X
বুধবার, ২৭ অক্টোবর ২০২১, ১১ কার্তিক ১৪২৮

সেকশনস

আমার B ও ৯

আপডেট : ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২১, ২৩:৫৬

The most beautiful experience we can have is the mysterious. It is the fundamental emotion that stands at the cradle of true art and true science.’… Albert Einstein

শুনতে পায় সব্যসাচী। শুনতে পায় তার মতোই অনেকে।

সেই রহস্যের মধ্যে বিভোর এক শৈশব। তাকিয়ে থাকে। এক মহাসঙ্গীত বাজে। বিস্ময়ভ্রমণ আর ফুরোয় না।

সেই চলা। কত বই! পংক্তি, শব্দ, ধ্বনি …

  • কে আছো পথ দ্যাখাও।
  • খোঁজো, খোঁজো, খোঁজো, খোঁজো, খোঁজো, খোঁজো

মাথা ঝনঝন ক’রে ওঠে। এও সম্ভব! বিস্ফোরণ ঘটবে?

পা ঠক ঠক করে। তবুও পা ঠুকে উঠে পড়ে সে। পাঠক! পাঠক!

Golden eggs! সে কেমন?

‘…তবুও নক্ষত্র নিজে নক্ষত্রের মত জেগে রয়! –

তাহার মতন আলো হৃদয়ের অন্ধকার পেলে

মানুষের মত নয়, – নক্ষত্রের মত হতে হয়!...’

ওই ‘!’ নিয়েই জীবনানন্দ থেকে বিনয়ে ঢুকেছিলো সব্যসাচী।

বলেছিলো ‘বিনয় আপনি আমার B ও ৯’

‘নক্ষত্রের আলোয়’ পড়েছিলো ‘চাঁদ নেই দেখি দূরে নক্ষত্রেরা জ্বলে।’

  • সব্যসাচী তোমার কাছে বিনয়
  • বিনয়ের সাথেই বলি, সে ঘোর কাটাতে গেলে তাঁকে আরও গভীরে পড়তে হয়।

 

বিশ্রাম 

‘চোখে তার
যেন শত শতাব্দীর নীল অন্ধকার;
স্তন তার
করুণ শঙ্খের মতো— দুধে আৰ্দ্র— কবেকার শঙ্খিনীমালার;
এ-পৃথিবী একবার পায় তারে, পায়নাকো আর।’
… জীবনানন্দ দাশ

সেখানেই কি জুড়ে গ্যালো—

‘রূপকথা শুনেছি সে—কঙ্কাবতী, পদ্মমালা, শঙ্খিনীমালার।/ …/ভিজে অন্ধকারে ব’সে পরস্পর সেইসব রূপকথা বলি।’… বিনয় মজুমদার

‘কিন্তু কেউ আমার কবিতা সম্বন্ধে উচ্চবাচ্য সুরু করলো না, প্রশংসাও করলো না’

‘সব চুপচাপ, যেন আমার বই প্রকাশিত হয়নি’

‘কেউ ভালো ক’রে রিভিউও করলো না।’

 

নীরবতা!

হাসছি আমি। নীরবতাই আমাদের অলংকার। উচ্চবাচ্যই যদি শুরু না হয়, তাহলে প্রশংসার প্রশ্ন আসছে কেন, বিনয়! প্রশংসার শংসাপত্র প্রথম বইয়ের ক্ষেত্রে এক ফুয়েল অবশ্যই। আপনি নিশ্চই জানেন আপনার পূর্বে এবং সমসাময়িক বহু কবির লেখা, আর আমরা জানি আপনার পরে বহু উৎকৃষ্ট কাজ নীরবতায় ডুবে গ্যাছে। আপনি তবু আপনার জীবদ্দশায় স্বীকৃতির আলো পেয়েছেন, বাকিদের! থাক।

‘এই বিরাট দূরত্ব থেকে নক্ষত্রদের অস্তিত্বের খবর এনে দিচ্ছে কিসে। সহজ উত্তর হচ্ছে আলো।’… (বিশ্বপরিচয়/রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)

‘আমার কবিতা বেশ পুরোনো ধাঁচের, সেগুলিকে ঠিক আধুনিক কবিতা বলা চলে না।’

‘অন্যান্য তরুণ কবির ঢঙে লেখা তো আর চাইলেই হয়ে ওঠে না। ফলে এরূপ চিন্তা আমি করতাম না।’

—কবিতা কতবার কাটাছাঁটা ক’রে বুঝলেন ‘জীবনানন্দকে নকল করা এত সহজ ব্যাপার নয়’?

যদিও অনেকের ক্ষেত্রেই আমি দেখলাম তাকে নকল করা বেশ সহজ। কেউ বলছেন মরীচিকা, কেউ বলছেন চোরাবালি। কেউ বলছে ডুবডুবডুব, কেউ বলছে খালি। যদিও আপনার পরম্পরার প্রতি আস্থা প্রবলভাবে দেখি যখন আপনি বলেন—‘অগ্রজকে অস্বীকার করে কিছুই সম্ভব নয়’।

 

কেউ স্বয়ম্ভু নয়, আপনার অগ্রজরাও নয়, আপনার অনুজরাও নয়।

 

‘ধূসর জীবনানন্দ, তোমার প্রথম বিস্ফোরণে/ কতিপয় চিল বলেছিলো, ‘এই জন্মদিন’।’

 

জীবনানন্দের ঝ’রে যাওয়া নিয়ে আপনার জিজ্ঞাসা ও প্রাপ্ত উত্তর পাঠক আরেকবার প’ড়ে ফেলুক।

আপনার আত্মোপলব্ধি আপনার জ্বালানি হোলো। ঢঙ নয় ঢং ঢং ক’রে ব্রেক হোলো। শুরু হোলো আরেক যাত্রা।

রচনার পদ্ধতিতে নির্মাণের আলো পড়লো, আপনি সচেতন হলেন, যা সন্ধানী মানুষের সুনির্দিষ্ট শিল্পযাত্রা। হৃদয়ঙ্গম ও আত্তীকরণ, সেই সাথে পূর্বসূরির কাজগুলোকে চিহ্নিত ক’রে ব্যাপক প্রভাব কাটিয়ে ওঠা, নিজস্ব ভাষা-সন্ধান আপনাকে ‘বিনয়’ করলো।

সাঁচি, অমরাবতী, অজন্তা নিয়ে ভাবি।

তর্ক থাকুক। তা স্বাস্থ্যকর। তবুও elimination, analogy, editing, substitution, standard elements, dimension এই অনুষঙ্গে জীবনানন্দের ‘অদ্ভুত আঁধার এক’ কবিতাটি সেই আত্মস্থ করার প্রমাণ বললে অত্যুক্তি হবে না। যা ইউনিক স্টাইলেই গতিময়।

রেখা রেখা রেখা

রঙ রঙ রঙ

আলো আলো আলো

স্পেস স্পেস স্পেস

অশোক মিত্র ‘নকশা’ প্রবন্ধে বলছেন—‘রসবিচারে রেখার মূল্য নিরূপণ হয় তা অন্যান্য চিত্র উপাদানের সঙ্গে কেমন মিলেছে, মিশেছে, তারই উপর।’

চোখের চেনাজানার প্রসঙ্গে Leonardo ও Raphael পেইন্টিং প্রসঙ্গে শ্রী মিত্রের লেখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

আমি তখনই আপনার elimination—এর প্রসঙ্গ নিয়ে ভাবছিলাম।

যে প্রথম বারে বারে ফিরে আসে বিশ্বের সৃষ্টিতে
কখনো-বা অগ্নিবর্ষী প্রচণ্ডের প্রলয় হুংকারে,
কখনো-বা অকস্মাৎ স্বপ্নভাঙা পরম বিস্ময়ে
শুকতারানিমন্ত্রিত আলোকের উৎসবপ্রাঙ্গণে।’

রবীন্দ্রনাথের ‘প্রান্তিক’ যা কবির রোগমুক্তির পর, তা তো আপনার আশ্রয়। শুরু -> শেষ -> শুরু… এই আলো-ছায়াতেই সে সম্পর্কিত।

গায়ত্রী আপনার কল্পনা নয়।

 

বিশ্রাম 

‘তবুও পাইন গাছ, ঋজু হয়ে ক্রমে বেড়ে ওঠে,/প্রকৃত লিপ্সার মতো, আকাশের বিদ্যুতের দিকে।’

১। চাকার ইতিহাস নয়, আপেক্ষিক স্থিতির মুক্তিতে আপেক্ষিক গতিময়তায় আপনি আলো ফেললেন।

২। প্রকরণ আপনাকে দিয়েছে মিলন ও বিচ্ছেদের গুণ।

৩। ‘জড় হইতে জন্তু এবং জন্তু হইতে মানুষ পর্যন্ত যে একটি অবিচ্ছেদ্য ঐক্য আছে এ কথা আমাদের কাছে অত্যদ্ভুত বোধ হয় না; কারণ বিজ্ঞান এ কথার আভাস দিবার পূর্বে আমরা অন্তর হইতে এ কথা জানিয়াছিলাম;…'—(পঞ্চভূত / রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)

৪। মাটি, গাছ, জল, আকাশ সবাই কি কথা বলতো কবির সাথে? কী কথা বলতো?

৫। জড় ও মনুষ্যআত্মা, দূরত্ব মাপবে কে? —

৬। ‘পাথর হোক লোহা হোক বাইরে থেকে দেখলে মনে হয় তাদের মধ্যে কোনো নড়াচড়া নেই। তারা যেন স্থিরত্বের আদর্শস্থল। কিন্তু এ কথা প্রমাণ হয়ে গেছে যে তাদের অণু পরমাণু, অর্থাৎ অতি সূক্ষ্ম পদার্থ, যাদের দেখতে পাই নে অথচ যাদের মিলিয়ে নিয়ে এরা আগাগোড়া তৈরি, তারা সকল সময়েই ভিতরে ভিতরে কাঁপছে। ঠান্ডা যখন থাকে তখনো কাঁপছে, আর কাঁপুনি যখন আরো চড়ে ওঠে তখন গরম হয়ে বাইরে থেকেই ধরা পড়ে আমাদের বোধশক্তিতে।’… (বিশ্বপরিচয়/রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)

৭।’ আমরা জড়বিশ্বের সঙ্গে মনোবিশ্বের মূলগত ঐক্য কল্পনা করতে পারি সর্বব্যাপী তেজ বা জ্যোতিঃ-পদার্থের মধ্যে। অনেক কাল পরে বিজ্ঞান আবিষ্কার করেছে যে আপাতদৃষ্টিতে যেসকল স্থূল পদার্থ জ্যোতির্হীন, তাদের মধ্যে প্রচ্ছন্ন-আকারে নিত্যই জ্যোতির ক্রিয়া চলছে। এই মহাজ্যোতিরই সূক্ষ্ম বিকাশ প্রাণে এবং আরো সূক্ষ্মতর বিকাশ চৈতন্যে ও মনে। বিশ্বসৃষ্টির আদিতে মহাজ্যোতি ছাড়া আর কিছুই যখন পাওয়া যায় না, তখন বলা যেতে পারে চৈতন্যে তারই প্রকাশ। জড় থেকে জীবে একে একে পর্দা উঠে মানুষের মধ্যে এই মহাচৈতন্যের আবরণ ঘোচাবার সাধনা চলেছে। চৈতন্যের এই মুক্তির অভিব্যক্তিই বোধ করি সৃষ্টির শেষ পরিণাম।’ …(বিশ্বপরিচয়/রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)

তুলনামূলক জায়গা থেকে ঢুকে পড়ি—

৮। জগতের সঙ্গতি ও অসঙ্গতির মধ্যে এক সম্পর্কের সূত্র উপলব্ধি করা, জড়, উদ্ভিত, মানুষ যে এক অবিচ্ছেদ্য ধারায় প্লাবিত—এই বিশেষ ভাবনা আপনাকে দিলো ব্যতিক্রমী নির্মাণ।

৯। আপনি বললেন এভাবে—‘সৃষ্টির মূল যে সূত্রগুলি তা জড়ের মধ্যে প্রকাশিত, উদ্ভিদের মধ্যে প্রকাশিত, মানুষের মধ্যেও প্রকাশিত… অতএব জড় এবং উদ্ভিদের জীবন অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে লক্ষ্য করতে লাগলাম আমি। এবং তাদের জীবনের ঘটনাকে মানুষের জীবনের ঘটনা ব’লেই চালাতে লাগলাম’।

১০। এভাবেই যা চিন্তায় ছিলো তাকে বিশেষ ক’রে আনলেন আপনি। নিজস্বতা ভাবনার গুণে আলোকিত হোলো।

১১। মনে পড়ছে Empedocles মিলিয়ে দিলেন Heraclitus, Thales, Anaximenes।

১২। রবীন্দ্রনাথ বললেন ‘এ তরু খেলিবে তব সঙ্গে,/সংগীত দিয়ো এরে ভিক্ষা/ দিয়ো তব ছন্দের রঙ্গে/পল্লবহিল্লোল শিক্ষা।’

‘বৃক্ষ ও প্রাণীরা মিলে বায়ুমণ্ডলকে সুস্থ, স্বাস্থ্যকর রাখে।

এই সত্য জানি, তবু হে সমুদ্র, এ অরণ্যে কান পেতে শোনো—

ঝিঁঝি পোকাদের রব—যদিও এখানে মন সকল সময়

এ-বিষয়ে সচেতন থাকে না, তবুও এই কান্না চিরদিন

এইভাবে রয়ে যায়, তরুমর্মরের মধ্যে অথবা আড়ালে।’

                                ১২ অক্টোবর ১৯৬০

১৩। সবকিছুর শেষে—‘আমি এখন যা লিখছি সে হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যপুস্তক।’—বিনয় এ ইচ্ছে কেন!

 

বিশ্রাম

বিজ্ঞান, বিনয়, benign কি?, উৎপন্ন জ্ঞানের প্রতি ভালোবাসা! মিথস্ক্রিয়া? কবিতার সার্থকতা?

Isaac Asimov মহাবিশ্বের কাছে দাঁড়ালেন।

পড়তে পড়তে পৌঁছে গেলাম আবির্ভাব ও বিলয়ে।

আপনার লেখায় প’ড়ে ফেলি জন্মের রহস্য—

‘পাখি থেকে পাখি জন্মে, গাছ থেকে গাছ জন্মে, যন্ত্র থেকে যন্ত্র জন্মে, কবিতার থেকে

সকল কবিতা জন্মে, তারা থেকে সেইভাবে কেবল তারাই জন্মে—এ এক নিয়ম।

নিয়মিত গর্ভ হয়ে মাতৃগর্ভে এ-সকল—সকলই চিরকাল জন্মলাভ করে…’

জননী তারা, সন্তান তারা, ‘পিতাকে আসলে এক তারা হতে হয়—সন্তানলাভের জন্য হতে হয়…’

 

আপনি বিস্মিত হতে জানেন, তাই তো আমরা আপনার লেখায় বিস্মিত হই।

 

‘একটি চুম্বক ভেঙে খণ্ড খণ্ড করা হলে তার/প্রত্যেক খণ্ডই এক সম্পূর্ণ চুম্বক হয়ে যায়’

‘তপ্ত লৌহদণ্ড জলে প্রবিষ্ট হবার শান্তি আচম্বিতে নামে।’

‘জলীয় গান বাষ্পীভূত হয়ে যায়’

‘তবু সব বৃক্ষ আর পুষ্পকুঞ্জ যে—যার ভূমিতে দূরে দূরে/চিরকাল থেকে ভাবে মিলনের শ্বাসরোধী কথা।’

‘শুনেছি যে কতিপয় পতঙ্গশিকারী ফুল আছে’

‘আলোকসম্পাতহেতু বিদ্যুৎসঞ্চার হয়, বিশেষ ধাতুতে হয়ে থাকে।’

‘আকাশআশ্রয়ী জল বিস্তৃত মুক্তির স্বাদ পায়, পেয়েছিলো।'

‘…ক্ষত সেরে গেলে পরে ত্বকে/ পুনরায় কোশোদ্গম হবে না…’

‘বাষ্পের সহিত যদি বাতাসের মতো নাই মেশো’

‘জরায়ু ত্যাগের পরে বিস্তীর্ণ আলোকে এসে শিশু/ সৃষ্টির সদর্থ বোঝে, নিজস্ব পিপাসা, ক্ষুধা পায়’

‘শাশ্বত, সহজতম এই দান—শুধু অঙ্কুরের/ উদগমে বাধা না দেওয়া, নিষ্পেষিত অনালোকে রেখে/ফ্যাকাশে হলুদবর্ণ না—ক’রে শ্যামল হতে দেওয়া।’

‘দুপুরে মেঘের রঙ সাদা কিম্বা কালো হয় অন্য কোনো রঙের হয় না। / রাত্রি এলে সন্ধ্যাবেলা মেঘগুলি বহুবর্ণ হয়/ সোনালি রুপালি হয়, শুধুমাত্র রাত্রি এলে এ প্রকার হয়।’

‘জন্মের সময়ে সব মানুষের—শিশুদের ওজন অত্যন্ত কম থাকে।’

‘উদয়ের কালে সূর্য বৃহৎ, রক্তাভ হয়ে ওঠে।/… /মৃত্তিকা জলের চেয়ে দ্রুত তপ্ত হয় ব’লে সমুদ্রোপকূলে/সকালে স্থলের থেকে সাগরে দিকে এক বায়ু বয়ে যায়।…।’

পড়তে পড়তে শুধুই ঢুকে পড়ে এরা। আপনি যা লিখলেন কোনোটিও অজানা নয়, তবুও আপনি জানা ও দ্যাখার মধ্যে নির্মাণের গুণে বুনে দ্যান সেই রহস্য, ঢুকিয়ে দ্যান সেই রস আপনার নির্দিষ্ট ফর্মুলায় যা নতুন ক’রে দৃষ্টিকে শানিত করে, ভাবনাকে ভাস্বর করে, চেতনায় দ্যায় বিদ্যুতের চমক।

‘এই মহাবিশ্বের প্রতিটি ঘটনাই সমগ্র বিশ্বব্যাপারের সঙ্গে সম্পর্কিত কোনোটিই বিচ্ছিন্ন নয় কিছু নয়।’ এই সারকথা আপনি বললেন—‘এই বিপুল বিশ্ব—তার সম্পর্কে বিস্ময়বোধ করা ছাড়া একজন কবি আর কি করতে পারে!’

আপনি যাই মনে করুন, আমি গাইছি—‘তাই, দুলিছে দিনকর চন্দ্র তারা,/চমকি কম্পিছে চেতনাধারা,/আকুল চঞ্চল নাচে সংসারে, কুহরে হৃদয়বিহঙ্গ।’ আপনি আমার সঙ্গে গলা মেলান।

 

কেন আমি উৎপন্ন জ্ঞান বলেছি?

এককথায় আপনার ইন্দ্রিয়ানুভূতির ফসল অনুভবে উজ্জ্বল হয়েছে আপনারই প্রকাশে যা আপনার ভেতরে উদ্ভূত দর্শন।

এ বিষয়ে : নির্দিষ্ট à সাধারণ, এবং সেই সাধারণ থেকে সার্বিক সূত্রের দিকে যাত্রা আপনাকে বিশেষ করেছে সাধারণ থেকে।

আপনি নির্দিষ্টকে সাধারণ করতে গিয়ে, লেখায় সাধারণ ভাবনাকে টপকে বিশেষ দর্শনে উপনীত হলেন যা আপনার কবিতাকে মহৎ গুণ দিলো।

খুব সহজ কিন্তু জহবাবু ও সহবাবু নিয়ে এলো ‘হাসপাতালে লেখা কবিতাগুচ্ছ’—তে ‘কলা দিয়ে গেছে’ কবিতাটা—

‘মনে হয় শব্দ দিয়ে, শব্দের চেহারা এই ফল/সিঙাপুরী, মর্তমান এইসব বিশেষণে ফলের চেহারা নানারূপ/হয়ে যায়, চাঁপাকলা নামেও তো কলা আছে এক।’

আপনার ‘প্রাণী সৃষ্টি’ কবিতার দিকে তাকাই—

‘ঙুঙৃ’, ‘ঙাঙুঙা’, ‘ঞাঞ’ এই তিনটি শব্দ নিয়ে দেবতা বানিয়েছিলেন ও পাখি বসিয়েছিলেন। শব্দ তাকে যেমন অপিরিচিত থেকে পরিচিত করাচ্ছেন, তার সাথে সাথে আপনি artistic imperfection-এ তাকে সচেতন ভাবেই ব্যতিক্রমী স্থানে বাঁধছেন। ‘আকাশের দিকে তাকান। দেখুন একটি পাখি বসে আছে।’—এই পাখিকে আকাশে বসানোতে আমি আজও রোমাঞ্চিত হই।

আরেকটা দিক ‘আপনিও এরকম নতুন দেবতা বা দেবী সৃষ্টি করতে পারেন, যদিও আপনি মানুষ।’

এই লাইনটি লেখার আগে আপনি ইতিমধ্যেই মানুষ হয়ে দেবতা সৃষ্টি ক’রে ফেলেছেন, তার পরেই সৃষ্টির সমস্ত আলিঙ্গনে স্রষ্টা হিসেবে পাঠকের মধ্যদিয়ে যেকোনো মানুষকে সেই আসনে বসিয়ে দিচ্ছেন। শুধু রচনায় নয় পরীক্ষাগারে পাঠককে আপনি আপনার সহকর্মী ক’রে তুলছেন।

‘হ্বিয়াতুলি’ গাছের কথা ভাবি, ‘ফরাই-হা’ শব্দের কথা।

‘বিশেষণ’ কবিতাটা পাঠককে আরেকবার পড়তে বলি।

এগুলো ভাবতে ভাবতেই মনে হয় প্রচল অর্থবোধকতার ঘেরাটোপ টপকে শ্রাব্য ও দৃশ্যের আলোয় আপনি সৃষ্টির উৎসধ্বনিকে স্পর্শ করেছিলেন বিস্তৃতির পথে, যা আমাকে আলোড়িত করেছিলো গভীরভাবে।

আপনার লেখা পড়তে পড়তে সেই কথা—‘ঘ্রাণেন অর্ধভোজনং’ হয়েছে কি না জানি না, তবে এটা জানি—পাঠক তার শিক্ষায় দীক্ষায় অভিজ্ঞতায় যাপনে আপনার লাইনে হাঁটবে না। সে তার অনুভবে ও বোধে নিজস্ব রাস্তায় আপনার রচনাটি থেকে নিজের আলো জ্বালবে। যিনি লিখলেন আর যিনি পড়লেন তাদের চলা অর্ধেক বা গোটায় দাঁড়িয়ে থাকে ব’লে মনে হয় না।

কানে বাজছে আপনার লাইন—‘ধ্বনি শুধু ধ্বনি শুনে এবং না দেখে/আমি স্পষ্ট বুঝতে পারছি কাঠে শিরীষ ঘষা ধ্বনি।’

 

বিশ্রাম

 

‘কবিতাগুলি বিকশিত হয়ে বিশুদ্ধ গণিত হয়ে গেছে’

আপনি Mechanical Engineering এর ছাত্র ছিলেন। এরকম বহু ছাত্রই ছিলো, আছে, ভবিষ্যতেও থাকবে। কিন্তু আপনাকে যে বিষয় ভাবিয়েছে তা আমাদের ভাবিয়েছে। আপনার উদ্দেশ্য সফল।

‘I became more and more convinced that even nature could be understood as a relatively simple mathematical structure. This lucidity and certainty made an indescribable impression upon me.’ … Albert Einstein

এই উক্তি নিয়ে আপনার কাছে আসি। আপনার মডেলে ঢুকি বহির্বিশ্বকে ধারণ করার জন্য।
গণিত ও কবিতা, তাদের সঙ্গম ও বিচ্ছেদ সারা পৃথিবীতেই বহু চর্চিত। সেখানে আপনি নতুন নন, আপনার সংযোজন নতুন। ব্যক্তিগতকে বিশ্বগতকে করার প্রক্রিয়ায় সেই গণিতের শিখাটি আপনি জ্বেলে রেখেছিলেন নিরন্তর।

‘স্মরণে আসে অনেক কাল পড়েছি বিজ্ঞান,/ গণিত দিয়ে বেঁধেছে নর বিপুল বিশ্বের/সকল কিছু…’

‘ত্রিগুণে বিশ্লিষ্ট হলে ইনটারপোলেশন সিরিজের মতো/টার্মের পরেই টার্ম হয়ে যেন এ-সকল ঘ’টে যায় ঘ’টেই চলেছে

‘জ্যামিতি জমিতে ছিলো, পঙক্তিতে-পঙক্তিতে শুধু জ্যামিতিই ছিলো।’

‘আমাদের জ্ঞানদণ্ডে এক প্রান্ত শুদ্ধতম গণিত নামক শাস্ত্র আর/অন্য প্রান্ত আমাদের সকলের পরিচিত কবিতা ও কাব্য-কাব্যগুলি।/ এ এক নিয়মমাত্র, গণিত যে-ধারে থাকে আসলে বিশ্বের সব রস–/বিশ্বের সকল রস জড়ো হয়ে এসে জমা হয়ে থাকে রসের আকারে।/অন্য ধার যেই ধারে কবিতা রয়েছে তার মুখ দিয়ে এই রস পড়ে,/ বার হয়ে এসে পড়ে বাহিরের জগতে ও জগতের মোহনাগুলিতে।’

‘সঙ্গত কারণে শেষে মনে হয়, মনে হতে থাকে / চিরায়ত গণিতের সর্বোচ্চ শাখাটি আমি এবং ঈশ্বরী—/সর্বত্র বিরাজমান, বিশ্বের সকল কিছুতেই/ রূপ ও শক্তি হয়ে বিদ্যমান আছি দুজনেই।’

‘ক্রিয়াশীল থিওরেম অথবা নিয়মটিকে খুঁজে পেতে হলে সমাধান/হয়তো গণিতমতে ট্রায়াল মেথড দিয়ে বার করা, অজ্ঞাতের মান।’

‘তাহলে এক্সের বর্গ এবং ওয়াইয়ের বর্গ এবং জেডের বর্গ যোগ ক’রে নিলে—/ এই যোগফল তার ব্যাসার্ধের বর্গ হয়, এই হলো বেলুনের আকারের সূত্র তার পরে…’

‘যে কোনো গণিতসূত্র নিয়ে তার পরবর্তীদের।/বাঁ পাশে আনার পরে সে সমীকরণে/সমান চিহ্নের পরে–ডান পাশে শূন্য হয়ে যায়।’

এভাবে পড়তে পড়তে…

‘দৈর্ঘ্য, ভর ও সময় এই তিন এককের কথা/প্রায়শই উচ্চারিত হয় পৃথিবীতে,/ যেন আর কিছু নেই এই তিন একক ব্যতীত/অন্যান্য একক নেই এইরূপ কথা শোনা যায়।’

‘আমিই গণিতের শূন্য’

‘ধরিত্রীর সব প্রাণী’-র মধ্যে আমিও ভাবছি কীভাবে ঢুকে গণিতচেতনা কবিতার শরীরে, গণিতের দর্শন ইউনিভার্সাল সেটে খেলা করছে, আর তার রূপ, রস, গতি-প্রকৃতি একজন মানুষ নিবিড় অবলোকনে ও হাতে, কলমে মিশিয়ে দিচ্ছে থিওরি ও প্র্যাক্টিকালের পারস্পরিক বিনিময়ে। অখণ্ডের মতো খণ্ড, অভেদের মধ্যে ভেদ, অভিন্নতার মধ্যে ভিন্নতা, জেনারেলের মধ্যে পার্টিকুলার। এই জেনারেল প্রবলেমকে সমাধান করাই অনুভূতির সবচেয়ে বড় কাজ এবং সেখানেই থিওরেমের প্রাসঙ্গিকতা। এখান থেকেই বহির্বিশ্বের সংযোগ ও রসসিক্ত কবিতার জন্ম। আমরা এই সংযোগ থেকেই আত্মীয়তায় পৌঁছোই, ভেতর ও বাইরের নিরলস বিনিময় টের পেতে শুরু করি। ফর্মুলা বা থিওরেমের এই প্রয়োজনীয়তার প্রয়োগ আপনি কবিতায় করেছেন নিরন্তর যা আপনার কবিতাকে দিয়েছে ব্যাপ্ত (শূন্য ও পূর্ণতার) আলিঙ্গন। আমার তুলে ধরাগুলো আলাদা ক’রে দ্যাখালেও এর সম্পূর্ণ পাঠ বুনন শব্দকে কতটা প্রাধান্য দিয়েছে টের পাই, যদিও কোথাও ধারাবাহিক এই বুনন আপনার নিজস্ব জিজ্ঞাসা ও বিশ্বাসের উপর আলো ফেলতে ফেলতে বড় বেশি রকমের দীর্ঘ হয়েছে। ওই দীর্ঘ যাত্রায় যদিও আপনি ক্লান্ত হননি। আমি পাঠক হিসেবে হয়েছি কখনো।

আপনি আমাকে বললেন—‘দেখেছ গণিত আর কবিতা হুবহু মনে থাকে।’

আপনি আস্বাদ নিয়েছেন particular problem থেকে theorem এ পৌঁছনো পর্যন্ত। এই ব্যুৎপত্তি, এই সমীকরণ।

কিছু বলবেন Bertrand Russell ও Emily Dickinson?

কিছু বলবেন William Rowan Hamilton?

‘রুবাইয়াৎ’-এর ওমর খৈয়াম, আপনি?

রোমানিয়ান কবি ও গণিতবিদ Ion Barbu আপনাকে নিয়েও ভাবছি।

আর এগোতে এগোতেই অনিন্দ্য রায়ের কথা মতো ঘুরে এলাম KAZ MASLANKA-র ব্লগে। পড়লাম ‘Polyaesthetics and mathematical poetry’, এবং পরিচিত হোলাম তাঁর দেওয়া ‘Mathematical Poetry’-র সংজ্ঞার সাথে।

বিনয় আপনি জানেন এই বাংলাতেও গণিত ও কবিতা নিয়ে অনেক কাজ হচ্ছে? অনিন্দ্য রায়ের ‘অঙ্ক কবিতা’ ব’লে গবেষণামূলক কাজটি পড়তে পারেন। লেখার শুরুতে আছে—‘বব গ্রুম্যান ও বিনয় মজুমদারকে’।

একটা মজার জায়গা দিয়ে এই পর্ব শেষ করি—

‘ভোলানাথ লিখেছিল,
তিন-চারে নব্বই

গণিতের মার্কায়
কাটা গেল সর্বই।
তিন চারে বারো হয়,
মাস্টার তারে কয়;
‘লিখেছিনু ঢের বেশি’
এই তার গর্বই।’
… রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

পাঠক এরও শেষে আপনারা আরেকবার বিনয়ের ‘কবিতা বুঝিনি আমি’ থেকে ‘প্রায় প্রত্যহই আমি’ প’ড়ে ফেলুন আরেকবার।

 

বিশ্রাম

 

‘সমুদ্র, নক্ষত্র, চাঁদ, নদী, ফুল সহজেই একসঙ্গে কলরব করে’

কবিতা সংযোগ বিশ্বব্রহ্মাণ্ড --> রসসিক্ত কবিতা

কবিতা সংযোগহীন বিশ্বব্রহ্মাণ্ড --> রসবিরহিত কবিতা

এই রসপূর্ণতার উপলব্ধিতে স্টিমুলাস ও রেসপন্সের কথা আমি ভাবি।

‘রসাত্মক বাক্য লেখা কবে যে আয়ত্ত হবে, ভাবি’—আর তা আয়ত্তের পর বহির্বিশ্বের সঙ্গে সংযোগের কথা ভাবেন। ‘বহির্বিশ্ব কবিতা নামক পাত্রে রসনিষেক করে’।

এই সংযোগের কথা আপনি বারংবার বলছেন।

‘কোনো ফলের রসই—আম, লিচু প্রভৃতি ফলের রসে স্বয়ংসম্পূর্ণ রস থাকে না, মুখগহ্বরের লালার সহিত মিলনেই ও-রস মিষ্ট হয়, হয়ে যায়…’

এই আদিম, অকৃত্রিম রসের ধারা আপনাকে প্লাবিত করেছে শেষ দিন পর্যন্ত বুঝতে পারি। আপনি নিজেই কবিতায় সচেষ্ট হন, সেই লোভটুকু জাগিয়ে রাখেন। সেখানে জ্যোৎস্নাকামী এক চিন্তন যেমন দেখি, তেমনই দেখি বারংবার ‘মাংস’ শব্দের আশ্রয়, দেখি ‘শূন্যলেহন’, ‘তমোরস’, ‘আহার্যের ঘ্রাণ’, ‘লাস্যময়ী অগ্নি’, ‘পিপাসার্ত তুলি’, ‘মাতালের আর্ত নেশা’, ‘সুগভীর মুকুরের প্রতি ভালোবাসা’, ‘মিলনচিৎকার’, ‘আশ্চর্য ফুল’, ‘রসাবিষ্ট হরিতকী ফল’,‘সেতু শুয়ে থাকে ছায়ার উপরে’ ‘কুসুমের শব্দময় হাসি’, ‘তেলের খনির নিচে ভালোবাসাবাসি’, ‘যৌনাঙ্গ’, যুবক ও যুবতীর ভাব, রমণ, ‘নরম-নরম লাগে চাঁদের পাহাড়’, ‘মদিরা’, ‘গুহার রস’, ‘ভুট্টার কাত হয়ে পড়া’, ‘দেখি, টিপি, টানি, ঘষি’…

রস তার আদি মধ্যে অন্তে একাকার। সে কাব্যের প্রাথমিক গুণগুলোর একটি।

এমন কি আপনার ‘অঘ্রানের অনুভূতিমালা’ নারীভূমিকা বর্জিত আপনার কথায়, কিন্তু একাকিত্বের মধ্যেও আদিরস বর্জিত ব’লে আমার মনে হয় না। প্রকৃতির মধ্যেও আমি রসসন্ধানী হয়ে সেই রূপ, রস, গন্ধ, বর্ণের কাছে যাচ্ছি। আপনার অবগাহন আমার বাইরেটাকে ভেতরের আলিঙ্গন দিচ্ছে। আমিও সেই সংযোগে বুঁদ হয়ে মোহানা মোহানা মোহানা মোহানা বলতে বলতে কাত হয়ে পড়ছি। আমার কল্পনাবিস্তার আমারই। আপনার হাত নেই।

‘প্রতি অঙ্গ লাগি  কাঁদে প্রতি অঙ্গ মোর’ 

‘‘বাল্মীকির কবিতা’ বইখানির কথা মনে পড়লেই আমি খুব লজ্জা পাই। তার কারণ অত্যন্ত অশ্লীল গোটা কয়েক কবিতা এই বইতে আছে।’

আপনি অন্যদিকে তরুণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে চিঠিতে রবীন্দ্রনাথের একটি কবিতার উদাহরণ দিয়ে লিখেছিলেন ‘এতো অশ্লীল কবিতা। সমস্ত ডাক্তারী বইও অশ্লীল।…’

সঙ্গম ও প্রশান্তি। চুম্বন, লেহন, স্পর্শ, মর্দন। সৃষ্টি ও সম্ভাবনার মধ্যে আমরা ঝুঁকে পড়ি।

বিশ্বসাহিত্যের বহু লেখাই তবে অশ্লীল!

আপনি তো যৌনতার অবগুণ্ঠন খুললেন, দ্যাখালেন এইভাবেও লেখা হয়। একে জড়তামুক্তি হিসেবেই দেখছি।

আপনিই তো লিখলেন—‘—এই ব্যাপারের তুল্য অন্য কোনো কীর্তি মানুষের নেই বলে স্পষ্ট টের পাই।’

কবি নিষ্কাম নন।

কবির যৌন আকাঙ্ক্ষা আছে বাকিদের মতোই। ফলে ‘অশ্লীল’ শব্দটাকেই আজ বড় বেশি অশ্লীল মনে হয়।

কুমারসম্ভবের কবি কালিদাস কী বলছেন?

Nudity নিয়ে চিত্রশিল্পীরা, চলচ্চিত্রশিল্পীরা?

 

পাশাপাশি দুটো ছবি—Claude Monet—এর ‘Lady in the garden’ আর Paul Cezanne-র ‘The smoker’। ব্যক্তির উপস্থিতি দুরকম সংযোগের মধ্যে আছে, অথচ এই দুজনের জড়িয়ে থাকার উপর ছবির ফ্রেমমুক্তি দাবি করছে দুটো অবস্থা। ছবির রসাস্বাদনের সময় একজনের উপস্থিতি তার চারপাশকে প্রকট করছে, আরেকটিতে চারপাশ—ব্যক্তিটিকে প্রকট করছে।

 

বিশ্রাম

 

সংযোগ

১। নিজের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে একজন মানুষ সমস্ত রহস্যের মুখোমুখি হচ্ছেন।

২। দিনপঞ্জী তাঁর কবিতাকে আশ্রয় করছে।

৩। পারিপার্শ্বিক জগতের সঙ্গে নিজেকে একাত্ম করছেন।

৪। পর্যবেক্ষণ ও উপলব্ধির আলো কল্পনাশ্রয়ী হচ্ছে।

৫। বিষয়বস্তুকে অবলম্বন ক’রে নিজস্ব যুক্তি ও বিচারের আলোয় অধীত শিক্ষাকে মিশিয়ে দিচ্ছেন।

৬। অবয়ব থেকে অনুভূতির ক্ষরণ ঘটছে, চুইয়ে পড়ছে বলা ভালো।

৭। সঞ্জাত সিদ্ধান্ততে উপনীত হচ্ছেন।

৮। বস্তুর সাথে মানসিক সম্পর্ক।

৯। বৈশ্বিকতার দিকে অগ্রসর হতে গিয়ে বর্ণনার মধ্যদিয়ে বিশেষকে সাধারণ করা।

১০। concrete to abstract

১১। জীবন ও জগৎ একই শরীরে মিশে খুঁড়ে চলেছে রহস্যের পথ। এক শিশুর মনস্তাত্ত্বিক ক্রমবিকাশও জায়গা নিয়েছে।

১২। ভাব শব্দের অধীনে ‘যন্ত্রের অন্তর্নিহিত তত্ত্ব, দেহবিধৃত অনুভূতি, গণিতের দর্শন, কবিতার অনুভূতি’ লেখার বীজ হয়েছে।

১৩। Psychological association, দর্শনসমীকরণ, হৃদয়াবেগ সমীকরণ।

১৩। ঘুম, ক্ষত, রহস্য, জন্ম, যৌবন, অসুখ, আলিঙ্গন, মিলন, জ্বলা, জেগে ওঠা, নিরাময়, মাধুর্য, মৃত্যু, বার্ধক্য, সুখ, আত্মহত্যা, বিরহ, নেবা, আপেক্ষিক স্থিতি, আপেক্ষিক গতি, যোগ, বিয়োগের এক আশ্চর্য সমীকরণ।

১৪। শরীর যার আছে, ভাবনাও তার আছে।

১৫। মহাকালো ও আলোর মাঝে এক পর্যটন। সম্পর্কিত কার্যকারণের ছায়ায় এসে বসে।

বলা যায় এ যা কিছু, তার রসায়নই আপনার লেখার সজীব উপস্থিতি। আপনার কাব্যরচনার উপকরণ যা আপনাকে দিয়েছে নিজস্ব রাজপথ। সময়ের মধ্যে থেকে বৃহত্তর উম্নীলন।

 

বিশ্রাম

 

‘চিরকাল একত্রিত হয়ে থাকো’

আপনার নির্মাণ সেই পথেই চলেছে। কারণ আপনি আপনার ভাবনার প্রয়োগ করেছেন আপনার লেখায়।

দেহ ও অন্তর এক এবং অভিন্ন এই ভাবনায় আপনি পৌঁছে যান অবয়ব ও ভাবের একাত্মরক্ষায়।

নারীদেহের বিভিন্ন প্রত্যঙ্গ ও কবিতার যোগ নিয়ে আপনার লেখাটার কাছে দাঁড়াই।

উত্তেজনাপূর্ণ, যৌনতাপূর্ণ এবং রহস্যময় অনুভূতি?

আপনার প্রেম একমুখী?

গায়ত্রী? ঈশ্বরী?

শারীরিক?

মানসিক?

আত্মিক?

বিকৃত?

গুপ্ত?

নগ্ন?

না?

হ্যাঁ?

প্রেম প্রেমই।

‘শুধু কৌতুকে কেন মনোলীনা অমন দুললে?’

‘মানুষীর আকৃতির মতো তুমি দেখা দিয়েছিলে’

‘আর অন্ধকার নয়, আর নয় অবাঞ্ছিত ছায়া।’

‘প্রত্যাখ্যাত প্রেম আজ অসহ ধিক্কারে আত্মলীন।’

‘পর্দার আড়ালে থেকে কেন বৃথা তর্ক ক’রে গেলে—’

‘সফল কবিতা আজ নিপুণিকা প্রেমিকার মতো’

‘ছবি আঁকবার কালে, কোনো যুবতীর ছবি আঁকার সময়ে/ তার সব প্রত্যঙ্গকে হাজির রাখাই হলো বেশি দরকারি—’

‘পরস্পর ভালোবেসে শুয়ে আছি ঈশ্বরী ও আমি ও সময়’

‘যে-কোনো সহসম্পর্ক স্থাপন প্রকৃতপক্ষে, সখি, লেহন মর্দন ঠাপ চুম্বনের মতো মান রূপে…’

‘ভুট্টাটি সহজভাবে ঢুকে গেল সঙ্গে সঙ্গে ধাক্কা শুরু করি।’

‘আমার ঠিকানা আছে তোমার বাড়িতে,/ তোমার ঠিকানা আছে আমার বাড়িতে,/চিঠি লিখব না।/আমরা একত্রে আছি বইয়ের পাতায়।’

পাঠক যে কবিতাগুলো থেকে এই লাইন তুলেছি সেগুলো খুঁজে আরেকবার পড়তে পড়তে উপরে করা পশ্নগুলোর উত্তর খুঁজুন।

প্রেম প্রেমই।

 

বিশ্রাম

 

আপনার অভিজ্ঞ ছন্দ

‘আমাদের পুরাণে ছন্দের উৎপত্তির কথা যা বলেছে তা সবাই জানেন। দুটি পাখির মধ্যে একটিকে যখন ব্যাধ মারলে তখন বাল্মীকি মনে যে ব্যথা পেলেন সেই ব্যথাকে শ্লোক দিয়ে না জানিয়ে তাঁর উপায় ছিল না। যে পাখিটা মারা গেল এবং আর যে একটি পাখি তার জন্যে কাঁদল তারা কোনকালে লুপ্ত হয়ে গেছে। কিন্তু এই নিদারুণতার ব্যথাটিকে তো কেবল কালের মাপকাঠি দিয়ে মাপা যায় না। সে-যে অনন্তের বুকে বেজে রইল। সেইজন্যে কবির শাপ ছন্দের বাহনকে নিয়ে কাল থেকে কালান্তরে ছুটতে চাইলে। হায় রে, আজও সেই ব্যাধ নানা অস্ত্র হাতে নানা বীভৎসতার মধ্যে নানা দেশে নানা আকারে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কিন্তু সেই আদিকবির শাপ শাশ্বতকালের কণ্ঠে ধ্বনিত হয়ে রইল। এই শাশ্বতকালের কথাকে প্রকাশ করবার জন্যেই তো ছন্দ।’… রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

(আপনার ছন্দ নিয়ে বলতে যাওয়া অতিরিক্ত। আপনিই সব বলেছেন প্রবন্ধে।)

কয়েকটি কথা

১। আপনিও প্রকাশ করলেন ছন্দে।

২। বাঁধলেন মুক্তি দিতেই।

৩। আপনি গণিতের মানুষ, গাণিতিক মডেল আপনার ভেতরে। আপনার ছন্দ তাই ভারসাম্য বজায় রেখেই সাবলীল।

৪। আপনার মাত্রাজ্ঞান স্মরণীয়।

৫। পরিমাপে আপনি সিদ্ধহস্ত।

৬। মিশ্রকলাবৃত্তর মতো বনেদি ছন্দের ব্যবহার আপনাকে মানাল। সংযত ও গম্ভীর ভাব তাকে মান্যতা দিলো। ঘোড়দৌড় কি আপনার কবিতায় মানায়?

 ৭। ওই ২মাত্রার জিরিয়ে নেওয়া।

৮। ছন্দের সঙ্গে জিহ্বার সম্পর্ক।

৯। আট-ছয় আট-ছয় পয়ারের ছাঁদ কয় …

১০। আপনি কানে কানে বললেন—‘কেউ নিখুঁত পয়ার লিখতে পারলেই তাকে কবি ব’লে স্বীকার করা যায়, স্বীকার করা উচিত।’

আমি হেসে মনে মনে বললাম—‘এ আপনার পয়ার লেখার নিখুঁত পদ্ধতি আবিষ্কারের আনন্দ মাত্র’।

এক বিশ্বপথিক এভাবেই হাঁটে, এক বিস্ময়বালক এভাবেই খ্যালে, এক মহামস্তিষ্ক এভাবেই চলে,

এক অবিরাম ঘড়ি থামে না

থামে না।

অসীমতায় হাত রাখে সীমায় ব’সে।

মহাবিশ্বর স্পন্দন মাপে নিজের তৈরি স্টেথোস্কোপ দিয়ে।

এক নক্ষত্র দেখি আমি।

বিনয় আপনি—

শুধু গণিতে নয়

শুধু গায়ত্রীতে নয়, ঈশ্বরীতে নয়

শুধু সঞ্জাত দর্শনে নয়

শুধু বিজ্ঞানে নয়

শুধু ছন্দে নয়

শুধু ভুট্টায় নয়

শুধু ‘প্রকৃত প্রস্তাবে’, ‘মুকুরে প্রতিফলিত’ নয়

আপনি আমার B ও ৯। আপনি কবিতাময়, কবিতাময়…

মৌমাছির রসনা মিষ্টতাকে পূর্ণ ক’রে নিলো। পান করলো।

মনে পড়ছে

একটা প্রশ্ন ক’রে আপনাকে বিব্রত ক’রে ও আপনার একটি কবিতা দিয়ে শেষ করি—

‘কে কত বড় গুরু তা বিচার হয় তার শিষ্য দিয়ে।’—আপনার গুরু হওয়ার বাসনা জেগেছিলো কেন?

 

এ জীবন / বিনয় মজুমদার

পৃথিবীর ঘাস, মাটি, মানুষ, পশু ও পাখি—সবার জীবনী লেখা হলে

আমার একার আর আলাদা জীবনী লেখা না-হলেও চলে যেতো বেশ।

আমার সকল ব্যথা প্রস্তাব প্রয়াস তবু সবই লিপিবদ্ধ থেকে যেতো।

তার মানে মানুষের, বস্তুদের, প্রাণীদের জীবন প্রকৃতপক্ষে পৃথক পৃথক

অসংখ্য জীবন নয়, সব একত্রিত হয়ে একটি জীবন মোটে; ফলে

আমি যে আলেখ্য আঁকি তা বিশ্বের সকলের যৌথ সৃষ্টি এই সব ছবি।

বল্কলে আঙুল রেখে আমি বলি ‘এ কী বলো’ এবং উত্তর পাই ‘গাছ’।

পাতায় আঙুল রেখে আমি বলি ‘এ কী বলো’ তখন উত্তর পাই ‘গাছ’।

শিকড়ে আঙুল রেখে আমি বলি, ‘এ কী বলো’ তবুও উত্তর পাই ‘গাছ’।

কুসুমে আঙুল রেখে আমি বলি ‘এ কী বলো’, এবারো উত্তর পাই ‘গাছ’।

তা সত্ত্বেও পৃথিবীতে অত্যন্ত বিশিষ্ট ব’লে ফুলকে পৃথক ক’রে ভাবি—

প্রণয়িনী ফুল বলি, এ রীতিও রয়ে গেছে; প্রকৃতিতে ব্যক্তি আছে,

                                                        ব্যক্তি পূজা আছে।

জীবন ফুরিয়ে এল, এই সব জেনে খ্যাতি তৃপ্তি প্রণয়ের সেঁক

চেয়ে চেয়ে শালবনে বাঁশবনে এ জীবন কাটিয়ে দিয়েছি।

/জেডএস/

সম্পর্কিত

চল্লিশদিন উপন্যাসের সঙ্গে সহবাস, মৃত্যু পর্যন্ত

চল্লিশদিন উপন্যাসের সঙ্গে সহবাস, মৃত্যু পর্যন্ত

আমাদের সেলিব্রেটি কবি শামসুর রাহমান

আমাদের সেলিব্রেটি কবি শামসুর রাহমান

সাহিত্যতত্ত্ব : একটি সংক্ষিপ্ত পরিক্রমা

সাহিত্যতত্ত্ব : একটি সংক্ষিপ্ত পরিক্রমা

জীবনানন্দ দাশ  একটি পথ দুর্ঘটনা বা পূর্বঘোষিত মৃত্যুর কালপঞ্জি

জীবনানন্দ দাশ একটি পথ দুর্ঘটনা বা পূর্বঘোষিত মৃত্যুর কালপঞ্জি

পর্ব—এক

চল্লিশদিন উপন্যাসের সঙ্গে সহবাস, মৃত্যু পর্যন্ত

আপডেট : ২৬ অক্টোবর ২০২১, ১২:২১

বারান্দার পরিবার আমাদের চারতলার ফ্ল্যাটে, শোওয়ার ঘরের লাগোয়া বেশ বড় বারান্দা আছে। ব্যালকনি। আবাসনের সব ফ্ল্যাটেই আছে। নানা মাপের। জমির মাপের মাননসই ও আইনসই বাড়ি বানাতেই এক এক ফ্ল্যাটের ব্যালকনির এক এক রকম মাপ। কোনোটা পশ্চিমমুখো, কোনোটা-বা পুব বা দক্ষিণমুখো, উত্তরমুখো একটাও নেই। আমাদের ব্যালকনির পেছনের ঘরের দরজা ও টানাজানালা। ডান-বাঁ-ও সম্মুখ একেবারে ফাঁকা। অবারিত। আশপাশের কোনো বাড়ি, দূরের, কিছুদূরের বা আরো দূরের, দেখায় বাধা হয়ে নেই। বাঁদিকের আকাশে, দমদম এয়ারপোর্টে এরোপ্লেন নামা-ওড়া-দেখা যায়। আরো ভালো দেখা যেত। ভি আই পি রোডে খুব উঁচু টাওয়ারে লম্বা চওড়া একটা হোর্ডিং, আর বারো-চৌদ্দতলা একটা বাড়ি, আকাশের একচিলতে আড়াল করেছে। এখানেই মাটি ছোঁয়ার আয়োজনে এরোপ্লেন চাকা নামায়, উড়ান নিতে চাকা গোটায়। এই চাকা নামানো গোটানোর ঠিকঠিক জায়গা আকাশের গায়ে নাকি এঁকে দেওয়া হয়। অনেক অঙ্ক, হিসাব-নিকাশ জ্যামিতি আছে এই আঁকার। যারা আকাশ পড়তে জানে, আকাশ পড়ার ভাষা জানে, তারাই সে-সব বুঝতে পারে। আমাদের দেখায় বাধা হয়ে যদি হোর্ডিং বা বাড়ি ওঠে, আকাশের আঁকিবুকি তো জায়গা বদলাবে না। আমাদের দেখায় একচিলতে শূন্যতা তৈরি হবে।

সূর্যের অয়নচলনের কারসাজিতে, আমাদের বারান্দা সারা শীতকাল সকাল থেকে বিকেল, আক্ষরিক অর্থেই রোদে ভেসে যায়। গরমে, শেষ সকালে, রোদ বারান্দা ছোঁয়, ছুঁয়ে থাকে বিকেল অবধি। গ্রীষ্ণের রোদহীন : দীর্ঘ বিকেল শেষ হওয়ার আগেই, দক্ষিণ সমুদ্রের হাওয়া হামলে পড়ে, খোলা দরজা-জানালা দিয়ে ঘরে ঢুকে বিপর্যস্ত করে দেয় সব। এই বারান্দা থেকে, সম্মুখের বাড়িঘর, কেষ্টপুর খালের ওপারে সল্টলেক-নিউটাউন রাজারহাটে উন্নয়নের ধুলোয় ধূসর আকাশ ছাড়িয়ে, পুবছোঁয়া-দক্ষিণ থেকে পশ্চিমছোঁয়া দক্ষিণের দিক-রেখা জুড়ে, সাত সাগর তেরো নদীর জলভারে শ্লথ ও নত মৌসুমী মেঘ, বৃষ্টির অজস্র জলধারা নিয়ে এগিয়ে আসছে—আমরা দেখতে পাই।

এই বারান্দা বা ব্যালকনি বা ঝুলবারান্দায় আমাদের দুই ভায়ের এক কল্পনার গার্হস্থ্য শুরু হয়েছিল মার্চ মাসের শেষ সপ্তাহ নাগাদ, নরেন্দ্র মোদি চারঘণ্টার নোটিশে আসমুদ্র হিমাচলে লকডাউন জারি করার পর। তিতির আমেদাবাদে নতুন চাকরিতে যোগ দিয়েছে। মাসে একবার কলকাতা আসতেই হবে, অফিসের কাজেই। সেখানে বড় দোতলা বাড়ি ভাড়া নিয়েছে। তৃপা গাজিয়াবাদের ফ্ল্যাটে তালা দিয়ে, ছেলেমেয়ে নিয়ে আমেদাবাদে সংসার গোছাচ্ছে। সেই বাড়িতে দোতলার ঘর-বারান্দার ছবি পাঠাচ্ছে, দাদা সে ঘরে থাকবে। তৃপা একটু গুছিয়ে নিলেই দাদা আমেদাবাদ যাবে।

—কী-রে আমেদাবাদ সেমি না ফাইনাল? আমেদাবাদি হবি?
—কী-ই জানি, আগে দেখে আসি।
—ও দেখতে যাবি? থাকবি না?
—তুই আমাকে কলকাতা থেকে তাড়াতে চাস কেন?
—ততাকে তাড়াবো আমি? ছেলে নাতি-নাতনিদের সঙ্গে থাকতে ইচ্ছে করে না? ওখানে গেলে গান্ধিজীকে নিয়ে উপন্যাসটা লিখবি। একা একা কতদিন থাকবি?
—কলকাতায় থেকে লেখা যাবে না? একা কোথায়, তুই তো আছিস—এরকমই নানা কথায় যেন বোঝা যাচ্ছিল, অন্তত আমার মনে হয়েছে, একা থাকার ভার পড়েছে। মনে। এরকম সময়ই লকডাউন অর্থাৎ যা ভাবা হচ্ছিল তার কোনোটাই হওয়ার সব উপায়ই বন্ধ হয়ে গেল, তিতিরের মাসে অন্তত একবার কলকাতা আসাও। কতদিন আর চলবে লকডাউন? ভাবনার কী আছে? শুরুর দিকে এরকমই ভেবেছিলাম আমরা দুজনই। খবরের কাগজের সাপ্তাহিক কলাম, পোস্ট এডিট লিখতে হচ্ছে না। কাগজ বের হওয়া, বাড়ি বাড়ি বিলি করা নিয়ে তখন এক চরম অনিশ্চয়তা। দাদার সাপ্তাহিক কলাম ‘হাওয়া যেমন’ শেষ বের হলো ২০ মার্চে। কিন্তু লেখা ছাড়া থাকবে কেমন করে? চা-জলখাবার খেতে খেতে, বারান্দায় বসে কথা হচ্ছিল এক সকালে।

—তোকে তো জুলেখা-ইয়ুসুফ শেষ করতে হবে—অর্ধেক বই নিয়ে গেছে, বাকিটা লিখে ফেল—ওরা হয়তো বইমেলায় বের করতে চাইবে।
—সে আর কতটুকু, বসলেই লেখা হয়ে যাবে।
—আজ্ঞে না, অনেকটাই লিখতে হবে।
—তুই কাজ বাড়াস—ওটা তো শেষই প্রায়।
—লিখতে বসলেই দেখবি বেড়েই যাচ্ছে, তখন গল্পের ঠাকুরকে ধরে পার হতে হবে।
—ভালো এক কল বানিয়েছিস গল্পের ঠাকুর।

দুই ভাইয়ের অট্টহাসিতে পাশের ছাদের পায়রাগুলো ঝাঁক বেঁধে উড়ান দিলো।

লকডাইনের বিচ্ছিন্ন একাকিত্ব, সার্বিকসঙ্গহীনতা মনে চেপে বসেনি তখনও।


উপন্যাসের সঙ্গে সহবাসের প্রাথমিক

ঝুলবারান্দায় দাদা বসত, ওর হিশেবে পুব দিকে পেছন দিয়ে, সেই-হিশেবের পশ্চিমমুখী হয়ে। বারান্দায় বসার আলাদা চেয়ার ছিলো। ঘরে বসে লেখার অন্যচেয়ার। বারান্দায় চেয়ারের পেছনের দিকে, বারান্দা আর জানালার গ্রিলে আটকানো, দুটো বাতিল পুরোনো ঝুলঝাড়ুতে কোনোভাবে একটা আলগা কাপড় মেলা থাকতো, রোদ আটকাতে। একটা বড় মাপের বেতের টুপি, সমুদ্রের পাড়ে যেমন পরে, মাথায় দিতে। কোলে লেখার বোর্ড, জানালার আলসেতে কলমদানিতে অগোছালো পেন, ডট, জেলপেন রাখা। কালির কলমে গল্প-উপন্যাস লিখত। অন্যলেখা ডট বা জেলপেনে। বারান্দায় চেয়ারে বসে, উঁচু করা হাঁটুতে বোর্ড রেখে একটু কুঁজো হয়ে ঝুঁকে লিখতো।

—তুই এতো দেরি করিস, বলার কথা ভুলে যাই।

দোতলা থেকে সকালের জলখাবার ও আড্ডার জন্য যেতে দশটা বেজে যায়ই। তাই বকে উঠল একদিন।

—ঘুম থেকে উঠেই তো চলে আসি।
—কটায় উঠিস?
—নটায় সাড়ে নটায়—আমার তো ধান কাটা নেই। তুই সাতসকালে উঠিস কেন?
—ঘুম ভাঙে সাড়ে সাতটা-আটটা, শুয়েই থাকি, তখনই কত কিছু ভাবি।
—ভাবতে ভাবতে আবার ঘুমিয়ে পড়বি। রাতে ঘুম হচ্ছে?
—ফাস্টকেলাস—একঘুমে রাত কাবার—তুই যে বললি জুলেখার লেখাটা শেষ করতে হবে।
—সে তো করতেই হবে, করে ফেল : তোর কাছে আছে যে কটা বেরিয়েছে?
—থাকার তো কথা—আনছি দাঁড়া।

ফাইলে পত্রিকায় বের হওয়ার ক্রমে ছাপানো কপিই সাজানো ছিলো। শেষেরটা পাণ্ডুলিপি। শারদীয় সংখ্যাতে বের হয়েছিল। সংখ্যাটা কেউ পড়তে নিয়ে ফেরত দেয়নি। আমি পাণ্ডুলিপিটাই নিয়ে এসেছিলাম। ফাইলটা নিয়ে পাতা উল্টে বন্ধ করে কোলে রেখে বলল—

—এটা থাক।
—হারাস না।
আমার কথার উত্তর না-দিয়ে, আমার পেছনের আকাশে তাকিয়ে, একটু অন্যমনস্ক স্বরে যেন নিজেকেই বলল

—একটা ম্যাপ লাগবে।
—কীসের ম্যাপ?
—ইয়সুফ তো ঘুরবে এখন, মেডিটারেইয়ানের পশ্চিমে দক্ষিণে পুবে, মরুভূমিতে। জুলেখার তো ইয়ুসুফকে পেতে হবেই—একটা ম্যাপ চাই—এখানে উত্তর তো এইদিকে—দাদা ওর ডানদিকে তাকায়।
—এই উত্তরের সঙ্গে ইয়ুসুফের উত্তরের কী সম্পর্ক?
—তোর কী ধারণা? উত্তর দক্ষিণ সবখানেই এক?
—আরে উত্তর তো উত্তরেই থাকবে—ম্যাপের উপরের দিকটাই তো উত্তর।
—উত্তর-দক্ষিণ চিনিস? ম্যাপ যদি না থাকে।
—জন্মের থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখেছি সকাল-সন্ধ্যা, আমি উত্তর চিনি না? আমি কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখে উত্তর চিনেছি, আর কেউ হয়তো কোনো বটগাছ দেখে চেনে—তাতে তো দিক বদলে যায় না। চিহ্নগুলো বদলে গেলেও দিক তত দিকই থাকে।
—দিকচিহ্ন বদলালে সবই তো উল্টেপাল্টে যার রে। ধূ ধূ মরুভূমিতে চিহ্ন পাবি কোথায়? তখন দিক বানাতে হয়।
—দিক বানানো যায়?
—নিতে হয় কখনো—আমাকে একবার বানাতে হয়েছিলো। হায় হায় পাথারে, পূর্ণিমা ছিলো বোধহয়। আমি আর স্থানীয় একজন সাইকেলে, তার রাস্তা চেনার কথা। রাস্তা আর কোথায়, ওই জোড়া শালগাছের ডান দিকে ঘুরতে হবে, বা মরা শিমুলের পাশ দিয়ে—তো সেই জ্যোৎস্নায় শাল শিমুল সব এক রকম। যখন বুঝলাম রাস্তা হারিয়েছি, একটা গাছের নিচে সাইকেল থেকে নেমে দাঁড়ালাম। সঙ্গের মানুষটি পাগলের মতো চারপাশে কী যেন খুঁজছে। জিগ্যেস করলে বলল আলো খুঁজছে। চাঁদের আলো না, চেনা কোনো আলো, লন্ঠনের বা কুপির, বিড়ি ধরাবার জন্য জ্বালানো দেশলাইয়ের কাঠির মাথার আগুন—খুব বিরক্ত হয়ে বলল

—শালারা কেউ বিড়িও ধরায় না। আমি জিগ্যেস করলাম—আমাদের কোন দিক যাওয়ার কথা? ও বলল কথা তো ছিলো সোজা গিয়ে বড়ইগাছের ঝোপটাকে পাক দিয়ে—সেসব পাব কোথায়? সবই তো একাকার হয়ে গেছে। দিক ঠিক হারিয়ে গেল। সে এক কাণ্ড—দিকও হারায় বুঝলি?

—তোদের দিকভ্রম হয়েছিল—দিক তো দিকেই ছিলো...
—আরে দিক কি একটা? দিকেরও নানাদিক আছে, দিকও তো দিক বদলাতে পারে।
—ম্যাপটা কীভাবে বানাবি? তোর দরকারে দিক বদলে নাকি দিককে দিকে রেখে?
—সে ভেবে দেখা যাবে—এখান থেকে উত্তর-দক্ষিণ বলতে পারবি?
—আগে তুই বল।

দাদা হাতের অলস ভঙ্গিতে মাথার পেছন দেখিয়ে বলল ‘পূর্ব’, ডানপাশের জানালা দেখিয়ে বলল—উত্তর, ওদিকে পশ্চিম, আর বাঁদিকের দিগন্তপ্রসারী শূন্যতার দিকে তাকিয়ে বলল ‘দক্ষিণ’।

—কী করে বুঝলি?
—যেমন করে লোকে বোঝে।
—দাঁড়া একবার দেখে নেই।
—কীভাবে দেখবি?

আমার স্মার্টফোনে কম্পাসও আছে নাতির কাছে শিখেছি মেঝেতে কাগজ পেতে, তার ওপর মোবাইল রেখে, বোতাম টিপে কম্পাস বের করার পর দেখা গেল, ছোড়দার দেখানো উত্তর আসলে উত্তর-পূর্ব, ওর মাথার পেছনে দক্ষিণ-পূর্ব, তাহলে দক্ষিণকেও জায়গা বদল করতে হয়। ছোড়া মোবাইলের ফোনের কম্পাসে উত্তর-দক্ষিণ মানতে অস্বীকার করলে আমাদের বাড়িতে যেমন হয়, ডাক পেয়ে সখা বড় কম্পাস ও তার বাবাকে নিয়ে দিক মাপতে এলো দোতলা থেকে।

—আরে এত বছর ধরে জেনে এলাম এটা দক্ষিণ, আর তোদের কম্পাস সেটাকে দক্ষিণ-পশ্চিম বললেই মানতে হবে? বল গোপাল—আমার ছেলেকে দাদা গোপাল ডাকে। আমার মা-ও ডাকতেন।
—তোমার কি দরকার বলো তো? এটাও তো দক্ষিণ, দক্ষিণ-পশ্চিম তো দক্ষিণের একটা দিক। তোমার দক্ষিণ এটাই, তোমার তো একটা দক্ষিণ চাইধরে নাও এটাই তোমার দক্ষিণ, অত ভাগাভাগি করার দরকার নেই, ঝামেলা বাড়বে।
—আমিও তো তাই বলছি—তোর বাবাই তো খেলনার ফোনের কম্পাসে মেপে বলল দিকের-ও নাকি নানা দিক আছে।
—আমি কোথায় বললাম, তুই-ই তো বললি দরকারে দিক বানাতেও হয়।
—হারানো দিক না বানালে তো পৌঁছুতে পারবি না কোথাও। চলবে

/জেডএস/

সম্পর্কিত

আমাদের সেলিব্রেটি কবি শামসুর রাহমান

আমাদের সেলিব্রেটি কবি শামসুর রাহমান

সাহিত্যতত্ত্ব : একটি সংক্ষিপ্ত পরিক্রমা

সাহিত্যতত্ত্ব : একটি সংক্ষিপ্ত পরিক্রমা

জীবনানন্দ দাশ  একটি পথ দুর্ঘটনা বা পূর্বঘোষিত মৃত্যুর কালপঞ্জি

জীবনানন্দ দাশ একটি পথ দুর্ঘটনা বা পূর্বঘোষিত মৃত্যুর কালপঞ্জি

ছাদবাগানে ফুলের ঘ্রাণে তবে রসায়ন কমে যাক

ছাদবাগানে ফুলের ঘ্রাণে তবে রসায়ন কমে যাক

আমাদের সেলিব্রেটি কবি শামসুর রাহমান

আপডেট : ২৩ অক্টোবর ২০২১, ০৯:৩৫

সব কবি সেলিব্রেটি হন না, কোনো কোনো কবি হন। বাংলাদেশের কবিদের মধ্যে শামসুর রাহমান জীবদ্দশায় ছিলেন সেলিব্রেটি, দেশব্যাপী পরিচিত মুখ। শামসুর রাহমানের সঙ্গে প্রথম দেখা হয়েছিল একটি ছোটকাগজকে উপলক্ষ্য করে। কবিবন্ধু পলাশ দত্ত, সাইফুল শামীম ও আমি একটি ছোটকাগজ সম্পাদনা করতাম। নাম ‘প্রাণ-স্রোত’। এর দ্বিতীয় সংখ্যায়ই আমরা প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম আবুল হাসানকে নিয়ে একটি সংখ্যা করার। তখন আবুল হাসানের কবিতাসমগ্র পড়তে গিয়ে আমাদের চোখে পড়ে, ওই বইয়ের শুরুতেই শামসুর রাহমানের দুপৃষ্ঠার একটি ভূমিকা। পলাশ আর আমি সিদ্ধান্ত নেই শামসুর রাহমানের আবুল হাসান বিষয়ে সাক্ষাৎকার নেওয়ার। পরে ১৯৯৮ সালের কোনো একদিন আমরা সদ্য কৈশোর পেরুনো দুই তরুণ হাজির হই প্রথমবারের মতো শামসুর রাহমানের শ্যামলীর বাসভবনে। সেই যে প্রথম যাওয়া, এরপর বহুবার গিয়েছি তাঁর বাসায়। মজার ব্যাপার হচ্ছে প্রথম দিকে তিনি আমাকে ‘আপনি আপনি’ বলে সম্বোধন করতেন। তাঁর এই অতি বিনয়ী আচরণ, আমার জন্য খুবই অস্বস্তিকর ছিল। আমি একদিন যখন বললাম ‘রাহমান ভাই, আমাকে তুমি করে বইলেন।’ এরপর মুচকি এক হাসি দিয়ে তিনি আমাকে তুমি করে বলতে শুরু করেন।

শামসুর রাহমানের সাথে একটা বিষয়ে আমার মিল আছে,—আমাদের উভয়েরই জন্মদিন ২৩ অক্টোবর। আমার জন্মেরও ৪৮ বছর আগে ১৯২৯ সালে তিনি এ পৃথিবীতে এসেছিলেন। রাহমান ভাইয়ের জীবদ্দশায় দেখতাম তাঁর জন্মদিনটা বেশ ঘটা করেই বিভিন্ন দৈনিকের সাময়িকীগুলো পালন করত। ওই বছরগুলোতে আমি আমার জন্মদিনটা কাটাতাম বেশিরভাগ সময় শহরের রাস্তায় কিংবা চিড়িয়াখানায় একা একা ঘুড়ে। আমার কেন যেন তখন রাহমান ভাইয়ের কথাই মনে পড়ত। 

প্রশ্ন হচ্ছে, কেবল উৎকৃষ্টমানের কবিতা লিখলেই কি সেলিব্রেটি হওয়া যায়? নিশ্চয় না, আরও বাড়তি কিছু গুণের প্রয়োজন হয়—যা শামসুর রাহমানের ছিল। সপ্তম শ্রেণির ছাত্র থাকা অবস্থায় ছোট বোন নেহারের মৃত্যুতে একটি কবিতা লেখেন তিনি। তাঁর লেখা জীবনের প্রথম এই কবিতাটি শুনে তাঁর মা কেঁদেছিলেন। এরপর তিনি লিখেছেন অসংখ্য কবিতা। বাংলাদেশের স্বাধীনতার সংগ্রামসহ বাঙালি-নাগরিক জীবনের নানা চিত্র বিভিন্ন সময়ে উঠে এসেছে তাঁর কবিতায়। ১৯৬৮ সালে আইয়ুব খান তৎকালীন পাকিস্তানের সব ভাষায় অভিন্ন রোমান হরফ চালু করার প্রস্তাব করলে ৪১ জন কবি, সাংবাদিক, সাহিত্যিক বুদ্ধিজীবী, শিক্ষক ও সংস্কৃতিকর্মীর সঙ্গে এর বিরুদ্ধে বিবৃতি দেন শামসুর রাহমান। এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতেই পরে তিনি লেখেন ‘বর্ণমালা, আমার দুঃখিনী বর্ণমালা’। ১৯৬৯ সালের ২০ জানুয়ারি গুলিস্তানে একটি মিছিলের সামনে একটি লাঠিতে শহিদ আসাদের রক্তাক্ত শার্ট দিয়ে বানানো পতাকা দেখে মানসিকভাবে আলোড়িত হয়ে, সন্ধ্যায় বাসায় ফিরেই লেখেন ‘আসাদের শার্ট’ কবিতাটি। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় পরিবার নিয়ে চলে যান নরসিংদী পাড়াতলী গ্রামে। এপ্রিলের প্রথম দিকে লেখেন তাঁর বিখ্যাত ‘স্বাধীনতা তুমি’ ও ‘তোমাকে পাওয়ার জন্য হে স্বাধীনতা’ কবিতাদুটি। এভাবেই অসংখ্যবার দেশের নানান সংকটময় মুহূর্ত ইতিহাসের ছবি হয়ে উঠে এসেছে তাঁর কবিতায়। আর এসব কবিতা রচনার মধ্যদিয়েই তিনি আমাদের বাংলাদেশের ইতিহাসেরও অংশ হয়ে ওঠেন। বাংলাদেশের যেকোনো আন্দোলন-সংগ্রামকে বিষয় করে কবিতা করে তুলতে পারার সক্ষমতার ক্ষেত্রে তাঁর সাফল্য প্রশ্নাতীত। ফলে বাংলাদেশের নানান ইস্যুতে বারবারই শামসুর রাহমানের কবিতা প্রসঙ্গ হয়ে ওঠে। এছাড়া শহর ঢাকার অলিগলি ও জনজীবন তাঁর কবিতায় যেভাবে এসেছে তা খুব কম কবির কবিতাতে পাওয়া যায়।

মনে পড়ছে, একদিন শহরের কোনো এক হৈ-হল্লামুখর গলি দিয়ে রিকশার টুংটাং বেল শুনতে শুনতে যাত্রী হয়ে কোথাও যাচ্ছি। এমন সময় চোখে পড়ল—রাস্তার পাশে একটা গাছ মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো কিন্তু গাছটার মাথার ডালপালা অনেকখানি কেটে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কী কারণে কাটা হলো, এটা একটু মন দিয়ে তাকালেই টের পাওয়া যায়। কারণটা হলো : ওই গাছটা বেড়ে ওঠায় একটা পণ্যের বিজ্ঞাপন তাঁর মুখ দেখাতে ব্যর্থ হচ্ছিলো।
কিন্তু গাছ তো প্রতিবাদহীন; গাছ যেন যীশুখ্রিস্টর মতো নীরবে মানুষের সমস্ত পাপের শাস্তি একাই হজম করে কর্পোরেট পৃথিবীর মানুষদের মুক্ত করতে চাইছে। গাছের এ কর্তন আমি বা আমরা কি মেনে নিতে পারি? আমরা তো স্বপ্ন দেখি সুন্দর একটা শহরের, যেখানে গাছ থাকছে তার নিজস্ব অধিকার নিয়ে। কেমন সে শহর, তা নিয়ে ভাবতে গেলেই মনে পড়ে গিয়েছিল শামসুর রাহমানেরই কবিতার কয়েক লাইন—

হেঁটে যেতে যেতে
বিজ্ঞাপন এবং সাইনবোর্ডগুলো মুছে ফেলে
সেখানে আমার প্রিয় কবিতাবলীর
উজ্জ্বল লাইন বসালাম;
প্রতিটি পথের মোড়ে পিকাসো মাতিস আর ক্যান্ডিনিস্কি দিলাম ঝুলিয়ে।
[ হরতাল ]

শামসুর রাহমান কবিতা, গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, অনুবাদ ও শিশুসাহিত্যসহ লিখেছেন শতাধিক বই। সম্ভবত বাংলা কবিতায় এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি সংখ্যক কবিতা লিখেছেন তিনি। জীবনের শেষ দুই দশক দেশের প্রধান কবি হিসেবে রাষ্ট্রীয় নানান অনুষ্ঠানে শামসুর রাহমানকে উপস্থিত হতে দেখা যেত। যেকোনো বিশেষ দিবস উপলক্ষ্যে আট-দশটি পত্রিকা তাঁর কবিতাকে লিড করত, আর এসব কবিতাই হতো নতুন লেখা। অর্থাৎ, যারাই তাঁর কাছে লেখা চাইতেন, তিনি তাদের ‘না’ করতেন না। তাঁর কবিতার একটি বিখ্যাত লাইন হচ্ছে—‘যদি বেঁচে যাই একদিন আরো/লিখবো’। তিনি সত্যি সত্যি লিখে গেছেন সারা জীবন। শেষ বয়সে তিনি প্রায় প্রতিদিন কবিতা লিখতেন।  স্বাভাবিকভাবে কবি হিসেবে তিনি ছিলেন সর্বাধিক পরিচিত ও আলোচিত মুখ। দৈনন্দিন জীবনের ঘটনা, বিক্ষিপ্ততা ও কম্প্রোমাইজজনিত জটিলতা বা ক্ষুব্ধতাগুলোকে তিনি কবিতার মধ্যদিয়ে প্রকাশ করতেন। দৈনন্দিনতাকে অক্ষরবৃত্তের চালে কবিতা করে তুলতেন। আজ যখন তাঁর সেসময়ের কবিতাগুলো পড়তে যাই, মনে হয়—হয়তো তিনি শেষদিকে কবিতার মাধ্যমে দিনলিপি লিখতেন। দৈনন্দিন জীবনের যা কিছু আজ আমরা স্ট্যাটাস আকারে ফেইসবুকে লিখি, তিনি তাকে কবিতায় রূপান্তর করে লিখেতেন। তাঁর সময় ও ভাবনাজগৎকে চিহ্নিত করার জন্য যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

 

২.

নব্বই দশকের মাঝামাঝিতে শামসুর রাহমানের ‘উত্তর’ কবিতাটি মানুষের মুখে মুখে শোনা যেত কিছুটা পরিবর্তীত রূপে। ১৯৯৫ সালে কবিতাটিকে গানে রূপান্তরিত করে ‘নগরবাউল’ অ্যালবামের জন্য জেমস গেয়েছিলেন ‘তারায় তারায়’। সম্প্রতি শামসুর রাহমানের ‘উত্তর’ কবিতাটি পড়ছিলাম—

তুমি হে সুন্দরীতমা নীলিমার দিকে তাকিয়ে বলতেই পারো

‘এই আকাশ আমার’
কিন্তু নীল আকাশ কোনো উত্তর দেবে না।
সন্ধ্যেবেলা ক্যামেলিয়া হাতে নিয়ে বলতেই পারো,
‘ফুল তুই আমার’
তবু ফুল থাকবে নীরব নিজের সৌরভে আচ্ছন্ন হয়ে।
জ্যোত্স্না লুটিয়ে পড়লে তোমার ঘরে,
তোমার বলার অধিকার আছে, ‘এ জ্যোত্স্না আমার’
কিন্তু চাঁদিনী থাকবে নিরুত্তর।
মানুষ আমি, আমার চোখে চোখ রেখে
যদি বলো, ‘তুমি একান্ত আমার’, কী করে থাকবো নির্বাক?
তারায় তারায় রটিয়ে দেবো, ‘আমি তোমার, তুমি আমার’।

উত্তর/ শামসুর রাহমান

মূল কবিতার সঙ্গে যখন গানের লিরিক মিলিয়ে পড়তে যাই, তখন লক্ষ করি জেমস কিভাবে কবিতাটির কিছু-কিছু জায়গা বদল করেছেন। যেমন কারও উপন্যাস বা গল্প নিয়ে সিনেমা বানানোর সময় করা হয়। এ পরিবর্তন কি শামসুর রাহমান স্বাভাবিকভাবে মেনে নিয়েছিলেন। নিশ্চয় মেনে নিয়েছিলেন, তা-নাহলে তো তিনি প্রতিবাদ করতেন। পাঠকদের জন্য তুলে দেওয়া হলো জেমসের রূপান্তর করা গানের লিরিকটি।

সুন্দরীতমা আমার
তুমি নীলিমার দিকে তাকিয়ে বলতে পারো
এই আকাশ আমার।

নীলাকাশ রবে নিরুত্তর
মানুষ আমি চেয়ে দেখো
নীলাকাশ রবে নিরুত্তর
যদি তুমি বলো আমি একান্ত তোমার,
আমি তারায় তারায় রটিয়ে দেবো তুমি আমার
আমি তারায় তারায় রটিয়ে দেবো আমি তোমার।

ক্যামেলিয়া হাতে এই সন্ধ্যায়
ভালবেসে যতো খুশি বলতে পারো এই ফুল আমার।

ফুল শুধু ছড়াবে সৌরভ লজ্জায় বলবে না কিছু
ফুল শুধু ছড়াবে সৌরভ লজ্জায় বলবে না কিছুই
ফুল থাকবে নীরব।

আমি তারায় তারায় রটিয়ে দেবো তুমি আমার
আমি তারায় তারায় রটিয়ে দেবো আমি তোমার।

জোছনা লুটালে তুমি অধিকার নিয়ে বলতে পারো
এই জোছনা আমার।
এই চাঁদ খুঁজবে না উত্তর একবার যদি বলো
এই চাঁদ খুঁজবে না উত্তর একবার যদি বলো আমাকে

আমি থাকবো না নির্বাক,
আমি তারায় তারায় রটিয়ে দেবো তুমি আমার
আমি তারায় তারায় রটিয়ে দেবো আমি তোমার।

আমি তারায় তারায় রটিয়ে দেবো
আমি তোমার তুমি আমার।

তারায় তারায় / জেমস

লক্ষ্যণীয় বিষয়, জেমস তাঁর কবিতার লাইনের কিছু কিছু জায়গা সংক্ষিপ্ত করেছেন, কিছু লাইন ঘুরিয়ে দিয়েছেন। আর এর ভেতর দিয়েই একটি কবিতা গান হয়ে উঠল।

 

৩.

শামসুর রাহমান যে ভাষায় কবিতা লিখতেন, তাঁর পরবর্তী কয়েক দশকের বহু কবি সে ভাষা দ্বারা এতটাই আচ্ছন্ন ছিলেন যে, এক সময় তা অতি ব্যবহারে জীর্ণ হতে থাকে। প্রয়োজন হয় কবিতার ভাষাভঙ্গি বদলের। ফলে আশির দশকের মাঝামাঝি থেকে শুরু করে পরবর্তী দশকের তরুণ কবিদের মধ্যে ব্যক্তি শামসুর রাহমানের প্রভাব থাকলেও, তাঁর কবিতার প্রভাব কিছুটা ম্লান হতে থাকে। বদলে যেতে থাকে কবিতার ভাষা ও ভঙ্গি। কবিতায় বাড়তে থাকে বিষয়বৈচিত্র্য। তাঁর কবিতার প্রকাশভঙ্গি নিয়ে অতিকথনের অভিযোগ ওঠে, যে অভিযোগ আজকের তরুণদের মুখেও হরহামেশা শোনা যায়। রবীন্দ্রনাথের কবিতা নিয়েও এমন অভিযোগ রয়েছে। হয়তো এ কারণেই রবীন্দ্রনাথ এক সময় লিখেছিলেন—

‘ইংরেজিতে অনেক সময় আট-দশ লাইনের একটি ছোট কবিতা লঘুবাণের মতো ক্ষিপ্রগতিতে হৃদয়ে প্রবেশ করিয়া মর্মের মধ্যে বিদ্ধ হইয়া থাকে। বাংলায় ছোট কবিতা আমাদের হৃদয়ের স্বাভাবিক জড়তায় আঘাত দিতে পারে না। বোধ করি কতকটা সেই কারণে আমাদের ভাষার এই খর্বতা আমরা অত্যুক্তি দ্বারা পূরণ করিয়া লইতে চেষ্টা করি। একটা কথা বাহুল্য করিয়া না বলিলে আমাদের ভাষায় বড়ই ফাঁকা শোনায় এবং সে কথা কাহারো কানে পৌঁছায় না। সেইজন্য সংক্ষিপ্ত সংহত রচনা আমাদের দেশে প্রচলিত নাই বলিলেই হয়। কোনো লেখা অত্যুক্তি পুনরুক্তি বিস্তারিত ব্যাখ্যা এবং আড়ম্বরপূর্ণ না হইলে সাধারণত গ্রাহ্য হয় না।—[ বাংলা শব্দ ও ছন্দ,  রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ]

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলা কবিতায় অতিকথন থাকার বিষয়টাকে ভাষার খর্বতা হিসেবে দেখেছেন। বিষয়টা কি আদৌ তাই? আমরা যদি চর্যাপদের দিকে তাকাই কিংবা বৈষ্ণব পদাবলীর দিকে, দেখব সে-সময় অতিকথনহীন ছোট ছোট কবিতা লিখিত হতো। এসময়ে এসেও ছোট-বড় সব ধরনের কবিতাই লিখিত হচ্ছে। আসলে কখনও কখনও কবিতার ভাব ও রসকে পাঠক হৃদয়ে পরিপূর্ণভাবে সংক্রমিত করতে অতিকথনের প্রয়োজন পড়ে। রবীন্দ্রনাথ কিংবা শামসুর রাহমানর অনেক কবিতা পড়তে গিয়ে তাই-ই মনে হয়েছে। এরপরও বলব, কোথাও-কোথাও অতিকথন তাঁর কবিতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করতেই পারে, তবে তা যেন ঢালাওভাবে না হয়!

শামসুর রাহমানের কবিতার ইতিবাচক দিক হচ্ছে, চলমান জীবনে মানুষের মুখে মুখে ফেরার মতন অসংখ্য স্মরণীয় লাইন রয়েছে। তাঁর কবিতা যারা নিবিড়ভাবে পড়বে, নানান পর্যায়েই তাঁর লাইনগুলো স্মরণ করবে। যেমন এ মুহূর্তে মনে পড়ছে — 

যেখানে আকাট মূর্খ শব্দটি মানায় চমৎকার

সেখানে পণ্ডিত ব্যবহার করে আহ্লাদে আটখানা

হয়ে যাই। শত্রুস্থলে বন্ধু শব্দটিকে

হরহামেশাই

জিভের ডগায়

নাচাই এবং যারা অতি খর্বকায়

তাদের সপক্ষে দীর্ঘকায় বিশ্লেষণ

সাজিয়ে নরক করি গুলজার

[ইদানীং বঙ্গীয় শব্দকোষ/শামসুর রাহমান ]

/জেডএস/

সম্পর্কিত

চল্লিশদিন উপন্যাসের সঙ্গে সহবাস, মৃত্যু পর্যন্ত

চল্লিশদিন উপন্যাসের সঙ্গে সহবাস, মৃত্যু পর্যন্ত

সাহিত্যতত্ত্ব : একটি সংক্ষিপ্ত পরিক্রমা

সাহিত্যতত্ত্ব : একটি সংক্ষিপ্ত পরিক্রমা

জীবনানন্দ দাশ  একটি পথ দুর্ঘটনা বা পূর্বঘোষিত মৃত্যুর কালপঞ্জি

জীবনানন্দ দাশ একটি পথ দুর্ঘটনা বা পূর্বঘোষিত মৃত্যুর কালপঞ্জি

ছাদবাগানে ফুলের ঘ্রাণে তবে রসায়ন কমে যাক

ছাদবাগানে ফুলের ঘ্রাণে তবে রসায়ন কমে যাক

পর্ব—সাত

সাহিত্যতত্ত্ব : একটি সংক্ষিপ্ত পরিক্রমা

আপডেট : ২২ অক্টোবর ২০২১, ১৭:১১

পূর্বপ্রকাশের পর

 রিডার রেসপন্স থিয়রি : অবভাসবাদ বা ফেনোমেনোলজি

যেমনটা আগেই বলেছি, বিংশ শতকীয় সাহিত্যতাত্ত্বিক ধারণাসমূহ একে অপরের সাথে সময়ানুক্রম রক্ষা করে না। উদাহরণস্বরূপ, রিডার রেসপন্স থিয়রিকে আমরা কোন সময়ের থিয়রি ধরব তা সঠিক করে বলতে পারি না। একদিকে এটি যেমন বিংশ শতকের শেষ দুদশকের আগে উচ্চারিত হতে শুনি না, অপরদিকে তেমনি এটি উচ্চারিত হবার পরে দেখি এর তাত্ত্বিক জন্ম হয়েছিল বিংশ শতকের প্রথম দিকে, শতাব্দীর তৃতীয় দশকে অবভাসবাদ নামক দার্শনিক তত্ত্বের সাথে।

সাহিত্যতাত্ত্বিক ধারণাগুলোকে চারটি ভাগে ভাগ করে নেওয়া যায় : লেখককেন্দ্রিক তত্ত্ব ((author-centred theory), লেখাকেন্দ্রিক তত্ত্ব (text-centred theory), পাঠককেন্দ্রিক তত্ত্ব (reader-centred theory) ও লেখার প্রসঙ্গকেন্দ্রিক তত্ত্ব (context-centred theory)। লেখককেন্দ্রিক তত্ত্বের (author-centred theory) উদাহরণ হিসেবে পুরনো যুগ থেকে বলা যায় রোমান্টিসিজম, আর বিংশ শতক থেকে বলা যায় সাইকো-অ্যানালাইটিকাল থিয়রি। লেখা বা টেক্সট-কেন্দ্রিক তত্ত্বের উদাহরণ যেমন : নিউ ক্রিটিসিজম, রাশিয়ান ফরমালিজম, বাখতিনিয়ান ডায়লজিজম, স্ট্রাকচারালিজম, পোস্ট-স্ট্রাকচারালিজম ইত্যাদি। অবভাসবাদ পাঠককেন্দ্রিক সাহিত্যতত্ত্বের একটি উদাহরণ। মার্কসিস্ট থিয়রি, ফেমিনিস্টিক থিয়রি, পোস্ট-কলোনিয়াল থিয়রি ইত্যাদি সবই লেখার প্রসঙ্গকেন্দ্রিক সাহিত্যতত্ত্বের উদাহরণ।

রিডার রেসপন্স থিয়রির জন্ম অবভাসবাদ থেকে; আর অবভাসবাদ বা ফেনোমেনোলজি নিয়ে আলোচনায় প্রথমেই যাঁর কথা বলতে হয় তিনি হলেন এডমান্ড হুসার্ল (১৮৫৯-১৯৩৮)। হুসার্ল পেশাগতভাবে গণিতশাস্ত্রবিদ হলেও তিনিই মূলত দর্শনের ফেনোমেনোলজি নামক ধারণার জনক বা প্রবর্তক। দর্শনের এই ধারা প্রবর্তিত হয়েছে তাঁর Pure Phenomenology : Its Method and Its Field of Investigation নামক বিখ্যাত প্রবন্ধের মাধ্যমে। এই প্রবন্ধের মাঝামাঝি হুসার্ল লিখেছেন No object of the category ‘work of art’ could occur in the objectivational world of any being who was devoid of all aesthetic sensibility, who was, so to speak, aesthetically blind. এই বাক্যের ব্যাখ্যায় আমরা বুঝতে পারব ফেনোমেনোলজি কীভাবে পাঠককেন্দ্রিক সাহিত্যতত্ত্বের বিষয়। সাধারণভাবে, অবজেক্ট হলো সেইসব বস্তু যারা চেতনারাজ্যের বাইরে অবস্থিত থাকে। কিন্তু ফেনোমেনোলজি বলে যে, বস্তু তখনই বস্তু হয় যখন তারা আমার চেতনারাজ্যে প্রবেশ করে। যখন আমি বস্তু হিসেবে একটি পেন্সিলের নাম করি তখন মুখ থেকে এমন কোনো বস্তু বের হয় না বা যে শোনে তার কাছে এমন কোনো বস্তু পৌঁছায় না যা হাতে ধরে নিয়েই লেখা শুরু করা যায়। বরং যা মুখ থেকে নিসৃত হয় বা যা শ্রোতার কানে পৌঁছায় তা হলো চেতনায় ধৃত একটি বস্তু যার অস্তিত্ব চেতনার ভিতরেই নির্ভর করে। চেতনায় ধারণের মাধ্যমে এভাবে অস্তিত্বশীল হয়ে ওঠা বস্তু হলো দর্শনের সংজ্ঞায় ফেনোমেনন। দর্শন অবশ্য বলে যে, মানুষের চেতনা বা অনুভবের ওপর নির্ভরশীলতা ছাড়াও স্বাধীনভাবে অস্তিত্বশীল হয়ে ওঠার মতো বস্তু প্রতিটি বস্তুতেই আছে, দর্শনের ভাষায় যার নাম হলো নুমেনন। তবে যেহেতু নুমেনন জাতীয় বস্তু তার অস্তিত্বশীল হয়ে ওঠার জন্য মানুষের চেতনা বা অনুভবের ওপরে নির্ভর করে না তাই নুমেনন জাতীয় বস্তু আদতে কী বস্তু তা মানুষের পক্ষে জানাও সম্ভব নয়। মানুষের পক্ষে বস্তুজগতের যেটুকু জানা সম্ভব সেটুকু হলো ফেনোমেনন। পেন্সিল নামের বস্তুটির যেটুকু মানুষের অনুভবে ও চেতনার রাজ্যে প্রবেশ করতে পারে মানুষের পক্ষে পেন্সিলের সেটুকুই জানা সম্ভব, আর সেটুকুই হলো পেন্সিলের ফেনোমেনন। পেন্সিলের মধ্যে বস্তুসত্যের আরো যদি কিছু থেকে থাকে তার নাম নুমেনন যা মানুষ কখনো জানতে পারে না। ফেনোমেনোলজি বস্তুর এই নুমেনন রূপকে অস্বীকার করে কারণ এটি মানুষের জ্ঞানের বাইরে। ফেনোমেনোলজি তাই বস্তুর ফেনোমেননকেই স্বীকার করে, নুমেননের বিষয়ে বলে—‘সে নিয়ে আমরা না ভাবি’। নুমেনন সম্পর্কে ভাবনা বন্ধের এই আদেশকে বলা হয় ‘ফেনোমেনোলজিকাল ইপোকে’ (phenomenological epoche)।

এখানে আরেকটি বিষয় স্পষ্ট করা দরকার। উপরের উদ্ধৃত বাক্যে অবজেক্টিভেশনাল ওয়ার্ল্ড বলতে যে বস্তুজগৎকে বোঝানো হয়েছে তা ফেনোমেনোলজিকাল বস্তুজগৎ। এই জগতে বস্তু যেভাবেই অনুভবে বা চেতনায় উপস্থিত হবে সেভাবেই তাকে বস্তু হিসেবে মেনে নেওয়া হবে। এমনকি ‘ম্যাকবেথ’ নাটকে হ্যালুসিনেশন বা চেতনার ভ্রমে যে তলোয়ার ম্যাকবেথ দেখেছেন তাও ফেনোমেনোলজিকাল বস্তুজগতের অংশ। এটা বস্তুর অস্তিত্ব যা বস্তুর প্রতি ধাবিত অনুভবকারীর আকাঙ্ক্ষা বা ইচ্ছাশক্তির (intentionality) ওপর অনেকখানি নির্ভরশীল। ফেনোমেনোলজিতে এই ইচ্ছাশক্তির এতই শক্তি যে তা যে বস্তুর প্রতি ধাবিত হয় সে বস্তু অন্যদশ জনের অনুভবে অস্তিত্বশীল না হলেও নির্দিষ্ট অনুভবকারীর নিকট তা অবজেক্টিভেশনাল ওয়ার্ল্ডের তথা ফেনোমেনোলজিকাল বন্তু জগতের অংশ, অর্থাৎ সে অস্তিত্বশীল বস্তু, যেমন ম্যাকবেথের দেখা তলোয়ার বা লেডি ম্যাকবেথের হাতের রক্ত। ফেনোমেনোলজির এই ধারণাটুকুই রিডার রেসপপ্স থিয়রির দার্শনিক ভিত্তি।

এই ভিত্তির বলেই ফেনোমেনোলজিস্টরা বলে যে, বস্তুর চরিত্র ও বৈশিষ্ট্য নির্ণীত হয় অনুভবের ইন্দ্রিয় দ্বারা। অন্য কথায় বস্তুর ছুরত ও ছিফত অনুভবকারীর ইন্দ্রিয়ের ও চেতনার দান। এই কথা যদি দার্শনিকভাবে মেনে নেওয়া হয় তাহলে ফরমালিজম আর নিউক্রিটিসিজমের প্রবর্তকরা সাহিত্যকর্মের অর্থ ও বিষয়বস্তু উক্ত সাহিত্যকর্মের ভিতরে স্বাধীনভাবে অস্তিত্বশীল ধরে যতসব তত্ত্বকথা বলেছেন তার আর দার্শনিক ভিত্তি থাকে না। কারণ ফেনোমেনোলজিস্টরা বলেন যে, সাহিত্যকর্মটি নিজেই স্বাধীনভাবে অস্তিত্বশীল কিছু নয়। তাকে অস্তিত্বশীল হতে হয় অনুভবকারীর তথা পাঠকের চেতনা ও অনুভবের মধ্যদিয়ে। ফলে কোনো সাহিত্যকর্মের অর্থ ও বিষয়বস্তু সবই নির্ভর করবে পাঠকের অনুভবে ও চেতনায় তা কীভাবে অর্থবহ ও অস্তিত্বশীল হয়ে উঠবে তার ওপরে। উপরে উদ্ধৃত হুসার্লের বাক্যটির প্রসঙ্গ টেনে আবারো বলা যায়, যে-মানুষটির চেতনা ও ইন্দ্রিয়ে নন্দনবিষয়ক কোনো অনুভবশক্তি নেই তার কাছে বস্তু জগতে সুন্দর বা শৈল্পিক বলে কোনো বস্তু থাকতে পারে না। এই তত্ত্বের ওপর দাঁড়ানো রিডার রেসপন্স থিয়রির মোদ্দাকথা হলো কোনো শিল্প বা সাহিত্যকর্মের সৌন্দর্য ও অর্থ ঐ কর্মটির মাঝে স্বাধীনভাবে অস্তিত্বশীল থাকে না, এর সকল সৌন্দর্য ও অর্থ অস্তিত্বশীল হয় পাঠকের পাঠের মধ্যদিয়ে তার চেতনা ও অনুভব রাজ্যের মাধ্যমে। একটু ঘুরিয়ে বললে বলা যায়, এই তত্ত্বমতে যে কোনো সাহিত্যকর্মের অর্থ ও সৌন্দর্য সাহিত্যকর্মটির পাঠকের চেতনা ও ইন্দ্রিয়ানুভবের দান।

হুসার্লের ফেনোমেনোলজির এই বক্তব্য সাহিত্য সমালোচনা তত্ত্বে প্রথম কাজে লাগান হুসার্লের ছাত্র রোমান ইনগার্ডেন (Roman Ingarden)। ফেনোমেনোলজিভিত্তিক তাঁর সাহিত্যতত্ত্বকে তিনটি পয়েন্টে উপস্থাপন করা যায়। এই তিনের প্রথমটিই হুসার্লের আকাঙ্ক্ষা বা ইচ্ছাশক্তি (intentionality) বিষয়ক বক্তব্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত। হুসার্ল বলেছেন বাস্তবতা ব্যক্তির আকাঙ্ক্ষার সাথে সম্পর্কিত, যে বিষয়ে আমরা উপরে আলোচনা করেছি। এই সূত্র ধরে ইনগার্ডেন বলছেন সাহিত্যের কোনো টেক্সট প্রথমত হলো লেখকের কোনো বস্তুর প্রতি আকাঙ্ক্ষার প্রকাশ ও সেই আকাঙ্ক্ষার রেকর্ড। দ্বিতীয় পয়েন্টে ইনগার্ডেন বলছেন যে, কোনো টেক্সটের পাঠ হলো প্রথমত লেখকের সেই আকাঙ্ক্ষাকে বা আকাঙ্ক্ষার প্রকাশকে পুনরুজ্জীবিত করার প্রয়াস। এই পুনরুজ্জীবনকর্মে হুসার্ল বর্ণিত ‘ইনটেনশলাটি’ তত্ত্বের অংশ হিসেবে এবার পাঠকের আকাঙ্ক্ষা ও ধাবিত হবে নির্দিষ্ট বস্তু বা অর্থের দিকে। কিন্তু সমস্যা হলো লেখকের আকাঙ্ক্ষার বস্তুর দিকেই যে পাঠকের আকাঙ্ক্ষা ধাবিত হবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। ফলে লেখকের আকাঙ্ক্ষার বস্তুই যে পাঠকের পাঠের মধ্যদিয়ে পুনরুজ্জীবিত হবে তারও কোনো নিশ্চয়তা নেই। লেখকের ইনটেনশনাল অ্যাক্ট লেখায় যেভাবে কোডিং হয় পাঠকের ইনটেনশনাল অ্যাক্ট দ্বারা লেখকের সেই ইনটেনশনাল অ্যাক্টই যে ডিকোডেড হবে তার কোনো গ্যারান্টি নেই। ফলে লেখক পাঠকের যোগাযোগের মধ্যে ব্যাপক শূন্যতা তৈরি হয়। অবশ্য ইনগার্ডেন এর নাম দিয়েছেন টেক্সচুয়াল ইনডিটারমিনেসি বা অনিশ্চয়তা। ইনগার্ডেনের তৃতীয় পয়েন্ট হলো এই অনিশ্চয়তা দূরীকরণকে কেন্দ্র করে। টেক্সচুয়াল ইনডিটারমিনেসি দূরীকরণার্থে ইনগার্ডেনের মতে প্রয়োজন হয় পাঠকের নিজস্ব ব্যাখ্যার, যে ব্যাখ্যার নির্মাতা পাঠকের নিজের ইনটেনশনাল অ্যাক্ট। ইনগার্ডেন এর নাম দিয়েছেন অ্যাক্টিভ রিডিং বা সক্রিয় পাঠ। ইনগার্ডেনের মতে এই অ্যাকটিভ রিডিঙের মধ্যদিয়েই একটি সাহিত্যকর্ম পাঠকের কাছে মূর্ত বা ‘কংক্রিটাইজড’ হয়ে ওঠে। ফলে ইনগার্ডেনের মতে সাহিত্যকর্ম পাঠকের চেতনার ও অনুভবের বাহিরের রাজ্যে অবস্থিত কোনো স্বাধীন সত্তা নয়। এটি বাস্তব হয়ে ওঠে পাঠকের অ্যাক্টিভ রিডিঙের মাধ্যমে। অ্যাক্টিভ রিডিঙের মাধ্যমে লেখকের চেতনার সাথে পাঠকের চেতনার যোগাযোগ হয় এবং সে যোগাযোগে যে শূন্যস্থানগুলো থাকে তা পাঠকের ইনটেনশনাল অ্যাক্টের মাধ্যমে পূর্ণ হয়।

ইনগার্ডেনের এই ব্যাখ্যার ওপর দাঁড়িয়ে আছে রিডার রেসপন্স থিয়রির আরেক প্রবক্তা উলফগ্যাঙ ইজার (Wolfgang Iser) এর বক্তব্য। ইনগার্ডেন যার নাম দিয়েছিলেন টেক্সচুয়াল ইনডিটারমিনেসি, ইজার তার নাম দিয়েছেন টেক্সচুয়াল গ্যাপ বা শূন্যতা। এই শূন্যতার কারণে টেক্সটের একটি অর্থপূর্ণ সুসমন্বিত পাঠ বাধাগ্রস্ত হয়, বুঝে ওঠার ধারাটি বাধাগ্রস্ত হয়। এই বাধাগ্রস্ততার তিনটি কারণ গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, টেক্সটের বিভিন্ন অংশের পারস্পরিক বিচ্ছিন্নতা। যেমন, একজন কবি তাঁর কবিতা কতগুলো পর্বে ও স্তবকে ভেঙে থাকেন। একজন ঔপন্যাসিক তাঁর উপন্যাসকে অনেক পরিচ্ছেদে ভেঙে থাকেন। এই জাতীয় ভাঙনগুলো অর্থের চলমানতারও এক ধরনের ভাঙন। এই ভাঙা জায়গাটি জোড়া লাগাতে পাঠককে যে চেষ্টা করতে হয় ইনগার্ডেন তার নাম দিয়েছেন অ্যাকিটভ রিডিং আর ইজার এর নাম দিয়েছেন ভাবায়ন বা আইডিয়েশন (Ideation), যা নির্ভর করে পাঠকের কল্পনা ও বিশ্লেষণী শক্তির ওপর। দ্বিতীয় কারণটি হলো ন্যারেটিভ পারসপেক্টিভের বিচ্ছিন্নতা। আমরা জানি দস্তয়েভস্কির উপন্যাসগুলোতে বহুস্বরের পারসপেক্টিভ রয়েছে। লেখকের স্বরই সেখানে একমাত্র স্বর নয়। ফলে স্বর ও চেতনাগতভাবে এই উপন্যাসে বহু এককের বিচ্ছিন্ন রূপ রয়েছে। উপন্যাসটিকে একক সমগ্রতায় বোঝার জন্য এই বহুস্বরকে এবং বহু চেতনাকে জোড়া দেওয়া বা এক সুতায় গাঁথার জন্য পাঠককে চেষ্টা করতে হয়। পাঠককে তার চেতনা রাজ্যে এক ধরনের কোলাজ সৃষ্টি করতে হয়। সে কোলাজ প্রত্যেক পাঠকের কাছে স্বাভাবিকভাবেই এক ও অভিন্ন নয়, বরং বহুরকম। ইজারের মতে পারসপেক্টিভের বিভিন্নতা ও বিচ্ছিন্নতাকে কোলাজের একক সমগ্রতায় আনয়নও সম্ভব হয় পাঠকের আইডিয়েশন ক্রিয়ার মাধ্যমে। টেক্সচুয়াল গ্যাপের তৃতীয় কারণটি ‘পাঠক কে’ তার ওপর নির্ভরশীল। লেখার ঈপ্সিত পাঠক আর লেখার সত্যিকারের পাঠক ভিন্ন হওয়ার কারণেও লেখার সাথে পাঠকের গ্যাপ তৈরি হয়। একটি ধর্মগ্রন্থের ঈপ্সিত পাঠক ঐ ধর্মের একজন ভক্ত মানুষ। কিন্তু যখন পাঠকটি হন ঐ ধর্মের সাথে অপরিচিত বা অবিশ্বাসী একজন, তখন স্বাভাবিকভাবেই লেখার সাথে পাঠকের অপরিহার্য গ্যাপ সৃষ্টি হয়। এই গ্যাপও পাঠককে পূরণ করে নিতে হয় তার আইডিয়েশন দ্বারা।

রিডার রেসপন্স থিয়রির মূল বিষয়টি হলো ইনগার্ডেন কথিত অ্যাকটিভ রিডিং বা ইজার কথিত আইডিয়েশন দ্বারা লেখার ইনডিটারমিনেসি বা অর্থের অনির্দিষ্টতাগুলো দূর করা বা পাঠকালে অনুভূত গ্যাপগুলো পূরণ করা। এমনকি যদি কোনো টেক্সটে লেখকের ইচ্ছাকৃত অর্থ-অনির্দিষ্টতা রেখেও দেওয়া হয় পাঠক সেই অনির্দিষ্টতার মধ্যে পাঠ সম্পূর্ণ করতে পারে না। তাকে আইডিয়েশনের মাধ্যমে একটি নির্দিষ্টতায় পৌঁছতে হয়। ইনগার্ডেন ও ইজারের এই বক্তব্য থেকে একটা সমস্যার সূত্রপাত হয়। সেটি হলো এই যে, টেক্সটের গ্যাপগুলো বা অর্থ-অনির্দিষ্টতাগুলো এক এক পাঠক যখন এক এক ভাবে পূরণ করবেন তখন ঐ টেক্সটটির সাধারণভাবে গ্রহণীয় কোনো অর্থই তো থাকবে না। ফলে মানুষ টেক্সটটি নিয়ে পারস্পরিক আলোচনার জন্য যেকোনো একটা রেফারেন্স দেবে সেই রেফারেন্সই তো সম্ভব হবে না। এর উত্তরে ইজার বলতে চেয়েছেন যে, পাঠক সম্পূর্ণটা তো তার ইনটেনশনাল অ্যাক্ট দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হবে না। পাঠক তো লেখকের ইনটেনশনাল অ্যাক্ট দ্বারাও নিয়ন্ত্রিত হবে। ফলে পাঠকে পাঠকে আইডিয়েশনের ভিন্নতা থাকলেও লেখকের ইনটেনশনাল অ্যাক্ট তাদেরকে মোটামুটি একটা সূত্রে গেঁথে রাখবে। ফলে পাঠক ইচ্ছে করলেই আইডিয়েশনের দ্বারা ভুলপাঠের (misreading) নৈরাজ্যে পৌঁছবে না।

মিসরিডিং-এর প্রসঙ্গটা যেহেতু উঠল সেহেতু হ্যারল্ড ব্লুমের এ সংক্রান্ত ভাবনাটির সাথে একটু পরিচিত হওয়া যেতে পারে। হ্যারল্ড ব্লুমের মিসরিডিং কোনো নেতিবাচক ধারণা নয়, বরং একটি ইতিবাচক ধারণা। হ্যারল্ড ব্লুম বলেছেন যে, সব লেখক অতীতের লেখকদের প্রভাব থেকে নিজেদেরকে রক্ষা করতে চান। কিন্তু অতীতকে অস্বীকার করে তো আর নতুনের নির্মাণ সম্ভব নয়। তাই লেখকরা যা করেন তা হলো অতীতের লেখাকে যতটা পারা যায় ভাঙতে চেষ্টা করেন, বিকৃত করে (distorting) তার ওপর নতুনের নির্মাণ দাঁড় করাতে চান। ব্লুম এই বিকৃতির নাম দিয়েছেন মিসরিডিং (misreading)। দেখা যাচ্ছে শব্দটা মিসরিডিং হলেও কাজটি রিডারের নয় বরং রাইটারের অর্থাৎ লেখকের। ব্লুমের মতে মিসরিডিং দুরকমের : দুর্বল ও সবল মিসরিডিং। দুর্বল মিসরিডিং মানে লেখকের মৌলিকত্ব কম, আর সবল মিসরিডিং মানে হলো লেখকের মৌলিকত্ব বেশি। ফলে ব্লুমের মতে মিসরিডিং লেখকদের একটা বড় গুণ যে-গুণের বলে লেখকরা অতীতের লেখকদের প্রভাববলয় থেকে নিজেদেরকে যোগ্যতার সাথে রক্ষা করে থাকেন। আগেই বলেছি, ব্লুমের এই মিসরিডিং লেখকের সাথে সংশ্লিষ্ট, পাঠকের সাথে নয়। ফলে এই মিসরিডিং রিডার রেসপন্স থিয়রির পাঠকদের আইডিয়েশন ও লেখকের ইনটেনশনাল অ্যাক্টের মধ্যকার সংযোগহীনতায় তৈরি মিসরিডিং নয়।

রিডার রেসপন্স থিয়রির আলোচনায় আরেকজনের কথা বলতেই হয়। তিনি হলেন স্ট্যানলি ফিশ (Stanley Fish)। স্ট্যানলি ফিশের দুটি ধারণা রিডার রেসপন্স থিয়রির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ : অ্যাফেকিটভ স্টাইলিসটিকস (affective stylistics) ও ইন্টারপ্রিটিভ কমিউনিটিজ (interpretive communities)। অ্যাফেক্টিভ স্টাইলিসটিকস মানে হলো কোনো টেক্সটের পাঠ পাঠককে কীভাবে প্রভাবিত করে (affect) এবং সেই প্রভাব কীভাবে পাঠের প্রক্রিয়ার ওপর প্রভাব ফেলে সে সম্পর্কিত ধারণা। রিডার রেসপন্স থিয়রির মূলসূত্রেই বলা হয়েছে যে, টেক্সট কোনো স্বাধীন সত্তা নয়। পাঠকের চেতনার মধ্যদিয়ে সে বাস্তব হয়ে ওঠে। পাঠক তার পাঠের মাঝে আরোপ করে তার নিজের কল্পনা, অনুভূতি ও প্রত্যাশা। পাঠ যত আগায় এই কল্পনা, অনুভূতি ও প্রত্যাশা পরিবর্তিত হতে থাকে এবং ফলস্বরূপ টেক্সটটি সম্পর্কে পাঠকের ভাবনায় বা ধারণায়ও পরিবর্তন আসতে থাকে। তার মানে টেক্সটটির প্রতি পাঠকের রেসপন্স অনুযায়ী টেক্সটটি নির্মিত হতে থাকে। পাঠকের রেসপন্স অনুযায়ী টেক্সটের এই নির্মাণই ফিশের মতে অ্যাফেকটিভ স্টাইলিসটিকস। অ্যাফেক্টিভ স্টাইলিসিটকস সেই সমস্যাটি আবার সামনে আনে যে, টেক্সট যদি পাঠকের রেসপন্স অনুযায়ী এভাবে নির্মিত হতে থাকে তাহলে একই টেক্সট তো এক এক জন পাঠকের কাছে এক এক ভাবে নির্মিত হবে আর তার ফলে টেক্সটের কোনো একক ও সর্বজনগ্রহণীয় রূপই থাকবে না। স্ট্যানলি ফিশ এই সমস্যার উত্তর দিয়েছেন তাঁর ইন্টারপ্রিটিভ কমিউনিটি বা বিশ্লেষকগোষ্ঠীসংক্রান্ত ধারণার দ্বারা। ইজার এই সমস্যার সমাধান দিয়েছিলেন লেখকের ইনটেনশনাল অ্যাক্ট দ্বারা। ফিশের ক্ষেত্রেও লেখকের ইনটেনশনাল অ্যাক্টই এর সমাধানের ভিত্তি। তবে তার সাথে তিনি আরো কিছু প্রসঙ্গ যুক্ত করেছেন। তিনি বলছেন লেখক ও পাঠক উভয়ই একই ইন্টারপ্রিটিভ কমিউনিটির অন্তর্ভুক্ত। তারা উভয়ই ধারণ করে একই সাহিত্যিক ধারার ঐতিহ্য ও একই একই সাংস্কৃতিক ভাবনারীতি। ফলে একই টেক্সটের ভিত্তিভূমে দাঁড়িয়ে তাদের সম্পূর্ণ ভিন্ন হওয়ার সুযোগ নেই। তারা একই বিশ্লেষণী গোষ্ঠীভুক্ত বলে তাদের বিশ্লষণে ও অর্থে একটি যৌথ সংহতির জায়গা থাকবেই। এভাবেই রিডার রেসপন্স থিয়রি অর্থ উদ্ধারে বা টেক্সচুয়াল শূন্যতা পূরণে পাঠকের স্বেচ্ছাচারিতার আশঙ্কাকে নাকচ করেছে। তবে এ উত্তর বা সমাধান অনেকের কাছেই খুব গ্রহণযোগ্য মনে হয়নি। তাই রিডার রেসপন্স থিয়রি সাহিত্যতত্ত্বে খুব বড় জায়গা করেও নিতে পারেনি। বিংশ শতকের সাহিত্যতত্ত্বে যে ধারণাটি পূর্বের সকল তত্ত্বকে একটি জোর ঝাঁকুনি দিয়েছিল সেটি হলো স্ট্রাকচারালিজম বা কাঠামোবাদ। আমাদের পরবর্তী আলোচনার বিষয় স্ট্রাকচারালিজম।

  

স্ট্রাকচারালিজম বা কাঠামোবাদ

সাহিত্যতত্ত্বে কাঠামোবাদের কোনো সোজাসাপ্টা সংজ্ঞা নেই। তবে এইটুকু বলা যায় যে, কাঠামোবাদের মূল কথা হলো কাঠামোর বাইরে কোনো বস্তুর কোনো অর্থ নেই। এর পরের কথা হলো কাঠামো কী। কাঠামো হলো সেই সব নির্মাণ যেখানে নির্মাণের উপাদানগুলো তাদের নিজ স্বাধীন অস্তিত্ব আর ধারণ করে না বরং কাঠামোর মধ্যে লীন হয়ে যায়। যেমন, বলা যেতে পারে একটি দালানের কথা। দালানে ইট আছে, বালু আছে, রড আছে, সিমেন্ট আছে। কিন্তু এইসব উপাদানের আর কারোই কোনো স্বাধীন অস্তিত্ব নেই। সকলের স্বাধীন অস্তিত্ব দালানের মাঝে লীন হয়ে গেছে। তাই দালান একটি কাঠামো। ইটের স্তূপ বা বালুর রাশি কোনো কাঠামো নয়, কারণ ইটের স্তূপে বা বালুর রাশিতে ইট ও বালু সম্পূর্ণ স্বাধীন অস্তিত্বে বর্তমান। একটি দরজা বা জানালাও এমনিভাবে দালান থেকে আলাদা স্বাধীন অস্তিত্বে কল্পনা করলে সে আর দরজা জানালা থাকবে না এবং কাঠামোর অংশ না হওয়ার কারণে কাঠামোর মধ্যে তার যে অর্থ তা আর কার্যকর থাকবে না। এভবেই কাঠামো তার অঙ্গ বা অংশকে তার অর্থের মাঝে লীন করে তোলে। এই বয়ান থেকে কাঠামোবাদ বিষয়ে অন্তত দুটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য স্পষ্ট হয় : ক) একটি কাঠামো অনেক উপাদান বা অঙ্গ দ্বারা তৈরি হয় এবং উপাদানগুলো কাঠামোর অধীন হয়; এবং খ) গঠনকারী উপাদানসমূহ ঐ কাঠামোর অধীন হিসেবেই শুধু নির্দিষ্ট অর্থ বহন করে এবং কাঠামোটির বাহিরে নিয়ে গেলে ঐ উপাদানের ঐ নির্দিষ্ট অর্থ আর থাকে না।

ফার্দিনান্দ দে সস্যুর ও কাঠামোবাদ : এই কথাগুলো মাথায় রেখে আমরা ফার্দিনান্দ দে সস্যুরের ভাষা সম্পর্কিত ধারণাগুলো আলোচনা করব সাহিত্যতত্ত্বের সাথে সম্পর্কিত কাঠামোবাদের ভিত্তিটা বোঝার জন্য। সস্যুর সুইজারল্যান্ডের একজন ভাষাবিজ্ঞানী। তাঁর ‘কোর্স ইন জেনারেল লিঙ্গুইস্টিকস’ নামক গ্রন্থের জন্য তিনি দুনিয়াজুড়ে বিখ্যাত। তবে গ্রন্থটি তিনি নিজে লিখে যাননি। তাঁর মৃত্যুর পরে তাঁর শিষ্যরা তাঁর বক্তৃতাগুলো জড়ো করে এই গ্রন্থ প্রণয়ন করেছেন। ভাষাবিজ্ঞানে তিনিই প্রথম দুনিয়াকে বলেছেন যে, ভাষা হলো একটি কাঠামো। তাঁর আগে ভাষাবিজ্ঞানীদের ভাবনা ছিল যে, স্বাধীনভাবে অর্থবহ অজস্র শব্দ একত্র হয়ে ভাষার সৃষ্টি হয়। এই শব্দসম্ভার কীভাবে ইতিহাসের পথ বেয়ে ধরে ধীরে ধীরে একত্র হলো এবং ভাষারূপে বিবর্তিত হলো তার পাঠই ছিল ভাষাবিজ্ঞানের কাজ। ভাষাবিজ্ঞানের এই ধারণাকে ডায়াক্রনিক অ্যাপ্রোচ (Diachronic Approach) বলা হয়। সস্যুর এই ডায়াক্রনিক অ্যাপ্রোচের ইতি ঘটিয়ে সিনক্রনিক অ্যাপ্রোচের (Synchronic Approach) জন্ম দিলেন।

ভাষাবিজ্ঞানের এই সিনক্রনিক অ্যাপ্রোচে সস্যুর বললেন যে, শব্দ কোনো অকৃত্রিম অর্থ নিয়ে ভাষায় প্রযুক্ত হয় না, বরং ভাষার কাঠোমোতে স্থান পাওয়ার পরে অন্য শব্দের সাথে তার সম্পর্কের ভিত্তিতে তার অর্থ সৃষ্টি হয়। এই কথা বোঝানোর জন্য সস্যুর শব্দ নামক ধারণাটিকে নতুন পরিচয়ে অন্য নামে উপস্থাপন করেছেন। তিনি বলেছেন শব্দমাত্রই একধরনের সাইন (sign) বা চিহ্ন। কোনো চিহ্ন যখন কোনো বস্তুকে বোঝায় তখন চিহ্নটির সাথে বস্তুটির কোনো অন্তর্গত বা কার্যকারণগত সম্পর্ক থাকে না। তেমনই শব্দ যে বস্তুকে বোঝায় তার সাথে শব্দের কোনো অন্তর্গত বা কার্যকারণগত সম্পর্ক নেই বিধায় সকল শব্দকেই তিনি নাম দিয়েছেন সাইন। প্রতিটি সাইনের দুটি দিক রয়েছে—একটি ধ্বনিগত, আরেকটি বস্তুগত। শব্দ তথা সাইনটি যে ধ্বনিরূপে উচ্চারিত সেই ধ্বনিটিকে তিনি বলেছেন ‘সিগনিফায়ার’ (signifier), আর সেই ধ্বনি যে বস্তুকে নির্দেশ করে তাকে তিনি বলেছেন ‘সিগনিফাইড’ (signified)। ‘কলম’ শব্দটির ধ্বনিরূপ হলো সিগনিফায়ার, আর এই ধ্বনি উচ্চারিত হলে লেখার যে হাতিয়ারটি বোঝায় সেটি হলো সিগনিফাইড। সস্যুর বলেছেন সিগনিফায়ার সিগনিফাইডকে নিজে নিজে বোঝাতে পারে না। সিগনিফায়ারগুলো ভাষার কাঠামোতে প্রবেশের পরে সিগনিফায়ারগুলোর মাঝে যে পারস্পরিক সম্পর্ক সৃষ্টি হয় সেই সম্পর্কের ভিত্তিতে সিগনিফায়ারগুলো তাদের সিগনিফাইডকে বোঝানোর যোগ্যতা অর্জন করে। ‘বিশ’ এবং ‘বিষ’ সিগনিফায়ার রূপে একই ধ্বনি, কিন্তু তাদের সিগনিফাইড যে ভিন্ন তা নির্ণীত হয় ভাষার ও বাক্যের অন্যান্য সিগনিফায়ারের সাথে তাদের সম্পর্কের ভিত্তিতে। মনে রাখতে হবে যে, এই সম্পর্ক হলো ভিন্নতার এবং বৈপরীত্যের সম্পর্ক। উদাহরণস্বরূপ সিগনিফায়ার ‘লাল’ তার নিজ ধ্বনিরূপ থেকে কোনো রঙকে বোঝাতে পারে না। সে শুধু কমলা, হলুদ, সাদা, বেগুনি, সবুজ ইত্যাদির বিপরীতে দাঁড়িয়ে সেই রঙের অবস্থাকে বোঝাতে পারে যা ঐগুলো দ্বারা বোঝায় না। সুতরাং ‘লাল’-এর অর্থ অন্যদের বৈপরীত্যে দাঁড়ানোর যোগ্যতা থেকে উদ্ভূত, ‘লাল’-এর নিজস্ব ধ্বনিরূপ থেকে উদ্ভূত নয়। একইভাবে প্রমাণিত যে, ‘লাল’ ধ্বনিরূপে কোনো অর্থ বহন করে না বরং ভাষার কাঠামোতে অবস্থান পাওয়ার ফলে অর্থ বহনের যোগ্যতা অর্জন করে। সিগনিফায়ারদের বৈপরীত্যের সম্পর্ক থেকে অর্থ উদ্ভবের বিষয়ে আরো স্পষ্ট উদাহরণ বৈপরীত্যের দ্বিপদগুলো (oppositional binaries), যেমন দিন-রাত, ছাত্র-শিক্ষক ইত্যাদি। এসব দ্বিপদের একটির অর্থ অন্যটির মাঝে তার অনুপস্থিতি দ্বারাই শুধু বোধগম্য হয়। ফলে পারস্পরিক বৈপরীত্যই এদের অর্থের নির্মাতা। সস্যুরের মতে ভাষা তার কাঠামোর মধ্যে সিগনিফায়ারদের পারম্পরিক সকল সম্পর্কের বিষয়ে সম্পূর্ণ স্বাধীন ও স্বয়ংসম্পূর্ণ। এই সম্পর্ক ভাষার বাহির থেকে কেউ নিরূপণও করতে পারে না, নির্মাণও করতে পারে না।

সস্যুরের সাইন ও সিগনিফায়ারের এই ধারণাকে আরো সম্প্রসারিত করে বলা যায় যে, সাইন ও সিগনিফায়ারের মাধ্যমে ভাষাই আমাদের বাস্তবতাকে নির্মাণ করে। আমাদের ভাষা ছয় ঋতুতে বছরকে ভাগ করেছে বলে ওর মধ্যদিয়েই আমরা বছরকে চিনি, যদিও একটি নির্দিষ্ট ঋতুর শেষদিনের পরের দিনে এমন কিছু দেখি না যা দ্বারা নতুন ঋতুটিকে চিহ্নিত করা যায়। ফলত ঋতুর বাস্তবতা আমাদের ইন্দ্রিয় দ্বারা অনুভূত নয় এবং ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বস্তু দ্বারাও নির্মিত নয়, বরং ভাষা দ্বারা নির্মিত। আবার রঙের বাস্তবতা হাজার রূপ হলেও মাত্র সাতটি সিগনিফায়ার তথা সাতটি নাম দ্বারা রঙের সামগ্রিক বাস্তবতা নির্মিত। এভাবে বাস্তবতা সম্পর্কিত সকল রূপ সিগনিফায়ারের মধ্যে আটকে থাকার কারণে মানুষ তার অনুভবের কোনো বাস্তবতা সিগনিফায়ারের তথা ভাষার বাইরে গিয়ে প্রকাশ করতে পারে না। ফলে প্রমাণিত হয় যে, সকল বাস্তবতাই ভাষার নির্মাণ।

এবার আরেকটি প্রশ্ন আসে। ভাষা যদি তার সম্পর্কগত নিজস্ব নিয়মের মধ্যে সবসময় স্বয়ংসম্পূর্ণ হয় তাহলে হাজারো ব্যক্তির ব্যবহারে হাজারো স্বতন্ত্র স্বয়ংসম্পূর্ণ ভাষার উদ্ভব হওয়ার কথা। কিন্তু তা কেন হয় না? এর উত্তর রয়েছে ভাষার কাঠামো সম্পর্কে সস্যুরের প্রদত্ত অপর দুটি ধারণায়। ধারণা দুটোর একটির নাম ‘লাঙ’ (langue) এবং অপরটির নাম ‘পারোল’ (parole)। এই দুটো ধারণা বোঝাতে সস্যুর উদাহরণ টেনেছেন দাবা খেলা থেকে। দাবা খেলায় প্রত্যেকটি ঘুটির চালের একটা নিয়ম রয়েছে। সেই নিয়ম অনুসরণ করে একজন মানুষ যখন দাবা খেলে তখন প্রতিটি খেলা তার চাল পরম্পরায় আরেকটি খেলা থেকে আলাদা ও স্বয়ংসম্পূর্ণ এক একটি খেলা রূপে আত্মপ্রকাশ করে। প্রতিটি খেলা এভাবে আলাদা হলেও প্রতিটি খেলাই সম্পন্ন হয় দাবা খেলার সাধারণ ও স্বয়ংসম্পূর্ণ নিয়মের অধীন থেকে। ভাষার ব্যবহারও এমন। প্রত্যেক মানুষের ভাষা তার একক সমগ্রতার বিন্যাসে আরেকজন মানুষের ভাষা থেকে আলাদা কাঠামোতে স্বাধীন যেমন স্বাধীন ও আলাদা প্রতিটি মানুষের নিজের দাবা খেলাটি। একই সাথে প্রতি মানুষের এই নিজ ভাষাটি সংশ্লিষ্ট ভাষাভাষীদের সমগ্র মানুষের ভাষার সাধারণ কাঠামোর অধীন। সস্যুরের বর্ণনায় ব্যক্তির ভাষাটির কাঠামো হলো পারোল (parole), আর সকল ব্যক্তির ভাষা সংশ্লিষ্ট ভাষাটির বৃহত্তর কাঠামোর যে সাধারণ নিয়মের অধীন সেই কাঠামো হলো লাঙ (langue)। প্রত্যেক পারোলের কাঠামো বৃহত্তর কাঠামো লাঙের অধীন বলেই একজনের ভাষার ব্যবহার আরেকজনের কাছে বোধগম্য ভাষা হয়ে ওঠে। চলবে

/জেডএস/

সম্পর্কিত

চল্লিশদিন উপন্যাসের সঙ্গে সহবাস, মৃত্যু পর্যন্ত

চল্লিশদিন উপন্যাসের সঙ্গে সহবাস, মৃত্যু পর্যন্ত

আমাদের সেলিব্রেটি কবি শামসুর রাহমান

আমাদের সেলিব্রেটি কবি শামসুর রাহমান

জীবনানন্দ দাশ  একটি পথ দুর্ঘটনা বা পূর্বঘোষিত মৃত্যুর কালপঞ্জি

জীবনানন্দ দাশ একটি পথ দুর্ঘটনা বা পূর্বঘোষিত মৃত্যুর কালপঞ্জি

ছাদবাগানে ফুলের ঘ্রাণে তবে রসায়ন কমে যাক

ছাদবাগানে ফুলের ঘ্রাণে তবে রসায়ন কমে যাক

জীবনানন্দ দাশ একটি পথ দুর্ঘটনা বা পূর্বঘোষিত মৃত্যুর কালপঞ্জি

আপডেট : ২২ অক্টোবর ২০২১, ০০:১১

চলে যাব, সেদিন মরণ এসে অন্ধকারে আমার শরীর
ভিক্ষা করে লয়ে যাবে,—সেদিন দু’দণ্ড এই বাংলার তির—
এই নীল বাঙলার তীরে শুয়ে একা একা কী ভাবিব, হায়,—

শরীর খুব অসুস্থ, কদিন ধরেই তেতে ছিলো অভব্য প্রতিবেশী ভাড়াটিয়ার কারণে। প্রতিদিনের মতই ১৪ অক্টোবর বিকালে তিনি হাঁটতে বের হলেন। একা জীবনানন্দ। যখন বেরুচ্ছিলেন স্ত্রী লাবণ্য তাঁকে বেরুতে নিষেধ করলেন, শরীর অসুস্থ ছিল কয়েকদিন ধরেই। লাবণ্যর নিষেধ না শুনেই জল দিয়ে মাথা ধুয়ে একাই বেড়িয়ে যান। ফেরার সময় বাড়ির কাছের লেক মার্কেট থেকে দুটো ডাব কিনে নেন। 

হাঁটতে হাঁটতে জীবনানন্দ রাসবিহারী এভিনিউ ও ল্যান্সডাউন রোডের সংযোগস্থলের প্রায় কাছাকাছি এসে গেছেন, তিনি আসছিলেন রাসবিহারী এভিনুয়ের দক্ষিণ দিকের ফুটপাথ ধরে, সংযোগস্থলে এসে ফুটপাথ থেকে নেমে রাস্তা অতিক্রম করার জন্য পথে নামলেন। রাস্তার এই অংশটা বেশ চওড়া, ট্রাম যাতায়াতে জন্য রাস্তার মাঝখানে দুটো ট্রামলাইন পাতা। ট্রামলাইনের জমিটা ঘাসে সবুজ। তিনি ফুটপাথ থেকে নেমে মোটর, বাস, ট্যাক্সি প্রভৃতির জন্য পিচরাস্তার অংশ অতিক্রম করে ট্রামলাইনের কাছে এলেন, মনটা কিছুটা চঞ্চল ছিলোই, ভাবলেন ট্রাম আসার আগেই লাইন পার হয়ে যেতে পারবেন, এর আগে তো একটা স্টপেজ আছেই, এই সব ভাবতে ভাবতে কিছুটা অন্যমনষ্ক হয়েই ট্রামলাইন পার হতে লাগলেন।

তখন সন্ধ্যা নেমে এসেছে, অন্ধকার অল্প অল্প করে জমছে। ট্রামটা আসছিল, আগের স্টপেজে লোক ওঠা-নামার না থাকায় না থেমে জোড়ের সাথেই চলে এলো, ছুটন্ত ট্রামটি জোড়ের সাথেই এসে ধাক্কা দিলো কবিকে, জীবনানন্দ আর ট্রামলাইন পার হতে পারলেন না। সঙ্গে সঙ্গে আহত ও অচৈতন্য হয়ে ট্রামলাইনের মাঝের সেই সবুজের ওপর ছিটকে পড়লেন, ট্রামের ক্যাচারের ভিতরে দেহটা ঢুকে গেল। রাসবিহারী এভিনিউ ও ল্যান্সডাউন রোডের সংযোগস্থলের দক্ষিণে একটা জলখাবারের দোকান ছিল, নাম ছিল ‘জলখাবার’। মালিক চুনীলাল দে পরে সেখানে ‘সেলি কাফে’ নামে রেস্টুরেন্ট খোলেন। জীবনানন্দের দুর্ঘটনার সময় এই চুনীবাবুই শুধু প্রত্যক্ষদর্শীই ছিলেন না, তিনি ছুটে গিয়ে অনেক সাহায্যও করেছিলেন। সেই চুনীবাবুর কথায়, ‘একটু পরেই হঠাৎ ট্রামের একটা শব্দ, বালিগঞ্জমুখো একটা ট্রাম কাকে যেন চাপা দিয়েছে। সঙ্গে সঙ্গেই পথচারীদের অনেকেই এসে গেলেন। গিয়ে দেখি একজন লোক অচৈতন্য হয়ে ট্রামের ক্যচারের মধ্যে পড়ে আছেন। ট্রাম দাঁড়িয়ে আছে। ট্রামের ড্রাইভার দুর্ঘটনার সঙ্গে সঙ্গেই ভিড়ের মাঝে গাঢাকা দিয়ে সরে পড়েছে। যাইহোক, আমি তখনি ট্রামের তলায় ঢুকে আস্তে আস্তে তাকে বের করলাম। সমবেত জনতার দু-একজনের কথা কানে আসছিল, ট্রামলাইনের ঘাসের ওপর দিয়ে এই ভদ্রলোক আনমনে আসছিলেন। ট্রাম ড্রাইভার হর্ন দিয়েছিল, দু-একজন চিৎকার করলেও ভদ্রলোক কিসের চিন্তায় এমন বিভোর ছিলেন যে কিছুই তাঁর কানে যায়নি। যখন তাঁকে বের করা হলো, তখন তিনি অজ্ঞান। দু-তিনজনে মিলে জ্ঞানহীন জীবনানন্দকে ট্যক্সিতে তুলে শম্ভুনাথ পণ্ডিত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলো। চুনীবাবু তাঁকে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে রেখে এলেন, সাধারণ রোগীর মতোই পড়ে রইলেন জীবনানন্দ দাশ। পড়ে আত্মীয়স্বজনের অন্যবিভাগে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলেও তাঁর শরীরের অবস্থার কারণে তা সম্ভব হয়নি আর। ট্রামের ধাক্কায় জীবনানন্দের বুকের কয়েকটা পাঁজর, কাঁধের হাড় এবং পায়ের হাড় ভেঙে গিয়েছিল। ডা. বিধান রায় তাকে দেখতে গিয়ে জানিয়ে দেন যে তাঁর আর বাঁচার আশা নেই, যতদিন থাকেন একটু শান্তিতে রাখবেন। শম্ভুনাথ হাসপাতেলেই যখন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন কবি। ১৪ অক্টোবর রাত ৮টায় তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়, ২২ অক্টোবর রাত ১১টা ৩৫ মিনিটে শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন। গোটা জীবন অশান্তি ও আতৃপ্তির যন্ত্রণার এইভাবেই পরিসমাপ্তি ঘটল। সবুজ ঘাস তার প্রিয় ছিল, অন্তিম আঘাতেও তিনি ছিটকে পড়েছিলেন সেই সবুজ ঘাসেই।

আশা স্বপ্নের ছাই ভষ্ম

১৯৫১ সালের ২৮শে মে ১৮৩ ল্যান্সডাউন রোডের বাড়ি থেকে উত্তরবাংলার জলপাইগুড়ি শহরের তরুণ লিটল ম্যাগাজিন সম্পাদক সুরজিৎ দাশগুপ্তকে চিঠিতে লিখেছিলেন যে, ‘একবার ঘুরে আসতে ইচ্ছে করে, সভাসমিতি ইত্যাদি সবকিছুর হাত সম্পূর্ণভাবে এড়িয়ে তোমাদের মতো দু-একজনের সাহায্যে হিমালয়, চা-বাগান ইত্যাদি দেখে আসার লোভ জেগেছে মনে।’ পঞ্চাশোর্ধ কবির আরো অনেক ইচ্ছার মতই এই ইচ্ছাও পূর্ণ হয়নি। উল্লিখিত চিঠির সূত্রেই সুরজিত বাবু তাঁর শহরের কিছু নিসর্গ দৃশ্যের ফোটোগ্রাফ পাঠিয়ে দেন। ‘নগ্ন নির্জন’ শহরের ছবি। উত্তরে জীবনানন্দ লেখেন ‘এখুনি ঝিলের পারে ঘাসের ওপরে আকাশের মুখোমুখি নিজেকে ছড়িয়ে দিতে ইচ্ছে করছে। নদী, ঝিল, পাহাড়। বন, আকাশ। কোনো নিরালা জায়গা থেকে এসবের নিকট সম্পর্কে আসতে ভালো লাগে আমার। বসে থাকতে পারা যায় যদি এদের মধ্যে, কিংবা হেঁটে বেড়াতে পারা যায় সারা দিন, তা হলেই আমাদের সময় একটা বিশেষ দিক দিয়ে (আমার মনে হয়) সবচেয়ে ভালো কাটে।’ 

নির্জনতা ও বিষণ্নতা আক্রান্ত জীবনানন্দের, প্রকৃতি ও মানবতার ছায়া-আচ্ছন্ন জীবনানন্দের ভালো লাগার ছোট ছোট টুকরোগুলো এমনই ছিল। ঝিলের পাসে ঘাসের ওপরে আকাশের মুখোমুখি নিজেকে ছড়িয়ে দিতে চাওয়া কবির ভালোবাসার ইচ্ছেগুলোও ছিল ভেসে বেড়ানো মেঘের মতো; শুভ্র ও খণ্ডখণ্ড, নিঃস্বার্থ ও উচ্চাশামুক্ত। এইসব ভালো লাগার ইচ্ছের অধিকাংশই ইচ্ছেপূরণের আনন্দে উত্তীর্ণ হয়নি, এই অতৃপ্তির যন্ত্রণার দহনেই দগ্ধ হয়েছেন তিনি নীরবে। নির্জন ও স্বতন্ত্র এই কবির গোটা জীবন ধরে রক্তপথ যাত্রা তাঁকে আরো স্বতন্ত্র করে দিয়েছিলো। 

জীবনানন্দের ৫৫ বছরের জীবনে ১৯১৯-এ ‘ব্রহ্মবাসী’ পত্রিকায় প্রকাশিত (বৈশাখ ১৩২৬) ‘বর্ষা আবাহন’ কবিতা থেকে শুরু ধরলে কবিজীবন মাত্র ৩৪ বছরের, প্রকৃত বিচারে যদিও কবি জীবনানন্দের আয়ুষ্কাল আরো কম। এই ক্ষণকালের মধ্যেই তাঁর অন্তরের অনেকটা জুড়েই ছিল নতুনের, তারুণ্যের প্রতি পক্ষপাতিত্ব। এই কারণেই যখন প্রান্তবাংলা জলপাইগুড়ির তরুণেরা লিখলেন, ‘আধুনিক সাহিত্য, বিশেষত, আধুনিক বাংলা কবিতার সঙ্গে উত্তরবংগের মানুষদের সম্পর্কে স্থাপনের জন্য একটা পত্রিকা প্রকাশ করতে চাই। আপনার একটা কবিতা চাই।’ জীবনানন্দের পর্যায়ের কবি এর উত্তরে কত অনায়াসে ‘শিরিষের ডালপালা লেগে আছে বিকালের মেঘে’ মফস্বলের নাম না জানা, না দেখা, সাক্ষাৎপরিচয়হীন সদ্য কৈশোর অতিক্রান্ত ছাত্রদের পত্রিকায় প্রকাশের জন্য পাঠিয়ে দেন। জীবনানন্দকে জলপাইগুড়ি আসার আমন্ত্রণ করা হয়েছিলো ‘জলার্ক’-এর তরুণদের পক্ষ থেকে। ১৯৫২র ২০ জানুয়ারি জীবনানন্দ সুরজিত দাশগুপ্তকে এক চিঠিতে লেখেন, ‘জলপাইগুড়ির ওদিককার অঞ্চল, পাহাড়, নদী, জংগল বেশ দেখবার মতো, ঘুরবার মতো, ঘুরে বেড়াবার মতো, আমার খুব ইচ্ছা করে, জল্পাইগুড়ির দিকে একবার যাব ভাবছি।’ কিন্তু তাঁর এই ইচ্ছা অপূর্ণই থেকে যায়। ১৯৫২তে লেখেন ‘আমার এখন জলপাইগুড়ি যাবার কোনো সম্ভাবনা নেই। যেতে পারলে অবশ্য আনন্দিত হতাম।’ 

অসুস্থতা, বেকারত্ব, পারিবারিক অশান্তিতে বিপর্যস্ত কবি যেন সেসময় তাঁর ভালো লাগার জগৎ থেকে ক্রমশ ছিটকে যাচ্ছেন। এমনকি, কবিতাও লিখতে পারছেন না এই সময়। কবি কায়সুল হককে লেখা এইসময়ের একটি চিঠিতে তিনি একথা লিখেছিলেন। ১৯৫২ সালের ২৬ জুন তিনি জানালেন, ‘নানা কারণে মন এত চিন্তিত আছে, শরীরও এত অসুস্থ যে অনেকদিন থেকেই কিছু লিখতে পারছি না।’ আলোচ্য এই চিঠিগুলো জীবনানন্দ লিখেছিলেন ১৯৫১-৫২, যখন তাঁর অন্তরাত্মা চাইছিলো জলপাইগুড়ির মতো কোনো সবুজ নির্জনতা। যখন চারপাশ তাঁর কাছে রূঢ় হয়ে উঠছিল। প্রতিটি ইচ্ছা ও কামনার মৃত্যু পরখ করছেন প্রতিদিন। ১৯৫০-এর ২ সেপ্টেম্বর তিনি খড়্গপুর কলেজ অধ্যাপনার কাজে যোগ দেন, সদ্য প্রতিষ্ঠিত কলেজে নামমাত্র মাইনে পেতেন। স্ত্রী লাবণ্য ডেভিড হেয়ার ট্রেনিং কলেজে বি. টি. পড়তে শুরু করেছেন এসময়। কিছুদিনের মধ্যেই তিনি ‘এলকাইনা’ রোগে অসুস্থ হয়ে পরেন। ১৯৫১-র জানুয়ারি, স্ত্রীর অসুস্থতার খবরে কলকাতা আসেন কবি। লাবণ্যদেবী সুস্থ হচ্ছেন না দেখে ছুটির সময় বৃদ্ধির আবেদন করেন কলেজ কর্তৃপক্ষের কাছে। কিন্তু কলেজ কর্তৃপক্ষ ২৫ ফেব্রুয়ারি তাঁকে বরখাস্থ করে দেয়। এসময় সহকর্মী পুলিনবিহারিকে কবি লেখেন, ‘বড়ই বিপদের ভেতর আছি। খড়্গপুর কলেজে থেকে ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে তিনশত টাকা পেয়েছিলাম। ফেব্রুয়ারি মাসে যে কাজ করেছিলাম, সে পাওনা আজ পর্যন্ত পাইনি। অন্তত পূর্বের মাইনে না পেলে এই দুর্দিনে কিছুতেই টিকে থাকতে পারবো না।’

এ সময় চরম বেকারত্বের। তাঁর কাধেই সংসারের ভার। বাড়ি নিয়ে, পরিবার নিয়ে তাঁর শত দুশ্চিন্তা। খড়গপুরের কলেজের সাড়ে পাঁচ মাসের মেয়াদি চাকরি চলে যাওয়ার পর সম্পূর্ণ বেকারত্ব তাঁকে অসহায় অবস্থা্র মধ্যে ঠেলে দেয়। শুরু হয় আবার চাকরির খোঁজ। ১৯৫৯ সালে এশিয়াটিক সোসাইটির রিসার্চ এসিস্ট্যান্টের জন্য দরখাস্ত করেন কবি। প্রার্থী হন চারুচন্দ্র কলেজে অধ্যাপনার জন্য। এসব ছেড়ে একসময় ব্যবসায় নামার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিলেন তিতিবিরক্ত, হতাশ জীবনানন্দ। এ সময় তাঁর আত্মবিশ্বাসেও ফাটল ধরেছিলো। অধ্যাপনার বা পড়ানোর কাজ খুব একটা পছন্দের ছিলো না, তবুও হন্যে হয়ে খুঁজেছেন। ভাইবৌ নলীনী চক্রবর্তীকে তিনি অধ্যাপনার সম্পর্কে লিখেছিলেন। ‘অধ্যাপনা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সেসবের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে আপনি যা লিখেছেন ঠিকই। তবে অধ্যাপনা জিনিসটা কোনো দিনই আমার ভালো লাগেনি। যেসব জিনিস যাঁদের কাছে যেমন ভাবে শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে—তাতে আমার বিশেষ আস্থা নেই। এই কাজে মন তেমন লাগে না, তবুও সময় বিশেষে অন্য কোনো কোনো প্রেরণার চেয়ে বেশী জাগে তা স্বীকার করি।’ শিক্ষকতাকে পেশা হিসাবে গ্রহণ করেও, সন্তুষ্ট ছিলেন না, সম্ভবত নিশ্চিন্ত কোনো শিক্ষকতাও কোনো দিন পাননি। একটা কাজের খোঁজে হন্যে হয়ে উঠেছিলেন, চিঠি লিখেছিলেন শিক্ষকতা/অধ্যাপনা চাকরির খোঁজের জন্য হরপ্রসাদ মিত্র, নরেশ গুহ কিংবা অনিল বিশ্বাসকে। হরপ্রসাদ মিত্রকে লিখেছিলেন : অমৃতবাজার পত্রিকায় দেখা গেছে, কলকাতার কয়েকটি প্রথম শ্রেণীর কলেজে ইংরাজি শিক্ষক নেওয়া হবে। কিন্তু কলেজের নামের পরিবর্তে পোস্ট বক্স নম্বর ব্যবহৃত বলে বুঝতে পারছি না স্কটিশচার্চ অথবা সিটি কলেজের প্রয়োজনে এই বিজ্ঞাপন।’

আর্থিক প্রয়োজনে জীবনানন্দ একসময় সিনেমার গান লেখবার কথাও ভেবেছিলেন। বন্ধু কবি অরবিন্দ গুহের কাছে একবার জানতে চেয়েছিলেন—‘সিনেমার গান লিখলে নাকি টাকা পাওয়া যায়? তুমি কিছু জানো এবিষয়ে?’ অরবিন্দ বাবু তখন এবিষয়ে প্রেমেন্দ্র মিত্রের সঙ্গে যোগাযোগের কথা বলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর প্রেমেন্দ্র মিত্রের কাছে বিষয়টি তুলতে পারেননি কবি। এর পর অরবিন্দ বাবু শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়ের কথা বলেন। সিনেমার ডিরেক্টার শৈলজানন্দ বাবু জীবনানন্দের কাছের মানুষ ছিলেন। কিন্তু এক্ষেত্রেও পূর্বের মতই কবি আর বিষয়টি তুলতে পারেননি। কারণটি বেশ মজা করে অরবিন্দবাবুকে তিনি বলেছিলেন : এরপর সকৌতুক ভঙ্গিতে তিনি বলেন, যদি শৈলজা আমার জন্য কোথাও একটা ব্যবস্থা করে দেয় তাহলেও আমি কেমন করে লিখব, ‘রাঁধে -এ -এ -এ, ঝাঁপ দিলি তুঁই মরণ যমুনায়।’

এই কথোপকথনের কিছুদিনের মধ্যেই সেই মহাদুর্ঘটনা, ১৪ অক্টোবর। 

এমনই একদিন আড্ডার ছলে জীবনানন্দ অরবিন্দ গুহকে বলেছিলেন : ‘আমি ঈশ্বরে বিশ্বাস করি না। আমি মানুষের নীতিবোধে বিশ্বাস করি।’ এই বিশ্বাসের প্রতিফলন ছিল জীবনানন্দের জীবন ও সাহিত্যে, কবিতায় ও কথায়। গোটা জীবন যে আর্থিক অনিশ্চয়তা তাকে তাড়া করে বেড়িয়েছে তাই তার প্রধান বিপন্নতা ছিল।

মুর্শিদাবাদের সরকারি আমলা অনিল বিশ্বাসকে লেখা তাঁর চিঠির মধ্যেও কবির বিপন্নতা ধরা পরে : বর্তমানে অত্যন্ত অসুবিধায় আছি, কাজ খুঁজছি। কলকাতায় একটা সাধারণ কাজও পাওয়া যাচ্ছে না। জংগীপুর কলেজে একজন ইংরেজি শিক্ষক নেওয়ার বিজ্ঞাপন দিয়েছে, আমার বর্তমান অবস্থা এমন যেকোনো রকম কাজ করতে আমি কোনোরকম দ্বিধা করবো না।’ অথচ, আমরা জানি তিনি কলকাতাকে আঁকড়ে ধরেই থাকতে চেয়েছিলেন, বুদ্ধদেব বসুকে লিখেছিলেন : কলকাতার অলিগলি মানুষের শ্বাস রোধ করে বটে, কিন্তু কলকাতার ব্যাবহারিক জীবনে প্রান্তরের মতো মুক্তি পাওয়া যায়; এখন যখন জীবনে কর্মবহুলতার ঢের প্রয়োজন, কলকাতা এই স্বচ্ছন্দ পটভূমি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকা চলে না আর।’ এখানে উল্লেখ করতে হয় নলিনী চক্রবর্তীকে লেখা তাঁর উক্তি : ‘বরাবরই আমার আত্মোহতি ও জীবিকা নিয়ে কলকাতায় থাকার ইচ্ছে।’

১৯৫১-তে যে দুর্বিষহ আর্থিক চাপ তাঁর উপর নেমে আসে তাতে একসময় বিপন্ন জীবনানন্দ জনৈক পরিচিতের সঙ্গে ব্যবসায় নামার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিলেন, যদিও তা শেষ পর্যন্ত ভেঙে যায়। খাঁ খাঁ বেকার সংসারের চাপে জীবনানন্দ প্রত্যহ খবরের কাগজে বিজ্ঞাপনের কলম থেকে বিভিন্ন কাজের খোঁজ নিয়ে আবেদন করতে থাকেন। তাঁর এরকম অসহায় জীবনের, অর্থাৎ কর্মহীনপর্বে একবার পরিচিতদের পরামর্শে দেখা করতে গিয়েছিলেন রাইটার্সে রেভিনিউ বোর্ডের সদ্য আই সি এস সত্যেন ব্যানার্জীর সঙ্গে। দেখা করতে গিয়ে রীতিমতো অসুস্থ হয়ে পড়েন, রাইটার্স বিল্ডিংয়েই অবনীমোহন কুশারীর ঘরে তিনি অচৈতন্য হয়ে পড়েছিলেন। 

পরের বছর চাকরি পেলেন তাঁর স্ত্রী লাবণ্য। এ সময়ই চার মাসের জন্য চাকরি পান জীবনানন্দ, ১৯৫২-র নভেম্বর থেকে ১৯৫৩-র ফেব্রুয়ারি, বড়িশা কলেজে শিক্ষকতার। কিন্তু এখানেও থাকা হয়নি। এই সময়কালে তিনি এতটাই বিপন্ন ছিলেন যে কবিতাও লিখে উঠতে পারছিলেন না। এ সময়ের একটা ঘটনা উল্লেখ করা যেতে পারে। সুরজিত দাশগুপ্ত একবার জলার্কের জন্য বুদ্ধদেব বসুর কাছে লেখা চাইতে গেলে তিনি প্রকাশিত ও অপ্রকাশিত লেখার জন্য পৃথক দর উল্লেখ করেছিলেন। সুরজিৎ দাশগুপ্ত এ কথা জীবনানন্দকে জানিয়ে তাঁর কোন দর আছে কিনা জানতে চাইলে জীবনানন্দ লেখেন, ‘একটি কবিতার জন্য সম্মানমূল্য আমি সাধারণতঃ ২৫/৩০ টাকা থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত পাই, তোমরা ২০ টাকা দাও। আমি সময় করে ভালোভাবে নতুন কবিতা লিখে পাঠাই।’ লেখার জন্য সময় ও সাধনা দরকার, গদ্যের চেয়ে কবিতার বেশি। ২রা নভেম্বর ১৯৫১তে তিনি এই চিঠিটি লেখেন।

ইতোপূর্বে কিছু চিঠির উল্লেখ করেছি, এমনি ১৯৫৭র জ্যৈষ্ঠ মাসে সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়কে কবি লেখেন ‘বেশ ঠেকে পড়েছি, সেজন্য বিরক্ত করতে হলো আপনাকে। এখুনি পাঁচশ টাকার দরকার, দয়া করে ব্যবস্থা করুন। এই সঙ্গে পাঁচটি কবিতা পাঠাচ্ছি। পরে প্রবন্ধ ইত্যাদি (এখন কিছু লেখা নেই) পাঠাবো। আমার একটা উপন্যাস (আমার নিজের নামে নয়—ছদ্মনামে) পূর্বাশায়, কিন্তু টাকা এক্ষুনি চাই—আমাদের মতো দু-চারজন বিপদগ্রস্ত সাহিত্যিকের এরকম দাবি গ্রাহ্য করবার মতো বিচার বিবেচনা অনেকদিন থেকে আপনারা দেখিয়ে আসছেন—সেজন্য গভীর ধন্যবাদ। লেখা দিয়ে আপনার সব টাকা শোধ করে দেব, না হয় ক্যাশে। ক্যাশে শোধ করতে গেলে ছ-সাত মাস তার বেশি নয়, দেরি হতে পারে।’ এক সময় তিনি, এই অবস্থায় পড়বার অনেক আগে অচিন্তকুমার সেনগুপ্তকে লিখেছিলেন ‘চারদিকে বে-দরদীর ভিড়। আমার যে একটি সমানধর্মা আছি, একটা নিরেট অচ্ছেদ্য মিলনসূত্র দিয়ে আমাদের গ্রথিত করে রাখতে চাই। আমাদের তেমন পয়সা-কড়ি নেই বলে জীবনে “creative comforts” জিনিসটা হয়তো চিরদিন আমাদের এড়িয়ে যাবে।’ বিভিন্ন জায়গায় কাজের জন্য হন্যে হয়ে ঘুরেছেন, বছরের পর বছর অনিশ্চিত জীবন যাপন করতে হয়েছে তাঁকে। খবরের কাগজের দপ্তরে কাজও করেছেন। স্বরাজ-এ প্রায় বেতনহীন অবস্থায় কয়েকমাস কাজ করেছেন, রবিবারের সাময়িকী দেখতেন। এই কাগজের চাকরি ছাড়ার পরেই তীব্র আর্থিক দুরাবস্থায় পড়ে বাধ্য হন উপন্যাস লিখতেন, রোজগারের জন্য, স্বাভাবিকভাবেই অনেকাংশে তা তাই হয়ে উঠে আত্মজৈবনিক। নিজস্ব যন্ত্রণা-জটিল জীবনের আলো-আঁধার অনুসৃত সৃজনের পেছনে থেকেছে তার আত্মগত উচ্চারণ। 

এক সময় যে কবি বুঝেছিলেন ‘এ যুগ অনেক লেখকের, একজনের নয়—কয়েকজন কবির যুগ; বিংশ শতাব্দীর সূচনা পর্বের স্বপ্ন দেখা জগৎ স্বপ্ন দেখানো জগত, ক্রমশ শতাব্দীর বয়স হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পাল্টাচ্ছিলো। প্রকৃতির রূপ রস-এ নিমজ্জিত কবিও এই যন্ত্রণার বিবর্তন টের পেয়েছেন। যুদ্ধ, মন্বন্তর, দাঙ্গা, কালোবাজারী, বেকারত্ব, সমাজ ও রাষ্ট্রকে অস্থির করে তুলেছিলো, পরাধীনতার বেদনা ও স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা এই সময়ের সর্বোচ্চ আলোড়ন। শতাব্দীর এই রাক্ষসী বেলায় আর বাস্তবের রক্ততটে জীবনানন্দের আগমন। যার কাছে বাংলার লক্ষ গ্রাম ‘নিরাশায় আলোকহীনতায় ডুবে নিস্তব্ধ নিস্তেজ’। জীবনানন্দ যে যন্ত্রণায় তাড়িত হয়েছিলেন তা কি শুধু বাইরের জগতের, নাকি তাঁর অভ্যন্তরের, খবর কে রাখে? তাঁর যন্ত্রণার চিহ্ন নিয়ে রয়ে গেছে তাঁর কবিতা :

‘কোনোদিন মানুষ ছিলাম না আমি,
হে নর, হে নারী,
তোমাদের পৃথিবীকে চিনিনি কোনদিন;

...

গভীর অন্ধকারের ঘুমের আস্বাদে আমার আত্মা লালিত;
আমাকে কেন জাগাতে চাও?’

তাঁর ‘আট বছর আগের একদিন’ পর্বের কবিতায় জীবনানন্দের যে আস্তিক্যবোধের স্পর্শ পাই, সংশয়ের চিহ্ন দেখি তা পরবর্তীতে ‘মহাজিজ্ঞাসা’য় দৃঢ় হয়ে ওঠে। জীবন যাঁর কাছে ছিল ‘অন্ধকারের সারাৎসারে অনন্ত মৃত্যুর মতো মিশে থাকা’, আবার তিনিই লেখেন, ‘তবু চারিদিকে রণক্লান্ত কাজের আহ্বান। / সুচেতনা, এই পথে আলো জ্বেলে—এ-পথেই পৃথীবীর ক্রমমুক্তি হবে’। জীবনের প্রতি প্রত্যাশামুক্ত কবিকে ক্রমশ মৃত্যু বোধ আচ্ছন্ন করছিল। যিনি একসময় লিখেছিলেন, ‘পৃথিবীর ভরাট বাজার লোকসান / লোভ পচা উদ্ভিদ কুষ্ঠ মৃত গলিত আমিষ গন্ধ ঠেলে / সময়ের সমুদ্রকে বারবার মৃত্যু থেকে জীবনের দিকে যেতে ব’লে।’ (পৃথিবীতে এই) তিনিই লেখেন ‘কোথাও মৃত্যু নেই—বিরহ নেই / প্রেম সেতুর থেকে সেতুলোক—/ চলছে—জ্বলছে দ্যাখ। (আমি) স্বেচ্ছা ধ্বংসের যে ধূসর ছায়ায় তিনি বিশ্রাম নিতে চেয়েছিলেন, সেই শান্তি তাকে দিয়েছিলো মৃত্যু, স্বেছা আহূত কি সেই মৃত্যু? যেখানে কবি ‘কোনোদিন জাগিবে না আর / জানিবার গাঢ় বেদনার / অবিরাম—অবিরাম ভার/ সহিব না আর’।

/জেডএস/

সম্পর্কিত

চল্লিশদিন উপন্যাসের সঙ্গে সহবাস, মৃত্যু পর্যন্ত

চল্লিশদিন উপন্যাসের সঙ্গে সহবাস, মৃত্যু পর্যন্ত

আমাদের সেলিব্রেটি কবি শামসুর রাহমান

আমাদের সেলিব্রেটি কবি শামসুর রাহমান

সাহিত্যতত্ত্ব : একটি সংক্ষিপ্ত পরিক্রমা

সাহিত্যতত্ত্ব : একটি সংক্ষিপ্ত পরিক্রমা

ছাদবাগানে ফুলের ঘ্রাণে তবে রসায়ন কমে যাক

ছাদবাগানে ফুলের ঘ্রাণে তবে রসায়ন কমে যাক

ছাদবাগানে ফুলের ঘ্রাণে তবে রসায়ন কমে যাক

আপডেট : ২০ অক্টোবর ২০২১, ১৩:১৪

ভালোবাসি চলো

চলো ভালোবেসে ফেলি পরস্পরে 
পাড়ার লোকে? 
তাকালো না হয় আড়চোখে— 
ক্ষতি কী! 
শানবাধা পুকুরঘাট তো নেই আর 
নেই জমিদারি নৌকায় বাদ্য সাজিয়ে আমোদের ভ্রমণ— 
সাথে শিল্পের খেলা 
এ বুঝি পড়ন্ত বেলা 
হলে হোক, ক্ষতি কী! 
আবার তো সকাল হবে 
আলোয় আলোয় আলোকিত হবে বাগান-ফুল 
হলে হোক ভুল; 
আমরা হয়তো বাগান পাব না 
ক্ষতি কী! 
ছাদবাগানে ফুলের ঘ্রাণে তবে রসায়ন কমে যাক। 
আমরা তো একটি রাস্তাও পাব 
শুধু কি তাই! 
ফ্লাইওভারে চুল উড়িয়ে পাব বিন্দাছ হাঁটার সুখ 
পৃথিবী তবে নিরাপদ করুক আমাদের পথ চলা।। 
চলো, 
এর পরেও কি চিন্তিত হওয়া মানায় বলো? 
দেরি কেন; ভালোবাসি চলো, 
চলো ভালোবাসি পরস্পরে; 
জাত-পাতের কথাও তো দেখি ভাবো অবসরে! 
ঘরে? 
পরে? 
কৃষ্ণের ভালোবাসায় কি অধর্মের কল নড়ে? 
দ্বারে? 
আহা, সোজাসুজি বলো দুয়ারে 
না হয় বলো প্রবেশদ্বার 
এবং বলো দরজা যার 
পারাপার? 
তুমিও তো জানো—উনিও যে নিয়েছেন ফরহাদ-ইউসুফের ভার।। 
পৃথিবীতে দেখো স্ববিরোধী চরিত্রগুলোর খেলা— 
দেখো রক্তের হোলি, 
এসো ভালোবেসে পথ চলি; 
তবে রক্তের খেলা ফেলি 
কে নাড়ে কড়া দুয়ারে হায়! 
আমরা না হয় ভালোবেসে দাঁড়াব মৃত্যুর দরজায়।।



কি করেছি আমি

কি করেছি আমি? 
আমাকে দেখে মুখ ফেরালো 
আকাশে একফালি চাঁদ 
দিনের সূর্যও মুখ ফেরালো 
অশ্রু যে ভাঙ্গলো বাঁধ!

কি করেছি আমি? 
পরিণয় চাওয়াতে বিচ্ছেদ পাতে 
কাঁটা যে বিঁধল পায় 
মঙ্গল চাওয়াতে অমঙ্গল ঘটল 
কলঙ্ক লাগল গায়।

জীবনবীণার করুণ সুরে 
জেগে থাকা প্রতিটি নিশি 
আমার শোকে শোকাহত আজ 
আঁধার রাতের শশী।

কি কারণে যে বিচ্ছেদ চাও 
বাক্ বিনিময় বন্ধ করে দাও 
তুমিই বলো, তুমি ছাড়া আমার 
কী আছে প্রিয় দামি? 
নোনা জলে না হোক 
ঘৃণা ভরে বলো, 
কি করেছি আমি?


অহেতুক প্রস্থান

দৃষ্টি সীমানা পেরিয়ে 
অনন্ত অসীম কোন দূরত্বের সেপথ 
স্মৃতির পৃষ্ঠাজুড়ে কেবল অঞ্জলি ভরা দুঃখ 
তবুও হেঁটে চলা পথ— 
যেন মরুর পথে ধু-ধু বালুচর 
বিচ্ছেদ যেখানে বিধেছে বিমূর্ত চেতন; 
কেন তবে প্রস্থান মৃত্তিকার গন্ধে!

/জেডএস/

সম্পর্কিত

নিখিলেশ রায়ের কবিতা

নিখিলেশ রায়ের কবিতা

নিষিদ্ধ ইস্তেহার 

নিষিদ্ধ ইস্তেহার 

ঘুমোতে যাবার আগে  

ঘুমোতে যাবার আগে  

ব্যক্তিগত

ব্যক্তিগত

সর্বশেষসর্বাধিক
quiz

লাইভ

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

চল্লিশদিন উপন্যাসের সঙ্গে সহবাস, মৃত্যু পর্যন্ত

পর্ব—একচল্লিশদিন উপন্যাসের সঙ্গে সহবাস, মৃত্যু পর্যন্ত

আমাদের সেলিব্রেটি কবি শামসুর রাহমান

আমাদের সেলিব্রেটি কবি শামসুর রাহমান

সাহিত্যতত্ত্ব : একটি সংক্ষিপ্ত পরিক্রমা

পর্ব—সাতসাহিত্যতত্ত্ব : একটি সংক্ষিপ্ত পরিক্রমা

জীবনানন্দ দাশ  একটি পথ দুর্ঘটনা বা পূর্বঘোষিত মৃত্যুর কালপঞ্জি

জীবনানন্দ দাশ একটি পথ দুর্ঘটনা বা পূর্বঘোষিত মৃত্যুর কালপঞ্জি

ছাদবাগানে ফুলের ঘ্রাণে তবে রসায়ন কমে যাক

ছাদবাগানে ফুলের ঘ্রাণে তবে রসায়ন কমে যাক

বিজয়ী হলেন সরোজ মোস্তফা, ইলিয়াস বাবর ও মাজেদা মুজিব

উজান বই আলোচনাবিজয়ী হলেন সরোজ মোস্তফা, ইলিয়াস বাবর ও মাজেদা মুজিব

ফরিদা মজিদের কথা

ফরিদা মজিদের কথা

বাংলা ট্রিবিউন শারদীয় সংখ্যা ২০২১

বিশেষ সংখ্যা (সূচিপত্র)বাংলা ট্রিবিউন শারদীয় সংখ্যা ২০২১

‘তোমরা শান্তিতে ঘুমাও—এই ভুল আমাদের আর কখনো হবে না’ : হারুকি মুরাকামি

‘তোমরা শান্তিতে ঘুমাও—এই ভুল আমাদের আর কখনো হবে না’ : হারুকি মুরাকামি

চাঁদ বণিকের একার যুদ্ধ

প্রবন্ধচাঁদ বণিকের একার যুদ্ধ

সর্বশেষ

হোয়াটসঅ্যাপের হিস্টোরি পিক্সেলেও স্থানান্তর করা যাবে

হোয়াটসঅ্যাপের হিস্টোরি পিক্সেলেও স্থানান্তর করা যাবে

বাটলার-ঝড় তুলতে দেননি নাসুম

বাটলার-ঝড় তুলতে দেননি নাসুম

‘টেকসই উন্নয়নের জন্য চাই ঐক্যবদ্ধ সামাজিক শক্তি’

‘টেকসই উন্নয়নের জন্য চাই ঐক্যবদ্ধ সামাজিক শক্তি’

বেস্ট রিটেইল অ্যাওয়ার্ড পেলো ফেয়ার ইলেকট্রনিক্স

বেস্ট রিটেইল অ্যাওয়ার্ড পেলো ফেয়ার ইলেকট্রনিক্স

পুলিশের জন্য কেনা হচ্ছে হেলিকপ্টার

পুলিশের জন্য কেনা হচ্ছে হেলিকপ্টার

© 2021 Bangla Tribune