পদ ছাড়লে রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধেও আইনি ব্যবস্থা সম্ভব: তথ্য উপদেষ্টা 

বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট 
২৮ জুলাই ২০২৬, ১৩:৪৭আপডেট : ২৮ জুলাই ২০২৬, ১৫:৩১

রাষ্ট্রপতি দায়িত্বে থাকা অবস্থায় তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি কার্যক্রম শুরু বা চালিয়ে নেওয়া যায় না। তবে দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়ার পর তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ নিয়ে আইনগত প্রক্রিয়া গ্রহণ করা যাবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। 

তিনি বলেছেন, “রাষ্ট্রপতির দায়মুক্তি নিয়ে অনেকের মধ্যে বিভ্রান্তি রয়েছে। রাষ্ট্রপতির পদে থাকা অবস্থায় তিনি বিশেষ সাংবিধানিক সুরক্ষা পান। কিন্তু পদ থেকে চলে যাওয়ার পর দায়িত্ব গ্রহণের আগে বা পরে সংঘটিত কোনও অনিয়ম ও অসদাচরণের অভিযোগ আইনগতভাবে বিবেচনার সুযোগ রয়েছে।” 

মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) দুপুরে সচিবালয়ে তথ্য অধিদফতরের সম্মেলন কক্ষে সরকারের সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।

‘দায়মুক্তি স্থায়ী কোনও ব্যবস্থা নয়’

সাবেক বা বর্তমান রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে বিভিন্ন আদালতে চলমান অভিযোগ ও আইনি প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তথ্য উপদেষ্টা বলেন, সংবিধানের ৫১ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রপতিকে দেওয়া সুরক্ষার ব্যাখ্যা নিয়ে কিছুটা বিভ্রান্তি রয়েছে। 

তিনি বলেন, “বাংলাদেশের একজন রাষ্ট্রপতি তার পদে থাকা অবস্থায় কোনও ফৌজদারি আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হবেন না। কিন্তু তিনি যখন আর রাষ্ট্রপতি থাকবেন না, তখন আগে বা পরে করা কোনও কাজ কিংবা অসদাচরণের অভিযোগ নিয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।” 

এই বক্তব্য কোনও নির্দিষ্ট রাষ্ট্রপতিকে উদ্দেশ করে নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, “এটি যেকোনও রাষ্ট্রপতির ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য একটি সাধারণ সাংবিধানিক ব্যাখ্যা।” 

রাষ্ট্রপতিকে ঘিরে ট্রায়াল কোর্ট, হাইকোর্ট ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিভিন্ন আবেদন বা অভিযোগের প্রসঙ্গ উঠলে তিনি বলেন, “আদালত স্বাধীনভাবে কাজ করছে। কোনও মামলা আদালতে গেলে তার বিচারিক প্রক্রিয়া কীভাবে চলবে, সেটি আদালতই নির্ধারণ করবেন।” 

তিনি বলেন, “সরকার কোনও কোনও মামলায় পক্ষ হয়। আবার অনেক মামলা সরকারের বিরুদ্ধেও হয়। উচ্চ আদালতে অসংখ্য রিটে সরকার পরাজিত হয়। সুতরাং সবকিছু সরকার নিয়ন্ত্রণ করছে— এভাবে দেখা ঠিক হবে না।” 

পুলিশের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান

দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে তথ্য উপদেষ্টা বলেন, “একটা সময় পুলিশ বাহিনী অত্যন্ত কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গেছে। সেই অবস্থা কাটিয়ে উঠে তারা এখন তুলনামূলকভাবে ভালো পারফর্ম করছে।” 

তিনি বলেন, “আমাদের জনগণেরও উচিত পুলিশের পাশে দাঁড়ানো এবং তাদের সহযোগিতা করা। নিরাপত্তা অত্যন্ত জরুরি একটি বিষয়। শুধু পুলিশের ওপর সব দায়িত্ব দিয়ে দিলে হবে না। জনগণ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে সহযোগিতা থাকতে হবে।”

আন্তর্জাতিক আয়োজনে প্রধানমন্ত্রীর অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত হয়নি

একটি আন্তর্জাতিক আয়োজনে বাংলাদেশকে পর্যবেক্ষক হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো এবং সেখানে প্রধানমন্ত্রী অংশ নেবেন কিনা— এমন প্রশ্নে উপদেষ্টা বলেন, “এই বিষয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।” 

প্রধানমন্ত্রী গেলে সংশ্লিষ্ট দেশ ও আন্তর্জাতিক নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে প্রধানমন্ত্রীর অংশগ্রহণ কিংবা সফরসঙ্গী কারা হবেন— সে বিষয়ে এখনও কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।” 

এমনকি প্রাথমিক পর্যায়ের বিস্তারিত আলোচনাও শুরু হয়নি জানিয়ে তিনি বলেন, “সময় নিয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট পর্যায়ে বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।” 

শিল্পের সংকটের কেন্দ্রে জ্বালানি নিরাপত্তা

বাংলাদেশের রফতানি খাত এবং শিল্প উৎপাদনে ভিয়েতনামের তুলনায় পিছিয়ে পড়ার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তথ্য উপদেষ্টা বলেন, “সংকটটি শুধু রফতানির নয়। দেশের সামগ্রিক বিনিয়োগ ও শিল্পায়নের সক্ষমতাই দীর্ঘদিনের নানা সমস্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।” 

তিনি বলেন, “বিগত বছরগুলোতে অর্থনীতিতে অকল্পনীয় লুটপাট ও অর্থপাচার হয়েছে। এর সঙ্গে করোনা মহামারি, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট এবং ২০২১-২২ সাল থেকে তৈরি হওয়া ডলার সংকট যুক্ত হয়েছে। সব মিলিয়ে বিনিয়োগ ও শিল্প উৎপাদন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।” 

জ্বালানি নিরাপত্তাকে শিল্পায়নের সবচেয়ে বড় পূর্বশর্ত উল্লেখ করে তিনি বলেন, “বর্তমানে বিদ্যমান শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোতেই প্রয়োজনীয় গ্যাস সরবরাহ করা যাচ্ছে না। এই কারণে আপাতত নতুন শিল্পে গ্যাস সংযোগ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে।”

তিনি বলেন, “একজন উদ্যোক্তা বিনিয়োগের আগে চিন্তা করবেন, তিনি নিয়মিত গ্যাস ও বিদ্যুৎ পাবেন কি না। উৎপাদন অব্যাহত রাখতে পারবেন কি না। পর্যাপ্ত জ্বালানি নিরাপত্তা না থাকলে দেশীয় ও বিদেশি— কোনও বিনিয়োগই প্রত্যাশিত মাত্রায় আসবে না। 

দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে দীর্ঘদিনের অবহেলা

ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, “দীর্ঘদিন দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এর পরিবর্তে আমদানিনির্ভর তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজির দিকে ঝোঁক তৈরি করা হয়েছিল।” 

এলএনজির মূল্য আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যাপকভাবে ওঠানামা করে উল্লেখ করে তিনি বলেন, “কিছু সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে আগের নীতিগুলো করা হয়েছিল কিনা— সেটিও পর্যালোচনার বিষয়।” 

বর্তমান সরকার স্থলভাগে গ্যাস অনুসন্ধান, ভোলার গ্যাস জাতীয় গ্রিডে আনা, এলএনজি আমদানি বৃদ্ধি এবং সমুদ্রের গ্যাস অনুসন্ধানের উদ্যোগ নিচ্ছে বলে জানান তিনি।

তবে সমুদ্রের গ্যাস অনুসন্ধানের দরপত্র দ্রুত সম্পন্ন হলেও সেখান থেকে গ্যাস উত্তোলনে কয়েক বছর সময় লাগবে। ফলে দীর্ঘদিনের সংকট রাতারাতি সমাধান হবে না বলেও সতর্ক করেন উপদেষ্টা। 

‘সরকারের সব কাজ নিখুঁত হবে না, তবে আন্তরিকতা আছে’

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেশের কয়েকটি পত্রিকার সম্পাদকদের একটি সংগঠনের প্রতিনিধিদের বৈঠকের প্রসঙ্গ তুলে তথ্য উপদেষ্টা বলেন, ওই বৈঠকে দেশের গণমাধ্যমসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ক্ষয়ক্ষতির বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

তিনি বলেন, “গণমাধ্যমের অবস্থা নিয়ে কথা উঠলে প্রধানমন্ত্রী প্রশ্ন রেখেছেন— বিগত সময়ে কোন খাতটি ধ্বংসের বাইরে ছিল?” 

উপদেষ্টা বলেন, “আমাদের সব কাজ নিখুঁত হয়ে যাবে, এমন নয়। কিন্তু সরকার আন্তরিক। সরকার আন্তরিকভাবে পরিস্থিতি পরিবর্তনের চেষ্টা করছে। জনগণ সরকারের এই আন্তরিকতা উপলব্ধি করবে বলে আমরা আশা করি।” 

ব্রিকসের সদস্যপদ এখনও পর্যালোচনায়

ব্রিকসের সদস্য হওয়ার জন্য বাংলাদেশের উদ্যোগ অব্যাহত আছে কিনা— এমন প্রশ্নের জবাবে তথ্য উপদেষ্টা বলেন, “এই বিষয়ে এখনও সুনির্দিষ্ট কোনও সিদ্ধান্ত হয়নি।” 

বাংলাদেশ বহুপাক্ষিক বিভিন্ন সংস্থা ও উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ নিয়মিত পর্যালোচনা করে উল্লেখ করে তিনি বলেন, “ব্রিকসের সদস্যপদের বিষয়টিও সরকারের বিবেচনায় রয়েছে।” 

তিনি বলেন, “বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থের পক্ষে যায়— এমন সিদ্ধান্তই সরকার নেবে। ব্রিকসের সঙ্গে যুক্ত হওয়া লাভজনক মনে হলে সরকার সেটি বিবেচনা করবে।” 

টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক: সমন্বিত পদক্ষেপের আশ্বাস

দেশের বাজারে থাকা ৩৪টি টুথপেস্টের নমুনা পরীক্ষা করে ২৬টিতে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে— এমন একটি গবেষণার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তথ্য উপদেষ্টা বলেন, “বিষয়টি সরকারের নজরে এসেছে।” 

তিনি বলেন, “মাইক্রোপ্লাস্টিক এখন শুধু টুথপেস্টের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বিভিন্ন উৎস থেকে এটি খাদ্য, পানি এবং পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ছে। ফলে একটি পণ্য বা একটি খাতের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলেই সমস্যার সমাধান হবে না।” 

এজন্য সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয় ও সংস্থার সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি। 

উপদেষ্টা বলেন, “জনগণের মধ্যে স্বাস্থ্যসচেতনতা বাড়ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার জনস্বার্থ ও জনস্বাস্থ্য রক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।” 

প্রমাণ ছাড়া প্রকাশ্যে কারও নাম নয়

একজন মডেলের দায়ের করা অভিযোগ এবং সেই অভিযোগে কয়েকজনের নাম প্রকাশ্যে বলার প্রসঙ্গে তথ্য উপদেষ্টা বলেন, “অভিযোগটি তদন্ত করা হবে। তদন্ত শেষে চার্জশিট অথবা চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হতে পারে। এর অর্থ এই নয় যে অভিযোগ দায়েরের মাধ্যমেই আইনি প্রক্রিয়া শেষ হয়ে গেছে।” 

তবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে যথেষ্ট প্রমাণ ছাড়া প্রকাশ্যে কারও নাম উচ্চারণ করা দায়িত্বশীল আচরণ নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।

উপদেষ্টা বলেন, “তিনি মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী বা সাধারণ নাগরিক— যেই হোন না কেন, প্রমাণ ছাড়া প্রকাশ্যে কারও নাম বলা উচিত নয়। কারণ এতে ওই ব্যক্তিকে সামাজিক ও প্রকাশ্য অপমানের মুখোমুখি হতে হয়।” 

অভিযোগকারী নিজের সমস্যার কথা সাংবাদিক ও জনগণের সামনে বলতে পারেন। এটি তার অধিকার। তবে নিজের অধিকার প্রয়োগ করতে গিয়ে অন্যের অধিকার ক্ষুণ্ণ হচ্ছে কিনা, সেটিও বিবেচনা করা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি। 

অবসরে পাঠানো মানেই ‘রাতের ভোটে’ শাস্তি নয় 

২০১৮ সালের নির্বাচনে দায়িত্ব পালন করা কয়েকজন জেলা প্রশাসক ও যুগ্ম সচিবকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তথ্য উপদেষ্টা বলেন, “সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে বলেনি যে তাদের নির্বাচনি অপরাধের কারণে অবসরে পাঠানো হয়েছে।” 

সরকারি চাকরির বিধান অনুযায়ী, চাকরির বয়স ২৫ বছর পূর্ণ হলে সরকার কোনও কর্মকর্তাকে কারণ দর্শানো ছাড়াই অবসরে পাঠাতে পারে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রেও সেই বিধান প্রয়োগ করা হয়েছে বলে জানান তিনি। 

তিনি বলেন, “আপনারা সাংবাদিক হিসেবে দেখেছেন যে তারা নির্বাচনের সময় জেলা প্রশাসক ছিলেন। সেখান থেকে একটি সম্পর্ক খুঁজে বের করেছেন। কিন্তু সরকার এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে বলেনি যে ২০১৮ সালের নির্বাচনের জন্য তাদের বিরুদ্ধে এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।” 

২০১৮ সালের নির্বাচন নিয়ে বিচার না হলে খারাপ দৃষ্টান্ত হবে

তথ্য উপদেষ্টা বলেন, “২০১৮ সালের নির্বাচন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। সন্ধ্যা থেকেই বিভিন্ন কেন্দ্রে ব্যালট বাক্স ভরার তথ্য আসতে শুরু করেছিল। রাতের বেলায় ভোট শেষ করে দেওয়ার এমন ঘটনা বিশ্বের নির্বাচন জালিয়াতির ইতিহাসেও বিরল।” 

তার মতে, ওই নির্বাচনের ঘটনায় যথাযথ তদন্ত হওয়া জরুরি। সেখানে শুধু ডিসি ও এসপি নন; নির্বাচনী কর্মকর্তা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য এবং অন্যান্য পর্যায়ে যারা নির্বাচনি অপরাধে জড়িত ছিলেন, তাদের দায়ও অনুসন্ধান করা প্রয়োজন। 

তিনি বলেন, “বাংলাদেশ যদি ২০১৮ সালের নির্বাচনের ঘটনার বিচার না করে, তাহলে সেটি খুব খারাপ একটি দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। নির্বাচনি অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি ব্যবস্থাও নেওয়া যেতে পারে।” 

২০০৮, ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচন নিয়েও নিরপেক্ষ অনুসন্ধান হওয়া দরকার বলে মন্তব্য করেন উপদেষ্টা। ২০০৮ সালের কয়েকটি কেন্দ্রে প্রতি বুথে অস্বাভাবিক দ্রুত ভোট পড়ার তথ্য পাওয়া গেছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। 

শাপলা চত্বরের বিচার বাধাগ্রস্ত হওয়ার কারণ নেই

২০১৩ সালের শাপলা চত্বরের ঘটনায় শেখ হাসিনাসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে করা মামলার বিচার নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তথ্য উপদেষ্টা বলেন, “ওই দিনের ঘটনায় কোনও আইন ভঙ্গ হয়ে থাকলে তার বিচার হতে হবে।” 

তিনি বলেন, “হেফাজতে ইসলামের নেতাকর্মীদের ঢাকায় আসতে দেওয়া, সমাবেশ এবং পরবর্তী অভিযানে হতাহতের অভিযোগসহ পুরো ঘটনাটি যথাযথভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন।” 

তিনি বলেন, “ওই রাতে যে বিপর্যয় ঘটেছিল, সেটি যে কারণেই ঘটে থাকুক, আইন ভঙ্গের বিচার হতে হবে। এই সরকারের সময় সেই বিচার বাধাগ্রস্ত হওয়ার কোনও কারণ নেই।” 

৭ দশমিক ৬২ মিলিমিটার গুলি নিয়ে ‘বিভ্রান্তি’

জুলাই আন্দোলনে ৭ দশমিক ৬২ মিলিমিটার গুলি ও স্নাইপার রাইফেল ব্যবহারের অভিযোগ নিয়ে তথ্য উপদেষ্টা বলেন, “বিষয়টি নিয়ে কিছু বিভ্রান্তিকর বক্তব্য প্রচার করা হচ্ছে।” 

তিনি বলেন, “বাংলাদেশ পুলিশের হাতে দীর্ঘদিন ধরে টাইপ-৫৬ রাইফেল ছিল, যা সাধারণভাবে ‘চাইনিজ রাইফেল’ নামে পরিচিত। এই রাইফেলে ৭ দশমিক ৬২ মিলিমিটার গুলি ব্যবহৃত হয়।” 

টাইপ-৫৬ মূলত সামরিক মানের অস্ত্র উল্লেখ করে তিনি বলেন, এর কার্যকর মারণসীমা অনেক দীর্ঘ। লক্ষ্যভ্রষ্ট গুলিও কয়েকশ মিটার দূরের মানুষকে হত্যা করতে পারে। এই ধরনের অস্ত্র সাধারণ পুলিশের হাতে দেওয়া উচিত ছিল না। 

পুলিশ ও বিজিবির সদস্যদের এই অস্ত্র থেকে গুলি করার ছবি ও ভিডিও রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। ফলে ৭ দশমিক ৬২ মিলিমিটার গুলি শুধু অজ্ঞাত কোনও স্নাইপার ব্যবহার করেছে— এমন প্রচারণা সঠিক নয় বলে মন্তব্য করেন উপদেষ্টা।

তবে কার গুলিতে কে নিহত হয়েছেন, তা নির্ধারণে সুষ্ঠু তদন্তের প্রয়োজন রয়েছে বলেও জানান তিনি। 

মিরাজ শেখকে খুঁজে বের করা সরকারের দায়িত্ব

গত ১০ এপ্রিল বাগেরহাটের মোংলা থেকে মিরাজ শেখ নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় কোস্ট গার্ডের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ নিয়ে তথ্য উপদেষ্টা জানান, সংশ্লিষ্ট বাহিনীর কাছ থেকে অভিযোগটির সত্যতা নিশ্চিত করে কোনও তথ্য তিনি পাননি। 

তবে ওই বাহিনী জড়িত না থাকলেও একজন নিখোঁজ নাগরিককে খুঁজে বের করা সরকারের দায়িত্ব বলে মন্তব্য করেন তিনি। 

তিনি বলেন, “পরিবার অভিযোগ করছে, একজন মানুষকে পাওয়া যাচ্ছে না। অভিযোগটি খতিয়ে দেখা এবং পরিবারকে নিয়মিত তথ্য দেওয়া সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।” 

বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের একটি আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দেওয়া প্রয়োজন উল্লেখ করে উপদেষ্টা জানান, তিনি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আবার কথা বলবেন। 

তবে তদন্তের আগে ঘটনাটিকে সরাসরি ‘গুম’ হিসেবে অভিহিত না করার আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে বাংলাদেশ থেকে গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড পুরোপুরি বন্ধ হওয়া উচিত বলেও মন্তব্য করেন। 

জুলাই জাদুঘরের উদ্বোধন ৫ আগস্ট

জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মরণে নির্মিত জাদুঘরের উদ্বোধন নিয়ে তথ্য উপদেষ্টা বলেন, আগামী ৫ আগস্ট এটি উদ্বোধন করা হবে। 

তিনি বলেন, জাদুঘরের কিছু কাজ অসম্পূর্ণ ছিল। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তিনি নিজেও কয়েক দিন ধরে কাজ করছেন। নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই অবশিষ্ট কাজ শেষ হবে।

তিনি বলেন, “কোনও সমস্যা হবে না। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে ৫ আগস্ট জাদুঘর উদ্বোধন হবে।” 

এই বছরের মধ্যেই স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু

স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সময়সূচি নিয়ে তথ্য উপদেষ্টা বলেন, “সরকারের সিদ্ধান্ত হচ্ছে চলতি বছরের মধ্যেই নির্বাচন শুরু করা।” 

ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনসহ বিপুলসংখ্যক স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন একসঙ্গে সম্পন্ন করা সম্ভব নয়। ধাপে ধাপে নির্বাচন আয়োজন করতে হবে। 

নির্বাচন শুরু হওয়ার পর সব স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের ভোট শেষ করতে প্রায় এক বছর সময় লাগতে পারে বলে জানান তিনি। 

অক্টোবরের মধ্যে নির্বাচন শুরু হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে উপদেষ্টা বলেন, “নির্বাচন কমিশন সময়সূচি নির্ধারণ করবে। তবে এই বছরের মধ্যে প্রক্রিয়া শুরু করার বিষয়ে সরকারের প্রতিশ্রুতি এখনও বহাল রয়েছে।” 

সাগর-রুনি হত্যার সঠিক বিচার না হলে বিচারব্যবস্থা প্রশ্নবিদ্ধ হবে

সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যা মামলার তদন্তে বারবার সময় নেওয়ার বিষয়ে তথ্য উপদেষ্টা বলেন, দীর্ঘদিন প্রায় স্থবির হয়ে থাকা কয়েকটি হত্যা মামলায় নতুন করে গতি আনা হচ্ছে। কুমিল্লার কলেজছাত্রী সোহাগী জাহান তনু হত্যা মামলার তদন্তও নতুন করে শুরু হয়েছে। 

তিনি বলেন, “অতীতে অমীমাংসিত থাকা সব হত্যাকাণ্ড নিয়েই সরকার কাজ করবে। প্রতিটি মানুষের জীবন সমান গুরুত্বপূর্ণ। তবে পেশাগত দায়িত্ব পালনের কারণে কোনও সাংবাদিককে হত্যা করা হয়ে থাকলে সেটি রাষ্ট্র ও স্বাধীন সাংবাদিকতার জন্য বিশেষভাবে গুরুতর ঘটনা।” 

তিনি বলেন, “সাগর-রুনি হত্যার একটি সুনির্দিষ্ট ও সঠিক বিচার না হলে দেশে বিচার বলে কিছু আছে কিনা— সেই প্রশ্ন থেকে যাবে।” 

তদন্তকারী সংস্থার পক্ষ থেকে শতাধিকবার আদালতে সময় চাওয়ার বিষয়ে উপদেষ্টা বলেন, “সময় দেওয়া আদালতের এখতিয়ার। কিন্তু যথাযথ তদন্ত না করে বারবার সময় চাওয়া সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থার দায়ের মধ্যে পড়ে।” 

আগের সরকারের আন্তরিকতার অভাবের কারণে তদন্ত এগোয়নি— এমন সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “বর্তমান সরকারের পক্ষ থেকে তদন্তে গতি আনার সুযোগ রয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত মামলার রায় কী হবে, সেটি সম্পূর্ণভাবে আদালতের বিষয়।” 

/জেইউ/এসটি/ 
সম্পর্কিত
ভারপ্রাপ্ত স্পিকারের সঙ্গে সিইসির সাক্ষাৎ, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে যা জানা গেলো 
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন: ভারপ্রাপ্ত স্পিকারের সঙ্গে সিইসির বৈঠক মঙ্গলবার
মো. সাহাবুদ্দিনকে নিয়ে আলাদা তদন্ত করবে না বাংলাদেশ ব্যাংক
সর্বশেষ খবর
দেশব্যাপী পুলিশের  অভিযানে ৩৯ হাজার গ্রেফতার
দেশব্যাপী পুলিশের অভিযানে ৩৯ হাজার গ্রেফতার
ইসি সচিবালয়ে সামসুল আলমের নিয়োগ বাতিলের দাবি জামায়াতের
ইসি সচিবালয়ে সামসুল আলমের নিয়োগ বাতিলের দাবি জামায়াতের
আলোচনায় মাইক্রোপ্লাস্টিক: টুথপেস্ট না গেলার পরামর্শ সরকারের  
আলোচনায় মাইক্রোপ্লাস্টিক: টুথপেস্ট না গেলার পরামর্শ সরকারের  
সিনিয়র পুলিশ কর্মকর্তার নির্দেশেই দিল্লিতে আন্দোলনকারীদের ওপর পেলেট নিক্ষেপ, নথি ফাঁস
সিনিয়র পুলিশ কর্মকর্তার নির্দেশেই দিল্লিতে আন্দোলনকারীদের ওপর পেলেট নিক্ষেপ, নথি ফাঁস
সর্বাধিক পঠিত
রাজধানীতে বাস-সিএনজির সংখ্যা অর্ধেক হয়ে গেলো কেন
রাজধানীতে বাস-সিএনজির সংখ্যা অর্ধেক হয়ে গেলো কেন
এক মিনিটেই মিলবে ৫০ হাজার টাকা
এক মিনিটেই মিলবে ৫০ হাজার টাকা
মেসির ৩ ছেলে, কে কোন পায়ে ও কোন পজিশনে খেলে
মেসির ৩ ছেলে, কে কোন পায়ে ও কোন পজিশনে খেলে
আমিরাতের ভিসা বাতিল নিয়ে যা বলছে দূতাবাস 
আমিরাতের ভিসা বাতিল নিয়ে যা বলছে দূতাবাস 
আগে ২০ লাখ টাকা চেয়েছিল, পুলিশকে জানানোর পর এখন ৫০ লাখ চাচ্ছে তারা
আগে ২০ লাখ টাকা চেয়েছিল, পুলিশকে জানানোর পর এখন ৫০ লাখ চাচ্ছে তারা