে, অর্থাৎ এটি মানবজন্মকে মহীয়ান করে তুলতে পারে এমন এক চর্চা। অথচ প্লেটো বলেছিলেন মাইমেসিস বা অনুকরণ মানুষকে অজ্ঞানতার অন্ধকারের দিকে চালিত করে। আরো এক ধাপ এগিয়ে এরিস্টটল বলেছেন অনুকরণ একটি সার্বজনীন নান্দনিক আননন্দের উৎস। প্লেটো বেঁচে থাকলে নিশ্চয়ই অনুভব করতেন যে, তাঁর সুযোগ্য শিষ্য এই অবধারণগুলোর প্রতিটির মধ্যদিয়ে তাঁকে একটি করে চপেটাঘাত করছেন। 

মাইমেসিসকে এভাবে মহীয়ান করে তুলে এরিস্টটল ইহাকে শিল্পের জন্য অপরিহার্য ঘোষণা করলেন। তিনি বললেন শিল্পের যতরূপ আছে সবই আদিতে অনুকরণ। শিল্পের রূপ নির্ধারিত হয় অনুকরণের মাধ্যমের ওপর ভিত্তি করে। অনুকরণের মাধ্যম ভাষা হলে শিল্পরূপটির নাম হয় সাহিত্য, মাধ্যম সুর হলে তার নাম হয় সঙ্গীত, মাধ্যম ছন্দ (rhythm) হলে তার নাম হয় নৃত্য। অনুকরণের মাধ্যমের পরে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো অনুকরণের বস্তু বা বিষয়টি। অনুকরণের বিয়য়বস্তু মহৎ মানুষের কর্মকাণ্ড হলে নির্মিত হয় মহাকাব্য বা ট্র্যাজেডি আর নিচশ্রেণি বা খল চরিত্রের মানুষের অনুকরণের মধ্যদিয়ে নির্মিত কমেডি। অনুকরণের অন্তর্গত এই সকল বিষয় বিবেচনায় রেখেই মাইমেসিস সম্পর্কে ভাবতে হবে। মাইমেসিসকে ভাবতে হবে অনুকরণের মাধ্যম, বিষয় ও চারিত্র্যের সাথে সংশ্লিষ্ট করে, প্লেটোর ‘ফরম’ সম্পর্কিত মতবাদের সাথে সংশ্লিষ্ট করে নয় কিংবা মিরর ইমেজের উৎপাদক হিসেবে জ্ঞান করে নয়। ‘ফরম’ সম্পর্কিত প্লেটোর মতবাদের সাথে মেলাতে গেলেই মাইমেসিসের দায় হয়ে পড়ে যে বস্তুকে সে অনুকরণ করছে তার একটি দার্পণিক প্রতিবিম্ব বা মিরর ইমেজ তৈরি করা। কিন্তু মাইমেসিস তার মাধ্যম, বিষয়বস্তু আর চরিত্রগত আচার (manner) দ্বারা এমনভাবে স্বতন্ত্র ও স্বাধীন একটি বিষয় যে তার দায় পড়েনি বস্তুর দার্পণিক প্রতিবিম্ব তৈরি করা। এভাবে ভাবতে পারলে মাইমেসিসকে মুক্ত করা যাবে প্লেটোর আরোপিত অপবাদগুলো থেকে। এ কথা বোঝাতেই এরিস্টটল ‘পোয়েটিকস’-এর একদম শুরুতেই বলেছেন ও I propose to treat of poetry in itself| GB in itself এর ইঙ্গিত হলো মাইমেসিসকে প্লেটোর ‘ফরম’ সম্পর্কিত মতবাদের সাথে সংশ্লিষ্ট করে ভাবা যাবে না। এভাবে এরিস্টটল প্লেটোর বিপরীতে দাঁড়িয়ে মাইমেসিসকে শুধু শিল্প অঙ্গনে প্রতিষ্ঠিতই করেননি, মাইমেসিসের মাধ্যমে অর্জিত শিল্পের রূপ ও প্রকরণ সম্বন্ধেও তিনিই প্রথম তাত্ত্বিক ধারণা দিয়েছেন।

এরিস্টটলের তত্ত্বমতে সাহিত্য মাইমেটিক আর্ট হিসেবে দার্পণিক প্রতিবিম্ব তৈরি করে না, বরং বস্তুর আইকন তৈরি করে। এরিস্টটল ‘পোয়েটিকস’-এর ৪র্থ পরিচ্ছেদে লিখেছেন ‘Thus the reason why men enjoy seeing a likeness is that in cotemplating it they find themselves learning or inferring, saying perhaps ‘Ah, that is he’. For if you happen not to have seen the original, the pleasure will be due not to the imitation as such, but to the execution, the colouring, or some such other cause.’ এরিস্টটল এখানে বলেছেন যে, মাইমেসিসের কাজ হলো সাদৃশ্যভিত্তিক, সাদৃশ্যের মাধ্যমে অনুকৃত বস্তুর কাছাকাছি যাওয়া (seeing a likeness), মোটেই অবিকল বস্তুটি উৎপাদন করা নয়। আর এই সাদৃশ্যের জন্য মূল বস্তুটি আদৌ দরকারিও নাও হতে পারে। কারণ মূল বস্তু আদৌ না দেখেও, শুধু অনুকৃত বস্তু দেখেও আনন্দ লাভ ঘটতে পারে। সেক্ষেত্রে অনুকরণ নয়, কাজটির সম্পাদন (execution), সে সম্পাদনে রঙের ব্যবহার বা অন্য কোনো বিষয়ের কারণেও আনন্দটি লাভ করা যেতে পারে। মোটের ওপরে এরিস্টটল পুরোপুরি সরে গেছেন প্লেটোর সেই আপ্ত ধারণা থেকে যে, মাইমেটিক আর্টের কাজ হলো বস্তুর প্রতিবিম্ব উৎপাদন। এরিস্টটল বরং বলতে চান অনুকৃত বস্তু কোনো দিন না দেখেও বস্তুর এই অনুকরণশিল্পের সাধনা সম্ভব। কথাটি আরো স্পষ্ট হয় ‘পোয়েটিকস’-এর ২৫তম পরিচ্ছেদে। সেখানে এরিস্টটল বলছেন not to know that a hind has no horns is a less serious matter than to paint it inartistically । দেখা যাচ্ছে, শিংসমেত একটি হরিণী অংকন করা যা বস্তু সত্যের পুরো লঙ্ঘন তা-ও মাইমেটিক আর্টে মেনে নেওয়া সম্ভব। তার মানে হলো মাইমেটিক আর্টের কাজ নয় প্রকৃতির প্রতিবিম্ব নির্মাণ, তার কাজ হলো অনুকরণের নিজস্ব রীতি-বৈশিষ্ট্যের মধ্যে থেকে নান্দনিক আনন্দ সৃষ্টির লক্ষ্যে বস্তুর প্রতীকী উপস্থাপন বা বস্তুর আইকন নির্মাণ।

আইকন মানে ঠিক বস্তুটি নয়, বরং বস্তুর সাথে অপরিহার্য সম্পর্কযুক্ত এমন কিছু যা ঐ বস্তুকে বোঝায়। ‘গাছ’ দ্বারা আমরা যে বস্তুটি বুঝি তার সাথে ‘গাছ’ ধ্বনির কোনো অপরিহার্য সম্পর্ক নেই, বরং যে সম্পর্কটি আছে তা সম্পূর্ণ খামখেয়ালি গোছের। ফলে ‘গাছ’ শব্দটি বস্তু গাছের কোনো আইকন নয়। কিন্তু একটি মুখমণ্ডলের ছবি মুখমণ্ডলটির আইকন কারণ এর সাথে মুখমণ্ডলটির অনস্বীকার্য ও অপরিহার্য সম্পর্ক রয়েছে। একটি মুখমণ্ডলের ছবি, সত্যিকারের কোনো মুখমণ্ডলের প্রতিকৃতি না হয়েও আইকনিক হওয়ার মধ্যদিয়ে আনন্দ সৃষ্টিতে সক্ষম হয়, যেমন কার্টুনের জন্য আঁকা মুখমণ্ডলগুলো আমাদেরকে আনন্দ দিয়ে থাকে। কার্টুনরূপ মনুষ্য চেহারা মানুষের চেহারার সাথে ন্যূনতম সাদৃশ্য নিয়েই মাইমেটিক আর্ট হতে পারছে, কোনো নির্দিষ্ট চেহারার সাথে আদৌ সাদৃশ্যপূর্ণ হতে হচ্ছে না। ঐ ন্যূনতম সাদৃশ্য থেকেই দর্শক চিনতে পারছে আইকনটি কিসের? আর চিনতে পারার মধ্যদিয়েই তার মধ্যে এক আনন্দ অনুভবের অনুরণন ঘটছে। আইকনিক উপস্থাপনার দ্বারা এরিস্টটল এরূপ মাইমেটিক আর্টের কথা বলেছেন যা প্লেটোর বলা মাইমেটিক আর্টের ভাবনা থেকে যোজন যোজন দূরের ভাবনা। প্লেটো মাইমেটিক আর্টকে বর্জনীয় বলছেন কারণ, এই আর্ট বস্তুর প্রতিবিম্বে খুঁত তৈরি করে (flawed image), আর এরিস্টটল মাইমেটিক আর্টের নান্দনিক বৈশিষ্ট্য হিসেবে সেই খুঁতকেই মূল্যায়ন করছেন। এই ভাবনা দ্বারা এরিস্টটল নিশ্চিত করছেন যে, মাইমেটিক আর্টের উৎকর্ষের পরিমাপক মোটেই সাদৃশ্যের সঠিকতা নয় বা নিখুঁত সাদৃশ্য নয়। বরং এর উৎকর্ষের পরিমাপক হবে আর্ট হিসেবে চর্চার জন্য এর উপযোগী বিভিন্ন কলাকৌশল ও রীতিনিয়ম। যা ঘটে তার নিখুঁত বর্ণনা মাইমেটিক আর্ট হলে ইতিহাস হতো ট্র্যাজেডি বা কমেডির চেয়ে উঁচু সাহিত্য। অথচ, আমরা জানি ইহিতাস সাহিত্য নয়, বরং ট্র্যাজেডিই সাহিত্য। ট্র্যাজেডি যা ঘটেছে তার বয়ান নয়, যা ঘটতে পারে তার বয়ান। যা ঘটেছে তা নয়, বরং যা ঘটতে পারে বা পারত মাইমেসিসের মাধ্যমে তার অনুকরণের দিকেই এরিস্টটলের আহ্বান।

প্লেটো সাহিত্য বা মাইমেটিক আর্টকে নিষিদ্ধ করার পেছনে একটি যুক্তি দেখিয়েছিলেন এই যে, ইহা মানুষের অনুভবগুলোকে জাগিয়ে তুলে তার যুক্তিবুদ্ধিকে (Reason) বিনষ্ট করে। প্লেটোর এই বক্তব্যের বিপরীতে রয়েছে এরিস্টটলের ‘ক্যাথারসিস’ তত্ত্ব। এরিস্টটলের ক্যাথারসিস তত্ত্ব অনুযায়ী ট্র্যাজেডি মানুষের মাঝে ‘করুণা’ ও ‘ভীতি’র অনুভব (pity and fear) জাগিয়ে মানুষের যুক্তিবুদ্ধিকে (Reason) বিনষ্ট তো করেই না, বরং এই অনুভূতিগুলো প্রবলভাবে জাগিয়ে তুলে তা মানুষের অনুভবরাজ্য থেকে সরিয়ে দিয়ে অর্থাৎ মানুষের অনুভরাজ্যের অপদ্রব্য সরিয়ে দিয়ে মানুষটিকে বিশুদ্ধ করে তোলে এবং এর মাধ্যমে মানুষটির যুক্তিবুদ্ধি (Reason) আরো পরিষ্কার হয়, শানিত হয়। এভাবেই এরস্টিটল তাঁর পোয়েটিকসে পরোক্ষে সাহিত্যের বিরুদ্ধে তাঁর গুরুর উত্থাপিত অভিযোগসমূহ খণ্ডন করেছেন এবং অনুকরণধর্মী শিল্প হিসেবে সাহিত্যের জয়গান উচ্চারণ করেছেন যা সাহিত্যের পাঠকদেরকে সাহিত্য বুঝতে ও সাহিত্যের রসাস্বাদনে হাজার হাজার বছর চিন্তার আশ্রয় হিসেবে কাজ করেছে। সাহিত্য সম্পর্কে এরিরস্টলের এই ভাবনার পরে আমরা আসবো রোমান যুগের আর এক সাহিত্যবোদ্ধার ভাবনার সাথে পরিচিত হতে। তিনি হলেন লঞ্জাইনাস, যাঁর নাম আমরা অনেকে লঙিনুস রূপে উচ্চারণ করে থাকি। চলবে

/জেডএস/

সম্পর্কিত

তুমি নামের অচেনা কেউ

তুমি নামের অচেনা কেউ

জীবনানন্দের ‘পৃথিবীলোক’ : নগর পতনেরও শব্দ শুনি

জীবনানন্দের ‘পৃথিবীলোক’ : নগর পতনেরও শব্দ শুনি

করিমের সহজ-স্বভাবী গান

করিমের সহজ-স্বভাবী গান

ভাষার নাম পাই (PIE) ।। গাস্তঁ দোরেন

ভাষার নাম পাই (PIE) ।। গাস্তঁ দোরেন

তুমি নামের অচেনা কেউ

আপডেট : ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২১, ২২:৩৫

তুমি নামের অচেনা কেউ

চার উপাঙ্গ সমানে দোলাও
বিলিয়ে যাও জুরাসিক কালের গান
তুমি কি পাখির মতন?

অথবা মূক বৃক্ষের মতন নির্বিকার
          ফ্যাকাসে ধুলোর সরানে
          ঢেলে দাও মধুর অম্লজান।

সবরমতী এক্সপ্রেসের মতন 
ধেয়ে আসে ঈশান-ঘূর্ণি
পাখিরা পালায়—ভেঙে যায় ডানার অহংকার
শেকড়ের ওজরেও নুয়ে পড়ে বৃক্ষ।

তুমি আসলে বাতাস
ভেঙে দাও প্রকাশরূপ—আলোর সংস্করণ।


জল ছাড়া অন্যকিছু 

শৈশবের নদী
যার ঢেউগুলোকে কুমারীর কুচ ভেবে
লাফিয়ে ওঠে পানকৌড়ি,

মানুষ পানিউড়ি হলে
জেনে যায় কবিতা আসলে উলঙ্গ সমুদ্দুর
যার চিকন ঢেউয়ে যুবতী আঁচলের ভ্রম,

মুহাজির মানুষ ঢেউ সোয়ারি হলে
জেনে যায় কবিতা জল ছাড়া কিছু নয়
যে কেবল তৃষ্ণা মেটায় না—ডুবিয়েও মারে।


নাস্তিকাল

বারবেলা পড়ে আছে
                  নাগরিক উঠোনে
কণ্ঠস্বরগুলোর ওপর 
            সেঁটে আছে লকডাউন 

ও পৌষালি পাখি
গান গাইবার আগে মিলিয়ে নাও
          গ্রহস্ফুটের নক্ষত্র সংখ্যা

পরিযায়ী মেঘের ক্যানভাসে ভেসে ওঠে—ফলাফল
বাক্য নাস্তি, শ্রুতি নাস্তি, দর্শন নাস্তি।

/জেডএস/

সম্পর্কিত

সাহিত্যতত্ত্ব : একটি সংক্ষিপ্ত পরিক্রমা

সাহিত্যতত্ত্ব : একটি সংক্ষিপ্ত পরিক্রমা

জীবনানন্দের ‘পৃথিবীলোক’ : নগর পতনেরও শব্দ শুনি

জীবনানন্দের ‘পৃথিবীলোক’ : নগর পতনেরও শব্দ শুনি

করিমের সহজ-স্বভাবী গান

করিমের সহজ-স্বভাবী গান

ভাষার নাম পাই (PIE) ।। গাস্তঁ দোরেন

ভাষার নাম পাই (PIE) ।। গাস্তঁ দোরেন

জীবনানন্দের ‘পৃথিবীলোক’ : নগর পতনেরও শব্দ শুনি

আপডেট : ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১৬:০৬

‘দূরে কাছে কেবলি নগর, ঘর ভাঙ্গে 
গ্রাম পতনের শব্দ হয়;’
                         
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর পৃথিবীর অস্বাভাবিক নগরায়ণ দেখে কি জীবনানন্দ-কবি ওপরের পঙক্তিদুটি লিখেছিলেন? 
আর পরক্ষণেই আরো ছ-পঙক্তিতে তিনি বিশদ করছেন :
‘মানুষেরা ঢের যুগ কাটিয়ে দিয়েছে পৃথিবীতে, 
দেয়ালে তাদের ছায়া তবু 
ক্ষতি, মৃত্যু, ভয় 
বিহ্বলতা ব’লে মনে হয়।
এসব শূন্যতা ছাড়া কোনোদিকে আজ 
কিছু নেই সময়ের তীরে।’

আজ এই করোনাকরুণ সময়ে দাঁড়িয়ে সত্যিই মনে হয়, মানুষ যদিও ‘ঢের যুগ কাটিয়ে দিয়েছে পৃথিবীতে’ এবং তার অর্জনও অসীম, তবু, তার সেরা উপার্জন মনে হয় কবি-কথিত ‘ক্ষতি, মৃত্যু, ভয়, বিহ্বলতা’ ছাড়া আর কিছুই নয়! আর এত নগর, এত প্রযুক্তি, ভোগ-সুখের এত অপার অপচয়ের সুযোগ, তবু যেন সত্যিই ‘শূন্যতা ছাড়া কোনোদিকে আজ কিছু নেই’। কারণ পৃথিবীর তাবৎ মানুষের দানবীয় শক্তিও এই অদৃশ্য ভাইরাসের কিচ্ছুটি করতে পারছে না, বরং বছরজুড়ে তার হাতে মার খেয়েই চলেছে। মানবজাতির তাবৎ জ্ঞান-বুদ্ধি-বিজ্ঞানের কেরদানিকে সে যেন বুড়ো আঙুল দেখিয়ে চলেছে। অথচ মানবজাতি তার বিপুল ধরিত্রীমাতাকে শতবার বিনাশ করার প্রযুক্তি করায়ত্ত করেছে, প্রতিদিন পৃথিবীর বুক ছিঁড়েখুঁড়ে তার সুখের প্রাসাদ নির্মাণ করছে, সমুদ্র থেকে আকাশ-বাতাস-মাটি-অরণ্য সবকিছুকে দূষিত করে, লক্ষ-লক্ষ প্রাণ ও বৃক্ষলতাকে প্রতিনিয়ত হত্যা করে তার অসীম প্রভুত্ব বিস্তার করেছে। এই আত্মগর্বী, জ্ঞানপাপী মানবকুল এবং তাদের মদমত্ত, বলদর্পী, ক্ষমতা ও ধনলোভী শাসক ও বণিকদল পৃথিবীকে যেন ভোগ আর মুনাফার ভাগাড় বানিয়ে ছেড়েছে। কিন্তু পৃথিবীও তার অদৃশ্য অস্ত্র দিয়ে আমাদের গালে চপেটাঘাত করে দেখিয়ে দিচ্ছে, মানুষ নিজেকে যতটা বড় মনে করে, তত বড় হতে তার ঢের বাকি আছে!

অবশ্য মানুষ যে আদতেই সামান্য, সামান্য ব্যতিক্রম ছাড়া প্রকৃতিরই তুচ্ছ অংশমাত্র, সে-কথাও মানুষই তার জ্ঞান-বিবেক-বুদ্ধি দিয়ে হাজার হাজার বছর ধরে বুঝেছে এবং চিন্তা-দর্শন-ধর্ম-সংস্কৃতি ও ব্যাবহারিকতার মাধ্যমে তার চর্চা করেছে। তবে কী এক বিপন্ন-বিকারে মানুষ যত ‘সভ্য’ হয়েছে, প্রকৃতির প্রতি তার ‘অসভ্যতা’ মাত্রাহীনতা পেয়েছে। কেবল তা-ই নয়, উনিশ শতক থেকে শুরু হয়েছে উৎকট-নগরায়ণ এবং আজকের এই একুশ শতকে প্রতিদিনই তীব্রগতিতে গ্রামের ভিতর শহর ঢুকে পড়ছে, প্রতিদিনই চলছে বৃক্ষ-নদী-ভূমিহত্যার উৎসব। নগরায়ণের সঙ্গে আছে ক্ষমতা, পুঁজি ও মুনাফার সম্পর্ক। আর তা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই উদগ্র লোভ-ভোগ-দখলের বিচারবোধহীনতার সঙ্গে সম্পর্কিত। এ কেবল যে প্রকৃতির ভারসাম্যকেই বিনষ্ট করে তা নয়, বরং মানবিক ভারসাম্যকেও ধ্বংস করে দেয়। পরিণামে কেবল মাটিই ইট-পাথরে রূপান্তরিত হয় না, বরং মানুষ নিজেকেও শুষ্ক করে তোলে; তার সজল আত্মা মরুতে পরিণত হয় এবং তা ভেতরে ভেতরে তাকে শিকড়হীন-উন্মূল করে তোলে; নানা ব্যাধি ও বিকার তাকে ছিন্নভিন্ন করে দেয়।

এ কথা মনে করেই হয়তো জীবনানন্দ-কবি তাঁর এই ‘পৃথিবীলোক’ কবিতার শেষ চার পঙক্তিতে লেখেন :            
‘তবু ব্যর্থ মানুষের গ্লানি ভুল চিন্তা সংকল্পের 
অবিরল মরুভূমি ঘিরে 
বিচিত্র বৃক্ষের শব্দে স্নিগ্ধ এক দেশ 
এ পৃথিবী, এই প্রেম, জ্ঞান আর হৃদয়ের এই নির্দেশ।’

কী চমৎকারভাবেই না জীবন-কবি বলেছেন, ‘বিচিত্র বৃক্ষের শব্দে স্নিগ্ধ এক দেশ এ পৃথিবী’! তবু মানবজাতি ‘এই প্রেম, জ্ঞান আর হৃদয়ের এই নির্দেশ’ কী অবলীলায় ভুল মেরে বসে আছে। অথচ আর কোনো প্রাণ-প্রজাতি নয়, কেবল মানবপ্রাণির জন্যই কত-না ঊর্ধ্বলোক থেকে কত-না গর্জন-বর্ষণ যুগে যুগে এসেছে বারবার। তবু মানুষ আজও হলো না মানুষ। কবে যে হবে কিংবা হবে কোনো দিন!
এই পৃথিবীলোক তবে কি মানুষের হাতেই হবে শহিদ! একদিন পতন হবে সব নগরের, মিলিয়ে যাবে তার সকল গৌরব!! 

[উৎসর্গ : প্রণম্য প্রকৃতিসাধক দ্বিজেন শর্মা]

/জেডএস/

সম্পর্কিত

সাহিত্যতত্ত্ব : একটি সংক্ষিপ্ত পরিক্রমা

সাহিত্যতত্ত্ব : একটি সংক্ষিপ্ত পরিক্রমা

তুমি নামের অচেনা কেউ

তুমি নামের অচেনা কেউ

করিমের সহজ-স্বভাবী গান

করিমের সহজ-স্বভাবী গান

ভাষার নাম পাই (PIE) ।। গাস্তঁ দোরেন

ভাষার নাম পাই (PIE) ।। গাস্তঁ দোরেন

করিমের সহজ-স্বভাবী গান

আপডেট : ১২ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১৪:৪১

‘আমি তোমায় চাই রে বন্ধু
আর আমার দরদি নাই রে॥

না জেনে করেছি কর্ম 
দোষ দিব আর কারে 
সর্পের গায়ে হাত দিয়াছি
বিষে তনু ঝরে রে
আর আমার দরদি নাই রে॥

আমার বুকে আগুন রে বন্ধু
তোমার বুকে পানি
দুই দেশে দুই জনার বাস
কে নিভাইব আগুনি রে 
আর আমার দরদি নাই রে॥

জন্মাবধি কর্মপোড়া
ভাগ্যে না লয় জোড়া 
এ করিম রে করবায় নাকি
দেশের বাতাস ছাড়া
আর আমার দরদি নাই রে॥’

করিম তার গানের মাধ্যমে যে-জায়গায়ই পৌঁছতে চান না কেন, তার মাধ্যম হিসেবে—ভাষা, বিষয় ও সুর গ্রহণে—কতটা সহজ ও স্বাভাবিক থাকা যায় সে-চেষ্টা করে গেছেন আজীবন এবং এ-ক্ষেত্রে তিনি যে পূর্ণমাত্রায় সফল, তার বড় নজির উপরিউক্ত গান : ‘বন্ধু দরদিয়া রে’। 
গানটি যতবারই শুনি, আমার মনে পড়ে যায় গাঁয়ের কোনো-এক রাখাল যুবকের কথা, যে-কিনা প্রেমে পড়ে পথে-পথে গোপাটে-গোপাটে ঘুরছে। এই অবস্থায় কেমন হওয়া উচিত সেই যুবকের মুখের ভাষা? যে কিনা একদমই নিরুপায় এবং এমন কোনো জানা পথও যে যেদিকে কোথাও চলে যেতে পারে সে—সেই অবস্থায়, গানের বাণী-অনুয়ায়ী বিকল্প হতে পারত কোনো ওঝা-বদ্যি? কিন্তু মনে হয় না তার প্রতি কোনো আস্থা আছে, বা, থাকলেও, সে-চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে গেছে প্রেমিক : 

‘না জেনে করেছি কর্ম 
দোষ দিব আর কারে 
সর্পের গায়ে হাত দিয়াছি
বিষে তনু ঝরে রে
আর আমি দরদি নাই রে॥’ 

বোঝা যাচ্ছে এই এই কর্ম অজানিত, জেনে-শুনে বিষ পান করা নয়, ফলে কৌশল অবলম্বন করাও যায়নি, এই অ-জ্ঞান কর্মের সঙ্গে কৃষ্ণের-পরমত্ব-বিষয়ে আপাতজ্ঞানহীন রাধার সমর্পণেরও মিল নেই, তবে বৃন্দাবন ত্যাগের পর রাধার যে একম্মন্যতা, তার সঙ্গে এই ভাবের মিল রয়েছে : ‘আর আমার দরদি নাই রে’—তুমিই আমার ওঝা-বদ্যি—তুমিই আমার সকল নির্ভরতা। এই কারণে সমস্ত সভ্যতা-ভব্যতা ছেড়ে, গানের বাণী তার সকল অলংকার খুলে ফেলে, নিরুপায় প্রেমিককে শেষপর্যন্ত জানিয়ে দিতে হয় : 

‘আমি তোমায় চাই রে বন্ধু
আর আমার দরদি নাই রে॥’
 
প্রেমিক/রাখাল যুবকের মুখে এমন সহজ ও সরাসরি উচ্চারণ এই কারণেই স্বাভাবিক হয়েছে যে, ভাব প্রকাশের নানা সংকেত ও সংবেদন/চেতনা-সংবলিত কোনো অধুনান্তন প্রতীকের ব্যবহার সে শেখেনি, বা হতে পারে, এই বেফানা অবস্থায় কোনোরকমের ঝুঁকি/সময়ও সে নিতে চায় না। এ-বিষয়ে প্রথম অন্তরায় সর্পের ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন উঠলে, এলিয়টকথিত দ্বিতীয় স্বরের কথা উঠতে পারে; এখানে প্রথম স্বর মুখপদ-এর স্বগতোক্তি আর দ্বিতীয় স্বর পাঠকের উদ্দেশে কবির/করিমের ব্যাখ্যা; এ-ছাড়া কিছু-কিছু বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরে সর্প যেভাবে নঞর্থ প্রতীক রূপে ব্যবহৃত, তা-ও এখন সবার কাছে বহুপরিচিত প্রতীকেরই দৃষ্টান্ত হয়ে গেছে। বহুপরিচিত প্রতীকের উদাহরণ রয়েছে গানের দ্বিতীয় অন্তরায়ও, সেই প্রতীক দুটি ‘আগুন’ ও ‘পানি’ : দৃশ্যত—এমনকি  কাজের ক্ষেত্রেও—বিপরীতধর্মী, কিন্তু ‘প্রকৃত প্রস্তাবে’ দ্বন্দ্বস্বভাবী। ভাব প্রকাশের জন্য এই দুটি প্রতীক কীভাবে সার্থক হয়ে উঠেছে, তার প্রমাণ ‘আমার’, ‘তোমার’ আর দুই দেশে এই দুই জনের অবস্থান ও দূরত্ব :             

‘আমার বুকে আগুন রে বন্ধু
তোমার বুকে পানি
দুই দেশে দুই জনার বাস
কে নিভাইব আগুনি রে 
আর আমার দরদি নাই রে॥’

বলা নিস্প্রয়োজন, এখানে দুই দেশ মানে দুই অঞ্চল, হতে পারে দুই গ্রাম, যেখানে ‘দুই জনা’র অবস্থান; এরা ঠিক পরস্পরনির্ভরশীল কি না জানি না, কিন্তু আমার/আগুন-এর জন্য তোমার/পানি-র দরকার, এরকম এক অনিবার্যতা রয়ে গেছে বাণীতে, আর তা বোঝানোর জন্য এর চেয়ে সহজ ও লক্ষ্যভেদী প্রতীক পাওয়া কঠিন। 
তবে প্রতীকে এই অনিবার্যতা ফুটে উঠলেও, বাস্তবে—ভণিতা-পদে রয়েছে না-পাওয়ার শংকা, জন্মজীবননিয়তি-বিষয়ে হতাশা এবং সর্বোপরি, দোলাচলতা। গানটি যারা শুনেছেন তারা জানেন যে—করিমের কণ্ঠে শুনে থাকলে তো কথাই নেই—এর মধ্যে বাতাসের মৃদুমন্দ প্রবহমানতা রয়েছে; যারা শোনেননি, তারা পড়ে অন্তত এটুকু কল্পনা করে নিতে পারবেন যে, গাঁয়ের গোপাট ধরে, গায়ে ‘দেশের বাতাস’ লাগিয়ে, বন্ধু দরদিয়া রে...এ বন্ধু দরদিয়া রে...এ গাইতে-গাইতে হেঁটে চলেছে কোনো যুবক : 

‘জন্মাবধি কর্মপোড়া
ভাগ্যে না লয় জোড়া 
এ করিম রে করবায় নাকি
দেশের বাতাস ছাড়া
আর আমার দরদি নাই রে॥’

আগের অন্তরায় অঞ্চল, গ্রাম বা স্থান ব্যবহার না করে, কেন ‘দেশ’ ব্যবহার করা হয়েছিল, তা বোঝা যায় এই অংশটি পড়ে। এখানে ‘এ করিম রে করবায় নাকি/দেশের বাতাস ছাড়া’ গাইবার সময় যে শংকা ও হাহাকারটুকু ঝরে পড়ে, তাতে দূর ‘দেশ’-এর আপাতনিস্তরঙ্গ পানিতে কতটুকু তরঙ্গ জাগবে জানি না, বা তাতে কোনো পারমার্থিক লক্ষ্য পূরণ হয় কি না তাও জানি না, কিন্তু আমরা, করিমের স্বদেশিরা, সঙ্গত করতে করতে তাঁর সঙ্গে, প্রেমিক যুবকের সঙ্গে গাইতে শুরু করি ‘বন্ধু দরদিয়া রে’...       

 

/জেডএস/

সম্পর্কিত

সাহিত্যতত্ত্ব : একটি সংক্ষিপ্ত পরিক্রমা

সাহিত্যতত্ত্ব : একটি সংক্ষিপ্ত পরিক্রমা

তুমি নামের অচেনা কেউ

তুমি নামের অচেনা কেউ

জীবনানন্দের ‘পৃথিবীলোক’ : নগর পতনেরও শব্দ শুনি

জীবনানন্দের ‘পৃথিবীলোক’ : নগর পতনেরও শব্দ শুনি

ভাষার নাম পাই (PIE) ।। গাস্তঁ দোরেন

ভাষার নাম পাই (PIE) ।। গাস্তঁ দোরেন

ভাষার নাম পাই (PIE) ।। গাস্তঁ দোরেন

আপডেট : ১২ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১০:০৮

ভিন ভাষার প্রতি ইংরেজিভাষীর দৃষ্টিভঙ্গি অনেকটা এরকম : চলো, লুট করা যাক; শেখার দরকার নাই।

ইংরেজি ভাষার শব্দভান্ডারের একটা বিপুল অংশ ফরাসি, লাতিন অথবা অন্য কোনো ভাষা থেকে আসা। কিন্তু ইংরেজরা একটা বিদেশি ভাষা পুরোপুরি শেখার ব্যাপারে কখনো তেমন গা করেনি। চার্লস ডিকেন্স তাঁর লিটল ডরিট উপন্যাসে মি. মিগলস-এর মুখ থেকে এই কথা বলিয়েছেন : ‘আমি যেকোনো কিছু সানন্দে করতে রাজি আছি, শুধু ওই ভাষাটি বলা ছাড়া।’ আর, এর দেড়শ বছর পরে ব্রিটিশ কৌতুকাভিনেতা এডি ইযার্ড তাঁর দেশের একভাষিকদের মনের কথা এভাবে প্রকাশ করেছেন : ‘এক মাথায় দুই ভাষা? এই বেগে কেউ বাঁচতে পারে না।’

বলাই বাহুল্য যে, এগুলো ক্যারিকেচার। কিন্তু ভাষার ব্যাপারে ব্রিটিশ সংরাগ বা প্যাশন সুতীব্র হলেও সেটা মুখ্যত কেবল ইংরেজির প্রতি আকর্ষণেই সীমাবদ্ধ। পান (pun) বা শব্দ নিয়ে ক্রীড়া-কৌতুক আর শব্দজব্দ (ক্রসওয়ার্ড) খেলায় ব্রিটিশরা অদম্য, প্রবল উৎসাহী, সেই সঙ্গে তাঁরা তাঁদের দেশি ভাষার ইতিহাস আর বৈচিত্র্য নিয়েও মন্ত্রমুগ্ধ। এবং ব্রিটিশরা খ্যাপাটে ব্যাকরণ আর সঙ্গতিহীন বানান নিয়ে অনুযোগ করতে পছন্দ করে ঠিকই, কিন্তু আমি ভাবি তাদের মধ্যে ঠিক কতজন এর অন্যথা হলে সেটা পছন্দ করতেন। এই সমস্ত উদ্ভটত্ব দুর্দান্ত সব গল্প তৈরি করে। এর চাইতে বেশি কেউ আর কী চাইতে পারে?

তা, অন্য ভাষাগুলোর জীবনের কী অবস্থা? ইউরোপের অসংখ্য ভাষা সেগুলোর ধ্বনিগত আর লিখিত ধরন নিয়ে বেশ ভীতিকর শোনাতে পারে, কিন্তু সেগুলো সম্পর্কে যেসব গল্প-কাহিনি প্রচলিত ছিল সেগুলো বেশ আকর্ষণীয়। এই বইয়ে সেসব গল্পের সেরা ষাটটি বলা হয়েছে। আপনারা দেখতে পাবেন দৃশ্যত পরিণত মনে হলেও কিভাবে ফরাসি ভাষা আসলে মাতৃ-আচ্ছন্নতা দিয়ে পরিচালিত। আবিষ্কার করবেন হিস্পানি ভাষা শুনতে কেন মেশিনগানের গুলির মতো শোনায়। আর যদি আপনার মনে হয়ে থাকে যে, লোকের মাথায় বন্দুক ধরে জর্মন ভাষার বিস্তার ঘটানো হয়েছে তাহলে ভুল করবেন। সেই সঙ্গে আপনি আরো খানিকটা দূরে গিয়ে নরওয়েজীয় ভাষার খাপছাড়া ধরনের গণতান্ত্রিক চরিত্র, ওলন্দাজের জেন্ডার টলিয়ে দেওয়া প্রবণতা, গ্রিক ভাষার জন্য করা রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ আর বলকান এলাকার ভাষাতাত্ত্বিক অনাথদের আবিষ্কার করবেন। তারপর, ব্যবহার-জীর্ণ রাস্তার আরো সামনে আপনাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে লিথুয়ানীয়র প্রাচীন তাঁত, সর্বীয়র নাকউঁচু ভাব, আর বাস্ক-এর হতবুদ্ধিকর রীতি-নীতির কাছে। এবং বিশ্বাস করুন আর না-ই করুন, ইউরোপের সবচাইতে অবিশ্বাস্য ভাষাবিষয়ক কাহিনিগুলো ব্রিটেনের দোড়গোড়াতে পাওয়া যাবে–দ্বীপটির কেল্টিক আর ভ্রমণকারীদের ভাষায় যা কিনা একই সঙ্গে ভিনদেশি, উদ্ভট, আবার সনাতনীও বটে।

লিঙ্গো-কে একধরনের গাইড বই বলা যেতে পারে, যদিও সেটাকে কোনো অর্থেই বিশ্বকোষ বলা যাবে না : এ বইয়ের কোনো কোনো অধ্যায় যদি হয় বিশেষ বিশেষ ভাষার ছোটোখাটো প্রতিকৃতি, অন্যগুলোতে রয়েছে কোনো ভাষার কোনো স্বতন্ত্র উদ্ভট বৈশিষ্ট্য। বইটাকে আসলে, ফরাসিরা যাকে খুব চমৎকারভাবে বলে, একটা amuse-bouche বা ক্ষুধাবর্ধক হিসেবে রচনা করা হয়েছে।

ভাষা ও তার পরিবার
ইন্দো-ইউরোপীয় আর ফিনো-উগরিক ইউরোপের দুটো বড় ভাষা পরিবার। ফিনো-উগরিক-এর বংশানুক্রম নিতান্তই সোজাসাপটা; সেটার আধুনিক রূপভেদগুলোরও তাই; অর্থাৎ ফিনিশ, হাঙ্গেরীয়, এবং এস্তোনীয়র। কিন্তু ইন্দো-ইউরোপীয়র কুলপরিচয় বেশ জটাজালবিশিষ্ট—জার্মানিক, রোমান্স (Romance), স্লাভিক ভাষাসমূহ, এবং আরো অনেক দূর অব্দি তার বিস্তার। কোনো কোনো দিকে থেকে সেটার গল্প অন্য যেকোনো পারিবারিক ‘সাগা’-র মতো, যেখানে আছে রক্ষণশীল সব কুলপতি (লিথুয়ানীয়), ঝগড়াটে সন্তান-সন্ততি (রোমানশ, Romansh), একেবারে যমজ ভাই বোন (স্লাভিক ভাষাসমূহ), বিস্মৃত জ্ঞাতি ভাই (ওসেতীয়), অনাথ-এতিম (রুমানীয় ও অন্যান্য বল্কান ভাষাগুলো), আর সেই সব শিশু যারা এখনো মাতৃছায়া থেকে বের হতে পারেনি (ফরাসি)।

পাই (PIE)-এর জীবন
(লিথুয়ানীয়)
একদা—তা সে হাজার হাজার বছর আগে (ঠিক কখন তা কেউ বলতে পারে না)—কোনো এক দূরবর্তী ভূখণ্ডে (কেউ জানে না ঠিক কোথায়) ছিল এক ভাষা। সে ভাষায় আজ আর কেউ কথা বলে না। সেটার নামও সবাই ভুলে গেছে। অবশ্য কোনো নাম সেটার আদৌ ছিল কিনা তা-ও কারো জানা নেই। শিশুরা তাদের বাপ-মায়ের কাছ থেকে ভাষাটা শিখত। ঠিক যেমনটা এই সময়ের বাচ্চারা করে। এবং তারা তাদের সন্তান-সন্ততির মুখে ভাষাটা তুলে দিত। এভাবেই চলত প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে। এত শত শতাব্দীতে ভাষাটির মধ্যে সারাক্ষণই নানান পরিবর্তন ঘটেছে। ব্যাপারটা অনেকটা সেই ঘটনার মতো যেটাকে ‘চীনা ফিসফিসানি’ খেলা বলে : শেষ খেলোয়াড় এমন কিছু শোনে যা প্রথম খেলোয়াড় তার পাশের জনের কানে যা বলেছিল তা থেকে একবারেই ভিন্ন। এক্ষেত্রে অবশ্য শেষ খেলোয়াড়রা হলাম আমরা। অবশ্য কেবল তারাই নয় যারা ইংরেজি ভাষী। যারা ওলন্দাজ ভাষী তারাও, যা কিনা কার্যত একই জিনিস। আর জর্মন—সেটাও এমন কোনো আলাদা নয়। সেই সঙ্গে, হিস্পানি, পোলিশ, ও গ্রিক—খুব ভালো ক’রে দেখলে খেয়াল করবেন এই ভাষাগুলোও খানিকটা ইংরেজির মতো। আরো দূরে আছে আর্মেনীয়, কুর্দিশ এবং নেপালীয়, যাদের পারিবারিক যোগসূত্র বা সাদৃশ্য খুঁজে পেতে বেশ খানিকটা করসরত করতে হবে। কিন্তু এদের প্রত্যেকটিই এমন একটি ভাষা থেকে উদ্ভূত যে ভাষায় নাম-না-জানা এক জনগোষ্ঠী কথা বলত; সম্ভবত ষাট শতক আগে। আর যেহেতু তাদের ভাষার নাম আমরা কেউ জানি না, সেটার জন্য একটা নাম উদ্ভাবন করা হয়েছে : পাই PIE (Proto-Indo-European, আদি ইন্দো-ইউরোপীয়)…

নামটাকে অবশ্য নিখুঁত বা সঠিক বলা যায় না। শব্দটা এ-কথাই বোঝায় যে এই ভাষার আগে অন্য কোনো ভাষা ছিল না। কিন্তু তা তো আর ঠিক নয়। আবার, ইন্দো-ইউরোপীয় বললে এমন একটি ভাষা-অঞ্চল বোঝায় যা কেবল ভারত আর ইউরোপজুড়েই বিস্তৃত ছিল। কিন্তু সত্যি বলতে, উত্তর আর দক্ষিণ মহাদেশের প্রায় প্রত্যেক মানুষ এমন কোনো ভাষায় কথা বলেন যা পাই PIE (Proto-Indo-European) থেকে এসেছে। ওদিকে, ভারতে বিশ কোটির বেশি মানুষ এমন কিছু ভাষায় কথা বলেন যার সঙ্গে পাই-এর আদৌ কোনো ঐতিহাসিক যোগসূত্র নেই। সেই সঙ্গে একথাও বলতে হয়, ইউরোপীয়দের ৯৫ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনো ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষায় কথা বলেন, অর্থাৎ, এমন কোনো ভাষায় যা পাই থেকে এসেছে।

পাই (PIE) আর সেই ভাষা ব্যবহারকারীরা সময়ের কুয়াশাবৃত। কিন্তু ভাষাতাত্ত্বিকরা সেই কুয়াশা দূর করার জোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন—পাই (PIE) কেমন শোনাতো তা ভাষাটির উত্তরসুরিগুলোর ভিত্তিতে পুনর্নির্মাণ করার মাধ্যমে। লাতিন, গ্রিক ও সংস্কৃতের মতো প্রাচীন ভাষায় লেখা পুরানো দলিলপত্র এক্ষেত্রে বেশ কাজের। তবে চতুর্থ শতকের আইরিশ ওগাম (ogham) উৎকীর্ণ লিপি আর নবম শতকের দিকে প্রাচীন ইংরেজিতে রচিত বেউলফ থেকে শুরু ক’রে আলবেনীয় ভাষার প্রথম দিকের কিছু লিখিত নমুনার ধ্বংসাবশেষ এবং এমনকি আধুনিক লিথুয়ানীয় উপভাষাগুলোর মতো আরো সাম্প্রতিক উৎসগুলোরও এ-ব্যাপারে একটি ভূমিকা আছে।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, tongue বা জিহ্বা-র পাই (PIE) শব্দটি কী ছিল তা বের করার জন্য ভাষাতাত্ত্বিকরা লক্ষ করেন পরবর্তী কালের এই ভাষাগুলো tongue বোঝাতে কোন কোন শব্দ ব্যবহার করেন : যেমন, lezu (আর্মেনীয়), liežuvis (লিথুয়ানীয়), tengae (প্রাচীন আইরিশ), tunga (সুইডিশ), dingua (প্রাচীন লাতিন), gjuhë (আলবেনীয়), käntu (তোকারীয় এ), jezykû (প্রাচীন স্লাভিক), jihva (সংস্কৃত)। প্রথমে শব্দগুলোর মধ্যে তেমন কোনো মিল নজরে পড়ে না বললেই চলে। কিন্তু একটা পদ্ধতি বা নিয়ম মেনে যদি এ-ধরনের বেশ কয়েকটি শব্দের সিরিজ তুলনা করা হয় তখন সব ধরনের ছাদ বা প্যাটার্ন বেরিয়ে আসে। ধীরে ধীরে এটা পরিষ্কার হয়ে আসে যে ‘ক’ ভাষাটি হয়তো পাই শব্দগুলোকে একটি বিশেষ রকমে বা সঙ্গতিপূর্ণভাবে বদলে (বা, ইচ্ছে হলে বলতে পারেন ‘বিকৃত’ ক’রে) ফেলেছে; আবার অন্যদিকে, ‘খ’ ভাষাটি সেগুলোকে সঙ্গতিপূর্ণভাবে কিন্তু আরেক রকমে বদলে দিয়েছে। একবার এই প্রক্রিয়াগুলোকে শনাক্ত ক’রে ফেললে আপনি আদি বা আসল শব্দটার কাছে ফিরে যেতে পারবেন।

এ-ধরনের গোয়েন্দাগিরির ফলে প্রচুর তথ্য পাওয়া গেছে। যদিও দুর্ভাগ্যজনকভাবে, তার ফলাফল অ-ভাষাতাত্ত্বিকদের জন্য খুব একটা সুখকর নয়, আলোকসম্পাতী নয়। দেখা গেছে, ‘জিহ্বা’ (tongue) শব্দটি ‘পাই’ (PIE) ভাষায় ছিল *dngwéhs। এখানে তারকাচিহ্নটি ‍দিয়ে বোঝানো হয়েছে যে শব্দটি পরবর্তীকালে আসা ভাষাগুলোর সাহায্যে পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে। অন্যান্য হরফ দিয়ে একটি ধ্বনি বোঝানো হয়েছে, কিন্তু কোন ধ্বনি তা কেবল ভাষাবিশারদরাই জানেন (কিন্তু এমনকি তাঁদের কাছেও কিছু কিছু ধ্বনি ধোঁয়াশাই রয়ে গেছে)। সংক্ষেপে বললে, ফলাফলটা বরং বিমূর্ত, এবং অনায়াসে বোধগম্য কিছু নয়।

আমাদের সেই সুদূরপারের পূর্বপুরুষদের ভাষা এবং আমাদের ভাষার মধ্যে যে দুস্তর ব্যবধান তার মধ্যে কি সেতু বাঁধা সম্ভব? ‘পাই’ (PIE)-কে কি আমরা আরো প্রবেশসাধ্য বা অভিগম্য করতে পারি না, সে-ভাষায় যাঁরা কথা বলতেন তাঁদেরকে কি আরো মানবোচিত ক’রে তুলতে পারি না? আমরা কি সেই ভাষা আর সেই সব মানুষের মধ্যে প্রাণসঞ্চার করতে পারি না? এর উত্তর হচ্ছে, পারি, খানিকটা হলেও। এবং কাজটা করার একটি উত্তম তথা উপযুক্ত স্থান হচ্ছে লিথুয়ানিয়ার রাজধানী ভিলনিয়াস।

ভিলনিয়াস হচ্ছে ভাষাতাত্ত্বিক মারিজা গিমবুতাস (১৯২১-১৯৯৪)-এর জন্মস্থান। গত শতাব্দীর পাঁচের দশকে তিনি তথাকথিত ‘কুরগান হাইপোথিসিস বা তত্ত্বপ্রকল্প’ হাজির করেন। আর সেই তত্ত্বপ্রকল্প অনুযায়ী ‘পাই’ ভাষীদের বাসস্থান ছিল, ৩৭০০ খৃষ্ট পূর্বাব্দে, কৃষ্ণ ও কাস্পিয়ান সাগরের উত্তরের বিপুল বিস্তৃত স্তেপ অঞ্চলে (আজকের ইউক্রেইন ও দক্ষিণ রাশিয়ায়)। ‘কুরগান’ একটি তুর্কী শব্দ, যার মানে সমাধিস্তূপ। এই এলাকার সবখানে কবরের ওপর যে মাটির ঢিবি দেখা যায় সেগুলোকেই কুরগান বলে। গিমবুতাস বলতে চাইলেন, যে-সংস্কৃতি এসব ঢিবির কিছু কিছু তৈরি করেছে সেটাই ছিল ‘পাই’ ভাষার উৎস। ঘোড়াকে বশ মানানোর মতো, এমনকি অশ্বশকট বা রথ চালানোর মতো যথেষ্ট উন্নত ছিল এই সংস্কৃতি। যদিও ভদ্রমহিলার এইতত্ত্ব অবিসংবাদিত নয়, কিন্তু সেটার সারকথা ব্যাপকভাবে গৃহীত হয়েছে।

এবং আপনি যদি ‘পাই’-এর সঙ্গে বেশ ঘনিষ্ঠ হতে চান তাহলে ভিলনিয়াস আপনার জন্য সেরা গন্তব্য। কারণ, পৃথিবীতে এখন যেসব ভাষা ব্যবহৃত হয় তার মধ্যে লিথুয়ানীয় ভাষার সঙ্গে ‘পাই’-এর সাদৃশ্য সবচাইতে বেশি। এই সময়ের লিথুয়ানীয়রা হয়তো সেই আদ্দিকালের ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষায় আপনার সঙ্গে খোশগল্প করতে পারবেন না, কিন্তু একজন গ্রিক বা নেপালির চাইতে অনেক দ্রুত তারা ভাষাটাকে আত্মস্থ করতে পারবে, ব্রিটিশরা যা একেবারেই পারবে না। কারণ, আগেই বলা হয়েছে, লিথুয়ানীয়র সঙ্গে ‘পাই’-এর প্রচুর মিল।

এই যেমন, ‘son’ বা ‘পুত্র’ লিথুয়িানীয় ভাষায় ‘sunus’, ‘পাই’ ভাষায় ‘suhnus’। ‘পাই’-এ ‘Esmi’ মানে ‘I am’ ‘আমি হই’। কিছু লিথুয়ানীয় উপভাষাতেও তাই (যদিও ভিলনিয়াসের আধুনিক প্রমিত বা মান ভাষা একই অর্থ বোঝাতে ‘esu’ ব্যবহার করে)। লিথুয়ানীয় ভাষাতে ‘পাই’-এর অনেক শব্দের ধ্বনি বজায় রয়েছে, যদিও অন্যান্য ভাষায় তা থাকেনি, বদলে গেছে। এবং ইংরেজি ভাষায় সে-বদল এত জোরালো বা আকস্মিক যে সেটা ‘গ্রেট ভাওয়েল শিফট’ নামে পরিচিতি লাভ করেছে। যেমন, ‘five’ শব্দটার কথাই ধরুন। ইংরেজি শব্দটা আর সেটার সমার্থক লিথুয়ানীয় ‘penki’, এই দুটোই ‘পাই’ ভাষার *penke থেকে এসেছে (আমাদের নিশ্চয়ই বাংলা পঞ্চ বা পাঁচ-এর কথা মনে পড়ে যাচ্ছে)। কিন্তু একজন ভাষা বিশারদ ছাড়া কারো পক্ষেই বোধহয় *penke আর ইংরেজি ‘five’-এর মধ্যে কোনো মিল খুঁজে পাওয়ার কথা নয়, যদিও লিথুয়ানীয় শব্দটার সঙ্গে সে সাদৃশ্য যে-কেউ দেখতে পাবেন।

সম্ভবত, লিথুয়ানীয় আর ‘পাই’-এর মধ্যে ব্যাকরণগত সাদৃশ্যগুলো আরো আকর্ষণীয়। পাই-এর আটটা কেস বা কারক ছিল। লিথুয়ানীয়তে এখনো সাতটি রয়েছে। অন্য কিছু ভাষাতেও সাতটি, যেমন পোলিশে, কিন্তু একমাত্র লিথুয়ানীয়তেই কারকগুলো অনেকটাই ‘পাই’-এর কারকগুলোর মতো শোনায়। একইভাবে, ‘পাই’-এর মতো কিছু লিথুয়ানীয় উপভাষাতে যে কেবল রেগিউলার একবচন আর বহুবচন আছে তা নয়, বরং একটি একটি বিশেষ ‘dual’-ও আছে : নির্দিষ্ট ক’রে দুটো জিনিস বোঝানোর বহুবচন, বাংলায় যাকে বলে দ্বিবচন। আধুনিক ইন্দো-ইয়োরোপীয় ভাষাগুলোর মধ্যে এটা দেখা যায় না, কেবল স্লোভেনে (Slovene) ভাষাই এক প্রধান ও গর্বিত ব্যতিক্রম।

ক্রিয়ার ধাতুরূপ করা (verb conjugation), পদান্বয় (syntax), ঝোঁকের ছাঁদ (emphasis pattern), বিভক্তি ও প্রত্যয় বা অভিযোজন (suffix)—লিথুয়ানীয়র এসব বহু বৈশিষ্ট্য সাক্ষ্য দেয় যে ভাষাটির উৎস ‘পাই’। এর সবগুলোই দুশো প্রজন্ম ধ‘রে টিকে আছে, এবং তেমন কোনো পরিবর্তন ছাড়াই। কাজেই, লিথুয়ানীয়দেরকে ‘চাইনিজ হুইসপার্স’ খেলার অবিসংবাদিত ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়ন বলা যেতেই পারে।

লেখক পরিচিতি
গাস্তঁ দোরেন একজন ভাষাতাত্ত্বিক, সাংবাদিক এবং বহুভাষাবিদ। তিনি ওলন্দাজ, লিম্বার্গিশ, ইংরেজি, জর্মন, ফরাসি, এবং হিস্পানিতে কথা বলতে পারেন, পড়তে পারেন আফ্রিকানস, ফ্রিসীয়, পর্তুগিজ, ইতালীয়, কাতালান, ডেনিশ, নরওয়েজীয়, সুইডিশ এবং লুক্সেমবুর্গিশ। ওলন্দাজ ভাষায় তিনি দুটো গ্রন্থ রচনা করেছেন—অভিবাসীদের ভাষা নিয়ে রচিত Nieuwe tongen (New Tongues), এবং Taaltoerisme (Language Tourism), যে-বইয়ের ওপর ভিত্তি ক’রে Lingo : A Language Spotter’s Guide to Europe ইংরেজিতে রচিত হয়েছে; এবং Language Lover’s Guide to Europe নামের একটি অ্যাপ। লেখার অবসরে তিনি গান গাইতে পছন্দ করেন, এবং অবশ্যই তা বহু ভাষায়। নেদারল্যান্ডের আমার্সফুর্ট-এ তিনি সস্ত্রীক বাস করেন।

/জেডএস/

সম্পর্কিত

সাহিত্যতত্ত্ব : একটি সংক্ষিপ্ত পরিক্রমা

সাহিত্যতত্ত্ব : একটি সংক্ষিপ্ত পরিক্রমা

তুমি নামের অচেনা কেউ

তুমি নামের অচেনা কেউ

জীবনানন্দের ‘পৃথিবীলোক’ : নগর পতনেরও শব্দ শুনি

জীবনানন্দের ‘পৃথিবীলোক’ : নগর পতনেরও শব্দ শুনি

করিমের সহজ-স্বভাবী গান

করিমের সহজ-স্বভাবী গান

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

সাহিত্যতত্ত্ব : একটি সংক্ষিপ্ত পরিক্রমা

পর্ব—তিনসাহিত্যতত্ত্ব : একটি সংক্ষিপ্ত পরিক্রমা

তুমি নামের অচেনা কেউ

তুমি নামের অচেনা কেউ

জীবনানন্দের ‘পৃথিবীলোক’ : নগর পতনেরও শব্দ শুনি

জীবনানন্দের ‘পৃথিবীলোক’ : নগর পতনেরও শব্দ শুনি

করিমের সহজ-স্বভাবী গান

করিমের সহজ-স্বভাবী গান

ভাষার নাম পাই (PIE) ।। গাস্তঁ দোরেন

ভাষার নাম পাই (PIE) ।। গাস্তঁ দোরেন

শেকড়ে ও সত্তায় শাহাবুদ্দিন

শেকড়ে ও সত্তায় শাহাবুদ্দিন

সাহিত্যতত্ত্ব : একটি সংক্ষিপ্ত পরিক্রমা

পর্ব—দুইসাহিত্যতত্ত্ব : একটি সংক্ষিপ্ত পরিক্রমা

শহীদুল জহিরের ঘর

শহীদুল জহিরের ঘর

মিলনের জন্য লেখা

মিলনের জন্য লেখা

আমার সুনীল

আমার সুনীল

সর্বশেষ

ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের মামলায় ‘পীর’ গ্রেফতার

ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের মামলায় ‘পীর’ গ্রেফতার

ড্রেনে পড়েছিল ২ যুবকের লাশ

ড্রেনে পড়েছিল ২ যুবকের লাশ

বিশ্ব ব্যাংকের প্রতিবেদন বদলের কথা অস্বীকার করলেন আইএমএফ প্রধান

প্রতিবেদন বদলানোর কথা অস্বীকার করলেন আইএমএফ প্রধান

ছয় বছর ধরে পানিবন্দি ফতুল্লার ওসমান আলী স্টেডিয়াম 

ছয় বছর ধরে পানিবন্দি ফতুল্লার ওসমান আলী স্টেডিয়াম 

ইভ্যালি বিক্রির পরিকল্পনা ছিল রাসেলের

ইভ্যালি বিক্রির পরিকল্পনা ছিল রাসেলের

© 2021 Bangla Tribune