X
রবিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২১, ১ কার্তিক ১৪২৮

সেকশনস

মিলনের জন্য লেখা

আপডেট : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১১:৩৯

সময়টা ছিল সত্তরের দশকের শেষ বা আশির দশকের শুরু। সে সময়ের খুব বেশি প্রচারিত নয় এমন একটি পত্রিকায় প্রকাশিত একটি লেখা পড়ে আমি রীতিমতো বিস্মিতই হলাম। এমন লেখা সচরাচর চোখে পড়ে না। যেমন তার বিষয়চিত্রণের দক্ষতা, তেমনি ভালো লেখকসুলভ কলম-সংযম। সবচেয়ে আকৃষ্ট হলাম তার ভাষার আশ্চর্য গতিময়তায়। লেখকের নামটি বারবার পড়লাম, খুব পরিচিত মনে হলো না, তবে নিশ্চিত হলাম, আমাদের সাহিত্যে নিঃসন্দেহে একজন ভালো কথাশিল্পীর পদার্পণ ঘটল। ধারণাটি আমার যে অমূলক ছিল না, তা আজ ইমদাদুল হক মিলনের পাঠক এবং বোদ্ধা সাহিত্য বিশ্লেষকরা নিশ্চয়ই স্বীকার করবেন (এমনি সচকিত ও উচ্ছ্বসিত হয়েছিলাম, আনোয়ার হোসেন সম্পাদিত ছোটকাগজ ‘রূপম’ পত্রিকায় প্রকাশিত নবীন এক লেখক মঞ্জু সরকারের প্রথম লেখাটি পড়ে)।
প্রতিশ্রুতি দেওয়া নবীন লেখক আজকের খ্যাতনামা কথাশিল্পী ইমদাদুল হক মিলনের জন্যই আজ কলম ধরেছি আমি। যদিও আজকের লেখার পরিপ্রেক্ষিতটি ভিন্ন, তার জন্মদিন উদযাপনের প্রাসঙ্গিকতাতেই আমার এই লেখা। ইমদাদুল হক মিলনের অবদানের কারণে তার সম্পর্কে লেখার দাবিটি অনেক আগেই যে তৈরি হয়েছিল, সেটা অস্বীকার করি না। তবে সম্ভবত মিলনের সাহিত্যযাত্রার মধ্যপথে, ভাবতে হয়েছিল জনপ্রিয় লেখক হয়ে ওঠার যে প্রবণতা তার কলমে স্পষ্ট হয়ে উঠছে, তাতে সেই জনপ্রিয়তার কোন অঙ্গনটি বেছে নেবে, সে উপলব্ধিটি করা। অপেক্ষা হয়তো সে কারণেই ছিল আমার। মিলনের লেখার যে বৈদগ্ধ্য প্রথমেই আমাকে আকৃষ্ট করেছিল, হয়তো চেয়েছিলাম সেই পথেই তার আরো উত্তরণ ঘটুক।
অবশ্য এর পরে আমি লেখকের জনপ্রিয়তা নিয়েও ভাবতে বাধ্য হয়েছি। আমাদের দেশে জনপ্রিয় লেখককে অবমূল্যায়নের একটি প্রবণতা সব সময়ই আছে। বলা হয়, জনপ্রিয় লেখা হচ্ছে তরল অগভীর গল্পকাহিনি, যা কেবল অপরিপক্ব পাঠকেরই প্রিয় হয়। অনেক সময় জনপ্রিয় লেখাকে রহস্য কাহিনি বা বটতলার অপসাহিত্যের পর্যায়ে নামিয়ে ফেলার অসৎ উদ্দেশ্যও দেখা যায়। বাস্তবতাটি কিন্তু ভিন্ন, আসলে সব জনপ্রিয় লেখাই রহস্য সিরিজ কাহিনি বা সস্তা লেখা নয়। কোনো লেখা জনপ্রিয়তা অর্জন করতে পারে লেখকের লেখার বৈশিষ্ট্যের কারণেই। ভাষা, আঙ্গিক, গল্প বলার ভঙ্গি এবং বিষয়ের বিশ্বস্ততার বাস্তবতাই একজন জনপ্রিয় লেখককে পাঠকপ্রিয় করে তোলে। বলার অপেক্ষা রাখে না, এখানেই রহস্য সিরিজের জনপ্রিয়তার সঙ্গে মূলধারার অন্তর্গত জনপ্রিয়তার পার্থক্য। আজ নিঃসন্দেহে বলতে পারি, হুমায়ূন আহমেদের মতো (যদিও তার মৃত্যুর পরে তার অবদানের কথা অনেকেই বলতে শুরু করেছেন) মিলনকেও ‘জনপ্রিয়তার’ কারণে যথার্থ মূল্যায়ন করা হয়নি বলে আমার ধারণা।
মনে আছে, অনেক আগে মিলন একবার আমাকে বলেছিল—রিজিয়া আপা, হুমায়ূন ভাই সম্পর্কে কলাম লিখে তাঁর নিন্দুকদের মুখ বন্ধ করে দিয়েছেন, আমার সম্পর্কেও কিছু লেখেন।
বলছিলাম—লিখব, সময় হোক।
বলা বাহুল্য, সময়টা হয়নি। কারণ তরলমতি পাঠকদের মস্তিষ্ক চর্বণ করবার এবং ‘ধোয়া তুলসীপাতা’ সদৃশ্য (!) গুরুগম্ভীর (!) সমকালীন বাংলা সাহিত্য পাঠকদের পথভ্রষ্ট করবার অপবাদ দিয়ে দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের কলমের ‘নার্ভাস ব্রেকডাউন’ করবার জন্য অনেক কবি-সাহিত্যিক তথা বুদ্ধিজীবীরা যেভাবে কোমর বেঁধেছিলেন, সৌভাগ্য আমাদের অর্থাৎ সমকালীন সাহিত্য পাঠকদের, ইমদাদুল হক মিলনের কলমের প্রতি তেমন প্রস্তর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেনি।
সত্যের প্রয়োজনে বলতেই হয়, মিলনের অবদান নিয়ে বিশ্লেষণ ও তার মূল্যায়নের তাগিদ অনুভব করেছি অনেক আগেই। বিশেষ করে তার একাধিক ছোটগল্প ও দু-একটি উপন্যাস এবং তার আত্মজীবনীর খণ্ডগুলো আমাকে যথেষ্ট উদ্বুদ্ধ করেছে আলোচনা লেখার জন্য। এই লেখাগুলোই বাংলা সাহিত্যে তার যথার্থ স্থান নির্ধারণ করে দিয়েছে। আমার শারীরিক অক্ষমতা ও কিছু অকর্মক ব্যস্ততাই ইমদাদুল হক মিলন সম্পর্কে লেখার প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে। সময় হওয়ার পরও মিলনকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি আমি রাখতে পারিনি। এটা আমার যথেষ্ট মর্মপীড়ার কারণও বটে। সে যা-ই হোক, আজ মিলনের জন্মদিনের শুভকামনা জানাতে গিয়ে ধান ভানতে শিবের গীত গাওয়া আলোচনা স্থগিতই রাখলাম। আজ তার ষাটতম জন্মদিনে পদার্পণের ঘটনাই মুখ্য। মানুষের জীবনে ষাট বছর বয়স এসে যাওয়া এমন কিছু নতুন ব্যাপার নয়। কিন্তু একজন সৃজনশীল মানুষের ক্ষেত্রে এটি একটি বিশেষ ঘটনা। মিলনের ক্ষেত্রেও।
তবু মিলনকে জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে হচ্ছে, কী করে কখন তুমি আমাদের মতো প্রৌঢ়দের সারিতে এসে দাঁড়ালে? সেই প্রাণবন্ত তরুণটি তুমি—তুমিও শেষে ষাটের ঘরে পা রাখলে? বয়স বাড়ার শুভ-অশুভ নিয়ে কথা বলার সময় নয়, তবু বলতে চাই, বয়সের বৈদগ্ধ্যেই প্রকৃত স্বর্ণের খনির আধার (ওল্ড ইজ গোল্ড), তা ছাড়া লেখকের বয়স কখনো কি ষাট বছর হয়! ওটা ক্যালেন্ডারের পাতায়ই থাকে। লেখকরা চিরতরুণ, চিরনবীন—চিরহরিতের দেশের বাসিন্দা তাদের মনে সতত প্রবাহিত হয় বসন্তের বাতাস। তা-ই যদি না হবে, পঁচাত্তর বছর বয়সে রবীন্দ্রনাথ ‘শেষের কবিতা’ নামের রোম্যান্টিক উপন্যাসের বিস্ফোরণটি ঘটাতে পারতেন? ষাটোর্ধ্ব অনেক কবি তাঁদের বিখ্যাত প্রেমের কবিতাগুলো লিখতে পারতেন! এই বয়সেই তো পৃথিবী বিখ্যাত কবি-সাহিত্যিকরা তাঁদের সোনালি ফসল ঘরে তুলে আনতে থাকেন। মিলনের ক্ষেত্রে তার ব্যতিক্রম ঘটবে না, আশা আমার।
একসময় আমি ছিলাম মিলনের কাছে বড় বোনের সম্মানে। এখনো আছি কি না জানি না (কারণ স্বেচ্ছানির্বাসিত আমার দীর্ঘদিন যোগাযোগ নেই মিলনের সঙ্গেও), তবু সেই বড় বোনের দাবি নিয়ে ইমদাদুল হকের স্বর্ণালি ফসলের আশা আমি করতেই পারি। পৃথিবীর আহ্নিক গতি, বার্ষিক গতির কারণে মানুষের বয়স বাড়বার অনিবার্যতা সত্ত্বেও সে সময়ের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতির অনার্সের ছাত্র মিলন, সেই উদ্যমী তরুণটিই নিজের লেখার ব্যাপারে যে ছিল দারুণ উৎসাহী, সে ছিল আমার স্নেহের পাত্র। সেই সব দিনে, কোনো দুপুরে হঠাৎ এসে টিপে দিত আমার বাড়ির দরজার বেল। ঢুকেই বলত—খিদে পেয়েছে খুব, রিজিয়া আপা। বলি—এসো, আমার সঙ্গে ভাত খাও। রাজ্যের গল্প হয় খাবার টেবিলে বসে। তারপর দুম করে উঠে দাঁড়ায় সে; বলে—চলি, রিজিয়া আপা।
হোন্ডা নিয়ে সশব্দে আমাদের গলির মুখে অদৃশ্য হতে দেরি হয় না তার।
ছোট ভাইটির মতোই আমার কাছে ছিল হয়তো মিলনের আবদারের জায়গা। সমস্যা হলে শুকনো মুখে ছুটে আসত রিজিয়া আপার কাছে। সেসব মিলনের মনে আছে কি না জানি না, কিন্তু মনে আছে আমার।
হঠাৎ একদিন এসে জানাল—পশ্চিম জার্মানিতে চলে যাচ্ছি। দোয়া করবেন। অবাক আমি। কোনো চাকরি নিয়ে নয়, জার্মানির কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষার জন্যও নয়, লেখাপড়া ছেড়ে দিয়ে কেন চলেছে? ক্ষুণ্নই হলাম; বললাম—অনার্স পরীক্ষা না দিয়েই চলে যাবে! তা ছাড়া এত ভালো লেখার হাত তোমার, তোমার লেখা পাঠকরা পছন্দ করছে, এসব ফেলেই চলে যাবে?
মিলন শুধু বলে—ফিরে আসব, রিজিয়া আপা। বেশিদিন থাকব না।
মিলন ফিরে এলো সত্যিই, বেশিদিন না থেকেই। বলল—ভালো লাগল না, চলে এলাম।
কাজ শুরু করল সাপ্তাহিক ‘রোববার’ পত্রিকায়। লেখাও শুরু করল পুরোদমে, অল্প দিনেই পেল খ্যাতি।
সে সময়ের একটি ঘটনা—মিলন হয়তো এত দিনে ভুলে গেছে। ঘটনাটি তেমন গুরুত্বপূর্ণ না হলেও আজও বেশ মনে আছে আমার। একেবারে ছেলেমানুষি কাণ্ড, কৌতুকই বোধ করি ভাবলে। বর্তমানে আমেরিকাপ্রবাসী তখনকার তরুণ কবি ইকবাল হাসানও ছিল ঘটনাটিতে। কয়েক বছর আগে ঢাকায় এসেছিল, দেখা হয়েছিল আমার সঙ্গে, পুরনো ঘটনাটি নতুন করে মনে পড়েছিল আমার, ইকবালেরও। দুজনেই হাসছিলাম। ঘটনাটির উল্লেখ হয়তো অপ্রাসঙ্গিক হবে না ভেবেই লিখছি। তখন ‘রক্তের অক্ষর’ আর ‘শিলায় শিলায় আগুন’ লিখে বেশ খ্যাতি পেয়ে গেছি। ‘বিচিত্রা’ সম্পাদক শাহাদত চৌধুরীর অনুরোধে ঈদসংখ্যা ‘বিচিত্রা’র জন্য চা বাগানের উপন্যাস ‘সূর্য-সবুজ রক্ত’ লিখতে শুরু করেছি। লিখে সবে শেষ করেছি, প্রচণ্ড  পরিশ্রমে রীতিমতো বিধ্বস্ত আমি তখন। তখনই, এক সকালে মিলন এসে উপস্থিত, সঙ্গে কবি ইকবাল হাসান। দুজনেই ঈদসংখ্যা রোববারের জন্য কাজ করছে।
মিলনই প্রথমে বলল—রিজিয়া আপা, আপনাকে এবারের ঈদসংখ্যা রোববারের জন্য উপন্যাস দিতে হবে।
বললাম—ঈদসংখ্যা বিচিত্রার জন্য উপন্যাস লিখে মাত্র শেষ করলাম। এখন আরেকটি উপন্যাস লেখা আমার পক্ষে কী করে সম্ভব!
মিলন গম্ভীর কণ্ঠে জানাল—উপন্যাস আপনাকে দিতেই হবে। কোনো আপত্তি চলবে না।
ইকবাল আরো একপ্রস্থ চড়া—যদি না দেন, সেটা আপনার জন্য ভালো হবে না জানিয়ে রাখি। কী হবে আমার জানতে চাইলে মিলন বলল—আপনাকে আমরা ব্ল্যাক লিস্টেড করব, আপনার কোনো লেখা, কোনো ছবি, আপনার সম্পর্কে কোনো খবর, সমালোচনা-আলোচনা আমাদের পত্রিকায় যাবে না।
সাপ্তাহিক ‘রোববার’ ছিল ইত্তেফাক গ্রুপেরই একটি প্রকাশনা। ইত্তেফাকের সার্কুলেশন তখন দেশের সব জাতীয় দৈনিকের শীর্ষে।
আমার অতি পরিচিত দুই তরুণ লেখকের কথাবার্তা-হাবভাবে আমি প্রথমে হতবাক হলাম, তার পরই রেগে গেলাম, বললাম—তোমরা কি আমাকে হুমকি দিতে এসেছ! ভয় দেখিয়ে লেখা নেবে? শোনো, উপন্যাস তোমাদের আমি দেবো না। কোনো লেখাই আর দেবো না, যাও, আমাকে ব্ল্যাক লিস্টেড করলে কর গিয়ে, ও নিয়ে আমার কোনো মাথাব্যথা নেই।
নিমেষেই চুপসে যায় দুই আগ্রাসনবাদীর ভাবভঙ্গি। মিলন মিনমিন করে কী যেন বলতে চেষ্টা করে। যেন যেতে পারলেই বাঁচে। ইকবাল একেবারেই নিষ্প্রভ। এরপর কী করতে হবে, বলতে হবে, ওরা বুঝে উঠছে না যেন, শুকনো মুখেই চলে গেল দুজন।
কিন্তু ওদের বিব্রত নির্বাক মুখ আর অপরাধী ভঙ্গিতে চলে যাওয়ায় বেশ মন খারাপ হলো। ভাবলাম, ওদের নেহাতই ছেলেমানুষি কাণ্ডে আমি এমন রেগে না গেলেও পারতাম। ওদের যিনি পাঠিয়েছেন, নির্দেশনাটা হয়তো তাঁরই ছিল। মিলনকে তো আমি চিনি। এমন ব্যবহার ওর স্বভাবে নেই।
পরদিন ফোন করল মিলন—রিজিয়া আপা, আমার কিন্তু কোনো দোষ নেই। ইকবালই...
ওকে থামিয়ে দিলাম, বললাম—উপন্যাস আমি তোমাদের জন্য লিখব।
দুদিন পর ইকবাল সস্ত্রীক আমার বাড়িতে এসে হাজির; বলল—আপনার সঙ্গে আমার স্ত্রীর পরিচয় করাবার জন্য নিয়ে এলাম। ও আপনার লেখার ভক্ত।
একেবারেই নিপাট ভালো মানুষ ইকবাল। চা-টা খেয়ে, গল্পসল্প করে, অতি বিনীত সম্ভাষণে বিদায় নিল। উপন্যাস লেখার কথা একবারও উচ্চারণ করল না।
পরে জেনেছিলাম, ওদের সেই অপরিপক্ব ঘটনাটি কবি আহসান হাবীবও শুনেছেন। হাবীব ভাই-ই ইকবালকে বলেছেন—খুব অন্যায় কাজ করেছ। রিজিয়া রহমানের কাছে মাফ চেয়ে এসো।
হাবীব ভাইয়ের কথায়ই ইকবালের ঘটা করে বউ নিয়ে বেড়াতে আসা, অর্থাৎ মাফ চাইতে আসা। মাফ ওকে চাইতে হয়নি, কোনো রাগই আমার ছিল না।
বেশ মন দিয়েই লিখলাম ঈদসংখ্যা রোববারের জন্য ‘অলিখিত উপাখ্যান’ নামের উপন্যাসটি। ইকবাল এসে নিয়ে গেল, ছাপা হলো ঈদসংখ্যা রোববারে। সেই প্রথম আমার একসঙ্গে দুটি ঈদসংখ্যার উপন্যাস লেখা।
মিলন কিন্তু লাপাত্তা। ফোন সে আর করেনি, আমার বাড়ির দরজায় তার আঙুলের চাপে অসহিষ্ণু বেল আর বাজে না। কবি জাহিদুল হক, লেখক নুরুল করিম নাসিম ও আরো দু-একজন কবি-সাহিত্যিক ছিলেন আমার স্নেহভাজন, যাঁরা প্রায়ই আসতেন আমার বাড়িতে। ইমদাদুল হক মিলন ছিল এদের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ, হয়তো সে কারণেই এই প্রতিভাবান তরুণটি ছিল আমার বিশেষ স্নেহের পাত্র।
হঠৎ উদ্ভট একটা কাণ্ড ঘটিয়ে ওর পালিয়ে থাকায় বেশ দুঃখিত হয়েছিলাম।
‘অলিখিত উপাখ্যান’ ঈদসংখ্যায় প্রকাশিত হওয়ার বেশ কিছুদিন পর হঠাৎ একদিন মিলনের ফোন—রিজিয়া আপা, আপনার উপন্যাসটা পড়েছি। খুব ভালো লেগেছে।
বললাম—এ উপন্যাসের ক্রেডিট তো তোমার আর ইকবালের। তোমাদের হুমকির কারণেই একটা ভালো উপন্যাস লেখা হয়ে গেল।
মিলন কুণ্ঠিত স্বরে বলে—রাগ করেছেন, রিজিয়া আপা? হেসে ফেলি—রাগ করব কেন। অল্প বয়স, কোনো পত্রিকার পক্ষ থেকে এমন গুরুদায়িত্ব পেয়ে গেলে ও রকম একটু হয়েই থাকে। আমি তো আর তোমাদের বয়সী ছেলেমানুষ নই যে এ নিয়ে রাগ করে বসে থাকব।
মিলন সহজ হয়ে যায়, আবার সেই আগের মিলন হয়ে ওঠে।
মনে হয়, এসব এই তো সেদিনের কথা। মনে হয়, এই তো সেদিন বাংলা একাডেমির বইমেলায় গেলাম আমি আর রাবেয়া আপা—রাবেয়া খাতুন। গেটের কাছেই বইয়ের স্টলটিতে ছিল মিলন আর ওর স্ত্রী। ছিল হুমায়ূন আহমেদও। চেয়ারে বসে ছিলেন হক ভাই—সৈয়দ শামসুল হক। মিলনই ডাকাডাকি শুরু করল—রিজিয়া আপা, রাবেয়া খালা, আসেন আমাদের দোকানে। আসেন, আসেন।
আমাদের তখন বইমেলার স্টলগুলো সব ঘুরে ঘুরে দেখবার তাগিদ রয়েছে। পুকুরপাড়ে উন্মুক্ত চায়ের দোকানে বসে চা খাওয়ার পরিকল্পনাও আছে। রাবেয়া আপাই বললেন—আসব একটু পরে, মেলাটা ঘুরে দেখি আগে।
হুমায়ূন এসে জোর করেই আমাদের দোকানে নিয়ে গেল। মিলনের নতুন বই সাজানো রয়েছে র্যাকে, হুমায়ূনেরও।
পাঠকরা বেশ সমীহ-ভক্তি নিয়েই ঘুরে ঘুরে দেখছে তাদের। হুমায়ূন, মিলন দুজনই তখন খ্যাতিমান লেখক, রাবেয়া আপা আর হক ভাই তো সাবেকি নামি লেখক, দোকানের সামনে কৌতূহলী পাঠক-ক্রেতার ভিড় জমাটাই স্বাভাবিক। সেটা বেশ উপভোগ করেছিলাম সেদিন। তা ছাড়া ফাল্গুনের উতলা হাওয়া আর মিষ্টি রোদের বিকেলটিতে বইয়ের দোকানে আড্ডাটি সেদিন কিন্তু হুমায়ূনের রসিকতায় হক ভাইয়ের সংক্ষিপ্ত-তীক্ষ্ন বাক্য এবং মিলন ও তার স্ত্রীর প্রাণবন্ত হাসিতে চমৎকার জমেছিল। অসুখ ধরা পড়েছে। প্রায়ই ব্যথা হয়, ব্যথার ওষুধ খেয়ে গুটিশুটি পড়ে থাকি বিছানায়, ডাক্তার বলেছেন পানি বেশি খেতে। পানির বোতল সব সময় সঙ্গেই রাখি।
মিলনকে বললাম—মিলন, আমার পানির বোতলটা রেখে এসেছি। গলা, বুক শুকিয়ে উঠছে। পানি খেতে হবে। চলো, ফিরে যাই। তোমার উপন্যাসের পত্রিকা পরে কিনে পড়ে নেব।
পলকে মিলনের মুখ নিষ্প্রভ। বুঝলাম, ওর ইচ্ছে পত্রিকাটা আজই আমার হাতে তুলে দেয়। হতাশ কণ্ঠে মিলন বলল—চলেন, তাহলে ফিরে যাই। আর কিন্তু হাঁটতে হবে না, এসেই গেছি প্রায়। নবীন লেখকটি নিজের লেখা অন্যকে পড়তে দেওয়ার আগ্রহে এতক্ষণ খুবই উৎসাহী ছিল। ফিরে যাওয়ার কথায় একেবারে ম্লান হয়ে গেছে। মনে পড়ল, একসময় আমিও তো আমার প্রথম লেখা উপন্যাসটি বন্ধুবান্ধব-পরিচিতদের পড়তে দিয়েছি, অধীর আগ্রহে তাদের মন্তব্যের অপেক্ষায় থেকেছি। মিলনকে বললাম—চলো, পত্রিকাটা কিনেই নিই। পরে আবার পাওয়া যায় কি না। গুলিস্তানের শেষ মাথায় এসে ফুটপাত থেকে পত্রিকাটি কিনে নিলাম।
ড্রাইভার আমার শরীরের অবস্থা জানে, ভিড় ঠেলেই সে গাড়ি নিয়ে চলে এসেছে গুলিস্তানে। গাড়ির জানালার কাছে হাত রেখে মিলন বারবার বলল—আমার উপন্যাসটা কিন্তু পড়বেন। পড়ে কেমন লাগে জানাবেন কিন্তু, আপা।
বাড়িতে ফিরে দুপুরের মধ্যেই পড়ে শেষ করলাম মিলনের উপন্যাস। ভাষার এমন জাদু... একটানা পড়ে গেছি, শেষ না হওয়া পর্যন্ত ছাড়তেই পারিনি। রোম্যান্টিক একটি উপন্যাস। কিন্তু চমৎকার। বিকেলেই ফোন করল মিলন—আপা, পড়ছেন আমার উপন্যাস?
বললাম—পড়ে শেষ করেও ফেলেছি। এমন চমৎকার লেখার হাত! উপন্যাস লিখবার ক্ষমতা তোমার কলমের আছে। লেখা ছেড়ে না দিলে ভবিষ্যতে ভালো উপন্যাস পাব তোমার কাছ থেকে।
নিঃসংশয় হলো না মিলন, বলল—সত্যি বলছেন?
—সত্যিই তো বলছি, দুপুরে আমার কিডনিতে পাথরের খোঁচা তুচ্ছ করতে পেরেছি তোমার উপন্যাস পড়তে পড়তে।
খুশি হলো মিলন—দোয়া করবেন, আপা।
আজ নিঃসংকোচেই বলি, মিলনের খ্যাতি তার লেখার গুণেই। সহজ এবং শিল্পিত ভাষা দিয়ে পাঠককে ধরে রাখবার ক্ষমতা সব লেখকের থাকে না, হাতেগোনা কিছু লেখক ছাড়া।
সমকালের সাহিত্যে আমাদের দেশের হুমায়ূন আহমেদ, ইমদাদুল হক মিলন এবং পশ্চিমবঙ্গের খ্যাতনামা লেখক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের লেখায়ই পাওয়া যায় এই শিল্পময় গতিশীল ভাষার জাদু।
অনেক জটিল কঠিন রূঢ় আখ্যানেও তাঁরা খরস্রোতা নদীর মতো হালকা স্বচ্ছন্দ গতির সাহিত্যভাষা সৃষ্টি করতে পেরেছেন, এখানেই রয়েছে তাঁদের সাফল্য বা কৃতিত্বের মূল চাবিকাঠি।
অনেক আগে নিজের লেখা প্রথম উপন্যাস নিয়ে যে আগ্রহ, অভিনিবেশ, মমতা ও উৎসাহ আমি মিলনের মাঝে দেখেছিলাম, সেটাও ছিল তার সাফল্যের বড় প্রতিশ্রুতি।
আজ যখন সে ষাট বছর [এখন ৬৬ বছর বয়স—সম্পাদক] বয়সে পা রেখেছে, আমি এখনো তাকে প্রতিভাবান সেই উদ্যমী তরুণটিই মনে করছি।
এই দিন, এই বয়স নিঃসন্দেহে সোনালি ফসলের সমৃদ্ধি এনে দেবে। প্রয়োজন শুধু তার অবদানের প্রতি নিরপেক্ষ দৃষ্টিক্ষেপণ এবং তার সঠিক মূল্যায়ন।

লেখাটি ইমদাদুল হক মিলন হীরক জয়ন্তী সংবর্ধনা গ্রন্থ-এর জন্য লেখা

/জেডএস/

সম্পর্কিত

ফরিদা মজিদের কথা

ফরিদা মজিদের কথা

বাংলা ট্রিবিউন শারদীয় সংখ্যা ২০২১

বাংলা ট্রিবিউন শারদীয় সংখ্যা ২০২১

‘তোমরা শান্তিতে ঘুমাও—এই ভুল আমাদের আর কখনো হবে না’ : হারুকি মুরাকামি

‘তোমরা শান্তিতে ঘুমাও—এই ভুল আমাদের আর কখনো হবে না’ : হারুকি মুরাকামি

চাঁদ বণিকের একার যুদ্ধ

চাঁদ বণিকের একার যুদ্ধ

ফরিদা মজিদের কথা

আপডেট : ১৭ অক্টোবর ২০২১, ০৫:০০

অতি আধুনিক জীবন যাপন করে ‘আধুনিকা’ হয়েও ফরিদা মজিদ সারা জীবন মনে প্রাণে খাঁটি বাঙালি হয়েই ছিলেন। দীর্ঘকাল যুক্তরাজ্য এবং যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসী থাকা স্বত্ত্বেও তিনি শাড়ি পরা ছাড়েননি। শুধু বাইরের পোশাকেই নয়; মনের দিক দিয়েও অস্তিমজ্জায় তিনি ভেতরে ভেতর লালন করতেন, ধারণ করতেন নিজস্ব সংস্কৃতির মার্জিত এবং রুচিশীলতার ‘বাঙালিত্ব’। তিনি ‘বাংলার নারী’ নামে একটি সংগঠনও করেছিলেন। তবে তা নারীবাদী সংগঠন নয়।

ফরিদা মজিদের সাথে প্রথম দেখা হয় ২০০৪ সালে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। কবি, অনুবাদক, মানবতাবাদী, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারক, বুদ্ধিজীবী ফরিদা মজিদের সাথে বিশ্বখ্যাত এবং নোবেলপ্রাপ্ত অনেক লেখকের বন্ধুত্ব ছিলো। তাঁদের মধ্যে কবি-বিশিষ্ট নাট্যকার ডেরেক এলটন ওয়ালকট, কবি জন অ্যাশবেরি, অ্যালেন গিন্সবার্গ থেকে শুরু করে টেড হিউজ, জ্যাক দেরিদা, জিনি লোলা ব্রিজিদার এঁরা অন্যতম। এঁদের কারো কারো সাথে ফরিদা আপার পত্র যোগাযোগ ছিলো।

‘প্রয়াতদের অপ্রকাশিত চিঠিপত্র’-এর জন্য তিনি তাঁর নানা কবি গোলাম মোস্তফা, ডেরেক ওয়ালকটসহ ক’জনের চিঠি দিয়ে আমার সংগ্রহ সমৃদ্ধ করেছেন।

সেই চিঠি সংগ্রহের জন্য তাঁর নিউ ইয়র্কের ম্যানহাটানে ১২০ হাডসন রিভার ড্রাইভে বাসা যাই। নদীর কাছের ছিমছাম একটি ছোট্ট ফ্লাট। সেই ফ্লাটে গিয়ে দরজায় নক করতেই ভেতর থেকে বললেন, ‘একটু অপেক্ষা করো। দরজা খুলছি।’

দরজা খুলতে-খুলতে বললেন, ‘নোংটো ছিলাম। জামাটা পরে নিলাম।’

আমি বিব্রত এবং বিষ্মিত হলাম! পরে তিনি নিজেই ব্যাখ্যা করলেন, আমরা পোশাক পরি, লজ্জা ঢাকি নিজের নগ্নতা আড়াল করার জন্য। কিন্তু তা নিজের জন্য নয়; অন্যের জন্য! তাই আমি ঘরে একান্ত ঘরোয়া পরিবেশে এভাবেই থাকি!

ফরিদা আমার এই বিষয়টি প্রথমে ধাক্কা খেলাম এবং তা পাগলামি মনে হলেও পরে গভীর দর্শনতত্ব এবং এন্ট্রি-মর্ডান-লাইফ খুঁজে পেয়েছিলাম। পরে এই ধারণ এবং দর্শন নিয়ে আমি একটি কবিতাও রচনা করেছি।

নিজগৃহে খোলামেলা থাকার বিষয়টা আলাদা একটা সংস্কৃতি। একবার ‘সাপ্তাহিক বাঙালি’র সম্পাদক বন্ধু কৌশিক আহমদ এবং আলোকচিত্রী নাসির আলী মামুন দেখা করতে গিয়েছিলেন অ্যালেন গিন্সবার্গের বাসা। তিনিও তখন একেবারে পোশাকবিহীন অবস্থায় এসে দরজা খুলেছিলেন। গিন্সবার্গের ব্যাখ্যাও হয়তো তাই।

প্রসঙ্গক্রমে আরো একটি অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরছি। আমি টিটিসিতে কাজ করার সময় আমার ট্রেনিং-ইন্সট্রাক্টর প্যাট্রিক পরিচয় পর্বে বাংলাদেশের কথা শুনেই জর্জ হ্যারিসনের ‘বেংলাদেশ, বেংলাদেশ/ My friend came to me/ With sadness in his eyes… গেয়ে উঠেছিলেন। তিনি একজন গায়কও। তাঁর কণ্ঠের সেই গানটি ধারণ করার জন্য তাঁর টরন্টোস্থ ডাউন টাউনের বাসায় গিয়েও তাকে জন্মদিনের পোশাকে দেখতে পাই। প্যাট্রিকের আরেকটি বিষয় ছিলো তিনি মোবাইল ফোন ব্যবহার করেন না। তাঁর ভাষ্য, পৃথিবীতে যদি একজন লোক মোবাইল ছাড়াই থাকবে, সে হচ্ছে আমি!

সে প্রসঙ্গ থাক। সেদিন ফরিদা আপার বারান্দায় বসে দ্বিপাক্ষিক আড্ডা হলো। আড্ডা দিতে দিতে গ্লাসে ডগডগ করে ড্রিংক ঢাললেন। আমি খাব কি না, তা জিজ্ঞেসও করলেন না! সাথে কাজুবাদাম আর আলুর চিপস।

‘চিয়ার্স’ বলেই চুমুক দিতে দিতে একা একাই বলতে থাকলেন তাঁর রাজ্যের কথা। যেন ঠাকুরমার ঝুলি খুলে বসলেন। তাঁর কিছু কিছু কথা বোধগম্যও হচ্ছিল না। একটু ধৈর্যচ্যুত হচ্ছিলাম। কিন্তু আমার উদ্দেশ্য—লেখকদের চিঠি। একফাঁকে বললেন, তোমার দুটি কবিতা দিয়ো। অনুবাদ করব।

সেদিন অনেকটা একতরফাই প্রচুর গল্প করলেন। জানলাম, তখন পর্যন্ত তাঁর কোনো বই বের হয়নি।

১৯৯৬ সালে আমার সরকারি চাকরি সমাপ্তির পর আমি আজিজ মার্কেটে প্রথমে ‘মিসিং লিংক’ পরে ‘স্বরব্যঞ্জন’ থেকে প্রবাসীদের জন্য নিউজ সার্ভিস, পত্রিকা প্রকাশ এবং গ্রন্থ প্রকাশনা শুরু করি। আমার প্রকাশনা থেকে ফরিদা আপার অনূদিত বিদেশি কবিদের একটি গ্রন্থ প্রকাশের প্রস্তাব দিলাম। তিনিও আগ্রহ প্রকাশ করলেন। সে প্রসঙ্গে পরে আসছি।

পরে তিনি আমাকে নিয়ে বের হলেন। প্রথমে কলেজে একটি ক্লাস নেবেন। তারপর  বিকেলে আমাকে নিউ ইয়র্ক দেখাবেন। স্থানীয় একটি কলেজে সাহিত্য বিষয় ক্লাস নিলেন। আমাকে একবার বাইরের একটি ফাঁকা ব্যাঞ্চে বসিয়ে রাখলেন। পরে কি মনে করে ক্লাসে নিয়ে গেলেন। বললেন, আমার ক্লাস করো।

আমি বললাম, ভালোই হলো—আমি আপনার একদিনের ছাত্র।

—না, না। তোমাকেও মাস্টার বানাচ্ছি। দাঁড়াও।

তাঁর ক্লাস নেওয়ার স্টাইল ভিন্ন। পাঠ্য পড়ার চেয়ে অপাঠ্য বিষয় নিয়েই আলোচনা করলেন। অনেকটা আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদের মতো। যদিও সায়ীদের ছাত্র হওয়ার সৌভাগ্য বা দুর্ভাগ্য কোনটাই আমার হয়নি। তবে তা সায়ীদ ভাইয়ের প্রিয় ছাত্রদের কাছে জানা।

যদ্দূর মনে পড়ে ফরিদা আপা সেদিন নারী লেখকদের সাহিত্য পড়িয়ে ছিলেন। এক পর্যায়ে আমাকে পরিচয় করিয়ে দিলেন—বাংলাদেশের কবি হিসেবে। এবং আমাকে তাঁর ছাত্রদের উদ্দেশ্যে কিছু বলার অনুরোধ করলেন। আমি এই পরিস্থিতিতে অপ্রস্তুত এবং বিব্রত। অনেকটা হাত-পা কাঁপাকাঁপি অবস্থা। একই রকম কাজ করেছিলেন ইকবাল করিম হাসনু। তিনিও ইউনিভার্সিটি অফ টরন্টোতে চালুকৃত বাংলা ক্লাসে অতিথি বক্তা হিসেবে মঞ্চে উঠিয়ে দিয়েছিলেন।

যাহোক। ফরিদা আপা আমার সিটে বসলেন। আমি সেদিন কি বলেছিলাম, তা পুরোটা মনে নেই। যদ্দূর মনে পড়ে বাংলাদেশের কবিতা, নারী-কবিদের কবিতা নিয়ে কয়েক মিনিট কথা বলেছিলাম। প্রথমত, বাংলাদেশের নারী-কবিদের কবিতা নিয়ে কাজ করেছেন মার্কিন কবি ও গবেষক ক্যারোলিন রাইট। তাঁর কাজে আমার সহযোগিতার কথা বললাম। সেই সাথে প্রয়াত কবি নাসিমা সুলতানা এবং প্রবাসী কবি তসলিমা নাসরিন নিয়ে যৎসামান্য বললাম। কারণ, এরা তিন জনেই আমার বন্ধু। তখন দু-এক জন প্রশ্ন করেছিল—ক্যারোলিনের কাজ, নাসিমার মৃত্যু এবং তসলিমার দেশান্তরী নিয়ে।

আমি লেকচার টেবিল থেকে নামার পরও বাকি প্রশ্নের বাকি উত্তর দিয়েছিলেন ফরিদা আপা। ক্লাস থেকে বেরিয়ে আমাকে যথারীতি নিউ ইয়র্ক দেখালেন এবং আমার দেশে ফেরার আগের দিন অর্থাৎ পরের রোববার বাসায় দুপুরে খাবার দাওয়াত দিলেন আমাকে এবং ক্যারোলিন রাইটকে। ক্যারলিন রাইট তখন নিউ ইয়র্কে এসেছিলেন বিশ্বজিত সাহার ‘দশ সেরা বাঙালি’ অনুষ্ঠানে।

সেদিন ক্যারোলিনও এলেন, আমিও গেলাম। আড্ডা, ভাত-ভর্তা এবং আবারো নারী-কবিদের কবিতা নিয়ে আলোচনা চমৎকার কাটল নিউ ইয়র্কে একটি ঝলমলে দুপুর। বেশ জমেছিলো ক্যারোলিনের ঢাকা থাকাকালীন স্মৃতিচারণে। জানতে চাইলেন সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, মুহাম্মদ নূরুল হুদা, কাজী রোজীদের সম্পর্কে। ক্যারোলিন আমার মিরপুরের বাসায় বেড়াতে গিয়েছিলেন। আমার আম্মার হাতের রান্না খেয়েছিলেন। সেই ঝাল তরকারির কথা এখনো মনে আছে তাঁর।

ফরিদা আপা এবং ক্যারোলিন তাঁদের দুজনেরই পছন্দের পোশাক ‘শাড়ি’। ফরিদা আপা শীত প্রধান দেশে শীতকালেও শাড়িই পরতেন। টিপ পরতেন। খোঁপা বাঁধাতেন। তাঁর ফেইসবুক ঘেঁটে দেখলাম, মাত্র দুটি ছবি মার্জিত ভাবে অন্য ড্রেসে। বাকি সবই শাড়ি পরা ছবি। শাড়ি সম্পর্কে ক্যারোলিনের মূল্যবান বক্তব্য—‘এ এক অদ্ভুত ড্রেস। দশ হাতি একটা কাপড় সেলাই ছাড়াই কি চমৎকারভাবে সারা অঙ্গে জড়িয়ে থাকে অপূ্র্ব সৌন্দর্যে’!

দুই
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময় নিউ ইয়র্কে ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’-এ স্বেচ্ছা সেবকের বিরল ভূমিকা পালন করেন ফরিদা। এছাড়াও পাকিস্তানবিরোধী যেসব বিক্ষোভ-সমাবেশ-আন্দোলন হতো, তাতে ফরিদা আপার সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল। পরবর্তীতে ১৯৯২ সালেও নিউ ইয়র্কে ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সমন্বয়কারী হিসেবে নিরলসভাবে কাজ করেন। শুধু ভালো ইংরেজিই নয়; আরবি ভাষাতেও দক্ষ ছিলেন। তিনি যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে ইংরেজি বক্তৃতা দিয়ে, আরবি লিফলেট লিখে বিলি করে বিদেশির কাছে জনমত গড়ে তুলে ছিলেন। তাঁর সেই দেশপ্রেমের অবদান অনস্বীকার্য।

সেসব ঘটনা সাপ্তাহিক বাঙালির ৯ অক্টোবর ২০২১ সংখ্যায় স্মৃতিচারণের মাধ্যমে সুন্দর করে উপস্থাপনা কবি ফকির ইলিয়াস এবং আদনান সৈয়দ।

কিন্তু পরিতাপের বিষয়, তাঁর অসীম দেশপ্রেম দেশ বা দেশের মানুষ মূল্যায়ন করেনি! এবং তিনিও কখনো এই নিয়ে ভাবেননি তা পুঁজি করে ভাঙ্গাতে চেষ্টা করেননি। এখন থেকেই ফরিদা মজিদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য এবং ব্যক্তিত্বের স্বাক্ষর মেলে। অথচ পিয়ারীরা বাংলা একাডেমির প্রবাসী পুরস্কার থেকে শুরু করে একুশে পদক ভ্যানিটি ব্যাগে ঢুকিয়ে ফেলেছেন।

ফরিদা আপা আজীবন বাউন্ডেলে ছিলেন এবং একইসাথে লেখালেখির সাথে যুক্ত ছিলেন। প্রচুর লিখেছেন, অনুবাদ করেছেন, গদ্য লিখেছেন। এ সব লেখা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে 'বোহেমিয়ান' ফরিদা আপা বলতেন, ‘আমি তো খাঁটি বাদাইম্যা। ও সব নেই কিছু—সব হারিয়ে গেছে’।

এখন তিনি নিজেই অনন্তে হারিয়ে গেলেন।

তিন
ধর্মতত্ব, সমাজতত্ব, সুফিবাদ, সঙ্গীত, শিল্পকলা, সাহিত্য, সিনেমাসহ অনেক বিষয়েই ছিলো তাঁর অগাধ জ্ঞান এবং পাণ্ডিত্য। আমার জানা মতে, পিএইচডি করেছিলেন তুলনামূলক সাহিত্যে। পড়িয়েছেন আমেরিকার বনেদি বিশ্ববিদ্যালয় এবং কলেজে। কমনওয়েলথ পোয়েট্রি প্রাইজের বিচারক ছিলেন। কিন্তু এসব নিয়ে তাঁর কোনো অহমিকা ছিল না। ছিলো আধ্যাতিকতা, পাগলামি, উড়নচণ্ডী।

ফরিদা আপা প্রকাশনার সাথে জড়িত থাকলেও তাঁর মাত্র একটি বই ‘গাঁদা ফুলের প্রয়াণ ও যারা বেঁচে থাকবে’ বই বের হয়েছে। ২০২০ সালে মাত্র ২৫টি কবিতা নিয়ে বইটি প্রকাশ করেছে ক্রিয়েটিভ ঢাকা পাবলিকেশন্স। ধন্যবাদ দেই এই অসীম ধৈর্যধারী প্রকাশনাকে। যদিও মুম রহমানের লেখা থেকে জানলাম, চরম বিড়ম্বনা আর বিরক্তির পরীক্ষায় তারা পাশ-ফেল দুটোই করেছেন। সবচেয়ে বড়কথা অন্তত তাঁর একটি বই প্রকাশ পেয়েছে।

কবি ফরিদা মজিদের কবিতা সম্পর্কে কবি সৈয়দ আদনানের মূল্যায়ন—

‘তাঁর কবিতাগুলো পড়লে যে বিষয় উপলব্ধি করতে পারি, তা হলো তিনি কবিতার শব্দ প্রয়োগে ছিলেন অনেক সচেতন। বিশেষ করে কবিতায় মেটাফোর তাঁর কবিতার অন্যতম অলংকার। তাঁর প্রতিটা কবিতার শব্দই পাঠকের চিন্তায় এবং অন্তরে এক চিত্রকল্পের ঢেউ জাগিয়ে তোলে। কবিতার শরীরে জাদুবাস্তবতার চিত্র আঁকতেও কবি ছিলেন সিদ্ধহস্ত। এসব কাজ দেখে তাঁর কবিতার পাঠকরা খানিক নিজের কল্পনাকে আশ্রয় করে আবার কবির কবিতার নির্যাসে ডুবে থেকে এক নতুন জগতের বাসিন্দা হয়ে যেতে বাধ্য’। [দ্রষ্টব্য : ফরিদা আপাকে মনে পড়ে/ সৈয়দ আদনান, সাপ্তাহিক বাঙালি, ৯ অক্টোবর ২০২১, নিউ ইয়র্ক, আমেরিকা।]

অনেক আগে আমি বের করার উদ্যোগ নিয়েছিলাম ফরিদা আপার অনূদিত কবিতা বইয়ের। তিনি ঢাকায় আমার আজিজ মার্কেটের অফিসেও এসেছিলেন। পাণ্ডুলিপি কম্পোজও হলো। কিন্তু তিনি একের পর এক শর্তারোপ দিতে থাকলেন।

‘তুমি তো জানো, আমি লন্ডনে সালামান্দার পত্রিকা সম্পাদনা করেছি, আমাদের প্রকাশনা ছিলো। কাজেই আমাকে ফাঁকি দেওয়া চলবে না। বইটি এভাবে মেকাপ হবে, সেভাবে ছাপা হতে, টিস বাঁধাই হতে হবে’… ইত্যাদি ইত্যাদি।

আমি তাঁকে বোঝানোর চেষ্টা করলাম, আপা দেখুন—এটা বাংলাদেশ। আবহাওয়া, পরিবেশ, পরিস্থিতির কারণে ‘প্রকাশনার আন্তর্জাতিক মান’ আমাদের পক্ষে বজায় রাখা সম্ভব হয় না। ধরুন, কাগজের জন্য ৫%, কালির জন্য ৫%, ছাপাযন্ত্রের জন্য ৫%, বাঁধাই ৫%, কাটিং ৫% এভাবেই ধারাবাহিক প্রক্রিয়ায় ৫০% কোয়ালিটি মাইনাস হয়ে যায়।

অবুঝ ফরিদা আপা কিছুতেই তা বুঝতে চান না। আরো আমার ওপর বিরক্ত হচ্ছিলেন এবং আমিও বিরক্ত হয়ে পড়ি। তাঁর শিশুশুলভ শর্তের পর শর্ত মানতে পারিনি বলে কম্পোজের পরও ‘বিদেশি বাতাস’ বের হয়নি।

চার
ফরিদা আপা ২০০৬ সালে দেশে ফিরে যাবার পর তাদের মৌচাকের পেছনে টিনসেট বাসায় দেখা করতে গিয়েছিলাম। তখন তিনি আমাকে বললেন, ‘তুমি তো বিদেশে উড়াল দিলা। আর আমি ঘুড়ির মতো আকাশ ঘুরে লাটাইয়ের কাছে ফিরলাম। শহীদ কাদরী ফিরতে পারলেন না। তুমি ফিরে আসো’।

এই ফিরে আসাটাই ফরিদা মজিদ। তিনি লন্ডন-নিউ ইয়র্ক কোথাও শেকড় গাঁথেননি এবং কোনো বন্ধনেও আবদ্ধ হয়নি। ছন্নছাড়া জীবনে একবার নাকি ‘বেলতলা’য় গিয়েছিলেন। তাঁর ভাষ্য—মাথার উপর যৌথ ছাদের চেয়ে খোলা আকাশই ভালো!

২০১৫ সালে ১৫ ফেব্রুয়ারি কবি শিমুল সালাউদ্দিন আমাকে নিয়ে একটি একক অনুষ্ঠান করলেন কেন্দ্রীয় পাবলিক লাইব্রেরিতে। সেখানে ফরিদা আপা হুট করে হাজির হয়ে শুধু চমকিয়েই দেননি; ভালোবাসার প্রমাণও দিয়েছেন। মৃদু অভিযোগের সুরে বললেন, তোমাকে নিয়ে অনুষ্ঠান আর আমাকে একবারও বললে না! আমি বিব্রত হয়ে বললাম, আপা সরি। আসলে আয়োজকেরা হয়তো ব্যস্ততার জন্য ভুলে গিয়েছিল।

আমি শিমুলকে ডেকে বললাম, আপাকে কিছু বলার জন্য মঞ্চে ডেকো। তিনি তাঁর বক্তব্যে আমাদের যৌথ স্মৃতিচারণ করলেন। বললেন, ‘আমি দেশে চলে এলাম আর দুলাল দেশ ছেড়ে চলে গেলে? তা বিদেশি বাতাস কেমন লাগছে’!

একটু ঝাঁকুনি খেলাম। এখনো মনে আছে তাঁর সেই ‘বিদেশি বাতাস’-এর কথা।

আবারও বইমেলায় দেখা হলো ২০১৯ সালে। আমি আর আমীরুল ইসলাম একটি বুকস্টলের সামনে দাঁড়িয়ে আড্ডা দিচ্ছি। ফরিদা আপা এসে বললেন, আরে আমীরুল, আরে রিটন তোমরা কেমন আছ? তোমাদের কি বই বেরুলো?

আপা এবার আমাকে চিনতে পারলেন না! আমি একটু অবাক হলাম। এত চেনাজানা পরেও আপা আমাকে গুলিয়ে ফেললেন! আমি তাঁর স্মৃতি থেকে হারিয়ে গেলাম! উজ্জ্বল-উচ্ছল চেহারাটা মরা নদীর মতো ক্লান্ত। সাজুগুজো স্বত্ত্বেও কেমন যেন ম্লান আর এলোমেলো মনে হচ্ছিল!

আমীরুল চিমটি কেটে দুষ্টুমি করে আমাকে ‘রিটন ভাই, রিটন ভাই’ শুরু করল। আমিও মজা নিচ্ছিলাম এবং শেষ পর্যন্ত আমি লুৎফর রহমান রিটন হয়েই থাকলাম।

/জেডএস/

সম্পর্কিত

বাংলা ট্রিবিউন শারদীয় সংখ্যা ২০২১

বাংলা ট্রিবিউন শারদীয় সংখ্যা ২০২১

‘তোমরা শান্তিতে ঘুমাও—এই ভুল আমাদের আর কখনো হবে না’ : হারুকি মুরাকামি

‘তোমরা শান্তিতে ঘুমাও—এই ভুল আমাদের আর কখনো হবে না’ : হারুকি মুরাকামি

চাঁদ বণিকের একার যুদ্ধ

চাঁদ বণিকের একার যুদ্ধ

ইমান একটি সাদা জবা ফুল

ইমান একটি সাদা জবা ফুল

বিশেষ সংখ্যা (সূচিপত্র)

বাংলা ট্রিবিউন শারদীয় সংখ্যা ২০২১

আপডেট : ১৫ অক্টোবর ২০২১, ২১:০৯

 

সূ | চি | প | ত্র

 সাক্ষাৎকার

যতীন সরকারের সাক্ষাৎকার

হাসান আজিজুল হকের সাক্ষাৎকার

 

অনুবাদ

এইচ জি ওয়েলস যদি বেঁচে থাকতেন! | মূল : এলিফ শাফাক

অনুবাদ : অসীম নন্দন

 

‘তোমরা শান্তিতে ঘুমাও—এই ভুল আমাদের আর কখনো হবে না’ | হারুকি মুরাকামি

অনুবাদ : আলভী আহমেদ

 

ছোটগল্প

ইমান একটি সাদা জবা ফুল | মামুন অর রশীদ

 

অনুগল্প

পাঁচটি অণুগল্প | চন্দন চৌধুরী

 

প্রবন্ধ

চাঁদ বণিকের একার যুদ্ধ | মনির-উল হক

 

কবিতা

[বর্ণানুক্রমে]

অর্ণব রায় | আসাদ মান্নান | খায়রুল বাকী শরীফ | গৌতম গুহ রায় | ত্রিশাখ জলদাস | ধীমান চক্রবর্তী | নিষাদ নয়ন | নিখিলেশ রায় | পরিতোষ হালদার | ফরিদ ছিফাতুল্লাহ | বনানী চক্রবর্তী | বিভাস রায়চৌধুরী | মাহফুজা অনন্যা | মেঘ বসু | রাখী সরদার | রুবেল সরকার | শিকদার ওয়ালিউজ্জামান | সাকিরা পারভীন | হাসনাইন হীরা |

 

দীর্ঘ কবিতা

পৃথিবীর প্রাচীনতম নেপথ্যসঙ্গীতের কথা | অরিত্র সান্যাল

 

ভ্রমণ

স্যুরিশের চারপাশে | অহ নওরোজ

 

/জেডএস/

সম্পর্কিত

ফরিদা মজিদের কথা

ফরিদা মজিদের কথা

‘তোমরা শান্তিতে ঘুমাও—এই ভুল আমাদের আর কখনো হবে না’ : হারুকি মুরাকামি

‘তোমরা শান্তিতে ঘুমাও—এই ভুল আমাদের আর কখনো হবে না’ : হারুকি মুরাকামি

চাঁদ বণিকের একার যুদ্ধ

চাঁদ বণিকের একার যুদ্ধ

ইমান একটি সাদা জবা ফুল

ইমান একটি সাদা জবা ফুল

‘তোমরা শান্তিতে ঘুমাও—এই ভুল আমাদের আর কখনো হবে না’ : হারুকি মুরাকামি

আপডেট : ১৪ অক্টোবর ২০২১, ১৫:০০

[হারুকি মুরাকামি পোস্টমডার্ন সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ একজন লেখক। তাঁর লেখা গল্প, উপন্যাস ও প্রবন্ধ পাঠক-সমালোচক মহলে সমানভাবে প্রশংসিত। তাঁর উল্লেখযোগ্য উপন্যাসগুলো হলো নরওয়েজিয়ান উড, কাফকা অন দ্য শোর, দ্য উইন্ড-আপ বার্ড ক্রনিক্যাল, কিলিং কমেনডেটর ইত্যাদি।
২০১১ সালের ১৬ জুন ২৩-তম ক্যাতালুনিয়া আন্তর্জাতিক পুরস্কার লাভ করেন তিনি। পুরস্কারটি গ্রহণ করতে গিয়ে স্পেনের বার্সেলোনায় হারুকি মুরাকামি এই বক্তৃতাটি দেন। পরে ক্যাতালান নিউজে এটি প্রকাশিত হয়। দ্য গার্ডিয়ান-সহ বিশ্বের অনেক পত্রিকায়ও বক্তৃতাটি ছাপা হয়েছিল। জাপানের পারমাণবিক শক্তি উৎপাদন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে এটি একটি প্রতিবাদ। খোদ জাপানে বক্তৃতাটি বিতর্কের ঝড় তোলে।]


শেষবার বার্সেলোনা এসেছিলাম ঠিক দু-বছর আগের এক বসন্তে। একটা বই সাইনিংয়ের অনুষ্ঠান ছিল সেদিন। অসংখ্য পাঠক লাইন ধরে দাঁড়িয়ে ছিল আমার অটোগ্রাফ নেওয়ার জন্য। পুরো ব্যাপারটাতে আমি যথেষ্ট অবাক হয়েছি। আমার মনে পড়ে, দেড় ঘণ্টার কিছু বেশি সময় লেগেছিল সবাইকে অটোগ্রাফ দিতে। এত সময় লাগার কারণটা আপনাদের বলি। এখানে আমার কিছু নারী ভক্ত-পাঠক আছে, যারা আমাকে সেবার চুমু খেতে চেয়েছিল।

আমি পৃথিবীর অনেক শহরে গিয়েছি বই সাইনিং ইভেন্টে অংশ নেওয়ার জন্য। কিন্তু কেবলমাত্র বার্সেলোনাতেই নারী ভক্তরা আমাকে চুমু খেতে চেয়েছে। শুধুমাত্র এ-কারণেই এটা আমার কাছে একদম অন্যরকম একটা শহর। এই শহরে দু-বছর পর আজ আবার ফিরে আসতে পেরে আমি আনন্দিত, আপ্লুত। অদ্ভুত সুন্দর এই শহর। ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতিতে সমৃদ্ধ।

কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে আপনাদের বলতে চাই, আজ আমি চুমু খাবার মতো হালকা কোনো বিষয়ে কথা বলতে আসিনি। একটা সিরিয়াস বিষয় নিয়ে কথা বলব।

এ ব্যাপারে হয়তো আপনারা অবগত আছেন যে, গত মার্চ মাসের ১১ তারিখ দুপুর দুটো বেজে ৪৬ মিনিটে জাপানের উত্তরপূর্ব সীমান্তে এক ভয়ঙ্কর ভূমিকম্প হয়—অত্যন্ত শক্তিশালী এক ভূমিকম্প। প্রচণ্ড ঝাঁকুনিতে পৃথিবী যে অক্ষের ওপর ঘুরছে সেই ঘোরার গতি সহসা বেড়ে যায়। এমনকি দিনের দৈর্ঘ্য সেকেন্ডের ১.৮ মিলিয়ন ভাগের এক ভাগ হ্রাস পায়। 

ভূমিকম্পের ফলে যে ক্ষতি হয়েছে তা ভয়াবহ। ভূমিকম্প পরবর্তী সুনামির কারণে যে মারাত্মক বিপর্যয় ঘটেছে তা রীতিমতো ধ্বংসাত্মক। কোনো কোনো জায়গায় সুনামির ঢেউ এতটাই ফুলে ফেঁপে উঠেছে যে, তার উচ্চতা ছিল ৩৯ মিটারের মতো।

আপনারা একটা বার ভাবুন। ৩৯ মিটার! ১০ তলা একটা বিল্ডিং ডুবে যাবে। মানুষ আশ্রয় পাবে না। যারা উপকূলের কাছাকাছি বাস করত তারা পালানোর কোনো সুযোগ পায়নি। প্রায় ২৪ হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছে, যার মধ্যে নয় হাজার লোকের এখনো কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। বড় বড় ঢেউ তাদেরকে ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। আমরা এখনো তাদের দেহ খুঁজে পাইনি। সম্ভবত তারা গভীর সাগরের মাঝে চিরদিনের জন্য হারিয়ে গেছে।

বিষয়টা নিয়ে যতই ভাবি না কেন, কোনো কূলকিনারা করতে পারি না। তাই মাঝে মাঝে ভাবনা বন্ধ করে নিজেকে ওই হতভাগা মানুষগুলোর জায়গায় কল্পনা করি। আমার বুক শক্ত হয়ে আসে। যারা বেঁচে গেছে, তাদের কথা ভাবি। অনেকেই তাদের পরিবার, বন্ধু, ঘরবাড়ি, বিষয়-সম্পত্তি, এমনকি বেঁচে থাকার শক্তি পর্যন্ত হারিয়ে ফেলেছে। কোনো কোনো জায়গায় পুরো গ্রাম, পুরো জনপদই ধ্বংস হয়ে গেছে। সেসব মানুষের মধ্যে বেঁচে থাকার কোনো স্পৃহাই আর অবশিষ্ট নেই, আশাটাই যেন মরে গেছে। 

একজন জাপানিজ এ কথাটা খুব ভালো করেই জানে যে, তাকে প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে বাস করতে হবে। গ্রীষ্ম থেকে শরৎ-এর মধ্যে পুরো জাপান জুড়ে দফায় দফায় টাইফুন হয়। প্রতি বছরই এ কারণে জীবন এবং সম্পদের ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতি হয়। জাপানের প্রতিটা অঞ্চলেই একাধিক সক্রিয় আগ্নেয়গিরি আছে। ভূমিকম্পের কথা নতুন করে আর নাই-বা বললাম।

আমাদের দুর্ভাগ্য যে, জাপানের ভৌগোলিক অবস্থান ভূমিকম্প-প্রবণ অঞ্চলে। এশিয়া মহাদেশের পূর্ব দিকে চারটা বড় টেকটোনিক প্লেটের মধ্যে বিপজ্জনকভাবে ঝুলে আছে আমাদের জন্মভূমি। এখানে বাস করাটা তাই আমাদের কাছে অনেকটা ভূমিকম্পের আঁতুড়ঘরে বাস করার মতো। 

টাইফুনের সঙ্গে ভূমিকম্পের একটা পার্থক্য আছে। টাইফুনের সময় এবং গতিপথ কিছুটা হলেও আবহাওয়া দপ্তর ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারে। কিন্তু ভূমিকম্প কবে হবে বা কখন হবে—সেটা কেউ বলতে পারবে না। ১১ মার্চের ভূমিকম্প সম্পর্কে কেবলমাত্র এটুকুই বলা সম্ভব যে এটাই শেষ নয়, এরপরও সে আসবে, আবার আসবে, নিশ্চয়ই আসবে, হয়তো অদূর ভবিষ্যতেই আসবে। আমরা নির্দিষ্ট করে সেই সময়টা সম্পর্কে বলতে পারব না। তবে সে যে আসবে এটুকু আমরা নিশ্চিতভাবে জানি। এর কোনো ভুল নেই। ভুল হবার সুযোগ নেই।

বিশেষজ্ঞরা ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন, আগামী ২০-৩০ বছরের মধ্যে টোকিওতে আট মাত্রার একটা বড় ভূমিকম্প হতে পারে। তারা ২০ বা ৩০ বছরের কথা বললেও এটা ১০ বছরের মধ্যেও ঘটে যেতে পারে। আমি মোটেই অবাক হব না যদি আগামীকাল বিকালেই সেই ভূমিকম্প আঘাত করে। টোকিওর মতো একটা ঘনবসতিপূর্ণ শহরে যদি সত্যিই এই ভূমিকম্প আঘাত হানে, তবে কী হতে পারে—একটাবার ভাবুন। যে ক্ষয়ক্ষতি হবে তার সঠিক পরিমাণ কেউ আন্দাজ করতে পারবে না।

কেবলমাত্র টোকিও শহরেই প্রায় ১৩ মিলিয়ন মানুষ খুবই সাধারণ জীবন যাপন করে। তারা ভিড়ভাট্টার মধ্যে কমিউটার ট্রেনে চেপে অফিস যায়। তাদের অফিসগুলো সব আকাশ ছোঁয়া ইমারতে। ১১ মার্চের ভূমিকম্পের পরে টোকিওর জনমনে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ার কথা। কিন্তু সেরকম কিছু ঘটেনি। আমি অন্তত শুনিনি যে টোকিও ছেড়ে একটি লোকও চলে গেছে।

কেন যায়নি? কেন তারা রয়ে গেছে? আপনারা এই প্রশ্ন করতেই পারেন। ঠিক কী কারণে এতগুলো মানুষ প্রতিদিন এরকম ভয়ংকর একটা জায়গায় তাদের জীবন কাটিয়ে দিচ্ছে? তাদের তো ভয়ে পাগল হয়ে যাবার কথা, তাই না?

উত্তরটা দিচ্ছি।

জাপানিজ ভাষায় আমাদের একটা শব্দ আছে, একেবারেই নিজস্ব সেই শব্দ—মুজো। এর অর্থ হচ্ছে নশ্বর। কোনোকিছুই চিরকাল টিকে থাকে না। এই পৃথিবীতে যা কিছু জন্মায়, তা এক সময় ক্ষয়ে যেতে যেতে যেতে ‘নেই’ হয়ে যায়। এমন কোনোকিছুই নেই যা অবিনশ্বর, বা পরিবর্তন হবে না। বিশ্বসংসার সম্পর্কে এই ধারণাটা সম্ভবত এসেছে আমাদের বৌদ্ধ দর্শন থেকে। কিন্তু সত্যিকার অর্থে বলতে গেলে 'মুজো'-র ধারণাটা বৌদ্ধ দর্শনের গণ্ডি পেরিয়ে জাপানি জনমানুষের আত্মার মধ্যে গভীরভাবে ঢুকে গেছে। সেই প্রাচীনকাল থেকে মানুষের মনে শব্দটা পাকাপাকিভাবে স্থান করে নিয়েছে, আসন পেতে বসেছে—অনেকটা শেকড় গাঁড়ার মতো। 

সবকিছুই যে নশ্বর এই ধারণার মধ্যে এক ধরনের হাল ছেড়ে দেওয়ার গন্ধ আছে। আমরা বিশ্বাস করি, প্রকৃতির বিরুদ্ধে গিয়ে কিছুই করা সম্ভব নয়। এই হাল ছেড়ে দেওয়ার ব্যাপারটার মধ্যেও জাপানের লোকজন একটা সুন্দর ইতিবাচক দিক আবিষ্কার করেছে।

প্রকৃতি থেকে কিছু উদাহরণ টেনে ব্যাপারটা পরিষ্কার করার চেষ্টা করি। বসন্তকালে জাপানে চেরি ফুল ফোটে, আমরা তা ভালোবাসি। গ্রীষ্মের সময় নিভু নিভু অন্ধকারে আমরা জোনাকি দেখি আর শরৎকালে ভালোবাসি লাল রঙের পাতা। আমরা সবাই মুগ্ধ হয়ে একসঙ্গে এগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকি। এটা আমাদের অভ্যাস, একইসঙ্গে ঐতিহ্য। চেরি ফুল ফোটে এমন জায়গায় আপনি যদি বসন্তকালে কোনো হোটেল ভাড়া নিতে যান, আপনি সেটা পারবেন না। হোটেলের সব সিট আগে থেকেই বুক হয়ে যায়। জোনাকি অথবা লাল পাতার জন্য বিখ্যাত কোনো জায়গার বেলাতেও একই কথা প্রযোজ্য। গ্রীষ্মকালে এবং শরতে সেখানে মানুষের ভিড় লেগে থাকে। 

কেন এমন হয়?

কারণটা সম্ভবত এই যে চেরি ফুল, জোনাকি অথবা শরতের লাল পাতা কোনোটাই অবিনশ্বর নয়। তাদের সৌন্দর্য ক্ষণস্থায়ী। তাই আমরা দূর-দূরান্ত থেকে যাই ওই বিশেষ গৌরবময় মুহূর্ত বা সময়ের সাক্ষী হতে। আরও একটি ব্যাপার এখানে আছে। ওপরের যে তিনটি জিনিসের কথা আপনাদের বললাম, তারা ধীরে ধীরে যখন তাদের সৌন্দর্য হারায়, আমরা কিছুটা স্বস্তি বোধ করি। সৌন্দর্য তার সর্বোচ্চ শিখরে আরোহন করে যখন একটু একটু করে ম্লান হতে থাকে, আমরা আমাদের অগোচরেই মনের মধ্যে এক ধরনের শান্তি পাই। 

আমি ঠিক বলতে পারব না, আমাদের এধরনের মানসিকতার কারণটা কী। সম্ভবত প্রাকৃতিক বিপর্যয় আমাদের মনটাকে এভাবে তৈরি করেছে। কিন্তু আমি এ বিষয়ে নিশ্চিত যে এই মানসিকতাই আমাদের বারবার বিপর্যয় থেকে ঘুরে দাঁড়াতে সাহায্য করে। মোট কথা হলো, আমরা মেনে নিতে শিখেছি। অমোঘ নিয়তির মতো প্রকৃতির অনিবার্য বিষয়গুলো আমরা হাসিমুখে মেনে নেই।

অধিকাংশ জাপানিজ এই ভূমিকম্পে মানসিকভাবে ধাক্কা খেয়েছে। যদিও তারা ব্যাপারটাতে মোটামুটিভাবে অভ্যস্ত, তারপরেও যে পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে—তার সঙ্গে তারা মানিয়ে নিতে পারেনি। আমরা আমাদের দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় অসহায় এবং একই সাথে উদ্বিগ্ন। 

তবে আমরা ভেঙে পড়িনি। ঘুরে দাঁড়াবার শক্তি আমাদের আছে। আমাদের মন আবার চাঙা হয়ে উঠবে। আমি এটা নিশ্চিতভাবে জানি। আমরা ধ্বংসস্তূপ থেকে মাথা উঁচু করে উঠে দাঁড়াব। এবং সবকিছু আবার নতুন করে গড়ে নেব। এ নিয়ে আমার তেমন কোনো দুশ্চিন্তা বা ভয় নেই। 

ইতিহাসের দীর্ঘ সময় জুড়ে আমরা এভাবেই ঘুরে দাঁড়িয়েছি, বছরের পর বছর ধরে। দুঃখে স্থবির হয়ে যাইনি। আমরা জানি, ঘর ভেঙে গেলে তা নতুন করে বানানো যায়, ভাঙা রাস্তাও মেরামত করা সম্ভব। এমন কোনো জটিল বিষয় এগুলো নয়। 

পুরো বিষয়টাকে আপনারা এভাবে দেখতে পারেন যে পৃথিবীর বুকে আমরা যখন ঘর বানিয়েছি, তখন কারো অনুমতি কিন্তু নেইনি। পৃথিবী যদি আজ আমাদের অনাহূত অতিথি বলে ঘোষণা করে, তবে তার প্রতিবাদ করার মতো কোনো ভাষা আমাদের জানা নেই। ধরণী কখনো আমাদের অনুরোধ করেনি তার বুকে থাকতে। তাই সে যদি সামান্য নড়াচড়া শুরু করে বা কেঁপে ওঠে তাহলে এ নিয়ে আমাদের অভিযোগ জানানোর কিছু নেই। ভূপৃষ্ঠ মাঝে মধ্যে কেঁপে উঠবে, এটা তার ধর্ম। আমরা পছন্দ করি বা না-ই করি, তাতে তার কিছু এসে যায় না। এই ব্যাপারটা মেনে নিয়েই আমাদের বাঁচতে হবে। 

তবে আজ আমি আপনাদের সামনে জানমালের ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে কথা বলতে আসিনি। রাস্তা বা বাড়িঘর ভেঙে গেলে খুব সহজেই সেগুলো আবার তৈরি করা যায়। আমি এমন কিছু নিয়ে আজ কথা বলব যা একবার হারিয়ে গেলে সহজে আর ফিরে পাওয়া যায় না। এই যেমন, আমাদের মূল্যবোধ। এই জিনিসটার কোনো আকার নেই। একবার মূল্যবোধের অবক্ষয় হলে সেটা ফিরে পাওয়া খুব কঠিন। আপনার কাছে টাকা আছে, সেই টাকা দিয়ে আপনি কিছু শ্রমিক আর কাঁচামাল জোগাড় করে মূল্যবোধ ব্যাপারটা আবার গড়ে তুলতে পারবেন না। এটা সে ধরনের বিষয় নয়।

আমি যদি আমার কথাটা আরও নির্দিষ্ট করে বলতে চাই, তাহলে বলতে হবে আমি ‘ফুকুশিমা পারমাণবিক শক্তি কেন্দ্র’ নিয়ে কথা বলতে চাইছি। আপনারা হয়তো জানেন যে ছয়টা পারমাণবিক চুল্লির মধ্যে অন্তত তিনটা ভূমিকম্প এবং সুনামির ফলে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেগুলো এখনো মেরামত করা সম্ভব হয়নি। এই নিউক্লিয়ার রিঅ্যাক্টরগুলো থেকে চারপাশে ক্রমাগত তেজস্ক্রিয়তার বিকিরণ ঘটছে। সেখানকার মাটি দূষিত হয়ে গেছে। তেজস্ক্রিয় জল গিয়ে মিশেছে সাগরে। তেজস্ক্রিয় ধূলিকণা বাতাসে মিশে ছড়িয়ে পড়েছে দূর দূরান্তে।

লক্ষ লক্ষ মানুষ তাদের ঘর বাড়ি ছাড়তে বাধ্য হয়েছে। মাইলের পর মাইল জুড়ে গবাদি পশুর খামার ও প্রজনন কেন্দ্র, শিল্প কারখানা,শহর-বন্দর পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। যারা এসব জায়গায় বাস করত, হয়তো এ জীবনে তারা আর কখনো সেখানে ফিরে যেতে পারবে না। অত্যন্ত দুঃখের সাথে একথাও আমাকে স্বীকার করতে হচ্ছে যে শুধুমাত্র জাপান নয়, এই ঘটনায় ক্ষতির রেশ পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রগুলোতেও ছড়িয়ে পড়বে।

এরকম দুঃখজনক একটা দুর্ঘটনা কেন ঘটলো তা মোটামুটি স্পষ্ট। যে সমস্ত মানুষ এই পরমাণু প্রকল্পগুলো তৈরি করেছিল, তারা স্বপ্নেও ভাবেনি এরকম ভয়াবহ একটা সুনামি এসে আঘাত করবে। অবশ্য বিশেষজ্ঞরা বারবার বলেছিলেন যে অতীতেও এই মাপের সুনামি এই অঞ্চলে আঘাত করেছিল। অতীতে আঘাত করলে ভবিষ্যতেও আঘাত না করার মতো কোনো কারণ তৈরি হয়নি। সেই হিসেবে এগুলোর নিরাপত্তার মান আরও বাড়ানো দরকার ছিল।

কিন্তু যেসব কোম্পানি বৈদ্যুতিক শক্তি উৎপাদন করে তারা বিশেষজ্ঞদের মতামত অগ্রাহ্য করেছে। সেগুলো মোটেই আমলে নেয়নি। বেপরোয়াভাবে পরমাণু প্রকল্প স্থাপন করেছে। শত বছরে একবার ঘটতে পারে এরকম সুনামির কথা ভেবে বাণিজ্যিক সংস্থাগুলো বিনিয়োগ করতে চায় না। শুধু শুধু নিরাপত্তাজনিত কারণে খরচ বাড়িয়ে তাদের কোনো লাভ নেই। 

আমার কাছে কেন যেন মনে হয়, সরকার নিজেই পরমাণু প্রকল্পগুলোকে উৎসাহ দিতে গিয়ে নিরাপত্তা ইস্যুতে বেশ কিছু ছাড় দিয়েছে। সুনির্দিষ্ট কিছু বিধি শিথিল করেছে যা করার কোনো কারণ তাদের নেই। তারা ইচ্ছে করলে কড়াকড়ি আরোপ করতে পারতো, কিন্তু তারা তা করেনি। 

এই বিষয়গুলো আমাদের তদন্ত করা উচিত। এতে যদি কোনো গলদ ধরা পড়ে, তবে অবিলম্বে ব্যবস্থা নিতে হবে। হাজার-হাজার, লক্ষ-লক্ষ মানুষ তাদের ঘরবাড়ি, ভিটে-মাটি ছাড়তে বাধ্য হয়েছে। এটা কোনো ছেলেখেলা নয়। তাদের সর্বনাশ হয়ে গেছে। তারা যদি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বা রেগে যায়, তাহলে সেই রাগ খুবই স্বাভাবিক, যৌক্তিক। 

কোনো এক আশ্চর্য কারণে জাপানের মানুষজনের রাগ খুব কম। তারা খুব ধৈর্যশীল, সহজে রেগে ওঠে না। তারা অবশ্যই বার্সেলোনার নাগরিকের থেকে আলাদা। কিন্তু এ যাত্রায় তাদের পক্ষেও রাগকে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। 

এখন সময় এসেছে আত্মসমালোচনার। আমাদের নিজেদেরকে তিরস্কার করতে হবে। আমরা নিজেরাই দিনের পর দিন এই দুর্নীতিগ্রস্থ সিস্টেমকে মেনে নিয়েছি এবং সহ্য করে আসছি। 

আপনারা এ কথা সবাই জানেন যে আমরা জাপানের জনগণ পারমাণবিক তেজস্ক্রিয়তার সাথে আগে থেকেই পরিচিত। ১৯৪৫ সালের আগস্ট মাসে আমেরিকার সামরিক বিমান জাপানের দুটি প্রধান শহর হিরোশিমা ও নাগাসাকির ওপর পারমাণবিক বোমা নিক্ষেপ করে। দুই লক্ষের বেশি লোক তখন প্রাণ হারায়। এদের অধিকাংশই নিরস্ত্র এবং বেসামরিক মানুষ। নেহায়েৎ আমজনতা। সেই পারমানবিক বোমা হামলা ভুল ছিল নাকি শুদ্ধ ছিল, সে বিচারে আমি এই মুহূর্তে যেতে চাচ্ছি না।

আমি শুধু এই কথাটা বলতে চাইছি যে একটা দুটো লোক নয়, দুই লক্ষের বেশি লোক বোমা নিক্ষেপের প্রায় সাথে সাথেই প্রাণ হারিয়েছে। এই ঘটনায় যারা বেঁচে গিয়েছিল, তারাও দিনের পর দিন একটু একটু করে মৃত্যুর দিকে পা বাড়িয়েছে। তেজস্ক্রিয়তা তাদের পিছু ছাড়েনি। কী ভয়ংকর এক ক্ষতি যে তেজস্ক্রিয়তার কারণে হয়েছে, আমরা সবাই তা মোটামুটিভাবে জানি। 

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আমাদের দুটি মৌলিক নীতি গ্রহণ করতে হয়েছিল। প্রথমটা অর্থনৈতিক পুনর্জাগরণ। আর দ্বিতীয়টা হলো যুদ্ধকে অস্বীকার করা। সামরিক খাতে খরচ কমিয়ে উন্নতির পথে হাঁটাটা জরুরি হয়ে পড়েছিল। কেবলমাত্র সেভাবেই আমরা শান্তি পেতে পারতাম। এই ভাবনাগুলোই ছিল যুদ্ধপরবর্তী জাপানের নতুন নীতি। 

হিরোশিমায় পরমাণু বোমায় নিহতদের স্মৃতিফলকে একটা সুন্দর কথা লেখা আছে,

‘তোমরা শান্তিতে ঘুমাও-

এই ভুল আমাদের আর কখনো হবে না।’

শব্দগুলো অনেক কোমল, তাই না? এর একটা অন্য অর্থ আছে। তা হলো, আমরা একই সঙ্গে ভুক্তভোগী এবং অপরাধী। পারমাণবিক শক্তি আমাদের আতঙ্কিত করে, আমরা এই শক্তিকে ভয় পাই, সেই হিসেবে আমরা ভুক্তভোগী।

আবার আমরা নিজেরাই এই শক্তিকে ব্যবহার করছি, কোনোভাবেই এর ব্যবহার থেকে নিজেদের বিরত রাখতে পারছি না, সেই হিসেবে আমরা অপরাধী। আমরাই আক্রমণকারী। 

হিরোশিমায় পারমানবিক বোমা বিস্ফোরণের পর অনেকখানি সময় বয়ে গেছে। ঠিক ৬৪ বছর পর ফুকুশিমা দাই-ইচি পারমাণবিক চুল্লি থেকে গত তিন মাস ধরে তেজস্ক্রিয়তা ছড়াচ্ছে। এবং তার চারপাশের মাটি, সমুদ্র এবং বাতাস দূষিত হয়ে পড়ছে। কেউ জানে না এটা কীভাবে বন্ধ হবে অথবা কখন হবে।

পারমাণবিক শক্তির কারণে এটা জাপানের দ্বিতীয় বিপর্যয়। এবার কিন্তু কেউ আমাদের ওপর পরমাণু বোমা নিক্ষেপ করেনি। আমরা নিজেরাই এই ভয়াবহ বিপর্যয়ের কারণ। নিজেদের ভুলেই ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে আমাদের মাটি, আমাদের জীবন।

এমনটা কেন ঘটলো? কারণটা কী? দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পারমাণবিক শক্তিকে প্রত্যাখ্যান করার ব্যাপারে আমাদের যে নীতিগত সিদ্ধান্ত, সেটা হঠাৎ করে কেন পরিবর্তন করতে হবে? বছরের পর বছর যে শান্তিপূর্ণ এবং উন্নত সমাজের স্বপ্ন আমরা দেখতে শুরু করেছিলাম, সেই স্বপ্ন হুট করে কেন নষ্ট হয়ে গেল? কারণটা খুব সাদামাটা। আমরা উন্নয়নের সংক্ষিপ্ত এবং কাযর্কর একটা উপায় আবিষ্কারের চেষ্টা করেছি। দক্ষতা অর্জন করতে চেয়েছি, ইংরেজিতে যাকে বলে এফেসিয়েন্সি।

বৈদ্যুতিক শক্তি নিয়ে যে কোম্পানিগুলো কাজ করে, তারা আমাদের বোঝাতে পেরেছে যে শক্তি উৎপাদনের সবচেয়ে দক্ষ এবং কার্যকর ব্যবস্থা হলো পারমাণবিক চুল্লির ব্যবহার। সত্যিকার অর্থে এটা এমন একটা ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে কোম্পানিগুলো সহজেই মুনাফা অর্জন করতে পারবে।

জাপান সরকারের পেট্রোলিয়ামের চাহিদা এবং সরবরাহ নিয়ে সবসময়ই এক ধরনের দুশ্চিন্তা ছিল। পৃথিবী জুড়ে জ্বালানি তেল সংকট শুরু হবার পর থেকেই আমাদের সরকার পারমাণবিক শক্তি উৎপাদনকে জাতীয় নীতির অন্তর্ভুক্ত করে ফেলেছে। 

বৈদ্যুতিক শক্তি উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলো বিজ্ঞাপনে প্রচুর টাকা খরচ করেছে। একইসাথে মিডিয়াকে ঘুষ দিয়ে দেশের আপামর জনসাধারণের কাছে ভুল তথ্য সরবরাহ করেছে। মিথ্যে বলেছে তারা। আমাদেরকে পুরোপুরি বিভ্রান্ত করেছে—অত্যন্ত কার্যকর এক উপায়ে। দেশের মানুষকে বুঝিয়ে ছেড়েছে, পারমাণবিক শক্তি উৎপাদন ব্যবস্থা সম্পূর্ণ নিরাপদ। 

কিছু বুঝে উঠার আগেই আমরা আবিষ্কার করলাম, জাপানে উৎপাদিত মোট বিদ্যুতের শতকরা ৩০ ভাগ আসছে পরমাণু শক্তি থেকে। জাপান হচ্ছে একটা ছোট্ট দ্বীপ রাষ্ট্র, যে দেশে প্রায়ই ভূমিকম্প হয়, নানা প্রকার প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে আমরা জর্জরিত। অদ্ভুত ব্যাপার হলো, এই ছোট্ট দ্বীপ-রাষ্ট্রটি পারমাণবিক শক্তি উৎপাদনে এই মুহূর্তে বিশ্বে তৃতীয়। এই পুরো ব্যাপারটা কখন ঘটেছে, কীভাবে ঘটলো, কখন আমরা পারমাণবিক শক্তি উৎপাদনে বিশ্বে তৃতীয় অবস্থানে চলে গেছি—কিছুই টের পাইনি। 

আমরা ঠিক সেই সীমায় পৌঁছে গেছি, যেখান থেকে ফেরার পথ নেই। যা হবার তা হয়ে গেছে। যারা শুরুর দিকে পারমাণবিক শক্তি উৎপাদন নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছিল, বা এর বিরোধিতা করেছিল, তাদেরকে এখন উল্টো বিদ্রুপ করে প্রশ্ন করা হচ্ছে, আপনারা কি বিদ্যুৎ ঘাটতির পক্ষে?

খুব কৌশলে জাপানের জনগণকে ভাবতে বাধ্য করা হয়েছে যে পারমাণবিক শক্তির ওপর নির্ভরশীলতা অবশ্যম্ভাবী। এটা এড়ানোর কোনো সুযোগ নেই। কিছু মানুষ এটা মেনে নিয়েছে। কারণ গ্রীষ্মের প্রচণ্ড গরমে এয়ারকন্ডিশনিং সিস্টেম ছাড়া বাস করাটা আসলেই বেশ কষ্টকর। যারা পারমাণবিক শক্তির বিরোধিতা করে আসছিল, তাদের গায়ে একটা তকমা এঁটে দেয়া হয়েছে—বাস্তবতা বিবর্জিত স্বপ্নবাজ লোক। 

এবং ঠিক এভাবেই আমরা পৌঁছে গেছি আমাদের আজকের অবস্থায়। পারমাণবিক চুল্লিগুলো, যা কি-না আমাদের খুব দক্ষতার সাথে কার্যকর পন্থায় বিদ্যুৎ উৎপাদনের স্বপ্ন দেখিয়েছিল, পৃথিবীকে স্বর্গ বানানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, সেগুলোর কারণেই আজ আমরা নরকের চেহারা দেখতে পাচ্ছি। এটাই সত্য, এটাই বাস্তব, এর মধ্যে কোনো ভ্রান্তি নেই।

এই বাস্তব এবং সত্যের বাইরে আছে অন্য ধরনের এক সত্য। সেটা হলো ‘তথাকথিত বাস্তবতা’। এই তথাকথিত বাস্তবতার ওপর ভিত্তি করে পারমাণবিক শক্তি উৎপাদনে জোর দেওয়া হয়েছিল। অথচ সত্য কথা হলো এই যে এটা আসলে কোনো বাস্তবতাই নয়। এক ধরনের প্রলোভন—যা ব্যবহার করে কেবল কিছু সুযোগ সুবিধা পাওয়া যায়। অথচ ওই ভয়ঙ্কর লোকগুলো বাস্তবতা শব্দটার ভুল ব্যবহার করেছে। ‘বাস্তবতা’ শব্দটার মোড়কে ওরা খুঁজে ফিরেছে ‘সুবিধা’।

জাপানের মানুষের একটা বড় গর্ব ছিল তাদের প্রযুক্তি নিয়ে। চলমান পরিস্থিতিতে সেই প্রযুক্তি গল্প-গাথার যে সাম্রাজ্য ছিল তার পতন হয়েছে। শোচনীয়ভাবে হেরে গেছে প্রযুক্তি। এটা শুধু প্রযুক্তিগত পরাজয় নয়, আমাদের নৈতিক মূল্যবোধের পরাজয়। আমরা হেরে গেছি। 

এখন আমরা জাপান সরকার এবং বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলোকে দায়ী করছি, যেটার যথার্থতা নিয়ে আমার কোনো কথা নেই। আমি শুধু এই কথা বলবো যে আয়নায় আমাদের নিজেদের মুখটাও একবার দেখা উচিত। আমরা নিজেরা কি এ দায় এড়াতে পারব? আগেই বলেছি আমরা একই সঙ্গে ভুক্তভোগী এবং অপরাধী। আমাদের অবশ্যই চলমান এসব ঘটনাকে অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে বিচার করতে হবে। না হলে একই ভুল বার বার হবে।

‘তোমরা শান্তিতে ঘুমাও-

এই ভুল আমাদের আর কখনো হবে না।’

এই প্রতিশ্রুতি আমরাই দিয়েছিলাম। আমাদের মনের মধ্যে এই কথাগুলো গেঁথে ফেলতে হবে।

ডক্টর রবার্ট ওপেনহাইমার, যিনি ছিলেন আণবিক বোমা তৈরীর প্রধান কারিগর, তিনি নিজেই হিরোশিমা ও নাগাসাকির মারাত্মক ধ্বংসযজ্ঞে মানসিক আঘাত পেয়েছিলেন। প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যানকে তিনি আক্ষেপ করে বলেছিলেন, মিস্টার প্রেসিডেন্ট, আমার হাতে রক্ত লেগে গেছে।

এই কথার উত্তরে প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যান তার পকেট থেকে একটা পরিস্কার রুমাল বের করে ওপেন হাইমারের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলেছিলেন, ঠিক আছে, রক্ত মুছে নাও। 

কিন্তু গোটা পৃথিবীতে এত বড় আর পরিষ্কার রুমাল কি সত্যিই আছে যেগুলো এত মানুষের রক্ত মুছে ফেলতে পারবে?

আমি বিশ্বাস করি, আমাদের মানে জাপানিজদের অবশ্যই চিৎকার করে বলা উচিত ছিল, আমরা পরমাণু শক্তি চাই না।

আমাদের সম্মিলিতভাবে পরমাণু শক্তির বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। আমাদের অন্য যেসব প্রযুক্তি আছে, সেই প্রযুক্তি আর আমাদের মেধার সাথে সব পুঁজি এক করে পারমাণবিক শক্তির বিকল্প প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে হবে। এটা করতে গিয়ে যদি সারা পৃথিবী আমাদের নিয়ে রসিকতা করে বলে, ‘পারমাণবিক শক্তির মতো দক্ষ এবং কার্যকর একটা শক্তি জাপান ব্যবহার করছে না, ওরা অত্যন্ত বোকা’—তবুও আমরা সে কথায় কান দেবো না। পারমাণবিক শক্তির ব্যাপারে আমাদের যে প্রচণ্ড বিতৃষ্ণা, তা অব্যাহত থাকবে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতার পর পারমাণবিক শক্তি উৎপাদন ব্যবস্থা ছাড়া অন্য যেসব প্রক্রিয়ায় শক্তি উৎপাদন করা সম্ভব, সেগুলোকেই আমাদের জাতীয় নীতি হিসেবে গ্রহণ করা দরকার ছিল। হিরোশিমা এবং নাগাসাকিতে যারা প্রাণ হারিয়েছে, তাদের আত্মার জন্য এটা হতো এক ধরনের সান্ত্বনা। আমাদের অতি অবশ্যই এ ধরনের একটা বার্তা পাঠানো দরকার ছিল পৃথিবীর কাছে।

পুরো পৃথিবীকে কিছু একটা দারুণ জিনিস উপহার হিসেবে দেওয়ার জন্য এটা ছিল জাপানের একটা সুযোগ। কিন্তু আমরা সঠিক রাস্তাটা বেছে নিইনি। ভুল পথে চলেছি। কারণ, মূল্যবোধ আমাদের কাছে কোনো বিষয় নয়। আমরা দক্ষ এবং কার্যকর একটা ব্যবস্থা চেয়েছি। দ্রুত ধনী রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার একটা লোভ আমাদের হয়েছিল।

আমি আপনাদের আগেই বলেছি যে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে যে ক্ষতি হয়েছে সেই ক্ষতি একদিন আমরা কাটিয়ে উঠতে পারব। রাস্তা ভেঙে গেলে সেটা মেরামত করা যায়। ঘরবাড়ি ধ্বসে গেলে আবার তৈরি করা যায়। এসব জিনিস পুনর্গঠনের জন্য পৃথিবীর বুকে যথেষ্ট পরিমাণে বিশেষজ্ঞ আছেন।

কিন্তু ভেঙে যাওয়া মনকে আবার কে গড়ে দেবে? নষ্ট হয়ে যাওয়া মূল্যবোধ আর নৈতিকতা কে ফিরিয়ে দেবে? এগুলো আমাদের নিজেদেরই পুনরুদ্ধার করতে হবে। আর কেউ এসে সেটা করে দিয়ে যাবে না। এ ব্যাপারে কোনো বিশেষজ্ঞ নেই।

যারা মরে গেছে, তাদের জন্য শোক পালন করে আমরা শুরু করব। যারা ক্ষতিগ্রস্ত, তাদের যত্ন নেব। তাদের ব্যথা এবং আঘাতকে কোনোভাবেই ব্যর্থ হতে দেওয়া যাবে না। কাজটা করতে হবে খুব যত্ন সহকারে এবং নিঃশব্দে। এজন্য আমাদের সবার আত্মার শক্তিকে এক করে সম্মিলিতভাবে চেষ্টা করতে হবে। ধরুন, রৌদ্রোজ্জ্বল এক বসন্তের দিন। আপনারা দেখে থাকবেন, গ্রামের কৃষকরা সাতসকালে হাসিমুখে একসাথে মাঠে যায়। তারা বীজ বোনে। তারা একসঙ্গে সব কাজ করে—এক আত্মা, এক হৃদয়ে। সে ধরনের সম্মিলিত শক্তিতে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। 

আমরা যারা পেশাদার লেখক, তারা যে কোনো শব্দ খুব চাতুর্যের সাথে ব্যবহার করতে জানি। এই সম্মিলিত লক্ষ্য অর্জনে আমরা খুব কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারি। এই যে নতুন করে আবিষ্কার করা মূল্যবোধের কথা এতক্ষণ ধরে আপনাদের বললাম, সেগুলোকে নতুন নতুন শব্দে গেঁথে প্রাণবন্তভাবে নতুন গল্প হিসেবে মানুষের সামনে উপস্থাপন করতে পারি। এই গল্পগুলো আমরা একে অন্যের সঙ্গে ভাগ করে নিতে পারি। তখন আমরা একটা সত্যিকারের ছন্দ খুজে পাবো। সেই ছন্দে মানুষ উৎসাহ বোধ করবে, তাদের মধ্যে উদ্দীপনা সৃষ্টি হবে। চাষিরা বীজ বোনার সময় যেমন গান বাঁধে, তারপর একসাথে সেই গান গায়, ঠিক তেমন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জাপান প্রায় ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। সেই ধ্বংসস্তূপ থেকে আমরা ফিরে এসেছি। ঘুরে দাঁড়িয়েছি। আমাদের অর্থনীতিকে পুনর্গঠন করেছি। আমাদের আবার সেই শুরুর দিনগুলোতে ফিরে যেতে হবে।

আমার বক্তৃতার শুরুতে বলেছিলাম, আমরা একটা পরিবর্তনশীল এবং নশ্বর ‘মুজো’ পৃথিবীতে বাস করি। প্রতিটি জীবনই এখানে পরিবর্তিত হবে এবং একসময় তা বিলীন হয়ে যাবে। এর কোনো অন্যথা হবার উপায় নেই। প্রকৃতি মহা শক্তিধর। তার সামনে মানুষের ক্ষমতা কোনো ক্ষমতাই নয়। এই যে স্বীকার করে নিচ্ছি যে আমাদের কোনো ক্ষমতা নেই এবং সবকিছু ক্ষণস্থায়ী, এটাই জাপানি সংস্কৃতির মূল ধারণা। আমরা বিশ্বাস করি পৃথিবীটা নশ্বর। একই সাথে আমাদের এই বিশ্বসাটুকুও আছে যে আমাদের এখানে বেঁচে থাকতে হবে। আমরা বাঁচব, তীব্রভাবে বেঁচে থাকবো ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে।

আমি খুবই গর্বিত যে, ক্যাতালানের মানুষ আমার লেখা পছন্দ করে এবং তারা আমাকে এ ধরনের একটা সম্মানজনক পুরষ্কারের জন্য এখানে ডেকেছে। আমার দেশ থেকে আপনাদের এ জায়গাটার দূরত্ব অনেক এবং আমরা সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটো ভাষায় কথা বলি। আমাদের মধ্যকার সাংস্কৃতিক দূরত্বও অনেক। কিন্তু একই সঙ্গে একথাও সত্য যে, আমরা সবাই আসলে বিশ্বনাগরিক। আমাদের সবার সমস্যা আদতে একই। আমাদের দুঃখ এবং আনন্দগুলোর স্বরূপও এক। এ কারণেই একজন জাপানি লেখকের গল্প ক্যাতালান ভাষায় অনুবাদ করা হয়। এবং ক্যাতালান মানুষেরা সে গল্পকে বুকে টেনে নেয়।

আপনাদের কাছে আমার গল্পগুলো পৌঁছে দিতে পেরে আমি যারপরনাই আনন্দিত। স্বপ্ন দেখা একজন ঔপন্যাসিকের দৈনন্দিন কাজ। এটা তাকে করতেই হয়। কিন্তু তার চেয়েও বড় আরেকটা কাজ তার আছে—তা হলো, সেই স্বপ্নটাকে সবার সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া। স্বপ্ন ভাগ করে নিতে না জানলে আমি উপন্যাস লিখতে পারতাম না। 

আমি জানি যে ক্যাতালানের মানুষদের একটা সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য আছে। সে ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে তাদের অনেক সংগ্রাম করতে হয়েছে। তারা ঝড়-ঝাপটা পার হয়েছে। আমি বিশ্বাস করি, আপনাদের সঙ্গে জাপানের মানুষের অনেক কিছু ভাগাভাগি করার আছে।

একটা বার ভাবুন, যদি এরকম কিছু যদি একটা করা যায় তো কী দারুণ হয়, জাপান এবং ক্যাতালানের মানুষেরা মিলে আমরা যৌথভাবে একটা ঘর তৈরি করলাম। যে ঘরে কিছু বাস্তব বুদ্ধি বিবর্জিত স্বপ্নবাজ মানুষ থাকবে, যেখানে দুই দেশের দুই সংস্কৃতির মানুষের আত্মার মিলন ঘটবে। আমি বিশ্বাস করি, সেটাই হবে আমাদের পুনর্জন্মের শুরু। আমরা দুই অঞ্চলের মানুষই সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কিছু প্রাকৃতিক বিপর্যয় এবং সন্ত্রাসী হামলার শিকার হয়েছি। তবু আমাদের স্বপ্ন দেখতে হবে, ভয় পেলে চলবে না। ‘দক্ষতা’ এবং ‘সুবিধা’ নামক পাগলা কুকুরকে কখনোই পাত্তা দেওয়া যাবে না। আমাদের অসম্ভব সব স্বপ্ন দেখতে হবে। কারণ আমরা হলাম, বাস্তব বুদ্ধি বিবর্জিত একদল মানুষ—যারা স্বপ্ন দেখতে জানে।

মানুষ জন্ম নেবে। আবার একদিন মরে যাবে। কিন্তু মনুষত্ব বেঁচে থাকবে চিরকাল। এই কথাটায় আমাদের বিশ্বাস রাখতে হবে। এটাই আমাদের শক্তি।

আমার বক্তব্যের প্রায় শেষ পর্যায়ে চলে এসেছি। আমি আমার পুরস্কারের অর্থ দান করতে চাচ্ছি সেইসব মানুষকে—যারা ভূমিকম্প এবং পারমাণবিক শক্তি প্রকল্প বিপর্যয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

ক্যাতালান জনগণ এবং ক্যাতালুনিয়া সরকারকে ধন্যবাদ আমাকে এই পুরস্কার প্রদান করার জন্য।

আমার অন্তরের অন্তস্থল থেকে আরও একটা ব্যাপারে সমবেদনা জানাতে চাই। সম্প্রতি লোরকায় ঘটে যাওয়া ভয়াবহ ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের জন্য আমি গভীরভাবে সমব্যথী।

হারুকি মুরাকামি
১৬ জুন, ২০১১
বার্সেলোনা

/জেডএস/

সম্পর্কিত

ফরিদা মজিদের কথা

ফরিদা মজিদের কথা

বাংলা ট্রিবিউন শারদীয় সংখ্যা ২০২১

বাংলা ট্রিবিউন শারদীয় সংখ্যা ২০২১

চাঁদ বণিকের একার যুদ্ধ

চাঁদ বণিকের একার যুদ্ধ

ইমান একটি সাদা জবা ফুল

ইমান একটি সাদা জবা ফুল

প্রবন্ধ

চাঁদ বণিকের একার যুদ্ধ

আপডেট : ১৪ অক্টোবর ২০২১, ১৪:০০

‘চাঁদ বণিকের পালা’ বহুরূপী  পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয় ‘বটুক’ ছদ্মনামে। নাটকের তিনটি পর্ব প্রকাশের সময়কাল ১৯৬৫, ’৬৬ ও ’৭৪ সাল। নাটকটি গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয় ১৯৭৮ সালে।

সন-তারিখ উল্লেখ করার কারণ এজন্য যে, ‘মনসামঙ্গল’-এর আখ্যানটিকে শম্ভু মিত্র হুবহু ব্যবহার না করে বিনির্মাণ করেছেন লৌকিক জীবনের প্রেক্ষিতে। এখানে শিব ও মনসা ব্যক্তি মানুষ বা রাজনৈতিক গোষ্ঠীরই প্রতীক। এখানে গ্রিক মিথ বা নাটকের মতো সবকিছু পূর্বনির্ধারিত নয়, মানুষ কেবল ভবিতব্যে অভিনয় করে যাচ্ছে না; বরং শম্ভুর মানুষ ক্ষমতাদ্বন্দ্বের বলি। তাই অলৌকিকভাবে কারও মুক্তি মেলে না, কিংবা পতিতও হয় না।

লৌকিক জীবনে চাঁদের আদর্শিক দৃঢ়তা, সংগ্রাম ও অপরদিকে চম্পকনগরে চলমান মাৎস্যনায় আমাদের মনে করিয়ে দেয় নকশালবাড়ি আন্দোলন এবং তা দমনপীড়নে ক্ষমতাসীনদের তৎপরতা। চম্পকনগর হয়ে ওঠে গোটা ভারতবর্ষ।

নাট্যকার শম্ভু মিত্র কোথাও নাটকের সময়-কাল উল্লেখ না করলেও একটি চরিত্রের মুখ দিয়ে তিনি প্রকাশ করেন, ‘...আমাদের আধুনিক শাস্ত্রমতে সমুদ্দুরে যাত্রা করা পাপ। তা আমরা তো আধুনিক? সুতরাং অধুনা যা সকলেই মানে সেইটারে উল্লঙ্ঘন করা অতীব গর্হিত–’ এরা সদলবলে আসে লখিন্দরের জন্য নির্মিত বাণিজ্যতরী ছিদ্র করে তার সলিলসমাধী রচনা করতে।

নাটকে শিবভক্ত চাঁদ বণিক জ্ঞান, সংগ্রাম ও সামাজিক সাম্য প্রতিষ্ঠার প্রতীক, অপরদিকে চম্পকনগরের ক্ষমতাসীনরা অন্ধকারবাসী-সাপের পূজারি তথা মাৎস্যনায়ের প্রতীক। আশ্চর্যের বিষয় ‘চাঁদ বণিকের পালা’ কখনও মঞ্চস্থ হয়নি, কেউ কেউ বলেন হতে দেয়া হয়নি নীরব সেন্সরশিপের কারণে।

নাটকের শুরুতে আমরা দেখি চাঁদের স্ত্রী সনকা মনসার গোপন পূজারি। তবুও তাদের ছয়পুত্র সাপের ছোবলে নিহত হয়। তিনি মনসার কাছে সন্তান ও স্বামীর নিরাপত্তা চান। কিন্তু শিবভক্ত চাঁদ স্ত্রীর এই বিশ্বাসঘাতকতায় ভীষণ ক্ষুব্ধ। এসময় তিনি তার দলবল নিয়ে সমুদ্রযাত্রা করে রাজ-আজ্ঞা অমান্য করে। তখন লখিন্দর সনকার গর্ভে।

দীর্ঘদিন পর চাঁদ সমুদ্র-ডুবিতে সবাইকে হারিয়ে চম্পকনগরে ফিরে আসেন ভিখারির বেশে, ছদ্মবেশি ওডেসিয়াসের মতো। তবে লক্ষ্য ভিন্ন এবং সত্যি সত্যি যৌবন হারানো এক বৃদ্ধ তিনি। স্ত্রীর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করেন, এমনকি স্ত্রীকে নিয়ে চম্পকনগরী ছেড়ে পালিয়ে যেতে চান; কিন্তু স্ত্রী ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন তার জীবনের অসফলতার জন্য। এদিকে চাঁদকে দলে ভেড়ানোর জন্য ক্ষমতাসীন ও ক্ষমতালোভী দুই পক্ষ টানাটানি করে। তারা আবার সমুদ্রযাত্রার ব্যবস্থা করে দেবে এই টোপ দিয়ে তাদের দলে ভেড়ানো ও প্রকাশ্যে মনসার পূজা দিতে বলেন। কিন্তু চাঁদ মৌখিকভাবে হ্যাঁ-না বললেও নিজের আদর্শের প্রতি অনড়। একই সময় লখিন্দর এসেও তার পিতাকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য ও অপমানে আশাহীন করে দেয়। যে কিনা বেণীমাধব ‘জারজ’ সন্তান গালি খেয়ে প্রতিবাদ করতে গিয়ে রক্তাক্ত হয়ে পিতার সামনে দাঁড়ায়। তখন সমাজে চলে হত্যা ও ক্ষমতাদ্বন্দ্বের লড়াই। চাঁদ হয়ে পড়ে মদ্যপ।

তবও চাঁদ আশা ছাড়ে না, ভবিষ্যতের ভেতর স্বপ্ন দেখে। লখিন্দর সমুদ্রযাত্রায় যেতে রাজি হয়। তার জন্য চাঁদের সমস্ত সম্পদ খরচ করে বানানো হয় বাণিজ্যতরী। বাণিজ্যযাত্রার আগে তিনি বেহুলার সঙ্গে তার বিয়ে দেন। সনকা ভবিতব্য জেনে লোহার বাসর নির্মাণ করেন এবং ওঝাদের হাজির রাখেন। কিন্তু ক্ষমতাসীন পক্ষ বাসর বানানো মিস্ত্রিকে ভয় দেখিয়ে বাধ্য করে তাতে ছিদ্র রাখতে। সেই ছিদ্রে সাপ ছেড়ে দিলে লখিন্দর সাপের ছোবলে নিহত হন। রীতি মাফিক কলাগাছের ভেলায় স্বামীকে নিয়ে বেহুলা ভাসানযাত্রা শুরু করে। মনসার বেহুলা স্বর্গে গিয়ে বেদতাদের অশ্লীল নাচ দেখায়, আর শম্ভুর বেহুলা জগতের কামুক পুরুষদের।

একদিন বেহুলা চাঁদের কাছে আসে পুত্রের জীবন ফিরে পাবার সংবাদ নিয়ে এবং একই সঙ্গে মনসার পুজার শর্ত নিয়ে। ততদিনে চাঁদ ভিখারি ও ক্ষমতাসীন বেণীমাধবের বাড়িতে আশ্রিত। সনকা পাগল হয়ে রাস্তাবাসী। বেহুলার শর্তে চাঁদ রাজি হয় সন্তানকে ফিরে পেতে, কিন্তু শিবপূজার বেলপাতা দিয়েই তিনি মনসার পূজা করেন। প্রকারন্তরে তিনি শিবেরই পূজা করেন। ততক্ষণে বেহুো-লখিন্দর তাদের জীবনের অসফলতা ও পরস্পরের বিচ্ছন্ন হয়ে যাবার আশঙ্কায় বিষপাণ করে আত্মহত্যা করেন।  

মনসামঙ্গলে দেখি চাঁদ বণিক মনসার পায়ে নতজানু, অনুতপ্ত। মনসা চাঁদকে ফিরিয়ে দেয় ছয়পুত্র ও সপ্তডিঙা। একইসঙ্গে মঙ্গলকাব্যের রীতি অনুযায়ী প্রতিষ্ঠা পায় দৈব অনুগ্রহ বা তার মহিমা।

শম্ভু মিত্র মনসামঙ্গলের মতো মিলনাত্মক পথে পা বাড়াননি। তিনি পুত্রবধূ বেহুলার কথায় মনসাকে পূজা দিলেও মনসা-পূজার উপাচার গ্রহণ না করে বিশ্বপত্র দিয়েই পূজা করেছেন। কৌশলগতভাবে তিনি নমনীয় হলেও আদর্শচ্যূত হননি। কিন্তু তার অবিচল আদর্শবোধ তাকে আপতদৃষ্টিতে কিছুই দেয়নি। না ফিরে পেয়েছে মৃত সন্তানদের, না সপ্তডিঙ্গা।  

আদর্শ তার জীবনে ক্রমাগত ব্যর্থতাই বয়ে এনেছে। স্ত্রী সহধর্মীনী হয়ে বিশ্বাসী থাকেননি, তার কাছে তিনি ব্যর্থ স্বামী। না মানসিক, না শারীরিক কোনো অনুভবের সঙ্গেই তিনি নিজেকে চাঁদের সঙ্গে জড়াতে পারেননি। একটি ব্যর্থ দাম্পত্যের অবশিষ্ট লখিন্দর, সেই পিতাকে অপমান করতে ছাড়ে না।    

লখিন্দর বলে, ‘মানুষ কি শুধু কতগুল্যা প্রতিক্রিয়া? শুধু প্রতিক্রিয়ার সমষ্টি?’ বা ‘রক্ত দেও, মুখ বুজে কাজ করে যাও, কথা কয়ো নাকো।’

চম্পকনগরীর বৃদ্ধরা আসে তাদের সন্তানদের হদিস পেতে। সমুদ্রযাত্রায় যদি সবাই নিহত হয় তবে, চাঁদ বণিক কিভাবে বেঁচে ফেরে? এই প্রশ্ন সবার। তবে কি চাঁদ তার সহ-নবিকদের হত্যা করে সমস্ত সম্পদ হাতিয়ে নিয়েছে? বিশ্বাস নেই, আস্থা নেই চম্পকনগরে। লখিন্দরকে কেন্দ্র করে চাঁদের ভবিষ্যতের ভেতরও বীজ বপন করা হল না।

একজন ব্যর্থ, রিক্ত, মদ্যপ চাঁদ কেবল শূন্যের ভেতর উচ্চারণ করে, ‘শিবাই শিবাই।’ কিন্তু শিব তাকে রক্ষা করে না। মনসা তথা অন্ধকার শক্তিরই পরাক্রম দেখি সমাজে।

ক্ষমতাসীন বল্লভাচার্য ও বেণীমাধবের দল, বিপরীতদিকে ভৈরব করালীদের দল– উভয়েই চম্পকের ক্ষমতা ভোগের প্রতিযোগি রাজনৈতিক শক্তি।  তার নগর ও জনতার উন্নতি ভাবে না, রক্ষা করতে চায় না। এই স্বার্থপরতার রাজনীতির ঘূর্ণিতে চাঁদ একা। তার লড়াই করারও শক্তি নেই। আশাবাদ ছাড়া যার কিচ্ছু নেই।

কিন্তু চাঁদ ‘শুধু বেঁচে থাকা বলে কোনো কথা নাইরে জীবনে’ তথা জীবনের অন্য আদিকল্পের সন্ধান সে করতে চেয়েছিল। সে কেবল কিছু ‘চেয়েছিল’র প্রতীক। যার বিপরীতে মনসার অন্ধকার।

‘চাঁদ বণিকের পালা’ মঞ্চস্থ করতে অনেক চ্যলেঞ্জের মধ্যে রয়েছে এর ভাষা। লেখক নিজেই বলেছেন, ‘বইটি পড়তে গিয়ে কোনো পাঠক কিছু শব্দের বর্ণবিন্যাসে বিভ্রান্ত হতে পারেন। অভ্যাসের বসে চলিত লিপির সাহায্যে আমরা উচ্চারণটা অনুমান করে নেই। কিন্তু বিপদ হয় অচলিত ভাষার ক্ষেত্রে। তাই অসমাপিকা ক্রিয়াপদের মধ্যে যেখানে উচ্চারণ লিখিত স্বরবর্ণের ঠিক– য় নয়, আবার– ই-ও নয়, মাঝামাঝি যেমন, –করে– কইরে বা কোয়রে নয়, সেই স্বল্পস্বর বোঝাতে শব্দের অন্তে ‘্য’ [য ফলা] ব্যবহার করা হয়েছে।’

নাট্যকারের এই কৃত্রিম ভাষা মনসামঙ্গল থেকে ‘চাঁদ বণিকের পালা’কে যেমন আলাদা করেছে, তেমনি আধুনিককালের একটি অনির্দিষ্ট কালপর্বের সঙ্গে এই ভাষা সখ্য গড়ে তোলে। এই ভাষা না-প্রমিত, না-আঞ্চলিক। এই ভাষা হয়ে উঠেছে ‘চাঁদ বণিকের পালা’র ভাষা।

/জেডএস/

সম্পর্কিত

ফরিদা মজিদের কথা

ফরিদা মজিদের কথা

বাংলা ট্রিবিউন শারদীয় সংখ্যা ২০২১

বাংলা ট্রিবিউন শারদীয় সংখ্যা ২০২১

‘তোমরা শান্তিতে ঘুমাও—এই ভুল আমাদের আর কখনো হবে না’ : হারুকি মুরাকামি

‘তোমরা শান্তিতে ঘুমাও—এই ভুল আমাদের আর কখনো হবে না’ : হারুকি মুরাকামি

ইমান একটি সাদা জবা ফুল

ইমান একটি সাদা জবা ফুল

ছোটগল্প

ইমান একটি সাদা জবা ফুল

আপডেট : ১৪ অক্টোবর ২০২১, ১১:০১

ঢাকায় আসার পরও আরফাতুল তার নামের প্রথমে থাকা মোহাম্মদ শব্দটির ব্যবহার করত। তখন তার দাদির কাছে শেখা কাঁচাসুপারির পানও খেত মাঝে মাঝে। কিন্তু শীঘ্রই মফস্বলের গন্ধ মুছে ফেলার জন্য পান খাওয়া ছেড়ে দিলো, আর কাঁচাপাতির রংচা ধরল। আর তাতেও যখন নাটকের মহড়া দলে তার অবস্থান পোক্ত হলো না তখন সে রেড ওয়াইন যে মেয়েলি পানীয় তা বলা শুরু করল। বিষয়টি টনিকের মতো কাজ করল এবং রুদ্র আরাফাত কিছু দিনের মধ্যে বুঝতে পারল রেড ওয়াইনের রং যে জাম রঙ না সিঁদুর রঙের মতো সে সম্পর্কে দলের কারোই ধারণা নাই। আরাফাতুলেরও সে সম্পর্কে ধারণা কম। সে নিজেও এই জিনিস একবারই খেয়েছে। কিন্তু এ বিষয়ে তার কথাবার্তা এমন পর্যায়ে তুলে রাখল যে, শুধু নিজের দল না, ক্লাসের বন্ধুরা না, শিল্পসাহিত্যের লোকজনও তাকে সমীহ করতে শুরু করেছিল। বরং ইতালি ও স্প্যাইনের ভাইন ইয়ার্ডগুলা পাকা আঙুরে কেমন মোঁ মোঁ করে, সেখানে সেই আঙুর ছিঁড়তে থাকা সুন্দরীদের নিপল, আর তাদের সঙ্গে লতানো গাছের ছায়ায় খুনশুটি শুরুর সঙ্গে শুয়েপড়ার আনন্দের গল্পগুলো এমনভাবে বলতে শুরু করল, কেউ অন্তত এটা ভাবল না যে, আরাফাতুল মূলত একবারই রেড ওয়াইন খেয়েছিল।
আবার বহুবছর পর, ফ্লাইটের পুরো সময় রেড ওয়াইন খেয়ে যখন ঝিমুচ্ছিল, তখন ঢাকাগামী মোহাম্মদ নামের যে সর্বশেষ যাত্রীর মাইকে খোঁজ চলছে, তখন ঝিমুনির মধ্যেও আরফাতুল বুঝতে পারল, এই মোহাম্মদ সে নিজে ছাড়া কেউ নয়। পাসপোর্টে এখনও নামটি রয়ে গেছে। রোম থেকে ইস্তাম্বুলের ফ্লাইট ভরে যে রেড ওয়াইন নিয়েছে, তাতে বিমানবালাদের কোনো প্ররোচনা নেই। আরফাতুলের কাছে এরা সবাই ভেনাসের মতোই সুন্দরী, হাসি দিয়ে রেড ওয়াইন ঢেলে দেয়, তবু কেন জানি এরা আনন্দ মাটি করতে একদম পেশাদার। বিষণ্ণতার আরো কারণ আছে। আরফাতুল ভেবেছিল ইতালির আঙুর খেতগুলোতে প্রচুর সুন্দরীদের দেখা যাবে এবং এরা প্রচুর উদার হবে, তাদের কারও সঙ্গে হয়তো ভাব হয়ে যাবে এবং পুরনো একটা বোতল খুলতে চাইতে পারে, আর সন্ধ্যা হয়ে বলতেও পারে, চল নাচি। কনফারেন্সের আয়োজকেরা এমন একটা ট্যুর করেওছিল সবচেয়ে বড় ভাইন ইয়ার্ডে। আসলে ট্যুর না, ঘুরতে গিয়েও বক্তৃতা। বাংলাদেশের পুরনো ঐতিহ্য কনফারেন্সের সব কথাই হচ্ছিল ফরাসি বা ইতালীয়তে। তবে আরফাতুল এ বিষয় যতটুকুই বুঝুক মনসামঙ্গলের পুথি আর আদিনা মসজিদের ছবি সে ঠিকই চিনেছিল। ইতালির এই আঙুরখেতে মনসামঙ্গলের আলোচনার ছবি অলরেডি ফেইসবুকে আরফাতুল দিয়ে দিয়েছে। যদিও তার নিজের বক্তৃতার ছবি দেওয়া যায়নি, এরা ছবি তুলতে অতটা উৎসাহী নয়। আরফাতুল পটের গানের ওপর বক্তৃতার অর্ধেক ছিল মূলত দেখে পড়া, বাকিটা তার পরিচিত প্রফেসর ইটালীয়তে বলে দিয়েছিলেন। যাকে ঢাকায় আরফাতুল গাইড করে থাকে। নিজের বক্তৃতার ছবি ফেইসবুকে দিতে না পারার জন্য মনটা খচখচ করছিল। তবে এর চেয়েও বেশি মন খারাপ কনফারেন্সে তার বয়সী কোনো মেয়ে নাই। এছাড়াও এমন ঝকঝকে রোদের মধ্যে জলরঙের মতো সবুজ আঙুর বাগানে একটি মেয়েও আঙুর তুলছে না। কয়েকটি ট্রাকের মতো মেশিন আঙুর তোলার সব কাজ করে দিচ্ছে। তবে সেখানে ডিনার হয়েছিল রাজকীয়। তখন স্থানীয় মেয়র এসেছিল। তার কন্যারা সত্যিই রাজকন্যার মতোই। খাবারও ছিল একেবারে বত্রিশ পদের। বাতি জ্বলছিল তেত্রিশ রকম । আর এমন মিউজিক বাজছিল যেন শত বছর এমন অর্কেস্ট্রায় জীবন পার করে দেওয়া যাবে। এমন ভালো খারাপের মধ্যে আয়োজকদের একজন আরফাতুলের সঙ্গে গল্প জুড়ে দেয়। বিস্ময়কর ভাবে বাংলাতেই কথা বলতে থাকে। বাংলাদেশের জাদুঘরের অবস্থা জিজ্ঞেস করেন তিনি। তিনি জানান মহরম নিয়ে নব্বয়ের দশকে পুরান ঢাকায় কাজ করেছিলেন। মাস ছয়েকের মতো ছিলেন। নেত্রকোনায় গিয়েছিলেন জারি গান নিয়ে কাজ করতে। ভদ্রলোকের মুখ থেকে হুইশকির গন্ধ আসছিল। এই গন্ধ ক্যারুর হুইশকি নেওয়া অ্যারামের মাতালদের মতো নয়। মেয়েরা যে বেনসন খাওয়া ছেলেদের ভালোবাসে তার কারণ বেনসন ক্রয়ের পৌরুষ নয়, আমিষ পচা গন্ধ ঢাকতে পারার ক্ষমতা। ভদ্রলোকের মুখের গন্ধটা আরও অমৃত লাগলো যখন তিনি বলে বসলেন আরফাতুল চাইলে তার সঙ্গে একটা গ্রন্থ সম্পাদনায় সাহায্য করতে পারে, যেটা ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরুচ্ছে। সাহায্য মানে, নেত্রকোনায় এক কাজী বাড়িতে একটা দেড় ইঞ্চির কোরান শরিফ দেখে এসেছিলেন তিনি। সেটা দিয়ে বইয়ের একটা চ্যাপ্টার হবে। সেটা সংগ্রহ করে দিতে পারলে ভালো, না হলে অন্তত ডিজিটাল কপি দিতে হবে। কোরান শরিফটা কিন্তু অন্তুত সাতশ বছরের পুরনো। কিন্তু কাজীরা জানো কোরান শরিফটা একশ বছর আগের, আদতে এর লিপি বলছে এটা সাতশ বছর আগের রীতি। ফলে অমূল্য কাজ হবে। এটা কোনো ব্যাপারই না। অধ্যাপকের সঙ্গে তার ছবি ফেইসবুকে দিয়ে দিয়েছে। ওখানে এ পর্যন্ত ছিয়ানব্বইটা কমেন্টস হয়ে গ্যাছে, অনেকে তাকে এযুগের ডক্টর মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ বলছেন, তবে তার বন্ধুদের কেউ এখনও লাইকও দিলো না। আরফাতুলের সেদিকে মন নেই। নেত্রকোনার ওইদিকে বাড়ি পিম্পির। পিম্পি তার সঙ্গে থিয়েটারে একটা কোর্স করেছিল। ওর কাছ থেকে খবর নেওয়া যাবে কাজীবাড়ির। গ্লাসের রেড ওয়াইনগুলা টকটকে লাল হয়ে উঠছে। আরফাতুলের পুরো রাতটা রঙিন মনে হলো।
টার্কিশ এয়ারের ফিরতি ফ্লাইট অনেক লম্বা সময় লাগাচ্ছে। প্রচণ্ড বৃষ্টির কারণে বিমান ঢাকায় নামতে দেরি করল। সকাল স ছয়টা বেজে গেল বের হতে হতে। এই এয়ারপোর্টাকে যারা দোজখের দ্বার বলে, তারা আসলে দেশকে ভালোবাসে না। আরফাতুল একটা সিএনজি নিয়ে নিল পিম্পির বাড়ির দিকে। দামদর বিষয় না। পিম্পির হেল্প ছাড়া নেত্রকোনা যাওয়া যাবে না। এর জন্য ইস্তাম্বুলের চকোলেটটা আলাদা ব্যাগে রাখল। আর চাচাতো বোনের জন্য ছাড়ে কেনা পারফিউমটাও পিম্পিকে দিয়ে দিলে ভালো। ওকে সাথে নিয়ে যাওয়া যাবে। ইন ফ্যাক্ট, ওর হেল্প ছাড়া এই কোরান উদ্ধার সম্ভব না।
 
দুই
ঠিকানামতো কাজীবাড়িতে একটা মসজিদ আছে। মসজিদের পুবপাশেই ইবাদাত কাজীর বাড়ি। তবে পিম্পিদের গ্রামের বাড়ি থেকে এই গ্রামে যাওয়াটা সহজ মনে হচ্ছে না। বন্যায় রাস্তা ভেঙে গেছে। সকাল সাতটায় চারটায় একটা ডিঙি নৌকা ভাড়া করে দুপুর এগারোটায় মসজিদ ঘাটে পৌঁছুনো গেলে। এই গ্রামে কারেন্ট নাই, মোবাইলের চার্জও শেষ। শব্দহীন পানিবন্দি একটা গ্রাম। মাছের লেজের বাড়ি দেওয়ার শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দ নাই। বাড়িতে কারোও সাড়াশব্দ নেই। বাড়িতে ঢোকার সময় বড় একটা গরুর গোয়াল। তবে মূল ঘরটি দেখে মনে হবে এরা গিরস্থ নয়। টিনের ঘরে বারান্দামতো আছে, বারান্দায় এটা টিয়া পাখির খাঁচা। ঘরের পাশে সামনে কয়েকটি সাদা জবার গাছ। অনেক দিনের বনেদি পরিবার বোঝা যাচ্ছে, আরফাতুল পিম্পিকে বোঝানোর চেষ্টা করছে। যিনি বেরিয়ে এলেন তিনিও আরফাতুলের বয়সী। জানা গেল, ইবাদাত কাজী তিরিশ বছর আগে মারা গিয়েছেন, তিনি তার নাতি নাম মাহবুব কাজী। আরফাতুলের হাতের ক্যামেরা, পিম্পির হাতে একট খাতা। সাংবাদিক বা গবেষক টাইপ সাজ না দিলে গ্রামে তেমন গুরুত্ব পাওয়া যায় না। পুথি নিয়ে আলাপ করতে তো নয়ই। আরফাতুলের এই পথটি অনেক দিন চেনা। মাহবুব কাজী দুটো কাঠের চেয়ার নিয়ে এলেন, ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন ষাটোর্ধ্ব একজন। তিনি মাহাবুব কাজীর পিতা। বোঝা গেল, এই কোরান শরিফের খোঁজে অনেকেই আসেন, এরা এমন আগন্তুকে অভ্যস্ত। পানিবন্দি বাড়িতে আগন্তুক পেয়ে এরা খুশিই। চাও চলে এল, তবে বিরক্তিকর টাইপের মিষ্টি। এরা মিশুক। কাজ হবে মনে হলো। মাহবুব কাজীর বাবা হাসি-খুশি। কোরান শরিফের গল্পটি তিনি তার বাবার হজযাত্রার গল্প দিয়ে শুরু নেত্রকোনা থেকে কীভাবে গোয়ালন্দ, সেখান থেকে স্টিমারে কলকাতা। কলকাতা থেকে বোম্বে, বোম্বে থেকে করাচি। করাচি থেকে সফিনা আরব জাহাজে করে জেদ্দা। সফিনা আরবের বিশালত্ব বলতে গিয়ে কাজী সাহেব যতটা গৌরবান্বিত হচ্ছিলেন। জেদ্দা যাওয়ার পর যখন উটের কাফেলা পনেরো দিন পর আসবে সেই অপেক্ষার বিষণ্ণতায় গল্পের আসরও চুপ হয়ে গেল। ফিরতি পথে কী করে হায়দারাবাদের নিজাম নিজ হাতে দেড় ইঞ্চি অমূল্য সম্পদ ইবাদাত কাজীকেই দিয়েছিলেন সেটা বিরাট অলৌকিক বিষয়। এই লম্বা গল্প শুনতে শুতে বিকেল হয়ে গেল। দুপুরে যে টেংরা পুঁটি ঝোলের যে স্বাদ তা কাজীর গল্পের সকল গৌরবকে ছাড়িয়ে যাওয়ার মতো। কিন্তু কোরানের ছবি তোলার কথা বলতেই আসর শেষ হয়ে গেল, সাফ জানিয়ে দিলেন। এ জিনিস দেখানোর নয়। অনেক অনুরোধ করার পরও তারা জানাল, পারিবারিকভাবে এটা ওয়াদা করা আছে। ফেরার সময় পিম্পি একটা সাদা জবা নিয়ে ফিরছে, মাহবুব কাজী তাকে দিয়েছে। পিম্পির কোনো বিকার নেই, সে এমন আচরণে অভ্যস্ত। মাস দুয়েক লেগেছিল আরফাতুলের এই ট্রমা ভাঙতে। এত কাছে গিয়েও কিছু হলো না, প্যারিস থেকে সেই অধ্যাপক আরফাতুলকে মেইল করেই যাচ্ছে। সেও আরও কয়েকদিন সময় চেয়েছে। লেগে থাকতে হবে, এটা আরফাতুল জানে।
 
তিন
গতকাল ভোরে আরফাতুল আমার বাসায় হাউমাউ কান্না, পুলিশ তাকে খুঁজতে পারে। কাউকে বলা যাবে না শর্তে আরফাতুল ভাঙা ভাঙা ঘটনাগুলো জানাল। মাহবুব কাজী গত সপ্তাহে লুকিয়ে ছবি পাঠিয়েছিল পিম্পিকে। আরফাতুল সেটা মেইলে ফরোয়ার্ড করে দেয় প্যারিসের সেই অধ্যাপককে। কিন্তু তিনি নাকি পেয়েছেন কোরানের সাদা পাতার ছবি। আর মাহবুব কাজীর বাবাও পড়তে গিয়ে দেখেন কোরান থেকে নাকি লিপি উধাও। কামেরার ফ্ল্যাশ থেকে এমনটা ঘটেছে কিনা পিম্পিও আমাকে ফোন করে যাচ্ছে। শুধু তাই না একসাথে সব জবাগাছগুলোও নাকি মরে গিয়েছে। আমি এর একটা বৈজ্ঞানিক ভিত্তি দেওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছি।

/জেডএস/

সম্পর্কিত

ফরিদা মজিদের কথা

ফরিদা মজিদের কথা

বাংলা ট্রিবিউন শারদীয় সংখ্যা ২০২১

বাংলা ট্রিবিউন শারদীয় সংখ্যা ২০২১

‘তোমরা শান্তিতে ঘুমাও—এই ভুল আমাদের আর কখনো হবে না’ : হারুকি মুরাকামি

‘তোমরা শান্তিতে ঘুমাও—এই ভুল আমাদের আর কখনো হবে না’ : হারুকি মুরাকামি

চাঁদ বণিকের একার যুদ্ধ

চাঁদ বণিকের একার যুদ্ধ

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

ফরিদা মজিদের কথা

ফরিদা মজিদের কথা

বাংলা ট্রিবিউন শারদীয় সংখ্যা ২০২১

বিশেষ সংখ্যা (সূচিপত্র)বাংলা ট্রিবিউন শারদীয় সংখ্যা ২০২১

‘তোমরা শান্তিতে ঘুমাও—এই ভুল আমাদের আর কখনো হবে না’ : হারুকি মুরাকামি

‘তোমরা শান্তিতে ঘুমাও—এই ভুল আমাদের আর কখনো হবে না’ : হারুকি মুরাকামি

চাঁদ বণিকের একার যুদ্ধ

প্রবন্ধচাঁদ বণিকের একার যুদ্ধ

ইমান একটি সাদা জবা ফুল

ছোটগল্পইমান একটি সাদা জবা ফুল

স্যুরিশের চারপাশে

ভ্রমণস্যুরিশের চারপাশে

নিখিলেশ রায়ের কবিতা

কবিতানিখিলেশ রায়ের কবিতা

নিষিদ্ধ ইস্তেহার 

কবিতানিষিদ্ধ ইস্তেহার 

ঘুমোতে যাবার আগে  

কবিতাঘুমোতে যাবার আগে  

দুর্গাপূজায় গণমানুষসংশ্লিষ্ট অসাম্প্রদায়িক চেতনাই বড় : যতীন সরকার

সাক্ষাৎকারদুর্গাপূজায় গণমানুষসংশ্লিষ্ট অসাম্প্রদায়িক চেতনাই বড় : যতীন সরকার

সর্বশেষ

ফেনীতে ত্রিমুখী সংঘর্ষ, আহত ৩০

ফেনীতে ত্রিমুখী সংঘর্ষ, আহত ৩০

ফরিদা মজিদের কথা

ফরিদা মজিদের কথা

রাজধানীর নিকুঞ্জ থেকে চিকিৎসকের লাশ উদ্ধার

রাজধানীর নিকুঞ্জ থেকে চিকিৎসকের লাশ উদ্ধার

দিনে মনোনয়নপত্র জমা, রাতে গুলিতে আ.লীগ প্রার্থীর মৃত্যু

দিনে মনোনয়নপত্র জমা, রাতে গুলিতে আ.লীগ প্রার্থীর মৃত্যু

বাণিজ্য, নিরাপত্তা ও জলবায়ু ইস্যু গুরুত্ব পাবে

প্যারিসে হাসিনা-ম্যাখোঁর বৈঠকবাণিজ্য, নিরাপত্তা ও জলবায়ু ইস্যু গুরুত্ব পাবে

© 2021 Bangla Tribune