যেখানে বিয়ের পথে বাধা এক বালতি পানি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
১১ জুন ২০২৬, ১৩:২২আপডেট : ১১ জুন ২০২৬, ১৩:২২

ভারতের উত্তর প্রদেশের মহোবা জেলার মুধারা গ্রামের প্রতিটি সকাল কাজ, স্কুল বা চাষবাস দিয়ে শুরু হয় না; শুরু হয় পানি সংগ্রহের এক তীব্র প্রতিযোগিতা দিয়ে। প্লাস্টিকের পাত্র হাতে শিশুরা, তীব্র রোদে প্রবীণদের অপেক্ষা আর ঘণ্টার পর ঘণ্টা কলসি-বালতি কাঁধে নারীদের হেঁটে চলা এই গ্রামের চেনা দৃশ্য। বুন্দেলখণ্ডের এই শুষ্ক জনপদে পানির তীব্র সংকট এখন কেবল তৃষ্ণা মেটানোর লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ নেই, তা রূপ নিয়েছে এক সামাজিক অভিশাপে। আর এই সংকটের কারণে গ্রামের অন্তত ৪০ জন যুবক বিয়ে করতে পারছেন না।

বুন্দেলখণ্ডের এই শুষ্ক অঞ্চলের মুধারা গ্রামের জীবনযাত্রার চিত্র অত্যন্ত ভয়াবহ। প্রতিটি ঘরে পাইপের মাধ্যমে পানি পৌঁছে দেওয়ার সরকারি দাবি সত্ত্বেও গ্রামবাসীদের অভিযোগ, কোটি কোটি টাকার পানীয় জল প্রকল্পের আওতায় বসানো কল থেকে আজ পর্যন্ত এক ফোঁটা পানিও পড়েনি। এর ফলে তৃষ্ণার চেয়েও বড় সামাজিক সংকটের মুখোমুখি হতে হচ্ছে গ্রামের মানুষদের। এক গ্রামবাসী বলেন, গ্রামে বিয়ের বয়সী প্রায় ৪০ জন যুবক রয়েছেন। কিন্তু এখানে পানি না থাকায় কেউ তাদের মেয়েদের এই গ্রামে বিয়ে দিতে চান না।

বিয়ের জন্য পাত্রী খুঁজতে গেলে পাত্রপক্ষের আলোচনা শুরুতেই থমকে যায় যখন কনেপক্ষ মুধারা গ্রামের পানির সংকটের কথা জানতে পারে। এক বয়োবৃদ্ধ গ্রামবাসী বলেন, তারা আমাদের সরাসরি জিজ্ঞেস করে, আমাদের মেয়ে আপনাদের গ্রামে গেলে তাকে কতটা পানি বয়ে নিয়ে আসতে হবে? মানুষ এখন সরাসরিই বলে দিচ্ছে যে, যে গ্রামে পানীয় জলের ব্যবস্থা নেই, সেখানে তারা মেয়ে বিয়ে দেবে না।

‘নমামী গঙ্গে’ প্রকল্পের আওতায় দুই বছরেরও বেশি সময় আগে এই গ্রামে পাইপলাইন বসানো হয়েছিল এবং একটি পানির ট্যাংক তৈরি করা হয়েছিল। গ্রামবাসীরা জানান, কর্মকর্তারা তখন পরীক্ষা-নিরীক্ষাও চালিয়েছিলেন, কিন্তু প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী পানি সরবরাহ আর কখনোই শুরু হয়নি। আজ সেই অবকাঠামোগুলো অপূর্ণ প্রতিশ্রুতির স্মারক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, তারা ট্যাংক বানালো, পাইপলাইন বসালো। পরীক্ষার সময় একবার পানি এসেছিল, তারপর বন্ধ হয়ে গেল। এরপর থেকে আমাদের বাড়িগুলোতে আর এক ফোঁটা পানিও পৌঁছায়নি।

দুই হাজারেরও বেশি মানুষের এই গ্রামটি এখন বেঁচে আছে মাত্র তিনটি হ্যান্ডপাম্প এবং একটি মন্দিরের কাছের কূপের ওপর ভরসা করে। অভিযোগ রয়েছে, তিনটি হ্যান্ডপাম্পের মধ্যে দুটির পানি নোনা এবং পানের অযোগ্য। ফলে গ্রামের বাইরে থাকা মাত্র একটি কার্যকর হ্যান্ডপাম্পই এখন পুরো গ্রামের পানীয় জলের প্রধান উৎস।

গ্রামের অনেক নারীর কাছে পানি সংগ্রহ করা আজীবনের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। তাদের একজন বলেন, আমাদের পুরো জীবনটাই পানি টানতে টানতে শেষ হয়ে গেল।

এখন এই কষ্টের বোঝা এসে পড়েছে পরবর্তী প্রজন্মের ওপর। শিশুরা স্কুলে যাওয়ার আগে এবং স্কুল থেকে ফিরে পানি বহনের কাজে সাহায্য করে, যা তাদের পড়াশোনা এবং দৈনন্দিন জীবনকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে। এক বাসিন্দা বলেন, আমাদের মেয়েরা ও পুত্রবধূরা পড়াশোনা বা অন্য কাজ করার বদলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পানি টানতে সময় ব্যয় করছে। মাঝে মাঝে পরিবারের রান্নার জোগাড় করতেই আমাদের কয়েকবার পানি আনতে যেতে হয়।

পানির এই তীব্র সংকট সামাজিক রীতিনীতিকেও বদলে দিয়েছে। গ্রামবাসীরা জানান, বিয়ে বা পারিবারিক কোনও অনুষ্ঠানে অতিথি এলে অতিরিক্ত টাকা খরচ করে পানির ট্যাংকার কিনতে হয়। এমনকি আত্মীয়স্বজনদের অতিথি হিসেবে আপ্যায়ন করাও এখন একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, পরিবারে কোনও বিয়ে হলে পানির ট্যাংকার ডাকার জন্য আমাদের বাড়তি টাকা খরচ করতে হয়। এমনকি অতিথিদের দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত পানিও থাকে না। আত্মীয়দের অনেক সময় পুকুর বা পুরনো কূপে গিয়ে গোসল করতে হয়। এটি আমাদের জন্য অত্যন্ত লজ্জাজনক, কিন্তু আমাদের কী-ই বা করার আছে?

যে অঞ্চলে বিয়ে সাধারণত পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধন দৃঢ় করে, সেখানে মুধারা গ্রামের এই পানির সংকট এখন একটি সামাজিক কলঙ্ক বা অপবাদে পরিণত হয়েছে। এই পরিস্থিতি স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। তারা নির্বাচিত প্রতিনিধি ও স্থানীয় কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে তাদের দুর্দশা উপেক্ষা করার অভিযোগ এনেছেন।

গ্রামবাসীদের অভিযোগ, নির্বাচনের সময় যারা ভোট চাইতে এসেছিলেন, তারা সংকট সমাধানের জন্য আর কখনোই ফিরে আসেননি। বারবার অভিযোগ করার পরও গ্রামবাসীদের হ্যান্ডপাম্পের ওপরই নির্ভরশীল থাকতে হচ্ছে, অথচ কোটি টাকার পানির অবকাঠামো অব্যবহৃত পড়ে আছে। এক বাসিন্দা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, নির্বাচনের সময় সবাই আমাদের সমস্যা সমাধানের প্রতিশ্রুতি দেয়। আমরা কোনও অসাধারণ কিছু চাচ্ছি না। আমরা শুধু পানি চাই। নেতারা এসে এখানে মাত্র একটি দিন কাটিয়ে যান, তাহলেই তারা বুঝতে পারবেন আমরা কীসের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি।

সরকারি নথিতে মুধারা হয়তো পানি প্রকল্পের আওতায় আসা আরেকটি সফল গ্রাম। কিন্তু এখানকার বাসিন্দাদের কাছে এটি এমন এক জায়গা, যেখানে শুকিয়ে থাকা পানির কল মানুষের জীবনযাত্রাকে ওলটপালট করে দিয়েছে, যেখানে বালতি হাতে শিশুরা বড় হচ্ছে, বিয়ে নির্ভর করছে ট্যাংকারের ওপর, আর ৪০ জন যুবক এমন কনের অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন যারা হয়তো কোনোদিন আসবেই না।

সূত্র: ইন্ডিয়া টুডে

/এএস/
সম্পর্কিত
অ্যান্টার্কটিকায় গায়েব ফ্রান্সের সমান বরফ!
আস্ত মোবাইল টাওয়ার উধাও!
যে উদ্ভিদ মরে গিয়েও কয়েক ঘণ্টায় ফিরে পায় প্রাণ!
সর্বশেষ খবর
কক্সবাজারে প্রধানমন্ত্রী, পাতিলী-মাছুয়াখালী খাল খনন উদ্বোধন
কক্সবাজারে প্রধানমন্ত্রী, পাতিলী-মাছুয়াখালী খাল খনন উদ্বোধন
অ্যান্টার্কটিকায় গায়েব ফ্রান্সের সমান বরফ!
অ্যান্টার্কটিকায় গায়েব ফ্রান্সের সমান বরফ!
টানা চার দফা কমার পর স্বর্ণের ভরিতে বাড়লো ৬৫৯০ টাকা
টানা চার দফা কমার পর স্বর্ণের ভরিতে বাড়লো ৬৫৯০ টাকা
আস্ত মোবাইল টাওয়ার উধাও!
আস্ত মোবাইল টাওয়ার উধাও!
সর্বাধিক পঠিত
বাংলাদেশে এসেই ভিসা নিয়ে যা বললেন ভারতের নতুন হাইকমিশনার
বাংলাদেশে এসেই ভিসা নিয়ে যা বললেন ভারতের নতুন হাইকমিশনার
আইনজীবী তালিকাভুক্তির এমসিকিউতে পাস করলেন জাইমা রহমান, মোট উত্তীর্ণ ৯২০১
আইনজীবী তালিকাভুক্তির এমসিকিউতে পাস করলেন জাইমা রহমান, মোট উত্তীর্ণ ৯২০১
মোটরসাইকেল আরোহীর মাথায় ইটের আঘাত: নেপথ্যে কী
মোটরসাইকেল আরোহীর মাথায় ইটের আঘাত: নেপথ্যে কী
কী আছে ইরান চুক্তিতে, যা সই করতে প্রস্তুত ট্রাম্প
কী, কেন, কীভাবেকী আছে ইরান চুক্তিতে, যা সই করতে প্রস্তুত ট্রাম্প
প্রথম দিনে বিশ্বকাপ সম্প্রচারে বিঘ্ন, যা বলছে ওটিটি প্ল্যাটফর্মগুলো 
প্রথম দিনে বিশ্বকাপ সম্প্রচারে বিঘ্ন, যা বলছে ওটিটি প্ল্যাটফর্মগুলো