রোহিঙ্গা ক্যাম্পের মাদ্রাসায় ‘ট্রেনিং সেন্টার’ করতে চেয়েছিল সন্ত্রাসীরা 

আবদুল আজিজ, কক্সবাজার
২৩ অক্টোবর ২০২১, ১০:৫৬আপডেট : ২৩ অক্টোবর ২০২১, ১১:৫১

কক্সবাজারের উখিয়ার বালুখালী ১৮ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অবস্থিত ‘দারুল উলুম নাদওয়াতুল ওলামা আল-ইসলামিয়াহ মাদ্রাসা’য় ট্রেনিং সেন্টার করতে চেয়েছিল একটি সশস্ত্র সন্ত্রাসী গ্রুপ। একইসঙ্গে ওই গ্রুপটিতে মাদ্রাসার শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের যোগ দেওয়ারও চাপ ছিল সন্ত্রাসীদের। এ জন্য প্রতিনিয়ত প্রাণনাশের হুমকিতে আতংকে ছিলেন মাদ্রাসার শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা। এমনটি অভিযোগ করছেন সন্ত্রাসীদের হাতে নিহতের স্বজন ও সাধারণ রোহিঙ্গারা।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পের মাদ্রাসায় হয়েছিল হামলা, নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৬

রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বিভিন্ন সূত্র জানায়, রোহিঙ্গাদের শীর্ষ নেতা মুহিবুল্লাহকে হত্যার পর ক্যাম্প জুড়ে বিরাজ করছে অস্থিরতা। কয়েকটি সন্ত্রাসী গ্রুপ রাত হলেই ক্যাম্পের নিয়ন্ত্রণ নেয়। এতে সাধারণ রোহিঙ্গাদের মধ্যে আতংক দেখা দিয়েছে। রাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন না থাকায় সন্ত্রাসীদের তৎপরতা বেড়ে যায় বলে অভিযোগ করেছেন রোহিঙ্গারা। তবে সন্ত্রাসীদের ভয়ে ক্যাম্পের বাসিন্দারা এ বিষয়ে কথা বলতে চান না, দেন না কোনও অভিযোগ।  

মুহিবুল্লাহ হত্যা: তিন মিনিটে শেষ হয় কিলিং মিশন


​শুক্রবার (২২ অক্টোবর) দুপুরে ময়নাতদন্ত শেষে লাশ নিতে আসা নিহত রোহিঙ্গাদের কয়েকজন স্বজনের সঙ্গে কথা হয়। তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন- কক্সবাজারের উখিয়ার বালুখালী ১৮ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অবস্থিত ‌‘দারুল উলুম নাদওয়াতুল ওলামা আল-ইসলামিয়াহ মাদ্রাসা’টিতে ‘আরসা’র পরিচয়ে কিছু সন্ত্রাসী ট্রেনিং সেন্টার করতে মাদ্রাসা সুপারকে চাপ দিচ্ছিল। কিন্তু, মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ এতে রাজি না হওয়ায় রাতে হামলা চালানো হয়। এ সময় এলোপাতাড়ি কুপিয়ে মাদ্রাসা শিক্ষক, ছাত্র ও স্বেচ্ছাসেবীসহ ছয় জন রোহিঙ্গাকে হত্যা করা হয়। হামলায় আহত হন ১০-১২ জন। 

অভিযোগ রয়েছে, নির্মম এই ঘটনার পরও হামলাকারীরা ক্যাম্পের আশপাশেই বীরদর্পে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কিন্তু সাধারণ রোহিঙ্গারা ভয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের তা জানাতে পারছেন না। কারণ দিনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে থাকলেও রাত হলে ক্যাম্পের নিয়ন্ত্রণ চলে যায় সন্ত্রাসীদের হাতে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে নিহত রোহিঙ্গার আরেক স্বজন অভিযোগ করেন, ‘ক্যাম্পে রাতের অবস্থা খুব ভয়াবহ। দিন শেষে সন্ধ্যা হলেই নিয়ন্ত্রণে নেয় সশস্ত্র সন্ত্রাসী গ্রুপ। এই গ্রুপটি মিয়ানমারের রাখাইনে সাধারণ রোহিঙ্গাদের যে জুলুম-নির্যাতন করে আসছিল, ঠিক একই কায়দায় ক্যাম্পগুলোতে রোহিঙ্গাদের নির্যাতন চালাচ্ছে। ক্যাম্পগুলো তাদের নিয়ন্ত্রণে নিতে চায়। রাত হলেই এসব সশস্ত্র সন্ত্রাসী গ্রুপের বিচরণে ভয়ে রাত কাটে রোহিঙ্গাদের।’

রোহিঙ্গাদের ভাষ্যমতে, ‘আরসা’র নামধারী মৌলভী আবু বক্কর, মৌলভী নুর হোছন, খালেক, ফজলুল কবির, ইকবালসহ অনেকেই উখিয়ার বালুখালী ২ নম্বর ক্যাম্পটি নিয়ন্ত্রণে নিতে চায়। এর জের ধরেই মাদ্রাসায় হামলার ঘটনা ঘটেছে।

জানতে চাইলে ক্যাম্পে নিয়োজিত ১৪ নম্বর আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন ‘এপিবিএন’র অধিনায়ক (পুলিশ সুপার) মো. নাঈমুল হক জানান- রাতে ক্যাম্পগুলোতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। এরপরও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ যদি মনে করে নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও কঠোর হবে। নিহত ছয় জনের হত্যাকারীদের ধরতে পুলিশি অভিযান জোরদার করা হয়েছে বলে জানান তিনি। 

কক্সবাজার জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. রফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পের মাদ্রাসায় হামলার ঘটনায় এই পর্যন্ত ছয় জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। লাশগুলোর ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। ঘটনার পর রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অভিযান জোরদার করা হয়েছে বলে জানান তিনি। 

শুক্রবার (২২ অক্টোবর) ভোর ৪টার সন্ত্রাসীদের হামলায় রোহিঙ্গা ক্যাম্প-১২, ব্লক-জে-৫ এর বাসিন্দা হাফেজ ও মাদ্রাসা শিক্ষক মো. ইদ্রীস (৩২), ক্যাম্প-৯ ব্লক-১৯ এর মৃত মুফতি হাবিবুল্লাহর ছেলে  ইব্রাহিম হোসেন (২৪), ক্যাম্প-১৮, ব্লক-এইচ -৫২ এর নুরুল ইসলামের ছেলে মাদ্রাসার ছাত্র আজিজুল হক (২২), একই ক্যাম্পের স্বেচ্ছাসেবী আবুল হোসেনের ছেলে মো. আমীন (৩২)। ‘এফডিএমএন’ ক্যাম্প-১৮, ব্লক-এফ-২২ এর মোহাম্মদ নবীর ছেলে মাদ্রাসা শিক্ষক নুর আলম ওরফে হালিম (৪৫), এফডিএমএন ক্যাম্প-২৪-এর রহিম উল্লাহর ছেলে মাদ্রাসা শিক্ষক হামিদুল্লাহ (৫৫) নিহত হন। পুলিশ হামলাকারীদের সদস্য মুজিবুর নামের একজনকে দেশীয় লোডেড ওয়ান শ্যুটারগান, ছয় রাউন্ড গুলি ও একটি ছুরিসহ হাতেনাতে গ্রেফতার করে। সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরির পর নিহতদের লাশ কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়। পরে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে নিহতদের দাফন করা হয়।

গত ২৯ সেপ্টেম্বর রোহিঙ্গাদের শীর্ষনেতা মুহিবুল্লাহকে গুলি করে হত্যার পর ক্যাম্পজুড়ে বিরাজ করছে অস্থিরতা। সৃষ্টি হয়েছে ভীতিকর পরিস্থিতি। ক্যাম্পে কয়েকটি সশস্ত্র গ্রুপ মাদক ও অস্ত্রের ব্যবসা করছে। এছাড়া অবৈধ দখলের মাধ্যমেও তারা বিভিন্ন দোকান পরিচালনা করছে। মানুষ হত্যা ও জিম্মির ঘটনাও ঘটছে। তাই, সরকার ও জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক এজেন্সি একত্রে কাজ করছে। 

/টিটি/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
সব ধরনের সরকারি সুবিধা এক কার্ডে আনার ঘোষণা প্রধানমন্ত্রীর
সব ধরনের সরকারি সুবিধা এক কার্ডে আনার ঘোষণা প্রধানমন্ত্রীর
সরকার কোনও ধরনের চরমপন্থা বা উগ্রবাদকে প্রশ্রয় দেবে না: প্রধানমন্ত্রী
সরকার কোনও ধরনের চরমপন্থা বা উগ্রবাদকে প্রশ্রয় দেবে না: প্রধানমন্ত্রী
অসত্য সংবাদ প্রকাশ করলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা: তথ্য অধিদফতর
অসত্য সংবাদ প্রকাশ করলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা: তথ্য অধিদফতর
পিরোজপুরে ঝর্ণা হত্যা: মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হাইকোর্টে খালাস
পিরোজপুরে ঝর্ণা হত্যা: মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হাইকোর্টে খালাস
সর্বাধিক পঠিত
২ মাসের শিশুর ভিডিও ভাইরাল, স্ত্রীর অপরাধে স্বামী-বাবা গ্রেফতার, কী ঘটেছিল
২ মাসের শিশুর ভিডিও ভাইরাল, স্ত্রীর অপরাধে স্বামী-বাবা গ্রেফতার, কী ঘটেছিল
আতঙ্কের নাম ডেভিড ইমন, কেন ধরতে পারছে না পুলিশ
আতঙ্কের নাম ডেভিড ইমন, কেন ধরতে পারছে না পুলিশ
এবার দুঃখ প্রকাশ করলেন কুমিল্লা শিক্ষাবোর্ডের চেয়ারম্যান
এবার দুঃখ প্রকাশ করলেন কুমিল্লা শিক্ষাবোর্ডের চেয়ারম্যান
রাস্তা আটকে রাতেও চলছে আন্দোলন
রাস্তা আটকে রাতেও চলছে আন্দোলন
ভালোবাসার মতো, অথচ ভালোবাসা নয়: নাম কী সে অনুভূতির
ভালোবাসার মতো, অথচ ভালোবাসা নয়: নাম কী সে অনুভূতির