X
বুধবার, ০৮ ডিসেম্বর ২০২১, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৮

সেকশনস

রোহিঙ্গাদের অভিযোগে আরসা, পুলিশ বললো অস্তিত্ব নেই

আপডেট : ২৩ অক্টোবর ২০২১, ০০:১৭

রাত তখন ৩টা। কক্সবাজারের উখিয়ার বালুখালী ১৮ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের এইচ ব্লকে সুনসান নীরবতা। কেউ ঘুমের ঘোরে, কেউ তাহাজ্জুদের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। ঠিক একই অবস্থা ক্যাম্পের দারুল উলুম নাদওয়াতুল উলামা আল ইসলামিয়া মাদ্রাসায়ও। রাত পোহালে শুক্রবার। ছুটির দিন হওয়ায় অনেক ছাত্র বাড়িতে চলে গেছেন। হেফজ বিভাগের ২০/২৫ ছাত্র এবং সাত শিক্ষক রাতে মাদ্রাসায় অবস্থান করছিলেন। শিক্ষকদের কয়েকজন তখন মসজিদে তাহাজ্জুদের নামাজে দাঁড়িয়েছিলেন। এমন সময় ঘটে আকস্মিক সশস্ত্র হামলা। প্রায় সাড়ে ৩০০ সন্ত্রাসী দা, কিরিচসহ নানান দেশীয় অস্ত্র নিয়ে মাদ্রাসায় ঢুকে শিক্ষক ও ছাত্রদের ওপর হামলা চালায়। এতে নিহত হয়েছেন ছয় জন। এর মধ্যে তিন শিক্ষক, এক ছাত্র ও দুই সাধারণ রোহিঙ্গা রয়েছেন। এই ঘটনায় মাদ্রাসার শিক্ষক ও সাধারণ রোহিঙ্গারা সরাসরি আরাকানের সন্ত্রাসী সংগঠন আরসা’কে দায়ী করেছেন।

নিহতরা হলেন- শিক্ষক হাফেজ মো. ইদ্রিস, মসজিদের ইমাম নুর হালিম, হামিদ উল্লাহ, ছাত্র নুর কায়সার, স্থানীয় রোহিঙ্গা আজিজুল হক (১৬) ও মোহাম্মদ আমিন (৬৩)। এ ঘটনায় মাদ্রাসা পরিচালক দিল মোহাম্মদসহ আরও ৯ জন গুরুতর আহত হয়েছেন। তাদের হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

এর আগে ২৯ সেপ্টেম্বর কক্সবাজারের উখিয়ার কুতুপালংয়ে রোহিঙ্গাদের শীর্ষস্থানীয় নেতা মো. মুহিবুল্লাহকে (৫০) হত্যার ঘটনায় আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মির (আরসা) সন্ত্রাসীরা জড়িত বলে অভিযোগ তুলেছিল তার পরিবার।

এদিকে, বাংলাদেশে আরসা নামের কোনও সংগঠনের অস্তিত্ব নেই দাবি করে কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘দুর্বৃত্তের গুলিতে ছয় রোহিঙ্গা নিহত হয়েছেন। তাদের লাশ ময়নাতদন্তের জন্য কক্সবাজার সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে। তবে নিশ্চিত না হয়ে বলা যাচ্ছে না এ ঘটনায় কারা জড়িত।’

রোহিঙ্গা ক্যাম্প নিয়ে কাজ করা একাধিক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তা ও সদস্যরা বলেন, ‘এ ধরনের হামলা হতে পারে, সে বিষয়ে আমরা আগে থেকেই আঁচ করেছিলাম। এ নিয়ে আমরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিতও করেছি। কিন্তু আমরা পদক্ষেপ নিতে পারেনি। মূলত মুহিবুল্লাহ হত্যার পরই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বেশ কিছু অপরাধী ধরা পড়েছে। সেখানে এ হামলাকারীদের অনেক সদস্য ছিল। ফলে তারা আরও বেশি ভয়ংকর হয়ে ওঠে। এ ধরনের হামলা আরও হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।’

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী মাদ্রাসাটির দাওরা বিভাগের (উচ্চতর শ্রেণি) ছাত্র রহিমুল্লাহ বলেন, ‘শুক্রবার ছুটি থাকায় রাতে তেমন পড়াশোনা ছিল না। তাই এশার নামাজের পর সামান্য পড়ে শুয়ে পড়েছিলাম। রাত ৩টার দিকে হঠাৎ পশ্চিম দিক থেকে ৩০০/৪০০ সন্ত্রাসী অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে মাদ্রাসা ঘিরে ফেলে। এর মধ্যে দেড় শতাধিক ক্যাম্পাসে ঢুকে টিনশেডে দা কিরিচ দিয়ে কোপাতে থাকে। পরে তারা নামাজরত অবস্থায় শিক্ষকদের ওপর হামলা করে, গুলি চালিয়ে তাদের হত্যা করে। পরে ছাত্রদের কক্ষে ঢুকে ভাঙচুর করে তাদের ওপরও হামলা চালায়। সেখানে বেশিরভাগ ছিল হেফজ বিভাগের ১০ থেকে ১২ বছর বয়সী ছাত্র। ঘটনার খবর পেয়ে স্থানীয় অভিভাবকদের অনেকে তাদের সন্তানদের উদ্ধারে এগিয়ে এলে তাদের ওপরও হামলা করে আরসার সন্ত্রাসীরা। তবে এত বেশি সংখ্যক সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের প্রতিরোধ করতে সাহস করেনি কেউ।’

ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যান প্রশাসনের কর্মকর্তারা

শুক্রবার সকালে উখিয়ার বালুখালীর ওই ক্যাম্পে গিয়ে দেখা যায়, মাদ্রাসাটি ঘিরে রেখেছে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) সদস্যরা। মাদ্রাসার বাইরে সড়কে সেনাবাহিনীসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলার সদস্যরা মোতায়েন রয়েছে। এলাকার মানুষের মুখে কোনও সাড়া শব্দ নেই। তবে নিহত পরিবারগুলোতে স্বজনদের আহাজারি শোনা গেছে।

রোহিঙ্গাদের অভিযোগ, আরসা পুরো ক্যাম্পে আধিপত্য বিস্তার করছে। তাদের আলেমদের নিয়ে গঠিত সংগঠন ‘উলামা কাউন্সিল’ ক্যাম্পের প্রত্যেক মসজিদ-মাদ্রাসা নিয়ন্ত্রণ নিতে চেয়েছিল। ইতোমধ্যে ক্যাম্পের শতাধিক মাদ্রাসার নিয়ন্ত্রণও তাদের হাতে। যেসব মাদ্রাসা তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে সেখানে তারা সন্ত্রাসী হামলা চালাচ্ছে। একাধিকবার তারা এ মাদ্রাসাটি নিয়ন্ত্রণে নিতে চেষ্টা করেছিল। কিন্তু আরসার একাধিক প্রস্তাবেও কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় রোহিঙ্গারা প্রতিষ্ঠানটি তাদের হাতে তুলে দিতে রাজি হননি। এতে ওই ব্লকের রোহিঙ্গা ও মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের ওপর ভীষণ খেপেছিল আরসার নেতার।

এইচ ব্লকের নুর আমিন জানান, যে মাদরাসাটিতে হামলা হয়েছিল, সেটি পরিচালনা করতেন ইসলামিক মাহাজ নামের একটি রোহিঙ্গা সংগঠন। তবে সংগঠনটি রোহিঙ্গাদের অধিকার আদায়সহ, মিয়ানমার ফেরাতে উৎসাহিত করার কাজ করছে। এছাড়া সংগঠনটি রোহিঙ্গাদের কল্যাণে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছে। কিন্তু সন্ত্রাসী সংগঠনটি (আরসা) এটি মেনে নিতে পারেনি। তাই মাহাজকে পিছু হটাতে সংগঠনটির মূল কেন্দ্র মাদ্রাসাটিতে হামলা চালানো হয়।

নিহত আজিজুল হকের মা সাজেদা বেগম বলেন, ‘আমার ছেলে আজিজ মাদ্রাসায় হামলার ঘটনার খবর শুনে হেফজ বিভাগে পড়ুয়া ভাই নুর কদরকে উদ্ধার করতে ছুটে গিয়েছিলেন। সেখানে আরসার সদস্যরা আমার ছেলেকে মেরে ফেলেছে।’

হামলার শিকার মাদ্রাসাটি

নিহত নুর হালিমের স্ত্রী উম্মে হাবিবা বলেন, ‘আমার স্বামী মাদ্রাসাটির শিক্ষক ছিলেন এবং মসজিদের ইমামতি করতেন। ঘটনার রাতে তিনি মাদরাসায় ছিলেন। সন্ত্রাসীরা আমার স্বামীকে মাদরাসায় ঢুকে ঘুমন্ত অবস্থায় হামলার পর হত্যা করে। সন্ত্রাসীরা সবাই আরসার লোক ছিলেন। এর আগেও একাধিকবার তারা আমার স্বামীকে হুমকি দিয়েছিল।’

এইচ ব্লকের রোহিঙ্গা নেতা মো. ইউসুফ বলেন, ‘আমরা মিয়ানমারে রাখাইনদের হাতে মার খেয়ে আশ্রয়ের জন্য এ দেশে পালিয়ে এসেছিলাম। এখন এখানে এসে রোহিঙ্গাদের মার খেতে হচ্ছে। সন্ধ্যার পর ক্যাম্পে এক বিভীষিকাময় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। আজ সন্ধ্যার পর কী ঘটবে তাও আমাদের অজানা। আমরা চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। এখানে বিশেষ করে রাতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করা দরকার।’

এদিকে, শুক্রবার সকাল ১১টায় ক্যাম্পের ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মো. মামুনুর রশীদ, অতিরিক্ত শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার সামছু দৌজা চৌধুরী নয়ন, উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নিজাম উদ্দিন আহমেদ, ১৬ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক নাঈমুল হক, ৮ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক শিহাব কায়সার খান।

জেলা প্রশাসক বলেন, ‘অপরাধীদের চিহ্নিত করে দ্রুত আইনের আওতায় আনা হবে, ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে সেজন্য ক্যাম্প প্রশাসন আরও কঠোর অবস্থানে থাকবে। ঘটনা তদন্তের পর বিস্তারিত কারণ জানা যাবে। অনুমান করে কিছু বলতে চাচ্ছি না।’

অতিরিক্ত শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার সামছু দৌজা নয়ন বলেন, ‘একদল দুর্বৃত্তের হামলায় ছয় জন রোহিঙ্গা নিহত হয়েছে। ক্যাম্পের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এখন স্বাভাবিক রয়েছে। ক্যাম্পে অতিরিক্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে আমরা কাজ করছি।’

/এফআর/

সম্পর্কিত

মাইলেজ জটিলতা নিরসনের দাবিতে রেলওয়ে কর্মীদের বিক্ষোভ

মাইলেজ জটিলতা নিরসনের দাবিতে রেলওয়ে কর্মীদের বিক্ষোভ

যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ জাহাজ চট্টগ্রামে

যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ জাহাজ চট্টগ্রামে

পারিবারিক কলহের জেরে আড়াই মাসের শিশুকে হত্যা

পারিবারিক কলহের জেরে আড়াই মাসের শিশুকে হত্যা

অটোরিকশার চাকায় চাদর পেঁচিয়ে প্রাণ গেলো চালকের

অটোরিকশার চাকায় চাদর পেঁচিয়ে প্রাণ গেলো চালকের

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ

মাইলেজ জটিলতা নিরসনের দাবিতে রেলওয়ে কর্মীদের বিক্ষোভ

মাইলেজ জটিলতা নিরসনের দাবিতে রেলওয়ে কর্মীদের বিক্ষোভ

যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ জাহাজ চট্টগ্রামে

যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ জাহাজ চট্টগ্রামে

পারিবারিক কলহের জেরে আড়াই মাসের শিশুকে হত্যা

পারিবারিক কলহের জেরে আড়াই মাসের শিশুকে হত্যা

অটোরিকশার চাকায় চাদর পেঁচিয়ে প্রাণ গেলো চালকের

অটোরিকশার চাকায় চাদর পেঁচিয়ে প্রাণ গেলো চালকের

ওএমএসের চাল-আটা বিক্রিতে অনিয়ম, লাখ টাকা দণ্ড

ওএমএসের চাল-আটা বিক্রিতে অনিয়ম, লাখ টাকা দণ্ড

অপহরণের পর চিৎকার করায় রাজকে হত্যা করে ফরিদুল

অপহরণের পর চিৎকার করায় রাজকে হত্যা করে ফরিদুল

বিশ্বের কোনও গণতন্ত্রই নিখুঁত নয়: শিক্ষামন্ত্রী

বিশ্বের কোনও গণতন্ত্রই নিখুঁত নয়: শিক্ষামন্ত্রী

৪৮ ঘণ্টায়ও উদ্ধার হয়নি চট্টগ্রামে খালে নিখোঁজ পথশিশু

৪৮ ঘণ্টায়ও উদ্ধার হয়নি চট্টগ্রামে খালে নিখোঁজ পথশিশু

সরকারের সঙ্গে সম্পৃক্ত কেউ কেউ নিজেদের বিতর্কিত করছেন: শিক্ষামন্ত্রী

সরকারের সঙ্গে সম্পৃক্ত কেউ কেউ নিজেদের বিতর্কিত করছেন: শিক্ষামন্ত্রী

ফেসবুকের বিরুদ্ধে মামলা করতে চান বাংলাদেশে থাকা রোহিঙ্গারাও

ফেসবুকের বিরুদ্ধে মামলা করতে চান বাংলাদেশে থাকা রোহিঙ্গারাও

সর্বশেষ

প্রক্টর পরিচয়ে সাংবাদিককে হুমকি বহিষ্কৃত চবি ছাত্রলীগ কর্মীর

প্রক্টর পরিচয়ে সাংবাদিককে হুমকি বহিষ্কৃত চবি ছাত্রলীগ কর্মীর

ভারতের ওয়ানডে অধিনায়কও রোহিত

ভারতের ওয়ানডে অধিনায়কও রোহিত

‘গ্রিন ফ্যাক্টরি অ্যাওয়ার্ড’ পেলো আকিজ ফুড

‘গ্রিন ফ্যাক্টরি অ্যাওয়ার্ড’ পেলো আকিজ ফুড

‘ট্রুথ সোশ্যাল’ দিয়ে ট্রাম্পের বিলিয়ন ডলার সংগ্রহের উদ্যোগ

‘ট্রুথ সোশ্যাল’ দিয়ে ট্রাম্পের বিলিয়ন ডলার সংগ্রহের উদ্যোগ

নারীদের নগদ টাকার ফাঁদে ফেলতো পাচারকারীরা

নারীদের নগদ টাকার ফাঁদে ফেলতো পাচারকারীরা

© 2021 Bangla Tribune