ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) নেতৃত্বাধীন ‘সংসদ চলো পদযাত্রাকে কেন্দ্র করে দিল্লির প্রাণকেন্দ্রে হাজার হাজার তরুণ আন্দোলনকারীর ওপর লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে পুলিশ। ওই ঘটনার পরদিন একদিকে সরকার আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আলোচনার পথ খোলা রাখার ইঙ্গিত দিয়েছে। অন্যদিকে আন্দোলন মোকাবিলার পদ্ধতি নিয়ে ক্ষমতাসীন বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোটে তৈরি হয়েছে চাপা অস্বস্তি।
বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে যোগাযোগের অংশ হিসেবে মঙ্গলবার কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জে পি নাড্ডা রামমনোহর লোহিয়া (আরএমএল) ও লেডি হার্ডিঞ্জ হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসাধীন আহত আন্দোলনকারীদের দেখতে যান। সোমবার আন্দোলনকারীরা নিট প্রশ্নফাঁস ইস্যুতে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে এই পদযাত্রা বের করেছিলেন। সে সময় নাড্ডা সিজেপি নেতাদের সঙ্গে একটি বৈঠক করলেও তা কোনও সিদ্ধান্ত ছাড়াই শেষ হয়।
মঙ্গলবার লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী এবং রাজ্যসভার বিরোধীদলীয় নেতা মল্লিকার্জুন খাড়গেসহ প্রবীণ কংগ্রেস নেতারা আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশি অ্যাকশনের প্রতিবাদে লোক কল্যাণ মার্গে প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবনের সামনে অবস্থান কর্মসূচি শুরু করেন। সেখানে তারা প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করেন। এর পরপরই তড়িঘড়ি করে প্রধানমন্ত্রী দফতরের প্রতিমন্ত্রী জীতেন্দ্র সিংকে রাহুলের সঙ্গে কথা বলতে পাঠায় সরকার।
বিজেপির দলীয় সূত্রগুলো জানায়, শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলনটি বাইরের শক্তির দ্বারা প্রভাবিত বলে বিজেপির কোনও কোনও নেতা দাবি করলেও, পুরো বিষয়টি একটি অপ্রত্যাশিত মোড় নিয়েছে এবং সরকার এটিকে সময়ে নিয়ন্ত্রণে আনতে হিমশিম খেয়েছে। তারা স্বীকার করেন যে রাহুল গান্ধীর এই পদক্ষেপ ক্ষমতাসীন শিবিরকে চমকে দিয়েছে।
রাহুল গান্ধীর সঙ্গে আলোচনার জন্য জীতেন্দ্র সিংয়ের সঙ্গে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র সচিব গোবিন্দ মোহনকেও পাঠানো হয়। তারা রাহুলকে আশ্বাস দেন যে সংসদে নিট ইস্যুতে আলোচনা করা হবে। এই কর্মসূচিতে সমাজবাদী পার্টির (এসপি) প্রধান অখিলেশ যাদব এবং এনসিপির (এসপি) নেত্রী সুপ্রিয়া সুলের মতো ইন্ডিয়া জোটের অন্যান্য শরিক নেতারাও রাহুল গান্ধীর পাশে এসে দাঁড়ান।
পরবর্তীতে ক্ষমতাসীন শিবির থেকে রাহুলকে নিশানা করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ একটি পোস্ট দেওয়া হয়। জীতেন্দ্র সিং লিখেন, শ্রী রাহুল গান্ধীর মতো একজন জ্যেষ্ঠ নেতা এবং বিরোধীদলীয় নেতার নিজের দেওয়া প্রতিশ্রুতি থেকে পিছিয়ে যাওয়া দুর্ভাগ্যজনক এবং এটি গণতন্ত্রের প্রতিটি রীতি-নীতির পরিপন্থি। সরকার নিট সংক্রান্ত যাবতীয় বিষয় এবং এ সম্পর্কিত আন্দোলন নিয়ে সংসদে আলোচনা করতে প্রস্তুত।
তবে বিজেপির এক নেতা স্বীকার করে বলেন, প্রথমবারের মতো রাহুল গান্ধী একটি রাজনৈতিক চাল চাললেন আর আমরা ব্যাকফুটে চলে গেলাম।
সংসদে আলোচনার এই সম্মতিকে সরকারের ‘পিছু হটা’ হিসেবেও দেখা হচ্ছে। কারণ দিনের শুরুতে শিক্ষামন্ত্রীরা দাবি করেছিলেন যে, সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী কিরেন রিজিজু গণমাধ্যমের সামনে এনডিএ বৈঠকে দেওয়া প্রধানমন্ত্রী মোদির যে বক্তব্য তুলে ধরেছেন, সেটাই ছিল সরকারের অবস্থান প্রকাশের মাধ্যম।
নিট প্রশ্নফাঁসকে একটি ‘গুরুতর অপরাধ’ আখ্যা দিয়ে এনডিএ এমপিদের উদ্দেশে মোদি বলেছিলেন যে সরকার অপরাধীদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিয়েছে এবং শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনও আপস করবে না। তরুণরা বিভিন্ন চক্রের মাধ্যমে বিভ্রান্ত হতে পারে উল্লেখ করে তিনি ক্ষমতাসীন এমপিদের নির্দেশ দেন তাদের কাছে পৌঁছাতে এবং সঠিক পথ দেখাতে।
এদিকে বিজেপির মুখপাত্রদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এটি প্রচার করতে যে, কংগ্রেস প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে বিক্ষোভ করে একটি ‘ভুল ও বিপজ্জনক নজির’ তৈরি করেছে। দলটির মতে, এটি ‘কেবল নিরাপত্তার জন্যই হুমকি নয়, কোনও টেকসই গণতন্ত্রে এমন বিদ্বেষপূর্ণ আচরণ দেখা যায় না’। বিজেপি নেতারা নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশের মতো প্রতিবেশী দেশগুলোতে তরুণদের আন্দোলনের ফলে সৃষ্ট ‘বিশৃঙ্খলা’র কথাও উল্লেখ করেন।
সংসদে অচলাবস্থা
এই রাজনৈতিক নাটকের ফলে সরকার ও বিরোধীদের মধ্যকার সংঘাত আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে, যার প্রভাবে বর্ষাকালীন অধিবেশনের দ্বিতীয় দিনেও উভয় কক্ষের কার্যক্রম ভেস্তে যায়। অথচ এই অধিবেশনে সরকার ১৩১তম সংবিধান সংশোধনী বিল এবং সীমানা পুনর্নির্ধারণ বিলের মতো গুরুত্বপূর্ণ আইন পাস করার পরিকল্পনা করছিল।
বিজেপির এক সংসদ সদস্য মন্তব্য করেন, ‘ভাবা হয়েছিল এই অধিবেশনে বিরোধী দল সম্পূর্ণ বিভক্ত থাকবে এবং ক্ষমতাসীন এনডিএ সুবিধাজনক অবস্থানে থাকবে। কিন্তু তার উল্টো চিত্র দেখা গেলো; এসপি এবং এনসিপির (এসপি) মতো দলগুলো কংগ্রেসের সঙ্গে এসে যোগ দিলো।’
সোমবারের ঘটনার ফলে সৃষ্ট ‘নেতিবাচক প্রতিচ্ছবি’ নিয়ে বিজেপি ও এর শরিক দলের একাধিক এমপি অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। এক বিজেপি এমপি বলেন, ‘বিষয়টি আরও ভালোভাবে সামলানো যেত। পরিস্থিতি এতদূর গড়াতে দেওয়া হলো কেন? সব যন্ত্রপাতি হাতে থাকা সত্ত্বেও আমরা ব্যবস্থাপনা সঠিকভাবে করতে পারিনি।’
এনডিএর অন্য কয়েকজন নেতাও একই সুর মিলিয়ে বলেন, শিক্ষার্থীদের আন্দোলন সামলানোর উপায় এটি হতে পারে না এবং সরকার আরও আগেই আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আলোচনায় বসতে পারত।
তবে একজন জ্যেষ্ঠ মন্ত্রী বলেছেন, আমরা আলোচনা চালিয়ে যেতে প্রস্তুত। তবে এর কোনও নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই। আন্দোলনকারীদের উত্থাপিত বিষয়গুলো সঠিক মঞ্চে পেশ করা হবে।
টিডিপি নেতা লাভু কৃষ্ণা জানান যে সরকার আন্দোলনকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে। তিনি বলেন, তাদের কিছু অভিযোগ ছিল এবং সরকার তা নিয়ে কাজ করছে। এই প্রতিবাদ সহিংসতার দিকে যাওয়া উচিত নয় কারণ তা দেশের জন্য খারাপ এবং শিক্ষার্থীদের নিজেদের ক্যারিয়ার ধ্বংস করা ঠিক হবে না। সবার প্রতিবাদ করার অধিকার আছে, তবে তা হিংসাত্মক হওয়া উচিত নয়।
সূত্র: ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস

দিল্লিতে আন্দোলন চলা যন্তর মন্তর আসলে কী
অনশন ভাঙার শর্ত জানালেন সোনম ওয়াংচুক
মোদির প্রকাশ্য ক্ষমাসহ তিন দাবি রাহুল গান্ধীর
রাহুল গান্ধীকে নিয়ে নীরবতা ভাঙলেন মুখ্যমন্ত্রী বিজয়
ছাত্রদের আন্দোলন কীভাবে ‘হাইজ্যাক’ করলেন রাহুল গান্ধী
নিট পরীক্ষা পুরোপুরি বাতিল চায় বিজয়ের টিভিকে 







