মমতার তৃণমূলে ভাঙনের সুর, দল ছাড়তে পারেন ৫০ বিধায়ক

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
০২ জুন ২০২৬, ১৬:১৮আপডেট : ০২ জুন ২০২৬, ১৬:১৮

পশ্চিমবঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেসে ভাঙনের সুর দেখা দিয়েছে। দাবি উঠেছে, প্রায় ৫০ জন বিধায়ক দল ছাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। দল থেকে সাময়িকভাবে বহিষ্কৃত জাতীয় মুখপাত্র রিজু দত্ত জানিয়েছেন, এই ক্ষুব্ধ বিধায়করা শেষ পর্যন্ত তৃণমূলের বিখ্যাত জোড়াফুল প্রতীক চাইতে পারেন।

ইন্ডিয়া টুডেকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রিজু দত্ত বলেন, আমার সূত্র অনুযায়ী, প্রায় ৫০ জন বিধায়ক তৃণমূল কংগ্রেস ভাঙার উপায় খুঁজছেন। নবনির্বাচিত তৃণমূল আইনপ্রণেতাদের একটি অংশ বহিষ্কৃত বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা হিসেবে দেখতে চেয়েছিলেন এবং তারা এটিকেই আসল তৃণমূল কংগ্রেস হিসেবে দাবি করার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছেন।

তৃণমূলের এই বিদ্রোহী শিবিরের তৎপরতার বিষয়ে রিজু দত্তের এই দাবি এমন এক সময়ে সামনে এলো, যখন ১৯৯৮ সালে দল গঠনের পর থেকে সবচেয়ে বড় অভ্যন্তরীণ সংকটের মুখোমুখি হয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বিরোধী দলনেতা নির্বাচন প্রক্রিয়ায় বিধায়কদের জাল স্বাক্ষরের বিতর্ক, ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় ও সন্দীপন সাহা নামের দুই বিধায়ককে বহিষ্কার এবং অন্যান্য প্রবীণ নেতাদের মধ্যে ক্রমবর্ধমান অসন্তোষের জেরে এই বিদ্রোহের গুঞ্জন আরও জোরালো হয়েছে। তবে রিজু দত্তের এই দাবি এখনও অন্য কোনও সূত্রে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তৃণমূলের কোনও বিধায়ক এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে তার এই বক্তব্যকে সমর্থন করেননি এবং নির্বাচন কমিশনের কাছেও প্রতীক নিয়ে কোনও আনুষ্ঠানিক দাবি জানানো হয়নি।

এ বিষয়ে সোমবার একটি ফেসবুক লাইভে এসে তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও দলের ভেতরের এই ফাটলের কথা স্বীকার করেছেন। মমতা বলেন, তৃণমূলের বিধায়কদের পুলিশের মাধ্যমে ভয় দেখানো হচ্ছে এবং নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ করার জন্য নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে।

একই সঙ্গে দলের প্রবীণ নেতা কুণাল ঘোষ হাত জোড় করে বিদ্রোহী বিধায়কদের বিভ্রান্ত না হওয়ার জন্য অনুরোধ করেছেন। কুণাল ঘোষ অভিযোগ করেন, দলীয় নেতৃত্বকে না জানিয়ে একটি গোপন বৈঠক আয়োজনের মাধ্যমে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় দলে বিভাজন তৈরির চেষ্টা করছেন।

তবে সোমবার কলকাতার একটি বাংলা নিউজ চ্যানেল এবিপি আনন্দকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় আলাদা দল গঠনের কোনও উদ্যোগের কথা অস্বীকার করেছেন। সম্ভাব্য নতুন দল গঠন বা দল ভাঙার বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, ‘আমি কোনও কিছু নিয়ে অনুমান করতে পারি না। তবে তৃণমূলে কথা বলার কোনও জায়গা নেই, এটা সবাই জানে। তৃণমূল দলটি বিলুপ্ত হওয়ার পথে রয়েছে এবং এটি আর টিকবে না। শুধু আমি নই, আমাদের অনেক প্রবীণ সংসদ সদস্য এবং নেতাও একই কথা বলছেন। আমি হয়তো এটি প্রকাশ্যে বলছি।’

সোমবার সন্ধ্যায় দক্ষিণ কলকাতার একটি হোটেলে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় এবং সন্দীপন সাহা বেশ কয়েকজন বিধায়কের সঙ্গে গোপন বৈঠক করেছেন বলে কুণাল ঘোষ যে দাবি করেছিলেন, ঋতব্রত তা প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং ঘোষের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দিয়েছেন। তবে পশ্চিমবঙ্গের দৈনিক পত্রিকা সংবাদ প্রতিদিনের শেয়ার করা একটি ভিডিও ক্লিপে কুণাল ঘোষকে বলতে শোনা গেছে, ‘আমি হাত জোড় করে আমাদের বিধায়কদের অনুরোধ করব। আমরা এখানে নিজেদের যোগ্যতায় জিতে আসিনি। আমরা তৃণমূল কংগ্রেসের কারণে এসেছি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছবি ব্যবহার করা হয়েছিল এবং তার উপার্জিত ভোট পেয়েই আমরা এখানে এসেছি। লোকের বিবেক বলে কিছু থাকা উচিত।’ কুণাল ঘোষ এই ঘটনাকে ‘দলবিরোধী কর্মকাণ্ড’ হিসেবে বর্ণনা করে আরও বলেন, ‘এবার হয়তো বিজেপি এদের নেওয়ার চেষ্টা করেছে। কিন্তু দোষটা দেব আমি ওদের, যারা গাজরটা খাওয়ার চেষ্টা করছে।’

তৃণমূলের এই উৎকণ্ঠার পেছনে একটি বড় কারণ রয়েছে। গত ৩১ মে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ডাকা একটি গুরুত্বপূর্ণ দলীয় বৈঠক ২৯৪ আসনের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় তৃণমূলের থাকা ৮০ জন বিধায়কের মধ্যে প্রায় ৬০ জনই এড়িয়ে গেছেন। দল এই অনুপস্থিতিকে সাধারণ ঘটনা হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করলেও, এটি দলের ভেতরে বড় ধরনের ফাটলের ইঙ্গিত দিচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিষয়ের অধ্যাপক সায়ন্তন ঘোষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ লিখেছেন, ‘তৃণমূল বাংলায় ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী ১৮ জুনের কাছাকাছি শুরু হতে যাওয়া বিধানসভার বাজেট অধিবেশনের মধ্যেই দলটির কার্যকর পতন ঘটতে পারে।’

দল ভাঙার ক্ষেত্রে দলত্যাগ বিরোধী আইন এড়াতে মোট বিধায়কের দুই-তৃতীয়াংশ বা প্রায় ৫৩ জন বিধায়কের সমর্থনের প্রয়োজন হয়, যা রিজু দত্তের দাবি করা ৫০ জনের কাছাকাছি।

এর আগে, বিধানসভার বিরোধী দলনেতা নির্বাচনের মনোনয়নপত্রে তৃণমূল বিধায়কদের স্বাক্ষর জাল করার বিরুদ্ধে সরব হওয়ায় দল থেকে বহিষ্কৃত হন ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় ও সন্দীপন সাহা। প্রবীণ রাজনীতিক ঋতব্রত তার রাজনৈতিক জীবন শুরু করেছিলেন সিপিআই (এম)-এর ছাত্র সংগঠন এসএফআইয়ের মাধ্যমে। পরে ২০১৭ সালে সেখান থেকে বহিষ্কৃত হয়ে ২০২০ সালে তৃণমূলে যোগ দেন এবং রাজ্যসভার সাংসদ ও আইএনটিটিইউসি-র রাজ্য সভাপতি হন। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তিনি উলুবেড়িয়া পূর্ব আসন থেকে ১১ হাজার ভোটে জয়ী হন। দল থেকে বহিষ্কারের পর সোমবার তিনি তৃণমূলের সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের তীব্র সমালোচনা করে বলেন, নির্বাচনে দলের পরাজয়ের পরও যেখানে সাধারণ সম্পাদককে উঠে দাঁড়িয়ে সম্মান জানাতে হয়, সেই দলে কথা বলার কোনও সুযোগ নেই।

সূত্র: ইন্ডিয়া টুডে

 

/এএ/
সম্পর্কিত
মার্কিন যুদ্ধবিরতি প্রত্যাখ্যান হিজবুল্লাহর, চলছে ইসরায়েলি হামলা
ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্নে মার্কিন চাপ মানছে না ওমান
রাস্তায় তোশক আর মুখে মুখ, দিল্লির আগুনে যেভাবে ‘হিরো’ হলেন স্থানীয়রা
সর্বশেষ খবর
কুমিরের আক্রমণে সন্তানের মৃত্যুর পর ফজিলাকে খুঁজে পেলো পরিবার
কুমিরের আক্রমণে সন্তানের মৃত্যুর পর ফজিলাকে খুঁজে পেলো পরিবার
ট্রাফিক আইন সবার জন্য সমান, পুলিশ সদস্য হলেও ব্যবস্থা: ডিএমপি কমিশনার
ট্রাফিক আইন সবার জন্য সমান, পুলিশ সদস্য হলেও ব্যবস্থা: ডিএমপি কমিশনার
ফ্রিল্যান্সারদের আয় থেকে সাড়ে ৭ শতাংশ কর কাটা নিয়ে যা বলছে এনবিআর 
ফ্রিল্যান্সারদের আয় থেকে সাড়ে ৭ শতাংশ কর কাটা নিয়ে যা বলছে এনবিআর 
কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের আয়ে ৭.৫% কর নেওয়ার অভিযোগ, স্পষ্ট করার দাবি সারজিসের
কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের আয়ে ৭.৫% কর নেওয়ার অভিযোগ, স্পষ্ট করার দাবি সারজিসের
সর্বাধিক পঠিত
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
হতাশা থেকে আত্মহত্যা বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালকের, ধারণা পুলিশের
হতাশা থেকে আত্মহত্যা বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালকের, ধারণা পুলিশের
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে