কক্সবাজারের মহেশখালীর একটি ভাসমান তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) টার্মিনালে কারিগরি ত্রুটির কারণে দেশে গ্যাসের সরবরাহ কমে গেছে। এতে রাজধানী ঢাকা ও আশপাশের এলাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় ভোগান্তিতে পড়েছেন গ্রাহকরা। তবে এই ত্রুটি সারাতে আরও কতদিন লাগবে, তা নিশ্চিত করে জানাতে পারেননি সংশ্লিষ্টরা।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কারিগরি ত্রুটির কারণে মহেশখালীতে অবস্থিত দুটি ভাসমান তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) টার্মিনালের একটি বন্ধ রয়েছে। এতে জাতীয় গ্রিডে এলএনজি (আরএলএনজি) সরবরাহ প্রায় অর্ধেক কমেছে। ফলে বন্দর নগী চট্টগ্রাম ও রাজধানী ঢাকাসহ আশপাশের এলাকায় গ্যাসের চাপ কমে গেছে। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন গ্রাহকেরা।
এদিকে, এলএনজি গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় চট্টগ্রামে বাসাবাড়ির রান্না ও সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে চরম দুর্ভোগ দেখা দিয়েছে। গ্যাসের সংকটে ফিলিং স্টেশনগুলোতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও অনেক চালক গ্যাস সংগ্রহ করতে পারছেন না। এর প্রভাব পড়েছে সিএনজিচালিত যানবাহনের ভাড়ার ওপরও। যাত্রীদের গুনতে হচ্ছে অতিরিক্ত ভাড়া।
রাউজান উপজেলার পাহাড়তলী গ্রামের সিএনজি অটোরিকশা চালক তাজু উদ্দিন বলেন, ‘গত কয়েক দিন ধরে সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে পর্যাপ্ত গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। অনেক সময় ৫ থেকে ৬ ঘণ্টা অপেক্ষা করার পরও গ্যাস ছাড়াই ফিরে যেতে হচ্ছে। এতে যেমন সময় নষ্ট হচ্ছে, তেমনি দৈনিক আয়ও কমে যাচ্ছে। গ্যাস সংকট দ্রুত নিরসনের দাবি জানাই।’
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মহেশখালীতে বন্ধ হয়ে যাওয়া এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান এলএনজি টার্মিনালটি (এফএসআরইউ) মেরামত করে পুনরায় সচল করতে আরও ৪ থেকে ৫ দিন সময় লাগতে পারে। গত ২১ জুলাই ২০২৬ তারিখে বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকে সৃষ্ট অগ্নিকাণ্ড ও কারিগরি ত্রুটির কারণে টার্মিনালটি বন্ধ হয়ে যায়।
পেট্রোবাংলা এবং রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড (আরপিজিসিএল) জানিয়েছে, যুক্তরাজ্য, রোমানিয়া ও সিঙ্গাপুর থেকে আসা বিদেশি বিশেষজ্ঞ দল স্থানীয় কারিগরি দলের সাথে মিলে এর মেরামত কাজ শুরু করেছে। টার্মিনালের দুটি বয়লারের মধ্যে আগুনে একটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের পরিকল্পনা অনুযায়ী, অক্ষত বয়লারটি ৪-৫ দিনের মধ্যে চালু করা সম্ভব হলে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক আরও প্রায় ৩০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো যাবে। তবে টার্মিনালটি পুরোপুরি মেরামত হয়ে সচল না হওয়া পর্যন্ত এবং জাতীয় গ্রিডে দৈনিক ৪৫ কোটি ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি পুরোপুরি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত রাজধানীসহ দেশের বাসাবাড়ি, সিএনজি স্টেশন ও শিল্প-কারখানার এই সংকট সম্পূর্ণ কাটবে না। এতে আরও কিছুটা সময় লেগে যেতে পারে।
এই দুর্ঘটনার কারণে জাতীয় গ্রিডে প্রতিদিন প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন (৪৫ কোটি) ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমে গেছে। গ্যাসের অভাবে সাভার, গাজীপুর, আশুলিয়া ও মানিকগঞ্জের প্রায় ২০০টিরও বেশি টেক্সটাইল, স্টিল ও সিরামিক কারখানার উৎপাদন স্থবির হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে সরবরাহ ১,০০০ মিলিয়ন থেকে কমিয়ে ৭০০ মিলিয়নে নামানো হয়েছে, যার ফলে দেশজুড়ে লোডশেডিং বাড়ছে।
একই সঙ্গে ঢাকার মিরপুর, মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি, বাড্ডা ও খিলগাঁওসহ বিভিন্ন আবাসিক এলাকায় দিনের বেলা রান্নার গ্যাস থাকছে না। সিএনজি স্টেশনগুলোতে গ্যাসের চাপ ১-২ পিএসআই-এ নেমে আসায় যানবাহনের দীর্ঘ লাইন তৈরি হয়েছে এবং অনেক স্টেশন বন্ধ রাখা হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড-এর উপমহাব্যবস্থাপক (এলএনজি) প্রকৌশলী মোহাম্মদ সাইফুল্লাহ কবির বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, দেশে আমদানি করা এলএনজি রূপান্তর করে সরবরাহের জন্য মহেশখালীতে দুটি ভাসমান টার্মিনাল চালু রয়েছে। সাধারণত এসব টার্মিনাল থেকে প্রতিদিন ১০০ থেকে ১০৫ কোটি ঘনফুট এলএনজি সরবরাহ করা হতো। তবে আকস্মিক কারিগরি ত্রুটির কারণে বর্তমানে সরবরাহ কমে অর্ধেকে নেমে এসেছে। ত্রুটি সারানোর কাজ চলমান আছে। আশা করছি শিগগিরই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে উঠবে।’
চট্টগ্রাম অঞ্চলে গ্যাস বিতরণের দায়িত্বে থাকা কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (কেজিডিসিএল) লিমিটেডের উপমহাব্যবস্থাপক (বিতরণ) মো. রফিক খান বলেন, এতদিন দৈনিক ২৪৬ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যেতো। বুধবার থেকে সরবরাহ ২৮ মিলিয়ন ঘনফুট কমে গেছে। ফলে বিভিন্ন এলাকায় গ্যাসের চাপ কমে যাবে। কবে ঠিক হবে তা জানি না।









