X
শনিবার, ১৬ অক্টোবর ২০২১, ৩১ আশ্বিন ১৪২৮

সেকশনস

পর্ব—তিন

সাহিত্যতত্ত্ব : একটি সংক্ষিপ্ত পরিক্রমা

আপডেট : ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২১, ২৩:৫৪

পূর্বপ্রকাশের পর

এরিস্টটলের সাহিত্যতত্ত্ব

এরিস্টটল (৩৮৪ খ্রি. পূ.-৩২২ খ্রি. পূ.) ছিলেন প্লেটোর সবচেয়ে বিখ্যাত ছাত্র। তাঁর জন্ম মেসিদোনিয়ায়। ১৭ বছর বয়সে তিনি এথেন্সে এসে প্লেটোর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। ৩৪৭ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে প্লেটোর মৃত্যুর পরে তিনি এথেন্স ত্যাগ করেন। ৩৩৫ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে তিনি পুনরায় এথেন্সে ফিরে আসেন এবং তাঁর স্কুল লাইসিয়াম শুরু করেন। ৩২২ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে তিনি লাইসিয়াম থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেন এবং ঐবছরই ক্যালচিস নামক শহরে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। বলতে গেলে জ্ঞানবিজ্ঞানের এমন কোনো শাখা যার ওপর এই ৬২ বছরের জীবনে এরিস্টটল কাজ করেননি। জ্ঞানবিজ্ঞানের এই সকল শাখায় তিনি যে বইগুলো রচনা করেছিলেন সেগুলো হারিয়ে গেছে। যা আছে তা সম্ভবত তার লেখা বই নয়, বরং খুব সম্ভবত তাঁর কাছ থেকে নেওয়া বিভিন্ন লেকচার নোটের সংকলন। ফলে এগুলো প্লেটোর ‘দি রিপাবলিক’-এর মতো সুলিখিত নয় এবং সাহিত্যগন্ধীও নয়। সাহিত্য বিষয়ে ‘পোয়েটিকস’ নামে তাঁর যে বইটি আমাদের কাছে আছে সেটিও সেরকম একটি লেকচার নোটের সংকলন। নোটগুলো তিনি হয়তো তাঁর লাইসিয়ামে লেকচারের জন্য তৈরি করেছিলেন। ফলে গ্রন্থভুক্ত বিষয়গুলোর আলোচনায় সুসংগঠিত পরম্পরা নেই, এবং ক্ষেত্রবিশেষে অনেক অস্পষ্টতা ও দুর্বোধ্যতা রয়েছে। তারপরও এটিই সাহিত্যতত্ত্ব বিষয়ে দুনিয়ার সকল দেশে সবচেয়ে বেশি রেফারেন্স দেওয়ার একটি বই। এরিস্টটলের সাহিত্যতত্ত্ব নিয়ে আলোচনা মানে হলো এই বইটি নিয়েই আলোচনা।

‘পোয়েটিকস’ গ্রন্থের পরিচ্ছেদগুলোকে তিনটি পর্বে ভাগ করা যায়। পরিচ্ছেদ-১ থেকে পরিচ্ছেদ-৫ পর্যন্ত বিস্তৃত প্রথম পর্বটিকে বলা যেতে পারে গ্রন্থটির সূচনা পর্ব যেখানে মাইমেসিস বা শিল্পের অপরিহার্য বৈশিষ্ট্য অনুকরণের অর্থ ও প্রকরণের আলোচনা রয়েছে। দ্বিতীয় পর্বের বিস্তৃতি পরিচ্ছেদ-৬ থেকে পরিচ্ছেদ-২২ পর্যন্ত। এ পর্বে মাইমেটিক আর্ট বা অনুকরণ শিল্পের একটি রূপ হিসেবে ট্র্যাজেডির গঠন ও বৈশিষ্ট্য নিয়ে আলোচনা রয়েছে। পরিচ্ছেদ ২৩ থেকে ২৬ পর্যন্ত তৃতীয় পর্বে রয়েছে ট্র্যাজেডির সাথে মহাকাব্যের তুলনা। আমরা এখানে বইটির পরিচ্ছেদ ধরে আলোচনা করব না। আমরা এখানে বরং ‘মাইমেসিস’ বিষয়ে এরিস্টটল ও প্লেটোর ভাবনার পার্থক্য এবং সেই পার্থক্যের সূত্র ধরে এরিস্টটল কর্তৃক সূচিত সাহিত্যবিষয়ক নতুন ভাবনার গতিপথ দেখব।

একথা বহু পণ্ডিত বলেছেন যে, এরিস্টটলের পোয়েটিকস ভিতরে ভিতরে প্লেটোর মাইমেসিস থিয়োরির একটি সমালোচনা এবং মাইমেসিসের বিরুদ্ধে প্লেটোর উচ্চারিত অপবাদগুলোর একটি জবাব। তবে সে জবাব সরাসরি নয়, হয়তো তাতে গুরুনিন্দা হয় বলেই এরিস্টটল সরাসরি প্লেটোর নামও উচ্চারণ করেননি এবং প্লেটোর অপবাদের ধরে ধরে একটি একটি করে জবাবও দেননি।

প্লেটোর আলোচনার মতোই এরিস্টটলও তাঁর আলোচনার কেন্দ্রে রেখেছেন মাইমেসিসকে, তবে মাইমেসিসের কোনো সংজ্ঞা দেওয়ার তিনি প্রয়োজন করেননি। সংজ্ঞা দিলে সে সংজ্ঞা গুরুর ভাবনার প্রতি সরাসরি দ্রোহ রূপে উচ্চারিত হবে সে ভাবনায়ও তিনি মাইমেসিসের সংজ্ঞা না দিয়ে থাকতে পারেন। তবে সংজ্ঞায় না বললেও আলোচনায় এরিস্টটল ধীরে ধীরে স্পষ্ট করেছেন তিনি কীভাবে মাইমেসিস বিষয়ে প্লেটো থেকে আলাদাভাবে ভাবছেন। প্লেটো বারবার বলেছেন যে, মাইমেসিস হলো প্রকৃতিকে এবং প্রকৃত বস্তুকে সত্য ও সঠিক রূপ থেকে ধাপে ধাপে বিকৃত করার একটি প্রয়াস। অথচ এরিস্টটল তাঁর পোয়েটিকসের ৪ নং পরিচ্ছেদে লিখেছেন ‘Poetry in general seems to have sprung from two causes, each of them lying deep in our nature. First, the instinct of imitation is implanted in man from childhood, one difference between him and other animals being that he is the most imitative of living creatures, and through imitation he learns his earliest lessons; and no less universal is the pleasure felt in things imitated.’

আশ্চর্যের সাথে লক্ষণীয় যে এই বাক্যদুটোতে এরিস্টটল যতগুলো অবধারণকে প্রকাশ করেছেন তার সবকটাই প্রায় সরাসরি মাইমেসিস বিষয়ে প্লেটোর অবধারণগুলোকে অস্বীকার করে। প্লেটো বলেছেন মাইমেসিস প্রকৃতিকে তথা প্রকৃত সত্যকে একধাপ বিকৃত করে। তার মানে প্লেটোর মতানুযায়ী মাইমেসিস একটি প্রকৃতিবিরুদ্ধ প্রক্রিয়া। কিন্তু এরিস্টটলের মতে মাইমেসিস প্রকৃতির গভীরে প্রোথিত এবং প্রকৃতির গভীর থেকে উৎসারিত (lying deep in our nature)। এরিস্টটলের মতে অনুকরণের প্রবৃত্তি মানবের জন্ম থেকে অর্জিত। তাই এ প্রবৃত্তি পরিহার্য তো নয়ই বরং এই প্রবৃত্তিই মানুষকে পশুজগতের থেকে আলাদা করেছে, অর্থাৎ এটি মানবজন্মকে মহীয়ান করে তুলতে পারে এমন এক চর্চা। অথচ প্লেটো বলেছিলেন মাইমেসিস বা অনুকরণ মানুষকে অজ্ঞানতার অন্ধকারের দিকে চালিত করে। আরো এক ধাপ এগিয়ে এরিস্টটল বলেছেন অনুকরণ একটি সার্বজনীন নান্দনিক আননন্দের উৎস। প্লেটো বেঁচে থাকলে নিশ্চয়ই অনুভব করতেন যে, তাঁর সুযোগ্য শিষ্য এই অবধারণগুলোর প্রতিটির মধ্যদিয়ে তাঁকে একটি করে চপেটাঘাত করছেন। 

মাইমেসিসকে এভাবে মহীয়ান করে তুলে এরিস্টটল ইহাকে শিল্পের জন্য অপরিহার্য ঘোষণা করলেন। তিনি বললেন শিল্পের যতরূপ আছে সবই আদিতে অনুকরণ। শিল্পের রূপ নির্ধারিত হয় অনুকরণের মাধ্যমের ওপর ভিত্তি করে। অনুকরণের মাধ্যম ভাষা হলে শিল্পরূপটির নাম হয় সাহিত্য, মাধ্যম সুর হলে তার নাম হয় সঙ্গীত, মাধ্যম ছন্দ (rhythm) হলে তার নাম হয় নৃত্য। অনুকরণের মাধ্যমের পরে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো অনুকরণের বস্তু বা বিষয়টি। অনুকরণের বিয়য়বস্তু মহৎ মানুষের কর্মকাণ্ড হলে নির্মিত হয় মহাকাব্য বা ট্র্যাজেডি আর নিচশ্রেণি বা খল চরিত্রের মানুষের অনুকরণের মধ্যদিয়ে নির্মিত কমেডি। অনুকরণের অন্তর্গত এই সকল বিষয় বিবেচনায় রেখেই মাইমেসিস সম্পর্কে ভাবতে হবে। মাইমেসিসকে ভাবতে হবে অনুকরণের মাধ্যম, বিষয় ও চারিত্র্যের সাথে সংশ্লিষ্ট করে, প্লেটোর ‘ফরম’ সম্পর্কিত মতবাদের সাথে সংশ্লিষ্ট করে নয় কিংবা মিরর ইমেজের উৎপাদক হিসেবে জ্ঞান করে নয়। ‘ফরম’ সম্পর্কিত প্লেটোর মতবাদের সাথে মেলাতে গেলেই মাইমেসিসের দায় হয়ে পড়ে যে বস্তুকে সে অনুকরণ করছে তার একটি দার্পণিক প্রতিবিম্ব বা মিরর ইমেজ তৈরি করা। কিন্তু মাইমেসিস তার মাধ্যম, বিষয়বস্তু আর চরিত্রগত আচার (manner) দ্বারা এমনভাবে স্বতন্ত্র ও স্বাধীন একটি বিষয় যে তার দায় পড়েনি বস্তুর দার্পণিক প্রতিবিম্ব তৈরি করা। এভাবে ভাবতে পারলে মাইমেসিসকে মুক্ত করা যাবে প্লেটোর আরোপিত অপবাদগুলো থেকে। এ কথা বোঝাতেই এরিস্টটল ‘পোয়েটিকস’-এর একদম শুরুতেই বলেছেন ও I propose to treat of poetry in itself| এই in itself এর ইঙ্গিত হলো মাইমেসিসকে প্লেটোর ‘ফরম’ সম্পর্কিত মতবাদের সাথে সংশ্লিষ্ট করে ভাবা যাবে না। এভাবে এরিস্টটল প্লেটোর বিপরীতে দাঁড়িয়ে মাইমেসিসকে শুধু শিল্প অঙ্গনে প্রতিষ্ঠিতই করেননি, মাইমেসিসের মাধ্যমে অর্জিত শিল্পের রূপ ও প্রকরণ সম্বন্ধেও তিনিই প্রথম তাত্ত্বিক ধারণা দিয়েছেন।

এরিস্টটলের তত্ত্বমতে সাহিত্য মাইমেটিক আর্ট হিসেবে দার্পণিক প্রতিবিম্ব তৈরি করে না, বরং বস্তুর আইকন তৈরি করে। এরিস্টটল ‘পোয়েটিকস’-এর ৪র্থ পরিচ্ছেদে লিখেছেন ‘Thus the reason why men enjoy seeing a likeness is that in cotemplating it they find themselves learning or inferring, saying perhaps ‘Ah, that is he’. For if you happen not to have seen the original, the pleasure will be due not to the imitation as such, but to the execution, the colouring, or some such other cause.’ এরিস্টটল এখানে বলেছেন যে, মাইমেসিসের কাজ হলো সাদৃশ্যভিত্তিক, সাদৃশ্যের মাধ্যমে অনুকৃত বস্তুর কাছাকাছি যাওয়া (seeing a likeness), মোটেই অবিকল বস্তুটি উৎপাদন করা নয়। আর এই সাদৃশ্যের জন্য মূল বস্তুটি আদৌ দরকারিও নাও হতে পারে। কারণ মূল বস্তু আদৌ না দেখেও, শুধু অনুকৃত বস্তু দেখেও আনন্দ লাভ ঘটতে পারে। সেক্ষেত্রে অনুকরণ নয়, কাজটির সম্পাদন (execution), সে সম্পাদনে রঙের ব্যবহার বা অন্য কোনো বিষয়ের কারণেও আনন্দটি লাভ করা যেতে পারে। মোটের ওপরে এরিস্টটল পুরোপুরি সরে গেছেন প্লেটোর সেই আপ্ত ধারণা থেকে যে, মাইমেটিক আর্টের কাজ হলো বস্তুর প্রতিবিম্ব উৎপাদন। এরিস্টটল বরং বলতে চান অনুকৃত বস্তু কোনো দিন না দেখেও বস্তুর এই অনুকরণশিল্পের সাধনা সম্ভব। কথাটি আরো স্পষ্ট হয় ‘পোয়েটিকস’-এর ২৫তম পরিচ্ছেদে। সেখানে এরিস্টটল বলছেন not to know that a hind has no horns is a less serious matter than to paint it inartistically । দেখা যাচ্ছে, শিংসমেত একটি হরিণী অংকন করা যা বস্তু সত্যের পুরো লঙ্ঘন তা-ও মাইমেটিক আর্টে মেনে নেওয়া সম্ভব। তার মানে হলো মাইমেটিক আর্টের কাজ নয় প্রকৃতির প্রতিবিম্ব নির্মাণ, তার কাজ হলো অনুকরণের নিজস্ব রীতি-বৈশিষ্ট্যের মধ্যে থেকে নান্দনিক আনন্দ সৃষ্টির লক্ষ্যে বস্তুর প্রতীকী উপস্থাপন বা বস্তুর আইকন নির্মাণ।

আইকন মানে ঠিক বস্তুটি নয়, বরং বস্তুর সাথে অপরিহার্য সম্পর্কযুক্ত এমন কিছু যা ঐ বস্তুকে বোঝায়। ‘গাছ’ দ্বারা আমরা যে বস্তুটি বুঝি তার সাথে ‘গাছ’ ধ্বনির কোনো অপরিহার্য সম্পর্ক নেই, বরং যে সম্পর্কটি আছে তা সম্পূর্ণ খামখেয়ালি গোছের। ফলে ‘গাছ’ শব্দটি বস্তু গাছের কোনো আইকন নয়। কিন্তু একটি মুখমণ্ডলের ছবি মুখমণ্ডলটির আইকন কারণ এর সাথে মুখমণ্ডলটির অনস্বীকার্য ও অপরিহার্য সম্পর্ক রয়েছে। একটি মুখমণ্ডলের ছবি, সত্যিকারের কোনো মুখমণ্ডলের প্রতিকৃতি না হয়েও আইকনিক হওয়ার মধ্যদিয়ে আনন্দ সৃষ্টিতে সক্ষম হয়, যেমন কার্টুনের জন্য আঁকা মুখমণ্ডলগুলো আমাদেরকে আনন্দ দিয়ে থাকে। কার্টুনরূপ মনুষ্য চেহারা মানুষের চেহারার সাথে ন্যূনতম সাদৃশ্য নিয়েই মাইমেটিক আর্ট হতে পারছে, কোনো নির্দিষ্ট চেহারার সাথে আদৌ সাদৃশ্যপূর্ণ হতে হচ্ছে না। ঐ ন্যূনতম সাদৃশ্য থেকেই দর্শক চিনতে পারছে আইকনটি কিসের? আর চিনতে পারার মধ্যদিয়েই তার মধ্যে এক আনন্দ অনুভবের অনুরণন ঘটছে। আইকনিক উপস্থাপনার দ্বারা এরিস্টটল এরূপ মাইমেটিক আর্টের কথা বলেছেন যা প্লেটোর বলা মাইমেটিক আর্টের ভাবনা থেকে যোজন যোজন দূরের ভাবনা। প্লেটো মাইমেটিক আর্টকে বর্জনীয় বলছেন কারণ, এই আর্ট বস্তুর প্রতিবিম্বে খুঁত তৈরি করে (flawed image), আর এরিস্টটল মাইমেটিক আর্টের নান্দনিক বৈশিষ্ট্য হিসেবে সেই খুঁতকেই মূল্যায়ন করছেন। এই ভাবনা দ্বারা এরিস্টটল নিশ্চিত করছেন যে, মাইমেটিক আর্টের উৎকর্ষের পরিমাপক মোটেই সাদৃশ্যের সঠিকতা নয় বা নিখুঁত সাদৃশ্য নয়। বরং এর উৎকর্ষের পরিমাপক হবে আর্ট হিসেবে চর্চার জন্য এর উপযোগী বিভিন্ন কলাকৌশল ও রীতিনিয়ম। যা ঘটে তার নিখুঁত বর্ণনা মাইমেটিক আর্ট হলে ইতিহাস হতো ট্র্যাজেডি বা কমেডির চেয়ে উঁচু সাহিত্য। অথচ, আমরা জানি ইহিতাস সাহিত্য নয়, বরং ট্র্যাজেডিই সাহিত্য। ট্র্যাজেডি যা ঘটেছে তার বয়ান নয়, যা ঘটতে পারে তার বয়ান। যা ঘটেছে তা নয়, বরং যা ঘটতে পারে বা পারত মাইমেসিসের মাধ্যমে তার অনুকরণের দিকেই এরিস্টটলের আহ্বান।

প্লেটো সাহিত্য বা মাইমেটিক আর্টকে নিষিদ্ধ করার পেছনে একটি যুক্তি দেখিয়েছিলেন এই যে, ইহা মানুষের অনুভবগুলোকে জাগিয়ে তুলে তার যুক্তিবুদ্ধিকে (Reason) বিনষ্ট করে। প্লেটোর এই বক্তব্যের বিপরীতে রয়েছে এরিস্টটলের ‘ক্যাথারসিস’ তত্ত্ব। এরিস্টটলের ক্যাথারসিস তত্ত্ব অনুযায়ী ট্র্যাজেডি মানুষের মাঝে ‘করুণা’ ও ‘ভীতি’র অনুভব (pity and fear) জাগিয়ে মানুষের যুক্তিবুদ্ধিকে (Reason) বিনষ্ট তো করেই না, বরং এই অনুভূতিগুলো প্রবলভাবে জাগিয়ে তুলে তা মানুষের অনুভবরাজ্য থেকে সরিয়ে দিয়ে অর্থাৎ মানুষের অনুভরাজ্যের অপদ্রব্য সরিয়ে দিয়ে মানুষটিকে বিশুদ্ধ করে তোলে এবং এর মাধ্যমে মানুষটির যুক্তিবুদ্ধি (Reason) আরো পরিষ্কার হয়, শানিত হয়। এভাবেই এরস্টিটল তাঁর পোয়েটিকসে পরোক্ষে সাহিত্যের বিরুদ্ধে তাঁর গুরুর উত্থাপিত অভিযোগসমূহ খণ্ডন করেছেন এবং অনুকরণধর্মী শিল্প হিসেবে সাহিত্যের জয়গান উচ্চারণ করেছেন যা সাহিত্যের পাঠকদেরকে সাহিত্য বুঝতে ও সাহিত্যের রসাস্বাদনে হাজার হাজার বছর চিন্তার আশ্রয় হিসেবে কাজ করেছে। সাহিত্য সম্পর্কে এরিরস্টলের এই ভাবনার পরে আমরা আসবো রোমান যুগের আর এক সাহিত্যবোদ্ধার ভাবনার সাথে পরিচিত হতে। তিনি হলেন লঞ্জাইনাস, যাঁর নাম আমরা অনেকে লঙিনুস রূপে উচ্চারণ করে থাকি। চলবে

/জেডএস/

সম্পর্কিত

বাংলা ট্রিবিউন শারদীয় সংখ্যা ২০২১

বাংলা ট্রিবিউন শারদীয় সংখ্যা ২০২১

‘তোমরা শান্তিতে ঘুমাও—এই ভুল আমাদের আর কখনো হবে না’ : হারুকি মুরাকামি

‘তোমরা শান্তিতে ঘুমাও—এই ভুল আমাদের আর কখনো হবে না’ : হারুকি মুরাকামি

চাঁদ বণিকের একার যুদ্ধ

চাঁদ বণিকের একার যুদ্ধ

ইমান একটি সাদা জবা ফুল

ইমান একটি সাদা জবা ফুল

বিশেষ সংখ্যা (সূচিপত্র)

বাংলা ট্রিবিউন শারদীয় সংখ্যা ২০২১

আপডেট : ১৫ অক্টোবর ২০২১, ২১:০৯

 

সূ | চি | প | ত্র

 সাক্ষাৎকার

যতীন সরকারের সাক্ষাৎকার

হাসান আজিজুল হকের সাক্ষাৎকার

 

অনুবাদ

এইচ জি ওয়েলস যদি বেঁচে থাকতেন! | মূল : এলিফ শাফাক

অনুবাদ : অসীম নন্দন

 

‘তোমরা শান্তিতে ঘুমাও—এই ভুল আমাদের আর কখনো হবে না’ | হারুকি মুরাকামি

অনুবাদ : আলভী আহমেদ

 

ছোটগল্প

ইমান একটি সাদা জবা ফুল | মামুন অর রশীদ

 

অনুগল্প

পাঁচটি অণুগল্প | চন্দন চৌধুরী

 

প্রবন্ধ

চাঁদ বণিকের একার যুদ্ধ | মনির-উল হক

 

কবিতা

[বর্ণানুক্রমে]

অর্ণব রায় | আসাদ মান্নান | খায়রুল বাকী শরীফ | গৌতম গুহ রায় | ত্রিশাখ জলদাস | ধীমান চক্রবর্তী | নিষাদ নয়ন | নিখিলেশ রায় | পরিতোষ হালদার | ফরিদ ছিফাতুল্লাহ | বনানী চক্রবর্তী | বিভাস রায়চৌধুরী | মাহফুজা অনন্যা | মেঘ বসু | রাখী সরদার | রুবেল সরকার | শিকদার ওয়ালিউজ্জামান | সাকিরা পারভীন | হাসনাইন হীরা |

 

দীর্ঘ কবিতা

পৃথিবীর প্রাচীনতম নেপথ্যসঙ্গীতের কথা | অরিত্র সান্যাল

 

ভ্রমণ

স্যুরিশের চারপাশে | অহ নওরোজ

 

/জেডএস/

সম্পর্কিত

‘তোমরা শান্তিতে ঘুমাও—এই ভুল আমাদের আর কখনো হবে না’ : হারুকি মুরাকামি

‘তোমরা শান্তিতে ঘুমাও—এই ভুল আমাদের আর কখনো হবে না’ : হারুকি মুরাকামি

চাঁদ বণিকের একার যুদ্ধ

চাঁদ বণিকের একার যুদ্ধ

ইমান একটি সাদা জবা ফুল

ইমান একটি সাদা জবা ফুল

স্যুরিশের চারপাশে

স্যুরিশের চারপাশে

‘তোমরা শান্তিতে ঘুমাও—এই ভুল আমাদের আর কখনো হবে না’ : হারুকি মুরাকামি

আপডেট : ১৪ অক্টোবর ২০২১, ১৫:০০

[হারুকি মুরাকামি পোস্টমডার্ন সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ একজন লেখক। তাঁর লেখা গল্প, উপন্যাস ও প্রবন্ধ পাঠক-সমালোচক মহলে সমানভাবে প্রশংসিত। তাঁর উল্লেখযোগ্য উপন্যাসগুলো হলো নরওয়েজিয়ান উড, কাফকা অন দ্য শোর, দ্য উইন্ড-আপ বার্ড ক্রনিক্যাল, কিলিং কমেনডেটর ইত্যাদি।
২০১১ সালের ১৬ জুন ২৩-তম ক্যাতালুনিয়া আন্তর্জাতিক পুরস্কার লাভ করেন তিনি। পুরস্কারটি গ্রহণ করতে গিয়ে স্পেনের বার্সেলোনায় হারুকি মুরাকামি এই বক্তৃতাটি দেন। পরে ক্যাতালান নিউজে এটি প্রকাশিত হয়। দ্য গার্ডিয়ান-সহ বিশ্বের অনেক পত্রিকায়ও বক্তৃতাটি ছাপা হয়েছিল। জাপানের পারমাণবিক শক্তি উৎপাদন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে এটি একটি প্রতিবাদ। খোদ জাপানে বক্তৃতাটি বিতর্কের ঝড় তোলে।]


শেষবার বার্সেলোনা এসেছিলাম ঠিক দু-বছর আগের এক বসন্তে। একটা বই সাইনিংয়ের অনুষ্ঠান ছিল সেদিন। অসংখ্য পাঠক লাইন ধরে দাঁড়িয়ে ছিল আমার অটোগ্রাফ নেওয়ার জন্য। পুরো ব্যাপারটাতে আমি যথেষ্ট অবাক হয়েছি। আমার মনে পড়ে, দেড় ঘণ্টার কিছু বেশি সময় লেগেছিল সবাইকে অটোগ্রাফ দিতে। এত সময় লাগার কারণটা আপনাদের বলি। এখানে আমার কিছু নারী ভক্ত-পাঠক আছে, যারা আমাকে সেবার চুমু খেতে চেয়েছিল।

আমি পৃথিবীর অনেক শহরে গিয়েছি বই সাইনিং ইভেন্টে অংশ নেওয়ার জন্য। কিন্তু কেবলমাত্র বার্সেলোনাতেই নারী ভক্তরা আমাকে চুমু খেতে চেয়েছে। শুধুমাত্র এ-কারণেই এটা আমার কাছে একদম অন্যরকম একটা শহর। এই শহরে দু-বছর পর আজ আবার ফিরে আসতে পেরে আমি আনন্দিত, আপ্লুত। অদ্ভুত সুন্দর এই শহর। ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতিতে সমৃদ্ধ।

কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে আপনাদের বলতে চাই, আজ আমি চুমু খাবার মতো হালকা কোনো বিষয়ে কথা বলতে আসিনি। একটা সিরিয়াস বিষয় নিয়ে কথা বলব।

এ ব্যাপারে হয়তো আপনারা অবগত আছেন যে, গত মার্চ মাসের ১১ তারিখ দুপুর দুটো বেজে ৪৬ মিনিটে জাপানের উত্তরপূর্ব সীমান্তে এক ভয়ঙ্কর ভূমিকম্প হয়—অত্যন্ত শক্তিশালী এক ভূমিকম্প। প্রচণ্ড ঝাঁকুনিতে পৃথিবী যে অক্ষের ওপর ঘুরছে সেই ঘোরার গতি সহসা বেড়ে যায়। এমনকি দিনের দৈর্ঘ্য সেকেন্ডের ১.৮ মিলিয়ন ভাগের এক ভাগ হ্রাস পায়। 

ভূমিকম্পের ফলে যে ক্ষতি হয়েছে তা ভয়াবহ। ভূমিকম্প পরবর্তী সুনামির কারণে যে মারাত্মক বিপর্যয় ঘটেছে তা রীতিমতো ধ্বংসাত্মক। কোনো কোনো জায়গায় সুনামির ঢেউ এতটাই ফুলে ফেঁপে উঠেছে যে, তার উচ্চতা ছিল ৩৯ মিটারের মতো।

আপনারা একটা বার ভাবুন। ৩৯ মিটার! ১০ তলা একটা বিল্ডিং ডুবে যাবে। মানুষ আশ্রয় পাবে না। যারা উপকূলের কাছাকাছি বাস করত তারা পালানোর কোনো সুযোগ পায়নি। প্রায় ২৪ হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছে, যার মধ্যে নয় হাজার লোকের এখনো কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। বড় বড় ঢেউ তাদেরকে ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। আমরা এখনো তাদের দেহ খুঁজে পাইনি। সম্ভবত তারা গভীর সাগরের মাঝে চিরদিনের জন্য হারিয়ে গেছে।

বিষয়টা নিয়ে যতই ভাবি না কেন, কোনো কূলকিনারা করতে পারি না। তাই মাঝে মাঝে ভাবনা বন্ধ করে নিজেকে ওই হতভাগা মানুষগুলোর জায়গায় কল্পনা করি। আমার বুক শক্ত হয়ে আসে। যারা বেঁচে গেছে, তাদের কথা ভাবি। অনেকেই তাদের পরিবার, বন্ধু, ঘরবাড়ি, বিষয়-সম্পত্তি, এমনকি বেঁচে থাকার শক্তি পর্যন্ত হারিয়ে ফেলেছে। কোনো কোনো জায়গায় পুরো গ্রাম, পুরো জনপদই ধ্বংস হয়ে গেছে। সেসব মানুষের মধ্যে বেঁচে থাকার কোনো স্পৃহাই আর অবশিষ্ট নেই, আশাটাই যেন মরে গেছে। 

একজন জাপানিজ এ কথাটা খুব ভালো করেই জানে যে, তাকে প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে বাস করতে হবে। গ্রীষ্ম থেকে শরৎ-এর মধ্যে পুরো জাপান জুড়ে দফায় দফায় টাইফুন হয়। প্রতি বছরই এ কারণে জীবন এবং সম্পদের ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতি হয়। জাপানের প্রতিটা অঞ্চলেই একাধিক সক্রিয় আগ্নেয়গিরি আছে। ভূমিকম্পের কথা নতুন করে আর নাই-বা বললাম।

আমাদের দুর্ভাগ্য যে, জাপানের ভৌগোলিক অবস্থান ভূমিকম্প-প্রবণ অঞ্চলে। এশিয়া মহাদেশের পূর্ব দিকে চারটা বড় টেকটোনিক প্লেটের মধ্যে বিপজ্জনকভাবে ঝুলে আছে আমাদের জন্মভূমি। এখানে বাস করাটা তাই আমাদের কাছে অনেকটা ভূমিকম্পের আঁতুড়ঘরে বাস করার মতো। 

টাইফুনের সঙ্গে ভূমিকম্পের একটা পার্থক্য আছে। টাইফুনের সময় এবং গতিপথ কিছুটা হলেও আবহাওয়া দপ্তর ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারে। কিন্তু ভূমিকম্প কবে হবে বা কখন হবে—সেটা কেউ বলতে পারবে না। ১১ মার্চের ভূমিকম্প সম্পর্কে কেবলমাত্র এটুকুই বলা সম্ভব যে এটাই শেষ নয়, এরপরও সে আসবে, আবার আসবে, নিশ্চয়ই আসবে, হয়তো অদূর ভবিষ্যতেই আসবে। আমরা নির্দিষ্ট করে সেই সময়টা সম্পর্কে বলতে পারব না। তবে সে যে আসবে এটুকু আমরা নিশ্চিতভাবে জানি। এর কোনো ভুল নেই। ভুল হবার সুযোগ নেই।

বিশেষজ্ঞরা ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন, আগামী ২০-৩০ বছরের মধ্যে টোকিওতে আট মাত্রার একটা বড় ভূমিকম্প হতে পারে। তারা ২০ বা ৩০ বছরের কথা বললেও এটা ১০ বছরের মধ্যেও ঘটে যেতে পারে। আমি মোটেই অবাক হব না যদি আগামীকাল বিকালেই সেই ভূমিকম্প আঘাত করে। টোকিওর মতো একটা ঘনবসতিপূর্ণ শহরে যদি সত্যিই এই ভূমিকম্প আঘাত হানে, তবে কী হতে পারে—একটাবার ভাবুন। যে ক্ষয়ক্ষতি হবে তার সঠিক পরিমাণ কেউ আন্দাজ করতে পারবে না।

কেবলমাত্র টোকিও শহরেই প্রায় ১৩ মিলিয়ন মানুষ খুবই সাধারণ জীবন যাপন করে। তারা ভিড়ভাট্টার মধ্যে কমিউটার ট্রেনে চেপে অফিস যায়। তাদের অফিসগুলো সব আকাশ ছোঁয়া ইমারতে। ১১ মার্চের ভূমিকম্পের পরে টোকিওর জনমনে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ার কথা। কিন্তু সেরকম কিছু ঘটেনি। আমি অন্তত শুনিনি যে টোকিও ছেড়ে একটি লোকও চলে গেছে।

কেন যায়নি? কেন তারা রয়ে গেছে? আপনারা এই প্রশ্ন করতেই পারেন। ঠিক কী কারণে এতগুলো মানুষ প্রতিদিন এরকম ভয়ংকর একটা জায়গায় তাদের জীবন কাটিয়ে দিচ্ছে? তাদের তো ভয়ে পাগল হয়ে যাবার কথা, তাই না?

উত্তরটা দিচ্ছি।

জাপানিজ ভাষায় আমাদের একটা শব্দ আছে, একেবারেই নিজস্ব সেই শব্দ—মুজো। এর অর্থ হচ্ছে নশ্বর। কোনোকিছুই চিরকাল টিকে থাকে না। এই পৃথিবীতে যা কিছু জন্মায়, তা এক সময় ক্ষয়ে যেতে যেতে যেতে ‘নেই’ হয়ে যায়। এমন কোনোকিছুই নেই যা অবিনশ্বর, বা পরিবর্তন হবে না। বিশ্বসংসার সম্পর্কে এই ধারণাটা সম্ভবত এসেছে আমাদের বৌদ্ধ দর্শন থেকে। কিন্তু সত্যিকার অর্থে বলতে গেলে 'মুজো'-র ধারণাটা বৌদ্ধ দর্শনের গণ্ডি পেরিয়ে জাপানি জনমানুষের আত্মার মধ্যে গভীরভাবে ঢুকে গেছে। সেই প্রাচীনকাল থেকে মানুষের মনে শব্দটা পাকাপাকিভাবে স্থান করে নিয়েছে, আসন পেতে বসেছে—অনেকটা শেকড় গাঁড়ার মতো। 

সবকিছুই যে নশ্বর এই ধারণার মধ্যে এক ধরনের হাল ছেড়ে দেওয়ার গন্ধ আছে। আমরা বিশ্বাস করি, প্রকৃতির বিরুদ্ধে গিয়ে কিছুই করা সম্ভব নয়। এই হাল ছেড়ে দেওয়ার ব্যাপারটার মধ্যেও জাপানের লোকজন একটা সুন্দর ইতিবাচক দিক আবিষ্কার করেছে।

প্রকৃতি থেকে কিছু উদাহরণ টেনে ব্যাপারটা পরিষ্কার করার চেষ্টা করি। বসন্তকালে জাপানে চেরি ফুল ফোটে, আমরা তা ভালোবাসি। গ্রীষ্মের সময় নিভু নিভু অন্ধকারে আমরা জোনাকি দেখি আর শরৎকালে ভালোবাসি লাল রঙের পাতা। আমরা সবাই মুগ্ধ হয়ে একসঙ্গে এগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকি। এটা আমাদের অভ্যাস, একইসঙ্গে ঐতিহ্য। চেরি ফুল ফোটে এমন জায়গায় আপনি যদি বসন্তকালে কোনো হোটেল ভাড়া নিতে যান, আপনি সেটা পারবেন না। হোটেলের সব সিট আগে থেকেই বুক হয়ে যায়। জোনাকি অথবা লাল পাতার জন্য বিখ্যাত কোনো জায়গার বেলাতেও একই কথা প্রযোজ্য। গ্রীষ্মকালে এবং শরতে সেখানে মানুষের ভিড় লেগে থাকে। 

কেন এমন হয়?

কারণটা সম্ভবত এই যে চেরি ফুল, জোনাকি অথবা শরতের লাল পাতা কোনোটাই অবিনশ্বর নয়। তাদের সৌন্দর্য ক্ষণস্থায়ী। তাই আমরা দূর-দূরান্ত থেকে যাই ওই বিশেষ গৌরবময় মুহূর্ত বা সময়ের সাক্ষী হতে। আরও একটি ব্যাপার এখানে আছে। ওপরের যে তিনটি জিনিসের কথা আপনাদের বললাম, তারা ধীরে ধীরে যখন তাদের সৌন্দর্য হারায়, আমরা কিছুটা স্বস্তি বোধ করি। সৌন্দর্য তার সর্বোচ্চ শিখরে আরোহন করে যখন একটু একটু করে ম্লান হতে থাকে, আমরা আমাদের অগোচরেই মনের মধ্যে এক ধরনের শান্তি পাই। 

আমি ঠিক বলতে পারব না, আমাদের এধরনের মানসিকতার কারণটা কী। সম্ভবত প্রাকৃতিক বিপর্যয় আমাদের মনটাকে এভাবে তৈরি করেছে। কিন্তু আমি এ বিষয়ে নিশ্চিত যে এই মানসিকতাই আমাদের বারবার বিপর্যয় থেকে ঘুরে দাঁড়াতে সাহায্য করে। মোট কথা হলো, আমরা মেনে নিতে শিখেছি। অমোঘ নিয়তির মতো প্রকৃতির অনিবার্য বিষয়গুলো আমরা হাসিমুখে মেনে নেই।

অধিকাংশ জাপানিজ এই ভূমিকম্পে মানসিকভাবে ধাক্কা খেয়েছে। যদিও তারা ব্যাপারটাতে মোটামুটিভাবে অভ্যস্ত, তারপরেও যে পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে—তার সঙ্গে তারা মানিয়ে নিতে পারেনি। আমরা আমাদের দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় অসহায় এবং একই সাথে উদ্বিগ্ন। 

তবে আমরা ভেঙে পড়িনি। ঘুরে দাঁড়াবার শক্তি আমাদের আছে। আমাদের মন আবার চাঙা হয়ে উঠবে। আমি এটা নিশ্চিতভাবে জানি। আমরা ধ্বংসস্তূপ থেকে মাথা উঁচু করে উঠে দাঁড়াব। এবং সবকিছু আবার নতুন করে গড়ে নেব। এ নিয়ে আমার তেমন কোনো দুশ্চিন্তা বা ভয় নেই। 

ইতিহাসের দীর্ঘ সময় জুড়ে আমরা এভাবেই ঘুরে দাঁড়িয়েছি, বছরের পর বছর ধরে। দুঃখে স্থবির হয়ে যাইনি। আমরা জানি, ঘর ভেঙে গেলে তা নতুন করে বানানো যায়, ভাঙা রাস্তাও মেরামত করা সম্ভব। এমন কোনো জটিল বিষয় এগুলো নয়। 

পুরো বিষয়টাকে আপনারা এভাবে দেখতে পারেন যে পৃথিবীর বুকে আমরা যখন ঘর বানিয়েছি, তখন কারো অনুমতি কিন্তু নেইনি। পৃথিবী যদি আজ আমাদের অনাহূত অতিথি বলে ঘোষণা করে, তবে তার প্রতিবাদ করার মতো কোনো ভাষা আমাদের জানা নেই। ধরণী কখনো আমাদের অনুরোধ করেনি তার বুকে থাকতে। তাই সে যদি সামান্য নড়াচড়া শুরু করে বা কেঁপে ওঠে তাহলে এ নিয়ে আমাদের অভিযোগ জানানোর কিছু নেই। ভূপৃষ্ঠ মাঝে মধ্যে কেঁপে উঠবে, এটা তার ধর্ম। আমরা পছন্দ করি বা না-ই করি, তাতে তার কিছু এসে যায় না। এই ব্যাপারটা মেনে নিয়েই আমাদের বাঁচতে হবে। 

তবে আজ আমি আপনাদের সামনে জানমালের ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে কথা বলতে আসিনি। রাস্তা বা বাড়িঘর ভেঙে গেলে খুব সহজেই সেগুলো আবার তৈরি করা যায়। আমি এমন কিছু নিয়ে আজ কথা বলব যা একবার হারিয়ে গেলে সহজে আর ফিরে পাওয়া যায় না। এই যেমন, আমাদের মূল্যবোধ। এই জিনিসটার কোনো আকার নেই। একবার মূল্যবোধের অবক্ষয় হলে সেটা ফিরে পাওয়া খুব কঠিন। আপনার কাছে টাকা আছে, সেই টাকা দিয়ে আপনি কিছু শ্রমিক আর কাঁচামাল জোগাড় করে মূল্যবোধ ব্যাপারটা আবার গড়ে তুলতে পারবেন না। এটা সে ধরনের বিষয় নয়।

আমি যদি আমার কথাটা আরও নির্দিষ্ট করে বলতে চাই, তাহলে বলতে হবে আমি ‘ফুকুশিমা পারমাণবিক শক্তি কেন্দ্র’ নিয়ে কথা বলতে চাইছি। আপনারা হয়তো জানেন যে ছয়টা পারমাণবিক চুল্লির মধ্যে অন্তত তিনটা ভূমিকম্প এবং সুনামির ফলে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেগুলো এখনো মেরামত করা সম্ভব হয়নি। এই নিউক্লিয়ার রিঅ্যাক্টরগুলো থেকে চারপাশে ক্রমাগত তেজস্ক্রিয়তার বিকিরণ ঘটছে। সেখানকার মাটি দূষিত হয়ে গেছে। তেজস্ক্রিয় জল গিয়ে মিশেছে সাগরে। তেজস্ক্রিয় ধূলিকণা বাতাসে মিশে ছড়িয়ে পড়েছে দূর দূরান্তে।

লক্ষ লক্ষ মানুষ তাদের ঘর বাড়ি ছাড়তে বাধ্য হয়েছে। মাইলের পর মাইল জুড়ে গবাদি পশুর খামার ও প্রজনন কেন্দ্র, শিল্প কারখানা,শহর-বন্দর পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। যারা এসব জায়গায় বাস করত, হয়তো এ জীবনে তারা আর কখনো সেখানে ফিরে যেতে পারবে না। অত্যন্ত দুঃখের সাথে একথাও আমাকে স্বীকার করতে হচ্ছে যে শুধুমাত্র জাপান নয়, এই ঘটনায় ক্ষতির রেশ পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রগুলোতেও ছড়িয়ে পড়বে।

এরকম দুঃখজনক একটা দুর্ঘটনা কেন ঘটলো তা মোটামুটি স্পষ্ট। যে সমস্ত মানুষ এই পরমাণু প্রকল্পগুলো তৈরি করেছিল, তারা স্বপ্নেও ভাবেনি এরকম ভয়াবহ একটা সুনামি এসে আঘাত করবে। অবশ্য বিশেষজ্ঞরা বারবার বলেছিলেন যে অতীতেও এই মাপের সুনামি এই অঞ্চলে আঘাত করেছিল। অতীতে আঘাত করলে ভবিষ্যতেও আঘাত না করার মতো কোনো কারণ তৈরি হয়নি। সেই হিসেবে এগুলোর নিরাপত্তার মান আরও বাড়ানো দরকার ছিল।

কিন্তু যেসব কোম্পানি বৈদ্যুতিক শক্তি উৎপাদন করে তারা বিশেষজ্ঞদের মতামত অগ্রাহ্য করেছে। সেগুলো মোটেই আমলে নেয়নি। বেপরোয়াভাবে পরমাণু প্রকল্প স্থাপন করেছে। শত বছরে একবার ঘটতে পারে এরকম সুনামির কথা ভেবে বাণিজ্যিক সংস্থাগুলো বিনিয়োগ করতে চায় না। শুধু শুধু নিরাপত্তাজনিত কারণে খরচ বাড়িয়ে তাদের কোনো লাভ নেই। 

আমার কাছে কেন যেন মনে হয়, সরকার নিজেই পরমাণু প্রকল্পগুলোকে উৎসাহ দিতে গিয়ে নিরাপত্তা ইস্যুতে বেশ কিছু ছাড় দিয়েছে। সুনির্দিষ্ট কিছু বিধি শিথিল করেছে যা করার কোনো কারণ তাদের নেই। তারা ইচ্ছে করলে কড়াকড়ি আরোপ করতে পারতো, কিন্তু তারা তা করেনি। 

এই বিষয়গুলো আমাদের তদন্ত করা উচিত। এতে যদি কোনো গলদ ধরা পড়ে, তবে অবিলম্বে ব্যবস্থা নিতে হবে। হাজার-হাজার, লক্ষ-লক্ষ মানুষ তাদের ঘরবাড়ি, ভিটে-মাটি ছাড়তে বাধ্য হয়েছে। এটা কোনো ছেলেখেলা নয়। তাদের সর্বনাশ হয়ে গেছে। তারা যদি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বা রেগে যায়, তাহলে সেই রাগ খুবই স্বাভাবিক, যৌক্তিক। 

কোনো এক আশ্চর্য কারণে জাপানের মানুষজনের রাগ খুব কম। তারা খুব ধৈর্যশীল, সহজে রেগে ওঠে না। তারা অবশ্যই বার্সেলোনার নাগরিকের থেকে আলাদা। কিন্তু এ যাত্রায় তাদের পক্ষেও রাগকে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। 

এখন সময় এসেছে আত্মসমালোচনার। আমাদের নিজেদেরকে তিরস্কার করতে হবে। আমরা নিজেরাই দিনের পর দিন এই দুর্নীতিগ্রস্থ সিস্টেমকে মেনে নিয়েছি এবং সহ্য করে আসছি। 

আপনারা এ কথা সবাই জানেন যে আমরা জাপানের জনগণ পারমাণবিক তেজস্ক্রিয়তার সাথে আগে থেকেই পরিচিত। ১৯৪৫ সালের আগস্ট মাসে আমেরিকার সামরিক বিমান জাপানের দুটি প্রধান শহর হিরোশিমা ও নাগাসাকির ওপর পারমাণবিক বোমা নিক্ষেপ করে। দুই লক্ষের বেশি লোক তখন প্রাণ হারায়। এদের অধিকাংশই নিরস্ত্র এবং বেসামরিক মানুষ। নেহায়েৎ আমজনতা। সেই পারমানবিক বোমা হামলা ভুল ছিল নাকি শুদ্ধ ছিল, সে বিচারে আমি এই মুহূর্তে যেতে চাচ্ছি না।

আমি শুধু এই কথাটা বলতে চাইছি যে একটা দুটো লোক নয়, দুই লক্ষের বেশি লোক বোমা নিক্ষেপের প্রায় সাথে সাথেই প্রাণ হারিয়েছে। এই ঘটনায় যারা বেঁচে গিয়েছিল, তারাও দিনের পর দিন একটু একটু করে মৃত্যুর দিকে পা বাড়িয়েছে। তেজস্ক্রিয়তা তাদের পিছু ছাড়েনি। কী ভয়ংকর এক ক্ষতি যে তেজস্ক্রিয়তার কারণে হয়েছে, আমরা সবাই তা মোটামুটিভাবে জানি। 

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আমাদের দুটি মৌলিক নীতি গ্রহণ করতে হয়েছিল। প্রথমটা অর্থনৈতিক পুনর্জাগরণ। আর দ্বিতীয়টা হলো যুদ্ধকে অস্বীকার করা। সামরিক খাতে খরচ কমিয়ে উন্নতির পথে হাঁটাটা জরুরি হয়ে পড়েছিল। কেবলমাত্র সেভাবেই আমরা শান্তি পেতে পারতাম। এই ভাবনাগুলোই ছিল যুদ্ধপরবর্তী জাপানের নতুন নীতি। 

হিরোশিমায় পরমাণু বোমায় নিহতদের স্মৃতিফলকে একটা সুন্দর কথা লেখা আছে,

‘তোমরা শান্তিতে ঘুমাও-

এই ভুল আমাদের আর কখনো হবে না।’

শব্দগুলো অনেক কোমল, তাই না? এর একটা অন্য অর্থ আছে। তা হলো, আমরা একই সঙ্গে ভুক্তভোগী এবং অপরাধী। পারমাণবিক শক্তি আমাদের আতঙ্কিত করে, আমরা এই শক্তিকে ভয় পাই, সেই হিসেবে আমরা ভুক্তভোগী।

আবার আমরা নিজেরাই এই শক্তিকে ব্যবহার করছি, কোনোভাবেই এর ব্যবহার থেকে নিজেদের বিরত রাখতে পারছি না, সেই হিসেবে আমরা অপরাধী। আমরাই আক্রমণকারী। 

হিরোশিমায় পারমানবিক বোমা বিস্ফোরণের পর অনেকখানি সময় বয়ে গেছে। ঠিক ৬৪ বছর পর ফুকুশিমা দাই-ইচি পারমাণবিক চুল্লি থেকে গত তিন মাস ধরে তেজস্ক্রিয়তা ছড়াচ্ছে। এবং তার চারপাশের মাটি, সমুদ্র এবং বাতাস দূষিত হয়ে পড়ছে। কেউ জানে না এটা কীভাবে বন্ধ হবে অথবা কখন হবে।

পারমাণবিক শক্তির কারণে এটা জাপানের দ্বিতীয় বিপর্যয়। এবার কিন্তু কেউ আমাদের ওপর পরমাণু বোমা নিক্ষেপ করেনি। আমরা নিজেরাই এই ভয়াবহ বিপর্যয়ের কারণ। নিজেদের ভুলেই ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে আমাদের মাটি, আমাদের জীবন।

এমনটা কেন ঘটলো? কারণটা কী? দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পারমাণবিক শক্তিকে প্রত্যাখ্যান করার ব্যাপারে আমাদের যে নীতিগত সিদ্ধান্ত, সেটা হঠাৎ করে কেন পরিবর্তন করতে হবে? বছরের পর বছর যে শান্তিপূর্ণ এবং উন্নত সমাজের স্বপ্ন আমরা দেখতে শুরু করেছিলাম, সেই স্বপ্ন হুট করে কেন নষ্ট হয়ে গেল? কারণটা খুব সাদামাটা। আমরা উন্নয়নের সংক্ষিপ্ত এবং কাযর্কর একটা উপায় আবিষ্কারের চেষ্টা করেছি। দক্ষতা অর্জন করতে চেয়েছি, ইংরেজিতে যাকে বলে এফেসিয়েন্সি।

বৈদ্যুতিক শক্তি নিয়ে যে কোম্পানিগুলো কাজ করে, তারা আমাদের বোঝাতে পেরেছে যে শক্তি উৎপাদনের সবচেয়ে দক্ষ এবং কার্যকর ব্যবস্থা হলো পারমাণবিক চুল্লির ব্যবহার। সত্যিকার অর্থে এটা এমন একটা ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে কোম্পানিগুলো সহজেই মুনাফা অর্জন করতে পারবে।

জাপান সরকারের পেট্রোলিয়ামের চাহিদা এবং সরবরাহ নিয়ে সবসময়ই এক ধরনের দুশ্চিন্তা ছিল। পৃথিবী জুড়ে জ্বালানি তেল সংকট শুরু হবার পর থেকেই আমাদের সরকার পারমাণবিক শক্তি উৎপাদনকে জাতীয় নীতির অন্তর্ভুক্ত করে ফেলেছে। 

বৈদ্যুতিক শক্তি উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলো বিজ্ঞাপনে প্রচুর টাকা খরচ করেছে। একইসাথে মিডিয়াকে ঘুষ দিয়ে দেশের আপামর জনসাধারণের কাছে ভুল তথ্য সরবরাহ করেছে। মিথ্যে বলেছে তারা। আমাদেরকে পুরোপুরি বিভ্রান্ত করেছে—অত্যন্ত কার্যকর এক উপায়ে। দেশের মানুষকে বুঝিয়ে ছেড়েছে, পারমাণবিক শক্তি উৎপাদন ব্যবস্থা সম্পূর্ণ নিরাপদ। 

কিছু বুঝে উঠার আগেই আমরা আবিষ্কার করলাম, জাপানে উৎপাদিত মোট বিদ্যুতের শতকরা ৩০ ভাগ আসছে পরমাণু শক্তি থেকে। জাপান হচ্ছে একটা ছোট্ট দ্বীপ রাষ্ট্র, যে দেশে প্রায়ই ভূমিকম্প হয়, নানা প্রকার প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে আমরা জর্জরিত। অদ্ভুত ব্যাপার হলো, এই ছোট্ট দ্বীপ-রাষ্ট্রটি পারমাণবিক শক্তি উৎপাদনে এই মুহূর্তে বিশ্বে তৃতীয়। এই পুরো ব্যাপারটা কখন ঘটেছে, কীভাবে ঘটলো, কখন আমরা পারমাণবিক শক্তি উৎপাদনে বিশ্বে তৃতীয় অবস্থানে চলে গেছি—কিছুই টের পাইনি। 

আমরা ঠিক সেই সীমায় পৌঁছে গেছি, যেখান থেকে ফেরার পথ নেই। যা হবার তা হয়ে গেছে। যারা শুরুর দিকে পারমাণবিক শক্তি উৎপাদন নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছিল, বা এর বিরোধিতা করেছিল, তাদেরকে এখন উল্টো বিদ্রুপ করে প্রশ্ন করা হচ্ছে, আপনারা কি বিদ্যুৎ ঘাটতির পক্ষে?

খুব কৌশলে জাপানের জনগণকে ভাবতে বাধ্য করা হয়েছে যে পারমাণবিক শক্তির ওপর নির্ভরশীলতা অবশ্যম্ভাবী। এটা এড়ানোর কোনো সুযোগ নেই। কিছু মানুষ এটা মেনে নিয়েছে। কারণ গ্রীষ্মের প্রচণ্ড গরমে এয়ারকন্ডিশনিং সিস্টেম ছাড়া বাস করাটা আসলেই বেশ কষ্টকর। যারা পারমাণবিক শক্তির বিরোধিতা করে আসছিল, তাদের গায়ে একটা তকমা এঁটে দেয়া হয়েছে—বাস্তবতা বিবর্জিত স্বপ্নবাজ লোক। 

এবং ঠিক এভাবেই আমরা পৌঁছে গেছি আমাদের আজকের অবস্থায়। পারমাণবিক চুল্লিগুলো, যা কি-না আমাদের খুব দক্ষতার সাথে কার্যকর পন্থায় বিদ্যুৎ উৎপাদনের স্বপ্ন দেখিয়েছিল, পৃথিবীকে স্বর্গ বানানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, সেগুলোর কারণেই আজ আমরা নরকের চেহারা দেখতে পাচ্ছি। এটাই সত্য, এটাই বাস্তব, এর মধ্যে কোনো ভ্রান্তি নেই।

এই বাস্তব এবং সত্যের বাইরে আছে অন্য ধরনের এক সত্য। সেটা হলো ‘তথাকথিত বাস্তবতা’। এই তথাকথিত বাস্তবতার ওপর ভিত্তি করে পারমাণবিক শক্তি উৎপাদনে জোর দেওয়া হয়েছিল। অথচ সত্য কথা হলো এই যে এটা আসলে কোনো বাস্তবতাই নয়। এক ধরনের প্রলোভন—যা ব্যবহার করে কেবল কিছু সুযোগ সুবিধা পাওয়া যায়। অথচ ওই ভয়ঙ্কর লোকগুলো বাস্তবতা শব্দটার ভুল ব্যবহার করেছে। ‘বাস্তবতা’ শব্দটার মোড়কে ওরা খুঁজে ফিরেছে ‘সুবিধা’।

জাপানের মানুষের একটা বড় গর্ব ছিল তাদের প্রযুক্তি নিয়ে। চলমান পরিস্থিতিতে সেই প্রযুক্তি গল্প-গাথার যে সাম্রাজ্য ছিল তার পতন হয়েছে। শোচনীয়ভাবে হেরে গেছে প্রযুক্তি। এটা শুধু প্রযুক্তিগত পরাজয় নয়, আমাদের নৈতিক মূল্যবোধের পরাজয়। আমরা হেরে গেছি। 

এখন আমরা জাপান সরকার এবং বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলোকে দায়ী করছি, যেটার যথার্থতা নিয়ে আমার কোনো কথা নেই। আমি শুধু এই কথা বলবো যে আয়নায় আমাদের নিজেদের মুখটাও একবার দেখা উচিত। আমরা নিজেরা কি এ দায় এড়াতে পারব? আগেই বলেছি আমরা একই সঙ্গে ভুক্তভোগী এবং অপরাধী। আমাদের অবশ্যই চলমান এসব ঘটনাকে অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে বিচার করতে হবে। না হলে একই ভুল বার বার হবে।

‘তোমরা শান্তিতে ঘুমাও-

এই ভুল আমাদের আর কখনো হবে না।’

এই প্রতিশ্রুতি আমরাই দিয়েছিলাম। আমাদের মনের মধ্যে এই কথাগুলো গেঁথে ফেলতে হবে।

ডক্টর রবার্ট ওপেনহাইমার, যিনি ছিলেন আণবিক বোমা তৈরীর প্রধান কারিগর, তিনি নিজেই হিরোশিমা ও নাগাসাকির মারাত্মক ধ্বংসযজ্ঞে মানসিক আঘাত পেয়েছিলেন। প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যানকে তিনি আক্ষেপ করে বলেছিলেন, মিস্টার প্রেসিডেন্ট, আমার হাতে রক্ত লেগে গেছে।

এই কথার উত্তরে প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যান তার পকেট থেকে একটা পরিস্কার রুমাল বের করে ওপেন হাইমারের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলেছিলেন, ঠিক আছে, রক্ত মুছে নাও। 

কিন্তু গোটা পৃথিবীতে এত বড় আর পরিষ্কার রুমাল কি সত্যিই আছে যেগুলো এত মানুষের রক্ত মুছে ফেলতে পারবে?

আমি বিশ্বাস করি, আমাদের মানে জাপানিজদের অবশ্যই চিৎকার করে বলা উচিত ছিল, আমরা পরমাণু শক্তি চাই না।

আমাদের সম্মিলিতভাবে পরমাণু শক্তির বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। আমাদের অন্য যেসব প্রযুক্তি আছে, সেই প্রযুক্তি আর আমাদের মেধার সাথে সব পুঁজি এক করে পারমাণবিক শক্তির বিকল্প প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে হবে। এটা করতে গিয়ে যদি সারা পৃথিবী আমাদের নিয়ে রসিকতা করে বলে, ‘পারমাণবিক শক্তির মতো দক্ষ এবং কার্যকর একটা শক্তি জাপান ব্যবহার করছে না, ওরা অত্যন্ত বোকা’—তবুও আমরা সে কথায় কান দেবো না। পারমাণবিক শক্তির ব্যাপারে আমাদের যে প্রচণ্ড বিতৃষ্ণা, তা অব্যাহত থাকবে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতার পর পারমাণবিক শক্তি উৎপাদন ব্যবস্থা ছাড়া অন্য যেসব প্রক্রিয়ায় শক্তি উৎপাদন করা সম্ভব, সেগুলোকেই আমাদের জাতীয় নীতি হিসেবে গ্রহণ করা দরকার ছিল। হিরোশিমা এবং নাগাসাকিতে যারা প্রাণ হারিয়েছে, তাদের আত্মার জন্য এটা হতো এক ধরনের সান্ত্বনা। আমাদের অতি অবশ্যই এ ধরনের একটা বার্তা পাঠানো দরকার ছিল পৃথিবীর কাছে।

পুরো পৃথিবীকে কিছু একটা দারুণ জিনিস উপহার হিসেবে দেওয়ার জন্য এটা ছিল জাপানের একটা সুযোগ। কিন্তু আমরা সঠিক রাস্তাটা বেছে নিইনি। ভুল পথে চলেছি। কারণ, মূল্যবোধ আমাদের কাছে কোনো বিষয় নয়। আমরা দক্ষ এবং কার্যকর একটা ব্যবস্থা চেয়েছি। দ্রুত ধনী রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার একটা লোভ আমাদের হয়েছিল।

আমি আপনাদের আগেই বলেছি যে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে যে ক্ষতি হয়েছে সেই ক্ষতি একদিন আমরা কাটিয়ে উঠতে পারব। রাস্তা ভেঙে গেলে সেটা মেরামত করা যায়। ঘরবাড়ি ধ্বসে গেলে আবার তৈরি করা যায়। এসব জিনিস পুনর্গঠনের জন্য পৃথিবীর বুকে যথেষ্ট পরিমাণে বিশেষজ্ঞ আছেন।

কিন্তু ভেঙে যাওয়া মনকে আবার কে গড়ে দেবে? নষ্ট হয়ে যাওয়া মূল্যবোধ আর নৈতিকতা কে ফিরিয়ে দেবে? এগুলো আমাদের নিজেদেরই পুনরুদ্ধার করতে হবে। আর কেউ এসে সেটা করে দিয়ে যাবে না। এ ব্যাপারে কোনো বিশেষজ্ঞ নেই।

যারা মরে গেছে, তাদের জন্য শোক পালন করে আমরা শুরু করব। যারা ক্ষতিগ্রস্ত, তাদের যত্ন নেব। তাদের ব্যথা এবং আঘাতকে কোনোভাবেই ব্যর্থ হতে দেওয়া যাবে না। কাজটা করতে হবে খুব যত্ন সহকারে এবং নিঃশব্দে। এজন্য আমাদের সবার আত্মার শক্তিকে এক করে সম্মিলিতভাবে চেষ্টা করতে হবে। ধরুন, রৌদ্রোজ্জ্বল এক বসন্তের দিন। আপনারা দেখে থাকবেন, গ্রামের কৃষকরা সাতসকালে হাসিমুখে একসাথে মাঠে যায়। তারা বীজ বোনে। তারা একসঙ্গে সব কাজ করে—এক আত্মা, এক হৃদয়ে। সে ধরনের সম্মিলিত শক্তিতে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। 

আমরা যারা পেশাদার লেখক, তারা যে কোনো শব্দ খুব চাতুর্যের সাথে ব্যবহার করতে জানি। এই সম্মিলিত লক্ষ্য অর্জনে আমরা খুব কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারি। এই যে নতুন করে আবিষ্কার করা মূল্যবোধের কথা এতক্ষণ ধরে আপনাদের বললাম, সেগুলোকে নতুন নতুন শব্দে গেঁথে প্রাণবন্তভাবে নতুন গল্প হিসেবে মানুষের সামনে উপস্থাপন করতে পারি। এই গল্পগুলো আমরা একে অন্যের সঙ্গে ভাগ করে নিতে পারি। তখন আমরা একটা সত্যিকারের ছন্দ খুজে পাবো। সেই ছন্দে মানুষ উৎসাহ বোধ করবে, তাদের মধ্যে উদ্দীপনা সৃষ্টি হবে। চাষিরা বীজ বোনার সময় যেমন গান বাঁধে, তারপর একসাথে সেই গান গায়, ঠিক তেমন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জাপান প্রায় ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। সেই ধ্বংসস্তূপ থেকে আমরা ফিরে এসেছি। ঘুরে দাঁড়িয়েছি। আমাদের অর্থনীতিকে পুনর্গঠন করেছি। আমাদের আবার সেই শুরুর দিনগুলোতে ফিরে যেতে হবে।

আমার বক্তৃতার শুরুতে বলেছিলাম, আমরা একটা পরিবর্তনশীল এবং নশ্বর ‘মুজো’ পৃথিবীতে বাস করি। প্রতিটি জীবনই এখানে পরিবর্তিত হবে এবং একসময় তা বিলীন হয়ে যাবে। এর কোনো অন্যথা হবার উপায় নেই। প্রকৃতি মহা শক্তিধর। তার সামনে মানুষের ক্ষমতা কোনো ক্ষমতাই নয়। এই যে স্বীকার করে নিচ্ছি যে আমাদের কোনো ক্ষমতা নেই এবং সবকিছু ক্ষণস্থায়ী, এটাই জাপানি সংস্কৃতির মূল ধারণা। আমরা বিশ্বাস করি পৃথিবীটা নশ্বর। একই সাথে আমাদের এই বিশ্বসাটুকুও আছে যে আমাদের এখানে বেঁচে থাকতে হবে। আমরা বাঁচব, তীব্রভাবে বেঁচে থাকবো ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে।

আমি খুবই গর্বিত যে, ক্যাতালানের মানুষ আমার লেখা পছন্দ করে এবং তারা আমাকে এ ধরনের একটা সম্মানজনক পুরষ্কারের জন্য এখানে ডেকেছে। আমার দেশ থেকে আপনাদের এ জায়গাটার দূরত্ব অনেক এবং আমরা সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটো ভাষায় কথা বলি। আমাদের মধ্যকার সাংস্কৃতিক দূরত্বও অনেক। কিন্তু একই সঙ্গে একথাও সত্য যে, আমরা সবাই আসলে বিশ্বনাগরিক। আমাদের সবার সমস্যা আদতে একই। আমাদের দুঃখ এবং আনন্দগুলোর স্বরূপও এক। এ কারণেই একজন জাপানি লেখকের গল্প ক্যাতালান ভাষায় অনুবাদ করা হয়। এবং ক্যাতালান মানুষেরা সে গল্পকে বুকে টেনে নেয়।

আপনাদের কাছে আমার গল্পগুলো পৌঁছে দিতে পেরে আমি যারপরনাই আনন্দিত। স্বপ্ন দেখা একজন ঔপন্যাসিকের দৈনন্দিন কাজ। এটা তাকে করতেই হয়। কিন্তু তার চেয়েও বড় আরেকটা কাজ তার আছে—তা হলো, সেই স্বপ্নটাকে সবার সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া। স্বপ্ন ভাগ করে নিতে না জানলে আমি উপন্যাস লিখতে পারতাম না। 

আমি জানি যে ক্যাতালানের মানুষদের একটা সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য আছে। সে ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে তাদের অনেক সংগ্রাম করতে হয়েছে। তারা ঝড়-ঝাপটা পার হয়েছে। আমি বিশ্বাস করি, আপনাদের সঙ্গে জাপানের মানুষের অনেক কিছু ভাগাভাগি করার আছে।

একটা বার ভাবুন, যদি এরকম কিছু যদি একটা করা যায় তো কী দারুণ হয়, জাপান এবং ক্যাতালানের মানুষেরা মিলে আমরা যৌথভাবে একটা ঘর তৈরি করলাম। যে ঘরে কিছু বাস্তব বুদ্ধি বিবর্জিত স্বপ্নবাজ মানুষ থাকবে, যেখানে দুই দেশের দুই সংস্কৃতির মানুষের আত্মার মিলন ঘটবে। আমি বিশ্বাস করি, সেটাই হবে আমাদের পুনর্জন্মের শুরু। আমরা দুই অঞ্চলের মানুষই সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কিছু প্রাকৃতিক বিপর্যয় এবং সন্ত্রাসী হামলার শিকার হয়েছি। তবু আমাদের স্বপ্ন দেখতে হবে, ভয় পেলে চলবে না। ‘দক্ষতা’ এবং ‘সুবিধা’ নামক পাগলা কুকুরকে কখনোই পাত্তা দেওয়া যাবে না। আমাদের অসম্ভব সব স্বপ্ন দেখতে হবে। কারণ আমরা হলাম, বাস্তব বুদ্ধি বিবর্জিত একদল মানুষ—যারা স্বপ্ন দেখতে জানে।

মানুষ জন্ম নেবে। আবার একদিন মরে যাবে। কিন্তু মনুষত্ব বেঁচে থাকবে চিরকাল। এই কথাটায় আমাদের বিশ্বাস রাখতে হবে। এটাই আমাদের শক্তি।

আমার বক্তব্যের প্রায় শেষ পর্যায়ে চলে এসেছি। আমি আমার পুরস্কারের অর্থ দান করতে চাচ্ছি সেইসব মানুষকে—যারা ভূমিকম্প এবং পারমাণবিক শক্তি প্রকল্প বিপর্যয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

ক্যাতালান জনগণ এবং ক্যাতালুনিয়া সরকারকে ধন্যবাদ আমাকে এই পুরস্কার প্রদান করার জন্য।

আমার অন্তরের অন্তস্থল থেকে আরও একটা ব্যাপারে সমবেদনা জানাতে চাই। সম্প্রতি লোরকায় ঘটে যাওয়া ভয়াবহ ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের জন্য আমি গভীরভাবে সমব্যথী।

হারুকি মুরাকামি
১৬ জুন, ২০১১
বার্সেলোনা

/জেডএস/

সম্পর্কিত

বাংলা ট্রিবিউন শারদীয় সংখ্যা ২০২১

বাংলা ট্রিবিউন শারদীয় সংখ্যা ২০২১

চাঁদ বণিকের একার যুদ্ধ

চাঁদ বণিকের একার যুদ্ধ

ইমান একটি সাদা জবা ফুল

ইমান একটি সাদা জবা ফুল

স্যুরিশের চারপাশে

স্যুরিশের চারপাশে

প্রবন্ধ

চাঁদ বণিকের একার যুদ্ধ

আপডেট : ১৪ অক্টোবর ২০২১, ১৪:০০

‘চাঁদ বণিকের পালা’ বহুরূপী  পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয় ‘বটুক’ ছদ্মনামে। নাটকের তিনটি পর্ব প্রকাশের সময়কাল ১৯৬৫, ’৬৬ ও ’৭৪ সাল। নাটকটি গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয় ১৯৭৮ সালে।

সন-তারিখ উল্লেখ করার কারণ এজন্য যে, ‘মনসামঙ্গল’-এর আখ্যানটিকে শম্ভু মিত্র হুবহু ব্যবহার না করে বিনির্মাণ করেছেন লৌকিক জীবনের প্রেক্ষিতে। এখানে শিব ও মনসা ব্যক্তি মানুষ বা রাজনৈতিক গোষ্ঠীরই প্রতীক। এখানে গ্রিক মিথ বা নাটকের মতো সবকিছু পূর্বনির্ধারিত নয়, মানুষ কেবল ভবিতব্যে অভিনয় করে যাচ্ছে না; বরং শম্ভুর মানুষ ক্ষমতাদ্বন্দ্বের বলি। তাই অলৌকিকভাবে কারও মুক্তি মেলে না, কিংবা পতিতও হয় না।

লৌকিক জীবনে চাঁদের আদর্শিক দৃঢ়তা, সংগ্রাম ও অপরদিকে চম্পকনগরে চলমান মাৎস্যনায় আমাদের মনে করিয়ে দেয় নকশালবাড়ি আন্দোলন এবং তা দমনপীড়নে ক্ষমতাসীনদের তৎপরতা। চম্পকনগর হয়ে ওঠে গোটা ভারতবর্ষ।

নাট্যকার শম্ভু মিত্র কোথাও নাটকের সময়-কাল উল্লেখ না করলেও একটি চরিত্রের মুখ দিয়ে তিনি প্রকাশ করেন, ‘...আমাদের আধুনিক শাস্ত্রমতে সমুদ্দুরে যাত্রা করা পাপ। তা আমরা তো আধুনিক? সুতরাং অধুনা যা সকলেই মানে সেইটারে উল্লঙ্ঘন করা অতীব গর্হিত–’ এরা সদলবলে আসে লখিন্দরের জন্য নির্মিত বাণিজ্যতরী ছিদ্র করে তার সলিলসমাধী রচনা করতে।

নাটকে শিবভক্ত চাঁদ বণিক জ্ঞান, সংগ্রাম ও সামাজিক সাম্য প্রতিষ্ঠার প্রতীক, অপরদিকে চম্পকনগরের ক্ষমতাসীনরা অন্ধকারবাসী-সাপের পূজারি তথা মাৎস্যনায়ের প্রতীক। আশ্চর্যের বিষয় ‘চাঁদ বণিকের পালা’ কখনও মঞ্চস্থ হয়নি, কেউ কেউ বলেন হতে দেয়া হয়নি নীরব সেন্সরশিপের কারণে।

নাটকের শুরুতে আমরা দেখি চাঁদের স্ত্রী সনকা মনসার গোপন পূজারি। তবুও তাদের ছয়পুত্র সাপের ছোবলে নিহত হয়। তিনি মনসার কাছে সন্তান ও স্বামীর নিরাপত্তা চান। কিন্তু শিবভক্ত চাঁদ স্ত্রীর এই বিশ্বাসঘাতকতায় ভীষণ ক্ষুব্ধ। এসময় তিনি তার দলবল নিয়ে সমুদ্রযাত্রা করে রাজ-আজ্ঞা অমান্য করে। তখন লখিন্দর সনকার গর্ভে।

দীর্ঘদিন পর চাঁদ সমুদ্র-ডুবিতে সবাইকে হারিয়ে চম্পকনগরে ফিরে আসেন ভিখারির বেশে, ছদ্মবেশি ওডেসিয়াসের মতো। তবে লক্ষ্য ভিন্ন এবং সত্যি সত্যি যৌবন হারানো এক বৃদ্ধ তিনি। স্ত্রীর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করেন, এমনকি স্ত্রীকে নিয়ে চম্পকনগরী ছেড়ে পালিয়ে যেতে চান; কিন্তু স্ত্রী ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন তার জীবনের অসফলতার জন্য। এদিকে চাঁদকে দলে ভেড়ানোর জন্য ক্ষমতাসীন ও ক্ষমতালোভী দুই পক্ষ টানাটানি করে। তারা আবার সমুদ্রযাত্রার ব্যবস্থা করে দেবে এই টোপ দিয়ে তাদের দলে ভেড়ানো ও প্রকাশ্যে মনসার পূজা দিতে বলেন। কিন্তু চাঁদ মৌখিকভাবে হ্যাঁ-না বললেও নিজের আদর্শের প্রতি অনড়। একই সময় লখিন্দর এসেও তার পিতাকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য ও অপমানে আশাহীন করে দেয়। যে কিনা বেণীমাধব ‘জারজ’ সন্তান গালি খেয়ে প্রতিবাদ করতে গিয়ে রক্তাক্ত হয়ে পিতার সামনে দাঁড়ায়। তখন সমাজে চলে হত্যা ও ক্ষমতাদ্বন্দ্বের লড়াই। চাঁদ হয়ে পড়ে মদ্যপ।

তবও চাঁদ আশা ছাড়ে না, ভবিষ্যতের ভেতর স্বপ্ন দেখে। লখিন্দর সমুদ্রযাত্রায় যেতে রাজি হয়। তার জন্য চাঁদের সমস্ত সম্পদ খরচ করে বানানো হয় বাণিজ্যতরী। বাণিজ্যযাত্রার আগে তিনি বেহুলার সঙ্গে তার বিয়ে দেন। সনকা ভবিতব্য জেনে লোহার বাসর নির্মাণ করেন এবং ওঝাদের হাজির রাখেন। কিন্তু ক্ষমতাসীন পক্ষ বাসর বানানো মিস্ত্রিকে ভয় দেখিয়ে বাধ্য করে তাতে ছিদ্র রাখতে। সেই ছিদ্রে সাপ ছেড়ে দিলে লখিন্দর সাপের ছোবলে নিহত হন। রীতি মাফিক কলাগাছের ভেলায় স্বামীকে নিয়ে বেহুলা ভাসানযাত্রা শুরু করে। মনসার বেহুলা স্বর্গে গিয়ে বেদতাদের অশ্লীল নাচ দেখায়, আর শম্ভুর বেহুলা জগতের কামুক পুরুষদের।

একদিন বেহুলা চাঁদের কাছে আসে পুত্রের জীবন ফিরে পাবার সংবাদ নিয়ে এবং একই সঙ্গে মনসার পুজার শর্ত নিয়ে। ততদিনে চাঁদ ভিখারি ও ক্ষমতাসীন বেণীমাধবের বাড়িতে আশ্রিত। সনকা পাগল হয়ে রাস্তাবাসী। বেহুলার শর্তে চাঁদ রাজি হয় সন্তানকে ফিরে পেতে, কিন্তু শিবপূজার বেলপাতা দিয়েই তিনি মনসার পূজা করেন। প্রকারন্তরে তিনি শিবেরই পূজা করেন। ততক্ষণে বেহুো-লখিন্দর তাদের জীবনের অসফলতা ও পরস্পরের বিচ্ছন্ন হয়ে যাবার আশঙ্কায় বিষপাণ করে আত্মহত্যা করেন।  

মনসামঙ্গলে দেখি চাঁদ বণিক মনসার পায়ে নতজানু, অনুতপ্ত। মনসা চাঁদকে ফিরিয়ে দেয় ছয়পুত্র ও সপ্তডিঙা। একইসঙ্গে মঙ্গলকাব্যের রীতি অনুযায়ী প্রতিষ্ঠা পায় দৈব অনুগ্রহ বা তার মহিমা।

শম্ভু মিত্র মনসামঙ্গলের মতো মিলনাত্মক পথে পা বাড়াননি। তিনি পুত্রবধূ বেহুলার কথায় মনসাকে পূজা দিলেও মনসা-পূজার উপাচার গ্রহণ না করে বিশ্বপত্র দিয়েই পূজা করেছেন। কৌশলগতভাবে তিনি নমনীয় হলেও আদর্শচ্যূত হননি। কিন্তু তার অবিচল আদর্শবোধ তাকে আপতদৃষ্টিতে কিছুই দেয়নি। না ফিরে পেয়েছে মৃত সন্তানদের, না সপ্তডিঙ্গা।  

আদর্শ তার জীবনে ক্রমাগত ব্যর্থতাই বয়ে এনেছে। স্ত্রী সহধর্মীনী হয়ে বিশ্বাসী থাকেননি, তার কাছে তিনি ব্যর্থ স্বামী। না মানসিক, না শারীরিক কোনো অনুভবের সঙ্গেই তিনি নিজেকে চাঁদের সঙ্গে জড়াতে পারেননি। একটি ব্যর্থ দাম্পত্যের অবশিষ্ট লখিন্দর, সেই পিতাকে অপমান করতে ছাড়ে না।    

লখিন্দর বলে, ‘মানুষ কি শুধু কতগুল্যা প্রতিক্রিয়া? শুধু প্রতিক্রিয়ার সমষ্টি?’ বা ‘রক্ত দেও, মুখ বুজে কাজ করে যাও, কথা কয়ো নাকো।’

চম্পকনগরীর বৃদ্ধরা আসে তাদের সন্তানদের হদিস পেতে। সমুদ্রযাত্রায় যদি সবাই নিহত হয় তবে, চাঁদ বণিক কিভাবে বেঁচে ফেরে? এই প্রশ্ন সবার। তবে কি চাঁদ তার সহ-নবিকদের হত্যা করে সমস্ত সম্পদ হাতিয়ে নিয়েছে? বিশ্বাস নেই, আস্থা নেই চম্পকনগরে। লখিন্দরকে কেন্দ্র করে চাঁদের ভবিষ্যতের ভেতরও বীজ বপন করা হল না।

একজন ব্যর্থ, রিক্ত, মদ্যপ চাঁদ কেবল শূন্যের ভেতর উচ্চারণ করে, ‘শিবাই শিবাই।’ কিন্তু শিব তাকে রক্ষা করে না। মনসা তথা অন্ধকার শক্তিরই পরাক্রম দেখি সমাজে।

ক্ষমতাসীন বল্লভাচার্য ও বেণীমাধবের দল, বিপরীতদিকে ভৈরব করালীদের দল– উভয়েই চম্পকের ক্ষমতা ভোগের প্রতিযোগি রাজনৈতিক শক্তি।  তার নগর ও জনতার উন্নতি ভাবে না, রক্ষা করতে চায় না। এই স্বার্থপরতার রাজনীতির ঘূর্ণিতে চাঁদ একা। তার লড়াই করারও শক্তি নেই। আশাবাদ ছাড়া যার কিচ্ছু নেই।

কিন্তু চাঁদ ‘শুধু বেঁচে থাকা বলে কোনো কথা নাইরে জীবনে’ তথা জীবনের অন্য আদিকল্পের সন্ধান সে করতে চেয়েছিল। সে কেবল কিছু ‘চেয়েছিল’র প্রতীক। যার বিপরীতে মনসার অন্ধকার।

‘চাঁদ বণিকের পালা’ মঞ্চস্থ করতে অনেক চ্যলেঞ্জের মধ্যে রয়েছে এর ভাষা। লেখক নিজেই বলেছেন, ‘বইটি পড়তে গিয়ে কোনো পাঠক কিছু শব্দের বর্ণবিন্যাসে বিভ্রান্ত হতে পারেন। অভ্যাসের বসে চলিত লিপির সাহায্যে আমরা উচ্চারণটা অনুমান করে নেই। কিন্তু বিপদ হয় অচলিত ভাষার ক্ষেত্রে। তাই অসমাপিকা ক্রিয়াপদের মধ্যে যেখানে উচ্চারণ লিখিত স্বরবর্ণের ঠিক– য় নয়, আবার– ই-ও নয়, মাঝামাঝি যেমন, –করে– কইরে বা কোয়রে নয়, সেই স্বল্পস্বর বোঝাতে শব্দের অন্তে ‘্য’ [য ফলা] ব্যবহার করা হয়েছে।’

নাট্যকারের এই কৃত্রিম ভাষা মনসামঙ্গল থেকে ‘চাঁদ বণিকের পালা’কে যেমন আলাদা করেছে, তেমনি আধুনিককালের একটি অনির্দিষ্ট কালপর্বের সঙ্গে এই ভাষা সখ্য গড়ে তোলে। এই ভাষা না-প্রমিত, না-আঞ্চলিক। এই ভাষা হয়ে উঠেছে ‘চাঁদ বণিকের পালা’র ভাষা।

/জেডএস/

সম্পর্কিত

বাংলা ট্রিবিউন শারদীয় সংখ্যা ২০২১

বাংলা ট্রিবিউন শারদীয় সংখ্যা ২০২১

‘তোমরা শান্তিতে ঘুমাও—এই ভুল আমাদের আর কখনো হবে না’ : হারুকি মুরাকামি

‘তোমরা শান্তিতে ঘুমাও—এই ভুল আমাদের আর কখনো হবে না’ : হারুকি মুরাকামি

ইমান একটি সাদা জবা ফুল

ইমান একটি সাদা জবা ফুল

স্যুরিশের চারপাশে

স্যুরিশের চারপাশে

ছোটগল্প

ইমান একটি সাদা জবা ফুল

আপডেট : ১৪ অক্টোবর ২০২১, ১১:০১

ঢাকায় আসার পরও আরফাতুল তার নামের প্রথমে থাকা মোহাম্মদ শব্দটির ব্যবহার করত। তখন তার দাদির কাছে শেখা কাঁচাসুপারির পানও খেত মাঝে মাঝে। কিন্তু শীঘ্রই মফস্বলের গন্ধ মুছে ফেলার জন্য পান খাওয়া ছেড়ে দিলো, আর কাঁচাপাতির রংচা ধরল। আর তাতেও যখন নাটকের মহড়া দলে তার অবস্থান পোক্ত হলো না তখন সে রেড ওয়াইন যে মেয়েলি পানীয় তা বলা শুরু করল। বিষয়টি টনিকের মতো কাজ করল এবং রুদ্র আরাফাত কিছু দিনের মধ্যে বুঝতে পারল রেড ওয়াইনের রং যে জাম রঙ না সিঁদুর রঙের মতো সে সম্পর্কে দলের কারোই ধারণা নাই। আরাফাতুলেরও সে সম্পর্কে ধারণা কম। সে নিজেও এই জিনিস একবারই খেয়েছে। কিন্তু এ বিষয়ে তার কথাবার্তা এমন পর্যায়ে তুলে রাখল যে, শুধু নিজের দল না, ক্লাসের বন্ধুরা না, শিল্পসাহিত্যের লোকজনও তাকে সমীহ করতে শুরু করেছিল। বরং ইতালি ও স্প্যাইনের ভাইন ইয়ার্ডগুলা পাকা আঙুরে কেমন মোঁ মোঁ করে, সেখানে সেই আঙুর ছিঁড়তে থাকা সুন্দরীদের নিপল, আর তাদের সঙ্গে লতানো গাছের ছায়ায় খুনশুটি শুরুর সঙ্গে শুয়েপড়ার আনন্দের গল্পগুলো এমনভাবে বলতে শুরু করল, কেউ অন্তত এটা ভাবল না যে, আরাফাতুল মূলত একবারই রেড ওয়াইন খেয়েছিল।
আবার বহুবছর পর, ফ্লাইটের পুরো সময় রেড ওয়াইন খেয়ে যখন ঝিমুচ্ছিল, তখন ঢাকাগামী মোহাম্মদ নামের যে সর্বশেষ যাত্রীর মাইকে খোঁজ চলছে, তখন ঝিমুনির মধ্যেও আরফাতুল বুঝতে পারল, এই মোহাম্মদ সে নিজে ছাড়া কেউ নয়। পাসপোর্টে এখনও নামটি রয়ে গেছে। রোম থেকে ইস্তাম্বুলের ফ্লাইট ভরে যে রেড ওয়াইন নিয়েছে, তাতে বিমানবালাদের কোনো প্ররোচনা নেই। আরফাতুলের কাছে এরা সবাই ভেনাসের মতোই সুন্দরী, হাসি দিয়ে রেড ওয়াইন ঢেলে দেয়, তবু কেন জানি এরা আনন্দ মাটি করতে একদম পেশাদার। বিষণ্ণতার আরো কারণ আছে। আরফাতুল ভেবেছিল ইতালির আঙুর খেতগুলোতে প্রচুর সুন্দরীদের দেখা যাবে এবং এরা প্রচুর উদার হবে, তাদের কারও সঙ্গে হয়তো ভাব হয়ে যাবে এবং পুরনো একটা বোতল খুলতে চাইতে পারে, আর সন্ধ্যা হয়ে বলতেও পারে, চল নাচি। কনফারেন্সের আয়োজকেরা এমন একটা ট্যুর করেওছিল সবচেয়ে বড় ভাইন ইয়ার্ডে। আসলে ট্যুর না, ঘুরতে গিয়েও বক্তৃতা। বাংলাদেশের পুরনো ঐতিহ্য কনফারেন্সের সব কথাই হচ্ছিল ফরাসি বা ইতালীয়তে। তবে আরফাতুল এ বিষয় যতটুকুই বুঝুক মনসামঙ্গলের পুথি আর আদিনা মসজিদের ছবি সে ঠিকই চিনেছিল। ইতালির এই আঙুরখেতে মনসামঙ্গলের আলোচনার ছবি অলরেডি ফেইসবুকে আরফাতুল দিয়ে দিয়েছে। যদিও তার নিজের বক্তৃতার ছবি দেওয়া যায়নি, এরা ছবি তুলতে অতটা উৎসাহী নয়। আরফাতুল পটের গানের ওপর বক্তৃতার অর্ধেক ছিল মূলত দেখে পড়া, বাকিটা তার পরিচিত প্রফেসর ইটালীয়তে বলে দিয়েছিলেন। যাকে ঢাকায় আরফাতুল গাইড করে থাকে। নিজের বক্তৃতার ছবি ফেইসবুকে দিতে না পারার জন্য মনটা খচখচ করছিল। তবে এর চেয়েও বেশি মন খারাপ কনফারেন্সে তার বয়সী কোনো মেয়ে নাই। এছাড়াও এমন ঝকঝকে রোদের মধ্যে জলরঙের মতো সবুজ আঙুর বাগানে একটি মেয়েও আঙুর তুলছে না। কয়েকটি ট্রাকের মতো মেশিন আঙুর তোলার সব কাজ করে দিচ্ছে। তবে সেখানে ডিনার হয়েছিল রাজকীয়। তখন স্থানীয় মেয়র এসেছিল। তার কন্যারা সত্যিই রাজকন্যার মতোই। খাবারও ছিল একেবারে বত্রিশ পদের। বাতি জ্বলছিল তেত্রিশ রকম । আর এমন মিউজিক বাজছিল যেন শত বছর এমন অর্কেস্ট্রায় জীবন পার করে দেওয়া যাবে। এমন ভালো খারাপের মধ্যে আয়োজকদের একজন আরফাতুলের সঙ্গে গল্প জুড়ে দেয়। বিস্ময়কর ভাবে বাংলাতেই কথা বলতে থাকে। বাংলাদেশের জাদুঘরের অবস্থা জিজ্ঞেস করেন তিনি। তিনি জানান মহরম নিয়ে নব্বয়ের দশকে পুরান ঢাকায় কাজ করেছিলেন। মাস ছয়েকের মতো ছিলেন। নেত্রকোনায় গিয়েছিলেন জারি গান নিয়ে কাজ করতে। ভদ্রলোকের মুখ থেকে হুইশকির গন্ধ আসছিল। এই গন্ধ ক্যারুর হুইশকি নেওয়া অ্যারামের মাতালদের মতো নয়। মেয়েরা যে বেনসন খাওয়া ছেলেদের ভালোবাসে তার কারণ বেনসন ক্রয়ের পৌরুষ নয়, আমিষ পচা গন্ধ ঢাকতে পারার ক্ষমতা। ভদ্রলোকের মুখের গন্ধটা আরও অমৃত লাগলো যখন তিনি বলে বসলেন আরফাতুল চাইলে তার সঙ্গে একটা গ্রন্থ সম্পাদনায় সাহায্য করতে পারে, যেটা ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরুচ্ছে। সাহায্য মানে, নেত্রকোনায় এক কাজী বাড়িতে একটা দেড় ইঞ্চির কোরান শরিফ দেখে এসেছিলেন তিনি। সেটা দিয়ে বইয়ের একটা চ্যাপ্টার হবে। সেটা সংগ্রহ করে দিতে পারলে ভালো, না হলে অন্তত ডিজিটাল কপি দিতে হবে। কোরান শরিফটা কিন্তু অন্তুত সাতশ বছরের পুরনো। কিন্তু কাজীরা জানো কোরান শরিফটা একশ বছর আগের, আদতে এর লিপি বলছে এটা সাতশ বছর আগের রীতি। ফলে অমূল্য কাজ হবে। এটা কোনো ব্যাপারই না। অধ্যাপকের সঙ্গে তার ছবি ফেইসবুকে দিয়ে দিয়েছে। ওখানে এ পর্যন্ত ছিয়ানব্বইটা কমেন্টস হয়ে গ্যাছে, অনেকে তাকে এযুগের ডক্টর মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ বলছেন, তবে তার বন্ধুদের কেউ এখনও লাইকও দিলো না। আরফাতুলের সেদিকে মন নেই। নেত্রকোনার ওইদিকে বাড়ি পিম্পির। পিম্পি তার সঙ্গে থিয়েটারে একটা কোর্স করেছিল। ওর কাছ থেকে খবর নেওয়া যাবে কাজীবাড়ির। গ্লাসের রেড ওয়াইনগুলা টকটকে লাল হয়ে উঠছে। আরফাতুলের পুরো রাতটা রঙিন মনে হলো।
টার্কিশ এয়ারের ফিরতি ফ্লাইট অনেক লম্বা সময় লাগাচ্ছে। প্রচণ্ড বৃষ্টির কারণে বিমান ঢাকায় নামতে দেরি করল। সকাল স ছয়টা বেজে গেল বের হতে হতে। এই এয়ারপোর্টাকে যারা দোজখের দ্বার বলে, তারা আসলে দেশকে ভালোবাসে না। আরফাতুল একটা সিএনজি নিয়ে নিল পিম্পির বাড়ির দিকে। দামদর বিষয় না। পিম্পির হেল্প ছাড়া নেত্রকোনা যাওয়া যাবে না। এর জন্য ইস্তাম্বুলের চকোলেটটা আলাদা ব্যাগে রাখল। আর চাচাতো বোনের জন্য ছাড়ে কেনা পারফিউমটাও পিম্পিকে দিয়ে দিলে ভালো। ওকে সাথে নিয়ে যাওয়া যাবে। ইন ফ্যাক্ট, ওর হেল্প ছাড়া এই কোরান উদ্ধার সম্ভব না।
 
দুই
ঠিকানামতো কাজীবাড়িতে একটা মসজিদ আছে। মসজিদের পুবপাশেই ইবাদাত কাজীর বাড়ি। তবে পিম্পিদের গ্রামের বাড়ি থেকে এই গ্রামে যাওয়াটা সহজ মনে হচ্ছে না। বন্যায় রাস্তা ভেঙে গেছে। সকাল সাতটায় চারটায় একটা ডিঙি নৌকা ভাড়া করে দুপুর এগারোটায় মসজিদ ঘাটে পৌঁছুনো গেলে। এই গ্রামে কারেন্ট নাই, মোবাইলের চার্জও শেষ। শব্দহীন পানিবন্দি একটা গ্রাম। মাছের লেজের বাড়ি দেওয়ার শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দ নাই। বাড়িতে কারোও সাড়াশব্দ নেই। বাড়িতে ঢোকার সময় বড় একটা গরুর গোয়াল। তবে মূল ঘরটি দেখে মনে হবে এরা গিরস্থ নয়। টিনের ঘরে বারান্দামতো আছে, বারান্দায় এটা টিয়া পাখির খাঁচা। ঘরের পাশে সামনে কয়েকটি সাদা জবার গাছ। অনেক দিনের বনেদি পরিবার বোঝা যাচ্ছে, আরফাতুল পিম্পিকে বোঝানোর চেষ্টা করছে। যিনি বেরিয়ে এলেন তিনিও আরফাতুলের বয়সী। জানা গেল, ইবাদাত কাজী তিরিশ বছর আগে মারা গিয়েছেন, তিনি তার নাতি নাম মাহবুব কাজী। আরফাতুলের হাতের ক্যামেরা, পিম্পির হাতে একট খাতা। সাংবাদিক বা গবেষক টাইপ সাজ না দিলে গ্রামে তেমন গুরুত্ব পাওয়া যায় না। পুথি নিয়ে আলাপ করতে তো নয়ই। আরফাতুলের এই পথটি অনেক দিন চেনা। মাহবুব কাজী দুটো কাঠের চেয়ার নিয়ে এলেন, ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন ষাটোর্ধ্ব একজন। তিনি মাহাবুব কাজীর পিতা। বোঝা গেল, এই কোরান শরিফের খোঁজে অনেকেই আসেন, এরা এমন আগন্তুকে অভ্যস্ত। পানিবন্দি বাড়িতে আগন্তুক পেয়ে এরা খুশিই। চাও চলে এল, তবে বিরক্তিকর টাইপের মিষ্টি। এরা মিশুক। কাজ হবে মনে হলো। মাহবুব কাজীর বাবা হাসি-খুশি। কোরান শরিফের গল্পটি তিনি তার বাবার হজযাত্রার গল্প দিয়ে শুরু নেত্রকোনা থেকে কীভাবে গোয়ালন্দ, সেখান থেকে স্টিমারে কলকাতা। কলকাতা থেকে বোম্বে, বোম্বে থেকে করাচি। করাচি থেকে সফিনা আরব জাহাজে করে জেদ্দা। সফিনা আরবের বিশালত্ব বলতে গিয়ে কাজী সাহেব যতটা গৌরবান্বিত হচ্ছিলেন। জেদ্দা যাওয়ার পর যখন উটের কাফেলা পনেরো দিন পর আসবে সেই অপেক্ষার বিষণ্ণতায় গল্পের আসরও চুপ হয়ে গেল। ফিরতি পথে কী করে হায়দারাবাদের নিজাম নিজ হাতে দেড় ইঞ্চি অমূল্য সম্পদ ইবাদাত কাজীকেই দিয়েছিলেন সেটা বিরাট অলৌকিক বিষয়। এই লম্বা গল্প শুনতে শুতে বিকেল হয়ে গেল। দুপুরে যে টেংরা পুঁটি ঝোলের যে স্বাদ তা কাজীর গল্পের সকল গৌরবকে ছাড়িয়ে যাওয়ার মতো। কিন্তু কোরানের ছবি তোলার কথা বলতেই আসর শেষ হয়ে গেল, সাফ জানিয়ে দিলেন। এ জিনিস দেখানোর নয়। অনেক অনুরোধ করার পরও তারা জানাল, পারিবারিকভাবে এটা ওয়াদা করা আছে। ফেরার সময় পিম্পি একটা সাদা জবা নিয়ে ফিরছে, মাহবুব কাজী তাকে দিয়েছে। পিম্পির কোনো বিকার নেই, সে এমন আচরণে অভ্যস্ত। মাস দুয়েক লেগেছিল আরফাতুলের এই ট্রমা ভাঙতে। এত কাছে গিয়েও কিছু হলো না, প্যারিস থেকে সেই অধ্যাপক আরফাতুলকে মেইল করেই যাচ্ছে। সেও আরও কয়েকদিন সময় চেয়েছে। লেগে থাকতে হবে, এটা আরফাতুল জানে।
 
তিন
গতকাল ভোরে আরফাতুল আমার বাসায় হাউমাউ কান্না, পুলিশ তাকে খুঁজতে পারে। কাউকে বলা যাবে না শর্তে আরফাতুল ভাঙা ভাঙা ঘটনাগুলো জানাল। মাহবুব কাজী গত সপ্তাহে লুকিয়ে ছবি পাঠিয়েছিল পিম্পিকে। আরফাতুল সেটা মেইলে ফরোয়ার্ড করে দেয় প্যারিসের সেই অধ্যাপককে। কিন্তু তিনি নাকি পেয়েছেন কোরানের সাদা পাতার ছবি। আর মাহবুব কাজীর বাবাও পড়তে গিয়ে দেখেন কোরান থেকে নাকি লিপি উধাও। কামেরার ফ্ল্যাশ থেকে এমনটা ঘটেছে কিনা পিম্পিও আমাকে ফোন করে যাচ্ছে। শুধু তাই না একসাথে সব জবাগাছগুলোও নাকি মরে গিয়েছে। আমি এর একটা বৈজ্ঞানিক ভিত্তি দেওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছি।

/জেডএস/

সম্পর্কিত

বাংলা ট্রিবিউন শারদীয় সংখ্যা ২০২১

বাংলা ট্রিবিউন শারদীয় সংখ্যা ২০২১

‘তোমরা শান্তিতে ঘুমাও—এই ভুল আমাদের আর কখনো হবে না’ : হারুকি মুরাকামি

‘তোমরা শান্তিতে ঘুমাও—এই ভুল আমাদের আর কখনো হবে না’ : হারুকি মুরাকামি

চাঁদ বণিকের একার যুদ্ধ

চাঁদ বণিকের একার যুদ্ধ

স্যুরিশের চারপাশে

স্যুরিশের চারপাশে

ভ্রমণ

স্যুরিশের চারপাশে

আপডেট : ১৩ অক্টোবর ২০২১, ১৮:১৫

ভাবছিলাম গরম শেষ হয়ে যাবে, কিন্তু শেষ হলো না। জার্মানির একদম উত্তরের শ্লেসভিগ শহর থেকে ২০২১-এর সেপ্টেম্বরে চলে এলাম একদম দক্ষিণে। তুলনামূলক গরম বেশি এখানে, সমুদ্র কাছে নেই বলে শ্লেসভিগের মতো সারাক্ষণ উত্তাল বাতাস নেই, পাহাড়ঘেরা অঞ্চল। রাজ্যের নামে বাডেন-ভ্যুর্টেমব্যার্গ। শহরের নাম লার/শভার্সভাল্ড। শভার্সভাল্ড শব্দের ইংরেজি ব্ল্যাক ফরেস্ট, বাংলায় দাঁড়ায় কালো বন। নামই আবিষ্কারের নেশা জাগায়। ঘরের জানালা খুললেই দেখি শভার্সভাল্ডের পর্বত শ্রেণি। কিন্তু কালো বন কেন? বন আরও দেখেছি জার্মানিতে। তাদের নাম কেন কালো বন নয়। এখানে আসার পরবর্তী রবিবার হাইকিং জুতো পরে পানি আর শুকনো খাবার নিয়ে বের হই। তুলনামূলক গরম—রোদ আড়াল হলে কিছুটা শীতল বাতাস গায়ে লাগে। শরৎ বইছে সারাগায়ে যেন। আলোছায়া করে করে দু ঘণ্টা হেঁটেও জানালা দিয়ে শভার্সভাল্ডের যে টিলা দেখা যায় তার চূড়ায় পৌঁছাতে পারি না। আমি একা নই, অনেকের সঙ্গে হাঁটতে গিয়ে দেখা। অপরিচিত, কিন্তু হাসলে, উত্তরে হাসি পাওয়া যায়, বয়সে অধিকাংশই শেষের দিকে। চোখ মেলে আশেপাশে চেয়ে দেখি ঝলমলে রোদের দিনেও বনের ভেতরে দুর্ভেদ্য অন্ধকার। পাইন (জার্মানে : কীফের্ন), ওক (আইশে), স্প্রুস (ফিচটেন), বীচ (বুখেন) গাছে ভরা বনের ভেতরে সূর্যের আলো এক প্রকার প্রবেশ করে না বললেই চলে। গাছগুলোর মধ্যে পাইন এবং স্প্রুসের পরিমাণ সবথেকে বেশি (এরাই বড়দিনের সময় ক্রিসমাস ট্রি হিসেবে ব্যবহৃত হয়)। স্প্রুস এবং পাইন চিরসবুজ গাছ, জানা গেলো এই দুই গাছের পরিমাণ শভার্সভাল্ডে প্রায় আশি শতাংশের বেশি। চিরসবুজ হওয়ায় শীতকালেও বনকে গাড় সবুজ দেখায়, তাদের বিস্তৃতির জন্য সারা বছরই সূর্যের আলো কম ঢোকে এই বনে, সে কারণেই নাম কালো বন। ব্ল্যাক ফরেস্ট-এর রেঞ্জ বিশাল, এই ঢেউ ধরেই পূর্ব দক্ষিণ জুড়ে বিস্তৃত হয়েছে সুইজারল্যান্ডের আল্পস পর্বতমালা।

এখান থেকে সুইজারল্যান্ড ঘণ্টা দুয়েকের দূরত্ব। জার্মানির ফ্রেইবুর্গ পার হয়ে বাসেলে এলেই সুইজারল্যান্ডে ঢুকে যাওয়া যায়। বাসেলের বিমানবন্দর আমার আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলো। দেখার অপেক্ষায় ছিলাম অনেকদিন। কারণ বলি, বিমানবন্দরটি একই সঙ্গে তিন দেশের সীমানায় অবস্থিত—সুইজারল্যান্ড, জার্মানি এবং ফ্রান্স। ইংরেজিতে নাম ‘ইউরোএয়ারপোর্ট বাসেল-মুলহাউজ-ফ্রেইবুর্গ’। মুলহাউজ ফ্রান্সের সীমানার শেষ শহর। বিমানবন্দরের রানওয়ে ফ্রান্সে কিন্তু ইমিগ্রেশন তিন দেশের জন্য তিনটে। জেনেভায় দেখেছি একই বিমানবন্দর ফ্রান্স এবং সুইজারল্যান্ড ব্যবহার করে। আমেরিকা-কানাডার সিমান্তেও এ রকম বিমানবন্দর আছে, যেগুলো একই সঙ্গে দুই দেশ ব্যবহার করে, কিন্তু তিন দেশের এক বিমানবন্দর জানামতে দুনিয়ার আর কোথাও নেই। 

সেপ্টেম্বরের শেষের দিকের শনিবার। আগে থেকে জুরিখ যাওয়ার পরিকল্পনা করা ছিলো। স্থানীয়রা তাকে বলে স্যুরিশ, বইয়ের জার্মানে উচ্চারণ তাইই, তাদের মুখে দেশের নাম শুভাইৎস। সুইজারল্যান্ডের জাতীয় ভাষার মর্যাদা একই সঙ্গে চারটে ভাষাকে দেওয়া হয়েছে। জার্মান বা ডয়েচ, ফ্রেন্স, ইতালিয়ান এবং রোমানিশ বা রেটোরোমানিশ। তবে তুলনায় জার্মানের চলন সবথেকে বেশি, ব্যবহারে ফ্রেন্স জার্মানের ধারে কাছে নেই, কিছু অংশে ইতায়ালিয়ান আর খুব স্বল্প লোক কথা বলে রোমানিশে। জুরিখ বা স্যুরিশ সুইজারল্যান্ডের ২৬ রাজ্যের একটি। রাজ্য ও শহরের নাম একই। 

আমরা যাত্রা করি বেশ ভোরে। আমরা বলতে আমি আর আমার জার্মান বন্ধু। তার গাড়ি আমাদের নিয়ে যায় স্যুরিশের দিকে। জার্মানির সীমানা পার হলেই সবকিছু আলাদা হয়ে ধরা দেয়, হুট করে সামনের গাড়িগুলোর নেমপ্লেট বদলে গেলো। ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোর গাড়ির নামপ্লেটের আদল একই রকম, শুধু নামগুলো আলাদা, কিন্তু সুইচ গাড়ির নেমপ্লেট সম্পূর্ণ আলাদা। দূরে সরে যেতে দেখি শভার্সভাল্ড পর্বতশ্রেণি। আরও দূরে আবছা আবছা আল্পস পর্বতমালা চোখে পড়ে। খেয়াল করলাম আমরা ক্রমশ উপরে উঠছি। চলতে চলতে এক সময় গাড়ির চারপাশ কুয়াশায় আচ্ছন্ন, আবছা আবছা সবকিছু দেখা যায়। বন্ধুকে বলি, এমন ঝলমলে রোদ্দুর দিনে হুট করে কুয়াশা? সে বলে, খেয়াল করে দূরে দেখো, কোনো গাছপালা, কিংবা পাহাড় চোখে পড়ে?— না সূচক মাথা নাড়ি।—আমরা আল্পস রেঞ্জের পাহাড়শ্রেণির ওপরে, এজন্য আশে পাশে উঁচু কিছু চোখে পড়ছে না। আর এগুলো কুয়াশা নয়, মেঘ। আমি বারবার মাথা নাড়ি। বন্ধু ইংরেজি পারে বাতাসের মতো, কিন্তু আমার সঙ্গে আজকাল ফ্রাঙ্কোনিয়ান জার্মানে কথা বলে বেশি—আমি যেন জার্মানে ভালো করি সেসব নিয়ে তার চেষ্টার অন্ত নেই। ফ্রাঙ্কোনিয়া রোমান সময়কালে ডিমিশিয়ান রাজার একটি রাজ্য ছিলো। এখন বাভারিয়ার অন্তর্ভুক্ত। তা সত্ত্বেও ন্যুর্নব্যার্গ বা ন্যুরেমব্যার্গে গেলে তাদের আলাদা খাবার, আলাদা উচ্চারণ চোখে পড়ে। যা হোক সেসব নিয়ে অন্য কোথাও লেখা যাবে। জুরিখের দিকে যাই।

আমাদের প্রথম লক্ষ্য ছিলো জুরিখ শহরের কেন্দ্রে যাওয়া। জুরিখ-হ্রদকেই জুরিখের কেন্দ্র বলা চলে, হ্রদের কাছেই জুরিখ কেন্দ্রীয় গণগ্রান্থাগার, সেখানেই আমাদের সুইচ বন্ধু মিরকার সঙ্গে দেখা হওয়ার কথা। কোনো শহরে গেলে সেই শহরে জন্মেছে বা বহু বছর ধরে বাস করে এমন কারো সঙ্গ পেলে আর কিছু চাওয়ার থাকে না। তখন মনের আনন্দে শহর হাতের কাছে চলে আসে। আসার পর সবথেকে বড়ো চ্যালেঞ্জ ছিলো গাড়ি পার্কিং করা। আর তারপরের চ্যালেঞ্জ ছিলো সবকিছুকে ঠিক তার মতো করেই খুঁজে পাওয়া। সঙ্গে খোদ শহরের বাসিন্দা থাকায় সবকিছু পানির মতো সহজ হয়ে গেলো। মজার ব্যাপার হলো জুরিখেও ঢাকার শাহবাগ-কাঁটাবন, বা কলকাতার কলেজ স্ট্রিটের মতো চিন্তক-আড্ডাবাজদের আড্ডা দেওয়ার জায়গা আছে। সামারে সেটা অপেরা হাউজের কাছে জুরিখ-হ্রদের পাড়ে আর শীতে অপেরা হাউজের উল্টো দিকের কফি পাড়ায়, কয়েকটা বইয়ের দোকানে। জুরিখ একেবারে ইন্টারন্যাশনাল। ইংরেজি চলে সবখানে। কিন্তু শহরের কারো প্রিয় সহজে হতে গেলে জার্মান বলা চাই। তবে চট্টগ্রামের বাংলাকে আপনি যদি বাংলা না বলেন তাহলে জুরিখের শ্যুভাইৎসে ডয়েচকে জার্মান বলতে নারাজ হবেন। বইয়ের জার্মানে আপনি চাইলে তারা কথা বলবে, কিন্তু নিজেদের মধ্যে কথা বললে আগা মাথা ধরতে পারবেন না।

জুরিখে ছবির হাটের মতো জায়গা আছে। অপেরা হাউজ থেকে কয়েকশ মিটার দূরে সেখানে শিল্পীদের আড্ডা বসে এক দারুণ ওক গাছের নিচে। তামাকের ঘ্রাণ আপনাকে দোলাবে বারবার। জুরিখের রাস্তা কলকাতার থেকে সরু, তার মধ্যে ট্রাম আর হাজার গাড়ি ভর্তি, রাস্তা দম ফেলার ফুসরত পায় না। তাদের পুলিশ বেশ কড়া। কোনো ভুল করলে খুব সহজে মোলাকাত হয়ে যাবে। সন্ধ্যায় গাড়ির হেডলাইট না জ্বালানোই কয়েক মিনিটের মধ্যে মোটরসাইকেলে সুইচ পুলিশ এসে হাজির। জানালো, হেডলাইট জ্বালানো আবশ্যিক। সুইচ পুলিশ নাকি জরিমানা করতে ইউরোপের সেরা। জার্মানরা বলে সুইচ মানুষের দম্ভ অনেক বেশি—আমি টের পেয়েছি শহরের বাতাসে।

জুরিখের অপেরা হাউজের পুরাতন ভবনটি শো পিসের মতো একটি শিল্পকর্ম। ছাদের নিচে দেখি সারি করে ছয়জনের দুই হাত সমান মূর্তি রাখা। একদম বামে শেকসপিয়র, তারপর জার্মানির জাতীয় কবি ফ্রিডরিশ শিল্যার, তারপর ভেবার, মোসার্ট, ভাগনার এবং গ্যোটের। বেটোভেনের আবক্ষ না থাকায় দুঃখিত হয়েছি। মজার ব্যাপার হলো অপেরা হাউজের কোণে একটি রাস্তার নাম শিল্যারের নামে। সুইচরা শিল্যারকে কেন বড় মনে করে সেটা খুঁজতে আরেকবার যাওয়া প্রয়োজন। 

জুরিখ কেন্দ্রিয় গণগ্রন্থাগার বা জেন্ট্রালবিবলিওটেক স্যুরিশ একই সঙ্গে জুরিখ বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগার হিসেবে ব্যবহৃত হয়।  
লাইব্রেরি অংশ দৈর্ঘ্যে আমাদের সুফিয়া কামাল জাতীয় গণগ্রন্থাগারের থেকে বেশ বড়ো (চত্বরে নয়)। সম্ভারে সে বিশাল। কোনো শহরে গেলে আমি আগে যাই লাইব্রেরি, তারপর জাদুঘর, আর সবশেষে বাজারে। তারা কীভাবে চলে, কী খায়, কী পড়ে আর কী ভাবে, সেটা জানলেই একটা সাধারণ ধারণা পাওয়া যায় পুরো শহরের ওপর। সুইচ লোকজন জার্মানদের থেকে কিছুটা অহংকারী, এবং অসহিষ্ণু, একটু দেরি করলে হর্ন দিতে পিছপা হবে না, হেসে আপনাকে আগে সুযোগ দেবে না। টাকার জোরে তারা অনেক কিছু নিজেদের করে রেখেছে। তার প্রতিচ্ছবি তাদের জাদুঘর, আর্ট গ্যালারি আর গ্রন্থাগার। 

জুরিখ কেন্দ্রীয় গণগ্রন্থাগার তেতলা, মাটির নিচে দুই তলা। রকমারি ভাষার গুরুত্বপূর্ণ ৩.৯ মিলিয়ন ছাপা বই, ১,২৪০০০ পাণ্ডুলিপি, ২,৪৩০০০ ম্যাপসহ তাদের সংগ্রহ বিশাল। সেগুলোর এক ক্ষুদ্র অংশ দেখতে গেলে চোখের নিমিষে তিন চার ঘণ্টা চলে যাবে। লাইব্রেরি কার্ড করা আর বই ধার নেওয়ার প্রসেস খুব সহজ। বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়াদের সমাগম চোখে পড়ার মতো, কিন্তু কেউ নোট বই কেটে এনে লাইব্রেরির টেবিলে বসে পড়ে না। লাইব্রেরির পাশে বিশাল গির্জা, তার হলরুমে মাঝে মাঝে সেমিনার চলে। ঢোকার পরই দরজার কাছ থেকেই জেনে যাবেন কোথায় কী বই আছে। প্রবেশ দ্বারের ওপরে দুই পাশে জায়গা পেয়েছে সুইচ কবি সালোমন গেসনার এবং য্যাকব বোডম্যর-এর আবক্ষ। মজার ব্যাপার হলো সপ্তাহের সাতদিনই খোলা থাকে এই গ্রন্থাগার।

আমাদের ভ্রমণের দ্বিতীয় দিন সকালে যাই, জুরিখ শিল্প একাডেমিতে। তার ক্যাফেটেরিয়া থেকে সকালের নাস্তা করে ঢোকার পথেই বড় ধাক্কা খাই। মনে হলো ম্যুসে রোঁদায় যাওয়া লাগলো না, রোঁদার (Auguste Rodin) সেই বিখ্যাত শিল্পকর্ম 'দ্য গেট অফ হেল' (La Porte de l'Enfer) এর দেখা মিললো একাডেমির প্রবেশ মুখে। এতই বিখ্যাত শিল্পকর্ম যে, এর রেপ্লিকা রয়েছে টোকিও, ফিলাডেলফিয়া, মেক্সিকো সিটি এবং স্ট্যানফোর্ডে। দান্তের ডিভাইন কমেডির নরক পর্বের পথম পরিচ্ছেদের বর্ণনার ওপর ভিত্তি করে ৩৭ বছর ধরে রোঁদা নির্মাণ করেন এই শিল্পকর্ম। শিল্পকর্ম দেখতে গিয়ে যে লোকটার কথা বারবার মনে হচ্ছিল তিনি কামিল ক্লোদেল। এক সময় রোঁদার প্রেমিকা ছিলেন, মরেছেন নানা সমস্যায় ভুগে। ধারণা করি এই নির্মাণের পেছনে তার হাতও ছিলো। রোঁদার এই শিল্পকর্ম ছাড়াও আর্ট গ্যালারিতে রয়েছে তার বেশ কিছু অরজিনাল স্কাল্পচার। পুরো গ্যালারি ইউরোপের শিল্পীদের চিত্রকর্ম দিয়ে ভর্তি। পাবলো পিকাসোর চিত্রকর্ম ‘হেড, ওমেন’স বুস্ট’ চোখে পড়ল।আর্ট গ্যালারির নিচতলায় পাওয়া যায় নানা রকমের ছবির বই। আর যেসব ক্যালেন্ডার, ভিউ কার্ড আর স্যুভেনির পাওয়া যায়, সে সকল কিছুকেই দুহাতে বাড়ি নিয়ে আসতে মন চাইবে। কিন্তু সে ইচ্ছেই বাধ সাধবে অর্থ। 

ইচ্ছে ছিলো জুরিখ শহরের বাইরে রাত কাটানোর। সে ইচ্ছেও পূরণ হয়েছে। জুরিখ থেকে দশ-বারো মাইল দূরে পাহাড়ের বুকে একটি খামার বাড়িতে আমাদের শেষ রাত কাটে। রাতে যখন ওখানে পৌঁছাই তখন বিশেষ কিছু মনে হয়নি। কিন্তু কয়েক ঘণ্টা পেরুতেই মশা আর থেমে থেমে গরুর ডাক বুকের মধ্যে ভয় ধরিয়ে দেয়। কোথায় এলাম। যা হোক, রাত পার হয়। মুখে ব্রাশ করে বাইরে হাঁটতে বের হই। শীত শীত করে। জার্মানির তুলনায় এখানে তুলনামূলক গরম অনুভূত হয়, আশাপাশে চোখ পড়তেই স্তবির হয়ে যাই, পাহাড়ের খাঁজ ধরে লাল-সাদা গরুর পাল ঘাস খেয়ে বেড়াচ্ছে। নিচে এক পাশে মেঘ জমে আছে, দূরে আল্পস পর্বত শ্রেণি, গায়ে খাড়া হয়ে দাঁড়িয়ে আছে স্প্রুস আর পাইন। মনে হয় এখানেই থেকে যাই।

থাকা হয় না। ফিরে আসতেই হয় পুরনো ব্যস্ততায়। তবে মন পড়ে থাকে জুরিখ-হ্রদের পাড়ে। চোখ বন্ধ করলেই দেখি সবুজ পানির দিকে চেয়ে হ্রদয়ের পাশে বসে আছি, ঝির ঝির করে বাতাস চলে যাচ্ছে শরীরের ভেতর দিয়ে, সামনে শো শো করে দুটো রাজহাঁস পার হয়ে গেলো, কিছু সময় পর পর পেছন দিয়ে জুরিখের মেট্রো চলে যাচ্ছে, হাজারো লোক হেঁটে যাচ্ছে আমার গা ঘেঁষে হ্রদের পাড় ধরে সুন্দর পিচঢালা পথে, বাতাসে তাদের ভাষা উড়ছে—ইংরেজি, জার্মান, তামিল, আরবি, হিন্দি, ফেন্স, স্প্যানিশ আর অজানা কিছু শব্দ সেসবের অন্তর্গত। আমি জল থেকে চোখ রাখি কিছুটা ওপরে, খাড়া পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে দোচালা ঘরগুলো আমাকে বলে তুমি থাকো এই সবুজ জলের কাছে।  

/জেডএস/
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

বাংলা ট্রিবিউন শারদীয় সংখ্যা ২০২১

বিশেষ সংখ্যা (সূচিপত্র)বাংলা ট্রিবিউন শারদীয় সংখ্যা ২০২১

‘তোমরা শান্তিতে ঘুমাও—এই ভুল আমাদের আর কখনো হবে না’ : হারুকি মুরাকামি

‘তোমরা শান্তিতে ঘুমাও—এই ভুল আমাদের আর কখনো হবে না’ : হারুকি মুরাকামি

চাঁদ বণিকের একার যুদ্ধ

প্রবন্ধচাঁদ বণিকের একার যুদ্ধ

ইমান একটি সাদা জবা ফুল

ছোটগল্পইমান একটি সাদা জবা ফুল

স্যুরিশের চারপাশে

ভ্রমণস্যুরিশের চারপাশে

নিখিলেশ রায়ের কবিতা

কবিতানিখিলেশ রায়ের কবিতা

নিষিদ্ধ ইস্তেহার 

কবিতানিষিদ্ধ ইস্তেহার 

ঘুমোতে যাবার আগে  

কবিতাঘুমোতে যাবার আগে  

দুর্গাপূজায় গণমানুষসংশ্লিষ্ট অসাম্প্রদায়িক চেতনাই বড় : যতীন সরকার

সাক্ষাৎকারদুর্গাপূজায় গণমানুষসংশ্লিষ্ট অসাম্প্রদায়িক চেতনাই বড় : যতীন সরকার

ব্যক্তিগত

কবিতাব্যক্তিগত

সর্বশেষ

এই স্কটল্যান্ডের কাছে কিন্তু হেরেছে বাংলাদেশ!

এই স্কটল্যান্ডের কাছে কিন্তু হেরেছে বাংলাদেশ!

ওয়ারীতে নারীর মরদেহ উদ্ধার

ওয়ারীতে নারীর মরদেহ উদ্ধার

দুই ডোজ টিকার আওতায় ১ কোটি ৮৯ লাখ মানুষ

দুই ডোজ টিকার আওতায় ১ কোটি ৮৯ লাখ মানুষ

ইয়েমেনে সৌদি জোটের হামলায় ১৬০ হুথি বিদ্রোহী নিহত

ইয়েমেনে সৌদি জোটের হামলায় ১৬০ হুথি বিদ্রোহী নিহত

কুমিল্লার ঘটনায় জড়িতদের শিগগিরই বিচারের আওতায় আনা হবে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

কুমিল্লার ঘটনায় জড়িতদের শিগগিরই বিচারের আওতায় আনা হবে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

© 2021 Bangla Tribune