‘হেরেছে, হেরেছে, স্বৈরাচার হেরেছে!’, ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের খবর দিল্লিতে আন্দোলনস্থল যন্তর মন্তরে পৌঁছাতেই আনন্দে ফেটে পড়েন সেখানে জড়ো হওয়া আন্দোলনকারীরা। শনিবার (২৫ জুলাই) এই স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো যন্তর মন্তর এলাকা।
নিট পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস বিতর্ক নিয়ে মাসব্যাপী তীব্র আন্দোলনের মুখে শনিবার পদত্যাগ করেন শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান। তিনি জানান, এটি তার জন্য কোনও ‘ব্যক্তিগত মর্যাদার’ বিষয় নয়। গত ১০ দিনে ঘটে যাওয়া নানা ঘটনায় ব্যথিত হয়ে তিনি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কাছে পদত্যাগপত্র পাঠিয়েছেন।
শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের খবর ছড়িয়ে পড়ার পরপরই আন্দোলনস্থল যন্তর মন্তরের পরিবেশ কয়েক মিনিটের মধ্যে বদলে যায়। পার্ক হোটেলের কাছের স্কয়ারে একটি পুলিশ ভ্যানের ওপর থেকে ঘোষণা দেওয়া হয়, ‘ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করেছেন’।
ঘোষণা শুনতেই আন্দোলনকারীদের মাঝে ব্যাপক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। চারপাশে ব্যারিকেড টপকে উত্তেজিত আন্দোলনকারীরা চত্বরে নেমে আসেন। এর আগে সেখানে ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও লাঠিচার্জের ঘটনা ঘটেছিল। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে চত্বরের দুপাশে দাঙ্গা পোশাক পরা পুলিশ ও আরএএফের জওয়ানেরা লাঠি ও ঢাল হাতে প্রস্তুত ছিলেন, আর বাকি দুপাশে ব্যারিকেড ঠেলে বিক্ষোভ করছিলেন আন্দোলনকারীরা।
ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক দল ককরোচ জনতা পার্টি’র (সিজেপি) নেতৃত্বে গত ২০ জুন থেকে যন্তর মন্তরে শুরু হওয়া এই ছাত্র আন্দোলন দিল্লি ছাড়িয়ে ভারতের অন্যান্য অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়েছিল। সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে মঞ্চ থেকে জনতার সঙ্গে যোগ দেন। জাতীয় পতাকা উড়িয়ে তিনি এ আর রহমানের গাওয়া ‘বন্দে মাতরম’ গান পরিবেশন করেন, আর চত্বরের অন্যান্য স্থানে আন্দোলনকারীরা ‘চক দে ইন্ডিয়া’ গানের তালে নাচতে থাকেন।
পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে নাচতে দেখা যায় আন্দোলনকারীদের। ড. বি আর আম্বেদকরের প্রতিকৃতি ও পোস্টার হাতে আন্দোলনকে সফল দাবি করে এই পদত্যাগ উদযাপন করা হয়।
সমাবেশে বক্তব্য দিতে গিয়ে সিজেপি প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে বলেন, এই পদত্যাগ গণতান্ত্রিক প্রতিবাদের শক্তিরই প্রমাণ। তিনি আরও বলেন, ‘তারা বলত এই সরকার পদত্যাগ দেখে না। আমরা বলি, দুনিয়া মাথা নোয়ায়, শুধু নোয়ানোর মতো কেউ একজন চাই।
ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের মন্তব্যের দিকে ইঙ্গিত করে দিপকে বলেন, ‘আপনি যদি আমাদের ককরোচ (তেলাপোকা) না বলতেন, তবে আমি ভারতে ফিরে আসতাম না। আপনি যদি আমাদের ককরোচ না বলতেন, তবে দেশের তরুণরা রাজপথে নেমে আসত না। আর আপনি যদি আমাদের ককরোচ না বলতেন, তবে ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগও হতো না।
তার এই বক্তব্যে উপস্থিত ছাত্র-জনতা করতালি ও স্লোগানে ফেটে পড়ে।
তবে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের পরেও আন্দোলন অব্যাহত থাকবে বলে জানান অভিজিৎ দিপকে। পরীক্ষা বিতর্কে আত্মহত্যা করা শিক্ষার্থীদের পরিবারকে ১ কোটি রুপি ক্ষতিপূরণ এবং গত ২০ জুলাই বিক্ষোভের সময় পুলিশের ভূমিকার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ইনস্টাগ্রামে অভিজিৎ দিপকের পোস্ট করা ৩ মিনিটের একটি ভিডিওতে দেখা যায়, খবর শোনার মুহূর্তে একটি ফোন কল পেয়ে তিনি উত্তেজিত জনতাকে মাইক্রোফোনে বলেন, ‘আমরা করে দেখিয়েছি!
এরপর একটি পোস্টার হাতে তুলে নিয়ে নিট প্রশ্নফাঁসের জেরে আত্মহত্যা করা শিক্ষার্থীদের নাম একে একে পড়ে শোনান তিনি। দীপকে বলেন, এই শিক্ষার্থীরাই প্রশ্নফাঁস বিতর্কে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং তাদের জীবন ও ভবিষ্যৎ ধ্বংস হয়ে গেছে।
এদিকে যন্তর মন্তরের বাইরে আন্দোলনকারীদের দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। হাজার হাজার মানুষ এখনও আন্দোলনস্থলের দিকে অগ্রসর হচ্ছেন। ভেতরে স্লোগান চলছে, সংগ্রাম এখনও জারি আছে, এবার লক্ষ্য ই-২০।
বাবার সঙ্গে মুম্বাই থেকে আসা ১২তম শ্রেণির শিক্ষার্থী বৃত্তিকা (১৭) জানায়, শিক্ষা ব্যবস্থা সংস্কারের প্রতিশ্রুতি না দেওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া উচিত। সে আরও বলে, আন্দোলনকারীদের এখন প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিও করা উচিত। ‘মুদ্রাস্ফীতি, আর্থিক সংকট এবং সাংবিধানিক মূল্যবোধের অবমাননার মতো অনেক গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা রয়েছে। আমি এখানে আমার শিক্ষার অধিকারের জন্য লড়তে এসেছি।
সূত্র: এনডিটিভি, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, ইন্ডিয়া টুডে

বোস্টন থেকে দিল্লির রাজপথে: যেভাবে ‘জেন-জি’ আন্দোলনের জনপ্রিয় মুখ অভিজিৎ দিপকে
জেন-জি প্রজন্মই আসল বিশ্বগুরু: গীতাঞ্জলি আঙমো
শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগে মোদিবিরোধীদের উচ্ছ্বাস
ভারতের জেন-জিদের জয়: ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগে কংগ্রেস






